#উধয়রনী
#লেখিকা_সামিয়া_বিনতে_হামিদ
||পর্ব-৩১||
৬২।
নিয়াজী তালুকদারের বাড়ির গেটের সামনে নামলো আফিফ। দারোয়ান তাকে দেখে জিজ্ঞেস করলো,
“ভাইজান, কেমন আছেন?”
আফিফ বলল,
“জ্বি ভালো। নিয়াজের সাথে দেখা করতে এসেছি।”
দারোয়ান গেট খুলে দিতেই আফিফ সোজা ভেতরে ঢুকে পড়লো। বাড়ির ভেতরে ঢুকেই সে উঁচু গলায় ডাকতে লাগলো নিয়াজকে।
নিয়াজী তালুকদার আফিফের চেয়েও বয়সে বড়। তবুও আফিফের এমন সম্বোধনে বাড়ির কেউই অবাক হলো না। নিয়াজী দৃপ্ত পদে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলেন। আফিফকে দেখে অদ্ভুত ভঙ্গিতে হাসলেন। আফিফ নিয়াজীর সামনে এসে বলল,
“আমার বোনের গায়ে হাত তোলার সাহস তোকে কে দিয়েছে?”
নিয়াজী ভাবলেশহীন সুরে বলল,
“তোরাই তো দিয়েছিস। বিয়ে করা বউ আমার। আমার যা ইচ্ছে করবো, ভালো না লাগলে রেখে দে।”
“রেখে তো দিবোই। রেনু আর এ বাড়িতে আসবে না।”
নিয়াজী অট্টহাসি হেসে বললেন,
“তোর বোনের কোনো যোগ্যতাও নেই এই বাড়িতে আসার৷ কখনো ছিলও না। ভাগ্য ভালো তোর বোনের। আমি বিয়ে করেছি বলেই সংসার চোখে দেখেছে। তোর বড় বোন যেই কীর্তি করেছে, তোদের দশ বংশের মেয়েকেও কেউ ঘরের বউ করে ঘরে তুলবে না।”
আফিফের হাত মুঠো হয়ে এলো নিয়াজের কথা শুনে। সে দাঁতে দাঁত চেপে নিয়াজের দিকে তাকিয়ে আছে। নিয়াজী বললেন,
“কে জানে সব দোষ গোড়ায় আছে কি-না। তোর তো বাবা নেই। কে বলতে পারে মারা গেছে, না-কি ছিলও না কখনো!”
আফিফ আর সহ্য করতে পারলো না। নিয়াজের কলার ধরে তাকে শরীরের সব শক্তি দিয়ে মারতে লাগলো। নিয়াজকে বাঁচানোর জন্য বাড়ির কাজের লোকরা আফিফকে সরানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু আফিফের এই রূপ যেন প্রথম দেখেছে তারা। আফিফকে দেখে বোঝার উপায় নেই, সে কারো গায়ে হাত তুলতে পারে। এদিকে নিয়াজীর বোন পরিস্থিতি দেখে রেনুকে ফোন করে সব জানালো। রেনু সব শুনে চিন্তায় পড়ে গেলো। সে মাকে কিছু না জানিয়ে পদ্মকে গিয়েই সব বললো। আফিফ আর নিয়াজের মারামারি লেগেছে এই কথাটা শুনেই পদ্মের অস্থিরতা আরো বেড়ে গেলো। সে তাড়াতাড়ি বোরকা পরে রেনুকে নিয়ে বেরিয়ে গেলো রেনুর শ্বশুড় বাড়ির উদ্দেশ্যে। পথে সে আবার আহিকে ফোন করলো। আহি তখন একটি বই হাতে নিয়ে বসেছিল মাত্র। বইটির নাম ইকিগাই। বইটিতে জাপানিজদের দীর্ঘজীবন লাভ এবং জীবনে সুখী হওয়ার বিষয় নিয়ে অনেক কথা বলা আছে। আহি পদ্মের কল দেখে বইটি একপাশে রেখে কলটা রিসিভ করে হ্যালো বলতেই পদ্মের কাঁদো কাঁদো কন্ঠ শুনে থমকে গেলো। পদ্ম কান্নাভেজা কন্ঠে বলল,
“আহি, প্লিজ আংকেলকে বল সাহায্য করতে।”
আহি ব্যস্ত কন্ঠে বললো,
“কাঁদছিস কেন? বাবা তো অফিসে। রাতে আসলেই বলতে পারবো।”
“আফিফ ওখানে গেছেন।”
“উনাকে ফোন করে বল চলে আসতে।”
“ফোন দিয়েছি। ধরছে না। রেনুর ননদ ফোন দিয়ে বললো, আফিফ আর নিয়াজের মারামারি লেগেছে। এখন উনার কিছু হয়ে গেলে?”
