#প্রনয়ের_দহন
#Nusrat_Jahan_Bristy
#পর্ব_৪৯
গাড়ি এসে থামে শপিংমলের সামনে। এক এক করে সবাই গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ায়। ইশান পার্কিং লটে গাড়ি পার্ক করে এসে সামনের দিকে তাকাতেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পরে তীরের পাশে শুভ্র রঙের শার্ট পরিহিত একটা ছেলেকে দেখে। ওই দিনের অনুমানটাই কি তাহলে ইশানের ঠিক ছিলো রেস্টুরেন্টের গৌরবর্ণের ছেলেটাই তীরের হবু বর। কিন্তু এই ছেলে এখানে কি করছে ওর তো এখানে আসার কথা নয়। ইশানের ভাবনার মাঝে ইশা ভাইয়া বলে চিৎকার করে। ইশার ডাক শুনে ইশান দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে ওদের কাছে আসতেই ইশা হাসিহাসি মুখ নিয়ে বলে।
–ভাইয়া ওনি আকাশ ভাই। মানে তীরের হবু বর।
ইশা ইচ্ছে করে এমনটা বলে ভাইয়ের রিয়াকশন দেখার জন্য। কিন্তু ইশান মুচকি হেসে আকাশের দিকে তাকাতেই আকাশ হাত বাড়িয়ে দেয় ইশানের দিকে হ্যান্ড শেক করার জন্য। ইশানও হাত বাড়িয়ে আকাশের হাতে হাত মিলিয়ে কুশল বিনিময় করে। আকাশ বলে।
–হাই! আমি আকাশ শেখ।
–ইশান….. ইশান ফরাজী।
তীরের এসব একদম ভালো লাগছে না দম বন্ধ হয়ে আসছে ইশানের এই নিরবতা। কেন এভাবে সব মুখ বুজে সবটা সহ্য করছে ইশান? তার কি একটুও খারাপ লাগছে না তীরকে অন্য এক ছেলের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। তীর গম্ভীর গলায় বলে।
–হয়েছে আপনাদের কুশল বিনিময়। যদি হয়ে থাকে তাহলে আমরা যা করতে এসেছি এখানে তা করি।
আকাশ মুচকি হেসে বলে।
–ম্যাডাম দেখা যায় রেগে যাচ্ছে শপিং করতে লেইট হচ্ছে বলে। মেয়েদের তো এই একটাই ইচ্ছে বেশি বেশি করে শপিং করা আর বরদের পকেটের টাকা খরচা করা। চলুন ম্যাডাম আজকে আপনার যা কিনতে মন চাইবে সব কিনে দিবো।
তীর নিজের রুপ পাল্টে ইশানের দিকে একবার আড় চোখে তাকিয়ে কুটিল হাসি দিয়ে বলে।
–আমি জানি তো আপনি আমায় কতোটা ভালোবাসেন তাই তো আমি যা চাইবো আপনি এক কথায় আমাকে কিনে দিবেন কোনো প্রকার দ্বিমত করবেন না।
আকাশ মুচকি হেসে তীরের ডান হাতটা ধরে বলে।
–সেটা আবার বলতে তুমি চাইবে আর আমি দিবো না তা কি করে হয়। চলো আন্টি হয়তো ভেতরে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন।
তীর মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বলে ইশানের দিকে তাকায়। ইশানের মুখে রাগের কোনো প্রকার অস্তিত্বও নেই। ইশানের এই শান্ত রুপটা যে তীরকে শান্তিতে থাকতে দিচ্ছে না। যেটার জন্য তীর শর্ত রেখেছে তার বিয়ের সমস্ত কাজ ইশানকে করতে হবে তার কোনো বহিঃপ্রকাশেই পাচ্ছে না ইশানের মাঝে। ইশান যেন অনুভূতিহীন এক পাথরে পরিণত হয়েছে। আকাশ তীরকে নিয়ে চলে যায়। ইশা ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে মনমরা হয়ে বলে।
–চলো ভাইয়া।
ইশা চলে যেতেই ইশান হুস করে নিঃশ্বাস ছাড়ে। এতক্ষণ যেন দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম ছিলো। চোয়াল শক্ত করে দু হাত মুষ্টিবদ্ধ করে জোরে জোরে নিঃশ্বাস ছেড়ে রা’গ’টা’কে নিয়ন্ত্রণ করার প্রচেষ্টা করছে। কিন্ত এই রা’গটা কতক্ষণ ধমন করে রাখতে পারবে সেটা ইশানের জানা নেই।
