প্রণয়াসক্ত_পূর্ণিমা #Writer_Mahfuza_Akter পর্ব-২৪

0
95

#প্রণয়াসক্ত_পূর্ণিমা
#Writer_Mahfuza_Akter
পর্ব-২৪

গোধূলির হলুদ আভা আকাশ থেকে মুছে যাবে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই। উত্তরে হাওয়ায় শীতলতার প্রখরতা ক্রমশ বাড়ছে। তরী গায়ের চাদরটা ভালোমতো গায়ে মুড়িয়ে নিল। হাত দুটোর তালু বারংবার ঘষতে লাগলো উষ্ণতার অভাবে। অপেক্ষিত, উন্মুখ দৃষ্টি মেলে রেখেছে সে সামনের ভবনের দিকে। মধু ওকে দাঁড় করিয়ে ভেতরে গেছে প্রায় বিশ মিনিট হয়ে এলো। এখনো তার আসার কোনো নাম নেই!

“তুমি-ই কি অরিত্রী?”

পেছন থেকে পুরুষালি কন্ঠে এমন কথা শুনে তরী ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো। চোখের সামনে ছেলেটার অবয়ব দৃশ্যমান হলো। তার সুদর্শন মুখের অমায়িক হাসিটা দেখে কপালে সূক্ষ্ম ভাজ পড়লো তরীর। কিয়ৎক্ষণ ছেলেটাকে সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ শেষে মুখ খুললো সে,

“জ্বী! আমিই অরিত্রী।”

ছেলেটা মুখে হাসি বজায় রেখেই বললো, “আমি দীপ্ত! তোমার ক্লাসমেট। আজকে ক্লাসে দেখেছিলাম তোমায়! তাই এখানে দেখে ভাবলাম, পরিচিত হওয়া যাক!”

তরী অপ্রস্তুত হলো। তবুও নির্বিকার ভঙ্গিতে তাকিয়ে বললো, “পরিচয় হয়ে ভালো লাগলো।”

দীপ্ত এর বেশি কিছু আশাও করেনি। তাই মাথা নাড়িয়ে বললো, “ধন্যবাদ। আচ্ছা, এই বইটা কি তোমার? তুমি যেই টেবিলে বসেছিলে, সেই টেবিলের ওপরই বইটা ছিল। বইয়ের ভেতরও তোমার নাম লেখা দেখলাম।”

তরী বইটা হাতে নিল। সে দেখেই চিনতে পেরেছে, তার প্রিয় উপন্যাসের বই এটা। হারিয়ে গেলে কষ্ট পেত খুব। তাই বইটা হাতে পেয়ে অজান্তেই মুখে হাসি ফুটে উঠলো ওর। দীপ্ত তরীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো নির্নিমেষ। চোখে মুখে অফুরন্ত মুগ্ধতা তার। আনমনে বললো, “সবসময় এভাবে হাসলেও পারো! এই হাসির মাঝে পৃথিবীর সকল সৌন্দর্যকে দেখা যায়।”

তরী ভ্রু কুঁচকে তাকালো। কথার মানে বুঝার চেষ্টা করে বললো, “সরি! কী বললেন? ”

দীপ্ত থতমত খেয়ে গেল। মুখ ফসকে কথাটা বের হয়ে গেছে তার। তাই পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে বললো,

“তেমন কিছু না। ঐটা এমনি কথার কথা ছিল!”

এদিকে,
মধু অ*গ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে প্রহরের দিকে। প্রহর মিটমিট করে হাসছে। হেসেই ব্যাঙ্গ করে বললো,

“দেখেছো? তোমার ভাগ্যে এই অভীক শাহরিয়ার-ই লেখা আছে। এজন্যই ঘুরে ফিরে আমাদের দুজনের বারবার দেখা হয়! আর এখন তো একদম পার্মানেন্টলি এখানে সেট হয়ে গেছো। হা হা হা! ”

মধু ফোঁ*স ফোঁ*স করে উঠলো। প্রহরের দিকে আঙুল তাক করে দাঁত কটমট করতে করতে বললো, “লিসেন! তোকে….”

“আহ্! ভদ্রতা বজায় রাখতে শেখো, মিস ধানিলঙ্কা! ডোন্ট ফরগেট দ্যাট আ’ম ইয়র টিচার।”

মধু তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বললো, “ভদ্রতা? সবাই সবকিছু ডিজার্ভ করে না। আর লাস্টে যেই কথাটা বললি, সেটা যেন মাথায় থাকে! এখানে তুই আমার টিচার আর আমি তোর স্টুডেন্ট। এর বাইরে আমাদের মধ্যে আর কোনো পরিচয় নেই। তবে আমার চোখে তুই আজীবন একটা ঠক আর প্রতারক-ই থেকে যাবি, যে কিনা মানুষকে স্বপ্ন দেখাতেও জানে আর সেটাকে সযত্নে ভেঙে তাকে ধ্বং*স-ও করতে জানে। তাই আমার কাছ থেকে অন্তত কোনো সম্মান এক্সপেক্ট করবি না।”