আহি ব্যস্ত কন্ঠে বললো,
“মারামারি লেগেছে মানে? ওয়েট কিচ্ছু হবে না আফিফের। আমি যাবো। এড্রেস দে আমাকে।”
“তুই যাবি আহি? তোর কথা শুনবে? তোকে চিনবে তো!”
আহি বুকে হাত দিয়ে বসে আছে। নিয়াজী তো তাকে চিনবেই না। কিন্তু তাজওয়ারকে চিনবে। এই মুহূর্তে তাজওয়ারই আহিকে সাহায্য করতে পারবে। আহি পদ্মকে বলল,
“আমি আসছি। তোর রেনুকে নিয়ে ওখানে যাওয়ার দরকার নেই। আমাকে শুধু এড্রেসটা দে। প্লিজ ওখানে যাবি না তোরা।”
আহি কল কেটে তাজওয়ারের নম্বরে ডায়াল করতে গিয়ে থেমে গেলো। এই নম্বরটা তাজওয়ারই জোর করে তার ফোনে সেইভ করিয়েছিল। আজ পর্যন্ত এই নম্বরে আহি নিজ থেকে কখনো কল দেয় নি। কিন্তু আজ তার প্রিয় মানুষটা বিপদে পড়েছে। আফিফের কিছু হয়ে গেলে আহি পাগল হয়ে যাবে। তাই সে বাধ্য হয়েই তাজওয়ারকে কল করলো।
(***)
স্ক্রিনে আহির নাম ভেসে উঠতেই তাজওয়ার রীতিমতো অবাক। সে ভ্রূ কুঁচকে কিছুক্ষণ নামটির দিকে তাকিয়ে রইলো। তার এসিস্ট্যান্ট সোহাগের দিকে ফোনটা তাক করে বলল,
“দেখ তো, কার কল এসেছে!”
সোহাগ মনোযোগ দিয়ে ফোনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“স্যার, আহি ম্যামের নাম দেখা যাচ্ছে।”
তাজওয়ার মৃদু হাসলো। ফোনের স্ক্রিনে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল,
“এখন যা, আমি একটু কথা বলি তোর ম্যামের সাথে।”
সোহাগ যেতে যেতেই কলটা কেটে গেলো। আহি কল কেটে যাওয়ায় বিরক্ত হয়ে একটা ওড়না গলায় ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়লো। গাড়ির কাছে আসতেই তাজওয়ার নিজেই কল করলো। আহি সাথে সাথেই কলটা রিসিভ করে বলল,
“তোমাকে একটা এড্রেস দিচ্ছি, তাড়াতাড়ি ওখানে আসো প্লিজ। এই মুহূর্তেই তোমাকে আসতে হবে। অনেক বড় বিপদে পড়েছি।”
তাজওয়ার আহিকে কিছু বলার আগেই আহি কল কেটে দিলো। এদিকে আহি গাড়িতে উঠেই তাজওয়ারকে সেই ঠিকানাটা পাঠিয়ে দিলো। তাজওয়ার ঠিকানা দেখে ভ্রূ কুঁচকে মনে মনে বলল,
“এই জায়গায় আহির কি কাজ!”
