#এলোকেশী_সে
#মাহমুদা_লিজা
পর্বঃ২৪
চাঁদ ঝলমলে আলো আঁধারির খেলায় বারান্দায় দাঁড়িয়ে সোডিয়ামের ল্যাম্পপোষ্টের পানে এক ধ্যানে চেয়ে আছে তোড়া। সবে খোলসের বাইরে মাথাটা বের করছিল সে, প্রলংকরী ঝড়টা আবারও জানান দিল শ্বাপদসংকুল পরিবেশ, আবারও গুটিয়ে যেতে হবে। চোখের কোল বেয়ে জল গড়ালো গালে। ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের তীক্ষ্ণ অনুভব জানান দিচ্ছে শক্ত বেষ্টনীর বলয়ে তাকে আবদ্ধ করেছে কেউ। একেবারে গা ঘেঁষে দাঁড়ানো মানুষটাকে চিনতে তার ভুল হয়নি। পেছনে দাঁড়ানো মানুষটা একহাত পেচিয়ে এনে রেখেছে তার গলার কাছে। সেই মানুষটার মৃদু টানে তার পিঠ ঠেকলো মানুষটার বুকে। শান্ত, শীতল স্বরে প্রশ্ন ছুড়লো মানুষটা -“পরীক্ষার পড়া শেষ হয়েছে? গত দু’টো পরীক্ষার অনুপস্থিতির কারণ দর্শিয়ে ছুটি এনেছি, আগামীকালের পরীক্ষার জন্য কোন ছুটি নেই কিন্তু।”
রেলিংটায় হাত রেখে তোড়া জবাব দিলো -“আপনিও অন্য শিক্ষকের মত। দুনিয়া উল্টে যাক, আপনাদের পড়া শেষ করতে হবে। আমার মনটা ভালো নেই মাস্টার মশাই।”
অহনের ঠোঁটের কোণে ম্লান হাসি। ঐ মাতৃতুল্য মানুষটার বিয়োগে সে-ও মর্মাহত কিন্তু প্রেয়সীর ছোট্ট মন থেকে গেঁথে বসা একমুখী চিন্তাটা দূর করতে হবে। এজন্য যদি একটু স্বার্থপর হতে হয়, তবে সে না-হয় সেই তকমাই নিবে। তবুও স্ত্রীর মলিন বদনটা তার সহ্য হচ্ছে না। তাইতো তোড়ার কথার পিঠে সে গম্ভীর স্বরে বলল -“জীবনে প্রতিটা ধাপে বাঁধা আসবে। সে বাঁধার জন্য কিছুদিন শোক পালন করতে করতে গোটা জীবন যাবে। নিজের লক্ষ্যে আর পৌঁছানো হবে না। আমি জানি আপনার মন খারাপ কিন্তু আপনার জীবনের একাংশের প্রভাবে অন্য অংশের ক্ষতি করবেন কেন? ব্যালেন্স করুন মিসেস আরিয়ান মজুমদার। আপনার কাছ থেকে এমন নির্বুদ্ধিতা আশা করিনি। আপনি তো লৌহ মানবী, আমার ইস্পাত লেডি। আপনি আমার শক্তি, এখন দেখি আমার শক্তির আধারের কৌটোতে ঘূণে ধরেছে।”
অহনের স্হলে অন্য কোন মানব হলে হয়ত নিমপাতা দেয়া ফুটানো পানিতে ধুয়ে দিত তোড়া। অথচ এই মানুষটার প্রতিটি কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে সে। কেমন বাধ্য মেয়েটি হয়ে চুপটি করে আছে আপন মানুষটার কদুষ্ণ বাহুডোরে। তার নীরবতায় অহনের মনটা অধিক আশকারা পেলো। অপর হাতটা পেছন থেকে এনে এলোকেশীর নির্মেদ পেটের ওপর রেখে বলল -“আপনার অশান্ত মনটা শান্ত করুন, উচাটন হওয়া মনটাকে শীতল করুন। হাহাকার করা হৃদয়টাকে প্রবোধ দিন। আমার তোড়ারাণীকে শক্ত করুন। এতটা শক্ত করুন যেন কোন ঝড়ও আপনাকে টলাতে না পারে। আপনি জানেন! তুমুল ঝড় পাহাড়ের গায়ে আছড়ে পড়ে নিজেই নিঃশক্তি হয়। আপনাকে আমি ঐরূপে দেখতে চাই।”
