#বৌপ্রিয়া
#আভা_ইসলাম_রাত্রি
#পর্ব-২৪
কেটে গেছে কটাদিন। কুসুম এবং উচ্ছ্বাস কদিনের মধ্যে হানিমুনে কক্সবাজার যাবে। তবে তার আগে উচ্ছ্বাসের ফুপুর মেয়ে মানহার জম্মদিন পালন করা হবে। মানহা এবার বায়না ধরেছে ধুমধাম করে জম্মদিন করার। তাই উচ্ছ্বাসের ফুপা মেয়ের বায়না রেখেছেন। বাড়িতে ধুমধাম করে জম্মদিন করার পাশাপাশি মাদ্রাসা এবং এতিমখানায় খাওয়ানো হবে। তাই উচ্ছ্বাস হানিমুনের তারিখ আরো দুইদিন পেছালো।
কুসুম সবে গোছল করে বেরিয়েছে। ভেজা চুল হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে শুকিয়ে নিল ঝটপট। বাথরুব গায়ে দিয়ে আলমারির সামনে এসে দাঁড়ালো। আজ সে সাদা রঙের জর্জেটের শাড়ি পরবে। আজকের জন্মদিনের পার্টির থিম সাদা। সেই উপলক্ষে শিউলি কদিন আগে কুসুমের জন্যে একটা সাদা শাড়ি কিনে এনেছে। কুসুম সেটাই এখন পরবে। তবে আলমারি তন্নতন্ন করে খুঁজেও সাদা শাড়ি পাওয়া গেল না।
আধা ঘন্টা ধরে সম্পূর্ণ আলমারি ঘেঁটে সিল্কের সেই শাড়ি খুঁজে পাওয়া গেল না। কুসুম অস্থির বোধ করল। আলমারির আনাচে কানাচে খোঁজ চালালো। পেল না কোথাও!
কুসুম যখন শাড়ির খুঁজে কাবার্ড এলোমেলো করতে ব্যস্ত, ঠিক তখন উচ্ছ্বাস ব্যস্ত পায়ে ফোনে কথা বলতে বলতে রুমে ঢুকছে। কুসুমকে অস্থির দেখে সে ফোন কেটে এগিয়ে আসে।
‘ কি খুজছ? ‘
‘ আমার সিল্কের শাড়ি! শিউলি আজকে পরার জন্যে দিয়েছিল। সেটা এখন কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না। ‘
কুসুমের অসহায় গলা শুনে উচ্ছ্বাস মোটেও চিন্তিত হল না। বরং তাকে নিশ্চিন্ত দেখা গেল। সেদিন শাড়ির পাতলা আঁচল দেখেই উচ্ছ্বাসের মেজাজ পুরোপুরি বিগড়ে গিয়েছিল। কৌশনে কুসুমকে বোঝাতে চেয়েছিল শাড়িটা উচ্ছ্বাসে ভালো লাগে নি। কিন্তু অবুঝ কুসুম সেটা বুঝে নি। তাই উচ্ছ্বাস রাতের দিকে কুসুম ঘুমে থাকাকালীন শাড়ি নিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে। কুসুম সেটাই এখন খুজছে?
উচ্ছ্বাস এতকিছু বললো না কুসুমকে। সে ধীর পায়ে বিছানার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল,
‘ আমি ফেলে দিয়েছি ওটা। ‘
কুসুম তাজ্জব বনে গেল। এগিয়ে এসে বলল, ‘ কেন? কেন ফেললেন? শাড়িটা কি সুন্দর ছিল। আমাকে ভালো লেগেছিল শাড়িতে। আপনার সামনেই না সেদিন ট্রায়াল দিলাম। তখন কেন বললেন না কিছু। এখন আমি আজকে পরব। আজকেই ফেলে দিলেন। কেন? ‘
উচ্ছাস পায়ের থেকে স্যান্ডেল খুলল। চশমা খুলে টেবিলে রেখে সাদা শার্ট আর প্যান্ট দিয়ে বাথরুমে গোসল করতে চলে গেল। যাবার আগে বলে গেল, ‘ এখন থেকে শরীর বোঝা যায়, এমন শাড়ি পরার দরকার নেই। লাইট অফ করে দাও। আমি ঘুমাব। ‘
কুসুম হতভম্ব হয়ে গেল উচ্ছাসের কথা শুনে। শাড়িতে শরীর একটু হলেও সেদিন বোঝা যাচ্ছিল। তাই কুসুম বারবার উচ্ছ্বাসকে বলেছে শাড়িতে তাকে ভালো লাগছে কি না। উচ্ছ্বাস তখন কিছুই বলে নি। এই মানুষটা এমন অন্যরকম কেন?
