রোদেলা লেখা: #মাহাবুবা_মিতু ৮০

0
32

#রোদেলা
লেখা: #মাহাবুবা_মিতু
৮০.

চারদিক কেমন নিস্তব্ধ। পাখির কিচিরমিচির আর মাঝে মাঝে মৃদু বাতাসে কাঠ লিচু গাছটার পাতায় পাতায় তৈরি খসখস শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দ বা
প্রাণের স্পন্দন নেই যেন এই পৃথিবীতে। স্তব্ধ দুপুর বলে যে একটা কথা বলে, একেই বলে হয়তো। মন খারাপের এই স্তব্ধ দুপুরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে রোদেলা। ওর জীবনে অর্জিত অনেক কিছু থাকলে ও যা সকলের একান্ত দুনিয়াটা জুরে সহজাত ভাবে, সুন্দরে, সুখে কিংবা দুঃখে পাশে থাকে তা ওর নেই। এটা অনেকের এমনি পাওয়া জিনিস, কিন্তু ও তা এমনি তো পায়-ই নি আর অর্জনও করতে পারলো না এতদিনে। আর তা হচ্ছে “মায়ের ভালেবাসা”
এই এক দুঃখ ওর জীবণে।

ওর মা সেদিন নাকি প্রিসিলাকে বলছিলো-
” অন্যের ছেলেমেয়েরা তাদের মা’কে কত ভালোবাসে, মা হাঁটলে ছেলেমেয়ে ব্যাথা পায়, আল্লাহ আমাকে তো ছেলে দিলোই না, মেয়েদের ভালোবাসাও পেলাম না জীবণে ”

সত্যি বলতে ” রোদলা ওর মা’কে ভালোবাসে না” কথাটা মিথ্যা। ওর প্রতি এত কঠিন হওয়ার পরও ওর মাকে যে ও ভালোবাসে তা টের পেয়েছিলো ক্লাস সিক্সে পড়ার সময়। ও নিজেও জানতো না ওর গভীরে এই কঠিন হৃদয়ের, কর্কশ কন্ঠ ধারী, যখন তখন প্রহার আর অকথ্য ভাষায় গালাগাল করা মহিলাটার প্রতি মায়া আছে, ভালোবাসা আছে।

স্কুলে ওর চেয়ে বড় ক্লাসের মেয়েদেরকে ওদের মা কিংবা বাবা স্কুলের গেইট অব্দি পৌঁছে দিতো, কারন
স্কুলে পৌঁছানোর রাস্তাটা নিরিবিরি আর খারাপ ছেলেদের উৎপাতে ভরপুর। দিনদুপুর ছিনতাই সহ নানান অঘটন ঘটে অহরহ। তাই তারা তাদের মেয়েদের নিরাপত্তায় এতদূর এসে পৌঁছে দিতো। আর রোদেলার বাসা তো পাঁচমিনিটের পথ। তাই বাবা কিংবা মা কখনোই ওকে স্কুলে পৌঁছে দিতো না। সেই যে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন ক্লাস ওয়ানে, স্কুল আর বাবা বলতে একটু স্মতিই ওর জীবণে। তারপর প্রতি বছরের প্রথম দিনে, রেজাল্ট কার্ড আর টাকা নিয়ে পৌঁছে যেতো বাসার টিচারকে সাথে নিয়ে আর ভর্তি হয়ে যেতো নতুন ক্লাসে। স্কুলে প্যারেন্টস মিটিং, কিংবা পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান, কোনটায়ই বাবা মা দুজনের কেউই যেতেন না। রাজ্যের অনীহা তাদের এ ব্যপারে।

তো রোদেলা প্রতিদিন স্কুলে একাই যেতো ঐ ভয়ংকর রাস্তা দিয়ে। রোদেলার ঐসবে ভয় ছিলো না। ও ভয় পেতো যখন কবরস্থান টা সমনে পরতো তখন। ওর মনে হতো সেখানে তাকালেই ও দেখতে পারবে কাফন জড়ানো লাশগুলো উপরে উঠে বসে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। ছোট মানুষ, উদ্ভট চিন্তা ভাবনার উদাহরণ এটি।

