যার_কথা_ভাসে_মেঘলা_বাতাসে #পর্ব_১৯ #তাসমিয়া_তাসনিন_প্রিয়া

0
519

#যার_কথা_ভাসে_মেঘলা_বাতাসে
#পর্ব_১৯
#তাসমিয়া_তাসনিন_প্রিয়া

( মুক্তমনাদের জন্য উন্মুক্ত।)

ঔষধ খেয়ে কিছুক্ষণ ঘুমানোর পর আবারও জেগে উঠেছে মেয়েটা। তবে ঠিক হুঁশে নেই। জ্বরের ঘোরে আছে। মাঝে মধ্যে একা একাই কথা বলছে। সমুদ্রর কেমন দিশেহারা লাগছে। চঞ্চল মেয়েটাকে এভাবে চুপচাপ থাকতে দেখতে মোটেও ভালো লাগছে না তার। সকাল হলেই বিনাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাবে বলে ঠিক করেছে সমুদ্র। অনেকদিন ধরে জ্বর কিন্তু বিনা চেপে গেছে। সমুদ্র যখনই জ্বরের প্রসঙ্গ তুলেছে তখনই প্যারাসিটামল খাচ্ছে বলে কথা ঘুরিয়ে ফেলেছে বিনা। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেয়েরা শরীরের বিষয় উদাসীন বেশি। এরা অসুখ হলেও চেপে যায়।
” সমুদ্র সাহেব! ”
বিনার অস্ফুটে ডাকে সমুদ্র নড়েচড়ে বসলো। বিনাকে কোলে শুইয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল সমুদ্র।
” হ্যাঁ বিনা বলো। কেমন লাগছে তোমার? মাথা ব্যথা কি খুব বেশি হচ্ছে? ”
” আমায় ছেড়ে যাবেন না! যাবেন না তো?”
বিনা চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে বললো। জ্বরের ঘোরে মেয়েটা যে এসব বকছে সেটা সমুদ্র বুঝতে পেরেছে। কোল থেকে সরিয়ে বালিশের ওপর শুইয়ে রেখে বিছানা থেকে উঠলো সমুদ্র। রান্নাঘর থেকে একটা বাটিতে অল্প পানি নিয়ে ঘরে এলো। বিনার মাথার পাশে বসে কাপড় ভিজিয়ে জলপট্টি দিতে লাগলো। একবার দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো সমুদ্র। রাত সবে বারোটা বেজেছে। অনেক সময় বাকি সকাল হতে….