তাজওয়ার আবার আহিকে কল করলো। আহি রিসিভ করতেই তাজওয়ার বলল,
“নিয়াজীর বাড়ির এড্রেস কেন দিয়েছো আমাকে?”
“উনার সাথে বোঝাপড়া আছে আমার।”
“তুমি তাকে কীভাবে চিনো? তোমার সাথে তো তার বোঝাপড়া থাকার কথা না।”
“তুমি কি এখন আসবে?”
“আমি এখন দূরে আছি। আসবো তো অবশ্যই। তুমি বলেছো আর আমি আসবো না, সেটা তো হয় না। আমার আসতে প্রায় ঘন্টা খানেক লাগবে। যদি জ্যাম না পড়ে, তাহলে আধা ঘন্টায় পৌঁছে যাবো।”
আহি দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“এমনিতে তো অসময়ে মাথার উপর উঠে বসে মগজ খেয়ে ফেলো। এখন প্রয়োজনে তোমাকে পাওয়ায় যাচ্ছে না।”
আহি কল কেটে দিলো। মনে মনে একটাই প্রার্থনা করছে আফিফ যাতে সুস্থ থাকে। আহির গাড়ি দশ মিনিটের মধ্যে নিয়াজীর বাড়ির সামনে এসে থামলো। গাড়ি থেকে নেমেই আহি দারোয়ানকে বলল,
“প্লিজ, আমাকে ভেতরে যেতে দিন।”
“কাকে চান আপনি?”
“নিয়াজী তালুকদার আছেন না বাসায়?”
“জ্বি, স্যার তো আছেন।”
আহি অনেক দ্বিধা নিয়ে বলল,
“আমি রিজওয়ান কবিরের মেয়ে।”
আহি জানে না দারোয়ান তার বাবাকে চিনবে কি-না বা এতোটুকু তথ্যে তার জন্য গেট উন্মুক্ত করে দিবে কি-না। তাই সে চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে রইলো। এরপর দারোয়ান গেট খুলে নিজেই আহির সাথে ভেতরে ঢুকলো। নিচে থাকা একজন মহিলাকে বলল,
“নিয়াজী স্যারের সাথে দেখা করতে এসেছে।”
মহিলাটি বলল, “স্যার রুমে আরাম করছেন।”
আহি ব্যস্ত কন্ঠে বললো, “আফিফ কোথায়?”
মহিলাটি ভ্রূ কুঁচকাতেই আহি বলল,
“রেনুর ভাইয়ার কথা বলছি।”
মহিলাটি বলল, “আপনি তার কে হোন?”
আহি ক্ষণিকের জন্য থমকে গেলো। কাঁপা কন্ঠে বললো,
“আমার ফ্রেন্ডের হাসবেন্ড। ওকে নিতে এসেছি।”
মহিলাটি বাগানের দিকে ইশারা করে বলল,
“তাকে তো পুলিশে ধরিয়ে দেবে। আপতত বাগানে ফেলে রেখেছে। সে স্যারের গায়ে হাত তুলেছে।”
“আচ্ছা, আপনি আমাকে অন্তত তার সাথে দেখা করতে দিন।”
মহিলাটি আহিকে বাগানে যেতে বলল। আহি দৌঁড়ে সেখানে গিয়ে দেখলো আফিফ মাটিতে পড়ে আছে। আর তার পাশে একটা লোক লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আহি আফিফের কাছে গিয়ে দেখলো আফিফের শার্টে রক্তের দাগ। আহি তার কাঁপা হাতটি আফিফের দিকে এগিয়ে দিতে গিয়েই থেমে গেলো। সে ক্ষীণ কন্ঠে ডাকলো, “আফিফ।”
আফিফ চোখ খুলে আহিকে দেখে কাঁপা কন্ঠে বলল,
“তুমি এখানে?”
আহি নরম সুরে বলল, “উঠো।”
আফিফ উঠতে যাবে তখনই দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি লাঠি দিয়ে সজোরে আফিফের পিঠে আঘাত করলো। আফিফ আবার ঢলে পড়লো। আহি ব্যস্ত হয়ে আফিফকে জড়িয়ে ধরে লোকটির দিকে ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“তুমি কি মানুষ না-কি পশু?”
