ভালোবাসার_কাব্য_গাঁথবো (৩৮)

0
1377

#ভালোবাসার_কাব্য_গাঁথবো

(৩৮)
” আমি তামিমকে এবং তার পরিবার কে অনেক কষ্ট দিয়েছি। সোহানা মমকে তো আরও বেশি কষ্ট দিয়েছি। উনি মেয়ের মতো করে আগলে ছিলেন আমাকে। বউ নয় সেই বাড়িতে ছিলাম রাণীর মতো। নিজ দোষে আমি আমার সর্বস্ব শেষ করেছি। নিজের সুখ শান্তি নষ্ট করেছি। আজ আমি কাজ থেকে সরে আসতে চাইছি। কাজ ছাড়া আমার দিন চলে না। কেউ দু একটা টাকা এসে আমাকে দেয়না। বাঁচার তাগিদে আমি এই অভিশপ্ত পেশার সাথে লেগে আছি। যদি তামিম আমার হাতটা আবার ধরে। আমার দায়িত্ব নেয়। আমাকে আমার সংসার ফিরিয়ে দেয়। আমি শুধু ওকে ঘিরেই থাকবো। আর কোনো দিকে তাকাবো না। কিন্তু সেটা আর হবার নয়। আমার যা বোঝার বোঝা হয়ে গেছে। আমি আর করুনার পাত্রী নয়। আমি এখন উপহাসের পাত্রী। তামিম আমাকে সবার সামনে পরিচয় দেয় আমি তার স্ত্রী। এটা নিতান্তই আমাকে উপহাস করা। সে দেখতে চায় এই কথা শুনার পর আমার রিয়েকশন। আমার ছটফটানো। আমার চোখে আনন্দ অশ্রু। কিন্তু আমাকে প্রকাশ্যে আসতে দেয়না। আমার চেহারা দেখায় না কাউকে। আমাকে আবৃত হয়ে তার সাথে দেখা করতে হয়। সে লজ্জাবোধ করে আমাকে নিয়ে। আমি সবার পরিচিত। একজন ডিভোর্সী হিরোইন। আমাকে নিয়ে কত জলখেলা! সেই আমি স্বনামধন্য ডাক্তার তামিম খানের ওয়াইফ এটা নিশ্চয়ই খান বাড়ির জন্য লজ্জাজনক।‌ খান বাড়ির বউরা তাঁদের স্বামীর নিজস্ব সম্পদ। হাজার হাজার লোকের মাথা খারাপ করা কোনো মিডিয়ার হিরোইন নয়। আমার আকুতি দেখে তানভীর মুগ্ধ হয়। হাসে। সে চায় আমি আরও শেষ হয়ে যাই। তার নামে যে অপবাদ ছড়িয়েছি এটা আমার প্রাপ্য। সোহানা মম আমার মুখ দেখতে চায়না। এমপি সাহেব আমাকে চেনেনা। আত্বীয় স্বজন খালা মামা শ্বশুড় শ্বাশুড়ী আমাকে দেখে না দেখার ভান করে। নিজের বাবা মা আমাকে ত্যাগ করেছে। আমি এসবের ই প্রাপ্য। আমি নিঃস্ব লাবিবা। আমি নিঃস্ব। ”

মুখে হাত চেপে ঢুকরে কেঁদে উঠে ফ্লোরা। ফ্লোরার কান্না দেখে লাবিবার নরম মনে ভীষন খারাপ লাগে। কাঁধে হাত রেখে শান্তনা দেয়, ” তুমি ভেঙে পড়োনা আপু। মানছি তুমি ভুল করেছিলে কিন্তু তুমি তো তোমার ভুলটা বোঝতে পেরেছো। আল্লাহর কাছে চাও। তিনি সব ঠিক করে দিবে।”

ফ্লোরা মুখ থেকে হাত সরিয়ে সোজা হয়ে বসে। চোখ মুছে লাবিবাকে বলে,
” শোনো লাবিবা একটা বিবাহিত মেয়ের সব থেকে বড় সম্পদ তার স্বামী। সব ভালোবাসা একমাত্র স্বামীর জন্য ই বরাদ্দ। আশ্রয় হলো স্বামীর ঘর। সপ্ন হলো স্বামীর সংসার। কর্ম হলো সন্তান লালন পালন। পরিচয় হলো সেই পরিবার এবং বংশ। আলাদা পরিচয় হলো সেই মেয়ের সাফল্য। সবকিছু মিলেই জীবন। এর মধ্যে অপশন হলো সাফল্য। এটা তোমার হলেও চলবে না হলেও চলবে। কিন্তু বাকি একটা ছাড়া তোমার জীবন অপরিপূর্ণ। তুমি যত বড় হবে ততো তোমার অভিজ্ঞতা বাড়বে। তানভীর তোমাকে ভালোবাসুক বা না বাসুক। তুমি তাকে ছাড়বে না। আর যাই হোক আমার মতো ভূল করোনা। স্বামীর মর্ম বুঝবে। স্বামী যদি তোমার হাতের মুঠোয় থাকে তাহলে কোনো ঝড়ই তোমাকে টলাতে পারবেনা। তুমি যে পরিবারে থাকবে সেই পরিবার একদিন আমারও ছিলো। সেই পরিবারের পুরুষগণ বংশের গৌরব নিয়ে চলে। ব্যর্থ হতে পছন্দ করেনা। আমি ভেবেছিলাম আমি হয়তো একজনকে ব্যর্থ করেছি কিন্তু না আমাকেই তারা সমুদ্রে‌ ফেলে দিয়েছে। তাঁদের সাথে লাগতে যাবেনা। বরং যদি তাদের মায়ার তলে থাকতে পারো তারা তোমাকে বুকে তুলে রাখবে। তোমার জন্য জীবন উৎসর্গ করতেও দ্বিধা করবেনা। আমি হয়তো আর এ শহরে থাকবোনা । জীবিকার জন্য ছুটতে হবে। তোমাকে আর সাহায্যও করতে পারবোনা। শুধু মনে রাখবে স্বামী ব্যতিত একটা মেয়ে কিছুই না। তুমি যত বড় সেলিব্রেটি হও না কেনো তোমার সঙ্গিনীই থাকবে কন্ঠশীর্ষে। বুঝলে? ”

