#মনের_অরণ্যে_এলে_তুমি
#দ্বিতীয়_পরিচ্ছেদ
#তাহিরাহ্_ইরাজ
#পর্ব_৩৬
রাহিদ চমকিত নেত্রে স্ত্রীর পানে তাকিয়ে! ভড়কানো কণ্ঠে কোনোমতে বললো,
” এসব কি? নিজে তো আস্ত এক ফটোবাজ হয়েছিস। এখন আমার ভাতিজাটাকেও সে-ই রাস্তায় আনতে চাইছিস? ”
ইনায়া ফটো তোলায় বিরতি টেনে স্বামীর পানে তাকালো। অপ্রসন্ন কণ্ঠে বললো,
” তোমার সমস্যাটা কোথায় হ্যাঁ? দিলে তো আমার সুন্দর ফটোটা নষ্ট করে। ”
চরম আশ্চর্যান্বিত হলো রাহিদ!
” কি? আমি? আমি তোর ফটো নষ্ট করেছি? কবে কখন কিভাবে? টেল মি। ”
” ফালতু বকবে না। রিহাম সোনাটা কি সুন্দর তাকিয়েছিল! ফাটাফাটি একটা পোজ। ছবিটা যেই তুলবো অমনি ষাঁড়ের মতো খ্যাঁক করে উঠলে। গেল আমার ছবিটা। ”
রাহিদ দুঃখ ভারাক্রান্ত ভাব করে বললো,
” ওরে নি-ষ্ঠুর মহিলা! নিজের স্বামীকে এভাবে মুখের ওপর ষাঁড় বলতে পারলি? একটুও কিডনি কাঁপলো না তোর? সিংহ বললে তা-ও কনসিডার করতাম। একটা বীরপুরুষ বীরপুরুষ ভাইবস্ আসতো। তা না। ডাইরেক্ট ষাঁড় বানিয়ে দিলি? ”
ইনায়া চোখমুখ কুঁচকে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। মোবাইলে খুটখুট করার ফাঁকে বললো,
” তোমার চৌদ্দ পুরুষের কপাল ভালো নেংটি ইঁদুর বলিনি। ”
রাহিদ এতবড় হা করলো যে সে ফাঁক দিয়ে অবলীলায় হাতি বাহিনী চলাচল করতে পারবে। মেকি আহাজারি করে উঠলো রাহিদ,
” ছিঃ ছিঃ ছিঃ ছিঃ! ইনু। শেষমেষ তোর জলজ্যান্ত তা”গড়া জামাইটাকে এভাবে অ-শ্লীল ইঙ্গিত দিচ্ছিস? ওয়াক থু। ”
ইনায়া বিস্ময়ে বাকশূন্য! তার জলজ্যান্ত জামাইটা অন দ্য স্পট কিসব ফাও বকছে! সে কিনা অ..! ছিঃ!
