#ভালোবাসার_কাব্য_গাঁথবো
(৫৬)
বিশাল বড় একটা হল ভাড়া করা হয়েছে। জায়গাটা শহরের একটু বাইরের দিকে। বাইপাস মোড় থেকে ডানদিকে যেতে হয়। গ্ৰামীন পরিবেশে এতো বড় হল সারাবছর ই বুকিং থাকে। রুচিশীল মানুষ যারা একটু ইউনিক ভাবে তাঁদের মেমোরিস গুলো মেমোরাবল করে রাখতে চায় তারাই বেছে নেয় হলটা। রাত জন্য জায়গাটা ঘুরে দেখা হলোনা লাবিবার। সকাল সকালই বেরিয়ে পড়বে দেখার জন্য ঠিক করলো। লাবিবা যে রুমে আছে সেই রুমে সব সমবয়সী মেয়েরা। কেউ কেউ ফ্রেন্ডস কেউ কেউ কাজিন। লাবিবা তানভীরকে কখন থেকে ট্রাই করে যাচ্ছে তানভীর ফোন ধরলোনা। অচেনা জায়গা গাদাগাদির ভেতরে লাবিবার আর ঘুম হবে না। লাবিবা একবার পুরো রুমে চোখ বুলিয়ে নিলো। সবাই ঘুম। হটাৎ করে মনে হলো কেউ একজন নড়লো। লাবিবা এগিয়ে গেলো দেখার জন্য কে নড়লো। মুখের উপর থেকে চাদরটা সরাতেই হাত চেপে ধরলো। লাবিবা ভয় পেয়ে গেলো। রোজী সাথে সাথে কথা বললো, ‘ লাবিবা?’ লাবিবা যেনো হাফ ছেড়ে বাঁচলো।নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল, ” আপু? ঘুমাও নি?” রোজী ছোট্ট করে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। জীবনে একই রাত সে দুইবার পেলো। একই অনুভূতি। সাথে পূর্বের রাতের জন্য কিছুটা খারাপ লাগা। লাবিবা আবার ডাকলো,
” আপু?”
” আমার ঘুম আসবেনা লাবিবা।”
” আমারো ঘুম আসছে না। চলো গল্প করি।”
” আমাকে ঘুমোতে হবে। বাই। ঘুমোও লাবিবা।”
রোজী আবার মুখ ঢেকে ফেললো। লাবিবা অবাক হলো। “এটা কি হলো?”
লাবিবা একা একা ছটফট করলো। রুম ছেড়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালো। লম্বা বারান্দা। এ মাথা থেকে ঐ মাথা দেখা যায়। মাথার উপর জ্বলছে এল ইডি বাল্ব। লাবিবা রুমে ফিরে আসলো। তার লাগেজ টা টেনে বের করলো লাগেজের স্তুপ থেকে। লাগেজের ভেতরে তানভীরের জার্নাল। সে বারান্দায় এসে দাঁড়ালো। জুতো খুলে ফ্লোরে বুড়ো আঙুলে দাগ কাটলো। একদমই চকচক করছে ফ্লোর। রাতে সবাই রুমে যাবার পর ই বোধ হয় মুছে দিয়ে গেছে। সে বসে পড়লো। জার্নাল টা খুললো। প্রথম কিছু পাতা ছোট ছোট লেখা। প্রথম পাতার উপর ছোট্ট করে লেখা ‘ বউ ‘ । লাবিবা পড়ে যা বুঝলো ভবিষ্যত বউকে নিয়ে জল্পনা কল্পনা ই এখানে লেখা। এতো ধৈর্য্য হলো না। সম্পূর্ণ স্কিপ করে খুঁজতে লাগলো লাবিবার কথা কোথা থেকে লেখা। প্রথমেই একটা ছবি পেলো। কলেজ ড্রেস পরা ছবি। মুখে ফুচকা তুলে খাচ্ছে। লাবিবা মুচকি হেসে রেলিং এ পিঠ ঠেকিয়ে দিলো। উৎসাহ নিয়ে পড়লো,