” জি।”

সাবিনার ডাক পড়ে। বাইরে অনেক মানুষের কথা শোনা যাচ্ছে। ফ্লোরা বলে,
” তুমি শুয়ে থাকো। আমি সবার সাথে আছি। আর শোনো। একটু আগে যা বললে না? আমি তোমার জা? ভুল বলেছো। আমি তোমার জা ছিলাম। আর নেই। আর নয় হতে পারবো। তোমার ভাসুর আমাকে কখনো ক্ষমা করবেনা। প্লিজ আজ যা বলেছো বলেছোই। আর কোনদিন আমাকে এই পরিচয়ে পরিচয় দিবেনা। ”

” আপু ।”

” তোমার জন্য ছোট্ট একটা গিফট আছে আপুর পক্ষ থেকে। নতুন জীবন শুরু করলে তো। গিফট না দিয়ে পারি?”

” কি গিফট?”

ফ্লোরা লাবিবার হাতে একটা প্যাকেট তুলে দেয়। এই প্যাকেটটা প্রথমেই লাবিবার চোখে পড়েছে। ফ্লোরা সঙ্গে করে এনেছে। ভেবেছিলো ফ্লোরারই জিনিস। কিন্তু এখন জানলো এটা তার গিফট। ফ্লোরা মুচকি হেসে দরজা ভিড়িয়ে দিয়ে চলে যায়। লাবিবা প্যাকেটের পিন গুলো খুলে। টকটকে অরেঞ্জ কালার সিল্ক জামদানি হাতে উঠে আসে। গোল্ডেন সুতোর কাজ। এত্তো সুন্দর! লাবিবার খুব পছন্দ হয়। শুধু শাড়িই দিয়েছে। আর কিছু দেইনি? লাবিবা প্যাকেটে হাত দিলো সুন্দর একজোড়া ঝুমকো বেরিয়ে এলো। অরেঞ্জ স্টোন আর পার্ল বসানো। লাবিবা শাড়িটির দিকে তাকিয়ে রইলো। অরেঞ্জ আইসক্রিমের মতো লাগছে। আইসক্রিম হলে এতোক্ষনে মুখ লাগাতো। মূহুর্তেই লাবিবার আইসক্রিম ক্ষুধা লাগলো। অসুস্থতা কি সে ভুলেই বসলো। বিছানা ছেড়ে গুটি গুটি পায়ে হাজির হলো ডীপ ফ্রিজের সামনে। কিন্তু অরেঞ্জ কালার আইসক্রিম পেলোনা। পেলো লিচু ফ্লেভার আইসক্রিম। কিন্তু তার অরেঞ্জ কালার আইসক্রিম খেতে হবে। ভ্যানিলা আইসক্রিম একটা বাটিতে তুলে সেটা গলা অব্দি ওয়েট করলো। তারপর গলা আইসক্রিমে অরেঞ্জ ফুড কালার মেশালো। লিচু আইক্রিমে এপাশ ওপাশ ঢুবিয়ে যেইনা মুখে দিয়েছে ওমনি পেছন থেকে ছোট কাকী চিৎকার করে উঠে। হাত ফসকে আইসক্রিম ঢুকে যায় টেবিলের নিচে।
” কি খাচ্ছিস তুই? এই জ্বর শরীরে? আইসক্রিম!”

লাবিবা মুখটা মুছতেও পারলোনা কাকী চিৎকার করে বেরিয়ে গেলো ” ও ভাবী দেখে যাও তোমার মেয়ের কারবার। জ্বর মুখে আইসক্রিম খাচ্ছে । এখন ঠান্ডাটাও লাগাবে। ”

” দেখো মেয়ের কান্ড। লাব্বু! আসছি আমি। তুই কি মানুষ হবিনা?”