” এই তোমার সমস্যাটা কোথায়? কিসব ভাট বকছো? আমি তোমাকে মোটেও উল্টোপাল্টা বলিনি। ”
রাহিদ চোখ গরম করে তাকালো,
” উল্টোপাল্টা বলিসনি? তবে নেংটা কি? হ্যাঁ? ”
ইনায়া তৎক্ষণাৎ বর সাহেবের মুখে ব্রেক কষে দিলো,
” এই এই ওয়েট। আমি নেংটি ইঁদুর বলেছি। মোটেও ওই শব্দটা বলিনি। ”
” ওরে আমার নি-ষ্ঠুর বউ! এভাবে পাল্টি খাচ্ছিস? আকাশ, বাতাস, আমার রিহু বেপ্পি সব দেখছে। শুনছে। তোর শাপ লাগবে রে। শাপ। ”
রিহাম সোনাটা কি বুঝলো কি জানে। দন্তবিহীন হাসলো। হৃদয়কাড়া সে হাসি! ইনায়া ফটাফট সে হাসিটুকু ক্যামেরা বন্দী করে নিলো। রাহিদ-ইনায়া উভয়েই হাসলো। রাহিদ ঝুঁকে বাবাটার গালে চুমু এঁকে দিলো। আহ্লাদে কণ্ঠে বলতে লাগলো,
” ওলে আমার রিহু বেপ্পিটা! কি ছুন্দত করে হাসে! একদম কেরাশ বয়! চাচুর মতো? হা? ”
কথাটা শ্রবণপথে পৌঁছাতেই কটমট করে স্বামীর পানে তাকালো ইনায়া। দাঁতে দাঁত পিষে বললো,
” সবাইকে নিজের মতো মনে করো নাকি? খবরদার আমার বাবাটাকে ইঁচড়ে পাকা বানাবে না। ”
দাঁত কেলিয়ে হাসলো রাহিদ,
” তাহলে ইঁচড়ে কাঁচা বানাই? ”
ইনায়া বিরক্তিকর অভিব্যক্তি প্রকাশ করে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। রাহিদ এলো আরো সন্নিকটে। ঘন হয়ে বসলো। সঙ্গিনীর কাঁধ ও ঘাড় সংলগ্ন স্থানে তপ্ত শ্বাস ফেলে লহু স্বরে শুধালো,
” কি হয়েছে সোনা? রাগ পাচ্ছে? ”
শিহরিত তনুমন। হৃদয়ে দোল খাচ্ছে অবর্ণনীয় প্রেমময় পবন। কম্পিত স্বরে থেমে থেমে বললো ইনায়া,
” কি করছো? সরো। রিহাম তাকিয়ে.. ”
রাহিদ সম্পূর্ণ করলো বাক্য,
” থাকুক। ছোট ও। বোঝে না এসব। ”
মিনতি জানালো ইনায়া,
” সরো না। ”
কর্ণের নিম্নে ঠেকালো নাক। আলতো করে নাক ঘষে দিলো কোমল ত্বকে। ফিসফিসিয়ে শুধালো,
” খারাপ লাগছে এ ছোঁয়া? ”
জটিল প্রশ্ন ছিল এটি। জবাব দিতে ব্যর্থ ইনায়া। আবেশে মুদিত আঁখিপল্লব। ততক্ষণে সঙ্গিনীর নে শা চড়েছে ছেলেটার শিরায় শিরায়। কাঁধ ও ঘাড়ে ওষ্ঠ ছুঁয়ে যাচ্ছে অবিরাম। ইনুর শিউরে ওঠা ডান হাত চেপে বসলো স্বামীর হাতে। বন্ধ আঁখিপল্লব। অনুভব করে চলেছে একান্ত জনের আবেগী পরশ। দুঃখ যাতনা শেষে কতদিন পর এলো এই একান্ত লগ্ন! শিশু রিহাম নিজ আঙ্গুলে লালারস লাগিয়ে খেলছে। তাকিয়ে ফুপি ও ফুপা ওরফে চাচুর পানে। অবুঝ তো। তাই বুঝলো না আজ কিছুই। তাকে সাক্ষী রেখে প্রেম প্রেম খেলা চালিয়ে গেল রাহিদ। বেচারা পুঁচকে কোনো প্রতিবাদ জানাতে পারলো না। বলতে পারলো না,
