স্নিগ্ধ_কাঠগোলাপ #সাদিয়া_জাহান_উম্মি #পর্বঃ৪১

0
1166

#স্নিগ্ধ_কাঠগোলাপ
#সাদিয়া_জাহান_উম্মি
#পর্বঃ৪১
‘ আহাদ,আমি আসলে…আসলে আমি অন্য কাউকে ভা..ভালোবাসি।’

কথাটা অনেক কষ্টে উচ্চারণ করেছে নূর।আহাদকে এই কথাটা বলতে চাইনি ও।তাই তো এতোটা বছর যাবত নিজের মনের মাঝে লুকিয়ে রেখেছে।কাউকে জানতে দেয়নি।বুঝতে দেয়নি।কিন্তু আজ কেন যেন মনে হলো আহাদকে কথাটা বলা উচিত।নাহলে আহাদকে ঠকানো হবে।যেখানে আহাদ ওকে পাগলের মতো ভালোবাসে।সেখানে মনের মাঝে অন্য একটা মানুষকে রেখে আহাদকে বিয়ে করে নিলো।আবার আহাদকে কথাটা জানালও না এটা তাহলে ঠকানো হবে না?নূরের চোখ থেকে টপটপ করে পানি পরছে।ভয় পাচ্ছে আহাদের দিকে তাকাতে।তবে অনেকক্ষণ চলে গেলো আহাদের কোনো সারাশব্দ পাওয়া গেলো না।নূর এইবার ভয়ে ভয়ে তাকালো আহাদের দিকে।
দেখল আহাদ বেশ শান্ত দৃষ্টিতে নূরের দিকেই তাকিয়ে আছে।নূরের চোখজোড়া লাল টকটকে হয়ে আছে।ফর্সা চেহারাটাও লালচে হয়ে আছে।নূর ভয় পেলোঘাবড়ালো।থেমে থেমে বলল,’ আ..আপনি ঠিক আ..আছেন?’

আহাদ অত্যন্ত শীতল কণ্ঠে বলল,’ আমাকে এই কথা আগে কেনো বলোনি নূর?তাহলে তো তোমাকে এতোটা ভালোবেসে ফেলতাম না আমি।’

আহাদের এই কথাটায় অনেকটা কষ্ট লুকায়িত আছে।যেটা অনুভব করতে পারলো নূর।এইবার ঠোঁট ভেঙে কেঁদে ফেলল।বলতে লাগল,
‘ আমাকে ক্ষমা করুন আহাদ।আমি এমনটা চাইনি আহাদ।আমি নিজেও জানি না তাকে কেন,কিভাবে ভালোবাসলাম।আমি অন্যায় করেছি আহাদ।আপনি আমায় যেই শাস্তি দিবেন আমি মাথা পেতে নিবো।’

আহাদ মলিন হাসি উপহার দিলো নূরকে।বলল,’ ভালোবাসা তো অন্যায় না নূর।তবে আফসোস তোমার ভালোবাসাটা আমার জন্যে না।’

নূর মাথা নিচু করে নিলো।আহাদের হাত দুটো ধরে সেটা ওর কপালে ঠেকালো।কাঁদতে কাঁদতে বলল,’ আমাকে মাফ করে দিন আহাদ।আমি এমনটা চাইনি।আ`ম সরি আহাদ।’

আহাদ একটা হাত ছাড়িয়ে নিলো নূরের কাছ থেকে।তারপর সেই হাত নূরের গালে ছোঁয়ালো।নূরের মুখটা উঁচু করে ধরল।নূরের চোখে চোখ রেখে বলল,’ তুমি ক্ষমা কেন চাচ্ছো নূর?অপরাধ তো আমি করেছি।যখন তোমার আমার বাগদান সম্পূর্ণ হলো। আমার উচিত ছিলো তখন থেকেই তোমাকে সময় দেওয়া।তোমার সাথে বেশি বেশি ভালো মুহূর্ত কাটানো।ফোনে কথা বলা।কিন্তু আমি তখন প্রথম প্রথম অফিসে জয়েন করেছি।কাজের প্রেসারে আমি তোমাকে সময় দিতে পারতাম না।সারাদিনে দু একটা ম্যাসেজ।আর সপ্তাহ একবার ফোন দিতাম।তাও পাঁচ মিনিটের বেশি দীর্ঘ হতো না আমাদের কথা।মাসের পর মাস দেখা না করে কাটিয়ে দিতাম।এই কারনেই তো তুমি আমায় ভালোবাসলে না নূর।তবে এতো কিছুর মাঝে এটা সত্যি নূর।হয়তো কাজের প্রেসারের কারনে তোমার সাথে ঠিকঠাক সময় দিতে পারতাম না।কিন্তু এটা সত্যি যে নূর আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।কিন্তু এটা আমার ব্যর্থতা আমি তোমাকে আমার ভালোবাসা বোঝাতে পারেনি।’

