তবে_ভালোবাসো_কী ২ #Mehek_Enayya(লেখিকা) পর্ব ০২

0
112

#তবে_ভালোবাসো_কী ২
#Mehek_Enayya(লেখিকা)
পর্ব ০২

ড্রইংরুমে বাবার পা ধরে ফ্লোরে বসে আছে মাহানুর। কিছুক্ষন পর পর ন্যাকা কান্নার ভঙ্গিতে সুর তুলছে। উপস্থিত সকলে মিটমিট করে হাসছে। আয়াস সোফায় বসে আইসক্রিম খেতে খেতে মজার ছলে বলল,
-আজ মেজবাবা তোকে অনুমতি দিবে না রে মাহানুর। শুধুই অসহায় এর মতো পা ধরে বসে আছিস।
মাহানুর মাথা তুলে রাগী চোখে আয়াসের দিকে তাকায়। তারপর আবারও কান্না শুরু করে। ন্যাকা কণ্ঠে বলে,
-ও বাবা যেতে দেও না। সত্যি বলছি তারপর আর কখনও এতো দূরে যাবো না এটাই শেষ।
মেহরাব খান শক্ত মুখে স্থির বসে রইলো। হামজা একবার ছোট ভাইকে দেখে তো একবার আদরের ভাস্তিকে। চোখের ইশারায় মাহানুরকে বলে আরেকটু রিকোয়েস্ট করতে। মাহানুর পুনরায় বলল,
-বাবা দেও না অনুমতি। দেখো বড়বাবাও তো যেতে বলছে। যাও ঘুরে এসেই আমি তোমাদের পছন্দের ছেলেকে বিয়ে করবো কোনো ঝামেল্লা করবো না। তারপর আমাকে শশুরবাড়ি পাঠিয়ে দেবে নাকি মেয়ের জামাইকে ঘর জামাই বানিয়ে রাখবে সেটা তোমাদের বিষয়।

আয়াস পানি খাচ্ছিলো মাহানুরের শেষের কথা শুনে মুখ থেকে ছিটকে পানি বের হয়ে যায়। নাকেমুখে উঠায় কাশতে থাকে। হাজেরা দ্রুত এগিয়ে এসে ছেলের পিঠে মৃদু চাপর দেয়। মেহরাব মাথা তুলে মাহানুরের পানে তাকায়। গম্ভীর কণ্ঠে বলে,
-সত্যি বলছো নাকি মিথ্যে?
-একশো পার্সেন্ট সত্যি বাবা। তুমি কী তোমার মেয়েকে বিশ্বাস করো না?
-ঠিক আছে আমি যাওয়ার অনুমতি দেবো তবে বেশিদিন থাকা যাবে না আর আয়াসকে সাথে নিয়ে যেতে হবে। রাজি?
-না এটা হয় না ভাই! আয়াইসা কায়াইসা কে আমি নেবো না আমার সাথে।
মেহরাব ধমকের স্বরে মাহানুরকে বললেন,
-আয়াস তোমার বড় ভাই ভালোভাবে কথা বলো ওর সাথে।
-মাত্র ছয়মাসেরই বড়।
আয়াস দাঁত বের করে হাসতে থাকে। মাহানুর তাকে ভেংচি কাটে। হামজা খান মাহানুরের পক্ষ নিয়ে বলে,
-মেহরাব আম্মাকে একাই যেতে দেও। তাছাড়াও ওর বান্ধবীর বাসাই তো যাচ্ছে কোনো সমস্যা হবে না।
-কিন্ত বড়ভাই,
-আর কিন্তু কিন্তু বলো না। আমার আমাদের মেয়ের ওপর ভরসা আছে যাওয়ার অনুমতি দিয়ে দেও।
মেহরাব তপ্ত নিঃশাস ছেড়ে মাহানুরের দিকে তাকালো। শান্ত স্বরে বললেন,
-ঠিক আছে। সেখানে যেয়ে ক্ষণে ক্ষণে কল করতে হবে আর নিজের খেয়াল রাখতে হবে।