‘ আমি ছুটু। তোমরা আমার সামনে দুষ্টু করছো কেন? ‘
•
গোধূলি লগ্ন। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এ কক্ষটি। বদ্ধ জানালার কাঁচ। সে কাঁচে ঠেকে বাঁ হাত। কানে স্মার্টফোন। ফোনালাপে লিপ্ত মানুষটি। পড়নে তুষারশুভ্র পাঞ্জাবি পাজামা। বুদ্ধিদীপ্ত নভোনীল চক্ষুদ্বয় আড়াল হয়েছে রিমলেস চশমার অন্তরালে। ফোনের ওপাশ হতে বলে চলেছে,
” ভাই। মুন্সিগঞ্জের ওইদিকে একজনকে দেখা গেছে। সন্দেহ হইতাছে ওইটাই জহির আহসান। ”
” জায়গায় লেগে থাক। এক পা-ও যেন না নড়ে। ওটা যদি জহির আহসান হয়েই থাকে তাকে বিন্দুমাত্র আঁচড়বিহীন ঢাকা আনার দায়িত্ব তোদের। আশা করছি সেটা কি করে করবি আমায় হাতেকলমে বুঝিয়ে দিতে হবে না? ”
ওপাশ হতে আশ্বস্ত করে বললো,
” না ভাই। আপনি চিন্তা করবেন না। নিশ্চিন্তে থাকেন। আমরা ওইখানে আঠার মতো লাইগা আছি। ওই বুড়া এত সহজে পগারপার হইতে পারবে না। আপনি নিশ্চিন্তে থাকেন। ”
গাম্ভীর্যপূর্ণ স্বরে বললো ইরহাম,
” মনুষ্য মস্তিষ্ক মানেই চিন্তার আনাগোনা। সে চলবেই। তোরা ওদিকে চোখকান খোলা রাখ। ”
” জ্বি ভাই। রাখছি তাহলে? কিছু টের পাইলে আপনাকে জানাবো। আসসালামু আলাইকুম। ”
” ওয়া আলাইকুমুস সালাম। ”
•
নিশুতি রাত। বিছানায় বসে হৃদি। কোলে তার তিন মাস বয়সী আদুরে কন্যা মাহিকা। রিহাম এখন পল্লবী দাদীর কাছে। দুই মিনিটের বড়ছোট এরা দুই ভাই-বোন। রিহাম দুই মিনিটের বড়। এরপর মাহিকা। জন্মের পর থেকেই দুর্বল মেয়েটা। তার শ্বাসকষ্ট ও হৃৎপিণ্ডজনিত সমস্যা দেখা দিয়েছিল। আলহামদুলিল্লাহ্ এখন অনেকটাই ঝুঁকিমুক্ত। ভালো রয়েছে। তবে ভবিষ্যতে কখনো অসুবিধা হতে পারে। মাহিকার তুলনায় রিহাম সুস্থ সবল। তার ইমিউনিটি সিস্টেম উন্নত। তবে মাহিকা দুর্বল। এজন্য ওকে একটু বেশিই যত্ন করা হয়। মায়ের কোলেই বেশি থাকে বাচ্চাটা। ওদিকে রিহাম দিব্যি সবার কোলে কোলে ঘুরে বেড়ায়। ‘ আনন্দাঙ্গন ‘ এ কয়েক চক্কর ইতিমধ্যে কাটা হয়ে গেছে। তাই বলে মা’কে ভুলে যায় এমনটা নয় কিন্তু। ঠিক মনে পড়লে কেঁদেকেটে মায়ের কোলে পৌঁছে যায়। এখনই বেশ চঞ্চল। মায়ের ছেলে বলে কথা। রাতে ঘুমাতে চায় না বিচ্চুটা। দিনভর ঘুমায় আর রাতে বাড়ি পাহারা দেয়। কিন্তু মাহিকা মিষ্টি নম্র মেয়ে। সে ভালোমতো ঘুমায়। তবে খাওয়া-দাওয়ায় বড় অনীহা।
