মায়ারণ্যে #লেখিকা-মেহরুমা নূর #পর্ব-২৭ (শেষ পর্ব)

0
106

#মায়ারণ্যে
#লেখিকা-মেহরুমা নূর
#পর্ব-২৭ (শেষ পর্ব)

★এক সপ্তাহ কেটে গেছে। এই এক সপ্তাহে অরণ্য মায়ার সাথে কোন কথা বলেনি। মায়াও তেমন চেষ্টা করেনি অরণ্যের রাগ ভাঙানোর। আর এই বিষয় টাই অরণ্যকে আরও বেশি রাগাচ্ছে। মায়ার এই হঠাৎ পরিবর্তন অরণ্যের রাতের ঘুম কেঁড়ে নিয়েছে। অস্থির মনটা খালি ছটফট করছে। আজকাল মায়াকে সে তেমন বাসায় দেখতেই পায় না। রোজ কোথাও যেন সে চলে যায়। কাওকে কিছু বলেও না। অরণ্যের সবকিছু যেন এলোমেলো লাগছে। রাগের কারণে মায়ার সাথে কথা বলছে না। তবে মায়ার জন্য চিন্তাও হচ্ছে। অজানা একটা ভয়ে বুকটা দুরুদুরু করছে। মায়া আবারও আমার কাছ দূরে যাওয়ার চিন্তা করছে নাতো? এবার এমনটা করলে আমি তোমাকে কখনোই মাফ করবোনা মায়া। আমাকে তুমি চিরজীবনের জন্য হারাবে। চেয়েও আমাকে খুঁজে পাবে না তুমি।

ফোনটা হাতে নিয়ে মায়ার নাম্বারের দিকে তাকিয়ে আছে। অস্থির মনটা বাঁধ মানছে না। মায়া সেই সকালে বেড়িয়েছে এখন সন্ধ্যা হতে চললো তবুও তার কোন খবর নেই। অরণ্যের অস্থিরতা বেড়েই চলেছে। সাথে ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলেছে রাগের মাত্রা। মায়ার চিন্তায় মাথা ফেটে যাচ্ছে। তাই আর থাকতে না পেরে মায়ার নাম্বারে ডায়াল করলো অরণ্য। তবে রিং বেজে বেজে ফোন কাট হয়ে গেল, ফোন রিসিভ হলো না। অরণ্যের অস্থিরতা আরও শতগুণ বেড়ে গেল। ফোন কেন ধরছে না? কোন বিপদ হলো নাতো? এই মেয়েটা আমাকে পাগল করে ছাড়বে।

রাত আটটার দিকে মায়া বাসায় ফিরলো। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই অরণ্যের অগ্নি চোখের ভয়ংকর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দেখে অন্তর কেঁপে উঠল মায়ার। মায়া মাথা নিচু করে পাশ কেটে যেতে নিলেই অরণ্য দৃঢ় কন্ঠে বলে উঠলো।
–কোথায় গিয়েছিলে?

মায়া মাথা নিচু রেখেই আমতা আমতা করে বললো।
–ভার্সিটির একটা কাজ ছিল।

অরণ্য এবার খপ করে মায়ার হাত শক্ত করে চেপে ধরে দেয়ালের সাথে আটকে দিয়ে চোয়াল শক্ত করে বললো।
–ভার্সিটির কাজ? কিসের ভার্সিটির কাজ শুনি যা তুমি এতরাত পর্যন্ত করছ? আমাকে কি তোমার বোকা মনে হয়? প্রতিদিন কোথায় বেড়িয়ে যাও তুমি? সারাদিন বাইরে থাকো। কি করতে চাইছ তুমি?

অরণ্য রাগের মাথায় মায়ার হাত টা এতটাই শক্ত করে ধরেছে যে হাতের রক্ত চলাচলই বন্ধ হয়ে গেছে প্রায়। মায়া তবুও কোনরকমে বললো।
–সময় হলে সব জেনে যাবেন।

মায়ার কথায় অরণ্যের ভয় যেন আরও বেড়ে গেল। সাথে রাগও। অতিরিক্ত রাগ আর অভিমানের মাত্রা বেড়ে গিয়ে অরণ্য হঠাৎই বলে উঠলো।
–কেন এখন বলা যাবে না? এমন কি করতে চাইছ তুমি? নাকি নতুন কাওকে পেয়ে গেছ? আমার কাছ থেকে দূরে গিয়ে নতুন কাওকে নিয়ে ঘর করার প্ল্যান করছ বুঝি?