লোকটি মাথা নিচু করে বলল,
“স্যারের আদেশ। আপনি আটকালে আপনার গায়ে হাত তুলতে বাধ্য হবো। যতোক্ষণ সে স্যারের কাছে ক্ষমা চায়বে না, ততক্ষণ তাকে এই শাস্তি দেওয়া হবে।”
আহি আফিফকে উঠিয়ে বসালে। এরপর লোকটির সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
“তোমার স্যার কোথাওকার রাজা, যে তার কথায় সবাইকে উঠবস করতে হবে? ডাকো তোমার স্যারকে। আমিও তার গালে কয়েকটা লাগিয়ে দেই।”
আফিফ আহিকে থামানোর জন্য উঠতে গিয়ে ব্যথায় কুঁকড়ে উঠলো। আহি আফিফের গোঙানোর শব্দ শুনে তার কাছে এসে বসলো। আফিফ বলল,
“কেন এসেছো এখানে? কে বলেছে আসতে?”
আহির চোখে অশ্রু ভীড় করলো। আফিফের কথা বলতেও কষ্ট হচ্ছে। মুখে রক্ত জমাট বেঁধে গেছে। আহি বলল,
“কথা বলো না তো। তোমার কষ্ট হচ্ছে। আর আমাকে পদ্ম বলেছিল আসতে। ও তোমার চিন্তায় অস্থির হয়ে যাচ্ছে। তোমাকে সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরতে হবে। আমি তোমাকে নিতে এসেছি।”
কথাগুলো বলতে বলতেই আহির চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। আফিফ দুর্বল দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালো আর কাঁপা কন্ঠে বলল,
“তুমি কাঁদছো কেন? আমাকে তো নিঃস্ব করে দিয়েছো তুমি। তোমার ভালোবাসা আমাকে আর আমার পরিবারকে শেষ করে দিয়েছে।”
আহি ভ্রূ কুঁচকে আফিফের দিকে তাকিয়ে বলল,
“কি বলছো তুমি, আফিফ!”
আফিফ মলিন মুখে বললো,
“আহি প্লিজ, তুমি যা ইচ্ছে করো। অন্তত আমার থেকে দূরত্ব রাখো। প্লিজ।”
“আমি তোমার কাছে এসেছি কখন? দূরেই তো ছিলাম। আর তুমি বলতে চাইছো, এসব আমার কারণে হয়েছে? সিরিয়াসলি আফিফ?”
আফিফ সেকেন্ড খানিক চুপ থেকে ম্রিয়মান কন্ঠে বলল,
“খুনী যখন নিজেই জানে না সে খুনী তাহলে কি তার উপর আরোপ লাগানো যায়? আমার অবস্থাটাও এমন। সব তোমার কারণেই হয়েছে, আহি। তুমিই আমার জীবনটা এলোমেলো করে দিয়েছো। অথচ আমি তোমাকে ঘৃণা করতে পারছি না। তোমার উপর রাগ দেখাতে পারছি না। কিন্তু আমার উচিত তোমাকে ঘৃণা করা।”
আহি আফিফের হাত ধরে বলল,
“আমি তোমার কাছে কোনো আবদার রাখি নি। তাহলে আমার অপরাধটা কোথায়?”
“আবদার করো নি, এতেই এই অবস্থা। আবদার করলে তো আমার অস্তিত্বই থাকতো না।”
“ঘুরিয়ে প্যাঁচিয়ে কথা বলছো কেন? সোজাসুজি বলো কি হয়েছে?”
