ফিরে_আসা ৪৭ লেখা : অতন্দ্রিলা আইচ

0
1445

#ফিরে_আসা
৪৭
লেখা : অতন্দ্রিলা আইচ

আজ সকাল থেকে বেশ কয়েকবার সাংবাদিকদের ক্যামেরায় ধরা পড়েছে আরশাদ। প্রথমত তাকে দেখা গেছে ধানমন্ডি থানা থেকে বের হতে। এরপর ডিআইজি সাহেবের অফিসে। আরশাদের চোখেমুখে একরাশ দুশ্চিন্তা। তাকে দেখে বোঝাই যাচ্ছে কাল রাতে এক মুহূর্তের জন্যেও দুচোখের পাতা এক করেনি। আরশাদের চোখদুটোর মাঝে দুশ্চিন্তার সঙ্গে সঙ্গে লুকিয়ে আছে তীব্র রাগ।

সাংবাদিকদের তোলা এই ছবিগুলো ঘুরে বেড়াচ্ছে ফেসবুকজুড়ে। নওশীন সেই সকাল থেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে ছবিগুলো। একটা বিষয়ই তার মাথায় ঢুকছে না, ওই মেয়েটার প্রতি আরশাদের এত টান আসছে কোত্থেকে? তার জানা মতে তো আরশাদ পরিস্থিতির চাপে পড়ে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছে অরাকে। দুজনে এক ঘরেও থাকে না।

প্রশ্ন উঠতে পারে, এতটা গোপন তথ্য নওশীন জানলো কী করে? উত্তরটার পেছনে রয়েছে লম্বা কাহিনী। মাস দুয়েক আগের কথা, সাবেরের সঙ্গে প্ল্যানটা পাকাপোক্ত করারও আগে নওশীন গিয়েছিল একটা পার্টিতে। সেলিব্রিটিদের পার্টিতে আজকাল তার তেমন ডাক পড়ে না। তবুও সেদিন ভাগ্যক্রমে ডাক পড়ে যায়। পার্টিতে গিয়ে নওশীন দেখে সেখানে আগে থেকেই উপস্থিত আরশাদের আইনজীবী হিমেল।

হিমেলকে দেখেই নওশীনের মাথায় তৎক্ষনাৎ বুদ্ধি খেলে যায়। তার কাছ থেকে কোনো না কোনো তথ্য বের করা গেলেও যেতে পারে। হিমেল আগে থেকেই অতিরিক্ত পরিমাণ ড্রিংক করে রেখেছিল। নওশীন যেহেতু চিরকালই পাকা অভিনেত্রী, তাই এমন একটা ভাব করলো যেন সেও অজস্র পরিমাণ ড্রিংক করেছে। একটা গ্লাস হাতে নিয়ে টলতে টলতে হিমেলের পাশে গিয়ে বসলো। হিমেল চোখ মেলে ভালো করে তাকালো নওশীনের দিকে। যেন তার চিনতে অসুবিধা হচ্ছে তার সামনে কে বসে আছে।

যখন চিনতে পারলো মানুষটা নওশীন, তখনই তীক্ষ্ণ স্বরে বলল, “নওশীন! এখনো আগের মতোই আছো দেখছি।”

নওশীন ভ্রু উপরে তুলে বলল, “এটা কমপ্লিমেন্ট ছিল?”

হিমেল তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল, “তোমার মতো মানুষ আবার কমপ্লিমেন্টের আশাও করে?”

নওশীন জড়ানো কন্ঠে বলল, “তুমি আমাকে যতটা খারাপ মনে করো হিমেল, আমি কিন্তু আসলে ততটা খারাপ না। আমি খুব ভালো করেই জানি তুমি আমাকে সহ্য করতে পারো না। তবুও তোমার কাছে এসে বসেছি, গল্প করছি।”

“তুমি খারাপ সেটা বলছি না। তবে তুমি বোকা।”

“আমি বোকা?”

“অবশ্যই। বোকা না হলে কেউ সুপারস্টার আরশাদ হকের মন ভেঙে খালাতো ভাইয়ের সাথে রাত কাটায়?”

