দোলনচাঁপার_সুবাস #পর্বঃ৩৩ #লেখনীতে- তাসফিয়া হাসান তুরফা

0
153

#দোলনচাঁপার_সুবাস
#পর্বঃ৩৩
#লেখনীতে- তাসফিয়া হাসান তুরফা

নিশীথ রাগে গজগজ করছে নিজের রুমে। ইতিমধ্যে কয়েকটা জিনিস ভেঙে ফেলেছে। অবশ্য ও রুমে একা নেই, ওর সাথে আছেন ওর দাদু, ইউনুস তালুকদার। মূলত তিনিই নিশীথকে টেনে নিয়ে এসছেন এখানে। ইউনুস সাহেব বুঝতে পেরেছিলেন আজ নিশীথ মুখ খুললে নির্ঘাত ঘরের মধ্যে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ লেগে যাবে বাপ-ছেলের মাঝে। তাই, নিশীথ কথা বলার আগেই ওকে বলতে সুযোগ না দিয়ে ওখান থেকে টেনে রুমে নিয়ে আসেন ইউনুস সাহেব। দরজার লাগানোর পর থেকেই নিশীথ কিছু জিনিসপত্র ভাঙাচোরা করেছে, এলোমেলো করেছে। মোট কথা, নিজের ভেতরকার চাপা রাগ ঝাড়ছে নিষ্প্রাণ জিনিসপত্রের উপর! ইউনুস সাহেব বিছানায় বসে বসে নাতির কর্মকাণ্ড দেখছিলেন শুধু। ওকে সময় দিচ্ছিলেন কিছুক্ষণ রাগ ঝেড়ে ভেতরের আ’গুন ঠান্ডা করার। এরপর ওর সাথে কথা বলা যাবে! মিনিট দশেক পর নিশীথ একা একাই থেমে গেলো। কি মনে করে হঠাৎ দেয়ালে হেলান দিয়ে মাটিতে বসে পড়লো। ইউনুস সাহেব মনোযোগ দিয়ে নাতির কর্মকাণ্ড লক্ষ্য করলেন। ওর উদ্দেশ্যে কথা বলার এটাই সময় ভেবে মুখ খুললেন।

—নিশীথ..

—কেন উনি সবসময় আমার সাথে এরকম ব্যবহার করে, দাদু?

দাদুকে থামিয়ে নিশীথ উদাস স্বরে বলে উঠলো। ইউনুস সাহেব কিছুক্ষণের জন্য থমকে গেলেন। নিশীথ উদাস মুখে চেয়ে আছে নিচের দিকে। নাতির এহেন প্রশ্নের কি জবাব দেওয়া উচিত তিনি সঠিক ভেবে পেলেন না! তবু ওকে বুঝ দিতে বললেন,

—বাবারা একটু-আধটু এরকম করেই থাকে, দাদাভাই। তুই মনে কষ্ট নিস না! আমি আয়মানের সাথে এ ব্যাপারে কথা বলবো। তুই চিন্তা করিস ন..

—একটু-আধটু? এ কথা তুমি বলছো, দাদু? তুমি কি দেখোনাই তোমার ছেলে আমার প্রতি বেশিরভাগ সময় কিরকম আচরণ করে?

—সেটা তো সব পিতামাতাই টুকটাক করে থাকে, নিশীথ। তুই তো জানিস তোর বাপ তোর মতোই রগচ’টা। এজন্যই মাঝেমধ্যে এরকম…

—না, দাদু। তুমি ভুল বলছো এবার। তোমার ছেলের আমি বাদেও আরেকটা সন্তান আছে। কিন্তু তার প্রতি উনার আচরণ আর আমার প্রতি উনার আচরণে রাত-দিন তফাৎ। একদিন শুধু ভালোমতো আমার প্রতি উনার ব্যবহার আর নিশানের প্রতি উনার আচরণের মধ্যে তুলনা করে দেখো। ওইদিন পার্থক্যটা নিজেই বুঝবে!

