অলিখিত_অধ্যায় #জান্নাতুল_ফারিয়া_প্রত্যাশা ২৫+26

0
1032

#অলিখিত_অধ্যায়
#জান্নাতুল_ফারিয়া_প্রত্যাশা
২৫।

প্রিয়তা চমকে পেছন ফিরে চাইল। চোখে চশমা আঁটা বিধিবৎ সাজে লোকটাকে দেখে চিনতে ভুল হলো না, উনি একজন শিক্ষক। প্রিয়তা অপ্রস্তুত হেসে সালাম দিল। সালামের জবাব দিল লোকটি। চোখ থেকে চশমা নামিয়ে তাকে আপাদমস্তক পরখ করে জিজ্ঞেস করল,

‘আপনি কি এই কলেজের স্টুডেন্ট?’

প্রিয়তা ঢোক গিলে মাথা নাড়াল। ক্ষীণ সুরে বলল,

‘না।’

লোকটা খানিক ভ্রু কুঁচকাল। বলল,

‘তো এখানে কী করছেন?’

প্রিয়তা ইতস্তত সুরে বলল,

‘আমার কাজিন এই কলেজে পড়ে, আমি তার সাথেই এসেছি।’

‘আচ্ছা। কোন ইয়ার?’

প্রিয়তা পড়ল মহা বিপদে। মৌমি কলেজে পড়ে সেটা জানে, তবে কোন ইয়ার সেটা তো জানে না। এবার কী বলবে? আন্দাজে একটা বলে দিবে না-কি?

লোকটি চশমাখানা ফের চোখে লাগাল। গম্ভীর স্বরে বলল,

‘আপনি আমার সাথে আসুন।’

প্রিয়তা বিচলিত সুরে বলল,

‘কোথায় যাব?’

‘অফিস রুমে।’

প্রিয়তা বুঝল, লোকটা তাকে সন্দেহ করছেন। করার’ই কথা। সে ঠিক মতো উত্তর দিতে পারছে না, তারউপর তার উর্দু ভাষাটা উনাদের মতো পরিষ্কার না। এমতাবস্থায় সন্দেহ করাটাই স্বাভাবিক।
প্রিয়তা অস্বস্তি নিয়ে হাসল। নিজেকে ধাতস্ত করার চেষ্টা চালাল সে। আজকার যেখানে যাচ্ছে সেখানেই ঝামেলা। ভাগ্যটাই খারাপ তার। সে ক্ষীণ সুরে বলল,

‘আসলে আমি জানি না ও কোন ইয়ারে। ওর নাম মৌমি, আমি সত্যিই ওর কাজিন। আমাকে কমন রুমে বসতে বলে ও ক্লাস করতে গিয়েছে, আমি মিথ্যে বলছি না।’

প্রিয়তার কথা একেবারে বিশ্বাসযোগ্য না হলেও একেবারে অবিশ্বাসযোগ্যও মনে হলো না অবশ্য। লোকটি ভোঁতা মুখে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বললেন,

‘কলেজে কোনো প্রয়োজন ছাড়া বাইরের লোক এলাউ করা হয় না, তার উপর আপনি আপনার কাজিন সম্পর্কে ঠিক মতো কিছু বলতেও পারছেন না। সেই জন্য আপাতত আপনাকে অফিস রুমে যেতেই হবে। সেখানে একটা স্বাক্ষর দিয়ে এসে আবার এখানে বসবেন।’

প্রিয়তার রাগ হলো। কেন আসতে গেল এখানে? এতকিছু হবে জানলে কখনোই আসত না। উপায়ান্তর না পেয়ে রাজি হলো সে। মনে মনে ঐ স্যারের গোষ্ঠীসুদ্ধ উদ্ধার করল। সব কলেজেই এমন একটা ঘাড়ত্যাড়া স্যার থাকবেই। তার কলেজেও ছিল। যাকে সে দু চোখেও সহ্য করতে পারত না।

স্যারের পেছন পেছন অফিস রুম অবধি গিয়ে থমকে দাঁড়াল প্রিয়তা। অফিস রুমের ভেতর ফারজাদকে দেখে স্তম্ভিত হলো। এই লোকটা আবার এখানে কী করছেন? তাকে থেমে যেতে দেখে স্যার পেছন ফিরে জিজ্ঞেস করলেন,

‘কী ব্যাপার, থেমে গেলেন যে?’

প্রিয়তা আমতা আমতা করে বলল,

‘আ-আমাকে কি যেতেই হবে?’