মায়ের কোলে শুয়ে মাহিকা। হৃদি আহ্লাদী স্বরে দুষ্টুমি করে কথা বলছে। দন্তবিহীন হাসি উপহার দিচ্ছে মেয়েটা। সে হাসিতে দু’চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছে। অলপক চাহনিতে তাকিয়ে হৃদি। এই সোনামনিটা তার নিজের? তার গর্ভজাত সন্তান! আল্লাহ্ তায়ালা তাকে দু’টো অমূল্য উপহার দিয়েছে। রিহাম ও মাহিকা। আল্লাহ্ প্রদত্ত অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপহার। মায়ের হাসি দেখে শিশু মাহিকাও হাসছে। হৃদি ঝুঁকে গেল। মেয়ের ললাটে গুনে গুনে চারটা চুমু এঁকে দিল। নিঃশব্দে হাসছে অবুঝ মেয়েটা। এমনই নজরকাড়া মুহূর্ত ঘরের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে উপভোগ করছে ইরহাম। সদ্য কর্মস্থল হতে ফিরলো সে। ঘরে প্রবেশ করার পূর্বেই মা মেয়ের মিষ্টিমধুর মুহূর্তের সাক্ষী হলো। অধরকোলে ফুটে উঠলো হাস্য রেখা। তখনই এদিকে তাকালো হৃদি। চোখে চোখ পড়লো দু’জনার। মুচকি হেসে সালাম দিলো হৃদি,
” আসসালামু আলাইকুম। ”
ঘরে প্রবেশ করে সালামের জবাব দিলো ইরহাম,
” ওয়া আলাইকুমুস সালাম। কেমন আছে আমার বাবু এবং তাদের আম্মু? ”
” আলহামদুলিল্লাহ্ আমরা দু’জনেই ভালো আছি। তুমি কেমন আছো? আসতে কোনো অসুবিধা হয়নি তো? ”
” আলহামদুলিল্লাহ্ আমিও ভালো আছি। না কোনো অসুবিধা হয়নি। ”
হৃদি মুচকি হেসে মেয়েকে কোলে নিয়ে উঠতে উদ্যত হলো। হাতের ইশারায় নিষেধ করলো ইরহাম। হৃদি আর উঠলো না। কাছে গিয়ে মেয়ের ললাটে চুম্বন এঁকে দিলো মানুষটি। স্নেহপূর্ণ চাহনিতে তাকিয়ে রইলো কয়েক পল। মেয়েও বাবার পানে তাকিয়ে। বাবাকে ঠিক চিনেছে। তাই তো শব্দহীন হাসছে। দ্বিতীয়বার চুমু দিয়ে,
” আমার সোনা মা! বাবা ফ্রেশ হয়ে আসছি। ঠিক আছে? ”
অবুঝ শিশুটি এখনো বাবার পানে তাকিয়ে। নিজ অনুভূতি ব্যক্ত করতে ব্যর্থ। তাই তো নিশ্চুপ। মেয়ের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে স্ত্রীর পানে তাকালো ইরহাম। বললো,
” তুমি বসো। আমি নিজেই নিয়ে নিচ্ছি। ”
প্রসন্ন হলো হৃদয়। ইতিবাচক মাথা নাড়ল হৃদি। ইরহাম মুচকি হেসে ড্রেসিং টেবিলের দিকে অগ্রসর হলো। পোশাকআশাক বদলে ফ্রেশ হয়ে বের হবে সে। বসবে বিছানায়। তন্মধ্যে রিহাম হাজির। ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে এবার বাবা সময় কাটাবে। ডিনারের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত এটা তাদের বিশেষ মধুরতম সময়। পিতা, পুত্র ও কন্যা। হৃদয়ছোঁয়া লগন!