” তুমি কি খেয়াল করেছো চাচি যেন কেমন হয়ে গেছে আজকাল? ”
ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে চুল বিনুনি করতে করতে বললো কন্ঠ। খাওয়াদাওয়া করে দু’জনে ঘরে এলো মাত্র। ইফতি কন্ঠর কথাট আগামাথা কিছুই বুঝল না।
” কেমন হয়ে যাচ্ছে? ক্লিয়ার করে বল তো।”
কিঞ্চিৎ ভ্রুকুঞ্চন করে ইফতি কন্ঠর দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে শুধালো।
” বিনার সাথে অদ্ভুত আচরণ করেন চাচি। বিনার প্রতি সমুদ্রর ভালোবাসা তিনি ভালো চোখে দেখেন না। চাচি মনে হয় মানসিকভাবে অশান্তিতে আছে। হয়তো ভাবছে সমুদ্র বিনাকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে।”
” এটা কী ধরনের কথা! স্ত্রী’কে ভালোবাসা কি অন্যায়? আমি মায়ের সাথে কথা বলে দেখবো।”
” তুমি বাসায় যেদিন থাকবে সেদিন একটু খেয়াল করে দেখো তাহলেই বুঝতে পারবে।”
” ঠিক আছে। এখন কি তুই ড্রেসিং টেবিলের সামনেই বসে থাকবি? না-কি বিছানায় আসবি?”
কন্ঠ থমকাল। ইফতি কি আজকেই তার কাছে অন্য কিছু আবদার করে বসবে? তবে এতে ইফতির কোনো দোষ নেই। কিন্তু কন্ঠর সময় লাগবে হয়তো। কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে বিছানায় এসে নিজের জায়গায় শুইয়ে পড়লো কন্ঠ।
” এখন বাতি নিভিয়ে ঘুমাও।”
ইফতি ঘরের বাতি নিভিয়ে বিছানায় শুয়ে ফোনের দিকে মনোযোগ দিলো। মনে মনে নিজেকে বকা দিলো কন্ঠ। একটু বেশি বেশি ভাবছে আজকাল। ইফতি তো নিজের মতো সময় কাটাচ্ছে।
” কিছু বলবি?”
হঠাৎ ইফতির কথায় চমকাল কন্ঠ। মানুষটা কি মনের কথাও শুনতে পায়?
” আচ্ছা মন ভালোবাসলে নাকি তাকে পাওয়া যায়? ”
“সব ভালোবাসা আসলে ভালোবাসা হয় না। কিছু আছে মন্দবাসা। ভালোবাসা থাকলে মানুষটার সাথে তুই ভালো থাকতে। কিন্তু তোমাদের মধ্যে ছিল মন্দবাসা। এজন্য আজ তোরা দুজনেই মন্দ আছিস। মানিয়ে নেওয়া এক বিষয় আর মেনে নেওয়া আরেক। বিপরীত দিকের মানুষের সাথে মানিয়ে নেওয়া দোষের কিছু না। তবে তার সব নেগেটিভ দিকগুলো মেনে নেওয়া অবশ্যই খারাপ। ”
” তুমি কীভাবে বুঝলে আমি প্রহরের কথা বললাম? ”
” তোর মন ও মস্তিষ্কে প্রহর ছাড়া দ্বিতীয় কেউ নেই। ”
” এই সত্যি বদলেছে এখন। তবে হ্যাঁ আমি কখনো ওর খারাপ দিক জেনে মেনে নেইনি।”
” না নিলে বাসে বসে পাশে বসতে দিলি কেনো? অতটুকু কথা বলারও বা সুযোগ কেন দিলি?”
কন্ঠ বিস্মিত হলো। ইফতি কীভাবে জানলো? কন্ঠ ইফতির আঁখি যুগলের দিকে দৃষ্টিপাত করলো। চোখগুলো কেমন লালচে বর্ণের হয়ে গেছে। ভেতরটা যে জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
” তুমি কীভাবে জানলে?”
” বাসে আমাদের এলাকার সুমন ছিল। তোদের পেছনের সিটেই। তোদের কথাবার্তা ওরকম শুনে আমাকে বললো। লোকটা যে প্রহর সে বিষয় আমার কোনো সন্দেহ নেই। ”
” সরি!”
” বোকা মেয়ে সরি বলছিস কেনো? আমি জানি তুই কেমন। তবে আমার হিংসা হয়েছে। আমি চাই না আমার স্ত্রী তার প্রাক্তনের সামনাসামনি হোক কখনো, কথা তো দূর! ”
” পৃথিবীটা গোল। হুটহাট দেখা হয়ে গেলে কী করার বলো? তবে হ্যাঁ আর কখনো কথা বলবো না। ”
” আমি তোকে কথা বলতে মানা করিনি। তুই তোর ইচ্ছে মতোই চলবি। মুক্ত পাখির মতো উড়বি। শুধু দিনশেষে আমার এই বক্ষপিঞ্জরে ফিরিস।”
” এতো ভালোবাসো?”
ইফতি কন্ঠর দিকে ফিরে শোয়। ফোন বালিশের পাশে রেখে দেয়।
” ঘুমা। অনেক রাত হয়েছে। শুভ রাত্রি। ”
” শুভ রাত্রি। ”