মায়া স্তব্ধ হয়ে আহত দৃষ্টিতে তাকালো অরণ্যের দিকে। এমন একটা কথা ও আশা করেনি। অরণ্য কি সত্যিই ওর ব্যাপারে এমনটাই ভাবে? কথাটা ভাবতেই মায়ার চোখ জোড়ায় বাঁধ ভেঙে এলো। মায়ার অশ্রুসিক্ত চোখ দেখে অরণ্যের হুঁশ এলো। বুঝতে পারলো ও রাগের মাথায় হয়তো একটু বেশিই বলে ফেলেছে। অরণ্য মায়াকে ছেড়ে দিয়ে হনহন করে রুম থেকে বেড়িয়ে গেল। মায়া ওখানেই বসে পড়লো। কতক্ষণ ওভাবেই বসে রইলো। তারপর নিজেকে একটু সামলে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। ওকে যে এখনো অনেক কাজ করতে হবে। বসে থাকলে চলবে না।

রাতে ডিনার টেবিলে মায়া সবার উদ্দেশ্যে বলে উঠলো।
–আজকে ডিনার শেষে কেউ রুমে যাবেন না প্লিজ । আমি আজকে সুন্দর একটা ফিল্ম এনেছি। আমরা সবাই মিলে দেখবো।

বাসার এমন একটা সময়ে মায়ার এমন মুভির কথা শুনে বাসার সবাই একটু অবাকই হলো।তবুও মায়ার কথা রাখতে সবাই রাজি হয়ে গেল। সারা অতি উৎসাহ নিয়ে বললো।
–ওয়াও ফিল্ম। অনেক মজা হবে। আমি পপকর্ণ নিয়ে আসছি।

মায়া শুধু একটা রহস্যময়ী হাসি দিল। অরণ্যের কাছেও ব্যাপার টা কেমন অদ্ভুত লাগলো। তবুও কিছু বললো না ও।দেখাই যাক কি করতে চায় মায়া।

অতঃপর ডিনার শেষে সবাই সোফায় এসে বসলো। রিয়াও এসে বসলো। মায়া পেনড্রাইভ টিভিতে লাগিয়ে দিয়ে রিমোট টা হাতে নিয়ে সবার উদ্দেশ্যে বলে উঠলো।
–তো সবাই রেডি তো?

সবাই সায় জানালো। মায়া এবার রিমোট চাপ দিয়ে মুভি চালু করলো। তবে মুভি চালু হতেই সবাই চমকে গেল। কারণ এটা কোন মুভি না। বরং রিয়ার কালো কারবারির প্রমাণ। টিভিতে দেখা যাচ্ছে রিয়া একটা ছেলের সাথে খুবই ঘনিষ্ঠ ভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে।যেন তারা কোন স্বামী স্ত্রী। তারপর তাদের নানান রকম ছবিও ভেসে উঠছে।

এসব দেখে সবাই প্রচুর অবাক হয়ে গেল। আর রিয়ার তো ভয়ে আত্মার পানি শুকিয়ে এলো। এগুলো কোথাথেকে এলো?

ভিডিও দেখে অরণ্যের বাবা বলে উঠলো।
–এসব কি বউমা?

মায়া একটা লম্বা নিঃশ্বাস টেনে নিয়ে স্মিত হেসে বললো।
–বাবা,এই মুভির নায়কটাই হলো আমাদের নায়িকা, আই মিন রিয়া মনির বাচ্চার বাবা।

মায়ার কথায় সবাই তাজ্জব হয়ে গেল। রিয়া মনে মনে ভয় পেয়ে গেলেও উপরে উপরে সাহস দেখিয়ে ফুসে উঠে বললো।
–কি কি আবোল তাবোল বলছিস মায়া? পাগল হয়ে গেছিস তুই? আমার বাচ্চার বাবা অরণ্য। অন্য কেউ না।