______
তীর একের পর এক বেনারসি শাড়ি আর লেহেঙ্গা রিজেক্ট করছে তার একটাও নাকি পছন্দ হচ্ছে না। মূলত পছন্দ হচ্ছে না বলে ভুল হবে তার এসব কিচ্ছু ভালো লাগছে না। আয়েশা সুলতানা মেয়ের উপর রেগে গিয়ে বলেন।
–এতো গুলা শাড়ি আর লেহেঙ্গা বের করা হয়েছে আর তার মাঝে তোর একটাও পছন্দ হচ্ছে না।
–নাহ পছন্দ হচ্ছে না।
আকাশ বলে।
–আন্টি রা’গ করবেন না। ওরা যতক্ষণ না পর্যন্ত শাড়ি কিংবা লেহেঙ্গা পছন্দ হচ্ছে না ততোক্ষণ পর্যন্ত আমরা দেখে যাবো।
এমন সময় ইশান এসে তীরের পাশে দাঁড়ায়। এতক্ষণ সময় ইশান বাইরেই ছিলো কিন্তু ইশার ফোনের উপর ফোন করার কারণে বাধ্য হয়ে আসতে হলো না হলে বলেন দম বন্ধ কর জায়গায় আসতো না। তীর চোখ বন্ধ করে ইশানের পারফিউমের গন্ধটা শুকে নেয়। এই গন্ধটা তীরকে অন্য এক জগতে যেন নিয়ে যায়। আয়েশা সুলতানা ইশানকে দেখে বলেন।
–ইশান বাবা তুমি বলতো কোন শাড়িটা তীরকে ভালো বানাবে।
আয়েশা সুলতানার কথা শুনে তীর চোখ মেলে ইশানের দিকে তাকায়। ইশানও তীরের দিকে কয়েক পল তাকিয়ে তীরের পাশ কাটিয়ে একটা লাল টকটকে লেহেঙ্গা নিয়ে বলে।
–শাড়ি থেকে লেহেঙ্গাতে ভালো লাগবে তীরকে।
আয়েশা সুলতানা বলেন।
–বাহ লেহেঙ্গাটা তো খুব সুন্দর। ইশানের চয়েজ খুব সুন্দর তো। তীর যা তো এটা ট্রাই করে আয় ট্রায়াল রুম থেকে।
মায়ের এই কথাটা বলতে দেরি হলো তীরের না করতে দেরি হলো।
–নাহ! এই লেহেঙ্গাটা একদম সুন্দর নয়। এই লেহেঙ্গাটা আমার একটুও পছন্দ হয় নি। যে চয়েজ করেছে তার চয়েজ খুব খারাপ খুব বাজে।
তীরের মুখে এমন কথা শুনে হেসে ফেলে ইশান। তবে এই হাসির পেছেনে লুকিয়ে আছে হাজারো যন্ত্রণা যে যন্ত্রণাটা কাউকে বুঝাতে চাইছে না ইশান এমন কি নিজেকেও না।
তীর আকাশকে উদ্দেশ্য করে বলে।
–আকাশ আপনি একটা লেহেঙ্গা চয়েজ করে দিন তো। আমি আপনার পছন্দের লেহেঙ্গা পরেই বিয়ে করবো।
তীরের কথা শুনে আকাশ নিজের ভাবনা থেকে ফিরে আসে। আকাশের সন্দেহ হচ্ছে তীর আর ইশানকে নিয়ে। তীরের ইশানের দিকে তাকানো ইশানের তীরের তাকানো আকাশের ঠিক ভালো লাগছে না। কিছু তো একটা ব্যাপার আছে এই দুজনের মাঝে আকাশ সেটা ভালো করেই বুঝতে পারছে। আকাশ মুচকি হেসে একটা খয়েরি রঙের লেহেঙ্গা হাতে নিয়ে বলে।
–এটা! এটা পড়লে তোমাকে সুন্দর লাগবে একদম আমার স্বপ্নের রাণীর মতো।
লাস্ট কথাটা আকাশ ইশানের দিকে তাকিয়ে বলে এটা দেখার জন্য ইশানের কি প্রতিক্রিয়া হয়। কিন্তু না ইশানের কোনো প্রতিক্রিয়াই করলো না বরং সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে পকেটে হাত গুজে।
তীর লেহেঙ্গাটা নিয়ে ট্রায়াল রুমে যেতে নিলে ইশা বলে।
–আমি আসবো তোর সাথে।
–নাহ তার কোনো দরকার নেই আমি একাই পরবো।
–ওকে।
তীর চলে যেতেই আকাশ বলে।
–আন্টি আমি একটু আসছি।
______
তীর ট্রায়াল রুমে এসে হ্যাঙ্গারে লেহেঙ্গাটা ঝুলিয়ে দিয়ে দেয়াল পিট টেকিয়ে বসে পড়ে। এতো কষ্ট আর নিতে পারছে না। ইশানকে কষ্ট দিতে গিয়ে নিজেই যেন ভেতর থেকে শেষ হয়ে যাচ্ছে। ইশান তো কষ্ট পাচ্ছেই না বরং হাসি মুখে সবটা মেনে নিছে। চোখ বন্ধ করে দেয়ালের সাথে মাথাটা হেলিয়ে দেয় তীর। এমন সময় দরজায় নক করে কেউ। তীর বসা থেকেই বলে।
–কে?