আহাদ থামল।বড়ো বড়ো শ্বাস নিলো।আশ্চর্য! বুকের বা-পাশটা এতো জ্বলছে কেন?এতো কষ্ট কেন লাগছে?তবে কি ভালোবাসার মানুষটির মুখে অন্যকাউকে ভালোবাসার কথা শুনলে এমনই যন্ত্রণা অনুভব হয়?
আহাদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফের বলল,
‘ তবে তুমি চিন্তা করো না নূর।আমি কোনো জোরজবরদস্তির সম্পর্ক রাখতে পারবো না।কিন্তু তোমার কাছে আমার একটাই প্রশ্ন।’

নূর ভেজা চোখে তাকালো আহাদের দিকে।বলল,’ কি প্রশ্ন?’
‘ তুমি যাকে ভালোবাসো সেও কি তোমায় ভালোবাসে?যদি উত্তরটা হ্যা হয়।তো আমি সবাইকে মানাবো।তোমাদের দুজনকে এক করব আমি।আর যদি এটা শুধুই এক তরফা ভালোবাসা হয়ে থাকে। তবে সরি নূর।তোমার আমাকেই বিয়ে করতে হবে।সারাটাজীবন আমার সাথেই কাটাতে হবে।তুমি আমার পাশে থাকবে এতেই আমার চলবে।আমি জানি দুজন একসাথে সংসার করা শুরু করলে। একদিন না একদিন তুমি আমার মায়ায় পরবে।আর সেই মায়া থেকেই ভালোবাসার সৃষ্টি হবে।আর আমাকে তুমি ভালোবাসবে নূর।এটা আমার প্রমিস।তোমার এক তরফা ভালোবাসা আমি মেনে নিবো।সব মেনে নিবো।তাও আমাকে ছেড়ে যাবার কথা বলো না।আমি কোনোদিন তোমাকে এই বিষয় নিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করব না।কোনোদিন এই কথা আমাদের মাঝে আসবেই না।আমি সব ঠিক করে দিবো নূর।’

কথাগুলো বলে আহাদ চাতক পাখির মতো তাকিয়ে রইলো নূরের দিকে।নূর কি বলে তা জানার জন্যে অধির আগ্রহ নিয়ে সে বসে আছে। মনে মনে দোয়া করছে।যেন নূর বলে যে ও এক তরফা ভাবেই ভালোবাসে।তাহলেই হবে।বাকিটা আহাদ সামলে নিবো।সে নূরকে অনেক অনেক অনেক ভালোবাসবে।এতোটাই ভালোবাসবে যে নূরের কোনোদিন আফসোস হবে না। যে নূর কেন আহাদকে বিয়ে করলো।ওর ভালোবাসায় মুগ্ধ হবে মেয়েটা। ওকে ভালোবাসতে বাধ্য হবে নূর।
এদিকে নূর আহাদের কথাগুলো মন দিয়ে শুনল।সব তো বলেই দিলো।এখন আর লুকানোর কি আছে?যদি সবটা জেনেও আহাদ ওকে গ্রহণ করতে পারে।তো নূরও আর মানা করবে না।কারন নূর একাই ফাহিমকে ভালোবাসে।ফাহিম তো আর ভালোবাসে না।এই একতরফা ভালোবাসার কারনে আহাদকে আর কষ্ট দিতে পারবে না।এমনিতেই আজ সত্যিটা জেনে আহাদ অনেক কষ্ট পেয়েছে।তবে নূর ভেবেছে।একটা সম্পর্ক শুরু করতে হলে একে-অপরের সম্পর্কে সব জানতে হয়।সম্পর্কের শুরুই যদি মিথ্যে দিয়ে হয়।তাহলে সেই সম্পর্ক ভালো হয় না।তাই তো নূর সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলো। আহাদকে সব বলে দিবে।কোনোরকম লুকোচুরি করবে না।আহাদকে সব বলবে।নূর চোখ মুছে নিলো। কিন্তু অবাধ্য জল আবারও ওর গাল ভিজিয়ে দিলো।নূর বলল,’ আমি একাই ভালোবাসি।সে আমাকে ভালোবাসে না।ইনফেক্ট আমার দিকে কোনোদিন অন্যভাবেই তাকায়ও নাই।’

