খেলাঘর_১

0
1428

#খেলাঘর_১
কাচের দেয়ালের বাইরে কায়নাত ঝিরিঝিরি বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে আছে,হালকা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মনে মনে একশো থেকে উল্টো দিকে গুনছে, সে ভেবে নিয়েছে যদি শূন্য পর্যন্ত যাওয়ার আগে লোকটা না আসে তাহলে আর এক মিনিটও দেরি সে করবে না। দেরি করার একটা লিমিট থাকা চাই, দেড়ঘন্টা যাবত সে এখানে বসে আছে,যে মানুষের সময়জ্ঞান নেই সেই মানুষটা আর কেমন হতে পারে!কায়নাত এখন গুনতে গুনতে আটচল্লিশ এ ঠেকেছে। এমন সময় রেস্টুরেন্টের কাচের দরজা ঠেলে আধভেজা হয়ে কাউকে আসতে দেখলো সাদা ফর্মাল শার্ট কুনুই পর্যন্ত ভাজ দেওয়া সাথে খাকি রঙের প্যান্ট হাতে একগুচ্ছ সাদা রেইন লিলি!কায়নাতের মনটাই ফুরফুরে হয়ে গেলো, লোকটা একটু এদিক ওদিক তাকিয়ে কায়নাতের টেবিলের সামনে এসে দাড়ালো, ভদ্রতার খাতিরে কায়নাত উঠে দাড়াতেই লোকটা লজ্জিত ভঙ্গিতে হেসে বলল,
—মিস সামায়রা কায়নাত?
—জ্বী
কায়নাতের হাতে ফুলগুলো দিয়ে বসতে বসতে সে বলল,
—খুব দেরি করে ফেলেছি বোধহয় আমি ভেবেছি এতক্ষণে আপনি বাড়ি চলে গেছেন।
কায়নাত ফুল হাতে নিয়ে একবার অপলক ভাবে ফুলের দিকে অন্যবার লোকটির দিকে তাকাচ্ছে কাছাকাছি দুটি সুন্দর জিনিস থাকলে মানুষ সিদ্ধান্ত নিতে পারে না কোনটি বেছে নেবে কায়নাতের এখন তাই হচ্ছে, ছেলেটি বর্ণনাতীত সুন্দর, ছেলে মানুষের সাধারণত এত সুন্দর হতে নেই,
—মিস কায়নাত আপনি কথা বলছেন না কেন?
কায়নাত এবার নিজেকে সামলে বলল,
—আপনার নামটা জানিনা তাই কথা বাড়াতে পারছি না।
কায়নাত ভেবেছিলো এরকম কথা শুনে লোকটি হয়তো একটু আহত কিংবা বিব্রত হবে কিন্তু কায়নাতকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ করে দিয়ে লোকটি এক গাল হেসে বলল,
—আমি, প্রহর আহমেদ।
কায়নাত একটু আমতা আমতা করে বলল,
—আসলে,
মেনুকার্ড কায়নাতের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে প্রহর বলল,
—কি খাবেন বলুন
—অসুবিধা নেই আপনি একটা কিছু অর্ডার করুন
—আমি তো অবশ্যই অর্ডার করবো কিন্তু আপনি এমন কিছু চুজ করুন যাতে আপনি কম্ফোর্ট ফিল করবেন।
তারপর ওয়েটার ডেকে দুজনেই দুটো ক্যাপেচিনো অর্ডার করলো।প্রহর কায়নাতের ডাগর চোখে চোখ রেখে বলল,
—আপনি কি এই বিয়ের জন্যে প্রস্তুত নন?
কায়নাত চুপ করে রেইন লিলির দিকে তাকিয়ে রইলো এই কথাটা বলতেই ও এখানে এসেছিলো কিন্তু প্রহরকে দেখার পর কায়নাতের মনে এক ধরণের দ্বিধা কাজ করছে, ওর মনে হচ্ছে অনন্তকাল এই লোকটার সামনে বসে থাকা যায়।তবুও কায়নাত প্রহরের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
—বিয়েটা আমি করব না মিঃ আহমেদ
—বেশ করবেন না একজনের সাথে দেখা হলেই যে বিয়ে করতে হবে এমন কি কোনো মানে আছে?
কায়নাত নিচুস্বরে বলল,
—আমার বাবা এক কথার মানুষ তিনি আপনার মা কে কথা দিয়েছেন আমার বিয়ে দিয়ে তবেই তিনি দম ফেলবেন।
—এরকম কিছুই হবে না,আচ্ছা যদি আপনি কিছু মনে না করেন তাহলে কি আমি জানতে পারি কেন বিয়েটা করবেন না, মানে আমি কি কোনোভাবে আপনার অযোগ্য? বা আপনার কোনো পছন্দ আছে?
এবার কায়নাত একটু স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হেসে বলল,
—যে লোকটা এইটুকু খোজ নিয়ে এসেছে যে আমার সাদা রঙ আর রেইন লিলি পছন্দ সে নিশ্চয়ই এতটুকু জানবে যে আমার পছন্দের কোনো মানুষ আছে কি নেই।
প্রহর মুচকি হেসে বলল,
—সমস্যা টা বলা যায়?
—যেহেতু আমি আপনাকে বিয়ে করছি না সেহেতু বলা যায়, সমস্যার কথা দূরের মানুষকে বলা যায় কাছের মানুষকে সমস্যার কথা বলতে নেই।তবে আজ অনেক দেরি হয়ে গেছে। কফিটা শেষ করে আজ বরং উঠি।
ধোয়া ওঠা কাপে চুমুক দিয়ে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে রইলো কায়নাত,
প্রহর এবার কায়নাতের দিকে মনোযোগ দিয়ে তাকালো,বিয়েটাতে প্রহরেরও তেমন ইচ্ছে ছিলো না কিন্তু যেই শুনেছে একটা মেয়ে ওকে দেখার পর ওর বায়োডাটা দেখেও ওকে রিজেক্ট করে দিয়েছে সেই মেয়েকে একবার নিজের চোখে দেখতেই প্রহরের এখানে আসা, কায়নাতকে যতটা সম্ভব ইম্প্রেস করার সবরকম কায়দা করেই সে এসেছে আর যাই হোক দরকার হলে ও না করে দেবে কিন্তু কোনো মেয়ে প্রহর কে রিজেক্ট করবে এটা সে কিছুতেই মানতে পারছিলো না,তাও আবার মেয়েটার কোনো পছন্দের মানুষও নেই।কায়নাতের ছবিতেই প্রহর বুঝেছিলো মেয়েটা অসম্ভব রূপবতী রূপের দেমাগ তার থাকবে এটাই স্বাভাবিক, কিন্তু এখন ওর সামনে বসে থাকা সাদা থ্রিপিচ পড়া ছিমছাম ধারণের মেয়েটাকে দেখে ওর মনে হচ্ছে মেয়েটা দেমাগী নয় বরং বেশিই কোমল,অঙ্গভঙ্গিতে অদ্ভুত এক অনন্যতা আছে।