সেদিন স্কুলের অপজিটে থাকা এক কাঠের দোকানে আগুন লেগে গিয়েছিল সর্ট সার্কিটে। শীতকালে সবকিছু শুকনো থাকায় সে আগুন ছড়িয়ে পরেছিলো দ্রুত। স্কুলের স্যার ম্যাডামরা তাই দ্রুত উল্টো রাস্তা দিয়ে সেইভলি পার করে দিয়েছিলেন সবাইকে । সেখান থেকে রোদেলা অনেক পথ ঘুরে বাড়ি পৌঁছে জানতে পারে ওর মা আগুনের খবর শুনে দৌঁড়ে স্কুলে গেছেন ওকে খুঁজতে। ও স্কুল ব্যাগ রেখে ছুটে যেতে চেয়েছিলো ওর মাকে খুঁজতে। বাড়ির বড়রা বললো তুমি যেও না, তোমার মা ঠিক চলে আসবে। আগুন খুব ভয়ংকর রূপ নিয়েছে এখন। বাড়ির ছাঁদে উঠা ছেলেরা খেলার ধারা ভাষ্যের মতো বর্ননা করছিলো সে আগুনের হিংস্রতা কে। এদিকে বাড়ির অন্যান্য ভাড়াটিয়াদের মধ্যে আতংকিত কেউ কেউ এত দূরে বাড়ি হওয়া সত্ত্বেও,তাদের মূল্যবান জিনিসপত্র গুছগাছ করছে।

রোদেলার সে কি কান্না মাটিতে গড়িয়ে। “আমার মা ম*রে যাবে সে আগুনে ” কারন আগুনের হিংস্রতা ও দেখাে এসেছে খুব কাছ থেকে। মায়ের প্রতি প্রথম ভালোবাসা বলতে এ স্মৃতিটাই মনে পরে ওর। সেদিন ও বুঝেছিলো মা এমন হলেও রোদেলাকে তিনি ভালোও বাসেন।

গতরাতে সুফিয়ান ঘুমিয়ে পরার পর রোদেলা ওর মায়ের ডায়েরিটা পড়েছিলো। ডায়েরি বলতে সবুজ মলাটের ৬/৪ সেন্টিমিটার সাইজের একটা ছোট্ট নোটবুক। নাম-ঠিকানা আর ফোন নম্বর লেখায় তিনি ব্যাবহার করেন এটি। নেটবুকটার বয়স অনেক। কেমন তেল চিটচিটে ভাব হয়ে গেছে সুতার বোনা সবুজ মলাটটা।

কি মনে করে সেদিন খুলেছিলো এটাকে। পরে চিনতে পেরে ওর উদ্দেশ্য ছিলো দরকারি নম্বরগুলোর ছবি তোলা। সেটা রেন্ডম নরাচরা করে রোদেলা কিছু লেখা পেয়েছিলো। এলেমেলো পাতায় কিছু অনুভূতি লিখে রাখা ছিলো সেখানে। যেমন একটা পাতায় লেখা-
ছোট মেয়েটার দাঁত উঠেছে আজ।
তার নিচে তারিখ দিয়ে লেখা- নোভেল আজ ম*রা*র ঘর থেকে ফিরে এলো। আরেক পাতায় লেখা- এত ছোট বয়সেও রোদেলা কি সুন্দর বাচ্চাদের পড়ায়।
আরেক পাতায় লেখা আমার মেয়ে গান গেয়ে পুরস্কার পেয়েছে আজ।

আরেক পাতায় লিখেছেন- লোকটা মেয়েটার কানের দুল গুলোকে ও নিয়ে গেলো। কখন নিলো একদম টেরই পেলাম না।

এমন অনেক অনেক ব্যাক্তিগত টুকরো টুকরো স্মৃতি গুলো টুকে রাখা তাতে, যাতে ফুটে উঠেছে তার প্রতি তার স্বামীর করা অবহেলা আর অন্যয়ের কথা, না পাওয়া আর কষ্টের কথা, অপমান আর যন্ত্রণার কথা। এসব জানে রোদেলা, তাইতো আগলে রাখতে চাইতো মাকে। বাবার সাথে কথাও বলে নি ও অনেক বছর ওর মাকে তিনি কষ্ট দিয়েছেন তাই।