স্যার কপালে ভাঁজ ফেলে বললেন,

‘জি, এটা নিয়ম। চলুন।’

প্রিয়তা ত্রস্ত পায়ে এগুল। ফারজাদের মুখোমুখি হয়ে এখন কী বলবে সে। তার উপস্থিতি মোটেও ফারজাদের পছন্দ হবে না, সেটা সে বেশ বুঝতে পারছে। প্রিয়তা ভেতরে প্রবেশ করে সালাম দিল। ফারজাদের তখনই এই গলার স্বর পরিচিত মনে হলো বেশ। সে একপলক পাশ ফিরে চেয়ে সামনে তাকাতেই টনক নড়ল তার। সে কি মাত্রই প্রিয়তাকে দেখেছে? সে ততক্ষণাৎ চোখ ঘুরিয়ে চাইল ফের। প্রিয়তাকে নিজ চোখের সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অতি মাত্রায় চমকাল সে। জিজ্ঞেস করল,

‘আপনি এখানে কী করছেন?’

স্যার মহাশয় অবাক হয়ে বললেন,

‘আপনারা কি পরিচিত?’

ফারজাদ কিছু বলার প্রস্তুতি নেওয়ার আগেই প্রিয়তা বলে উঠল,

‘জি জি। উনি মৌমির ভাই। মৌমি আমার কাজিন, তারমানে উনিও আমার কাজিন। তাই না?’

ফারজাদ কপাল কুঁচকাল। মেয়েটা কী বলছে উল্টা পাল্টা কথা! সে ফের কিছু বলার উদ্যত হতেই প্রিয়তা তাকে ইশারা দেয়। তার ইশারা দেখে কিছু একটা আন্দাজ করতে পেরে ফারজাদ থামল। বলল,

‘ইয়েস, উই আর কাজিন।’

কথাটা দাঁতে দাঁত চেপে বলল সে। তা দেখে ঢোক গিলল প্রিয়তা। লোকটাকে ফের ক্ষেপিয়ে দিয়েছে সে। স্যার পরিচয় পেয়ে প্রসন্ন হাসলেন। প্রিয়তার দিকে চেয়ে বললেন,

‘দুঃখিত, আপনাকে আমি চিনতে পারিনি।’

প্রিয়তা জোরপূর্বক হেসে বলল,

‘না না, সমস্যা নেই।’

ফারজাদ প্রিন্সিপালের সাথে কথা সেরে বের হলো। তার সাথে বেরিয়ে এল প্রিয়তাও। ফারজাদ হেঁটে সামনে গেল কিছুটা। মাঠের এক কোণে দাঁড়াল। প্রিয়তাও বাধ্য মেয়ের মতো তাকে সঙ্গ দিল। বুকের উপর হাত ভাঁজ করে বিরক্ত চোখে প্রিয়তার দিকে চাইল ফারজাদ। রুষিত সুরে জিজ্ঞেস করল,

‘এসব কী, প্রিয়তা?’

প্রিয়তা মাথা নুয়াল। ভীত সুরে বলল,

‘বাসায় খারাপ লাগছিল বলে মৌমির সাথে কলেজে একটু ঘুরতে এসেছিলাম। মৌমি সবার সামনে আমাকে তার কাজিন’ই বলেছে, তাই আমিও আপনাকে আমার কাজিন বলে ফেলেছি। দুঃখিত।’

ফারজাদ দুহাত কোমরে রেখে এদিক ওদিক চাইল। নিজেকে সংযত রাখার চেষ্টা বোধ হয়। অতঃপর এক পল চুপ থেকে বলল,

‘আপনি এতটা নির্বোধ কেন, প্রিয়তা? সেদিন এত বড়ো একটা ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরও আপনি আজ একা কী করে বের হয়ে গেলেন? পুলিশ কী বলেছিলেন আপনাকে? বের হতে নিষেধ করেননি? সাবধান থাকতে বলেননি? তাও আপনি আজ বের হয়ে গেলেন? এখন নিজের ভালো নিজে না বুঝলে আর কে আপনাকে বোঝাবে বলুন তো?’