দক্ষিণা বাতাস বহে আজকাল। ফাল্গুনের আগমনীতে সকল বৃক্ষরাজির পাতা ঝরে পড়ে। ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়ে সময় দেখে নিলো সমুদ্র। সকাল সাতটা বাজে। সারারাত জলপট্টি দিয়ে ফজরের দিকে ঘুমিয়ে গেছিল ছেলেটা। ঘুম ভাঙতেই কপালে হাত ছুঁইয়ে জ্বর কতটা আছে বোঝার চেষ্টা করলো। রাতের চেয়ে কম কিন্তু জ্বর আছে ভালোই। ডাক্তার না দেখলে হবে না। নিশ্চয়ই সামান্য জ্বর না এটা। ঘর থেকে বেরিয়ে মায়ের কাছে যাবে নাকি ভাইয়ের কাছে দোটানায় পড়ে গেলো সমুদ্র। মায়ের কাছে গেলে নির্ঘাত কথা শুনিয়ে দিবে। আজকাল মায়ের আচরণ বদলে গেছে। বেকার জীবনের সবচেয়ে বড়ো কষ্ট হলো নিজের প্রয়োজনে অন্যের নিকট হাত পাততে হয়। যদিও টিউশনি করিয়ে কিছু টাকা জমিয়েছে সমুদ্র। কিন্তু এতটুকু টাকায় ডাক্তার দেখানে,পরীক্ষানিরীক্ষা, ঔষধ পত্র হবে না। ভাবতে ভাবতে ইফতির কাছেই যাবে বলে ঠিক করেছে সমুদ্র। তবে আটটার আগে ঘুম থেকে উঠবে না তার ভাই। ততক্ষণে রান্নাঘরে গিয়ে কিছু খাবার নিয়ে এসে বিনাকে খাইয়ে দিবে বলে ঠিক করে সে। প্রতিদিন তো বিনা নাস্তা তৈরি করে কিন্তু আজকে তো সে নিজেই অসুস্থ! কন্ঠকে কি ডেকে তুলবে সমুদ্র? বাড়ির লোকজন কেউ জানেনই না বাড়ির বউ অসুস্থ।
এলার্ম ঘড়ির আওয়াজে চোখ মেলে তাকালো কন্ঠ। এমনিতে আটটার পরে উঠলেও আজ একটু আগেভাগে জাগার জন্য এলার্ম ঘড়ি সক্রিয় করে রেখেছিল। বিছানা ছেড়ে চটপট চোখেমুখে পানিরছিটা দিয়ে রান্নাঘরেট দিকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটলো সে। সেখানে যেতেই দেখে সমুদ্র পাউরুটিতে মাখন মাখাচ্ছে।
” তুই কী করছিস এত সকালে?”
” এইতো পাউরুটি নিয়ে যাবো বিনার জন্য। ”
” তুই বরং নাস্তা সেড়ে বিনাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যা। মেয়েটার জ্বর প্রায় আসে যায়। ”
সমুদ্র বিস্মিত নয়নে কন্ঠর দিকে তাকালো। এতকিছু কন্ঠ খেয়াল রেখেছে?
” কী অবাক হয়েছিস? আমি নিজেকে ঘরে বন্দী রাখলেও তোদের খবর ঠিক রাখি। সর আমি নাস্তা তৈরি করছি। বেশি সময় লাগবে না। ”
” আমিও আছি এখানেই। বিনা ঘুমোচ্ছে এখনো। তোর সাথে হাতে হাত লাগাই তারচেয়ে।”
” আচ্ছা শোন তুই চাচির কাছে না গিয়ে তোর ভাইয়ার কাছে যাস। নইলে তোকে যেতে হবে না। আমি টাকা এনে দিবো নাস্তা তৈরি করার পরে। ”
সমুদ্রর দু-চোখ ছলছল করছে। কন্ঠ আজ একদম বোনের মতোই বুঝলো সমুদ্রকে। নিজেকে স্বাভাবিক করে সমুদ্র মুচকি হেসে বলে,
” তা ঠিক আছে। কিন্তু কাহিনি কী? ভাবি ডাকা শুরু করবো নাকি? মনে হচ্ছে সামথিং সামথিং?”
” বজ্জাত ছেলে একটা। তোর যা খুশি ডাকিস।”