মায়া রহস্যময় হাসি দিয়ে রিয়ার সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর হঠাৎ ঠাস করে রিয়ার গালে একটা থাপ্পড় লাগিয়ে দিল। রিয়া বেচারির মাথা পুরো ঘুরে উঠলো। মায়ার হঠাৎ এ্যাকশনে সবাই টাস্কি খেয়ে গেল। মায়া চেহারায় কঠিনতা এনে রিয়ার সামনে আঙুল তুলে দৃঢ় কন্ঠে বললো।
–তুই কি ভেবেছিলি তুই সবাইকে বোকা বানিয়ে তোর থার্ড ক্লাস প্ল্যানে সফল হয়ে গেছিস? আরে আমি তোকে হারে হারে চিনি। তুই ভাবলি কি করে যে তোর মতো নোংরা মেয়ের কথা আমি মেনে নিবো? আমি নরম মনের ঠিকই, কিন্তু বোকা না। আমার সরলতা কে আমার দূর্বলতা ভাবার ভুল করেছিস তোরা। আরে অরণ্য নিজে এসেও যদি বলতো এই কথা তবুও আমি মানতাম না। সেখানে তোর মতো নোংরা মেয়ের কথা বিশ্বাস করার তো কোন প্রশ্নই আসে না। আরে বোকা তুই আমাকে না, বরং আমি তোকে বানিয়েছি।

মায়ার কথায় অরণ্যের মনটা ভরে উঠলো। আজ আবারও নতুন প্রাপ্তি এলো তার জীবনে।ওর মায়াপরী ওকে ভুল বোঝেনি।বিশ্বাস রেখেছে ওর ওপর। ভাবতেই চোখের কোন চিকচিক করছে।

অরণ্যের বাবা মায়ার উদ্দেশ্যে বলে উঠলো।
–বউমা কি বলতে চাইছ একটু ক্লিয়ার করে বলো।আমরাতো কিছুই বুঝতে পারছি না। তুমি যখন জানতে ও মিথ্যে বলছে তাহলে সেদিনই কেন বললে না?

মায়া এবার সবার দিকে তাকিয়ে বললো।
–আসলে বাবা,সেটারও একটা কারণ আছে। একটা বিষয়ে আমার সন্দেহ ছিল তাই সেটা জানার জন্য আমার একটু সময়ের দরকার ছিল। তাই সেদিন আমি ওর কথা মেনে নেওয়ার অভিনয় করছিলাম। যাতে ও বাইরে গিয়ে কোন তামাশা না করে। আর আমিও ওর বিরুদ্ধে সব তথ্য সংগ্রহ করতে পারি। আর সঠিক প্রমাণ হাতে পেতে পারি।

অরণ্যের বাবা ভ্রু কুঁচকে বললো
–কি বিষয়ে সন্দেহ ছিল?

–আসলে আপনারা হয়তো জানেন না, আমি কিছুদিন দিন আগে একটু অসুস্থ হয়েছিলাম।আর অরণ্য আমাকে হসপিটালে নিয়ে যায়। সেখানে ডক্টর কিছু টেস্ট দেয়। আর টেস্টের রিপোর্টে আসে আমি নাকি কখনো মা হতে পারবো না।

মাায়ার কথায় সবাই থমকে যায়। অরণ্যের বুকটা কেঁপে উঠল। তখনই মায়া বলে উঠলো।
–প্রথমে আমি এই খবর টা শুনে অনেক ভেঙে পড়ি। তবে ঠিক সেইদিনই যখন রিয়া এবাড়িতে এসে ওই কথাটা বললো। তখন আমার সন্দেহ হলো। কারণ একই দিনে এই ঘটনা গুলো কোন কোয়েন্সিডেন্স হতে পারে না। আর রিয়া আর আমার মামীকে ভালো করেই চিনি। তারা যে নিজের কার্য সিদ্ধির জন্য যেকোনো ষড়যন্ত্র করতে পারে সেটার আন্দাজা আছে আমার। তাইতো সেদিনই আমি রিয়ার রুমের দরজায় পাশে লুকিয়ে রিয়া আর ওর মার ফোনের কথপকথন শুনি। যেখানে রিয়া ওর মাকে বলছে, আমাদের প্ল্যান কাজ করছে মা। আমার সন্দেহ আরও গাঢ় হয়ে যায়। আমি পরেরদিনই অন্য একটা হসপিটালে গিয়ে আবারও সব টেস্ট করাই। এবং ডক্টর দেখে বলে, আমার রিপোর্টে কোন সমস্যাই নেই। আমি চাইলে যেকোনো সময় মা হতে পারবো।