•
সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী খন্দকার আজগর মল্লিক। দলে পরিচিত ‘নেতাজী’ হিসেবে। কোথায় আজ তার প্রতিপত্তি? কোথায় সেই ক্ষমতার অপব্যবহার? বিগত দুই মাস ধরে কারাবন্দী জীবনযাপন করছে সে। ঠাঁই হয়েছে জেলের এক স্যাঁতস্যাঁতে ঘরে। আলো বাতাস সেথায় স্বাচ্ছন্দ্যে প্রবেশ করতে ব্যর্থ। যে লোকটির অর্ধ জীবন কেটেছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে। আজ তার শেষবেলা গরমে ঘর্মাক্ত শরীরে কাটছে। কোনো এসি নেই। নেই শীতল হাওয়া প্রদানকারী দামী সিলিংফ্যান। অন্ধকার সে কুঠুরিতে সম্পূর্ণ একাকী সে। নেই কোনো সঙ্গী-সাথী। নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে ওনাকে একাকী এক সেলে রাখা হয়েছে। দু’টো কথা বলার জন্য আজ পাশে কেউ নেই। চারিদিকে নিস্তব্ধতার চাদর। আর রাতের আঁধারে ভ”য়ঙ্কর হাতছানি। অধিকাংশ রাত তার নির্ঘুম কাটছে। দেখা দিচ্ছে সে বীভৎস-বিকট অবয়ব। ঘুমের ঘোরে চেঁচিয়ে উঠছে সে। চিৎকার করে বাঁচতে চাইছে। এই মানসিক যন্ত্রণা হতে মুক্তি চাইছে। তবে আফশোস! বাঁচাতে এলো না কেউ। বরং সামান্য ক্ষমতার অধিকারী এক কনস্টেবল তাকে ধমক দিয়ে চুপ করতে আদেশ দিলো। বাকিদের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটছে যে। আজগরের আজ এই দুরবস্থা। ভিন্ন ভিন্ন রূপে সর্বমোট এগারোটি মামলা দায়ের করা হয়েছে তার বিরুদ্ধে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে দুর্নীতি মামলায় কিছুদিন জামিনে ছিল। এরপর এলো সে-ই ভ-য়ানক দিন! একাধারে বেশকিছু মামলা। তন্মধ্যে প্রাইভেট ভার্সিটির স্টুডেন্ট মুহিত হ-ত্যা মামলা, ঢাবির ছাত্রনেতা হাসিফকে হ-ত্যার মূল পরিকল্পনাকারী, নারী পা:চার এবং মা-দক ব্যবসা অন্যতম।
আজগরের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে শীঘ্রই কোর্টে উঠবে তিনটে কেস। ওদিকে তার একমাত্র পুত্র রুদ্রনীল। সে আউট অফ রিচ। উনি যোগাযোগ করার চেষ্টা করে বারংবার ব্যর্থ হয়েছেন। বুঝে উঠতে পারছেন না রুদ্র কি করতে চাইছে। গোয়ায় বসে সে কি বাপের দুর্দশা দেখে মজা লুটছে? নাকি অন্যদের মতো বিপদের সময় সে-ও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। আজ এতটাই দুর্ভাগ্য তার। সরকারি দলের কোনো নেতাকর্মী, কিংবা তার ছেলেপেলে কেউই সেভাবে এগিয়ে এলো না। বিপদের আশঙ্কা করে সবাই মুখ বাঁচিয়ে চলছে। দূরত্ব বজায় রাখছে। এটাই মনুষ্য ধর্ম। গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটল নিজ ভাষায় একটি খাঁটি কথা বলেছেন। যার বঙ্গানুবাদ হলো,
” দুর্ভাগা তারাই যাদের প্রকৃত বন্ধু নেই। ”
একদা এমন সময় ছিল। যখন ওনার গায়ে আইনের সামান্যতম আঁচ লাগলেও দেশে হরতাল, অবরোধ কর্মসূচি পালন করা হতো। জায়গায় জায়গায় প্রতিবাদ হতো। মা-রপিট হতো। আজ সেসব অতীত। এইবার উনি এত বাজেভাবে ধরা পড়ে গেলেন। অথচ দেশব্যাপী তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা হলো না। বরং জনগণের সামনে ওনার মূখোশ উন্মোচন হলো। ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হলো বিশ্রীভাবে। এই ওনার কপালে ছিল! একদিন লোকের সম্মান নষ্ট করেছেন অবলীলায়। আজ ওনার নিজস্ব সম্মান কাদামাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। কেউ নেই পাশে। সম্পূর্ণ একা উনি। পুত্র রুদ্রনীল যদি কোনো কার্যকারী পদক্ষেপ গ্রহণ না করে তবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড কিংবা ফাঁ-সি নিশ্চিত।
রঙচটা দেয়ালে ভারী দেহটি এলিয়ে দিলেন আজগর। ধরনীর বুকে আস্তে ধীরে নামছে আঁধার। অন্যদিনের ন্যায় আজ রাতেও অন্ধকারে না হানা দেয় সে-ই বি”ভীষিকাময় মুহুর্ত! সে-ই অতিকায় দা-নব!