দূর আকাশের কোল থেকে দৃষ্টি সরালো তোড়া। অভাবনীয় কাজটা করে বসল চট করে। নিজের হালকা শরীরটাকে ঘুরিয়ে প্রিয় মানুষটার মুখোমুখি দাঁড়াল। আচমকা লোমশ বুকটাতে মাথা ঠেকিয়ে হাতজোড়া রাখল স্বামীর পিঠে। আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরল, হাতজোড়ার বাঁধনটা তার সর্বশক্তি দিয়ে কঠিন করল। তার কোমল হাতের স্পর্শ ঐ মানুষটার কাছে নিতান্ত আলতো ছোঁয়া। দৃঢ় চিত্তের লৌহ মানবটা কেঁপে উঠল, অদ্ভুত শিহরণে নিজের অশান্ত মনটাকে সংযত করার কঠিন চেষ্টা করছে। নিজের শক্তপোক্ত হাতটা প্রেয়সীর মাথায় রাখল। যতটুকু দূরত্ব ছিল ততটুকু ঘোচানোর জন্য ছোট্ট মাথটা চেপে ধরল নিজের উষ্ণ বুকে। অন্য হাতটা এলোকেশীর পিঠের ওপর রাখা। নিজের অস্হির ধুকপুকুনির বেগ হার মানল জড়িয়ে থাকা রমণীর ফুপিয়ে কেঁদে ওঠার কাছে। শীতল স্বরে বলল -“এটা যেন শেষ কান্না হয় তোড়ারাণী। আর ও চোখে জল দেখতে চাইনা। আমায় ছেড়ে পড়তে বসো যাও। এভাবে জড়িয়ে থাকলে তুমি পরীক্ষায় পাশ করতে পারবেনা। পড়তে হবে, তবেই পাশ করবে। আমি যদি তোমার কলেজে ক্লাস নিতাম তবে না-হয় দু’এক নাম্বার বাড়িয়ে দিতাম আমাকে জড়িয়ে ধরার বিনিময়ে।”
অহনের কথাটা কর্ণকুহরে আসতেই তাকে এক ধাক্কায় দূরে সরিয়ে দিল তোড়া। ভ্রু কুঁচকে বলল -“ছি! কি বাজে কথা। সবার সান্ত্বনায় আমার রাগ হয় কিন্তু আপনার সান্ত্বনা আমার মনটাকে শীতল করে। অথচ আপনি কি অসভ্য!”
অহন হাসল মৃদু। আপাতত ক্ষণিকের জন্য প্রেয়সীর মনটাকে শীতল করতে পারল তবে। তার মনের উচাটন অবস্থা আরো লাঘব করার জন্য সুকৌশল আঁটল। ভ্রু নাচিয়ে বলল -“এই এক মিনিট, তুমি বললে আমার কথায় তোমার মনটা শান্ত হয়। তার মানে প্রেমে পড়েছো! ছাত্রী হয়ে শিক্ষকের প্রেমে পড়তে লজ্জা করল না অথচ আমি কিছু বললেই আমার দোষ। কি যুগ এলো? হায় খোদা!”
তোড়া বুঝতে পারল এখন কথা বাড়ানোটাই বেকার। এই মানুষটার কথার পিঠে জবাব দেয়ার ভাষা তার নেই।বারবার হার মানে মানুষটার মেপে মেপে কথা বলার কাছে। অয়ন হলে এতক্ষণে কোমর বেঁধে ঝগড়া করত। অথচ, এই মানুষটা তাকে বেফাঁস কথাবার্তা বললেও ফিরতি জবাব থাকা সত্ত্বেও সে নীরব থাকে।
বারান্দা ছেড়ে ঘরের দিকে পা বাড়াতে যাবে তোড়া, তখনই হাতে টান পড়ল। এক হাতে তার গতি রোধ করে অন্য হাতে তার ঢিলে হওয়া খোঁপার বাঁধন আলগা করে দিল অহন। ঝরঝর করে কেশরাশি নেমে এলো পিঠ বেয়ে। নীরবে দৃষ্টি বিনিময় হলো ক্ষণিকের জন্য। আদুরে স্বরটা কানে এলো তোড়ার -“আমার এলোকেশীনিকে এভাবেই দেখতে চাই সবসময়। সারাদিন খোঁপা বেঁধে দাদী সেজে ঘুরবেন কিন্তু আমার সামনে আপনাকে এলোকেশে দেখতে চাই।”
উপরে নিচে মাথা দুলালো তোড়া। আজ্ঞা সসম্মানে পালন করবে। ধীর কদমে এসে বই নিয়ে বসল তোড়া। মনটা আবার হু হু করে উঠেছে মায়ের স্মৃতি রোমন্থন করে। ঐ একটা মানুষকে ঘিরেই তো তার দুনিয়া ছিল। কেউ তো ছিলনা ঐ মানুষটার। মেয়েকে আগলে নিয়ে নিজের জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ছিল। সেভাবে তোড়ার জীবনটাও মাকে ঘিরে ছিল। সুখ-দুখের অল্প বিস্তর আলোচনা তো মায়ের সাথেই হতো। আর কে ছিল তার মা ছাড়া!