” কিশোরী বড্ড চঞ্চল। ”
পরের পাতায় ধান ক্ষেতের মধ্যে হেঁটে যাওয়া ছবি। কমলা রঙের ওড়না দিয়ে ঢাকা কোমড় অব্দি। যতটুকু দেখা যাচ্ছে তা শুধুই নাক। কিন্তু ছবি তুলার ধরণটাই অসাধারণ। তার নিচে লেখা,
” উদাস ফাগুনে আগুন ধরিয়ে দিয়ে যায়। ”
লাবিবা একটু নড়েচড়ে বসলো। ছোট্ট ছোট্ট লেখা তার গভীরতা জানতে গেলে খেই হারিয়ে ফেলবে।
ছাদের কিনারে দাঁড়িয়ে চাঁদ দেখার মুহূর্ত।পাশেই লেখা,
” ঐ চাঁদের চেয়ে আমার চাঁদটা আরো সুন্দর। ”
কিছু ছবি মাঝখান দিয়ে কাটা। লেখা,” আই ওয়ান্ট টু ফরগেট য়্যু।” লাবিবা বুকটা ধুকপুক করতে লাগলো। পরের ছবিটা আরো বিচ্ছিরি করে কাটা। লেখা,
” আই উইল সুন ফরগেট য়্যু।” লাবিবার বুকে যন্ত্রনা শুরু হলো। সেই সময়টুকু তানভীরের কেমন কেটেছে ভাবতেই চোখে জল ছলছল করে উঠলো।
পরের পেইজে কোনো ছবি লাগানো নেই। আছে পেন্সিলের আঁকা ক্রেচ। ছোট্ট করে একটা লাবিবা। এলোকেশী চুলে ভাঁজে পড়া শাড়ী গায়ে হাতে গলায় অলংকার। নিচের দিকে ছোট্ট করে দুই লাইন লেখা,
” এতো কেনো জ্বালাতন? সপ্নেও হানা দেওয়া!
ওকে ফাইন, নাউ আ’ম নট লিভিং য়্যু। ”
নিচ থেকে আরেকটা ছবি তুলা। মাথায় ঘোমটা টানা। থুতনিটা প্রথমেই শো করছে। এদিক ওদিক কোনো লেখা নেই। উপরেই গ্লু লাগানো নিচে নেই। লাবিবা ছবিটা একটু নিচ থেকে উল্টে ধরলো । ছবির নিচে লেখা।
” আই ওয়ানা বাইট য়্যু।”
লাবিবার হাত থেকে ধপ করে পড়ে গেলো শক্ত মলাটের আবরণ টা। লাবিবা শক্ত ঢুক গিললো। প্রথম দিনের সেই বাইট ! চোখের সামনে ভেসে উঠলো।
প্রথম বিয়েতে ছিলো কষ্ট আর ভয়। কনফিউশনে ভরপুর সেই সময়। কিন্তু এবার যেনো পুরোদমে মেতে উঠেছে বর কনেরা। প্রথম বিয়ের আমেজে মাতোয়ারা। লাবিবা তো লজ্জায় লাল টুকটুকে হয়ে আছে। যখন কেউ কিছু বলছে তখনই জোর গলায় উত্তর দিচ্ছে,
“একদম ফাও কথা বলবেনা। আমার লাভ ম্যারেজ হচ্ছে। দশমাসের প্রেমের সম্পর্ক পরিণতি পেতে যাচ্ছে। আমি হাসিখুশি থাকবো নাতো কে থাকবে?”
সবার মাঝে হাসির রোল পড়ে যায়। রোজীকে জিজ্ঞেস করতেই রোজী ঘাবড়ে যায়। লজ্জাও পায়। শাড়ীর ঘোমটা আরো নিচে টেনে মুখ চেপে বসে থাকে। লাবিবা চেঁচিয়ে বলে,
” হেই রোজ কতদিন হলো? রেস্টুরেন্টে ডেটে যেদিন গিয়েছিলে সেদিন থেকে ধরবো নাকি কাল রাত থেকে?”