“এখন এসব বলে লাভ নেই। শুধু এতোটুকু জেনে রেখো, তোমার ভালোবাসা আমাকে ডুবিয়ে দিয়েছে। আমার আপার মৃত্যু, আমার ছোট বোনের সাথে যা হয়েছে সবকিছুর জন্য তুমি অনেকাংশে দায়ী। তোমার জন্য হয়েছে সব, আহি। আমি আর পারছি না এসব যন্ত্রণা নিতে। কেউ হয়তো আমার কষ্টটা বুঝবে না। তখন বুঝতো যখন তার প্রিয় মানুষটা তার চোখের সামনে মারা যেতো। তখন বুঝতো, যখন সে জানতে পারতো, সেই মৃত্যুটা তারই কোনো এক ভুলের কারণে হয়েছে। এরপর তো তার জন্য বেঁচে থাকাটায় কষ্টকর হয়ে যাবে, তাও না? কিন্তু তবুও তাকে বাঁচতে হবে। তার ক্ষমতা থাকবে না সেই অন্যায়ের শাস্তি দেওয়ার, অথচ সে রাত-দিন নিজের অক্ষমতায় ধুঁকে ধুঁকে মরবে। আর তখনই সে আমার কষ্টটা বুঝতে পারবে।”
আফিফ কথাগুলো বলেই ফুঁপিয়ে উঠলো। এদিকে তাজওয়ার গাড়ি থেকে নামতেই দেখলো আহির গাড়ি গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। ততক্ষণে তাজওয়ারকে দেখে দারোয়ান গেট খুলে দিয়েছে। সে দৌঁড়ে ভেতরে ঢুকে বলল,
“নিয়াজ কোথায়!”
তাজওয়ারকে দেখে একজন নিয়াজীকে ডাকতে গেলো। আর তাজওয়ার এদিক-ওদিক আহিকে খুঁজতে লাগলো। নিয়াজ কয়েক মিনিটের মধ্যে নিচে নামতেই তাজওয়ার ভ্রূ কুঁচকে বললো,
“আহি কোথায়?”
নিয়াজ বললেন,
“তাজওয়ার ভাই, আপনি হঠাৎ! আর আপনি কার কথা বলছেন?”
“তোমার সাথে দেখা করতে কোনো মেয়ে আসে নি?”
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মহিলা কর্মচারী তাজওয়ারকে বলল,
“সে বাগানের দিকে গেছে।”
তাজওয়ার দ্রুত পায়ে সেদিকে গিয়ে দেখলো আহি একটা ছেলের পাশে বসে আছে। তাজওয়ার সেখানে গিয়ে দেখলো, ছেলেটা আফিফ। আফিফ তাজওয়ারকে দেখে উঠে দাঁড়াতেই ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যেতে নেবে তখনই আহি তাকে ধরে ফেলল। আফিফ একনজর আহির দিকে তাকিয়ে আবার তাজওয়ারের দিকে তাকালো। তাজওয়ারের মুখটা রাগে লাল হয়ে আছে। আফিফ তা দেখে আহির কাছ থেকে সরে দাঁড়ালো। তাজওয়ার আহির হাত ধরে তাকে টেনে নিজের কাছে এনে বলল,
“তুমি এসবের জন্য আমাকে ডেকেছো?”
“হ্যাঁ, নিয়াজী তালুকদার তোমার পরিচিত৷ তাই তোমাকে আসতে বলেছিলাম।”
তাজওয়ার চেঁচিয়ে বলল,
“তোমার জন্য আমি শহরের এক প্রান্ত থেকে দৌঁড়ে এসেছি, আর এসে দেখলাম তুমি এই ভিখারির বাচ্চার জন্য আমাকে ডেকেছো!”