প্রিয়তা অনুশোচনায় দগ্ধ। মাথা তুলে তাকানোর মতো সাহস নেই তার। ফারজাদ চোখ বুজে বড়ো করে নিশ্বাস নিল। তারপর কিছুটা শান্ত হয়ে বলল,

‘আমি আপনার ভালোর কথা ভেবেই বলছিলাম, প্রিয়তা। আজকে বের হওয়াটা আপনার মোটেও উচিত হয়নি। বিপদ চারদিকে উঁত পেতে আছে। অন্তত ওয়াদি ধরা না পড়া অবধি আপনাকে বাসায় ভেতরেই থাকতে হবে। এছাড়া আর কোনো উপায় নেই।’

প্রিয়তা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি প্রকাশ করল। ফারজাদ বীতঃস্পৃহ সুরে বলল,

‘সবসময়ই তো মাথা নড়ান, কাজে তো আর সেটা দেখি না।’

প্রিয়তা মিইয়ে যাওয়া সুরে জবাব দিল,

‘আজ থেকে কাজেও সেটা দেখবেন।’

‘মনে থাকে যেন।’

‘জি, থাকবে মনে।’

‘আর হ্যাঁ, থানা থেকে কল এসেছিল; বলেছে, আপনার পরিবারের সাথে যোগাযোগ করা হবে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আপনার পরিবারকে এখানে আনা হবে। আর আপনার ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হবে সরকারী ভাবে। এখন আপনার বাবা আর ভাইয়ের নাম্বারটা দিন, আমি থানায় পাঠিয়ে দিচ্ছি।’

প্রিয়তা আহত সুরে জিজ্ঞেস করল,

‘পুলিশ নিশ্চয় আমার মা বাবাকে কল করে সব বলে দিবেন?’

‘তা তো বলবেন’ই, এছাড়া তো আর কোনো উপায়ও নেই।’

সব শোনার পর মা বাবা আর ভাইয়ের করুণ মুখটা যেন এখনই প্রিয়তা অবলোকন করতে পারছে। ভীষণ দুঃখ পাবেন উনারা। হয়তো মায়ায় পড়ে ক্ষমা করে দিবেন তাকে। কিন্তু তার দেওয়া কষ্টটা ভুলবেন না কখনোই।

ফারজাদ আর প্রিয়তা কমন রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে, মৌমির জন্য অপেক্ষা করছে। মৌমির ক্লাস শেষ। আয়েশাকে সঙ্গে নিয়ে হেলেদুলে আসছে সে। হঠাৎ আয়েশা থমকে দাঁড়ায়। অস্থির সুরে বলে,

‘এই দেখ দেখ, তোর ভাই না?’

মৌমি সামনে চেয়ে দেখল, তাই তো। ভাইকে এই মুহূর্ত এখানে দেখে মাত্রাধিক চকিত সে। প্রশ্ন করল,

‘ভাইয়া এখন এখানে কী করছেন?’

আয়েশা চট করে মৌমির হাত চেপে ধরে। ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করে,

‘এই এই, ভাইয়ার সাথে কি ঐ আপুটার বিয়ে দিবি নাকি?’

মৌমি ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,

‘কোন আপুটার?’

‘আরে তোর কাজিন। দেখ, পাশে যে দাঁড়িয়েছে দুজনকে কী সুন্দর লাগছে।’

মৌমি দেখল খেয়াল করে। আচমকা আবিষ্কার করল, আসলেই দুজনকে সুন্দর লাগছে। পরক্ষণেই ভাবল, এটা সম্ভব না। এমন চিন্তা করলেও ভাই তাকে বাড়ি ছাড়া করবে। তাই আয়েশাকে ধমকে বলল,

‘তুই এক ধাপ বেশি ভাবিস সব সময়। এমন কিছুই কোনোদিন হবে না।’

‘কেন হবে না? আমাদের এদিকে তো কাজিনদের মধ্যেই বেশি বিয়ে হয়। যেমন আমারও তো আমার কাজিনের সাথে বিয়ে ঠিক হয়ে আছে, পরীক্ষার পরই বিয়ে।’

মৌমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

‘তোর আর ভাইয়ার ব্যাপারটা এক না। তুই বুঝবি না এতকিছু। চল।’

আয়েশা বিরক্ত হয়ে তার পাশে হাঁটা ধরল।

চলবে….

#অলিখিত_অধ্যায়
#জান্নাতুল_ফারিয়া_প্রত্যাশা
২৬।

‘ভাইয়া, তুমি এখানে?’