অরণ্য একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। আল্লাহর লাখ লাখ শুকরিয়া আমার মায়া ঠিক আছে।
মায়া আরও বলতে লাগলো।
–পড়ে আমি খোঁজ নিয়ে জানলাম, ওই হসপিটালের নার্স রিয়ার বান্ধবী ছিল। সেই আমার রিপোর্ট পাল্টে দিয়েছে। এরপর থেকে আমি রিয়ার পিছু করি। রিয়া কোথায় যায়, কি করে সবকিছুর নজর রাখি। এবং জানতে পারি রিয়ার বাচ্চার বাবা ওই ছেলেটা। যেটা সে অরণ্যের ওপর চাপাতে চায় যাতে অরণ্যের সম্পত্তির ভাগিদার হতে পারে। আর এই প্ল্যান ওরা সবাই মিলেই করেছে। আমি লুকিয়ে ওদের কথা শুনেছি এবং রেকর্ডও করেছি।

মায়া ওর ফোন বের করে রিয়া আর ওর বয়ফ্রেন্ডের কথপোকথন শোনাল সবাইকে। যেখানে রিয়া ওর বয়ফ্রেন্ডের সাথে সব প্ল্যান করছে। তারপর মায়া আরও বললো।
–শুধু এই না। সেদিন বিয়ের দিনও রিয়ার কোন এক্সিডেন্ট হয়েছিল না। ও ওর বয়ফ্রেন্ড এর সাথে পালিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু যখন দেখলো ওর বয়ফ্রেন্ডের টাকা পয়সা নেই। তখন ও আবার ওর বয়ফ্রেন্ড কে রেখে বাড়ি ফিরে আসে। আর ফিরে এসে এক্সিডেন্ট এর নাটক করে।

সবকিছু শুনে সবাই একেবারে বাকরূদ্ধ হয়ে যায়।রাগে অরণ্যের রক্তকণিকা গুলো টগবগ করছে। অরণ্য ক্রুদ্ধ হয়ে রিয়ার দিকে তেড়ে গেল। অবস্থা বেগতিক দেখে সাহিল আর অরণ্যের চাচা অরণ্যকে ধরে আটকানোর চেষ্টা করছে। অরণ্য ক্ষিপ্ত বাঘের মতো নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলতে লাগলো।
–ছাড় আমাকে, আজ এই ডিসকাস্টিং মেয়েটাকে আমি খুন করেই ছাড়বো। ওর চ্যাপ্টার আজ চিরতরে বন্ধ করে দিবো। ওর সাহস কি করে হলো মায়ার সাথে এসব করার? ওকে তো আজ আমি খুন করেই ফেলবো।

অরণ্যের বাবা বলে উঠলেন।
–শান্ত হও অরণ্য। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার দরকার নেই। ওরা শাস্তি পাবে তবে সেটা আইন দিবে। গতবার ছেড়ে দিয়ে ভুল করেছিলাম। তবে এবার আর সেই ভুল করবো না। আমি এখুনি পুলিশকে ফোন করছি।
কথাটা বলেই অরণ্যের বাবা পুলিশকে ফোন দিল। রিয়া ভয়ে আকুতি মিনুতি করে মাফ চাইতে লাগলো। কিন্তু এবার আর কারোর মন গললো না।

একটু পরেই পুলিশ এসে রিয়াকে ধরে নিয়ে গেল। আর রিয়ার মাকেও ধরার কথা বলে দিল ওরা। সবাই মায়ার ওপর খুশী হয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলো। তবে অরণ্য মায়ার সামনে যেতে পারছেনা। ভুল বুঝে মায়াপরী কে কতো বাজে কথা শুনিয়ে দিয়েছে। এখন কোন মুখে মায়ার সামনে যাবে ও?
___

রাত এগারোটা,
মায়া বিছানায় কাত হয়ে শুয়ে আছে। অরণ্য এখনো আসেনি। আচ্ছা উনি কি এখনো আমার ওপর রেগে আছে? আমাকে কি ক্ষমা করবেন না উনি? কিভাবে উনার রাগ ভাঙাবো?
ভাবনার মাঝেই হঠাৎ পেছন থেকে একটা হাত এসে মায়ার কোমড় জড়িয়ে ধরলো। মায়ার ঠোঁটে হাসির রেখা ভেসে উঠলো। ও জানে এটা ওর অরণ্য।

অরণ্য পেছন থেকে মায়াকে জড়িয়ে ধরে মায়ার গলায় মুখ গুজে দিল। মায়া মুচকি হেসে আবেশে চোখ বন্ধ করে নিল। হঠাৎ কাঁধে তরল কিছু অনুভব করতে পেরে চোখ খুলে তাকালো মায়া। আৎকে উঠে অরণ্যের দিকে ঘুরে তাকালো মায়া। অরণ্যের চোখে পানি? বুক কেঁপে উঠল মায়ার। মায়া দুই হাতে অরণ্যের মুখটা ধরে আতঙ্কিত গলায় বললো।
–কি কি হয়েছে আপনার? কাদছেন কেন? বলুন না প্লিজ?