নোটবুক পড়ে রোদেলার মনে হলো এ যেন অন্য কেউ। কারন সেখানকার অনেক লেখার সাথে তিনি ঠিক খাপ খান না। যেমন – আঁকিবের সাথে রোদেলার সম্পর্কের ব্যাপারটা যেদিন তিনি জেনেছিলেন আঁকিবের মায়ের ওদের বাড়িতে আগমনে, সেদিন কুকুরের মতো পিটিয়েছিলেন তিনি রোদেলাকে। অকথ্য গালিগালাজ তো আছেই। সে কথাও লেখা নোটবুকের এককোণে অনুতাপের ভাষায়। আঁকিবের মা রোদেলার পরিবারের মানসম্মান বিবেচনা করে ওদের বাড়িতে গিয়ে ওর মাকে সাবধান করে এসেছেন এ ব্যাপারে। অথচ এলাকায় সবাই ঘটনাটা জেনেছিলো নাসিমার কারনেই। আঁকিবের মা কিন্তু পারতেন এসব বলে ওদেরকে অসম্মান করতে, কিন্তু তিনি পর হয়ে রোদেলার, ওর পরিবারের সম্মানের কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু নাসিমা তা ভাবে নি। উঠতে বসতে অকথ্য কথার বানে জর্জরিত করেছে সে রোদেলাকে দিনের পর দিন । তারপর পরের কারনে রোদেলাকে দেয়া অভিশাপ গুলো। এগুলো ও ভুলে যেতে চাইলেও পারে না ভুলতে। অন্যের কারনে তিনি কিভাবে পারেন বলতে যে – ” আল্লাহ অহংকারের ভর সইতে পারে না? ” অহংকার…! সেটা কি তা জানেই না রোদেলা। হীনমন্যতায় বড় হওয়া রোদেলার জীবণে এ শব্দটা ঠিক যেন অমাবস্যায় চাঁদ দেখার মতো। ওর মা -ওকে চিনলোই না। সারা দুনিয়ার মানুষ ওকে ভালো বলে, ভালোবাসে শুধু মায়ের চোখেই খারাপ ও। এসব মনে হলে খুব কষ্ট করে মায়ের প্রতি ভক্তি জড়ো করার চেষ্টাটা গুড়িয়ে যায়

তবুও মা, মা, মা এবং বাবা।

কলিং বেলের শব্দে ওর চিন্তার তার কাটে। বাইরের দরজা থেকে ওর রুমে আসতে ত্রিশ সেকেন্ডের মতো সময় লাগে, ঠিক ততোটুক সময় পর নাতাশা এসেছে ওর ঘরে। ওর হাতে বেশ কয়েকটা ব্যাগ। বোঝাই যাচ্ছে ওর জন্য কিছু এনেছে নাতাশা।

সন্ধ্যায় রেজওয়ান আর প্রিসিলা ফিরেছে। ওদের আগমনে বাড়িটা যেন প্রাণ ফিরে পেলো। তিনবোন মিলে জমপেশ আড্ডা হলো রাতে। রোদেলা কল্লোলকে ফেন করে বললো আপনিও চলে আসুন আমাদের বাড়িতে। কল্লোল এলো রাত সাড়ে দশটায়। ছাদে বসে আড্ডা হলো সবাই মিলে, অনিমাকেও ডেকে আনলো রোদেলা ফোন করে। আগামীকাল ওদের অঘোষিত দাওয়াত ওদের বাড়িতে।

রাতে ব্যাগপত্র গোছগাছ শুরু করে দিয়েছে রোদেলা। যাবার সময় হলো বলে। সুন্দর সময় গুলো কেমন দ্রুত শেষ হয়ে যায়, ভাবতেই খারাপ লাগায় মনটা ছেঁয়ে গেলো। কিন্তু সময় বড়ই অদ্ভুত জিনিস।
” মানুষের এক নম্বর শত্রু হল সময় ” কথাটা সত্যি। ঠিক এই সময়টাতে ওর ভীষণ রকমের বিরক্তি, খারাপ লাগা, ভর করেছে ওর মনে।

চলে যাবে বলে সবাই দাওয়াত করে খাওয়াচ্ছে ওদের। শেষ কটা দিন না চাইতেও সবার মন রাখতে বাড়ি বাড়ি দাওয়াত খেয়ে কাটাতে হবে। কত কাজ, কত কেনাকাটা বাকী । ওরা চলে যাবে সাথে করে কিছু নিয়ে যাবে যা ঐ বিদেশবিভুঁইয়ে মনে করাবে দেশের কথা, প্রিয়জনের কথা।

ব্যাপারটা এক দিক দিয়ে ভালোই। এই দেশে ওর এমন কোন প্রিয়জন নেই যার সঙ্গে সময় কাটানোর আকুলতায় এই দাওয়াতে গিয়ে সময় নষ্ট করাটা ভাবাবে ওকে। চলুক যা যেমন চলছে…

চলবে..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here