রোদেলা লেখা: #মাহাবুবা_মিতু ৮১

0
33

#রোদেলা
লেখা: #মাহাবুবা_মিতু
৮১.

রোদেলার জন্য আসা পার্সেলটা চেক করে সুফিয়ান একটা চিরকুট পেয়েছে। রোদেলা সবকিছু খুলে না দেখায় সেটা খুঁজে পায় নি তখন। সুফিয়ান চিরকুটটা পরপর তিনবার পড়লো। পরিচিত কিছু কথা, পুরাতন কিছু সময় কেমন যেন উপচে পরলো স্মৃতির বাক্স থেকে। পাশে দাঁড়ানো রোদেলা জিজ্ঞেস করলো-
” তা ডিটেকটিভ সাহেব, কিছু উদ্ধার করতে পারলেন কি? ” চিন্তামগ্ন সুফিয়ান ওর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। এর কোন মানে বুঝতে পারলো না রোদেলা।

সুফিয়ানের ডিটেকটিভ, সাসপেন্স আর থ্রিলার জনরার মুভি উপন্যাস বেশ পছন্দের, রোদেলা তাই ওকে মাঝে মাঝে এসব বলে খোঁচা দেয়। যদিও ওর এসব গুণ কিছু নেই। চোখকান খোলা রাখলো মানুষ অনেক কিছুই বুঝতে পারে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সবচেয়ে বেশী যা হনন করেছে তা হচ্ছে মানুষের চোখকান খোলা রাখবার মতো ধৈর্য।

সোফা থেকে উঠে বসে সুফিয়ান বললো-
: “নাহ্, আপাততঃ পারলাম না কিছু উদ্ধার করতে। তবে মস্তিষ্কে কিছু রসদ পৌঁছেছে। তার ক্যালকুলেশনে কিছু একটা বেরুবে ফলাফল, তবে সময় লাগবে…
তবে এটা যখন তোমার চার বছর আগে হওয়া বিয়ের উপহার তাহলে তুমি এটা নিশ্চিন্তে নিতে পারো সাথে করে”

: “আমি কিন্তু দুঃশ্চিতায় কিছু বলি নি, যে পাঠিয়েছে সে অনেক ভালোবাসেই পাঠিয়েছে এটা, তা আমি ঠিক বুঝেছি। কিন্তু পাঠালো কে তা বুঝতেই…”

: “আচ্ছা ওরা কখন গেছে সবাই…?”
: “সন্ধ্যার একটু পরে”
: “খাবার দাও, জলদি ঘুমাবো, কাজ আছে আগামীকাল”
বলেই উঠে পরলো সুফিয়ান আর রোদেলা গেলো রান্নাঘরে।

বাথরুমে ঢুকে চোখেমুখে পানি দিয়ে আয়নায় তাকিয়ে রইলো সুফিয়ান। এই প্রথম রোদেলার কাছে কিছু এড়িয়ে গেলো কজটা ঠিল হলো না ভুল তা বুঝলো না।

ছেলেরা তাদের স্ত্রীর প্রাক্তন প্রেমিকের সাথে হ্যান্ডশ্যাক করতে পারে, পারে কোলাকুলি করতে, মন খুলে কথাও বলতে পারে নির্দ্বিধায়। কিন্তু মেয়েদের কেস অন্য। স্বামীর প্রাক্তনের কথা শুনলেই এদের মেজাজ ৩৬০° ঘুরে যায়। রোদেলা যদিও অন্য মেয়েদের মতো না, তবুও ব্যাপারটা ভাবতে একটু সময় নিলো ও। যদিও সুফিয়ানের জীবণে এখন একছত্র অধিপত্য রোদেলা নামটার।

রাতের খাবার খেয়ে বিছানায় শুয়ে সুফিয়ান বই পড়ছে। রোদেলা আয়নার সামনে বসে চুল আঁচড়াচ্ছে। চুলের সাজসজ্জা বলতে কেবল চুলগুলো আঁচড়ে সব একসাথে মুচড়ে ক্লিপ দিয়ে আটকে রাখা। বিছানায় শুয়ে রোদেলার কেশ সজ্জা দেখে হাসে সুফিয়ান। আয়নাতেই তাকিয়ে রোদেলা ইশারায় জিজ্ঞেস করে হাসির কারন।

