#খেলাঘর_১২
তারেক, সাহেব আর বাদশা সাহেবদের ড্রয়িং রুমে বসে আছে আহসান চৌধুরীও আছেন একটু পরপর ফোনে কথা বলছে, সাহেবের পড়নে থ্রি কোয়াটার প্যান্ট আর টি শার্ট। তারেক আজ সাহেবের সাথেই ভার্সিটি যাবে কিন্তু সাহেবের রেডি হওয়ার নাম নেই ইদানীং সাহেব তারেককে নিয়েই ভার্সিটি যায় অকাজে যেমন তারেক তার পার্টনার তেমনি এখন লেখাপড়াতেও সে জোর করে তারেককে সঙ্গে রেখেছে।
অনেক্ষণ ধরেই লিলি আর সাহেবের মা তর্ক করছেন তারেক আগ্রহ নিয়ে সেসব শুনছে তার বেশ লাগছে। সাহেব আর বাদশার কাছে এগুলো এখন নিত্যদিনের ঘটনা, তারা অভ্যস্ত হয়ে গেছে।অনেকক্ষণ ধরেই রেহেনা আর লিলি তর্ক করছিলো রেহেনার ওজন নিয়ে, ইদানীং তার হাই প্রেশার একটুতেই অস্থির হয়ে যায় তাকে বলা হচ্ছে ডাক্তার দেখাতে কিন্তু তার ভাষ্যমতে লিলি বাড়াবাড়ি করছে ইচ্ছে করে তাকে অসুস্থ বানাতে চাইছে,
—তুমি বললেই তো আমি বুড়ো হয়ে যাবো না, কি ভেবেছো আমি বুঝিনা?
—অবশ্যই বোঝেন না আপনি তো কবিরাজও না গনকও না, ডাক্তার বলেছে মাসে আপনাকে একবার চেকাপে যেতে হবে মানে যাবেন।
—বাদশার আব্বা, বাদশার আব্বা আমি কিন্তু বাড়ি ছেড়ে চলে যাবো
লিলি সবজি কাটছিলো, চপিং বোর্ডের উপর ছুড়িটা দিয়ে জোড়ে বাড়ি দিয়ে দ্বিগুণ চেচিয়ে উঠল,
—খবরদার যদি কেউ জোরে কথা বলে, ডাক্তার যে বলেছে উত্তেজিত না হতে সে কথা কি কারো মনে নেই নাকি? হ্যা? আমি কিন্তু খুব রেগে যাচ্ছি এবার,
তারেক ফিসফিস করে সাহেব কে বলছে
—এই সাহেব এইটা কোন লিলি রে!রোজ রোজ তো এই মেয়েই নতুন রূপ দেখছি!
—এতটুকুতেই এই তাহলে ভাব আমি কত রূপ দেখি,
লিলির আওয়াজ আবার পাওয়া গেলো,
—ভাইয়া ভাইয়া ডাক্তার কে আসতে বলো তিনি যেন এখনই বাসায় এসে চেকাপ করে যায় দ্রুত আমার এত সময় নেই কিন্তু আমার পড়ালেখা আছে,আজ ভার্সিটি তে ক্লাস টেস্টও আছে আমার তো আর খালি খেলে আর ঘুরলে হবে না
তারেক পানি খাচ্ছিলো বিষম খেলো মনে হলো,সাহেবের মনে পড়লো আজকে সকাল থেকেই সে বইয়ের ধারে কাছে যায় নি।কেন জানি লিলি পড়তে না বসলে ওরও বসতে ইচ্ছে করে না।বাদশা ডাক্তার কে ফোন করে দিয়েছে।এবার রেহেনা চৌধুরী অন্যসুরে কথা বলছেন যে কথাগুলো বলার পর লিলি আর কথা বলে না চুপ হয়ে যায় সেই কথা প্রতিবারই তিনি হেরে যাওয়ার আগে তাই করেন,
—যেমন বাবা তেমনই মেয়ে,গুন্ডা আমার বাড়িতে এসে আমাকেই গুন্ডাগিরি দেখাচ্ছে হবে নাই বা কেন, বাবা কেমন দেখতে হবে না? ক্রিমিনাল একটা আমার ছেলেটাকে জেল খাটিয়ে ছাড়লো,আবার এসেছিলো তো পুলিশ নিয়ে বাড়িতে নিজের মেয়েই যে কেচ্ছা করে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেছে সেদিকে খেয়াল নেই ওনার মেয়ে তো কচি খুকি যে তাকে কেউ তুলে আনবে…
লিলি কথার মাঝেই মাথা নিচু করে নিজের ঘরে ঢুকে গেলো,ভার্সিটির জন্যে রেডি হতে আর রেহেনা বকবক করতে লাগলো
—এখন তো চোরের মতো পালাবেই সেদিন ওর বাবাও তো এভাবেই পালিয়েছিলো,কেমন বাবা! মেয়ে কে আমাদের ঘাড়ে গছিয়ে দিয়ে যে গেলো আর খোজ নেই, এই মেয়েও তো নির্লজ্জ দিব্যি খাচ্ছে থাকছে আর আমাকেই কথা শুনাচ্ছে!