অরণ্য মায়ার কপালের সাথে কপাল ঠেকিয়ে অপরাধী কন্ঠে বললো।
–অ্যাম সরি সোনা,অ্যাম রিয়েল সরি। আমি তোমাকে ভুল বুঝে অনেক বাজে বিহেভ করে ফেলেছি তোমার সাথে। প্লিজ মাফ করে দাও আমাকে।

মায়া অরণ্যের ঠোঁটের ওপর আঙুল চেপে ধরে বললো।
–হুঁশশ, একদম চুপ। এসব কি বলছেন আপনি? প্লিজ এসব বলবেন না। আপনার কোন দোষ নেই। আপনার জায়গায় যে কেও থাকলে এমনই করতো। আরে মাফ তো আমার চাওয়া উচিত। অনিচ্ছাকৃত ভাবে হলেও আমি আপনাকে কষ্ট দিয়েছি। প্লিজ মাফ করে দিন আমাকে। আমি আপনাকে আগে কিছু বলিনি কারণ আপনি রেগে গিয়ে কিছু উল্টো পাল্টা করে ফেলতেন। তাই আপনাকে আগে কিছু বলিনি।

অরণ্য আবেগ ভরা কন্ঠে বললো।
–জানো আমি কতো ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম? ভেবেছিলাম তুমি আমাকে ভুল বুঝে দূরে চলে যাবে। তাইতো রাগের মাথায় ওসব কথা বলে ফেলেছি আমি। কিন্তু বিশ্বাস করো আমার মনে এসব কিছুই নেই।

–আমি জানি। আমাকে কিছুই বলতে হবে না। নিজের থেকেও বেশি বিশ্বাস আছে আপনার ওপর।

অরণ্য মায়ার একটা গভীর চুমু দিয়ে বললো।
–ভালোবাসি মায়াপরী। অনেক ভালোবাসি।

–আমিও আপনাকে ভালোবাসি। নিজের থেকেও বেশি। আপনার কাছে একটা চাওয়া আছে আমার। দিবেন আমাকে?

–বলনা। জিজ্ঞেস করার কি আছে? আমার তো সবকিছুই তোমার।

–আমি মা হতে চাই। আমার গর্ভে আপনার সন্তান চাই। আমার একটা জুনিয়র অরণ্য চাই। দিবেন আমাকে?

অরণ্য দুষ্টু হেসে বললো।
–উহুম,দিবো না?

–কেন?

অরণ্য মায়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে লো ভয়েসে বললো।
–কারণ আমি ছোট্ট একটা মায়াপরী দিবো।
কথাটা বলে কানে চুমু খেল। আর মায়া লজ্জায় লাল হয়ে গেল। অরণ্য হারালো মায়াতে। আবারও এক হলো মায়ারণ্য।
____

সাহিল মাত্রই অফিস থেকে ফিরেছে। বাসায় ঢুকতেই কেমন যেন হৈচৈ দেখতে পেল। সাহিল ভ্রু কুঁচকে সিড়ি বেয়ে উপরে উঠতেই দেখলো সারার রুমের সামনে সব ভীড় করে আছে। আর দরজায় নক করে বারবার সারাকে ডেকে যাচ্ছে। এসব দেখে সাহিলের বুকের ভেতর ধুক করে উঠলো। ওর পিচ্চি পরির কিছু হলো নাতো? সাহিল দ্রুত গিয়ে উত্তেজিত কন্ঠে বললো।
–কি হয়েছে এখানে? আর সারাকে এভাবে ডাকছ কেন তোমরা?

এলিসা চাচী কাঁদো কাঁদো গলায় বললো।
–বাবা সাহিল দেখনা মেয়েটার কি হয়েছে? সেই কখন চলে দরজা আটকে বসে আছে। এতো ডাকছি কোন সারাই দিচ্ছে না। তুমি কিছু করোনা একটু।

–কিন্তু হয়েছে টা কি?