তাচ্ছিল্যের সাথে বলে উঠলো নিশীথ। ও ক্লান্ত, রোজ রোজ বাবার সাথে এসব দ্বন্দে। নিশীথ জানে হয়তো ওর ছন্নছাড়া লাইফস্টাইল, দায়িত্বহীন জীবনযাপন ওর বাবার পছন্দ নয় বলেই উনি ওর সাথে এমন ব্যবহার করে। কিন্তু এখন তো ও নিজেকে শুধরে নিচ্ছে। কাজে জয়েন করেছে, এভাবেই জীবনটাকেও ঠিকি গুছিয়ে নিবে। তাইতো সে একবুক আশা নিয়ে জীবনে প্রথমবার নিজের জন্য কিছু চাইতে গিয়েছিলো বাবার কাছে। মনে মনে নিশীথের বিশ্বাস ছিলো, অন্যদিন ওর বাবা ওর সাথে যতই মতবিরোধ করুক না কেন বিয়ের মতো ব্যাপারে ওর মতের উপর নিজের মতামত চাপিয়ে দেবেন না নিশ্চয়ই!

অথচ, আজ সাহস করে সকলের সামনে বিয়ের কথা তুলতেই নিশীথের সেই আশার প্রদীপটুকুও টুপ করে নিভে গেল! সে তো কোনো অন্যায় দাবি করতে যায়নি। বরং পরিবারের সকলের সম্মতি নিয়ে নিজের প্রিয়তমার সাথে বিয়ের কথাই তুলতে গিয়েছিলো। অথচ কিনা এখানেও ওর সাথে একমত হলেন না আয়মান সাহেব? উপরন্তু, একগাদা অভিযোগ চাপিয়ে দিলেন নিশীথের উপর!

বাবার প্রতি এক আরাগে-অভিমানে নিশীথ এর অন্তর শক্ত হয়ে আসে। দু’চোখে ক্রো’ধের অন’ল জ্ব’লতে থাকে ক্রমশ। ছেলে হিসেবে এ অপমানবোধ বাবার প্রতি অভি’মানের পাহাড় এক লাফে দ্বিগুণ উচ্চতায় বেড়ে যায়। ইউনুস সাহেব বয়সের ভারে আস্তেধীরে উঠে দাঁড়ালেন বিছানা থেকে। মাটিতে বসে থাকা নাতির কাছে গিয়ে ওর পিঠে হাত রাখতেই নিশীথ মাথা তুলে তাকালো। দাদুকে ওর দিকে ঝুকে থাকতে দেখে মুহুর্তের মাঝেই উঠে দাড়ালো ফ্লোর থেকে। দুই হাতে দাদুকে ধরে বললো,

—তুমি এখানে এলে কেন, দাদু? তোমাকে ডক্টর মানা করেছেনা বেশি নড়াচড়া করতে? আসো বিছানায় বসবে!

যত্নের সহিত দাদুকে নিয়ে এসে বিছানায় বসিয়ে নিশীথ নিজে বসলো তার পায়ের নিকট। দাদুর হাটুতে মাথা রাখলো। ইউনুস সাহেব নাতির মাথায় হাত রাখলেন। নরম গলায় শুধালেন,

—আয়মান ও নিশানের প্রতি তোর খুব অভিমান। তাই না রে, দাদুভাই?

নিশীথ খানিকটা হাসলো। ধীর কণ্ঠে জবাব দিলো,

—নিজের বাবা ও ভাইয়ের প্রতি কিই-বা অভিমান করবো, দাদু? আমার অভিমান করেও বা কি আর হবে? না নিশানের প্রতি তোমার ছেলের ভালোবাসা কমবে, না আমার প্রতি তার উদাসীনতা!

—আয়মান তোর প্রতি উদাসীন নয়। হ্যাঁ, তোর সাথে যতটা কড়া ব্যবহার করে নিশানের প্রতি ততটা করেনি হয়তো। এর পেছনের কারণটা তো তুই নিজেও জানিস তাইনা?