কুসুমও আর ঘাটাল না নিজেকে। যে শাড়ি, যে পোশাক উচ্ছ্বাসের পছন্দ নয়, সেই পোশাক কুসুম আজ থেকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিবে। উচ্ছ্বাসের সকল অপছন্দ আজ থেকে কুসুমের নিজেরও অপছন্দ। কুসুম খুঁজে খুঁজে পুরোনো এক সাদা রঙের শাড়ি বের করে পরে নিল। আজকে কুসুম নিজে নিজে বেশ সুন্দর করে শাড়ি পরল। সেদিন ঊষা আপার শাড়ি পরানো খুব সূক্ষ চোখে কুসুম লক্ষ্য করেছে।
কুসুম রেডি হয়ে নিচে নেমেছে। জন্মদিনের আয়োজনে সবাইকে সাহায্য করে উচ্ছ্বাসকে ডাকতে উপরে এল। উচ্ছ্বাস তখন তৈরি হয়ে হাতে হাতঘড়ি পরছে। সাদা ব্লেজারে বেশ ভালো লাগছে উচ্ছ্বাসকে। কুসুম শুধু চেয়েই থাকলো উচ্ছ্বাসের দিকে। চোখে যে। ধাঁধা লেগেছে তার। কুসুমকে দেখে উচ্ছ্বাস চুলে জেল লাগাতে লাগাতে বলল,
‘ শাড়ি ফেলে দিয়েছি বলে কি রাগ করেছ? শাড়ি আমার ভালো লাগেনি আসলে। তোমাকে আমি দেখে দেখে আরো সুন্দর শাড়ি কিনে দেব। তবে আজ থেকে ওসব শাড়ি পরে আমার অন্তর পুড়িও না, হুঁ? ‘
কুসুম হেসে ফেললো উচ্ছ্বাসের কথা শুনে। এগিয়ে এসে উচ্ছ্বাসের ব্লেজারের কলার ঠিক করে বলল,
‘ মোটেও রাগ করিনি আমি। আর না আপাতত আমার কোনো শাড়ি লাগবে না। শাড়ি আছে আলমারিতে। বিয়েতেও অনেক শাড়ি পেয়েছি। সেগুলো শেষ করি আগে। ‘
উচ্ছ্বাস মৃদু হাসলো। একটু সূক্ষভাবে কুসুমকে দেখে নিয়ে মোহগ্রস্ত গলায় বলল,
‘ শাড়িতে মোটেও তোমাকে ছোট লাগে না। সমবয়সী মনে হচ্ছে এখন।’
কুসুম মুচকি হাসলো। উচ্ছ্বাসকে দ্রুত তৈরি হতে বলে চলে যেতে নিলে উচ্ছ্বাস পেছন থেকে কুসুমের হাত আটকে নেয়। হাতে ধরে হেচকা টান দিতেই কুসুম ছিটকে এসে উচ্ছ্বাসের বুকে এসে পরে। কুসুমের নাক এসে লাগে ম্যানলি পারফিউমের গন্ধ। কুসুম মোহিত হয়ে যায়। উচ্ছ্বাস নিজের বুক থেকে কুসুমের মুখ দুহাতের আজলায় পুড়ে নিয়ে উচু করে তুলে। কুসুম চোখ বন্ধ করে। তারপর ধীরে ধীরে চোখ খুলে তাকায়। দুজনের চোখে চোখ পরে। চোখে চোখে কথা হয়। পবিত্র কিছু অনুভূতি দোলা দিয়ে যায় দুজনের মনে। উচ্ছ্বাস মৃদু স্বরে বলে,
‘ আজকে তোমায় অন্যরকম লাগছে। একদম ডিফরেন্ট।”
কুসুম প্রশ্ন করল, ‘ অন্যরকম কেমন? ‘