তারেক মাথা নিচু করে আড়চোখে সাহেবের দিকে চাইলো, সাহেব এতক্ষণ চুপ করে ছিলো এবার আর পারলো না, হাতের কাছে থাকা পানির গ্লাস টা ইচ্ছে করে রান্নাঘরের সামনে নিয়ে গিয়ে আছাড় মেরে ফেলে শান্ত স্বরে বলল,
—মা,লিলির কোনো কেচ্ছা নেই আমি ওকে তুলেই আনতে চেয়েছিলাম ও আমাকে বাচাতে বলেছে যে ও আমার সাথে পালিয়ে এসেছে কথা কি ক্লিয়ার? আরেকটা কথা তুমি হয়তো জানো না বাবা লিলিকে যে টাকা গুলো দেয় সেখান থেকে সে কিছুই খরচ করে না, ওর বাবা এখনো প্রতিমাসে ওর একাউন্টে টাকা পাঠায় সেটা দিয়েই ও ভার্সিটির খরচ চালায়।শুধু শুধু রোজ রোজ আর এই কথা গুলো বলবে না।
লিলি রেডি হয়ে এসে কিছুক্ষণ সরু চোখে সাহেবের দিকে তাকিয়ে রইলো,সাহেব চলে যেতে নিলেই ওকে থামিয়ে বলল,
—আপনাকে কেউ ভাড়া করে এনেছে আমাদের মধ্যে কথা বলতে?রান্নাঘরের কথা ড্রয়িংরুমে আলোচনা হবে না,কথা কি আপনার কাছে ক্লিয়ার?
সাহেব চুপ করে গেলো,তারেক, বাদশা আর আহসান চৌধুরী উঁকিঝুঁকি দিয়ে দেখতে লাগলো কি হলো,কেউ সাহস পাচ্ছে না আগানোর,লিলি সাহেবকে উদ্দেশ্য করে বললো,
—এই যে গ্লাস টা ভাঙলেন এটার দাম কত জানেন? আপনার সামর্থ্য আছে? একটা গ্লাস কেনার ভেঙে তো ফেললেন
সবাই অবাক হয়ে গেলো, রেহেনা চৌধুরী অবাক হয়ে বলল,
—তুমি আমার ছেলে কে টাকা দেখাচ্ছো?!ওর বাবার যা কিছু আছে সবই তো দুই ভাইয়ের
লিলি আড়চোখে সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললো
—এজন্যই তো পড়ালেখার এই অবস্থা নিজের বলতে চেহারা ছাড়া আপনার ছেলের আর আছে টা কি
সাহেব এবার রাগে কাপতে লাগলো, সে ডাইনিং রুমে গিয়ে জগ আর গ্লাস এনে সেগুলোও ভেঙে ফেললো,সবাই স্তব্ধ হয়ে গেলো আহসান চৌধুরী নিজেও ঘাবড়ে গেলো সবাই জানে সাহবের রাগ কতটা ভয়ংকর, লিলি মোটেও বিচলিত হলো না শান্ত কণ্ঠে কাজের লোক গুলোর দিকে তাকিয়ে বলল,
—খবরদার এ বাড়ির অন্য কেউ যেন এগুলো কেউ পরিষ্কার না করে,এগুলো এভাবেই থাকবে আমি জানি যে ভেঙেছে সে এগুলো তুলবে না তাই সবার খাওয়া হলে আমিই পরিষ্কার করবো।ততক্ষণ কেউ রান্নাঘর থেকে বের হবে না।বাবা, ভাইয়া, তারেক ভাই টেবিলে বসুন আমি খাবার আনছি, মা আপনি ওই পাশের দরজা দিয়ে বের হয়ে টেবিলে যান।
সবাই টেবিলে বসলো,
লিলি সাবধানে পা ফেলে রান্নাঘরে ঢুকলো ফেরার পথে তার পায়ে কয়েকটুকরো কাচ ঢুকে কেটে গেলো, সেদিকে তোয়াক্কা না করে খাবার নিয়ে টেবিলে রাখলো, সাহেব বুঝলো বলার জন্যে কথাগুলো লিলি বলে নি সাহবকে শাস্তি দিতেই বলেছে,রেহেনা সাহস পাচ্ছে না আর কিছু বলার কাজের লোকগুলোর কথা বাদই থাক।
আহসান চৌধুরীর বিচলিত হয়ে বলল,
—জেদ করে না মা!