মধু র*ক্তি*ম দৃষ্টিতে প্রহরের দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় কথা গুলো বললো। এতো দিন মধুর তিক্ত বাক্য শুনতে শুনতে অভ্যস্ত হয়ে গেলেও আজকের কথাগুলো প্রচন্ডভাবে আঘাত করলো তাকে। টলমলে দৃষ্টিতে তাকাতেই মধু নিজের চোখের পানি আড়াল করতে প্রহরের পাশ কাটিয়ে চলে গেল। প্রহর আজ আর ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো না। মধু চলে যাওয়ার দিকে অপলক চেয়ে রইলো না। বড় একটা শ্বাস নিয়ে মনঃস্থির করলো। করে নিল প্রতিজ্ঞা। কঠিন প্রতিজ্ঞা!

মধুকে আসতে দেখে তরী ওর দিকে তাকিয়ে হাসলো। দীপ্ত তরীর দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকাতেই মধুকে এগিয়ে আসতে দেখলো। মধুকে দেখে নিজের অজান্তেই একটা ঢোক গিললো সে। মেয়েটাকে দেখলেই ভয় লাগে ওর। কেমন যেন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায় সবার দিকে! তাই দীপ্ত আর সময় ব্যয় না করে তড়িঘড়ি করে বললো,

“আমি আসছি, হ্যা? কাল আবার দেখা হবে। বাই!”

তরীর উত্তরের অপেক্ষা না করেই দীপ্ত স্থান ত্যাগ করলো। মধু এগিয়ে আসতেই তরী ওর মলিন মুখ দেখে বললো, “কী হয়েছে? এমন মনমরা হয়ে আছো কেন?”

“কিছু না। চল, যাওয়া যাক। সন্ধ্যা নেমে এসছে প্রায়ই!”

মধুর স্কুটারে করে মধুর হোস্টেলের কাছাকাছি আসতেই তরী নেমে গেল। মধু বললো, “চল, তোকে তোর বাসায় পৌঁছে দেই! ”

তরী বাঁধা দিয়ে বললো, “নাহ্! এখান থেকে দূর অনেক। তোমার এতো দূর যাওয়া-আসার দরকার নেই। আমি একটা রিকশা নিয়ে চলে যাবো।”

মধু আর তরীর কথার বিপরীতে কিছু বললো না। তরী রিকশায় উঠলো। তরীর রিকশাটা যতক্ষণ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছিল, মধু ততক্ষণ-ই তাকিয়ে রইলো।

তরী রিকশায় উঠে হাতে থাকা উপন্যাসের বইটা খুললো। কয়েকটা পৃষ্ঠা উল্টেপাল্টে দেখতেই একটা হলুদ কাগজ চোখে পড়লো ওর। নিয়নের হলুদ আলোয় কাগজটার রঙ হলদেটে লাগলেও আসলে বুঝতে পারলো না, সেটার আসল রঙ কী! কাগজের লেখাগুলো পড়ার চেষ্টা করলো। কিন্তু অন্ধকারে অস্পষ্ট অক্ষরের লেখা গুলো বুঝতে সমস্যা হচ্ছে। ফোনের ফ্লাশলাইট অন করে লেখার ওপর ধরলো। দেখলো,

“প্রিয় অরিত্রী,
তুমি আসলেই একরাশ মায়ার অধিকারিণী! তোমার ঝলমলে হাসিটা আমার দৃষ্টিতে দেখা সেরা সৌন্দর্য। জানি না, তোমাকে কেন এতো ভালো লাগলো! নিজের অনুভূতি নিয়ে আমি সন্দিগ্ধ। তবে কথাগুলো তোমায় না জানিয়ে পারলাম না।

~দীপ্ত”

তরী প্রচন্ড বিরক্ত হলো লেখাটা পড়ে। এ নতুন কিছু না। মানুষের এসব মোহ, আবেগ দেখতে দেখতে অভ্যস্ত সে। যখন জানতে পারতো যে, তরী কথা বলতে পারে না, তখনই সব আবেগ মাটি চা*পা পড়ে যেত। কিন্তু এই ছেলে তো ওকে কথা বলতে দেখেছে-ই! একে পিছু ছাড়ানোর একটা ব্যবস্থা করতে হবে।

৩৫.
মিস্টার আফনাদ অফিস থেকে ফিরে নিজের ফর্মাল পোশাক বদলে পাঞ্জাবি পরলেন। মোহনা ওনাকে এতো পরিপাটি হতে দেখে ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। বললেন,

“এই মাত্র-ই না বাড়ি ফিরলে? এখন আবার এতো সাজগোজ করেছে কই যাচ্ছো? কোনো দাওয়াত আছে নাকি?”

