যাও পাখি বলো তারে – পর্ব ৮

0
180

#’যাও পাখি বলো তারে’❤
#’লেখাঃ ঈশানুর তাসমিয়া মীরা❤
#’পর্বঃ ০৮
.
বিকাল ৪টা ২৫ মিনিট। বাসার সবাই এখনো বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। ঘুমাবেই না কেন? বিয়ের দিন থেকে কাল রাত পর্যন্ত সবাই নানা কাজে ব্যস্ত ছিলেন। এখন একটু বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। এটা তো মোটেও হাত ছাড়া করা যায় না। কিন্তু আমিই সেই অভাগী যে কিনা এই সুযোগ হাত ছাড়া করে বাগানে হাঁটতে বেড়িয়েছিলাম। যে দুঃসাহস করার ফলসরুপ এখন আমাকে খাবার গরম করা, গুছানো এবং বেড়ে দেওয়ার কাজ করানো হচ্ছে। আর এই মহান কাজটা আমাকে দিয়ে করাচ্ছেন রেয়ান। উনি আর সবুজ ভাইয়া এখন আপাতত সোফায় বসে বসে টিভি দেখছেন। আর আমি রান্না ঘরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খাবার গরম করছি! ভাবা যায়?

প্রায় দশ-বিশ মিনিট পর সব খাবার গরম করে টেবিলে গোছাতে লাগলাম আমি। গোছানো শেষে ড্রইংরুমের এক পাশে দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে ধীর কণ্ঠে রেয়ান ভাইকে বললাম,

—” শুনছেন? খাবার গরম করেছি খেতে আসুন।”

উনি রিমোট হাতে নিয়ে টিভির চ্যানেল পাল্টাচ্ছিলেন। আমার কথায় ঘার কাত করে আমার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন। গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,

—” আসছি। ”

যাওয়ার আগে আমি সবুজ ভাইয়ার দিকে একবার আড়চোখে তাকিয়ে ছিলাম। উনি হাসি হাসি মুখ করে তাকিয়ে ছিলেন আমার দিকে। আমি ড্রইংরুম থেকে যেতেই রেয়ান ভাইকে কনুই দিয়ে গুঁতো দিয়ে ভ্রু নাচিয়ে বললেন,

—” সামথিং সামথিং ”

উনি ভ্রু কুঁচকে বললেন,
—” কি সামথিং সামথিং? ও আমার কাজিন। অন্যকিছু না। বাজে চিন্তা বাদ দেয়।”
—” আমি বিশ্বাস করি না। ”

বলেই আবারও ভ্রু নাচিয়ে বলে উঠলেন,

—” সামথিং সামথিং! ”

রেয়ান বেশ বিরক্তি নিয়ে বললেন,

—” লাথি খাবি! ওকে আমার মোটেও পছন্দ না। কেমন জানি! যাই হোক, ও আমার কাজিন মানে কাজিন। না জেনে বুঝে কিছু বলবি না।”

সবুজ ভাইয়া এতক্ষণ মুচকি মুচকি হাসলেও এখন মুখ বাঁকিয়ে বলে উঠলেন,

—” তোর থেকে আমি ওকে আরো আগে থেকে চিনি। তুই এখানে এসেই প্রথম দেখেছিস ওকে। আর আমি তোর আসার কয়েকদিন আগে আন্টি থেকে ছবি দেখেছিলাম। তোর মার ফোনে ওর এখনকার ছবি আছে বুঝলি? সো আমি ওকে তোর থেকে আগে চিনি।”

বলেই মুখ ভর্তি হাসলেন সবুজ ভাইয়া। উনি গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,

—” বেশি দাঁত কেলাতে হবে না। আমার থেকে মাত্র দু’তিন দিন আগে ওকে দেখেই যে চিনে ফেলেছিস সেটা তো কোনো কথা না। আমি ছোট থেকেই ওকে চিনি। তবে হ্যাঁ, প্রায় নয়-দশ বছরের মতো দেখিনি। তাই বলে ও তো আমার অপরিচিত কেউ হয়ে যাবে না তাই না?”

সবুজ ভাইয়া মুখ কালো করে ফেললেন। কেননা রেয়ান কিছু ভুল বলেন নি। এদিকে রেয়ান সবুজ ভাইয়াকে মুখ কালো করতে দেখে ভ্রু কুঁচকে বললেন,

—” পেঁচার মতো মুখ বানিয়ে এখানে বসে আছিস কেন? খেতে যাবি না?”

সবুজ ভাইয়া মিনমিনিয়ে বললেন,

—” ছোট বেলার কথা তোর এখনও মনে আছে নাকি? নেই যেহেতু মীরা তোর অপরিচিত!”