নিশীথ জবাব দেয়না। চুপচাপ দাদুর হাটুতে মাথা রেখে পড়ে থাকে সেভাবেই। ইউনুস সাহেব কিছুক্ষণ থেমে বললেন,

—দেখ নিশীথ, আয়মানের চিন্তার পেছনে কারণ আছে। তোকে শুধু নিজের দিকটাই ভাবলে হবেনা। তোর বাপের দিকটাও ভেবে দেখতে হবে। সন্তানদের নিয়ে বাবাদের কত চিন্তা হয় সেটা আমি বুঝছি, তোরা বুঝবিনা। আগে নিজে বাপ হ তারপর বুঝবি।

—বিয়ে করতেই দিচ্ছোনা, বাপ হবো কিভাবে!

—নিশীথ!

দাদু হেসে উঠেন নাতির কথায়। ওর পিঠ চাপড়িয়ে বললেন,

—এক হিসেবে তোর বাবা কিন্তু ঠিক কথাই বলেছে। তুই নিজেই ভেবে দেখ, নিশান তোর বড় ভাই। ও তোর চেয়ে দু বছরের বড়, ওরই এখনো বিয়ে হয়নি। সেখানে তুই মাত্র জবে জয়েন করলি আর এখনি বিয়ে করতে চাইছিস বিষয়টা কেমন দেখায় না? তোকে তো কেউ প্রেম করতে মানা করেনি, দাদুভাই। অফিস কর, দোলার সাথে প্রেম কর। কেবল তো প্রেম শুরু হলো তোদের। এখনই বিয়ের তাড়া কিসের?

নিশীথ দাদুর কথা মন দিয়ে শুনে। সবকিছু বুঝে গোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মাথা তুলে দাদুর হাত দুটো নিজের হাতে নিয়ে বলে,

—তোমার থেকে তো আমি কিছুই লুকোইনি, বুড়ো। তুমি তো সবই জানো! দোলনচাঁপার প্রতি আমার ভালোবাসা, মেয়ে হিসেবে ও কেমন- তা তো নিজেই দেখেছো। আমার সবকিছুই তুমি জানো। এবার তুমিই বলো, ওকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়ে কি আমি ভুল কিছু করেছি?

দাদু মাথা নাড়লেন। নিশীথ ভুল সিদ্ধান্ত নেয়নি। তা দেখে ও আবারো বললো,

—দোলার পরিবার সম্পর্কেও আমি তোমায় বলেছি। বাবা নেই ওর। মায়ের ছায়ায় একা একা মানুষ হওয়া সন্তান ওরা। এমন মেয়েরা একটু ভীতু হয়, আর বাকি দশজনের মতো প্রেম করাটা ওদের কাছে তত সহজ হয়না। আমার কাছে মনে হয় এজন্যই দোলা আমায় পছন্দ করা সত্ত্বেও আমার সাথে ওভাবে মিশতে পারেনা। আর আমি যেহেতু ওর ব্যাপারে সিরিয়াস, তাই আমিও ওর পরিস্থিতির কথা ভেবেই ওর মায়ের কাছে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে এসেছি! এজন্যই আজ বাবার কাছে বিয়ের ব্যাপারে….

—দোলার মা-কে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে এসেছিস মানে? কবে হলো এটা? বলিসনি তো?

নিশীথ ফোস করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে দাদুকে সবকিছু খুলে বলে। এগুলো শুনে এবার ইউনুস সাহেবও চিন্তায় পড়ে গেলেন। নিশীথের কথা শুনে মনে হচ্ছে জল গড়িয়ে কতদূর গেছে। এখন এ বিষয়ের কোনো একটা গতি করতে হবে। তবে তা কিভাবে হবে কারও জানা নেই। উনি নিশীথকে বুঝালেন, আপাতত খন্দকারদের সাথে ডিনার অব্দি যেন সে চুপ করে থাকে। কোনো ঝামেলা না বাধায়। ততদিনে আয়মান সাহেবকে এ বিষয়ে বুঝানোর একটা না একটা ব্যবস্থা করে ফেলা যাবে!

দাদুর কথায় নিশীথও ঠান্ডা মাথায় কিছুক্ষণ ভাবলো এ ব্যাপারে। তারপর মাথা নেড়ে সায় জানালো। দাদু সন্তুষ্টচিত্তে রুম থেকে চলে গেলেন ঠিকি, কিন্তু নিশীথের বিক্ষিপ্ত মন অশান্তই থেকে গেলো!