—আপনি খেয়ে নিন বাবা
লিলি দ্বিতীয়বার রান্নাঘরে ঢুকতে যাবে তার আগেই সাহেব লিলির হাত ধরে ফেললো,সবার সামনে লিলিকে কোলে তুলে নিয়ে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল,
—আসমা খালা,ফার্স্টএইড এর বক্সটা আমার রুমে আনো তো,আর তারেক তুই তাড়াতাড়ি খাবার শেষ কর, আমার সাথে কাচগুলো তুইও পরিষ্কার করবি তুই তো এই বাড়ির কেউ না।
তারেক হা হয়ে তাকিয়ে রইলো,
—মানে কি!
অন্যসবাই হেসে ফেললো সাহেবের কথা শুনে। বাদশা বলল,
—সাহেবের হিরোগিরির দিন শেষ।
আসমা খালা দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসছে, সাহেব ৭ মিনিট ধরে চেষ্টা করছে লিলির পায়ে এন্টিসেপ্টিক লাগানোর কিন্তু সাহস পাচ্ছে না, ও বিরক্ত হয়ে আসমা খালার দিকে তাকিয়ে বলছে,
—তুমি হাসছো কেন?তুমি হাসছো বলেই তো আমি লাগাতে পারছি না যাওও
—ছোট বাজান আমি লাগাইয়া দেই?
—না তুমি যাও
আসমা খালা হাসতে হাসতে বের হয়ে গেলো,লিলি অনেকক্ষণ সহ্য করেছে, সে এর আগেও অনেকবার না করেছে সাহেবকে, সাহেবের সাথে পেরে ওঠে নি,
—আপনি মিথ্যে বললেন কেন মা কে?
—অর্ধেক মিথ্যে বলেছি আর অর্ধেক সত্যি তুমি তো সত্যিই বাবার দেওয়া টাকা খরচ করো না
—হ্যা লাগে না তাই,কিন্তু আমার বাবার টাকাতেও আমি চলি না
—তাহলে?
—জ্ঞান হবার পর থেকেই আমার বড় মামার থেকে চেয়ে আমি টাকা নেই,মামাই আমার সেমিস্টার ফি,যাবতীয় খরচ চালান
—তোমার বাবার এত টাকা থাকতে তুমি মামার টাকা কেন নাও?
প্রসঙ্গ পাল্টাতে লিলি বললো,
—আপনি যদি এইরকম নকশা করেন তাহলে এর পর আমার শরীরের সব রক্ত বের হয়ে আমি রক্ত শূন্যতায় মারা যাবো আমার কাছে দিন আমি লাগিয়ে নিচ্ছ, তাছাড়া আমি তো জানি আপনার দৌড় কতদূর।
সাহেবের মেজাজ এবার তুঙ্গে উঠে গেছে,এতক্ষণ লিলি ব্যাথা পাবে বলে সে ভয় পাচ্ছিলো এবার সে ইচ্ছে করে খপ করে লিলির পা চেপে ওষুধ লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিলো,লিলির লাগলো ঠিকই ও বুঝতে দিলো না।বরং সোজা হয়ে দাড়িয়ে বলল,
—আমি আপনার মতো মনের প্রশান্তি নিয়ে বড় হই নি।যাদের মনে বিরাট ক্ষত থাকে তাদের বাহ্যিক আঘাত আহত করতে পারে না।
লিলি স্বাভাবিক ভাবে চেষ্টা করলো ঘর থেকে বের হতে পারলো না সে বুঝলো কোনো আঘাতই ছোট নয় মানুষকে কাবু করে ফেলে। লিলির ইচ্ছে হলো অসহায়ের মতো কাদতে কিন্তু সে পারলো না কান্না গিলে ফেললো। সাহেব লিলির দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলো এই মেয়ের এত কি কষ্ট!