সবুজ ভাইয়ার এমন জেদি কথাবার্তা শুনে বিরক্তি নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন রেয়ান ভাইয়া। গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,

—” ওকে নিয়ে এত কিসের কথা? একটা বিষয় নিয়েই কতক্ষণ ধরে কান ঝালাপালা করে দিচ্ছিস আমার। ও কিছু না আমার জন্য। না তোর। তাই ওকে নিয়ে কথা বন্ধ কর।”

বলেই চলে যেতে নিলেন তখনই সবুজ ভাইয়া বলে উঠলেন,

—” ও যেহেতু তোর জন্য কিছুই না তাহলে বাসার অন্য সদস্যদের না ডেকে ওকে আমাদের খাবার বেড়ে দিতে বলেছিস কেন?”

কথাটুকু শুনে থমকে দাঁড়ান রেয়ান। পরপরই আবারো ডাইনিংরুমের দিকে যেতে যেতে বলে উঠলেন,

—” বাসার সবাই ঘুমাচ্ছিল তাই। ”

এমন কথায় সবুজ ভাইয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রেয়ান ভাইয়ার সাথে ডাইনিংরুমে যেতে লাগলেন।

________________________

অনেক্ষণ ধরে খাবার বেড়ে রেখে টেবিলের কোণ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছি আমি। কিন্তু রেয়ান ভাইয়া কিংবা সবুজ ভাইয়ার আসার কোনো নামই নেই। বিরক্ত হয়ে সামনে তাকাতেই দেখলাম রেয়ান ভাইয়া এসে চেয়ার টেনে বসছেন। তার একটু পরেই সবুজ ভাইয়াও এসে বসলেন রেয়ান ভাইয়ার পাশে। আমি শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে উনাদের দিকে তাকিয়ে আছি। আমাকে নড়তে না দেখে রেয়ান ভ্রু কুঁচকে বললেন,

—” কি? হাবলার মতো তাকিয়ে আছো কেন? খাবার সার্ভের কথা ভুলে গেছ? ঢিলা নাকি?”

কথাটায় অনেক লজ্জা পেলাম আমি। সবুজ ভাইয়ার সামনে এমন কথা বলার কোনো মানে আছে? লজ্জায় কান্না আসতে চাইলো আমার। কোনোমতে কান্না নিয়ন্ত্রণ করে খাবার বেড়ে দিতে লাগলাম। সবুজ ভাইয়া আমাকে দেখে কিছু বুঝতে পারলেন। অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন আমার দিকে। কিন্তু রেয়ান দিব্যি খাবার খাচ্ছেন। একবার তাকানও নি আমার দিকে। আমি কোনোমতে খাবার বেড়েই দৌঁড়ে চলে এলাম রুমে। সবুজ ভাইয়া সেদিকে তাকিয়ে মুখ কুঁচকে রেয়ান ভাইকে কিছু বলবেন তার আগেই রেয়ান খাবার খেতে খেতে গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলেন,

—” ওকে নিয়ে আর একটা ওয়ার্ডও না। ”

সবুজ ভাইয়াও এবার আর কিছু বললেন না। চুপচাপ খাবার খেতে লাগলেন। কেননা তিনি জানেন উনাকে কিছু বললেও উনি সেগুলো কানে নেবেন না। উল্টো রেগে মেগে খাবার না খেয়েই উঠে চলে যাবেন।

খাবার খাওয়া শেষ হতে হতে বড় চাচী আর ছোট চাচী এলেন ডাইনিংরুমে। রেয়ান আর সবুজ ভাইয়াকে খেতে দেখে বলে উঠলেন,

—” কিরে তোরা কখন এলি? আর খাবারই-বা কে গরম করে দিয়েছে তোদের?”

সবুজ ভাইয়া বললেন,

—” মীরা দিয়ে গেল এইমাত্র। ”

বলেই সবুজ ভাইয়া খেতে খেতে গল্প করা শুরু করে দিলেন বড় চাচী আর ছোট চাচীর সাথে। রেয়ান চুপচাপ খাবার খাচ্ছেন। খাওয়া শেষ হতেই আগের মতো চুপচাপ চলে এলেন রুমে। রুমে ঢুকে প্রথমেই তার চোখ পড়ল বিছানায় রাখা জ্যাকেট-টার দিকে। এগিয়ে গিয়ে জ্যাকেট-টা হাতে নিলেন উনি। ভাবছেন এটা এখানে কিভাবে? পরপরই সকালের ঘটনা মনে পড়ল তার। এ জ্যাকেট-টা সকালে আমাকে পড়িয়ে দিয়েছিলেন উনি। বুঝতে পারলেন এটা আমিই রেখে গিয়েছি এখানে। ভাবতেই আবারও জ্যাকেট-টার দিকে তাকাতেই দেখলেন জ্যাকেটের পকেটে একটা সাদা কাগজ দেখা যাচ্ছে। কাগজটা এক হাত দিয়ে খুলে দেখলেন সেখানে “Thank you!” লিখা!