আহি রাগী দৃষ্টিতে তাজওয়ারের দিকে তাকালো। আফিফ মলিন মুখে অন্যদিকে ঘুরে দাঁড়ালো। তার চোখে অশ্রু টলমল করছে। ক্ষমতার অভাবে আজ সে কতো কথা শুনছে। তার মায়ের চরিত্রে আঙ্গুল তুলেছে, তার বোনকে পেটানো হয়েছে, আর সে প্রতিবাদ করতে এসে নিজেই মার খেয়ে বসে আছে। এবার আহি বুকে হাত গুঁজে তাজওয়ারকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আমি আমার ফ্রেন্ডের জন্য এখানে এসেছি। আফিফ পদ্মের হাসবেন্ড। তোমাকে এর বিহিত করতেই হবে৷ আফিফের বোনকে মেরেছে ওই নিয়াজী তালুকদার। একটা নারীর সাথে অন্যায় হয়েছে। আমি এখানে একটা মেয়ের জন্য এসেছি।”
তাজওয়ার আফিফের দিকে তাকিয়ে বলল,
“সিরিয়াসলি! সমাজে হতভাগা নারীর অভাব নেই। তুমি বললে, আমি তোমাকে খুঁজে এনে দেবো। ওদের জন্য তোমার যা করার করো। আমি পাশে থাকবো। অন্তত এই কথা বলো না যে তুমি এর বোনের জন্য এসেছো। কারণ আমি ভালো করেই জানি, তুমি ঠিক কার জন্য এসেছো।”
আফিফ দুর্বল দৃষ্টিতে তাজওয়ারের দিকে তাকালো। আহি আফিফের দিকে তাকিয়ে বলল,
“হ্যাঁ, আমি আফিফের জন্যই এসেছি।”
আহি এবার তাজওয়ারের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তো এখন কি করবে তুমি? আমার যার জন্য ইচ্ছে হয় আমি আসবো। তোমার কি? তুমি বরং চলে যাও। এন্ড সরি, তোমাকে টেনে শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে এনেছি।”
আহি কথাটি বলেই সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটির হাত থেকে লাঠি টেনে নিয়ে বলল,
“ঠিক যতোটা দাগ রেনুর শরীরে পড়েছে, ঠিক যতোটা আঘাত আফিফকে দেওয়া হয়েছে, সুদেআসলে মিটিয়ে দেবো আমি। এটা আমি করবো তাজওয়ার খান। তোমার যদি জ্বলে, পুড়ে, ছাই হয়ে যেতে ইচ্ছে হয়, তাহলে শুভকামনা রইলো।”
আহি এই কথা বলে হনহনিয়ে নিয়াজের বাড়ির দিকে গেলো। নিয়াজ তাজওয়ারের অপেক্ষায় বারান্দার সোফায় বসেছিল। আহি নিয়াজকে দেখেই বলল,
“তুমি নিয়াজী তালুকদার, রাইট?”
নিয়াজী তালুকদার চমকে বলে উঠলেন, “হ্যাঁ।”
আহি ঠাস করে নিয়াজীর গালে চড় মেরে বলল,
“জ্বলছে খুব? একটা মেয়ের চামড়ায়ও একই পীড়া হয়। তোমার শক্তি তো আরো বেশি হওয়ার কথা। ধরে নাও এর চেয়ে দ্বিগুণ হয়েছে।”
নিয়াজী সোজা হয়ে দাঁড়ানোর আগে আহি তার পেটে লাথি মেরে তাকে মেঝেতে ফেলে দিলো আর বলল,
“খেয়ে খেয়ে শরীরে চর্বি বাড়িয়ে একটা মেয়ের গায়ে হাত তুলতে লজ্জা করে না? কাপুরুষ লোক।”
আহি লাঠি দিয়ে আঘাত করতে যাবে তার আগেই নিয়াজের লোক এসে আহিকে ধরে ফেললো। আহি একনজর তাজওয়ারের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে বলে উঠলো,
“ডোন্ট টাচ মি।”
তাজওয়ার রেগেমেগে তেড়ে এসে লোকটাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো আর বলল,
“ডোন্ট টাচ হা’র। সি ইজ মা’ই লেডি।”
আহি এবার নিয়াজীর বুকের উপর পা রেখে বলল,
“পুরুষত্ব দেখাতে ইচ্ছে করলে উঠে আমার গায়ে হাত তোল।”
তাজওয়ার আহিকে সরিয়ে দিয়ে বলল,
“পাগলামো করছো কেন আহি?”