‘হ্যাঁ, একটা কাজে এইদিকে এসেছিলাম বলে ভাবলাম কলেজে গিয়ে স্যারের কাছ থেকে তোর একটু খোঁজখবর নিয়ে আসি। কিন্তু, এসে তো দেখি তোরা এখানে আরেক কান্ড ঘটিয়ে বসে আছিস। উনাকে নিয়ে এখানে এসেছিস কেন?’

মৌমি চোখ পিটপিট করে এদিক ওদিক চাইল। কী বলবে সে? প্রিয়তার এখন এখানে আসাটা ভাইয়া মোটেও সহজ ভাবে নিবেন না, না নেওয়ার’ই কথা। সে বোকা বোকা হেসে বলল,

‘না মানে, আসলে আপুর ঘরে একা ভালো লাগবে না বলে একটু নিয়ে এসেছিলাম।’

ফারজাদ গম্ভীর স্বরে বলল,

‘হাজার ভালো না লাগা কাটিয়ে হলেও উনাকে এখন বাসার মধ্যেই থাকতে হবে। ক্লাস কি শেষ তোর?’

‘না, আরো একটা আছে।’

‘ঠিক আছে, তুই ক্লাস কর। আমি উনাকে বাসায় নামিয়ে আসছি।’

ফারজাদ হাঁটা ধরে। প্রিয়তাও মন খারাপ করে মৌমিকে বিদায় জানিয়ে তার সঙ্গে যায়। তারা চলে যাওয়ার পর আয়েশা ভ্রু কুটি করে বলে,

‘ব্যাপার কী বলতো? কিছু কি হয়েছে?’

মৌমি তার দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করে,

‘কী হবে?’

এত সাবলীল ভাবে বলে যেন সত্যিই কিছু হয়নি। আয়েশা জানতে চাইল,

‘তোর ভাই এটা কেন বললেন যে, ভালো না লাগলেও আপুকে বাড়িতেই থাকতে হবে? উনার কি বাসা থেকে বের হওয়া নিষেধ?’

‘আরেহ না, তেমন কিছু না। আপু একটু অসুস্থ। ডাক্তার বারণ করেছেন, বেশি ঘোরাঘুরি যেন না করেন। সেজন্যই ভাইয়া কথাটা বলেছেন আরকি।’

আয়েশা ঠোঁট চেপে হাসল। বলল,

‘দেখেছিস কত কেয়ার! আমি বলে দিচ্ছি, দেখিস তোর ভাই একদিন অবশ্যই আপুর প্রেমে পড়বে। কী জানি, অলরেডি হয়তো পড়েও গিয়েছে।’

মৌমি হতভম্ব হয়ে তাকায়। চোখের কোটর বড়ো বড়ো করে ফেলে। মেয়েটার চিন্তা ভাবনা কী সাংঘাতিক! এসব তো দুঃস্বপ্নেও কখনো ভাবেনি সে।

_______

অফিসের গাড়িতে বসল দুজন। দুজনেই পেছনের সিটে, ড্রাইভার গাড়ি চালাচ্ছেন। দুজনের মাঝেই সমান দীর্ঘস্থায়ী নীরবতা। এতটাই নিস্তব্ধতা যে তাদের শ্বাস প্রশ্বাসের শব্দও কানে আসছে বোধ হয়। তাদের নীরবতার মাঝেই ফারজাদের ফোন বেজে উঠে। পকেট থেকে বের করে দেখে, জারার কল। রিসিভ করে সে। জারা জিজ্ঞেস করে,

‘কোথায় আপনি?’

‘আমার বোনের কলেজে, ম্যাডাম। এক্ষুণি অফিসে ব্যাক করছি।’

‘না, আপনার অফিসে এখন আসতে হবে না। আমি বরং আপনার বোনের কলেজে আসছি। কোন কলেজ?’

ফারজাদ কপাল কুঁচকাল। মেয়েটা এত গায়ে পড়া কেন? সে বলল,

‘ম্যাডাম, আমি কলেজ থেকে বাসায় ফিরছি। গাড়িতে আছি।’

জারার মনঃক্ষুন্ন হলো। বলল,

‘আচ্ছা তবে, অফিসে আসুন।’

‘জি আসছি।’

সে ফোন রাখল। বিরক্ত হয়ে চাইল বাইরের দিকে। প্রিয়তা সতর্ক দৃষ্টিতে দেখছে তাকে। মানুষটার উপর হয়তো খুব চাপ। একদিকে অফিসের দায়িত্ব, অন্যদিকে পরিবার আর তার উপর সে এসে জুড়েছে আরেক উটকো ঝামেলা। প্রিয়তা জিজ্ঞেস করল,

‘মা বাবা এলে আমি চলে যেতে পারব না?’