কন্ঠও হাসলো। নাস্তা বানানো শেষে কন্ঠ ইফতিকে বলে ডাক্তার দেখানোর জন্য যাবতীয় টাকা নিয়ে এসে সমুদ্রকে দিলো। ততক্ষণে বিনাকে নাস্তা খাইয়ে দিয়েছে সমুদ্র। শায়লা মল্লিকের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে বিনাকে নিয়ে ডাক্তারের উদ্দেশ্য রওনা হয়েছে সমুদ্র। ইফতি নয়টার মধ্যে রেডি হয়ে কলেজের উদ্দেশ্যে বেরিয়েছে। আজকে কন্ঠর ভার্সিটিতে ক্লাস নেই। তাই বাড়িতে শায়লা মল্লিক ও কন্ঠ আছে। শারমিন সুলতানা কিছুদিনের জন্য কন্ঠর মামার বাড়ি গেছেন। সারাদিন একা একা ঘরের মধ্যে থাকলে এমনিতেও মানুষের মন মানসিকতা ভালো থাকে না। কন্ঠই মা’কে একপ্রকার জোরাজোরি করে পাঠিয়েছে। বাড়িতে সমুদ্র ও বিনা নেই। এই সুযোগে কন্ঠ শায়লার সাথে কথা বলবে বলে ঠিক করলো। বিনা বাড়িতে থাকলে হয়তো এসব আলোচনায় ওর খারাপ লাগতে পারে ভেবে আগে কিছু বলেনি কন্ঠ। বসার ঘরে সোফায় বসে বড়ো থালায় করে চাল বাছাই করছে ইফতির মা। কন্ঠও পাশে এসে বসেছে।
” কিছু বলবি কন্ঠ?”
” চাচি তুমি তো না বলতেই সব বোঝো তাহলে ইদানীং অবুঝের মতো কেনো করো?”
” তুই আগে চাচি বাদ দিয়ে ‘মা’ ডাকার অভ্যাস কর। আর কী এমন করলাম আমি? ”
” আচ্ছা এখন থেকে মা’ই ডাকবো। তুমি সমুদ্রর সাথে বিনাকে নিয়ে খিটমিট করো কেনো? বিনা কী কিছু করেছে? ”
” তোর চোখ নেই? দেখিস না পড়ালেখা রেখে সারাদিন বউয়ের আঁচলের নিচে বসে থাকে সমুদ্র? ”
চালের থালা পাশে রেখে কিছুটা রেগেমেগে বললেন শায়লা। কন্ঠ অবাক হচ্ছে তার শ্বাশুড়ির আচরণে। হুট করে হলো কী উনার?
” এসব তুমি কী বলিতেছ! সমুদ্র তো রাতে পড়ে। আমরা মাঝে মধ্যে পড়া নিয়ে আলোচনা করি। আর বিনা সমুদ্রর স্ত্রী, ওদের মধ্যে ভালো সম্পর্ক থাকলেই তো আমাদের শান্তি। ”
” জানি না। আমার মনে হচ্ছে সমুদ্র আগের মতো আমার কথা শোনে না। ”
” মা! তুমি সমুদ্রর মা,আর বিনা স্ত্রী। তোমরা দুজনেই খুব গুরুত্বপূর্ণ মানুষ সমুদ্রর জীবনে। আচ্ছা ডানহাত বেশি কাজে লাগে বলে বামহাত বাদ দিয়ে কি আমরা জীবন কল্পনা করতে পারি? তুমি হলে সেই ডানহাত আর বিনা বামহাত। আদতে যে হাতেই আঘাত লাগুক না কেনো ব্যথা কিন্তু সমানভাবে অনুভূত হবে সমুদ্রর।”
শায়লা কন্ঠর দিকে তাকিয়ে আছে। আসলেই কি বিষয়টা এমন? সমুদ্রর কাছে সে-ও গুরুত্বপূর্ণ আগের মতোই? নাকি কন্ঠ শুধু সান্ত্বনা দিচ্ছে?
চলবে,
আমার দ্বিতীয় বই “নীরবে রাত্রি নামে” অর্ডার করুন ২৫% ছাড়ে। এছাড়াও রয়েছে আমার প্রথম বই “বিষণ্ণ প্রজাপতি”। আর বইটই এপসে আছে আমার লেখা দু’টি ই-বুক – শুভ্রপরী ও মন ফাগুনের পবন।
আগের পর্বের লিংক https://www.facebook.com/100080128645410/posts/401326492548302/
পরের পর্বের লিংক https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=402501115764173&id=100080128645410&mibextid=Nif5oz

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here