সুফিয়ান মাথা নেড়ে জবাব দেয়, “কিছু না”

মাথা ঘুরিয়ে সুফিয়ানের দিকে সরাসরি তাকালো রোদেলা, চোখদুটো সরু করে, যার অর্থ- ” আমি জানি আপনি অবশ্যই কোন না কোন কারনে হাসছিলেন…”

এবার সুফিয়ান বললো- “তোমার কেশ সজ্জা দেখে হাসলাম।”

রোদেলা সেখান থেকে বিছানায় গেলো। বললো-
: ” কাল কি কাজ সকাল সকাল? তখন যে বললেন…”
: ” গ্রামে যেতে হতে পারে, জায়গাজমি শক্ত একজনকে বুঝিয়ে দিয়ে আসবো, তাই যাওয়ার আগে কাগজপত্র একজন এডভোকেটকে দেখাতে যাবো আগামীকাল। যে এডভোকেটের কাছে যাবো তিনি সকাল সকাল যেতে বলেছেন”
: ” ওহ্, ”
: ” তুমি আর প্রিসিলা গোছগাছ করে নিও, চারপাঁচ দিন থাকবো হয়তো, সে হিসেবে প্রস্তুতি নিয়ে নিও ”
: ” এবার কোন দৌড়াদৌড়ি নেই তো? ”
: “নাহ্, এবার শুধু ঘুরবো আমরা ”
: ” গ্রামে যাওয়ার স্মৃতি আমার তেমন নেই জানেন? খুব মজা হবে”
: ” শীতে গ্রামে অনেক মজা হয় গ্রামে, এবার তোমাকে খুব সুন্দর গ্রামের স্মৃতি উপহার দিবো আমি ”
: “নাতাশাকে বলবো..?”
: “সমস্যা নেই, আমাদের বিশাল বাড়ি, যে যেতে চায় নিয়ে নাও, সবাই মিলো গেলে মজাও হবে, কদিন পর তো চলেই যাচ্ছি আমরা ”
রোদেলা সাথে সাথে নাতাশাকে ম্যাসেজ করে রাখে, সুফিয়ান বলে-
: “মা’কে ও বলো, তিনিও ঘুরে আসবেন আমাদের সাথে..”
: ” পাগল হয়েছেন আপনি? তিনি তার গুষ্টি রেখে যাবেন? তার বোনদেরকে রেখে গেলে তার পাপ হবে না…”
মজার ভঙ্গিতে কথাগুলো বললো রোদেলা। ওর ভঙ্গি দেখে সুফিয়ান হেসে বললো-
: ” নিয়ে চলো সবাইকে ”
: ” ধূর, আপনি জামাই মানুষ, তারা গুষ্টি সুদ্ধ মানুষ গেলে বাস ভাড়া করতে হবে, তারউপর এতগুলো মানুষের খাওয়াদাওয়া খরচ, আপনার হাতের অবস্থা তো আমি জানি…”
: ” ব্যাপার না, তুমি আগে মা’কে বলো, দেখো তার হাবভাব, তিনি সবার কথা বললে তারপর না হয় দেখা যাবে”
:” হাবভাব কিছুই না, সোজা বলবে – নারে যাবো না,”
: “তুমি এত কথা বলো না তো! বলেই তো দেখো আগে…!”
: “আচ্ছা ”
: আর শোনো একটা কথা…
পানি খাওয়া অবস্থায় রোদেলা ইশারা করে “কি”?
: ঐ যে একটা পার্সেল এসেছে না, সেটা ‘সম্পা’ পাঠিয়েছে…

পানি নাকেমুখে উঠে যায় রোদেলার এ কথা শুনে। খাট থেকে নেমে পিঠে হাত বুলিয়ে দেয় সুফিয়ান। মুচকি হেসে অবাক ভঙ্গিতে রোদেলা বলে-
: “সত্যি…? ”
: “হুম”
: “বুঝলেন কিভাবে?”