একটা শীতল বাতাস অনুভব করল আহাদ।চোখ বন্ধ করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলে,’ মানুষটা কে আমি জানতে পারি নূর?’
‘ আরাবী ভাবির ভাই ফাহিম।’

আহাদ অবাক চোখে তাকালো।বলল,’ তার সাথে তো মাত্র কয়েকটা দিন যাবত পরিচয়।তাহলে কিভাবে কি?’
‘ আত্মীয়তার সম্পর্ক হয়েছে কয়েকদিন ধরে।বাট তাকে আমি চিনি অনেক আগে থেকেই।আমি যেই কোচিং সেন্টারে পড়ি।সেখানে ফাহিম পড়ান আমাদের।আই মিন আমাদের শিক্ষক সে। ‘

আহাদ এইবার বুঝল কিভাবে কি হয়েছে।আহাদ আর কি বলবে?চুপচাপ বসে রইলো।ওকে একটু শান্ত হতে হবে।বুকের জ্বলন তো কমছে না।তীব্র যন্ত্রণায় হৃৎপিণ্ডটা ছটফট করছে।এই শান্ত নিরিবিলি পরিবেশটা অসহ্য লাগছে।আচ্ছা,চারদিকে এতো বিষাক্ত বাতাস কেন?শ্বাস নিতে কেন পারছে না আহাদ?
এদিকে নূর আহাদের এতো নিরবতা সহ্য করতে পারছে না।মানুষটা ওকে অনেক ভালোবাসে।এই মানুষটার কষ্ট ও সহ্য করতে পারছে না।একদমই পারছে না।নূর কাঁদো গলায় বলে উঠে,’ আপনি কি অনেক কষ্ট পাচ্ছেন?আমি সরি।আমি এমনটা করতে চাইনি।আমি আপনাকেই বিয়ে করব।শুধু আমার মনে হলো।একটা সম্পর্ক শুরু করার আগে। আমাদের মাঝে যেন কোনো গোপনীয়তা না থাকে। আপনি যেন সবটা জেনে তারপরেই আমাকে বিয়ে করেন।তাই আমি আমার মনের কথা বলতে বাধ্য হয়েছি।প্লিজ কথা বলুন।আপনাকে এভাবে দেখতে আমার ভালো লাগে না একদম না।হাসিখুশি আহাদকেই আমার পছন্দ।’

আহাদ নূরের চোখের দিকে তাকালো।তারপর একটুখানি এগিয়ে আসল নূরের দিকে।নূর ভড়কে গেলো।আহাদ অদ্ভুতভাবে হাসল।অতঃপর বলল,’ তুমি অনেক বোকা নূর।’

নূর বুঝল না আহাদের কথা।প্রশ্ন করল,’ আমি বোকা?’
‘ হ্যা ভীষণ বোকা।’
‘ কিভাবে? ‘
‘ বোকাই তো।নাহলে ভালোলাগাকে ভালোবাসা বলে যে দাবি করে তাকে বোকা বলে না তো কি বলে?’

নূরের মাথায় যেন বজ্রপাত হলো।কি বলছে লোকটা?কিসের ভালোলাগা আর ভালোবাসার কথা বলছে?আর এর কারনে ও বোকা কেন হবে?’
নূর অবাক করা কণ্ঠে বলে,’ আপনি কি বলছেন আমি বুঝতে পারছি না।’
‘ তুমি ফাহিমকে ভালোবাসো না নূর।ওটা তোমার ভালোলাগা।আর সেটাকেই তুমি ভালোবাসা বলে দাবি করে বসে আছ।তুমি বড্ড বোকা নূর।’

নূরের এসব হেয়ালিপনা কথায় আবারও কান্না পাচ্ছে।এতো প্যাঁচিয়ে কেন বলছে লোকটা?
নূর বলল,
‘ কিসের ভালোলাগা?একটা মানুষকে এতো বছর যাবত ভালোলাগে কিভাবে?ভালোলাগা কি এতো দীর্ঘদিন থাকে না-কি?’

