চন্দ্রকলা #লামিয়া_ইসলাম #পর্ব_১১

0
607

#চন্দ্রকলা
#লামিয়া_ইসলাম
#পর্ব_১১

-মা রে তুই কোথায় চইল্লা গেছিলি আমি কাইল থিক্কা তোরে খুজতাসি।

-কই মা। অনিমা তোহ কালকে থেকেই নিখোঁজ। তুমি তো কোনো খবর পাঠালে না যে ও এইখানে আসে কিনা তা জানতে।

-এই শোন্ তুই চুপ থাক। আমি অনিমারে নিতে আইছি।

-না। আমি যাবো না।

-না মা এরকম কয় না।আমি তোমার জন্য রাজপুত্র খুইজ্জা আনছি। সামনের শুক্রবার হের লগে তোমার বিয়া। তুমি জমিদার বাড়ির বৌ না হও কিন্তু মহাজন বাড়ির বউ হবা।

শেষক্ত কথাটি রাহেলা বানু চন্দ্রকে ঠেস মেরে বললো। কিন্তু মহাজন বাড়ির নাম শুনে চন্দ্র চমকে উঠে বললো,

-তুমি কার সাথে ওর বিয়ে ঠিকই করেছো মা।

-আরেহ বুঝছিস আমার হইসে রাজ কপাল। তুই ওগো ভালা চাস না তো কি হইসে আমার দুই মাইয়ার লগে মহাজন বাড়ির দুই পোলার বিয়া ঠিক করছি।

-রিমার সাথে না লোকমান মিয়ার বিয়ে ঠিক করসো। কিন্তু অনিমার সাথে তুমি কার বিয়ে দেবে।

-আরেহ ওই লোকমানের ছোডো ভাই আছে না জামাল ওর লগে।

জামালের নাম শুনেই অনিমা যেন আরো ভয়ে কুঁকড়ে গেলো। ইতিমধ্যে জমিদার বাড়ির বাকি সদস্য এসেও এখানে উপস্থিত হয়েছে। অনিমার সাথে জামালের বিয়ের ব্যাপারে শুনে সাফোয়ান ক্ষিপ্ত হয়ে বললো,

-আপনি তো ওই জামালের কোথায় বলছেন। যে বিয়ের তিন মাসের মধ্যেই নিজের বৌকে মেরে ফেলেছে।

-আরেহ কি যে কোন আপনি জামাই। অইয়া তো শুনা কথা। ওই মাইয়াডাই তো রোগা ছিল।হেইর লইগ্গাই তো মরছে।

-শুনা কথা না এটাই সত্যি। ওর সাথে বিয়ে দিলে ও তো অনিমাকেও এভাবে মেরে ফেলতে পারে।

-আরেহ আমার লগে জামালের মার কথা হইছে। জামাল বড়ো ভালা পোলা। ওই বয়সের কারণে একটু বিগড়াইয়া গেছে। ঘরে বৌ আইলে শুধরাইয়া যাইবো। আর আপনি আমার বড়ো মাইয়ার জামাই আমার বাকি দুই মাইয়ার ভালো মন্দ তো আমিই দেখমু।

-অবশ্যই আছে। আমি এই গ্রামের জমিদার। আর এই গ্রামের লোকের ভালো মন্দ দেখাও আমার দায়িত্ব। আর অনিমাও এই বিয়েতে রাজি না।আর এখন থেকে অনিমা এই বাড়িতেই থাকবে।

সাফোয়ানের দৃঢ় কণ্ঠে বলা কথাগুলো শুনে রাহেলা বেগম কিছুটা দমে গেলেও আবার বলতে লাগলো।

-কি পরিচয়ে এই বাড়িতে থাকবো। কেউ বইন জামাই বাড়ি এতদিন থাকে না। কোন পরিচয়ে থাকবো তুমি কও।

– তা যে পরিচয়ে থাকার থাকবে। তা নিয়ে আপনার ভাবতে হবে। যে মা তার মেয়েকে ঐভাবে আঘাত করে ভর সন্ধ্যা বেলা বাড়ি থেকে বের করে দিতে পারে সে কত দায়িত্বশীল মা তা আমার বোঝা হয়ে গেছে।

-এইভাবে কইলে তোহ অইবো না । আমরা একটা সমাজের ভিতরে পরি। শেষে গ্রামের মানুষ তোহ কইবো জোয়ান মাইয়া মানুষ কোনো পরিচয় ছাড়া এইহানে থাহে। এত কদর করে ওরে জমিদার পরিবার কোনো সম্পর্ক ছাড়াই।তাইলে কি ওয় জমিদারের ভাইয়েগো রক্ষি*তা হইসে নাকি। হেইর লইগ্গাই কি ওর এত কদর।