–তাতো জানি না। হঠাৎ দেখি ও কাঁদতে কাঁদতে নিজের রুমে ঢুকে গেল। আর তখন থেকেই দরজা আটকে বসে আছে। আমার অনেক ভয় করছে।

সাহিলের এবার ভয় হতে শুরু হলো। কি হলো ওর পরিটার? সাহিল এবার দরজায় করাঘাত করে বললো।
–এই সারা দরজা খোল। কি হয়েছে বল আমাকে? কেউ কিছু বলেছে? একবার বল আমাকে আমি সব ঠিক করে দিবো। দরজা খোল একবার। নাহলে কিন্তু আমি দরজা ভেঙে ফেলবো।

সারা দরজা খুলছে না। সাহিলের ভয় আরও বেড়ে গেল। সাহিল এবার দরজা ভাঙার প্রস্তুতি নিলো। তখনই দরজা টা খুলে গেল।সাহিল একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। সারা দরজা খুলে একটা লাগেজ নিয়ে বেড়িয়ে এলো। সাহিল রাগী কন্ঠে বললো।
–কি করছিলি তুই ভেতরে হ্যাঁ? এখানে যে সবাই তোর জন্য পেরেশান হচ্ছিল তার খেয়াল আছে? আর ব্যাগ বস্তা নিয়ে কোথায় যাচ্ছিস?

সারা সাহিলের কথার কোনো জবাব না দিয়ে ওর মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো।
–মা আমি এখুনি লন্ডন যাবো নানুর ওখানে। আর আমি এখন থেকে ওখানেই থাকবো। আমি নানুকে বলে দিয়েছি। উনি আমার যাওয়ার সব ব্যবস্থা করে দিয়েছে।

সারার কথায় সবাই অবাক হয়ে গেল। এলিসা বেগম চিন্তিত সুরে বলে উঠলো।
–কিন্তু হঠাৎ করে এভাবে যাবি কেন? হয়েছে কি সেটাতো বল? আর তোকে ছাড়া আমরা কিভাবে থাকবো?

–এতকিছু আমি বলতে পারবোনা। আমাকে যেতে না দিলে আমি কিন্তু বাড়ি ছেড়ে এমনি একদিক চলে যাবো। তাই আমাকে যেতে দাও এক্ষুণি।

সাহিলের এবার রাগ উঠে যাচ্ছে। সাহিল হাতের মুঠো শক্ত করে দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠলো।
–মামী আপনারা নিচে যান। আমি ওকে দেখছি।
সবাই মাথা ঝাকিয়ে নিচে নেমে গেল। ওরা জানে সাহিল সামলে নিবে সবকিছু। ওরা চলে যেতেই সাহিল সারার হাত ধরে রুমের ভেতরে নিয়ে এসে দেয়ালের সাথে চেপে ধরে চোয়াল শক্ত করে বললো।
–কি হচ্ছে এসব? এসব কি নতুন ড্রামা শুরু করেছিস? লন্ডনে চলে যাবি মানেটা কি? মজা চলছে এখানে কোনো? এটা চিন্তা করারও তোর সাহস কি করে হলো?

সারা এবার ক্ষিপ্ত সুরে বললো।
–কেন? কেন হবে না? সবকিছু কি আপনার ইচ্ছে মতো হবে নাকি? আমি যাবো মানে যাবো।ছাড়ুন আমাকে।

–কতো পারিস ছাড়িয়ে দেখা। আমাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা চিন্তা করলেও তোর ঠ্যাং ভেঙে ঘরে বসিয়ে দিবো। তবুও তোকে এবাড়িতেই থাকতে হবে।

–কেন? কেন থাকবো শুনি? যাতে এখানে বসে বসে আপনার বিয়ের রঙঢঙ দেখতে পারি?

সাহিল ভ্রু কুঁচকে বললো।
–হোয়াট? বিয়ে? কিসের বিয়ে?

–ঢঙ তো এমন করছেন যেন কিছু জানেনই না। আর ঢঙ করতে হবে না। আমি জানি আপনি আপনার ওই পেত্নী ফুপাতো বোনকে বিয়ে করছেন। আজ ফুপিকে বলতে শুনেছি। ফুপি মা আর বড় মাকে বলছিল।সে আপনার জন্য তার ননদের মেয়েকে পছন্দ করেছে। তাকে আপনার বউ করে আনবে।

সাহিল বাঁকা হেঁসে বললো।
–তো এইজন্যেই বুঝি বনবাসে যাওয়ার প্ল্যান করেছিস?