নওশীন অহংকারী ভঙ্গিতে বলল, “আমি কোনো দোষ করিনি হিমেল। ছোট্ট একটা ভুল করেছি। আমার ভুলের ক্ষমা না করে শাদ দোষ করেছে।”

“নিজেকে যে তুমি কী মনে করো! তোমার মতো নওশীন আরশাদের আশেপাশে মাছির মতো ঘুরে বেড়ায়।”

নওশীন থমথমে গলায় বলল, “তার মধ্যে থেকে এক মাছিকেই তো বিয়ে করলো।”

হিমেল জোর গলায় বলল, “আরশাদ অনেক ভালো মনের একটা মানুষ। তার হৃদয় তোমার মতো নোংরা না। আমি জানতাম তুমি কোনো না কোনোভাবে আরশাদের জীবনে ঢোকার চেষ্টা করবে। আবারও আরশাদকে হার্ট করবে। তাই আগেভাগেই অরার সঙ্গে ওর বিয়ের ব্যবস্থা করেছি। সমানে একটা ভালো সুযোগ পেয়েছিলাম বটে।”

নওশীন আগ্রহ নিয়ে বলল, “তুমি বিয়ের ব্যবস্থা করেছো মানে? ওই ভিডিও ভাইরাল হওয়ার আগেই না…”

“আরে না। ওই ভিডিওতে ওরা দুজনেই আনম্যারিড ছিল। মানুষ একের পর এক বাজে কথা বলে যাচ্ছে ইন্টারনেটে। আরশাদ আমাকে সিলেটে খবর দেয় একটা উপায় খুঁজে বের করে দেওয়ার জন্যে। আমি সঙ্গে সঙ্গে বলি অরাকে বিয়ে করতে।”

বিস্ময়ের সকল সীমা ছাড়িয়ে গেল নওশীনের। তার প্ল্যানের জন্যে বিরাট একটা ইনফরমেশন। এই ইনফরমেশন ব্যবহার করেই তো ব্ল্যাকমেইল করা যাবে অরাকে।

নওশীন আরও তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করলো, “তার মানে তোমার কারণেই বিয়েটা হয়েছে?”

“হ্যাঁ। আমার কারণেই ওদের বিয়েটা হয়েছে। অরা মেয়েটা ভালো। তোমার মতো ক্যারেক্টারলেস না। আরশাদকে আজীবন দেখে রাখবে। যদিও দুজনের মধ্যে দূরত্বটা কমেনি। এখনো আলাদা আলাদা ঘরে থাকে। তবুও, এই দূরত্ব শিঘ্রই ঘুঁচে যাবে। তুমি চাইলেও আরশাদ হকের জীবনে নিজের জায়গাটা ফিরে পাবে না।”

ড্রাংক অবস্থায় হিমলে তাকে তথ্যগুলো দিয়েছিল সেগুলো সে যত্ন করে সাজিয়ে রেখেছিল মস্তিষ্কের গভীরতর স্তরে। প্রয়োজন মতো এদের ব্যবহার করবে বলে। শেষ পর্যন্ত করলোও তাই। এই ইনফরমেশনগুলো দিয়েই তো শেষমেশ সাবের ব্ল্যাকমেইল করলো অরাকে।

তবে নওশীনের সাজানো প্ল্যানে ছোট্ট একটা গন্ডগোল হয়ে গেছে। গন্ডগোল যে কী, সে নিজেও এখনো ধরতে পারেনি। সে ভেবেছিল আরশাদ পরিস্থিতির চাপে পড়ে অরাকে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছে। তার মানে নির্ঘাত তাদের মধ্যে এখনো ওই বস-ম্যানেজারের সম্পর্ক। সে বুঝতে পারেনি, এই কয়েক মাসে তারা এতটা কাছকাছি চলে আসবে। আরশাদের হৃদয়ের মরুভূমিতে ভালোবাসার নতুন ফুল ফুটবে। নওশীনের ধারণা ছিল অরা কিডন্যাপ হলেও আরশাদ তা গায়ে মাখবে না। ভালোবাসার টানে সে যে অরাকে খুঁজে বের করতে এতটা মরিয়া হয়ে উঠবে, এটা সে বুঝতে পারেনি।

অরাকে আবারও ক্লোরোফর্ম দিয়ে অজ্ঞান করে নওশীনের বলে দেওয়া জায়গাটায় নিয়ে এলো সাবের। জায়গাটা দেখেই তার মন ভালো হয়ে গেল। গহীন জঙ্গলের মাঝে ছোট্ট একটা কাঠের ঘর। পুলিশের পক্ষে এই জায়গাটা খুঁজে পাওয়া একেবারেই অসম্ভব। যদিও ঘরের অবস্থা খুব একটা সুবিধার নয়। একাংশের কাঠ বৃষ্টির পানিতে পচে গেছে। আরেক পাশে আবার শ্যাওলা জন্মেছে। অরার হাত-পা আবারও একটা চেয়ারের সঙ্গে বেঁধে দিলো সাবের। অচেতন অবস্থায় ধীর গতিতে তার শ্বাস-প্রশ্বাস ওঠানামা করছে।