উচ্ছ্বাস মৃদু স্বরে বলল, ‘ জানিনা। বাট তোমাকে দেখে কেমন অস্থির লাগছে আমার। ‘
কুসুম মাথা নত করে হালকা হাসে। কুসুম কি করে বলবে, উচ্ছ্বাসকে দেখেও আজ কুসুমের অস্থির অস্থির লাগছে। বুকের ভেতরে ঝড় বইছে। দাউদাউ করে জ্বলছে সবকিছু। এই সুদর্শন স্বামী স্বয়ং তার, ভাবতেই শরীরের রক্ত ছলকে উঠছে।
উচ্ছ্বাস খানিক পর ঢোক গিলে ফিসফিস করে কুসুমের কানের কাছে মুখ এনে বলে,
‘ কুসুম, ক্যান আই কিস ইউ নাও? আই কান্ট কন্ট্রোল মাইসেল্ফ টুডে ইন দ্যাট ক্রিটিক্যাল মোমেন্ট।’
কুসুমের বুক ধড়ফড় করে উঠে। বুকের উঠানামার গতি বেড়ে যায়। অস্বাভাবিক হয়ে যায় শরীরের রক্তপ্রবাহের সঞ্চালন। কুসুম মাথা নত করে। পরপর আবার মাথা তুলে তাকায়। ঢোক গিলে মাথা নেড়ে সায় দেয়। উচ্ছ্বাস হাসে। ঝলমল করে উঠে উচ্ছ্বাসের চেহারা। মুখ নামিয়ে আনে কুসুমের পাতলা ঠোঁটে। কুসুম ভেসে যায় আনন্দে। প্রথমবারের মত দুজনের মধ্যে হওয়া গভীরতম স্পর্শ। পাঁচ সেকেন্ডের মাথায় উচ্ছ্বাস সরে আসে। কুসুম লজ্জায় লাল হয়ে যাওয়া মুখ নত করে রাখে। থুতনি যেন মিশে যায় বুকের সঙ্গে। উচ্ছ্বাস আলতো কণ্ঠে বললো,
‘ ট্রাস্ট মি কুসুম, দিস ইজ দ্য বেস্ট ফিলিং এবার। এমন অনুভূতি আমি আমার সাতাশ বছরের জীবনে পাইনি। তুমি সত্যি আমার জন্যে বিশেষ কেউ। ‘
কুসুম কথা বলে না। লজ্জায় আপাতত সে জমে। উচ্ছ্বাস কুসুমের কপালে চুমু দেয়। কুসুম এবার সত্যি সত্যি বরফ হয়ে যায়। ছিটকে সরে আসে উচ্ছ্বাসের থেকে। একপল উচ্ছ্বাসের দিকে চেয়ে দৌঁড়ে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। উচ্ছ্বাস মাথা চুলকে হেসে উঠে শব্দ করে। আজ প্রথমবার কেমন অদ্ভুদ অনুভব হচ্ছে উচ্ছ্বাসের। একটু অন্যরকম, একটুখানি আলাদা, একটুখানি মিষ্টি অনুভূতি। উচ্ছ্বাস শান্তির নিঃশ্বাস ছাড়ে। বুদ্ধিমান উচ্ছ্বাস বুঝতে পারে, ধীরে ধীরে তার কাছে ভালো লাগতে শুরু করেছে এই কুসুমকে। ধীরে ধীরে খুব করে জড়িয়ে যাচ্ছে কুসুমের সঙ্গে
#চলবে
পর্ব ছোট হবার জন্যে দুঃখিত। নেক্সট পর্ব বড় করে দেব।
গল্পের পরবর্তী সকল আপডেট পেতে যুক্ত হোন লেখিকার নিজস্ব গ্রুপে। গ্রুপ লিংক,
https://facebook.com/groups/929533097975216