সাহিলের এমন খোঁচা মারা কথায় শরীর জ্বলে গেল সারার। সারা ক্রুর চোখে তাকালো সাহিলের দিকে। যেন চোখ দিয়েই ভস্ম করে দিবে। সাহিল আবারও দুষ্টু হেসে বললো।
–বলনা? আমি বিয়ে করলে তাতে তোর কি যায় আসে?

সারা রাগী কন্ঠে বললো।
–কিচ্ছু যায় আসে না। আপনি যাকে খুশী তাকে বিয়ে করেন। চাইলে ওই শেওড়া গাছের পেত্নীকে বিয়ে করেন তাতে আমার কি? ছাড়ুন আমাকে। আমি এখুনি চলে যাবো।

সাহিল সারার কানের কাছে ঝুঁকে বললো।
–বায়দা ওয়ে আমার ফুপাতো বোনটা কিন্তু সত্যিই অনেক হট। বিয়ে করলে ভালোই জমবে মনে হচ্ছে।

সারা আর সহ্য করতে পারলোনা। হঠাৎ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। চমকে গেল সাহিল। দুই হাতে সারার মুখটা ধরে আদুরে গলায় বললো।
–হেই পিচ্চি পরি কাঁদছিস কেন? আমিতো মজা করছিলাম বাবু।কাঁদিস না প্লিজ।

সারা কাঁদতে কাঁদতে দুই হাতে সাহিলের বুকে এলোপাতাড়ি মারতে মারতে বলতে লাগলো।
–আপনি খুব পঁচা।একটুও ভালো না।ওই পেত্নীর নানিকে বিয়ে করতে চান আপনি? পঁচা পঁচা পঁচা। আই হেট ইউ, আই হেট ইউ, আই হেট ই…….

আর বলতে পারলোনা সারা।সাহিল তার অভিনব কৌশলে সারার মুখ বন্ধ করে দিল। সারাও হঠাৎ শক খেয়ে ফ্রিজড হয়ে গেল। বন্ধ হয়ে গেল ওর হাত। একটু পরে সাহিল সরার ঠোঁট ছেড়ে দিয়ে সারার কপালে কপাল ঠেকিয়ে বললো।
–তুই ভাবলি কি করে এই সাহিলের জীবনে অন্য কেউ আসতে পারে? আরে যেখানে আমার জীবন রেখাটাই তোর হাতে বন্দী। সেখানে অন্য কাওকে দেওয়ার মতো আর কি আছে আমার কাছে? মা হয়তো এমনি কথার কথায় বলে দিয়েছে। তাই বলে তুই সেটা সত্যি ভেবে নিয়ে আমাকে ছেড়ে চলে যাবি? এতো পাগল কেন তুই? কবে একটু বুদ্ধি আনবি মাথায়। আমার ওপর কি একটুও বিশ্বাস নেই তোর?

সারা নাক টানতে টানতে বললো।
–আ আমি কি করবো? ওই কথাটা শুনে আমার অনেক খারাপ লাগছিল।একদম সহ্য হচ্ছিল না। তাইতো চলে যাচ্ছিলাম।

–আচ্ছা এই কথা? ঠিক আছে চল আমার সাথে।
কথাটা বলেই সাহিল সারার হাত ধরে নিচে নিয়ে এলো। নিচে সবাই জড়ো হয়ে আছে। সাহিলের বাবা, আর দুই মামাও আছে। সাহিল সারাকে নিয়ে এসে সবার উদ্দেশ্যে বলে উঠলো।
–আজকের পর থেকে কেউ আমার জন্য কোন মেয়ে দেখবে না। কারণ বিয়ে করতে হলে শুধু আমি সারাকেই করবো। এখন বাদবাকি আপনারা বড়োরা মিলে ডিসাইড করে নিন। কথাটা বলেই সাহিল যেভাবে এসেছিল সেভাবেই হনহন করে চলে গেল।

বেচারি সারা এখন কি করবে? লোকটা যে ওকে এভাবে ফাঁসিয়ে দিয়ে চলে যাবে তা ভাবতেই পারেনি। এবার ও কোনদিকে পালাবে? বেচারি সবার দিকে চোরা চোখে তাকিয়ে জোরপূর্বক ক্যাবলা একটা হাসি দিয়ে ভোঁ দৌড় দিয়ে পাগাড় পার হয়ে গেল।