•
এক স্নিগ্ধ অপরাহ্ণ। লিভিংরুমে বসে হৃদি। কোলে তার মাহিকা। হৃদি’কে ঘিরে পাশে, সামনের সোফা দখল করেছে বন্ধুমহল। সকলে এসেছে। যথারীতি রিহাম সোনাটা তার খালামণি, মামাদের কোলে চড়ে বেড়াচ্ছে। এক জায়গায় স্থির নেই। দন্তবিহীন হাসি উপহার দিচ্ছে। হৃদি মুগ্ধ নয়নে সে হাসিটুকু উপভোগ করছে! সাবিতের ডান পাশেই বসে নাদিরা। ওর কোলে এখন রিহাম। সাবিত ভাগ্নের ছোট্ট তুলতুলে হাত নিয়ে খেলতে খেলতে দুঃখী বদনে বললো,
” বুঝলি তোরা? প্রেম ক কিংবা ফ্লার্টিং। সারাজীবন করলাম আমরা। আর শেষমেষ গুড নিউজ আগে দিলোডা কে? ওই ছ-লনাময়ী নারী। ”
” ছ-লনাময়ী নারী? কে? হৃদু? ” জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে নাদিরা।
” আবার জিগায়। এই মাইয়া হারা জীবন প্রেম ভালোবাসা থে দূরে। অথচ দেখ। ঠিক সময়মতো কাম বানাইয়া দুই পিস পুতুল আমদানী করছে। এক্কারে গুলুমুলু পুতলা। ”
এমন দুষ্টু কথাবার্তায় তপ্ত হলো শ্রবণপথ। হৃদি মেকি শাসনের সুরে বললো,
” সাবু। চুপ করবি তুই? ”
” না। করতাম না। আগে ক আমাগো সেটিং না করাইয়া তুই এতবড় পূণ্য ক্যামনে করলি? একটুও গিলা, কলিজা, ফুসফুস কাঁপলো না? ”
হেসে উঠলো বন্ধুরা। হৃদি নিঃশব্দে হাসলো। নাবিল সহমত পোষণ করে বললো,
” কারেক্ট আছে বস। আমরা এখনো একটা পারমানেন্ট গফ জুটাইতে পারলাম না! আর হৃদু কিনা দুই কিউট পিসের মামা বানাই দিলো? ”
ইভা মুখ বাঁকিয়ে বললো,
” গাপ্পেন জুটাইতে পারোছ নাই। ইগ্লা তোগো ব্যর্থতা। এতে হৃদু কি করতো? তোগো লেইগা গফ ভিক্ষা করতো? ”
সাবিত আঙ্গুল তাক করে শাসিয়ে দিলো,
” ওই মহীয়সী বেডি! তুই তো চুপ ই থাক। নিজে তো থ্রি পিস মালু লইয়া মজায় আছো। আর আমগো চিরকুমার ক্লাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট বানানোর ধান্দা করতাছো? ”
ইভা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে!