মাহানুর বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। খুশিতে উৎফুল্ল হয়ে লাফাতে থাকে। সবাই একসাথে হেসে উঠে মাহানুরের কান্ড দেখে। হাজেরা উদ্বিগ্ন হয়ে বলে,
-হয়েছে তো ব্যাথা পাবি।
-কিছু হবে না। আমি আজকে অনেক খুশি বড়আম্মু।
-হ্যাঁ সেটা তো দেখছি এখন আয় খাবার খেয়ে নে। দুপুরেও রাগ করে খাবার খেলি না।
-তুমি খাবার বাড়ো আমি আসছি।
হাজেরা চলে গেলো রান্নাঘরে। মেহরাব মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বাহিরে কিছু কাজের জন্য বেরিয়ে গেলো। মাহানুর দৌড়ে বড়বাবাকে জড়িয়ে ধরে। আদুরে কণ্ঠে বলে,
-আজ তুমি না হলে আমি বাবাকে মানাতে পারতাম না বড়বাবা। তোমাকে অনেক গুলো লাভ ইউ।
হামজা খান মাহানুরের কপালে চুমু দিয়ে একই ভঙ্গিতে বলে,
-আমার আম্মা খুশি তো আমি খুশি।

সবাই ড্রইংরুম থেকে চলে যেতেই মাহানুর আয়াসের পাশে এসে এটিটিউড নিয়ে দাঁড়ায়। মুখ বাকিয়ে বলল,
-দেখেছিস ঝিঙ্কুর বলেছিলাম না বাবা ঠিক মেনে যাবে।
-হইছে নাচো কম বনু। আব্বু মেজবাবাকে বলেছে তাই মেনেছে।
-যাই হোক এখন তো আমি চট্টগ্রাম যাবো। ইসসস কী মজা হবে! আমরা অনেক জায়গায় ঘুরবো।
-ঘুর গা আমার কী!
আয়াস হাতের ফোনে দৃষ্টি রেখে ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে কথাটা বলল। মাহানুর আয়াসকে আরেকটু ভরকাতে বলল,
-ভালোই হলো তোকে নিতে হবে না। এখন আমি একাই ঘুরবো আর তোকে পিক দেখিয়ে দেখিয়ে জ্বলাবো।
-আমিও যেতাম না যতসব! সামনের মাসে আমার এক্সাম।
-ভালো ভালো।
মাহানুর আর কিছু বলল না। গুনগুন গান গাইতে গাইতে ডায়নিং টেবিলে যেয়ে বসে পরে। লুৎফা (মাহানুরের ছোট চাচী) মাহানুরকে ভাত বেড়ে দিতে দিতে বললেন,
-সেই দুপুর থেকে মেয়েটা না খাওয়া!শরীরটা কেমন হেংলা দেখাচ্ছে।
মাহানুর ভেবছেকা খেয়ে যায়। মাত্র কয়েক ঘন্টা খায়নি তাই বলে তাকে হেংলা দেখাচ্ছে! এদের সকলের কী চোখে সমস্যা হলো নাকি!মনে মনে ভাবলো সে।
হাজেরা গরম গরম গরুর মাংসের কালাভুনা আর মাহানুরের পছন্দের ঝাঁলঝাঁল চিকেন কষা এনে দেয়। মাহানুর শাকসবজি খায় না এটা নিয়ে তার বাবা তাকে প্রতিদিন খাওয়ার সময় বকা দেয়। ক্ষুদার্থ পেটে পছন্দের খাবার দেখে দ্রুত খাওয়া শুরু করে মাহানুর। গরুর মাংস নিতে গেলেই লুৎফা তাকে ধমকে উঠে।
-ভুলেও গরুর মাংসে হাত দিবি না মাহানুর। বড়আপা আপনি ভুলে গিয়েছেন মাহানুরের যে গরুর মাংসে এলার্জি!
হাজেরা নিজ কপালে চাপর দেয়। করুন কণ্ঠে বললেন,
-আমি আসলেই ভুলে গিয়েছিলাম লুৎফা।
মাহানুর অসহায় স্বরে বলল,
-একদিন খেলে কিছু হবে না চাচীমা।
-না। একদম না। এখন ভাত খেয়ে নে কিছুক্ষনের মধ্যে আমি তোর জন্য নুডুলস রান্না করে দিচ্ছি।
মাহানুর খুশিতে মাথা নারায়। হাজেরা আদরে হাত বুলিয়ে দেয় মাহানুরের মাথায়। বিয়ের পর থেকেই তার ভীষণ ইচ্ছে ছিল তার একটা মেয়ে সন্তান হবে। অনেক আদরে রাখবে তাকে। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা তাকে দিলো দুইটা ছেলে। আয়াসের পর যখন সে মাহানুরকে পেলো তার মনে হয়েছিলো সৃষ্টিকর্তা তার ইচ্ছে পূরণের জন্যেই এই মা হারা মেয়েকে তার কাছে দিয়েছে। ধীরে ধীরে নিজ মেয়ের মতো বড় করতে থাকে মাহানুরকে। তার পেট থেকে জন্ম না নিলেও হাজেরা সবাইকে গর্ব করে বলে মাহানুর তার মেয়ে। তার অনেক বেশি আদুরে আর ভালোবাসার এই কন্যা। যখনই বাসায় কেউ মাহানুরের বিয়ের কথা বলে তার বক্ষ কেঁপে উঠে। এই আদুরে কন্যাকে দূরে রেখে তারা কিভাবে থাকবে! মাহানুর যে ফ্যামিলি ছাড়া কিছুই বুঝে না সে-ই বা কিভাবে থাকবে পরিবার ছাড়া!
_______________________