বাকি সবাই টাস্কি খেয়ে অটো হয়ে গেল। একজন আরেকজনের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। কয়েক সেকেন্ড পর হঠাৎ করে সবগুলো একসাথে উচ্চস্বরে হেঁসে দিল।
__

আজ সারা সাহিলের এনগেজমেন্ট। বাড়িতে উৎসব মুখোর পরিবেশ।সারার খুশী যেন ধরছে না। সাহিল শুধু তার পিচ্চি পরিটাকে মুগ্ধ নয়নে দেখে যাচ্ছে। রাইসা দুই মাসের প্রেগন্যান্ট। ইহান আর ইরিনের সম্পর্কটাও অনেক মধুর হয়ে উঠেছে। স্বাভাবিক স্বামী স্ত্রীর মতো সম্পর্ক গড়ে উঠেছে তাদের।

অনুষ্ঠান শেষে ছাঁদে এসে বসে আছে অরণ্য আর মায়া। মায়ার কোলের মাঝে মাথা দিয়ে শুয়ে আছে অরণ্য। আর তার মায়াপরীর দর্শন করে যাচ্ছে। মায়া অরণ্যের চুলে হাত বোলাতে বোলাতে বলে উঠলো।
–আপনাকে একটা কথা বলার ছিল।

–বলনা।

–আর বেশিদিন কিন্তু আপনি আর এভাবে কোলে মাথা দিয়ে থাকতে পারবেন না। অন্য আরেকজনও আপনার সাথে ভাগ বসাতে চলে আসছে। আর তার ভাগ টাই বেশি থাকবে।

অরণ্য কিছু একটা আন্দাজ করতে ঝট করে উঠে বসলো। মায়ার গালে হাত দিয়ে বিস্ময় ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো।
–আর ইউ সিরিয়াস?

মায়া মাথা ঝাকিয়ে বললো।
–হ্যাঁ। আমি মা হতে যাচ্ছি। মায়ারণ্যের ভালোবাসা সম্পূর্ণতা পেয়েছে।

অতিমাত্রায় খুশীর বহিঃপ্রকাশ স্বরূপ অরণ্যের চোখের কোনে অশ্রু জমে গেল। মায়ার কপালের সাথে কপাল ঠেকিয়ে অশ্রু চোখে হেসে উঠলো। মায়ার কপালে চুমু খেয়ে বুকের মাঝে জড়িয়ে নিল সে। সত্যি মায়ারণ্যের প্রেমোকাহিনি সম্পূর্ণ হলো।

__________🌹🌹সমাপ্ত🌹🌹__________

(গত পর্বের আপনাদের মহান মহান বাণী গুলোর জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ। শুধু একটা পর্ব পরেই গল্পের আগাগোড়া ডিসাইড করে ফেললেন আপনারা।এটা দেখে আমি সত্যিই শিহরিত। যাইহোক আশা করি আপনারা আপনাদের মহান উক্তিগুলোর উত্তর পেয়ে গেছেন।
যদিও গল্পটা আর কয়েকটা পর্ব লিখতাম। তবে সেটারও ইচ্ছে মরে গেছে। তাই এই পর্বেই শেষ করে দিলাম।

আমরা মানুষ বড়ই অদ্ভুত। সবসময় ভীন্ন কিছু চাই। অথচ ভীন্ন কিছু আনলে সেটাকে আবারও নরমাল করার পেছনে লেগে পড়ি। ভিন্নধর্মী একটা গল্প আনায় এই গল্প টা নিয়ে প্রথম থেকেই নানান সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছে। তবে আপনাদের দোষ দেবনা। হয়তো আমারই লেখনীতে কোথাও কমতি আছে।
যাইহোক ভালো থাকবেন সবাই। ভুল ত্রুটি ক্ষমার চোখে দেখবেন। আর আপনারা চাইলে পরবর্তী গল্প আনবো। নাহলে আনবো না। আর হ্যাঁ এখন থেকে আমার পরবর্তী গল্প শুধু আমার নিজস্ব পেইজ আর গ্রুপে দিবো।কোনো পাবলিক গ্রুপে দিবোনা। তাই যারা আমার গল্প পড়তে ইচ্ছুক তারা আমার পেইজ বা গ্রুপ ফলো করবেন। )

গল্প নিয়ে যেকোনো আলোচনা আড্ডা দিতে আমার গ্রুপে জয়েন হওয়ার আমন্ত্রণ রইল।
গ্রুপ
https://facebook.com/groups/170529085281953/

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here