কোনো সাড়া শব্দ আসলো না বাইরে থেকে। তীর ভাবলো এটা হয়তো ইশা হতে পারে। কারণ ইশা মাঝে মাঝে এমনটা করে দরজায় শব্দ করে কোনো কথা না বলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। তাই তীরও না বুঝে দরজা খুলে দিতেই আকাশ দরজা ঠেলে ভেতরে ডুকে। আকাশকে এখানে এমন সময় দেখে তীর হতভম্ব হয়ে বলে।
–আপনি? আপনি এখানে কি করছেন?
–হে আমি অন্য কাউকে আশা করেছিলে বুঝি।
তীর ভ্রু-কুচকে বলে।
–মানে।
আকাশ বাঁকা হেসে বলে।
–মানেটা খুব সোজা এখানে নিশ্চয়ই ইশান ফরাজীকে আশা করেছিলে তুমি তাই না।
তীর রা’গী গলায় বলে।
–কি যা তা বলছেন আপনি এসব?
আকাশ তীরের দু বাহু ধরে নিজের কাছে এনে বলে।
–একদম আমার সাথে তেজ দেখিয়ে কথা বলবে না। কি ভেবেছো তুমি আমি কিচ্ছু বুঝতে পারবো না ওই দিনও রেস্টুরেন্টে আমি খেয়াল করেছি তোমার আর ওই ইশানের বিষয়টা। তখন বুঝতে পারি নাই কিন্তু আজ অক্ষরে অক্ষরে বুঝতে পারছি তোমার আর ওই ইশান ফরাজীর মাঝে কিছু তো একটা আছে।
তীর ব্যাথায় আর্তনাদ করে বলে।
–কি করছেন কি হাতে লাগছে আমার। ছাড়ুন আমাকে।
–আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দাও তারপর ছাড়বো।
তীর এবার রা’গী চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে।
–হে আমার আর ইশান ভাইয়ের মাঝে সম্পর্ক আছে শুনেছেন আপনি আমার আর ইশান ভাইয়ের মাঝে সম্পর্ক আছে। এবার আপনি কি করবেন বিয়েটা ভেঙ্গে দিবেন, ভেঙ্গে দিন এই বিয়েটা আমি এই বিয়েটা করতে চাই না। শুধু মাত্র মায়ের কথায় এই বিয়েতে রাজি হয়েছি আমি, না হলে আপানাকে বিয়ে করার কোনো রকম ইন্টারেস্ট নেই আমার।
আকাশ তীরকে নিজের আরেকটু কাছে এনে বলে।
–কিন্তু আমার তো ইন্টারেস্ট আছে সোনা তোমাকে বিয়ে করার। তোমাকে ছবিতে দেখে সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে এসেছি আর আমি বিয়ে করবো না তোমাকে তা কি করে হয়।
তীর দাঁতে দাঁত চেপে বলে।
–ছাড়ুন আমাকে।
–অবশ্যই ছাড়বো কিন্তু ছাড়ার আগে কিছু তো আদায় করতেই পারি তোমার কাছ থেকে হবু বর হিসেবে তাই না।
চোখ টিপ মেরে বলে কথাটা আকাশ। তীর তা দেখে শুকনো ঢোক গিলে ভয়ে ভয়ে বলে।
–কি আদায় করার কথা বলছেন আপনি?