লজ্জায় রোজীর চোখদুটোও বন্ধ হয়ে এলো। উর্মিলা লাবিবার উপর ঢলে পড়লো। আকাশের দিকে তাকিয়ে ভঙি করে বললো, “আহা! কেয়া সিন হে হিরো হিরোইন কা।”
লাবিবার আরো দুজন বান্ধবী এসেছে মালা তো নাকিবকে ফোন দিয়েই বসলো, “হ্যালো নাকিব! দোস্তরে, কাল রাতে অন্ধকারে কেয়া সিন হে! ”
ফোনের ঐপাশে নাকিব সহ সব মেয়েরাই হাসতে হাসতে গলে পড়লো। রোজীর ইচ্ছে করছে এখান থেকে পালিয়ে যেতে। এতোক্ষন মনটা ভীষণ খারাপ করছিলো। লাবিবা যে কি! বুঝতে পেরে কিভাবে তাকে লজ্জায় দিচ্ছে। রোজী মনে মনে লাবিবার জন্য প্রাণখুলে দোয়া করলো। কিছু কিছু মানুষ আসে জীবনে আশির্বাদ হয়ে। লাবিবা তার জন্য আশীর্বাদ। আর ডক্টর তামিম খান! রোজী লজ্জায় যেনো আজ মারাই যাবে। মেহেন্দীর জন্য মা চাচীরা এসে ঝটপট তাড়া দিয়ে যায়। মেহেন্দী অনুষ্টান হবে ছেলেপক্ষ মেয়ে পক্ষ একসাথে। কিন্তু হলুদ দেওয়া হবে আলাদা আলাদা যেহেতু হলুদের গোছল দেওয়ানো হবে। তাড়াতাড়ি একটা অনুষ্টান শেষ করলেই না পরেরটার প্রস্তুতি নিতে পারবে।
সকাল আটটায় তানভীর বেশ কয়েকদিন পর গোছল দিলো। এতোদিন ব্যস্ততায় নিজের পানচুয়াল লাইফটা পুরো ঘেটে গেছে। রেডি হতে এসেই দেখে তামিম একদম অফ হোয়াইট শেরওয়ানি পড়ে রেডি। ভীষন ভালো লাগছে তাকে। চল্লিশ ছুই ছুই মানুষটা বোঝায় যাই না। তানভীর একগাল হেসে বললো,
” সুন্দরী ভাবির ছোঁয়ায় ভাইয়ের কি আমার বয়সটা আরো কমে গেলো?”
তামিম ও হাসলো। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আতর লাগাতে লাগাতে বললো, ” জোকস অফ দ্যা ইয়ার।”
” আরে, বিলিভ মি।”
” কুইক রেডি হ। আমি বেরোলাম।”
” য়্যু লুক সো গর্জিয়াস ভাই।”
” থ্যাংক য়্যু।”
তামিম বের হবার পথে নাকিবকে ক্রস করলো। নাকিব ঝটপট একটা শপিং ব্যাগ তানভীরের সামনে রাখলো।
” স্যার। আপনার মেহেন্দী ড্রেস। ”
” লাবিবা?”
