#মউফুল(৬)
—–মার্জিয়া হক।
একটা মাস খুব কষ্টে কাটালো জহির। একটা ঘর ঠিক করেছে সে ছোট্ট ঘর আর সাথে এক চিলতে বারান্দা।তিন মাসের আগাম,একটা চৌকি,আলনা,টেবিল চেয়ার কিনতে অনেক টাকা চলে গেল। কাসেম চাচার কাছে ধার করল জহির। এই একমাস অনেক কাজ করেছে, প্রথমত মউফুলকে ভুলে থাকতে আর দ্বিতীয়ত বেশী টাকা রোজগারের জন্য। জহির বাড়িতে জানায়নি কবে যাবে। মনে মনে ঠিক করে রেখেছে হঠাৎ গিয়ে চমকে দিবে মউফুলকে। মউফুলের ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া চেহারাটা ভেবে মনে মনে পুলক অনুভব করে সে।
একমাস প্রায় হয়ে এসেছে, মউফুল মনে মনে দিনগুনে। এই একমাসে শাশুড়ি খুব কম দোষ ধরতে পেরেছে তার। দুই একটা ভুল পেয়ে গুষ্টি উদ্ধার করতে ছাড়েনি। ছোটকাল থেকে মামার বাড়ি মানুষ সে। বাপ মা হারা, তাই সব সময় নানী,মামা, মামীর মন জুগিয়ে চলেছে। কখনও কোন কথার প্রতিবাদ করেনি। সব কাজ সুন্দর ভাবে গুছিয়ে করতে শিখেছে তাই কাজে তার ভুল ধরা কঠিন। দুই তিনদিন থেকে মন চঞ্চল হয়ে আছে বউয়ের, শাশুড়ি বুঝতে পারে তাই মনে মনে জ্বলে। সকালে কাজ সেরে রান্না করে রাজ্জাককে নিয়ে গোসলে যায় মউফুল। প্রতিদিনের মত ওকে গোসল করিয়ে ঘাটে বসিয়ে রাখে। বারবার মানা করে কোনদিকে যেন না যায় সে, প্রতিদিনের মতই। এরপর গোসল করতে নেমে মনে পড়ে সেইদিনের কথা, যেদিন জহির ডুব সাঁতার দিয়ে এসে ওকে জড়িয়ে ধরেছিল। জানে না কতক্ষণ ভেবেছিল এটা নিয়ে। বেলা বেড়ে যাচ্ছে দেখে তাড়াতাড়ি ডুব দিয়ে ঘাটে উঠে দেখে রাজ্জাক নাই সেখানে। বুকের মধ্যে ছ্যাঁত করে উঠে। পুকুর ঘাটে যারা ছিল তাদের জিজ্ঞাসা করে রাজ্জাককে দেখেছে নাকি? কেউ বলতে পারে না। মউফুল কাঁদতে কাঁদতে খুঁজতে থাকে। পুকুরে কিছু পড়ার শব্দ হয়নি,তারমানে পুকুরে পড়েনি। কিন্তু কোথায় গেল রাজ্জাক ? মউফুলের কাঁদাকাটি, চেঁচামেচি শুনে অনেক মানুষ জুটে গেছে। সবাই চারিদিকে খুঁজছে। প্রায় আধাঘন্টা পর দেখা গেল রাজ্জাক হেলতে দুলতে দোকানের দিক থেকে আসছে। হাতে চিপস আর লজেন্স। মউফুল দৌড়ে গিয়ে রাজ্জাককে জড়িয়ে ধরে হাঁউমাঁউ করে কাঁদতে লাগলো। কাজ শেষে ফেরার সময় জহিরের মা আর বোন রাজ্জাকের হারিয়ে যাওয়ার খবর শুনে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে,মউফুলকে গালি দিতে দিতে, দৌড়ে বাড়ি ফিরলো। রাজ্জাককে যে পাওয়া গেছে সেটা তারা জানে না। জহিরের মা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে একটা চ্যালা কাঠ দিয়ে মউফুলকে পিটাতে লাগল। মউফুল কিছু বলার সুযোগই পেল না। এতদিনের চেপে রাখা রাগ, বিদ্বেষ,যেন প্রতিটা মারে ফুটে উঠতে লাগলো। মউফুলের শরীরের কয়েক জায়গা কেটে গেছে। প্রতিবেশীরা অনেক কষ্টে ছাড়ালো ওকে শাশুড়ির হাত থেকে। যখন রাজ্জাককে সামনে নিয়ে এলো তখন সম্বিত ফিরল তার। এরই মধ্যে জহির এসে দাঁড়িয়েছে উঠানে। কেউই দেখতে পায় নি। প্রতিবেশী কেউ একজন জহির বলে ডেকে উঠলে সবাই তাকালো জহিরের দিকে। জহিরের মা বেকুব বনে গেছে। ছেলের সামনে এমন বেকায়দায় ধরা পড়ে কি