পরেরদিন ভার্সিটির ক্যাম্পাসে বসে আছে মাহানুর ও তার বন্ধুর দল। তাদের কথার মেইন টপিক হলো চট্টগ্রাম কিভাবে যাবে আর কে কে যাবে। অহনার বাড়ি চট্টগ্রামে। ঢাকায় পড়াশোনা করতে এসেছে সে। ভার্সিটির সামনেই একটা হোস্টেলে থাকে আবার মাঝে মাঝে মাহানুরের সাথে তার বাসায়ও থাকে। মাহানুরের সাথে অহনার আর সিয়ামের চার বছরের বন্ধুত্ব। মুহিব মাহানুরের স্কুল জীবন থেকে বন্ধু। অহনার চাচাতো বোনের বিয়ে। তাই অহনা প্ল্যান করেছে যেভাবেই হোক বন্ধুদের নিজের সাথে নিয়ে যাবে। তার ফ্যামিলিও তাঁদের নিয়ে যেতে বলেছে।
অনেক কথা কাটাকাটির পর সকলে মিলে প্ল্যান করলো আগামীকাল সন্ধ্যায় তারা রওনা হবে। মাহানুরের ইচ্ছে ছিল লঞ্চে করে যাবে কিন্তু মুহিব লঞ্চে একটুও যাবে না। সে ছেলে হলেও মেয়েদের থেকেও বেশি ভীতু প্রকৃতির। অতঃপর ট্রেনে করে যাওয়ারই পরিকল্পনা হলো।
হাসতে হাসতে পাশ ফিরে তাকাতেই মাহানুরের নজর পরে তাঁদের পাশের টেবিলে চেয়ার পেতে বসা রাফিন ও তার বন্ধুদের দিকে। মাহানুরকে দেখে গা জ্বলানো হাসি দেয় রাফিন। মুহূর্তেই মাহানুরের হাসি মুছে মুখে গম্ভীর্য্য দেখা মিলে। অহনা, সিয়াম বেপার টা বুঝে উঠার আগেই রাফিন বসা থেকে উঠে মাহানুরের পাশের খালি চেয়ারে গা এলিয়ে দেয়। মাহানুর বিরক্তে উঠে যেতে নিলেই রাফিন তার একহাত চেপে ধরে টেবিলে। রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে যায় সিয়াম, অহনা আর মুহিবের। শান্ত ভঙ্গিতে মাহানুর একবার রাফিনকে দেখছে তো একবার তার ধরে রাখা হাত।
রাফিন বাঁকা হেসে বলল,
-ওয়েদারটা কিন্তু সেই চলো না কোথায়ও ঘুরতে যাই।
-তোর কলিজা কত বড়! কোন সাহসে মাহানুরের হাত ধরেছিস?(সিয়াম)
-যার হাত ধরেছি সে কিছু বলছে না তুই উঁচু স্বরে কথা বলার কে?
সিয়াম টেবিলে বাড়ি দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। কিছু বলতে যাবে তার পূর্বেই মাহানুর তাকে থামিয়ে বলল,