” জি স্যার। কুইক রেডি হয়ে আসুন। ”
নাকিব বেরিয়ে যেতেই তানভীর ব্যাগ থেকে ড্রেস বের করে নিলো। চোখ আটকে গেলো কটির কাপড়টার দিকে। সাত রংয়ের মিশেল ভারী সুন্দর সিকুয়েন্সের কাজ। এরজন্য ই তার বউ এতো পাগলামি করলো? সারপ্রাইজ দিবে বলে দেখালোনা পর্যন্ত! তানভীর রিয়েক্ট করতে ভুলে গেলো। কটি হাতে তুলে নিতেই কাপড়ের ভাজে সবুজ চিরকুট চোখে পড়লো।
কালো মার্কারে ছোট ছোট গুটি গুটি হাতের লেখা,
” এ্যা সারপ্রাইজ ইজ ওয়েটিং ফর য়্যু।”
তানভীর মুচকি হাসলো। পাঞ্জাবীর দিকে তাকিয়ে দু আঙুলে দু চোখের পাতা চেপে ধরে আবার হেসে উঠলো। সারপ্রাইজ সেও দিতে জানে তার বউকে । পাঞ্জাবী কটি পড়ে একদম তৈরী হয়ে গেলো। চুলগুলো সেট করে কড়া স্মেলের আতর মাখলো গায়ে। হাত ঘড়িটা পড়ে নিলো। হালকা করে গ্ৰুম বেস মেকাপটাও সেরে নিলো। তামিম ইউজ করে একদম ফেলে রেখে গেছে ভ্যানিটির উপরেই। তানভীর সেটা প্যাক করে লাগেজে ঢুকিয়ে রাখলো। সে ভালো করেই বুঝে গেছে আজ তার বউ শোধ তুলবে। এতোদিন বকা ঝকা বুঝিয়ে আঁটকে রাখা মেয়েটা কোনো বাধা মানবেনা। পুরো রেইনবো হয়ে তার সামনে ধরা দিবে। সে যদি তার মাথা ঘুরিয়ে দেয় সেও তাকে পাগল করে ছাড়বে। তানভীর একদম রেডি হয়ে আয়নায় আরেকবার এদিক সেদিক ঘুরে নিজেকে দেখে নিলো। একই বিল্ডিং এ দুজন আজ দুজনের জন্য তৈরী হচ্ছে ভেবেই তানভীরের হার্টবিট বেড়ে গেলো। এটাই চেয়েছিলো সে না? এই দিন এই সময়টাই তো চেয়েছিলো।
রোজীর পড়নে মেজেন্টা রংয়ের বড় রাউন্ড গাউন। রোজী একেবারেই অভ্যস্ত নয় এরকম ড্রেসে। রোজীর মনে হলো এই ড্রেসে লাবিবাকে সুন্দর লাগবে। লাবিবা এতে অভ্যস্ত। সে লাবিবাকেই বলবে এটা পড়তে আর লাবিবার লেহেংগা সে পড়বে। তারপর মনে পড়লো সাইজ হবেনা। অগত্যা গাউন পড়েই যতটা সম্ভব কমর্ফোর্ট দেখানো যায় চেষ্টা করে যাচ্ছে। নিতু ইসলাম এলেন লাবিবা রোজীকে নিয়ে যেতে। স্টেজে তানভীর তামিম এসে গেছে। মেয়েদের বললেন চলো তোমরা পেছনে দাঁড়াও তিনটি সারি বেঁধে। ব্রাইডদের পেছন পেছন যাবে। ক্যামেরাম্যান ভিডিওগ্ৰাফার সবাই রেডি। দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে আছে। নিতু ইসলামের সাথে তার মেয়ে এনা আর নাতনী মারিয়া। আমেরিকা থেকে এসে আজ সকালেই হলে এসেছে। এতোক্ষন অপেক্ষার পর দুই ব্রাইডকে দেখে অভিভূত হয়ে গেলো। নিতু ইসলাম তো লাবিবাকে জড়িয়ে ধরে গালে চুমু খেয়ে বসলো। আদরে বললো, “আমার ছোট মা।”
রোজীকে বুকে টেনে নিয়ে মৃদু হাসলো। কপালে চুমু খেয়ে দোয়া দিলো, “স্বামী সোহাগী হও।”
রোজী নুইয়ে গেলো। সবাই হি হি করে হেসে উঠলো। লাবিবা বেশ মজা পাচ্ছে রোজীকে দেখে। এদিকে সে যে আরেকজন ব্রাইড তার কোন হুসই নেই। মনে মনে একটাই তার অস্থিরতা কখন সে তানভীর কে দেখবে? কাল থেকে কথাও হচ্ছে না। লাবিবার অনুভূতি সদ্য ফোটা কিশোরীর মতো। যখন প্রথম তার ভ্রমর এসে বসে মধু খাওয়ার জন্য। বিয়ের দশমাস বয়সে কতক্ষন পেয়েছে তানভীর কে? নয়টা রাত মাত্র! তার মাঝে পাঁচ রাত আদরে মুডিয়ে আরেক রাত কষ্ট আর বাকিগুলো _
একান্ত ভাবে প্রতিটা দিন প্রতিটা রাত প্রতিটা সময় পাওয়ার জন্য মুখিয়ে আছে সে। আর দুটোদিন অপেক্ষা। আগামী রাত থেকেই তো তানভীর পুরোপুরি তার। না সে তানভীর কে আর বেপারোয়া ভাবে থাকতে দিবে আর না তানভীর তাকে ছেড়ে থাকতে পারবে। স্বামী নামক মানুষটার ভালোবাসার গভীরতা কতদূর তার জানা হয়ে গেছে। বাকী যদি থাকে সেটাও জানতে দেরী নেই । লাবিবার মন টানছে। ভীষণ ভাবে মন টানছে সেই অপেক্ষারত মানুষটার জন্য।
লাবিবার হাতের আঙুল ধরলো ছোট্ট মারিয়া। লাবিবা হাই দিতেই সেও বললো, ” হ্যালো মামুনী।”
” কি কিউট!”