ওর হাতের লেখা, কুমড়োর বরি আর আচর দেখে। এগুলো এর আগেও অনেকবার এসেছিলো আমাদের বাড়িতে। এবার অতিরিক্ত যা এসেছে তা হচ্ছে শুটকি আর জামদানী শাড়িটা।

রোদেলা বক্সটার কাছে গিয়ে শাড়িটা বের করলো। জিনিসগুলোর উপর কেমন হাত বুলিয়ে দিলো। যেন ‘সম্পার’ স্পর্শ খুঁজতে চেষ্টা করছে ও। এসব দেখে ভড়কে যান সুফিয়ান। রোদেলার রিএ্যাকশন দেখে হতবাক ও। অথচ কত কি ভেবেছে ও ব্যাপারটা বলার আগে।

সুফিয়ান ওর কাছে গিয়ে রূঢ়ভাবে বললো-

: ” এমন করার কি আছে, তাই বুঝলাম না, আমি তো ভেবেছিলাম এ কথা শুনে এগুলো ঘর থেকে বের করে দিতে যাচ্ছো তুমি ”
: ” আরে না,
: “তুমি আজব..! ”
: ” আপনি জানেন সম্পার একটা ছবি রয়েছে আমার কাছে?”
: “মানে?”
: “হুম”
বলে আলমারিতে রাখা এলবাম বের করে সুফিয়ানকে দেখায় ও ছবিটা। এটা দেখে সুফিয়ান জিজ্ঞেস করলো-
: “এটা এত যত্ন করে রাখার কি আছে?”
: ” ছিড়ে ফেলবো ভেবেছিলাম, পরে কি মনে হলো জানেন-
” এ মেয়েটা আর আমি একটা মানুষকেই ভালোবাসি ” আমার সৌভাগ্য আমি মানুষটাকে পেয়েছি, ও আমাকে আমার জীবণের সেরা উপহারটা দিয়েছে আমাকে, আমি কিভাবে ওর ছবিটা ফেলে দিই বলেন?”

কিচ্ছু বলে না সুফিয়ান, এসব কথা ওর মাথার উপর দিয়ে যায়। রোদেলা মেয়েটা আসলেই অন্যরকম, সবার চেয়ে আলাদা।

ঘরের বাতি নিভিয়ে শুয়ে পরে ওরা। রোদোলা গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে শীতে। সেদিন ও বললো রুমে একটা ফায়ার প্লেস তৈরি করে দিতে। সে কথা শুনে হেসছিলো সুফিয়ান।

কি মনে করে সুফিয়ান হঠাৎ জড়িয়ে ধরে রোদেলাকে পেছন থেকে। মুহুর্তেই সুফিয়ানের দিকে ফিরলো রোদেলা, কপালের সামনের চুলগুলো সরিয়ে কপালে চুমু খেলো সুফিয়ান, বললো- এই যে তোমার অনন্যাতা, এটাকে আমি বড্ড ভালোবাসি, যদিও এটা আমার উপরি পাওনা, তোমার এত সুন্দর এই ব্যাপারটা না জেনেই তোমাকে ভালোবেসেছি।

আপনি আমাকে এত ভালোবাসেন তাই আমিও আপনাকে ভালোবাসি, যদিও কথাটা স্বার্থপরের মতো শুনচ্ছে তবুও এটাই সত্যি, আপনার মতো ভালো কেও আমাকে বাসে নি সুফিয়ান। “আই লাভ ইউ টু ” বলেই রোদেলা সুফিয়ানের বুকে নিজেকে লুকালো যেন। আর সুফিয়ান শক্ত করে ধরে রাখলো ওকে।

এমনি ভালোবাসার শক্ত ইমারতে ঘেরা ওদের জীবণ, যা ভেদ করে তৃতীয় কারো ঢুকবার সাধ্য নেই।