অরাকে এভাবে নিজের কাছে বন্দী দেখে একপ্রকার পৈশাচিক আনন্দ হচ্ছে সাবেরের মাঝে। এত বড় সাহস মেয়েটার, পুরো ক্যাম্পাসের সামনে তাকে অপমান করা। এবার সে বুঝবে, সাবের কী জিনিস! বাকিটা জীবন ঠিক এভাবেই তার কাছে বন্দী হয়ে থাকতে হবে অরাকে। সাবের যেভাবে চাইবে, ঠিক সেভাবেই ব্যবহার করবে অরাকে।

অরার জ্ঞান ফিরলো সন্ধ্যার দিকে। চব্বিশ ঘন্টারও বেশি সময় ধরে সে সাবেরের কাছে বন্দী। নাইলনের দড়ি দিয়ে দিয়ে শক্ত করে তার হাত-পা বেঁধে রাখায় প্রচন্ড যন্ত্রণা হচ্ছে। মাথায়ও প্রচুর যন্ত্রণা হচ্ছে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শ্বাস-কষ্ট। চব্বিশ ঘন্টায় কিছুই পেটে পড়েনি। বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছে অরা। সে বুঝতে পারছে আগে সে যে ঘরটায় ছিল, সেখান থেকে তাকে অন্য কোথাও নিয়ে আসা হয়েছে।

অরা হাত-পা ছোড়াছুড়ি করে সে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করছে বাঁধনগুলো থেকে। তবে কিছুতেই পারছে না। অরার দুচোখ বেয়ে টপটপ করে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো। সে কি কোনোদিনও মুক্তি পাবে না এখান থেকে? কী করে বাঁচাবে সে নিজেকে? আরশাদ কোথায়? খুব তো বড় গলায় বলেছিল, ভালোবাসি। এখন যখন তার ভালোবাসা এত বড় বিপদের সম্মুখীন হয়েছে, তখন সে কেন আসছে না তাকে বাঁচাতে।

আচমকা কারও পায়ের শব্দ পেয়ে জড়সড় হয়ে বসে রইল অরা। সাবেরের সামনে তাকে শক্ত থাকতে হবে। কিছুতেই তাকে বুঝতে দেওয়া যাবে না অরা দুর্বল হয়ে পড়েছে।

সাবের কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল অরার সামনে। লোলুপ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে যাচ্ছে তার দিকে অনবরত। এই দৃষ্টিতে ঘৃণা ধরে গেল অরার। কেউ তার দিকে এমন নজরে তাকাবে স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি কোনোদিন।

সাবের মুগ্ধ দৃষ্টিতে বলল, “অরা? তুমি এত সুন্দর কেন বলো তো? তোমাকে এক পলক দেখার জন্যেই তো যে কেউ জান দিয়ে দিতে পারে।”

অরা দৃঢ় কন্ঠে কিছু একটা বলতে যেয়েও ব্যর্থ হলো। তার মুখের ওপরে এখনো স্কচটেপ অনড় অবস্থায় রয়েছে।

সাবের বলল, “কী কথা বলবে?”

সাবের এগিয়ে এসে অরার মুখ থেকে সরিয়ে দিলো স্কচটেপটা।

অরা ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলে উঠলো, “তুমি কী চাও সাবের?”

সাবের বাঁকা হাসি হেসে বলল, “বলেছি তো। তোমাকে চাই।”

অরা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল, “তুমি তো সারাজীবনই লোভী। আমার সাথে প্রেমের অভিনয় করতে চেয়েছিলে ভালো চাকরির লোভে। এখন আবার কীসের লোভে ধরে এনেছ? টাকা-পয়সার লোভে?”

“আমার ভালোবাসাকে এত আন্ডারএস্টিমেট কোরো না সুইটহার্ট।”

অরা অবিশ্বাসের সুরে বলল, “ভালোবাসা? তুমি?”

“এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না আমাকে? বিশ্বাস করার অভ্যাস করে নাও সুইটহার্ট। বাকিটা জীবন তো আমার সাথেই কাটাতে হবে।”

অরা অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সাবেরের দিকে। সারাজীবন তার সঙ্গে কাটাতে হবে মনে কী? মতলব কী এই ছেলের?