নিজের মেয়েকে নিয়ে কেউ এত বাজে ভাষা বলতে পারে বলে তাঁদের কারো ধারণা ছিল না । রাহেলা বানু কথাটি বলে শেষ করার আগেই সাফোয়ান হুঙ্কার দিয়ে চিৎকার করে উঠলো।

-একদম চুপ আপনি শুধুমাত্র চন্দ্রের মা বলে আপনাকে কিছু বলছি না। কোন সাহসে এই পরিবারের ছেলেদের নিয়ে এরকম ভাষা বলেছেন। আমি সাফোয়ান চৌধুরী আজ এখানে দাঁড়িয়ে বলছি আমার ছোট এক ভাইয়ের সাথে অনিমার বিয়ে হবে।

অনিমার বিয়ে জমিদার বাড়িতে হবে শুনে রাহেলা এবার তার কথার ধরণ পাল্টালো। রাহেলা বললো,

-আপনি সত্যিই কথা কইতাসেন।

-হ্যা মা। জমিদার সাহেব যা বলে তাই করে। কিন্তু তুমি এখন থেকে এই বাড়িতে প্রবেশ তোমার জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

-এইসব তুই কি কইতাসোস। আমার মাইয়ার বিয়া আর আমি এই বাড়িতে আমু না।

-না মা তুমি আর আসবে না। আমি আর চন্দ্র আপা আজ থেকে তোমার সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করলাম।

তাঁদের কথা শুনে রাহেলা বানু ফোঁস ফোঁস করে রেগে কিছু বলতেই চাচ্ছিলেন ঠিক তখনি সাফোয়ানের ইশারায় দুইজন কাজের মহিলা এসে রাহেলা বানুকে টানতে টানতে জমিদার বাড়ির বাহিরে নিয়ে গেলো।

-সাহেদ আমি চাই তুই অনিমাকে বিয়ে কর।

-না ভাইয়া। এটা সম্ভব নয়।

-কেন?তুই আমার সিদ্ধান্তর অমান্য করছিস।

-না ভাইয়া আমি তোমাকে অসম্মান করতে চাচ্ছিনা। কিন্তু ভাইয়া আমি অনিমাকে বিয়ে করতে পারবো না। কারণ আমি অন্য কাউকে ভালোবাসি।

সাহেদ অন্য কাউকে ভালোবাসে শুনে পুরো বাড়ির সবাই যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেলো। সাহেদের অন্য কেউ বলতে যে সে সামিরাকে বুঝিয়েছে সেটা সামিরা বুঝতে পেরেছে। সে ভয় পাচ্ছে সাহেদ না সবার সামনে তার নাম বলে দেয়। তবে এই ব্যাপারটা আর বেশি দূর আগালো না। সাহেদ বিয়েতে রাজি না শুনে সাফোয়ান রেগে হনহন করে তার রুমের দিকে চলে গেলো। চন্দ্রও দৌড়ে তার পিছে পিছে গেলো।

-আপনি এত রেগে যাচ্ছেন কেন?

-রেগে যাবো নাতো কি করবো? ওর কত বড়ো সাহস ও আমার পছন্দ করা পাত্রীকে বিয়ে করতে রাজি হচ্ছে না। তার উপর বলছে অন্য কাউকে ভালোবাসে।

-দেখুন এখানে কিন্তু আপনি শুধু শুধু রাগ দেখাচ্ছেন। এখন যদি সাহেদ ও কাউকে ভালোবাসে এই কথাটা গোপন করে অনিমাকে বিয়ে করার জন্য রাজি হতো তা মোটেও ভালো হতো না। কারণ এতে তিন তিনটে জীবন নষ্ট হতো। এতে অনিমার জীবন আরো দুর্ভিসহ হয়ে উঠতো।

চন্দ্রের বলা কথাগুলো শুনে সাফোয়ান কিছুটা ঠান্ডা হলো। সে ভেবে দেখলো যে আসলে তো সত্যিই সাহেদের সাথে অনিমার বিয়ে হলে হিতে বিপরীত হয়ে যেত। তাই সে বললো,

-তুমি এখন এইখান থেকে যাও। আমাকে একটু চিন্তা করতে দেও। দরকার পড়লে তোমাকে ডেকে নেবো।

চন্দ্রও সাফোয়ানের মানসিক অবস্থা বুঝতে পেরে আর কথা বাড়ালো না। তাই সে ও চুপচাপ রুম থেকে বের হয়ে গেলো।

-ভাইয়া এটা কেমন কথা মেজো ভাইয়া রাজি হচ্ছে না দেখে আমাকে এখন অনিমাকে বিয়ে করতে বলছো?