-আহ সিয়াম এতো পেরেশান হচ্ছিস কেনো তুই? চুপচাপ বস নিজের জায়গায়।
সিয়াম স্থির হয়ে বসতে পারলো না। রাফিন কিছুটা সাহস পেয়ে নিচু স্বরে বলল,
-চলো না আমার ফ্লাটে যাই। সেখানে যেয়ে শান্তিতে কথা বলবো কেউ আমাদের বিরক্ত করবে না।
মাহানুর মুচকি হাসি দিলো। রাফিনের থেকে ছাড়িয়ে নিলো নিজের হাত। ব্যাগের চেইন খুলে একটা চকচকে পাঁচশত টাকা বের করে। সিয়াম মুহিব বুঝতে পারছে না মাহানুর কী করতে যাচ্ছে। অহনা সকলের অগোচরে প্রসন্ন হাসলো। মাহানুর মুখের হাসি বজায় রেখেই রাফিনের শার্টয়ের বুকপকেটে টাকা ভরে দিয়ে বলল,
-টাকা দিয়ে দিলাম এখন পতি’তা’লয় চলে যা নিজের টাইপের অনেক মেয়ে পেয়ে যাবি। তবুও আমার পিছা ছাড়।
বসা থেকে উঠে দাঁড়ায় মাহানুর। রাফিনের সব বন্ধুবান্ধবীরা বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মাহানুর সকলের চাহনি উপেক্ষা করে পা আগে বাড়ায়। রাফিন ক্রোধে ধপ করে উঠে দাঁড়ায়। এলোমেলো মস্তিকে পিছন থেকে মাহানুরের হাত ধরে তাকে আটকে দেয়। মাহানুর এবার আর নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলো না। পিছনে ফিরে ঠাটিয়ে চড় বসিয়ে দিলো রাফিনের গালে। রাফিন চিৎকার করে বলল,
-হাউ ডেয়ার আর ইউ?
ক্যাম্পাসে উপস্থিত সকলে তাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকে। সকলেই জানে মাহানুর কেমন স্বভাবের আর রাফিন কোন পদের। তারা মনোরঞ্জন পেয়ে দেখতে থাকে।
মাহানুর শক্ত কণ্ঠে বলল,
-আমার সাথে আওয়াজ নামিয়ে কথা বলবি। তোর সাহস কত বড় আমার হাত ধরিস! তুই যেসকল মেয়েদের সাথে চলিস অথবা যেসকল মেয়েরা তোকে পছন্দ করে তাঁদের রুচি জঘন্য। আমাকে সেইসব মেয়েদের সাথে মেলাতে যাবি না একদম। যদি পুরুষ হয়ে থাকিস তাহলে আজ আমার এই চড়ের কথা ভেবে আর কখনও আমার সামনের আসবি না। খবরদার।