“তুমিও কিউট। গুলুমুলু মারিয়ার মতো। ”
রোজী টুকটাক কথা বলছিলো এনার সাথে। পাশ থেকে মারিয়ার গাল টেনে দিলো।
তানভীরের অপেক্ষার অবসান হতে চললো। তামিমকে ভাই ব্রাদার্সরা ধরেছে হাতে মেহেদি লাগিয়ে দিবে বলে। তানভীরকেও ডিস্টার্ব করতে চেয়েছিলো। এক চোখ রাঙানি দিতেই সবগুলো নরম সোজা তামিমকে নিয়ে পড়েছে। তামিম কোন মতে থামিয়ে রেখেছে রোজ আসুক বলে। আট নয়জন ফটোগ্ৰাফার সামনে ধীরে ধীরে পিছিয়ে আসছে। তার পরেই ব্রাইড দুজন। ঠিকভাবে দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু তানভীরের দৃষ্টি পড়েছে হাঁটার তালে ছন্দ তোলা সেই রেইনবো দোপাট্টার দিকে। ধীরে ধীরে নিকটে দৃষ্টি পরে আসছে মুহুর্ত গুনে। অবশেষে দৃষ্টি মেলালো সেই দৃষ্টিতে। একগাল লজ্জামাখা হাসি নিয়ে এগিয়ে আসছে তার দিকে। তানভীর বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। এক হাত স্বাভাবিক রেখে আরেক হাত চলে গেলো ডান পাশে বুকের উপরে। ঠোঁটে বাঁকা হাসি রেখা টান দিতেই লাবিবা মাথা নুইয়ে নিলো। দুহাতে লেহেংগা উপুড় তুলে সিড়ি বেয়ে নেমে এলো পর পর পায়ে। একদম তানভীরের সামনে। তানভীর বাকি দূরত্বটা অনেকটাই ঘুচিয়ে নিলো এগিয়ে এসে। কপালে চুমু ফিসফিসিয়ে বললো “মাশাআল্লাহ।”
দু পাশ থেকে ছেলে মেয়েদের মাঝে হৈ পড়ে গেলো এমন দৃশ্যে।
তামিম এক হাত এগিয়ে নিয়ে এলো রোজীকে। রোজীর লাজুক মুখের দিকে তাকিয়ে জানালো, “রোজ! তোমাকে ভীষণ সুন্দর লাগছে।”
রোজীর বিশ্বাস হলোনা তেমন তামিম তাকে এভাবে বলছে। অবিশ্বাসের সাথেই বললো, “এমনটাও না।”
তামিম চিন্তিত হয়ে পড়লো। গম্ভীর স্বরে বললো, “হুম। ওয়েটটা অনেকটাই বাড়াতে হবে। ” রোজীর লজ্জা মাখা মুখ ফুস হয়ে গেলো। তামিম একগাল হেসে দিলো, “মন খারাপ করো না। আমি আছি কি করতে? বেশী বেশী ডোজ দিয়ে ওয়েট গেইন করিয়ে দিবো।”
রোজীর বুকে হাপর টানলো। কান দিয়ে ধোঁয়া বের হলো। হায় আল্লাহ, কি অসভ্য!