আহাদ হাসল।বলল,’ থাকে নূর থাকে।তুমি বললে না ফাহিম তোমায় পাত্তা দেয় না। শিক্ষক ছাত্রী ছাড়া তোমাদের মাঝে আর কোনোদিন বারতি কথা হয়নি।’
‘ হ্যা তো?’
‘ ধরো যদি এটার উলটো হতো। তুমি ফাহিমকে পছন্দ করতে।ফাহিমও তোমায় পছন্দ করত।তবে কিন্তু তোমার এই ভালোলাগাটা এতো দীর্ঘস্থায়ী হতো না।আজ তোমার ভালোলাগা এতো দীর্ঘস্থায়ী কারন তুমি ফাহিমের থেকে কোনো রেস্পন্স পাও না এইজন্যেই।ফাহিম যদি তোমায় রেস্পন্স করত। তোমরা একসাথে টাইম স্পেন্ড করতে তখন দেখতে আস্তে আস্তে ফাহিমকে আর তোমার ভালো লাগে না।মানে সহজ ভাষায় যেটাকে ক্রাশ বলে। ক্রাশ যতোদিন পাত্তা দেয় না। ততোদিন কিন্তু ক্রাশকে ভালোলাগে।পাত্তা দেওয়া শুরু করলে আর ভালো লাগে না।বুঝেছ?’

নূর বার বার শুকনো ঢোক গিলছে। কিসব বলছে আহাদ?এইসব কি আদৌ হয়?
আহাদ ফের বলে,’ তোমাকে আরও সহজ একটা এক্সাম্পল দেই কেমন?এইযে এই মুহূর্তে তুমি আমার সাথে আছো তাই নাহ?তোমার একবারও ফাহিমের জন্যে খারাপ লাগছে?যে তুমি ফাহিমকে পাবে না?’

নূর স্তব্ধ হয়ে রইলো। আসলেই তো। একমুহূর্তের জন্যেও ফাহিমকে ও পাবে না এইজন্যে ওর খারাপ লাগেনি।উলটো আহাদের জন্যে ওর খারাপ লাগছে। ও অন্য কাউকে ভালোবাসে। এটা শুনে আহাদ কি রিয়েক্ট করে।কিভাবে সামলাবে নিজেকে?আহাদের কষ্ট কিভাবে কমাবে?আহাদের সাথে মিথ্যে বলে সম্পর্ক শুরু করতে চায় না।আহাদকে ধোকা দিতে চায় নাহ।এসবই ভেবেছে।নূর বারবার শুকনো ঢোক গিলছে।
আহাদ নরম গলায় বলে উঠল,
‘ নূর তুমি জানো না ভালোলাগা আর ভালোবাসার পার্থক্য।
তাই তুমি তোমার অনুভূতিগুলোও বুঝতে পারো না।
যাকে তুমি ভালবাসো তার সামনে তোমার হার্টবিট বেড়ে যাবে। কিন্তু যাকে তোমার ভালোলাগে তাকে দেখে তুমি খুশি হবে। যাকে তুমি ভালবাসো তার সামনে থাকলে শীত কালকে বসন্ত মনে হবে আর যাকে তোমার ভালো লাগে তার সামনে শীতকালকে শুধু সুন্দর শীত বলেই মনে হবে। যাকে ভালবাসো তাকে তোমার মনের সব কথা বলতে পারবে। কিন্তু যাকে তোমার ভালোলাগে তাকে বলতে পারবে না সহজে।তার সাথে এতোটা ফ্রিও হতে পারবে না। যাকে তুমি ভালোবাসো তার সামনে তুমি লজ্জা পাবে।আর যাকে তোমার ভালোলাগে তার কাছে তুমি নিজেকে উপস্থাপন করতে চাইবে। যখন তোমার ভালোবাসার মানুষ কাঁদবে তুমি তার সাথে কাঁদবে। কিন্তু যাকে তোমার ভালোলাগে সে কান্না থামালে তুমি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে।যাকে তোমার ভালোলাগে তাকে ভুলে যেতে চাও তাহলে শুধু তোমার চোখ বন্ধ করে তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেও একবার।নিজের মনকে বোঝাও ভালোভাবে। তাহলে দেখবে তুমি খুব সহজেই তাকে ভুলে যাবে।। কিন্তু যদি ভালবাসাকে ভোলার জন্য চোখ বন্ধ করো, তো তোমার ভালোবাসা কান্না হয়ে ঝড়ে পড়বে। সে তোমার হৃদয়ে থেকে যাবে, সারা জীবন।
আমি যেটুকু বুঝি তাই তোমাকে বোঝালাম।আমায় তুমি ভালোবাসো কি না জানি না।বা আদৌ ভালোবাসতে পারবে কি না তাও জানিনা।তবে আমি এটুকু জানি তুমি ফাহিমকেও ভালোবাসো না।’

নূর স্থির হয়ে বসে রইলো।আহাদের একেকটা কথা শুনে যেন ওর কণ্ঠনালি আটকে গিয়েছে।চাইলেও কিছু বলতে পারছে না নূর।

#চলবে________
ভুলত্রুটি ক্ষমা করবেন। কেমন হয়েছে জানাবেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here