সাবের পকেট থেকে দুটো পাসপোর্ট বের করে অরাকে দেখিয়ে বলল, “এই দেখো! এই পাসপোর্ট অনুযায়ী তোমার নাম শেফা আর আমার নাম সাফায়েত। এখন থেকে এই নামগুলোতেই অভ্যস্ত হয়ে যাও অরা। আরশাদ হকের দেওয়া নাম দিয়ে আমার বউ ঘুরবে, এটা তো হতে পারে না। এই নকল পাসপোর্ট নিয়ে তোমাকে নিয়ে অনেক দূরে চলে যাবো আমি। যত দূরে গেলে সুপারস্টার সাহেব আর কোনোদিন তোমাকে খুঁজে পাবে না, ঠিক তত দূরে।”

অরা বিড়বিড় করে বলল, “You bastard!”

সাবের হো হো করে হাসতে হাসতে বলল, “এই বাস্টার্ডের সাথেই তো শেষমেশ ওয়ার্ড ট্যুরে যেতে হবে ডার্লিং।”

অরা তীক্ষ্ণ স্বরে বলল, “এসব বিশ্রী নামে আমাকে ডাকা বন্ধ করো সাবের। ভালো হবে না কিন্তু!”

সাবের অরার দিকে ঝুঁকে এসে বলল, “কী করবে তুমি?”

অরা চুপ করে রইল।

সাবের আবারও তার নোংরা হাসিটা হেসে বলল, “কিচ্ছু করতে পারবে না। তোমার তো হাত-পা বাঁধা। আমি কী করতে পারি দেখবে?”

সাবের এগিয়ে আসছে অরার দিকে। তার দৃষ্টি অরার ঠোঁটের দিকে আবদ্ধ। একটু একটু করে অগ্রসর হচ্ছে অরার ঠোঁটের দিকে। অরা হৃদস্পন্দন এক লাফে কয়েকগুণ বেড়ে গেল। কী করবে সে এখন? সে তো মনেপ্রাণে কেবল আরশাদেরই। আরশাদ ছাড়া কারো স্পর্শ সে কল্পনাও করতে পারে না। সাবেরের স্পর্শ পাওয়ার থেকে নিশ্চিত মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে নেওয়াও ভালো।

আচমকা একটা বুদ্ধি এলো অরার মাথায়। সাবের তার হাত-পা বেঁধে রেখেছে তো কী হয়েছে? মুখটা তো খোলাই রেখেছে। সাবের চোখদুটো বন্ধ করে অরার ঠোঁটের খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। অরা আর এক মুহুর্তও দেরি না করে একদলা থুতু ছুঁড়ে মারলো সাবেরের মুখের ওপরে।

সঙ্গে সঙ্গে ছিটকে দূরে সরে গেল সাবের। হতবিহ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল অরার দিকে। মেয়েরা না-কি অসহায় হয়। কই! এই মেয়েটার মধ্যে তো অসহায়ত্বের কোনো ভাবলক্ষণই প্রকাশ পাচ্ছে না।

চব্বিশ ঘন্টা পার হয়ে গেল অরার কোনো খোঁজ নেই। আরশাদের চিন্তা-চেতনা আর স্বাভাবিক পর্যায়ে নেই। নিজেকে প্রচন্ড ব্যর্থ বলে মনে হচ্ছে। সে অরার জন্যে পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে পারেনি। অরা নিখোঁজ থাকার এতগুলো ঘন্টা পাড় হয়ে গেলেও সে তাকে খুঁজে বের করতে ব্যর্থ। সব দোষ তার নিজের। নিজের প্রতিই ঘৃণা ধরে যাচ্ছে আরশাদের।

তীব্র রাগে আরশাদ সজোড়ে একটা ঘুষি মারলো দেয়ালে। হাত ফেটে গড়িয়ে গড়িয়ে রক্ত পড়েছে। সেদিকে তার বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। তার সকল চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু কেবলই অরা। চোখের সামনে কেবল তারই মুখটা দেখতে পাচ্ছে সে। না জানি কোন অবস্থায় আছে অরা? ওই সাবের নামের ছেলেটা কি তাকে টর্চার করছে? অরার কি কষ্ট হচ্ছে।