ফারজাদ তাকাল তার দিকে। বলল,

‘আপনার চলে যাওয়ার ব্যাপারে পুলিশ এখনই কিছু বলেননি। আপাতত আপনার পরিবারের এখানে আসাটা জরুরি।’

প্রিয়তা অস্ফুট স্বরে বলল,

‘আমার চলে যাওয়াটাও জরুরি।’

‘কিছু বললেন?’

‘না না।’

তারপর বাকি রাস্তা ভীষণত্ব নীরবতা জারি রেখে বাড়িতে পৌঁছাল তারা। ফারজাদ আর ভেতরে গেল না, অফিসে যেতে লেইট হয়ে যাবে বলে। প্রিয়তা একাই প্রবেশ করল বাড়িতে।
দিলরুবা বেগম তখন রান্নাঘরে, দুপুরের আয়োজন করছেন।

প্রিয়তা রান্নাঘরের কাছে যায়।

‘আমি চলে এসেছি, আন্টি।’

কারোর গলার স্বর পেয়ে দিলরুবা বেগম চমকে তাকান। প্রিয়তাকে দেখে বলেন,

‘ওমা, এত তাড়াতাড়িই চলে এলে যে? মৌমির ক্লাস শেষ?’

‘মৌমি আসেনি। আপনার ছেলে মৌমির কলেজে গিয়েছিলেন, উনিই আমাকে এখন নামিয়ে দিয়ে আবার অফিসে গিয়েছেন।’

‘আচ্ছা, তাই বলো। ওর কলেজে গিয়ে ভালো লেগেছে?’

আর ভালো লাগা। সে যেখানেই যায় ঝামেলাও সঙ্গ নেয় তার। এত ঝামেলার মাঝে কি আর ভালো লাগা কাজ করে? তাও প্রসন্ন হেসে বলল,

‘জি আন্টি, ভালো লেগেছে।’

‘বেশ, এবার রুমে গিয়ে রেস্ট নাও। আমি তোমার জন্য স্যুপ বানিয়ে আনছি।’

‘আন্টি, আমি এখন কিছু খাব না।’

‘স্যুপ’টা খাও, ভালো লাগবে।’

প্রিয়তা বলল,

‘না না, আন্টি। আমি এখানে দাঁড়িয়ে আপনার সাথে একটু গল্প করব।’

দিলরুবা বেগম হাসলেন। বললেন,

‘ঠিক আছে, তোমার কথাটা রাখলাম।’

প্রিয়তা হাসল। বলল,

‘আন্টি, আপনি বাংলাদেশের কোন জেলার মেয়ে?’

দিলরুবা বেগম চমৎকার হেসে বললেন,

‘আমি? আমি বরিশালের মেয়ে।’

প্রিয়তা চকিত সুরে বলে,

‘তাই?’

‘হ্যাঁ। তুমি কোন জেলার?’

‘আমি ঢাকার মেয়ে। জন্ম থেকে বেড়ে উঠা সব ঐখানেই। বাবার বাড়িও ঢাকাতেই, তবে মায়ের বাড়ি রংপুর।’

‘রংপুর গিয়েছ কখনো?’

‘না। ঐদিকে যাইনি। আচ্ছা আন্টি, আপনার বাংলাদেশে যেতে ইচ্ছে করে না?’

দিলরুবা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ক্ষীণ স্বরে বললেন,

‘নিজের দেশে যেতে কার ইচ্ছে করে না, বলো? যদি পারতাম, কবেই চলে যেতাম। এখানে থাকতাম না।’

‘তাহলে যাচ্ছেন না কেন? কীসের পিছুটান?’

দিলরুবা বেগম তাকালেন প্রিয়তার দিকে। বললেন,

‘অনেক কিছুর, তুমি বুঝবে না, মা।’

প্রিয়তা আর এই নিয়ে কথা বাড়াল না। দিলরুবা বেগমের বিষাদগ্রস্থ হৃদয়খানা স্পষ্ট দেখল যেন। প্রসঙ্গ পাল্টাতে বলল,

‘আমি কি কোনো কাজে সাহায্য করব, আন্টি?’