ব্রাইড দুজনকে ধরে বসিয়ে দিলো দুই দিকে। তাঁদের পাশে গ্ৰুম বসবে। তামিম বসতেই হৈ পড়ে গেলো। এবার তামিমকে মেহেদী পড়তেই হবে। কি বড় ঝামেলা! তামিম বোঝানোর চেষ্টা করলো ‘ আরে তোদের ভাবীকে পরা। মেহেদী মেয়েদের হাতেই মানায়। আমি কেনো?’
” তাতো হবেনা ভাইয়া। আগে তোমাকে পড়াবো তারপর তানভীর ভাই।”
তানভীরের কথা বলতেই তানভীর কটমট করে তাকালো। ব্যাস। সবার সাহস ফুস করে উড়ে গেলো। তামিম বললো, ” তারচেয়ে বল নাচতে আমি নাচছি। তবুও মেহেদী পড়তে বলিস না। ”
সবাই বলে উঠলো এই মিউজিক ছাড়ো। মিউজিক স্টার্ট হতেই একদল ছেলে এসে দাঁড়ালো। তামিম কে উঠতেই হবে তামিম বুঝতে পারলো। রোজীকে বললো,
” তুমি মেহেদী পড়া শুরু করো। ”
” আচ্ছা।”
উঠতে গিয়ে আবার বসে পড়লো,
” রোজ! তুমি নাচতে পারো?”
রোজী ঘাবড়ে গেলো, ” এই না না আমি নাচবোনা।”
” তার মানে পারো। ”
” না পারিনা।”
” লাবিবা তোমাকে এতো কিছু শেখায় এটা শেখাতে পারলো না?”
” এমা! কি শিখাবে? কিচ্ছু শেখায় না। ”
” কিচ্ছু না শেখালে গাউন পড়ে এভাবে হেঁটেও আসতে পারতে না। বসেও থাকতে পারতেনা ইজি ভাবে। ”
রোজী বড়ো বড়ো চোখ করে তাকালো। সত্যি সত্যিই তো কাল রাতে ঘুমানোর আগে এই গাউন পড়ে অনেকক্ষন সে ছিলো। টুকটাক নাচের স্টেপ ও শিখিয়ে দিয়েছে লাবিবা। তামিম কিভাবে জানলো?
পেছন থেকে লাবিবার কোমড় চেপে ধরতেই লাবিবা একদম সোজা হয়ে গেলো। তানভীর কানের কাছে মুখ নিয়ে আস্তে আস্তে বললো, “জান! চলো আমরা রুমে গিয়ে মেহেদী পড়ি। প্লিজ! ”
যেটা ভেবেছিলো সেটাই হলো। লাবিবা ভেবেছিলো তানভীর এমন একটা কথা বলবেই বলবে। কিন্তু মেহেন্দী পড়ার আগেই যে বলে বসবে এটা ধারণা করেনি। আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো অনেক ছেলে মেয়ে তাকে দেখছে। দেখবেই তো। দেখারই কথা। যেভাবে চিপকে বসেছে না দেখে যাবে কই? তার মাঝে আবার ব্রাইড! লাবিবা মিষ্টি করে হাসলো,
” আপনার কি জেলাসি হচ্ছে আমার দেবর ভাইয়েরা আমাকে দেখছে বলে?”
” হুম।”
কি সহজ স্বীকারোক্তি!
লাবিবা অসহায় দৃষ্টি ফেললো। কিন্তু পাত্তা দিলো না। এখন যদি আর দু একটা কথা বলে এই বিষয় টেনে নিশ্চিৎ তাকে টেনে নিয়ে চলে যাবে। মেহেদী পড়ানো মেয়েকে বললো,
” মেহেদী পড়াও সুন্দর করে। আমার অনেক গুলো পিকচার নেবার আছে। ”
মেয়েটা বললো, “স্যার আপনি কি পড়াবেন?”