___________________

পরদিন রাত। ঘড়িতে ১২.১৫টা বাজে। এলাকার গলিতে দু-একটা আশ্রয়হীন কুকুর ছাড়া তেমন কাউকে দেখা যাচ্ছেনা। স্বাভাবিকভাবেই সকলে নিজ নিজ বাড়িতেই অবস্থান করছে। কেউ বা ঘুমের সাগরে তলিয়ে আছে তো কেউ রাত জেগে পড়াশুনা করছে। তো কেউ লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেমিকের সাথে ফোনালাপে ব্যস্ত! চারদিকে এতকিছু হয়ে গেলেও নিশীথের চোখে ঘুম নেই। শুধু আজ নয়, গত রাত ধরেই সে ঘুমোতে পারছেনা ঠিকমতো। মন শান্তিতে না থাকলে কি শরীর শান্তিতে ঘুমোতে পারে? পারেনা। নিশীথও পারলোনা। নিজের সাথে লড়াই করে মিনিটখানেক কিছু একটা ভেবে উদোম গায়ে শার্ট চেপে রুম থেকে বেরিয়ে এলো। চুপিসারে কাউকে না বলে বাসা থেকেও বেরিয়ে গেলো সবার অগোচরে। মনের শান্তি বড় জরুরী। এর চেয়ে বেশি ইম্পর্ট্যান্ট কিছুই নেই।

দোলা শুয়েছে বেশ কিছুক্ষণ হলো। বালিশের নিচে থেকে সশব্দে ফোন বেজে উঠতেই চমকে ঘুম থেকে উঠলো। ঘুমু ঘুমু চোখজোড়া বুজে ফোন বের করতেই স্ক্রিনে নিশীথের নাম দেখতে পেলো। এই মাঝরাতে নিশীথ ফোন দিয়েছে? কিন্তু কেন? ওর কোনো বিপদ হলো না তো?
দোলার মস্তিষ্কে হরেকরকম প্রশ্ন এলো!

—হ্যালো?

নিশীথ জবাব দিলোনা। প্রেয়সীর ঘুমজড়ানো কণ্ঠ শুনে ধীরে এক দীর্ঘশ্বাস ফেললো। দোলা আবারো জিজ্ঞেস করলো,

—শুনছেন? নিশীথ ভাই? হ্যালো।

—বারান্দায় আসো!

দোলা যেন ঠিক বুঝতে পারলোনা ওর কথাটা। বোকার ন্যায় শুধালো,

—মানে?

—তোমার রুমের বারান্দায় আসো, দোলনচাঁপা। দেরি করবেনা। আই ওয়ান্ট ইউ রাইট নাও!

দোলা হতবুদ্ধির ন্যায় উঠে দাড়ালো বিছানা থেকে। পাশ থেকে ওড়না হাতে নিয়ে মাথায় পেচিয়ে কোনোরকম ছুটে চলে গেলো নিজ রুমের বারান্দায়। অথচ ফোন এখনো কাটেনি নিশীথ, দোলাও কানে ফোন ধরে আছে! বারান্দায় রেলিং ধরে নিচে উঁকি দিতেই ওদের বাসার সামনে নিশীথকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতে পেলো দোলা! বিস্ময়ে চোখদুটো বড় বড় হয়ে এলো ওর। কানে ফোন রেখেই অস্ফুট স্বরে শুধালো,

—আপনি এ সময় এখানে কি করছেন, নিশীথ ভাই?

—তোমায় দেখতে এসেছি। দেখার অনুমতি দেবে?

দোলার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থেকে নিশীথ গম্ভীর কণ্ঠে শুধালো। ওর কথায় কি যেন ছিলো, হঠাৎই আনমনে দোলার বুক কেপে উঠলো। ও ভাবলো, এভাবে বলছে কেন নিশীথ? কি হয়েছে ওর?

#চলবে

প্রিয় পাঠক, আমি ক’দিন যাবত কিছু ব্যস্ততার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি এবং ফ্রি হতে খানিকটা সময় লাগবে আমার। তাই, আগামী পর্ব দিতেও একটু দেরি হতে পারে। আশা করছি সকলে আমায় বুঝবেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here