পাশের ছাদে অন্ধকারের মধ্যে জ্বলন্ত সিগারেটের ওঠানামা দেখে আয়না ছাদের কোণায় গিয়ে দাড়ালো,
—কে?
সাহেব সাথে সাথে সিগারেটটা ফেলে দিলো,ও খেয়ালই করে নি পাশের ছাদে কেউ আছে,
—আমি সাহেব আয়না আপা
—সিগারেট খাচ্ছো সাহেব?
অনেক্ষণ তাকিয়ে থাকায় এবার অবয়ব বুঝতে পারলো আয়না,সাহেব মাথা চুলকে বললো,
—অনেক টেনশন আপা
আয়না মৃদু হেসে বললো
—সাহেবটা বড় হয়ে গেছে দেখছি সেদিনও যেই ছেলেটা কায়নাতের চুল টেনে দৌড়ে পালাতো তারও নাকি মাথায় টেনশন।
—তুমি কি করো এত রাতে ছাদে?
আয়না কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—কাজের অনেক প্রেশার যাচ্ছে রে ভাই তাই একটু রিফ্রেশ হতে এলাম।
—আপা….
—বল সাহেব?
সাহেব কিছুক্ষণ আমতা আমতা করে বলল,
—কেমন আছো আপা?
—ভালো,বাসায় আসিস সাহেব আসিসই তো না এত ব্যস্ত হলে চলে?
—আসব।তোমার হাতের চা খেতে
—চা খেতে নাকি কায়নাতের চুল টানতে।
দুজনেই হাসলো খানিকক্ষণ।
—কায়নাত আজকাল থাকে কই ওর তো দেখাই মেলে না, আমার থেকেও ব্যাস্ত ম্যাডাম।
—সেকি তোর সাথে যোগাযোগ নেই?ভার্সিটি তে দেখা হয় না?
সাহেব একটু লজ্জা পেয়ে বললো,
—জানোই তো আপা এই রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত থাকি ক্লাস করিই না কেবল পরীক্ষা গুলো দেই বন্ধুদের থেকে নোটস নিয়ে,
—বাদশা ভাই ছাড়া পেয়েছে জেল থেকে?
—আব্বার নির্বাচনের আগেই পেয়ে যাবে, আমার ভাইয়াকে কে আটকে রাখবে সেটাও তো আমি দেখবো
—এসব নিয়েই চিন্তা করছিস তাই না?
—তুমি করছো না আপা?
আয়না কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—বেশি সিগারেট খাস না,মেঘ ডাকছে আবার হয়তো বৃষ্টি হবে নিচে নেমে যা।
সাহেব আর কথা বাড়ালো না, নিচে নেমে গেলো। তার মধ্যেই ঝুমঝুম করে বৃষ্টি পড়া শুরু হয়ে গেলো,আয়না ছাদের মাঝামাঝি এসে বসে রইলো।এই বৃষ্টি ওর গা ভিজিয়ে দিচ্ছে ইশ যদি ওর মনটাকেও একটু ভিজিয়ে দিতে পারতো! কত তৃষ্ণা ওর মনের মধ্যে!

চলবে…
সামিয়া খান মায়া

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here