” দাও স্টার্ট করে দিচ্ছি। ”
তানভীর নিজে থেকেই হাত টেনে নিলো। ক্যামেরা ম্যান দুজন এগিয়ে এলো। তাঁদের কোন কিছু তে বলে দিতে হয়না। নিজে থেকেই সব ক্লিক করে নেয় ।
হাতের মাঝবরাবর তানভীর লাভ আকালো। তার মাঝে টানা টানা বড় বড় হাতের লেখায় লিখলো তানভীর+লাবিবা। মেয়েটা অবাক হয়ে বললো,
” স্যার আপনার টার্ন তো বেশ ভালো হয়। ”
” এবার তুমি দিয়ে দাও। কনুই পর্যন্ত দিলেই এনাফ। উপরে যাবে না। ”
লাবিবা মুখ টিপে হাসলো। তানভীর পাশ থেকে উঠলোনা। লাবিবা খুব কাছ থেকে তানভীর কে দেখতে লাগলো। আর ভাবতে লাগলো এই অসাধারণ পুরুষটা কবে তার হলো? সে কেমন যেনো হয়ে গেলো। আশেপাশে কেউ না থাকলে এখনি চুমু খেয়ে নিতো। এতো মায়া লাগে! মনের ভেতর এতো প্রেম জাগে! কাছাকাছি এলেই লজ্জারা ঘিরে ধরে। এসব এতোকাল কোথায় ছিলো? সমস্ত আবেগ,প্রেম, অনুভূতি গুলো এই একটা মানুষের জন্য ই জমা ছিলো।
তামিম যেহেতু নিজে ছাড়া পায়নি রোজীকেও ছাড় দিবে না। রোজীর মেহেদী পড়া হয়ে যেতেই মেয়েদের জন্য জায়গা করে দিলো ছেলেরা। মেয়েরা বলতে রোজী লাবিবার ফ্রেন্ড কাজিনরা তানভীরের ফ্রেন্ড কাজিন রা। কলেজের কিছু ছাত্র ও বাদ পড়ে নি। এজন্য তানভীরের একটু লজ্জাই করছে। তবে আন্যভাবে। কলেজের ফ্রেশার কেউ বাদ পড়েনি। এলাহি আয়োজন। যেদিকেই তাকাচ্ছে সেদিকেই মানুষে গিজ গিজ করছে যার একাংশ ও আত্বীয় স্বজনরা। পলিটিক্যাল ফেমেলির ছেলে মেয়েরাও বাদ যায়নি।
তামিম রোজকে টেনে তুললো কনুইয়ের উপরে ধরে। রোজী বলছে, ” না না আমি পারবোনা।” তামিম অভয় দেয়, ” য়্যু ক্যান। কাম উইথ মি। ”
রোজীর আত্তা শুকিয়ে গেছে। এমনিতেই গাউনটাতে কমফোর্ট না। পিঠের দিকে চুলকাচ্ছে। রোজীকে জিজ্ঞেস করলো, ” ভাবী কোন গান ছাড়বো?”
রোজী মনে করতে লাগলো রাতে কোন গানের স্টেপ শিখেছে। লাবিবা চিল্লিয়ে বললো, ” খামোশিয়ান ।”
” ভাবী কাপল ডান্স হবে কিন্তু।”
রোজী কখনও নেচেছে? তাও আবার কাপল নাচ! বড়লোকের কারবার সব! এখানে লাজ লজ্জাও ম্যাটার করেনা। রোজীর যখন প্রথম বিয়ে হলো লজ্জায় তাকে কেউ বের ই করতে পারেনি। বাড়ির সবাই আগলে রেখেছে। এদিক থেকে ওদিক ও হেঁটেছে ধীরে ধীরে। আর এখানে সবার সামনে কাপল ডান্স। হাত ধরে কথা বলা। রোজী অসহায় দৃষ্টি ফেললো তামিমের দিকে। তামিম এগিয়ে এসে রোজীর কটিদেশ চেপে ধরলো। মুখোমুখি হয়ে বললো,
” আমার সাথে পায়ে পা মিলিয়ে চলা শিখো রোজ। খবরদার পা যেনো আমার আগে না চলে! আমি কিন্তু কোনো সাধারণ পরিবারের ছেলে না।”
নিরব হুমকিটা বুঝতে রোজীর দেড়ি হলোনা। সে বার বার খেই হারিয়ে ফেলে তামিমের কথায়। কনফিউশনে পড়ে যায়। তামিম কি তার জন্য পথ প্রদর্শক নাকি না?