আসমা খালা আবারো হেসে কুটিকুটি লিলি একটা চেয়ার টেনে বসে আছে, লিলির এবার খুব মায়া হচ্ছে সাহেব আর তারেক একটা একটা করে আনাড়ি হাতে কাচ তুলছে সাহেব কাউকে কাছে ঘেষতেও দিচ্ছে না নিজেও পারছে না।লিলি বিরক্ত হয়ে বলল,
—আমি ভার্সিটির জন্যে বেরিয়ে গেলাম আপনারা বরং কাজ শেষ করে আসুন অযথা আমাকে কেন বসিয়ে রেখেছেন?
সাহেব কাচ তুলতে তুলতে বলছে
—তোমার পায়ে চোট লেগেছে আজ তুমি আমার সাথেই যাবে
—না আমি রিক্সাতেই যাবো
—আমিও রিক্সাতেই যাবো
তারেক অবাক হয়ে বললো,
—তাহলে তুই আমাকে বসিয়ে রাখছিস কেন শালা তোর বাড়ি কামলা খাটাইতে হারামজাদা?
—চুপ থাক তো, তুই আমার গাড়ি নিয়ে যাইস।
—আপনার আবার গাড়ি এলো কোত্থেকে
সাহেব আড়চোখে তাকিয়ে রইলো কিছু বলল, না এখন আবার বাবার টাকা নিয়ে খোটা দেবে নিশ্চিত তার থেকে চুপ থাকাই ভালো,লিলি বিরক্ত হয়ে বলল,
—ঝাড়ুটা দাও তো আসমা খালা
—না আমিই করবো
—আপনিই করুন আমি দেখিয়ে দেই শিখতে তো দোষ নেই, আপনি তো পন্ডিত না যে সব পারবেন অবশ্য বিশেষ যে কিছু পারেন তা আমার এখনো চোখে পড়ে নি।
লিলি ঝাড়ু দিয়ে কাচ গুলো গুছিয়ে দিয়ে বেলচা দেখিয়ে বললো এবার এটাতে তুলুন,তারেক অবাক হয়ে বলল,
—এত সহজ কাজ আমরা এতক্ষণ একটা একটা করে কেন তুলছি!
বাদশা বের হতে হতে বললো,
—কারণ তোরা গাধা
আসমার মা হাসতে হাসতেই শেষ। লিলিও মুচকি হাসলো,সাহেব চেচিয়ে বলল,
—ভাইয়া তুমিও?
বাদশা দরজার বাইরে থেকে উকি দিয়ে বলল,
—সরিইই ভাই।
কিছুক্ষণ পর লিলিরাও বের হলো,সাহেব কতদিন পর রিক্সায় উঠেছে ওর মনে নেই ওর বারবার মনে হচ্ছে পড়ে যাবে কিন্তু লিলির জন্য কিছু বলতে পারছে না, লিলি বেশ বুঝতে পারছে মনে মনে হেসে বলল,
—অস্বস্তি হচ্ছে?
সাহেব চশমাটা মাথায় তুলে বলল,
—নাতো!
—আপনি কষ্ট করে কেন আসতে গেলেন বলুন তো!
—আমার জন্যেই তোমার পা কেটে গেছে তোমার ঘা না সেড়ে যাওয়া পর্যন্ত তোমার খেয়াল রাখা আমার কর্তব্য, আর সকাল বেলা ওরকম রাগ দেখানোর জন্যেও আমি সরি,পায়ে ব্যাথা দেওয়ার জন্যেও সরি ।
লিলি অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বলল,
—ইটস ওকে।আমার জন্যে আমি রাগ করিনি কিন্তু আপনার বাসার সবাই অনেক ভালো তাদের সাথে… যাইহোক আপনার পরিবার আপনি ভালো বোঝেন
—এখন ওইটা তোমারও পরিবার..
লিলি সাহেবের দিকে অবাক হয়ে তাকালো,
—না মানে সবাই তোমাকে খুব ভালোবাসে।
—জানি,
কথা পাল্টাতে সাহেব বলল,
—শুনলাম তোমাকে নাকি তোমার ডিপার্টমেন্টের বড় ভাইয়েরা কয়েকদিন ডিস্টার্ব করতো তারা কি এখনো…
—এত ভাণ করেন কি করে বলুন তো?আপনি যে লোক দিয়ে তাদের বেদম মাইর দিয়েছেন তা আমি জানি,এখন তারা আমাকে দেখলেই বলে ভাবি আসসালামু আলাইকুম।
সাহেব আর কিছু বলল না সে অন্যদিকে মুখ ফেরালো, এই মেয়ে সব বুঝে যায় কি করে!
চলবে…
সামিয়া খান মায়া