মিস্টার আফনাদ হাতে ঘড়ি পরতে পরতে বললেন, “তরীর সাথে দেখা করতে যাচ্ছি। হুট করে মেয়েটার কথা অনেক মনে পড়ছে। অনেক দিন দেখি না ওকে!”

মোহনা বিরক্তি ও রাগ নিয়ে বললেন, “গত সপ্তাহেও গিয়ে এলে। আজ আবারও যাচ্ছো! মেয়েটা মুখ খুলে কথা বলার পর থেকে ওর প্রতি তোমার দরদ একেবারে উথলে পড়ছে! কেন? কেন ওকে এতো মাথায় তুলছো তুমি? পরের বাড়ি পাঠিয়ে এতো কষ্টে ওকে ঘাড় থেকে নামালাম! মেয়েটা একটা অপয়া। ওর মুখ দেখতে ইচ্ছে করে না আমার!”

সবগুলো কথা শুনেও মিস্টার আফনাদ ভেতরের রাগ বাহিরে প্রকাশ করলেন না। তিনি সবসময়ই মাথা ঠান্ডা রাখেন। এজন্যই তরীকে এই সমাজে আজো টিকিয়ে রাখতে পেরেছেন তিনি। এবারেও তার ব্যতিক্রম ঘটালেন না। আজ মোহনার ব্যাপারটার একটা বিহিত করবেন তিনি। এজন্য শান্ত গলায় বললেন,

“তরীর প্রতি এতো ক্ষো*ভ কেন তোমার?”

মোহনা চোখে পানি জমে এলো। তিনি রাগী কন্ঠে বললেন, “কারণ ও তোমার প্রথম বউয়ের মেয়ে। ওকে দেখলেই আমার মনে পড়ে যে, তোমার জীবনের প্রথম নারী আমি নই। কোনো মেয়েই পারে না তার স্বামীর ভালোবাসার ভাগ অন্যকে দিতে। আমি অনেক চেষ্টা করেছি, ঐ মেয়েটাকে স্বাভাবিক ভাবে নিতে। কিন্তু আমার সহ্য হয় না। মনের ভেতরের কষ্টগুলো রাগ হয়ে বের হয় তখন।”

“যদি বলি, তরী আমার নিজের মেয়ে না। আমার কোনো প্রথম স্ত্রী নেই। আমার একমাত্র স্ত্রী সবসময় তুমিই ছিলে। তাহলে?”

মোহনা অবাক চোখে তাকালেন। চোখের পানি মুছে বললেন, “মানে?”

“মানেটা জানার জন্য তোমাকে অনেক কাহিনী শুনতে হবে। শোনো তাহলে!”

মিস্টার আফনাদ কীভাবে তরীকে সেই ভ*য়া*ব*হ রাতে বাচিয়ে এনেছিলেন সবটা বললেন। সবটা শুনে মোহনা নির্বাক হয়ে রইলো। অস্ফুটস্বরে বললো,

“এই মা-হারা, নিঃস্ব, অসহায় মেয়েটাকে আমি এতো কষ্ট দিয়েছি। ওর ওপর এতো অন্যায়, অত্যাচার করেছি! তুমি আমাকে আগে কেন বলোনি এসব? কেন বলোনি? আমি এমন জ*ঘ*ন্য কাজ কীভাবে করলাম? আমার নিজেকে ক্ষমা করবো কীভাবে?”

মিস্টার আফনাদ হাসলেন। বললেন,

“আমি জানতাম, তোমার আ*ক্রো*শের কারণ কী! কিন্তু আমারও কিছু করার ছিল না। আমি সত্যিটা কখনো প্রকাশ করতে চাইনি। তবুও সবটা প্রকাশ করতেই হলো। কিন্তু আমি চাই না, তরী এটা জানুক যে, তুমি সবকিছু জেনে গেছো। মেয়েটা কষ্ট পাবে তাহলে!”

মোহনা চোখের পানি মুছে বললেন, “ঠিক আছে, বলবো না। কিন্তু ওর সাথে আজকে আমি দেখা করতে যাবো।”

মিস্টার আফনাদ সন্তুষ্টির সাথে বললেন, “চলো। তবে এটা জেনে রেখো, যে বাড়িতে যাচ্ছো, সেটাই তরীর আসল বাড়ি। তরী ঐ বাড়ির ‘চাঁদ’! রায়হানের ভাই আরমানের ছোট মেয়ে ও। অরিত্রী সেহরীশ! সৌহার্দ্যের প্রাক্তন প্রেমিকা অরুণীর ছোট বোন।”

-চলবে….

(গল্প সম্পর্কে যেকোনো মতামত, অনুভূতি প্রকাশ করতে পারেন আমার পাঠক মহলেঃ
https://facebook.com/groups/532829361202192/)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here