একরাশ উদ্বেগ নিয়ে আরশাদ আবারও ঘুষি মারলো দেয়ালে। সাদা দেয়াল রক্তের লালে রঙিন হয়ে উঠলো। আবারও দ্বিগুণ বেগে আরশাদের হাত বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে রক্ত। ব্যথায়-যন্ত্রণায় টনটন করছে হাতটা। তবুও আরশাদ ব্যথা নিবারণের কোনপ্রকার চেষ্টা করলো না। এর থেকেও না জানি কতটা প্রখর যন্ত্রণা সহ্য করছে অরা।

এই পৃথিবীটাকে আর সহ্য হচ্ছে না। প্যারারাল ইউনিভার্স বলে যদি সত্যিই কিছু তাকে, তবে ছুটে চলে যেতে ইচ্ছা করছে ভিন্ন একটা দুনিয়ায়। এমন একটা পৃথিবীতে যেখানে আর কেউ থাকবে না। কেবল থাকবে আরশাদ এবং অরা। তারা হাতে হাত রেখে ঘুরে বেড়াবে অনিন্দ্য সুন্দর প্রকৃতির মাঝে। প্রাকৃতিক একেকটা নির্দশন দেখে অরা একটু পর পর চমকে উঠবে, আর তার বিম্ময়মাখা মুখটা দেখে বারবার মুগ্ধ হবে আরশাদ।

সেই পৃথিবীতে প্রতিদিনই আকাশটা ঝলমল করবে পূর্ণিমার চাঁদের আলোয়। প্রতি রাতে দুজনে জোসনা বিলাস করবে। অরা উচ্ছ্বসিত হয়ে নিজের একেকটা সিক্রেট জমা করবে আরশাদের মনের বাক্সে।

আনমনেই আরশাদের চোখ গেল অরার দেওয়া জন্মদিনের উপহারের দিকে।‌ Jar of secrects.

“আমি যখন আপনার আশেপাশে থাকবো না, কিন্তু আপনার খুব সিক্রেট শুনতে ইচ্ছা হবে – শুধু তখনই এখান থেকে একটা চিরকুট নিয়ে পড়বেন। এর আগে না।”

অরার কথাগুলো যেন স্পষ্ট নিজের কানে শুনতে পাচ্ছে আরশাদ। অরা কথা অনুযায়ী এখনো একটাও চিরকুট খুলে দেখেনি আরশাদ। কখনো প্রয়োজন পড়েনি বলেই হয়তো দেখেনি। সিক্রেট শুনতে ইচ্ছা হলে তো যখন তখন অরার কাছ থেকেই শোনা যেত। আজ তো আর সে উপায় নেই। খুব ইচ্ছা হচ্ছে আজ অরার নতুন আরেকটা সিক্রেটকে আপন করে নিতে। আরশাদ কোনোদিন ভাবতেও পারেনি এমন একটা পরিস্থিতিতে প্রথম চিরকুটটা খুলবে সে।

জার খুলে একটা ভাঁজ করা চিরকুট হাতে নিলো আরশাদ। শান্ত ভঙ্গিতে চিরকুটের ভাঁজ খুলতেই রীতিমত হকচকিয়ে গেল সে। অরা গোটা গোটা মুক্তার মতো হাতের লেখায় লিখেছে, “আমি আপনাকে ভালোবাসি।”

বিস্ময়ের চূড়ায় পৌঁছে আরশাদ দ্রুত হাতে আরেকটা চিরকুট খুলল। সেখানেও ঠিক একই কথা লেখা। তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম – একে একে সবগুলো চিরকুট খুলে ফেলল অরা। অসংখ্যবার এই একই কথা লিখে গেছে অরা। তার মানে অরাও ঠিক তার মতো করেই ভালোবাসে তাকে? এমনকি আরশাদের আগে ভালোবাসার প্রকাশটা করেছিল সে-ই?

নোনা জল টলমল করছে আরশাদের চোখদুটোতে। গড়িয়ে পড়ার ঠিক আগ মুহূর্তেই চোখদুটো বুজে তাদের আটকে দিলো আরশাদ। নাহ্! ভেঙে পড়া যাবে না। অরা তাকে যেমন ভালোবাসে, তেমনই নির্ঘাত ভরসা করে। অরার ভরসা কিছুতেই ভাঙতে পারে না আরশাদ। তাকে যে কোনো মূল্যেই হোক খুঁজে বের করতে হবে অরাকে। এই মেয়েটাই তো আর অন্ধকার জীবনটাকে আলোকিত করেছে।

(চলবে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here