মাহানুর আর একমুহূর্তও দাঁড়ালো না। বন্ধুদের নিয়ে প্রস্থান করলো সেখান থেকে। রাফিন রাগে নিজের চুল পিছন থেকে মুঠি করে ধরে। বিড়বিড় করে বলে,
-দারুণ রুচিশীল মেয়ে না তুই! আমিও দেখছি কোন সুপুরুষ তোর স্বামী হয়। একবারের জন্য হলেও তোকে আমি আমার বিছানায় নিয়েই ছাড়বো। এতদিন তো শুধুই পছন্দ ছিলি আজ থেকে তুই আমার জেদ। তোর জীবনের বারোটা না বাজিয়ে ছাড়ছি তাহলে আমিও রাফিন শেখ নই মাহানুর খান।

মাহানুরের মুড অফ থাকায় আজ আর ঘুরাঘুরি না করে বাসায় চলে আসে সে। নিজের রুমে এসে লম্বা একটা শাওয়ার নিয়ে বিছানায় শুয়ে পরে। হাজেরা মাহানুরের মুখ দেখে বুঝতে পারে কিছু একটা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন করার সাহস হয়নি তার।

বিকালে টিউশনি করিয়ে মাহানুরের বাসায় যাচ্ছিলো অহনা। মাহানুরের মন খারাপ সে গেলে একটু ভালো ফিল করবে ভেবেই যাচ্ছে। রাস্তার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় অহনা আড়চোখে একটা নিদিষ্ট বাড়ির মেইন গেটের দিকে তাকায়। এটা তাঁদের এলাকার মেয়র অর্থাৎ রিদদের বাসা ( আমি ভুলে গিয়েছিলাম ঢাকায় চেয়ারম্যান হয় না মেয়র হয়। তাই পরিবর্তন করে মেয়র দিলাম)। রিদদের বাসায় একটা খামার আছে। সেখানে গরু, ছাগল, মুরগি পালিত হয়। অহনার এই জিনিসটা অনেক ভালো লাগে। শহরে সাধারণত এইরকম খামার অনেক কমই নজরে পরে।

অহনা বেখেয়ালি সেদিকে তাকিয়ে যাচ্ছিলো আচমকা কারো শক্ত বুঁকের সাথে বারি খায় সে। ছিটকে কিছুটা দূরে সরে যায়। হিজাব ঠিক করে সামনে তাকাতেই দেখতে পায় রিদ হাসি হাসি মুখে তার দিকে তাকিয়েই দাঁড়িয়ে আছে। হটাৎ রিদকে দেখতে পেয়ে একটু ভয় পেয়ে যায় অহনা। পাশ কেটে যেতে নিলে রিদ পথ আটকায়। একটু ঝুঁকে বলল,
-আমাকে খুঁজছিলে নাকি?
-একদম না। আমি পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম শুধু।
অকপটে জবাব অহনার। রিদের হাসি আরেকটু চওড়া হয়। অহনার মুখে ফুঁ দেয়। অহনা অস্বস্থি অনুভব করে। দৃষ্টি নত রেখে বলল,
-আমাকে যেতে দিন ভাইয়া।
-ইসসস!যারে আমি বউ বানাইতে চাই সে আমাকে ভাই বলে! আমার থেকে বড় দুর্ভাগ্য আর কার।
অহনা কিছু বলল না। সে এতক্ষন পর খেয়াল করে রিদ দু’হাত পিছনে নিয়ে কিছু একটা লুকাচ্ছে। তাঁদের পাশ দিয়ে রিদদের বাড়ির কর্মচারী অনেকগুলো ছাগল নিয়ে বাড়ির ভিতরে যাচ্ছে। হয়তো আশেপাশের কোনো মাঠে নিয়ে গিয়েছিলো তাঁদের। একটা সাদা ছাগলকে দেখে মনে মনে ভীষণ হাসি পেলো অহনার। ছাগলটা কেমন রিদের মতোই দেখতে। মনের আজিবগুজীব ভাবনায় একা একাই হাসতে থাকে অহনা। রিদ সরু চোখে তাকিয়ে সুর টেনে বলল,
-যাক বেটা আমার সাথে থেকে থেকে দেখি তুমিও পাগল হয়ে যাচ্ছ জান! একা একাই হাসছো আমাকেও বলো হাসির কারণ।
অহনা চুপসে যায়। চলে যেতে নিলে রিদ ত্বরিত গতিতে বলল,
-দাঁড়াও দাঁড়াও। তোমাকে একটা জিনিস দেওয়ার আছে। আজ আমার মন বলেছিলো তুমি এদিকে আসবে তাই তোমার জন্য একটা স্পেশাল জিনিস নিয়েছি।
অহনা ছোট ছোট চোখ করে তাকিয়ে রইলো শুধু। সন্ধ্যার আগমুহূর্ত হওয়ায় রাস্তা অনেকটা ফাঁকা। দুই একটা রিকশা গাড়ি যাচ্ছে মাত্র। রিদ সবকিছু ইগনোর করে হাঁটুগেড়ে বসে পরে পাকা করা রাস্তায়। অহনার চোখ বড় বড় হয়ে যায়। আশেপাশে তাকিয়ে তাড়া দিয়ে বলে,
-কী করছেন আপনি? দ্রুত উঠুন ভাই আপনার বাসার কেউ দেখলে খারাপ ভাববে।