কাপল ডান্সটা খুব ভালোভাবে শেষ করার চেষ্টা করলো দুজনেই। একেতো হাত ভরা মেহেদী তার উপর কাপল ডান্স। তামিম কতটা হেল্পফুল সেটা স্বচক্ষেই দেখে নিলো। ডান্স শেষ হতেই এনা আর এনার হাজব্যান্ড এক বান্ডিল টাকা উড়ালো। তামিম ঝুঁকে বললো,
” থ্যাংক য়্যু। থ্যাংক য়্যু দুলাভাই।”
তানভীর কে ডাকলেই তানভীর বলে উঠলো,
” আমার টাকাতে হবে না দুলাভাই। বউ আমার পাঁচ বছরের কঠোর সাধনার। ডলার ছাড়া উঠা যাবে না।”
সবাই হৈ দিয়ে উঠলো। এনার হাজবেন্ড বললো,
” সেটা আমরা সেট করে নিবো। তোমাকে ভাবতে হবেনা। ”
” সরি দুলাভাই। বউ আমি এক সেকেন্ডের জন্য কাউকে দিচ্ছি না। ”
” আচ্ছা যাও ডলারই দিবো। সেকেন্ড এর আলাপ বাদ মিনিটে এসো। ”
তানভীর কাঁদো কাঁদো হয়ে বললো, “এর থেকে আমার আরেকটা বোনের ব্যবস্থা আপনাকে করে দিবো তাও ভাই বউ চাইবেন না। আমার একমাত্র বউ দম ফুরিয়ে যাবে। বাঁচবো না। ”
তানভীরের কথায় পুরো সমাবেশ হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়লো। দুলাভাই পেট চেপে ধরে বললো,
” শালা! এতো বউ পাগল কবে হলি? খালামনি খালুকেও ছাড়লি না। ”
লাবিবা নাচের মাঝে তানভীরকে হারিয়ে ফেললো। পাশে পেলো না। চোখ জুড়া নাচের তালে তালে খোঁজতে লাগলো। তানভীরের দৃষ্টি তখন ঘুরছে নাচের তালে বৌয়ের শরীরের প্রতিটা বাঁকে। ঘাড়ের উপর উষ্ণ শ্বাস ফেলে জানালো একটি কথা।
” য়্যু উইল বি ফিনিশড লাবিবা।”
ব্যাপারটা ঠিক এমন যে আমার জানামতে প্রায় দুই হাজারের উপর পাঠক গল্পটা পড়ছেন। রিয়েক্ট পড়ে তার অর্ধেক। গ্ৰুপের রিচ মাইনাস চল্লিশে চলে গেছে। অনেক রেগুলার রিডার্সদের কাছেও পৌঁছাতে পারছেনা। এরকম করলে হবে? নিজে পড়ুন পাশাপাশি সবাইকে পড়তে বলুন। লাইক কমেন্ট করুন বেশী বেশী যাতে রিচ বাড়ে। আমি আর কতবার বলবো সবাইকে? ভালোবেসে পড়ছেন ভালোবেসে অন্যদের পড়তে সাহায্য করবেন না? এতোটা অলস প্লিজ হবেন না। পেইজটা আমার হলেও পেইজে আপনাদের ই বিচরণ। ভালোবেসে ইনভাইট করুন সবাইকে। অন্য পাঠকদের জানান গল্পটা আপনারদের কতটা ভালো লেগেছে। পেইজের রিচ বাড়াতে সাহায্য করুন।
চলবে ___
আগের পর্বের লিংক
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=633884942078369&id=100063706060283&mibextid=Nif5oz