আকাশ তীরের ঘাড়ে হাত রেখে তীরের মুখটা নিজের মুখোমুখি এনে বলে।
–তোমার এই গোলাপি ঠোঁটে একটা নিষিদ্ধ চুমু তো খেতে পারি বিয়ের আগে তাই না।
আকাশের এমন লাগামহীন কথা শুনে তীরের শরীরের পশমগুলা কাটা দিয়ে উঠে। মুখটা অন্য দিকে ঘুরাতেও পারছে না আবার চিৎকারও করতে পারছে না বাইরের মানুষ জনের কথা ভেবে। আর এদিকে আকাশ তীরের ঠোঁটের দিকে এগিয়ে আসছে ধীরে ধীরে। অন্য দিকে তীর নিজের মাথা ঠান্ডা রেখে আকাশের পায়ে সজোরে লাথি মেরে বসে আর আকাশ ব্যাথা সহ্য করতে না পেরে হাটু ভেঙ্গে নিচে বসে পড়ে। তীর ভেবেছিলো আকাশের মেইন পয়েন্টে লাথি দিবে কিন্তু পরে করুণা হলো এটা ভেবে আকাশের ভবিষ্যৎ নষ্ট করে কোনো লাভ নেই। তাই পায়েই লাথি মারে। তীরও সুযোগে পেয়ে এখান থেকে চলে যায়।
_____
এদিকে তীরের লেইট হচ্ছে দেখে ইশান আর বসে থাকতে পারছে না। মনের ভেতরে অজানা ভ’য় কাজ করছে এটা ভেবে তীরের কোনো বি’প’দ হলো না তো। ইশান বসা থেকে উঠে সোজা ট্রায়াল রুমের উদ্দেশ্য পা বাড়ায়। কিন্তু এর আগেই তীরকে দেখে হন্তদন্ত হয়ে আসছে। তীরের এমন অবস্থা দেখে ইশান ভ্রু-কুচকে নেয়। চোখে মুখের অবস্থা খুবেই শোচনীয় তীরের। চোখ মুখ দেখেই স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছে তার সাথে। তীর ইশানকে দেখেও না দেখার ভান করে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলে ইশান তীরের পথ আটকে গলায় কঠিনত্ব রেখে বলে।
–কি হয়েছে?
তীর অনুভুতিহীন কন্ঠে বলে।
–কিচ্ছু হয় নি।
–তাহলে চোখ মুখের এই করুণ অবস্থা কেন?
–আমার বিষয়ে আপনাকে এতো না ভাবলেও চলবে।
বলেই ইশানের পাশ কেটে চলে যেতে নিলেই ইশান তীরের হাত ধরবে বা কিছু বলবে তার আগেই তীর কন্ঠ স্বরে ক্রোধ রেখে বলে।
–আমার কাছে আসার চেষ্টা করবেন না আপনি। এক বার যখন নিজ থেকে দুরে সরিয়ে দিয়েছেন তাহলে আর আমার কাছে আসার চেষ্টা স্বপ্নেও আনবেন না। তাই আমার থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলবেন।
মুহূর্তের মাঝে ইশানকে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেলো। কানের কাছে এখন বজ্রপাতের ধ্বনির মতো তীরের বলা প্রত্যেকটা কথা বাজছে। সে কি খুব আঘাত দিয়ে ফেলেছে তার তীরকে না হলে এতো শক্ত শক্ত কথা ইশানকে বলতে পারতো না কখনো। তারেই বা কি করার আছে তার হাত পা যে বেঁধে দিয়েছে আয়েশা সুলতানা স্বয়ং নিজেই। না হলে এই বিয়ে কিছুতেই হতে দিতো না ইশান। এখন শুধু একটা সুযোগের অপেক্ষায় আছে ইশান যেই সুযোগটা কাজে লাগিয়ে এই বিয়েটা ভাঙ্গতে পারবে।
এমন সময় আকাশকে খুঁড়ে খুঁড়ে হেটে আসতে দেখে কিছুটা অবাক হয় ইশান। আকাশ ইশানের কাছাকাছি আসতেই বলে।
–পায়ে কি হয়েছে?
–ও…. কিছু হয় নি মচকে গেছে।
ইশানের ঠিক বিশ্বাস হলো না কেন জানি আকাশের বলা কথাটা। মন বলছে কিছু তো একটা গন্ডগোল আছেই এর মাঝে তবে সেটা কি বের করতে হবে।
#চলবে______
খুব তাড়াতাড়ি শেষ করে দিবো গল্পটা।