বিশেষ ভাব গতি প্রকাশ করলেন না রেয়ান। নিরবে জ্যাকেট-টা আলমারিতে রেখে কাগজটা মুচড়ে ফেলে দিলেন ডাস্টবিনে। পরপরই বারান্দায় চলে গেলেন। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন আকাশের দিকে! একদিকে যেমন একজন কান্নার মাধ্যমে নিজের বালিশ ভেঁজাচ্ছে অন্যদিকে তেমনিই একজন উদাসীন হয়ে আকাশের পানে চেয়ে আছে। হঠাৎ-ই আকাশে উড়তে থাকা পাখিগুলোর দিকে তাকিয়ে রেয়ান গানের দুই লাইন মৃদু স্বরে গেয়ে উঠলেন,

-” যাও পাখি বলো তারে
সে যেন ভোলে না মোরে…”-

______________________

ছাদের রেলিং ঘেষে দাঁড়িয়ে আছে দুই ভাই। রেয়ান এবং আবদ্ধ! দুজনের মাঝেই প্রখর নিরবতা। কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবদ্ধই প্রথমে বলে উঠল,
—” কেমন আছিস ভাই? ”
—” ভালো। তুই? ”
—” আমি আছি কোনো রকম। ”

কথাটুকু বলে আবারও চুপ দুজনে। নিরবতা ভেঙ্গে এবার রেয়ান শান্ত কণ্ঠে বললেন,

—” আমি তোর বিয়েতে আসি নি। এখানে আসার এতসময় পর তোর সাথে দেখা করতে এসেছি, তুই রেগে নেই আমার সাথে?”

আবদ্ধ ছোট্ট করে জবাব দিলো,
—” একটু! ”

পরপরই তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলল,
—” যে বিয়ের কোনো মূল্যই নেই সেখানে কারো আসা বা না আসা দিয়ে কি আসে যায়।”
—” এ বিয়েতে খুশি না তুই? ”

রেয়ানের আচমকা এমন কথায় চুপ হয়ে যায় আবদ্ধ। প্রায় অনেক্ষণ চুপ করে নিচের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে থাকে। হঠাৎ-ই রেয়ানকে জড়িয়ে ধরে ধরা গলায় বলে উঠে,

—” আমি এত তাড়াতাড়ি বিয়ে করতে চাই নি ভাই। আমার বয়সই-বা কত? এখনও তো অনেক কিছু করার ছিল আমার। পড়ালেখার পাশাপাশি আব্বুর বিজনেসটা একটু সামলাতে চেয়েছিলাম আমি। তাই বলে কি আমি বড় হয়ে গেছি? তাও এসব মানলাম। কিন্তু বিয়ের দিন কনে পালিয়ে যাওয়ায় নিজেদের মানসম্মান রক্ষার্থে কনের ছোট বোন যেকিনা এখনও কিশোরী, মাত্র ইন্টারে উঠেছে তার সাথে আমার বিয়ে দিয়ে দিবে? আমার কথা একবার ভেবেও দেখলো না। এরপর আমার কি হতে পারে, কেমন লাগতে পারে আমার!”

একটু থেমে আবারও বলল আবদ্ধ,

—” এসব আর আমি নিতে পারছি না ভাই। আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। আব্বু-আম্মুর কি খুব বেশি জরুরি ছিল আমার সাথে এসব করার? বাচ্চা মেয়েটাকে কিভাবে আমি নিজের জীবনসঙ্গী হিসেবে মানবো? সে তো একটা বাচ্চা!”

রেয়ানও জড়িয়ে ধরলেন আবদ্ধকে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

—” সব মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা কর আবদ্ধ। ভাগ্যে এটাই ছিল। মেয়েটার জীবন শুধু শুধু নষ্ট করিস না।”

আবদ্ধ সরে দাঁড়ালো। চোখের পানি মুছতে মুছতে বলল,

—” আব্বু-আম্মু এমন কেন করেছে আমার সাথে? তুই জানিস ভাই?”

রেয়ান গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
—” না! ”

মিথ্যে কথাটা বলেই আবারও দীর্ঘশ্বাস ফেললেন রেয়ান। আকাশের দিকে চেয়ে প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে বলে উঠলেন,

—” মনে রাখবি আবদ্ধ। তোদের বিয়ে হয়ে গেছে। এখন কিছুই করার নেই। আর না মেয়েটার কোনো দোষ আছে। তাই মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা কর।”

আবদ্ধ মাথা নাড়ালো। নিজের ভাইয়ের মতো সেও আকাশের দিকে তাকিয়ে প্যান্টের পকেটে হাত রাখলো। তা দেখে বাঁকা হাসলেন রেয়ান। বললেন,
—” যা রুমে যা। তোর বউ হয়তো অপেক্ষা করছে তোর জন্য।”
—” তুই যাবি না? ”
—” এখন না৷ সবুজ ঘুমাক তারপর। ব্যাটা আলতুফালতু কথা বলে মাথা খারাপ করে দেয়।”

আবদ্ধ হেসে দিলো। পরপরই একবার রেয়ানের দিকে তাকিয়ে চলে গেল ছাদ থেকে। রেয়ান ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন ওভাবেই!

_______________

চলবে…
Ishanur Tasmia

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here