রিদ কিছুই বলল না। নিজ আঁখিজোড়া বন্ধ করে হাত সামনে এনে বলল,
-আমার মনের রানী, আমার রাতের স্বপ্নের পরী,আমার কলিজা ধক ধক করানো রমণী, আমার ভবিষ্যত বাচ্চাদের নাবালিকা আম্মু, আমার ভবিষ্যত রাঁধুনি অনেক ভালোবাসি তোমাকে। তোমার জন্যে তোমার মতোই সুন্দর একটি জিনিস।
আঁখিজোড়া বন্ধ রেখেই রিদ শুনতে পেলো অহনার রাগে ফোঁস ফোঁস নিঃশাসের শব্দ। অহনা চেঁচিয়ে বলল,
-ইউ স্টুপিড, পঁচা মুলা, গন্ধযুক্ত পোকা আমাকে গোলাপ ফুলের ডান্ডির মতো লাগে তোর কাছে!
অহনার শান্ত মুখে এহেন আচরণ শুনে ভড়কে গেলো রিদ। দ্রুত চোখ খুলে ফেলে। হাতে ফুলের পরিবর্তে ফুলের খালি ডান্ডি দেখে সে নিজেও অবাক হয়ে যায়। সেটা হাত থেকে ফেলে পিছনে ফিরে তাকাতেই দেখতে পায় ফুলের কয়েকটা পাঁপড়ি নিচে পরে আছে। কালো রঙের একটি ছাগল বেশ মজা করে খাচ্ছে সেগুলো।
রিদ মাথায় হাত দিয়ে অস্থির স্বরে বলল,
-জান বিশ্বাস করো আমি গোলাপ এনেছিলাম তোমার জন্য। এই কু’ত্তার বাচ্চা আমার গোলাপ খেয়ে ফেলেছে।
-তোর কী আমাকে মগা মনে হয় মুলার ঘরে মুলা! এখানে কুকুরের বাচ্চা কোথায় এটা তো ছাগল।
রিদ রাগে আর বিরক্তে অধয্য হয়ে মাথা চেপে নিচে বসে পরে। বিড়বিড় করে ছাগলের চোদ্দগুষ্টি উদ্ধার করতে থাকে। অহনা তপ্ত নিঃশাস ফেলে ধারালো কণ্ঠে বলে,
-মাহানুর ঠিক বলে আপনি জাস্ট টাইমপাস করতে আমার পিছনে ঘুরেন। তবে মনে রাখবেন রিদ ধনী বাপের ছেলে বলে সব মেয়েই আপনার হয়ে যাবে এটা আপনার ভুল ধারণা। আর কখনও আমার চোখের সামনে আসবেন না।

কথা শেষ করে বড় বড় পা ফেলে চলে যায় অহনা। না চাওয়ার সত্ত্বেও রিদকে তার একটু একটু ভালো লাগতে নিয়েছিল আজ এইরকম রসিকতায় তার ছোট মন ভয়ংকর ভাবে ব্যাথা পেয়েছে। তাইতো মুখে যা এসেছে তাই বলে চলে আসলো।
অন্যদিকে চোয়াল শক্ত করে রাস্তায়ই বসে থাকে রিদ। আজ একটা ছাগলের জন্য অহনা তাকে ভুল বুঝলো। রিদ পারে না ছাগলটাকে গলা টিপে মেরে ফেলে। রাগ কোনোরকম দমিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
-শালার ছাগল আমি অভিশাপ দিলাম তোর জীবনেও বিয়া হইবো না। কুয়াড়া ম’রবি তুই। কোনো মেয়ে ছাগলই তোর দিকে ফিরে তাকাইব না।
রিদ বড় বড় নিঃশাস নিলো। কিছু মনে পরার ভঙ্গিতে পুনরায় বলল,
-ওহ হো তোর জীবনে বাচ্চাও হইবো না কুঁ’ফা দিলাম আমি।

>>>>চলবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here