করবে, কি বলবে মাথায় ঢুকছেনা। জহির ভাববে সে বোধহয় সবসময় মউফুলের সাথে এমন করে। মনের মধ্যে পুঞ্জীভূত রাগ, নাতী হারানোর ব্যাথা, অন্তরের হতাশা তাকে মুহুর্তে পাগল করে তুলেছিল। মউফুলের চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ে গাল বেয়ে কোলের উপর এসে পড়ছিল। কেউ ওকে বারান্দায় বসিয়ে রেখে গিয়েছে। জহির মউফুলের হাত ধরে ঘরে নিয়ে গেল। পরনের কাপড়, ব্লাউজ ছিঁড়ে গিয়েছে, পাল্টাতে বলল। এরপর ওকে নিয়ে বড় রাস্তার পাশে ডিসপেনসারিতে গেল কাটা জায়গায় ওরা ওষুধ লাগিয়ে খাওয়ার ওষুধ দিল। আর ব্যাথার একটা ইঞ্জেকশন দিয়ে দিল। ওরা ফিরে এলো বাড়িতে। মামা আর নানী এসে বসে আছে। গ্রামদেশে কোন খবর বাতাসের আগে চলে তাই মউফুলের নানীর বাড়ি খবর পৌঁছে গেছে তাড়াতাড়ি। মামার জন্য আসতে দেরী হয়েছে। মামা বাড়ি আসার সাথে সাথে রওনা দিয়েছে ওরা। পিঠ, হাত, হাতের তালু ছড়ে গিয়েছে। জহিরের বাড়ি আসার খবর এখানে এসে শুনেছে ওরা। জহিরের মা ঘরে গিয়ে ঢুকেছে আর বের হয় নি। জানা গেল রাজ্জাকের বাপ রাজ্জাককে নিয়ে দোকানে গিয়ে খাবার খাইয়েছে,আবার লজেন্স, চিপস কিনে দিয়েছে। রাজ্জাক যাওয়ার সময় নাকি চিৎকার করে মামীকে বলে গেছে। কিন্তু মউফুল তখন জহিরের ধ্যানে মগ্ন থাকায় শুনতে পায় নি। মামা মউফুল কে নিয়ে চলে যেতে চাইল। জোরে জোরে শুনিয়ে বল্ল, জহির পাগল হয়েছিল বলে এইঘরে মেয়ে দিয়েছিল। সুন্দর মেয়ের পাত্রের অভাব হতো না কি?? তারা মেয়ে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে, দরকার হয় সারাজীবন মামা পালবে ওকে। থানায় যেয়ে মামলা দিবে।জহির বল্ল, “রাগ কইরেন না মামা আমি ওরে এইবার সাথে কইরা ঢাকা নিয়া যামু।”
মামা নিজের কাছে ওকে নিয়ে রাখতে চাইল। এত চোট সারতেও সময় লাগবে। জহিরের মা কাঁটা হয়ে ঘরে বসে আছে। এক প্রতিবেশীর কাছে শুনেছে এই মারের জন্য মউফুল থানায় নালিশ করলে জহিরের মায়ের জেল হয়ে যাবে। মনে মনে নিজের মাথা চাপড়ায় জহিরের মা। এতই কপাল খারাপ তার! সে কোনদিন মউফুলের গায়ে হাত তুলে নি আর আজ রাগের মাথায় যে দুইচার ঘা দিলো তাও ছেলে দেখে ফেল্ল। বউয়ের মামারা বলছে মামলা করবে,ছেলে বলছে বউ নিয়ে ঢাকা চলে যাবে।এই একটা মাস বউয়ের উপর সংসার ফেলে, নাতি ফেলে শান্তিতে কাজ করতে পারত এখন কি হবে? এছাড়া রাজ্জাকের বাপ হঠাৎ এতদিন পর ছেলেকে দেখতে এলো কেন? কি মতলব? আবার ছেলে নিয়ে চলে যাবে নাতো?? পাড়ার মহিলারা অনেক কথা শুনিয়েছে জহিরের মাকে। মেয়েটা কেমন পাগলের মতন রাজ্জাককে খুঁজছিল আর কাঁদছিল ওরা দেখেছে। স্বামী বউয়ের গায়ে হাত তুলতে পারে শাশুড়ি কেন তুলবে? জহিরের মা যেন একঘরে হয়ে পড়েছে। পড়সীরা খারাপ কথা বলছে,জহির তার সাথে কথা বলে নি আবার মউফুলের মামা পুলিশে দেয়ার হুমকি দিচ্ছে।