‘না না। তুমি ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নাও। তোমার এখন সুস্থ থাকার জন্য যথেষ্ঠ বিশ্রামের প্রয়োজন।’

প্রিয়তা বুঝল, মানুষটা তার কাছ থেকে কিছু আঁড়াল করতে চাইছে। থাক করুক, সবকিছু সবার সামনে প্রকাশ করা যায় না। কিছু জিনিস থাকে একান্তই ব্যক্তিগত, সেগুলো ব্যক্তিগত রাখাই শ্রেয়। প্রিয়তা তাই নিজের ঘরের দিকে গেল।

_______

সন্ধ্যার নাস্তা শেষ করে পড়ছিল মৌমি। ফোনটা তার পাশে রাখা। আচানক সেটা থেকে ভো ভো শব্দ শব্দ শুরু হয়। সে তাকিয়ে দেখে কল আসছে, ভাইব্রেশন মুডে দেওয়া বলে এমন ভয়ানক শব্দ করছে। সে ফোনটা হাতে নেয়। আননোন নাম্বার। একবার ভাবে, ধরবে না। পরে আবার কী ভেবে যেন ধরে। সালাম দেয়। খাস উর্দুতে জিজ্ঞেস করে,

‘হ্যালো! কন কেহরাহাহে?’

ওপাশের ব্যক্তিটি এক পল সময় নিয়ে জিজ্ঞেস করে,

‘কোন জায়গা এটা?’

বাংলা ভাষা শুনে খানিকটা অবাক হয় মৌমি। পরে ফোনটা চোখের সামনে ধরে দেখে, এটা বাংলাদেশী নাম্বার। সে ফের কানে লাগায়। জবাবে বলে,

‘এটা পাকিস্তান। আপনি কে?’

‘আমি নীহাল। আপনি মিমি না, প্রিয়তার বান্ধবী?’

মৌমির এতক্ষণে টনক নড়ল। জৈনক ব্যক্তির পরিচয় পেয়ে হতভম্ব হয়ে পড়ল সে। কী করবে বুঝতে না পেরে দৌড়ে গেল প্রিয়তার ঘরে। শুয়ে ছিল প্রিয়তা। মৌমিকে ছুটে আসতে দেখে ঘাবড়ে দ্রুত উঠে বসে। জিজ্ঞেস করে,

‘কী হয়েছে, মৌমি? এভাবে ছুটে এলে কেন?’

মৌমি কলটা মিউট করে বলল,

‘তোমার ভাই কল করেছেন।’

প্রিয়তা বিস্ফোরিত চোখে চেয়ে বলে,

‘কী!’

ফোনের ওপাশের ব্যক্তির ক্রমাগত হ্যালো হ্যালো শোনা যাচ্ছে। প্রিয়তা ঢোক গিলে। পুলিশ নিশ্চয় এতক্ষণে যোগাযোগ করে ফেলেছেন, তাই হয়তো এই নাম্বারের উপর ভাইয়ার সন্দেহ হয়েছে, নয়তো আজ আবার কেন কল দিবেন। মৌমি ভীত সুরে জিজ্ঞেস করল,

‘কী করব এবার?’

‘আমাকে দাও।’

মৌমি বিস্ময়াবিষ্ট সুরে বলল,

‘তুমি কথা বলবে?’

‘হ্যাঁ।’

প্রিয়তা আনমিউট করে ফোনটা কানে লাগাল। জিভ দিয়ে ভিজিয়ে নিল শুকনো ঠোঁট। মৃদু আওয়াজে ডাকল,

‘ভাইয়া।’

ওপাশের ব্যক্তিটি এবার থেমে যায়। কোনো শব্দ নেই। বেশ কিছুক্ষণ এভাবেই চুপ থাকে দুজন। অতঃপর একটা দীর্ঘশ্বাস শোনা যায়। ওপাশ থেকে শোনা যায় কারোর ব্যতিত সুর।

‘প্রিয়তা, বোন আমার, কেমন আছিস?’

প্রিয়তা কেঁদে ফেলে। তার কান্না দেখে চোখ ভিজে উঠে মৌমিরও। ওপাশ থেকে নীহাল বলে উঠে,

‘কাঁদিস না, বোন। আমি আসছি, কালই আসছি। আর কেউ তোকে কোনো কষ্ট দিতে পারবে না। ভাইয়া আসছি তো।’

চলবে….

গল্পটি সম্পর্কে রিভিউ, আলোচনা, সমালোচনা করুন আমাদের গ্রুপে। গ্রুপ লিংক নিচে দেওয়া হলোঃ
https://facebook.com/groups/holde.khamer.valobasa/

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here