-হ্যা। কেন তোর ও কি পছন্দের কেউ আছে?

-না ভাইয়া তা নেই। কিন্তু অনিমার সাথে আমাকে মানায় না।

-কেন? ওর পরিবার বাদে মেয়েটা তো সব দিক থেকেই ভালো।

-না না ভাইয়া। আমি ঐরকম ভাবে বলছি না। আমি জানি ও খুবই ভালো মেয়ে। কিন্তু আমাদের বয়সের পার্থক্য অনেক। আমার বয়স ২৩ আর ওর বয়স কেবল ১৬। প্রায় ৭ বছরের পার্থক্য। তার উপর আমার বা ওর কারোই এখনো বিয়ের বয়স হয়নি। আর আমার এখন আমার ক্যারিয়ার গড়ার সময়।

-তো কি হয়েছে? চন্দ্র আর আমার বয়সের পার্থক্যও তো প্রায় ১০ বছরের। আর তোর ক্যারিয়ার তুই গড়বি। এতে আর এমন কি সমস্যা। এখনি তো আর আমি তোকে অনিমার দায়িত্ব নিতে বলিনি। তুই ও সাহেদের মতো আমাকে ফিরাস না।

-ঠিক আছে ভাইয়া। আমি অনিমাকে বিয়ে করবো তবে আমার কিছু শর্ত আছে।

-কি শর্ত?

-প্রথম শর্ত আমাদের বিয়ের ব্যাপারে আমার ফ্রেন্ড সার্কেল বা ইউনিভার্সিটির কাউকে জানাতে পারবে না। দ্বিতীয় শর্ত আমি এখনি ওর কোনো দায়িত্ব নিতে পারবো না। তৃতীয়ত এখন শুধু ঘরোয়া ভাবে বিয়ে হবে। আমি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে ধুমধাম করে বিয়ে হবে।

অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সাহিলের দেয়া এসব শর্তে সাফোয়ানকে রাজি হতে হলো। বাড়ির বাকি সবাইকে জানানোর পর তারাও এই বিয়েতে মত দিলো।

-আপা আমি এই বিয়ে করবো না?

-কেন?

-আপা আমি একজন সাধারণ মেয়ে। আমি কি আর জমিদার বাড়ির বউ হওয়ার যোগ্য।

-আমিও তো সাধারণ। আমিও তো এই বাড়ির বউ হয়েছি। আর এই বাড়ির মানুষ গুলো অনেক ভালো। তুই সাহিলের সাথে সুখে থাকবি। তোকে ওর সাথে বিয়ে না দিলে মা তোকে নিয়ে ওই জামালের সাথে বিয়ে দিয়ে দিবে।

-তুই কি তা চাস?

-না না। আমি বিয়ে করবো।

চন্দ্রর মুখে জামালের নাম শুনেই অনিমা ভয়ে কুঁকড়ে গেলো। চন্দ্র বুঝতে পারলো না অনিমা এরকম কেন করলো। সে তাকে কিছু জিজ্ঞেস করতেই যাবে ঠিক তখনি সাফোয়াননের ডাক এলো। তাই সে তড়িঘড়ি করে সেখান থেকে বের হয়ে গেলো।

-আপনি আমাকে ডাকছিলেন।

-হ্যা। চন্দ্র আমি কাজী আনতে যাচ্ছি। তুমি অনিমাকে তৈরী করে রেখো।

-ঠিক আছে।

সেদিন সন্ধ্যার আগে থেকেই জমিদার বাড়িতে বিয়ের তোড়জোড় শুরু হয়ে গেলো। যতই ঘরোয়া ভাবে হোক এ যে জমিদার বাড়ির ছেলের বিয়ে একটু হই হুল্লোড় তো হবেই।

চন্দ্র অনিমাকে একটা লাল জামদানি পরিয়ে দিলো। সাথে কিছু হালকা গহনাও পরিয়ে দিলো। সেদিন গোধূলি লগ্নেই অনিমা আর সাহিলের বিয়ে হয়ে গেলো। সূচনা হলো তাঁদের জীবনের নতুন অধ্যায়ের।

চলবে….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here