মউফুলের মামা ওকে নিয়ে চলে গেল। জহির বাড়ি ফিরে বুবুকে বল্ল ভাত দিতে। কোন সকালে দুইটা খেয়ে বের হয়েছে এখন পেট চোঁচোঁ করছে। মউফুল ভাত,আলুর ডাল,আর বইথা শাক ভাজি করেছিল। দুপুরে খাওয়াও হয়নি তার। মা কে ঘরে খাবার দিয়ে এলো বুবু, ওরা তিনজন খেতে বসল। ছোট্ট রাজ্জাক বুঝতেই পারছেনা কি হলো। সে একটু পরপর জিজ্ঞাসা করছে নানী মামীকে মারল কেন?? মামী তো খুব ভালো। কত আদর করে তাকে। মামী কি আর আসবে না?? এসব শুনে বুবুর চোখে, জহিরের চোখে পানি আসে। এই কয়দিনে মউফুলের উপর মায়া পড়ে গেছে জহিরের বুবুর।
জহির সারপ্রাইজ দিবে বলে বাড়ি এসে নিজেই সারপ্রাইজড হয়ে গেল। এসে থেকে জহির মায়ের সাথে কথা বলেনি। কি যেন বাধো বাধো ঠেকছে। সে বিছানায় এসে শুয়ে পড়ল। বালিশে মউফুলের তেলের গন্ধ, বিছানায় শরীরের গন্ধ পায় সে। কি স্বপ্ন দেখতে দেখতে এলো আর কি হয়ে গেল! মউফুলের কত কষ্ট হচ্ছে কে জানে?? বুকটা হুহু করতে লাগল জহিরের ক্লান্তিতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ল। স্বপ্ন দেখলো মউফুল লাল শাড়ি পড়ে ফুলের বাগানে ঘুরে বেড়াচ্ছে, জহির সামনে গেলেও চিনছে না। জহিরের বুকের মধ্যে অনেক কষ্ট হচ্ছে। মউফুলের নাম ধরে চেঁচাচ্ছে মউফুল শুনতে পাচ্ছে না। ভীষণ কষ্ট নিয়ে ঘুম ভাংলো তার। সারা শরীর জবজবে হয়ে ভিজে গেছে। পরদিন সকালে উঠেই মউফুলের নানীর বাড়ি যায় জহির। মামার এক কথা মউফুলকে ওই সংসারে আর পাঠাবে না। কত স্বপ্ন নিয়ে এসেছিল জহির এখন সব স্বপ্নই বুঝি ভেংগে খান খান হয়ে যাবে। জহির এই কয়েক ঘন্টায় যেন অর্ধেক শুকিয়ে গেছে। মউফুলের বুকেও তুফান চলছে। জহিরের শুকনা মুখ দেখে তার বুকটা টনটন করছে কষ্টে। জহিরকে ছেড়ে বাঁচবে কি ভাবে?? আবার মামী এগিয়ে এলো এই বিপদে। দুইটা মানুষের ভালোবাসার মৃত্যু সে হতে দিবেনা। জহির বলেছে সে মউফুলকে নিয়ে ঢাকা চলে যাবে। মামী মামাকে বুঝাতে বসল। মামা তো প্রথমে বুঝতেই চাচ্ছিল না পরে একশর্তে রাজী হলো, এখান থেকে মউফুল সরাসরি ঢাকা যাবে আর বাড়ি এলে মউফুল নানীর বাড়িতে উঠবে।জহির যেন জানে পানি পেল। ঠিক হলো ওরা পরদিন সকালেই রওনা দিবে ঢাকার উদ্দেশ্যে। জহিরের সমস্যার সমাধান হলো কিন্তু তা এত খারাপ ভাবে যা কাম্য ছিল না তার।পরে রাগ পড়ে এলে তখন অনেক কিছুই পাল্টে যাবে।
বাড়ি ফিরে মউফুলের সব জিনিষপত্র ব্যাগে গুছিয়ে নিলো জহির, নিজের কিছু তো ব্যাগ থেকে বেরই করা হয়নি। মা জহিরের সামনে আসছে না। খুব খারাপ লাগছে ওর। মায়ের পুরাটা জীবন শুধু কষ্টে কেটেছে, শান্তি পায় নি কোনদিন তাই কি এখন এমন করছে মা? কিন্তু মা নিজে পছন্দ করে বিয়ে দিলে কি মউফুলের চেয়ে ভালো মেয়ে আনতে পারত? মাথা কাজ করে না জহিরের কেমন এলোমেলো লাগে সব কিছু। মায়ের সাথে কথা বলতে ভয় লাগছে, তাই বুবুকে বলে কাল ঢাকা চলে যাবে মউফুলকে নিয়ে। বুবুকে সব খুলে বলে। বুবু জানে সংসার ভাংগার কষ্ট তাই সায় দেয় জহিরকে। বলে এদিকটা সে সামলে নিবে। ভোরে বের হবার আগে মাকে বলতে যায় জহির। মা চুপচাপ শোনে, কোন উত্তর দেয় না।
জহির মউফুলকে নিয়ে সন্ধ্যায় ঢাকা আসে। ঢাকায় এত ঠাসাঠাসি বাড়িঘর, এত গাড়ি, এত মানুষ দেখে দমবন্ধ লাগে মউফুলের এরপর নিজেদের কবুতরের খোপের মত ঘর দেখে নিঃশ্বাস আটকে আসে। কিভাবে থাকবে এখানে সে??
(চলবে)