“তাহলে তুমি আমার হয়ে এই বদমাশ লোকের মুখটা লাল-নীল করে দাও। নয়তো আমিই এই কাজ করবো। আর যদি আমাকেই এই কাজ করতে হয় ভবিষ্যতে তোমাকে তো আমার বিশ্বাসই হবে না।”
তাজওয়ারের মাথায় রক্ত উঠে গেলো। সে আহির হাত থেকে লাঠি নিয়ে ইচ্ছেমতো নিয়াজকে পেটাতে লাগলো। আর আহি একপাশে দাঁড়িয়ে মনে মনে হাসছে। তাজওয়ারের মার খেলে রেনুর গায়ে ভবিষতে যে আর এই বাড়ির কেউ হাত তুলবে না, এই ব্যাপারে নিশ্চিত আহি।
এদিকে আফিফ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আহি একনজর আফিফের দিকে তাকালো। শরীর কাঁপছে আফিফের। সে পদ্মকে মেসেজ করে বলল,
“আফিফ ঠিক আছে, কিন্তু হাসপাতালে নিয়ে যাবো ওকে। একটু ব্যথা পেয়েছে। তুই চলে আসিস ওখানে। আমি তোকে এড্রেস লিখে দিবো একটু পর। আর চিন্তা করিস না। নিয়াজকে উচিত শিক্ষা দিয়েছি। এই জন্মে তো রেনুকে রানী হওয়া থেকে কেউ আটকাতে পারবে না। চট্টগ্রামের জুনিয়র ডন এসেই শায়েস্তা করছে বেটাকে।”
(***)
তাজওয়ার ঘেমে নেয়ে শেষ। নিয়াজকে ইচ্ছেমতো পিটিয়ে লাঠিটা ছুঁড়ে ফেলে দিলো সে। আহি নিয়াজের কাছে এসে তার মুখের উপর ঝুঁকে বলল,
“নেক্সট টাইম বউ পেটালে হাসপাতালের আইসিউতে পৌঁছে যাবে। আর যদি এই ব্যাপারে বাইরের কেউ জানে তোমাকে গুম করিয়ে দেবো।”
আহি এবার তাজওয়ারের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোমার বাবা তো আবার মানুষ গুম করতে পারদর্শী। তিনি নিজের হবু পুত্রবধূর নানাকে গুম করিয়ে ফেলেছেন। এই সামান্য মানুষটাকে পারবে না?”
তাজওয়ার ক্ষীণ কন্ঠে বললো, “আহি প্লিজ।”
“যদি আমার সাথে করা অন্যায়গুলোর এতো ভারী না হতো, আজ সত্যিই আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিতাম। কিন্তু তোমার বাবা তো আমার ছোটবেলা কেঁড়ে নিয়েছে। আজ আমার মা যদি আমার থেকে দূরে থাকে, তাহলে তোমার বাবার কারণে। আর তুমি সেই বাবার আদর্শ ছেলে।”
তাজওয়ার আর কিছু বললো না। আহি আফিফের কাছে এসে বলল,
“জানি না আমি তোমার এই অবস্থার জন্য কীভাবে দায়ী। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি কাউকে কষ্ট দিতে চাই না। তবুও মানুষ আমার কারণেই কষ্ট পাই। আমি নিজেও খুব একটা সুখী নই। অন্তত আমাকে ঘৃণা করো না। আমার ভালোবাসা গ্রহণ করার মতো ক্ষমতা তোমার ছিল না। ঘৃণা করার মতো মনও রেখো না৷ তোমার কাছ থেকে এর চেয়ে বেশি কিছু চাইবো না আমি।”
আহি নিয়াজের বাড়ি থেকে বের হয়ে ড্রাইভারকে কিছু টাকা ধরিয়ে দিয়ে বলল,
“আংকেল, আপনি প্লিজ উনাকে হাসপাতালে দিয়ে যান। যা খরচ হয়, এখান থেকেই করবেন।”
তাজওয়ার বের হয়ে আহির কাছে আসতেই আহি বলল,