” হোয়াট! আমি। আমি তিনটাকে নিয়ে মজা লুটপাট করতাছি? ”
” অফকোর্স। কোয়ি ডাউট? ”
” পাঁচশো পার্সেন্ট ডাউট। শা লা গাঁ;জাখুরি ভাট বকছে! ”
সাবিত দাঁত কেলিয়ে আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু পথিমধ্যে থামিয়ে দিলো আফরিন। সে বসে হৃদি’র বাম পাশে। নিচু স্বরে শাসন করে বললো,
” তোরা চুপ করবি? তোদের প্যাঁনপ্যাঁন শুনে আমার মা টা ভয় পাচ্ছে। যেকোনো সময় কেঁদে দেবে। চুউপ ”
ইভা তৎক্ষণাৎ ঠোঁটে আঙ্গুল ঠেকিয়ে চুপ হয়ে গেল। তবে দমে গেল না সাবিত। বরং দ্রুত উঠে দাঁড়ালো। গেল সম্মুখে এগিয়ে। আস্তে করে সাবধানী ভঙ্গিতে মাহিকা’কে কোলে নিলো। কপালে চুমু এঁকে আদুরে গলায় বললো,
” আমার মা টা কাঁদে? কেন কেন? ভু পাচ্ছে? আহা রে। ভু পায় না। ওইটা ভালো শাকচু”ন্নী। তোমাকে ডর দেখাবে না। ঠিক আছে? ওইটা সামান্য কাটপিস। ভু পায় না মা। উম্মাহ। ”
পুঁচকের কপালে আরেকটা চুম্বন করলো সাবিত। হৃদি শব্দহীন হাসলো। আর ইভা? তেলেবেগুনে জ্ব’লে উঠলো! এতবড় ফালতু কথা! সে কিনা শা:কচুন্নী? ওই। ওই সাবু’র বাচ্চা হলো গিয়ে মামদো ভূত। আস্ত খা টা শ। হুহ্।
শোকর আলহামদুলিল্লাহ্। ভাগ্য করে প্রকৃত কতগুলো বন্ধু পেয়েছে সে। হৃদি ভাগ্যবতী এই বি;চ্ছুগুলোকে বন্ধু রূপে পেয়ে। সুখেদুঃখে সদা সর্বদা পাশে ছিল এরা। হৃদি ভোলেনি তার সে-ই বি’ভীষিকাময় দিনগুলি। হাসপাতাল কিংবা বাড়ি। আপনজনের মতো পাশে ছিল এই বন্ধুরা। পালাক্রমে একেকজন দিনভর ও সন্ধ্যায় তাকে সময় দিয়েছে। বিরূপ পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে উদ্দীপনা জুগিয়েছে। পরিবারের পর এরাই ছিল পাশে। দুঃসময়ে হাতটি ত্যাগ করেনি। প্রকৃত বন্ধুর ন্যায়, ছায়ার ন্যায় পাশেই ছিল। সে আসলেই ভাগ্যবতী। এক জীবনে পেয়েছে অনেকগুলো মানুষের প্রকৃত স্নেহ, ভালোবাসা! আলহামদুলিল্লাহি আলা কু’ল্লি হাল!
•
অমানিশায় আচ্ছাদিত ধরিত্রী। নিস্তব্ধ চারিধার। গোলক ধাঁধায় ফেঁ সে মানুষটি। নভোনীল চক্ষু জোড়া ব্যস্ত ধাঁধার সমাধান খুঁজতে। আস্তে ধীরে চলছে দু’টো হাত। ভাবনা খেলে বেড়াচ্ছে মস্তিষ্কে। এ কোন গোলক ধাঁধার সমাধান করতে ব্যস্ত চৌধুরী?
চলবে.
[ বিশাল বড় করে পর্ব দিচ্ছি বর্তমানে। সুন্দর মন্তব্য চাই কিন্তু। কেমন লাগছে পর্বগুলো? আর নতুন অতিথিদের? গঠনমূলক মন্তব্য করে নিজ অনুভূতি ব্যক্ত করতে ভুলবেন না যেন। ধন্যবাদ। ]
♣️ আসসালামু আলাইকুম পাঠক বন্ধুরা….
তাহিরাহ্ ইরাজ এর লেখা গল্প-উপন্যাস সম্পর্কিত ছোট-বড় অনুভূতি ব্যক্তকরণ, গল্প নিয়ে আলোচনা, ভুলত্রুটি শুধরে দেয়া, রিভিউ প্রদান এবং গল্পের চরিত্র-দৃশ্য নিয়ে পোস্ট করতে জয়েন করুন আমাদের গল্প সংক্রান্ত গ্রুপে।
গ্রুপ লিংক 🍁
https://www.facebook.com/groups/499389245208190/?ref=share