পরদিন থেকে তোরজোর শুরু হয় গ্রামে যাওয়ার। মা’কে বলায় তিনি তার পুরাতন মহিমায় জেগে উঠলেন। উপায়ন্তর না দেখে বাস ভাড়া করলো সুফিয়ান। নাতাশা কল্লোল যাবে। সুফিয়ান ফোন করে শোভন সারাকে আসতে বলতে, আত্নীয় মানুষ সৌজন্যতা রক্ষায়। ওদের অন্য প্ল্যান থাকায় ওরা আসতে পারবেনা বলে জানায়। বুকে ভিতর থেকে পাথর নামে যেন রোদেলার। সুফিয়ান রোদেলাকে চেনে, এ ব্যাপারে কোন ভয় নেই ওর তা জানে সুফিয়ান। কিন্তু রোদেলার কেন যেন শোভনের সামনে পরা ব্যাপারটা ভালো লাগে না। ঠিক এ কারনে নাতাশাদের বাড়িতে যায় নি একবারের জন্য ও। শোভনের আনমনে তাকিয়ে থাকাটা বড্ড অস্বস্তিকর রোদেলার জন্য। যদিও ওর সে তাকিয়ে থাকাটা নোংরা না বরং ওর রোদেলাকে না পাওয়ার অসহায়ত্বের প্রকাশ পায় তাতে।

আগামীকাল ভোরে সবাই রওনা হবে একযোগে। শীতকাল হওয়ায় রাতের জার্নি এড়িয়ে গেলো ওরা। রাস্তা ফাঁকা থাকলে ৬ ঘন্টায় পৌঁছে যাবে রাজশাহী। একদিন সময় পাওয়ায় কোনমতে গুছগাছ করলো সবাই। সবার ভিতরে কেমন রোমাঞ্চকর অনুভূতি। বড় মামা থাকতে এমন বছরে অন্ততঃ একবার দূরে ঘুরতে যেতো সবাই মিলে। বড় মামা-মামীকে খুব মনে পরছে রোদেলার।

ফ্যামেলি গ্রুপটা অনেকদিন পর জেগে উঠলো ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির মতো। সবাই সবার প্রস্তুতির ছবি পাঠাচ্ছে। কোন শাড়ি নেবে কোনটা নেবে না তারও ভোটাভোটি চলছে। ইদে এলেও এমন আনন্দ আসে না, সুফিয়ান শুধু ম্যাসোজ গুলো সিন করো যাচ্ছে, কিছু বলছে না। সন্ধ্যায় রোদেলাকে সুফিয়ান বললো-
: ” টাকা বেশ খরচ হবে এটা আমি মানি, কিন্তু যে আনন্দ সবার মধ্যে, তা কি টাকায় হিসাব করা যাবে? টাকাপয়সা আসবে যাবে, কিন্তু সময়…?”
: ” তারপর ও”
: ” তার কোন পর নেই, জীবণে সময়টা সবচেয়ে ইম্পর্ট্যান্ট, নাথিং এলস্। বলেই উঠে দাঁড়ায় সুফিয়ান। হঠাৎ মনে পরার ভঙ্গিতে বলে –
” আর শোন আমাদের ভারী কাপড় বেশী করে নিও, ওখানে কিন্তু খুব শীত পরে। আর সবাইকে বলে দিও সে কথা ”
: ” বলেছি সবাইকে চিন্তা নেই ”

ম্যাসেজ গ্রুপে সেদিন একটা পর্যন্ত ম্যাসেজ চালাচালি হলো, রোদেলা সবাইকে বকে বললো-
: ” সকাল সকাল উঠতে হবে, যা ঘুমা গিয়ে সবাই”
এরপর শুভ রাত্রির বন্যা বয়ে গেলো ফ্যামেলি চ্যাট গ্রুপটাতে।

ফোনটাকে চার্জে দিয়ে শুয়ে পরলো ওরা। এখন শুধু অপেক্ষা কালকের সুন্দর সকালটার……

চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here