“আমাকে নাসিরাবাদ নামিয়ে দিতে পারবে? আমার একটা কাজ আছে।”
তাজওয়ার আফিফের দিকে তাকালো। আহি বলল,
“ড্রাইভার আংকেল উনাকে হস্পিটালে নিয়ে যাবেন। আমি আমার ফ্রেন্ডকে মেসেজ দিয়ে জানিয়ে দিচ্ছি।”
তাজওয়ার আহির কথায় বেশ খুশি হলো। আহি যে আফিফের সাথে যাচ্ছে না, তার সাথে যাচ্ছে, এটাই তাজওয়ারের জন্য অনেক বেশি। যদিও আফিফ যেতে চাইছিলো না, কিন্তু আহি জোর করে আফিফকে গাড়িতে উঠালো। এরপর গাড়ির দরজা বন্ধ করে জানালার হাত রেখে বলল,
“পদ্ম আমাকে বলেছিল আপনার সাহায্য করার জন্য, তাই আপনাকে হস্পিটালে পৌঁছে দেওয়া আমার দায়িত্ব।”
আফিফ আহির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। জীবনটা আফিফকে এমন পর্যায়ে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, সে বুঝতেই পারছে না কি করবে। আহিকে কষ্ট দেওয়ার ইচ্ছে তার ছিল না। কিন্তু পরিস্থিতি তাকে বলতে বাধ্য করেছে।
(***)
আহি তাজওয়ারের গাড়িতে উঠে বসলো। নিজেই গাড়ির জানালা খুলে দিয়ে বলল,
“আমার দম বন্ধ লাগছে।”
তাজওয়ার আহির উড়ন্ত চুলগুলো ছুঁয়ে দিতে যাবে আহি তার হাত আটকে দিয়ে বলল,
“এই মুহূর্তে আমার এসব ভালো লাগছে না।”
তাজওয়ার আর কিছু বললো না। আহিকে ড্রাইভার নাসিরাবাদ নামিয়ে দিয়ে চলে গেলো। আহি রাস্তার মোড়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো। এই রাস্তা ধরে সে কতোবার যে আফিফের পিছু নিয়েছিলো, তার হিসেব নেই। তার সব অনুভূতি তো মিথ্যে হয়ে গিয়েছিল, এখন নতুন করে কেন সে জানলো আফিফ তাকে ঘৃণা করতে চায়ছে।
আহি হাঁটতে লাগলো সেই রাস্তা ধরে। আজ সেই রাস্তা ধরে হাঁটছে না সেই কিশোরী। আজ হাঁটছে একটি ভাঙা হৃদয়ের তরুণী। আজ নেই তার সামনে আঠারো বছরের সেই ছেলেটি। সে তো ধুলোয় মিশে গেছে।
(***)
আহি হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলো চারুশিল্পের সামনে। গেটটির মুখোমুখি চায়ের দোকানটিতে গিয়ে বসলো সে। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো গেটটির দিকে আর মনে মনে বলল,
“ঘৃণা আছে। থাকুক না হয়। কিন্তু আমার ভালোবাসার মৃত্যু কখনো হবে না। প্রিয় মানুষ পৃথিবী থেকে মুছে গেলেও তাদের ভালোবাসা বেঁচে থাকে। তাহলে আমি তোমার ঘৃণা নিয়ে কেন তোমাকে ভালোবাসতে পারবো না, এআর? পাওয়ার আশায় তো সবাই ভালোবাসে না। কিছু ভালোবাসা অপ্রকাশ্যেও হয়। আমার ভালোবাসা অধরা থাকুক। জানি না আমি তোমার জীবনটা কীভাবে এলোমেলো করে দিয়েছি। হয়তো করেছি। কিন্তু আমার মন ভাঙার অপরাধে আমি তোমাকে কোনো শাস্তি দেবো না। তোমাকে কখনো ঘৃণা করবো না। কারণ ভালোবাসার মানুষকে ঘৃণা করা যায় না।”
চলবে-