পরমুহূর্তেই অহনের বলা কথাগুলো স্মৃত হলো তার। নিজেকে সামলে মন দিল পড়ায়। বারবার মনটা বিক্ষিপ্ত হলেও জোর চেষ্টা মনোযোগ পুনরুদ্ধারে। অল্প আওয়াজ তুলে পড়া শুরু করল সে। ওদিকে নিঃশব্দে প্রস্হান করল অহন। একদিকে সদ্য মা হারানোর আঘাত, অন্যদিকে বাবার কাপুরুষোচিত আচরণে পুরুষদের প্রতি অবিশ্বাসের জোর। অহন উপলব্ধি করল তার এই মুহূর্তে এ ঘরে থাকা ঠিক হবেনা, তাতে পুরুষদের প্রতি তোড়ার বদ্ধমূল ধারণাটা স্হায়ী হয়ে যাবে। সে কাপুরুষ নয়, সে একজন মানুষ হয়ে ধরা দিতে চায় স্ত্রীর নিকট।
**************
বসার ঘরে থমথমে অবস্থা। সবার নড়বড়ে মনটার প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে আদলে। কলিংবেলের শব্দ পেয়ে দরজা খুলল তন্ময়। বাবার বিষণ্ণতা বুঝতে তার বেগ পেতে হলোনা৷ একপাশে সরে জায়গা করে দিল সে। নিজাম মজুমদার ঘরে এসে জুতো খুলেই নত মস্তিষ্কে নিজের ঘরের দিকে এগোলো। প্রতিদিন বসার ঘরে বসে একটু জিরিয়ে তারপর নিজের ঘরে যেতেন তিনি। অথচ আজ তার অবনত মাথা দেখে অহন একবার তাকাল সেদিকে। পরক্ষণেই দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিল।
নিজের ঘরের দরজার সামনে আসতেই মেহেরজানকে দেখে চড়া আওয়াজে নিজাম মজুমদার বললেন -“আমার চাকরিটা চলে গেছে। আমার মত ফেরারিকে নাকি ঐ কোম্পানিতে রাখলে পরিবেশ কলুষিত হবে। আপনাদের সকল চেষ্টা সফল হয়েছে। আপনাদের আয়োজন স্বার্থক হয়েছে। আমার এতদিনের সম্মান এক চুটকিতে ধূলোয় লুটাতে পেরেছেন। আমাকে জিন্দা লাশ বানিয়ে ছেড়েছেন। এবার সবাই খুশি হয়ে মিষ্টি মুখ করেন।”
ছেলের কথায় মেহেরজান হাসলেন। ঠিক এইভাবে রুবাবাও রোদন করেছিল, যেদিন কাননকে বাড়ি এনেছিল সে। বসার ঘর থেকে স্পষ্ট সব শুনলো অহন। অয়নও চমকে উঠলো নিজাম মজুমদারের নীরব আর্তনাদ শুনে৷
অহন বিস্ময়ভরা চাহনি নিয়ে বাবার পানে চাইল। ঐ ছোট্ট একরত্তি মেয়েটা এতটা কঠিন প্রতিশোধ নিতে পারে তা কারো কল্পনাতেও আসেনি। পরোক্ষভাবে মাতৃহত্যায় ইন্ধনদাতাকে প্রথম চালেই কুপোকাত করবে তা ভেবে নাঈম মজুমদার রীতিমতো বেকুব বনে গেলেন। এই মানুষটার উপর থেকে অভিযোগ বাতিল করায় তোড়ার প্রতি মনঃক্ষুণ্ন ছিলেন তিনি। তিনি কস্মিনকালেও ভাবেননি ঐ মেয়েটার ধীশক্তি ঠিক কতদূরে ভেবেছে।
অনিমা আর কলিও বিস্মিত হলো। কাননের মুখে ঘোর অমাবশ্যা। অন্তরে কম্পন উঠেছে। মেয়েটার নীরব প্রতিশোধের প্রথম ছোবলেই তলিয়ে গেছে অতলে। পরবর্তী ছোবল সামলাতে পারবে তো!
অয়ন ভাইয়ের পাশে এসে ফিসফিস করে বলল -“সাংঘাতিক অবস্থা। মেজ কাকা তো মেয়ের হাতে নিজের অপকর্মের বিনাশ ডেকেছেন। আসলে তোড়া থুক্কু ভাবী দেখি প্রথম চালেই কিস্তিমাত দিল। বাবা-মেয়ের স্নায়ুযুদ্ধে দেখছি ঝড় আসতে চলেছে।”
অহন ঈষৎ হাসল। এই মানুষটার নির্লজ্জতার স্বীকার হওয়া নিরপরাধ রুবাবা দগ্ধে দগ্ধে জীবন পাত করেছে। একটা মেয়ের উজ্জ্বল ভবিষ্যতে অমাবশ্যার আঁধার নেমেছে। তার শাস্তি কঠিন থেকে কঠিনতর হওয়া উচিত। তোড়ার দূরদর্শিতায় মুগ্ধ সে। মানতেই হবে, মেয়েটা সত্যি বুদ্ধিমতী। এক দানেই রাজাকে ঘায়েল করার ক্ষমতা কয়জন রাখে?
চলবে…….
(রাতজেগে এটুকুই টাইপ করেছি। ফিনিশিং টাচও দেয়া হলো। কতটুকু মনে পৌঁছাবে জানিনা, তবে পড়া শেষে ছোট্ট করে অনুভূতি জানাবেন। এতটুকু আশা করতে পারি নিশ্চয়ই!)