ড্রয়িংরুমের সবাই খিলখিল করে হেসে উঠে। সাবিনা তেড়ে এসে দেখে লাবিবা নেই। এক দৌড়ে তখনই রুমে চলে আসছে। মাথাটা ভারী ভারী লাগছে। শরীরটাও কেমন জেনো লাগছে। মাথার চুল মুঠো করে ধরে বসেছে। সাবিনা এসে বলে,
” আবার জ্বর উঠছে?”

” না। গা কেমন করছে।”

” কাল ও তো গোছল করিসনি। আয় গা মুছে দেই। ভালো লাগবে।”

” আমি করে নিচ্ছি।”

” পারবিনা। ”

” পারবো আম্মু। ”

ওয়াশরুমে নিয়ে গিয়ে ভেজা টাওয়েল দিয়ে ভালোভাবে গা মুছে নেয়। মাথায় পানি ঢেলে চুলগুলোও ভেজায়। বাইরে এসে চোখে পড়ে সাবিনার হাতে শাড়িটা।
” সুন্দর তো। কে দিলো?”

” ফ্লোরাপু। ”

” ও। মেয়েটা ভালোই। বেশ মিশুক। কেনো যে ওরকম করলো! সেসব বাদ। আয় চুল মুছে দেই ভালোভাবে।”

” আস্তে। ব্যাথা দিওনা।”

সাবিনা চুল মুছে দিয়ে চলে যায়। লাবিবা শাড়িটার উপর হাত রেখে চোখ বুজে। ফ্লোরার কথাগুলো ভাবতে থাকে। কি করবে ও? সে তো স্বামীর মর্ম বুঝে। তবুও কেনো এতো দূরত্ব? দূরত্ব কোথায়? দূরে থাকলেই বুঝি দূরত্ব বাড়ে? কিন্তু তানভীর তো আছে লাবিবার হৃদয়ে। খুব কাছে। পুরো শরীর জুড়ে তার ছোঁয়া মিশে আছে। ফ্লোরা বলছিলো যদি তাদের মায়ার তলে থাকতে পারো তারা তোমাকে বুকে তুলে রাখবে। তোমার জন্য জীবন উৎসর্গ করতেও দ্বিধা করবেনা। সেদিন রাতের তানভীরের কথাগুলো লাবিবা ভাবতে থাকে। কি পাগলামিটাই না করলো। নিজেকেই নাকি দিয়ে দিলো। লজ্জায় লাবিবা দু হাতে মুখ ঢাকলো। সেদিন তো এতো লজ্জা লাগেনি। একটুও লাগনি। এখন কেন এতো লজ্জা লাগছে? সেদিন এতোটা জেদ দেখিয়েছিলো? নিজের কর্মে নিজেই লাবিবা অবাক হলো।

শেষ বিকেলে ফ্লোরা চলে যাবে বলে বিদায় নিতে লাবিবার কাছে এলো। সোফা থেকে ব্যাগ উঠিয়ে মুচকি হাসলো। সেল ফোনটা লাবিবার চোখের সামনে ধরলো।
লাবিবা জিজ্ঞেস করলো,
” কি?”

” পড়ো।”

লাবিবা পড়লো। তানভীরের ছোট্ট মেসেজ ” কামিং। ”

” তানভীর আসছে লাব্বু। তুমি তো না বলে খুব ভুল করেছো। এখন তানভীর আসছে। তাকে সামলিও।”

” উনি তো আমার উপর রাগ করে আছে আপু।”

” তুমি অসুস্থ শুনেই রাগ চলে গেছে। তাড়াহুড়ো করে আসছে বলে। আমার কথা মিলিয়ে নিয়ো।”

ফ্লোরার কথায় লাবিবা আস্বস্থ হলো না। তার টেনশন বেড়ে গেলো। এবার যদি অসুস্থ জেনে রাগ দেখায়? এতো রাগের পাল্লা লাবিবা কিভাবে সামাল দিবে? ফ্লোরা যখন চলে যাবে তখন হুট করেই লাবিবা ডেকে বসে।
“আপু? আম্মু কোথায়?”

” আন্টি তো কাকী দের সাথে হাঁটতে হাঁটতে রাস্তায় গিয়ে ওয়েট করছে।”

” আপু। আমি না শাড়ী ভালোভাবে পড়তে পারি না। তুমি আমাকে এই শাড়িটা পড়িয়ে দিবে?”

লাবিবার চোখে মুখে হাসি। ফ্লোরাও বুঝে গিয়ে চোখে হাসে ‌। আদর করে ডাকে, “আয় সাজিয়ে দেই তোকে।”

লাবিবা লক্ষী মেয়ের মতো এসে দাঁড়ায়। বিপত্তি বাঁধে ব্লাউজ নিয়ে। লাবিবার দুটো ব্লাউজ ছাড়া আর কোনো ব্লাউজ নেই। এখন কি হবে? লাবিবা চিন্তায় পড়ে যায়। ফ্লোরা বলে, ” আন্টির ও নেই? ইসস আমার ব্লাউজ ও আনা উচিত ছিলো তোমার জন্যে।”

“একটা উপায় আছে।”

” কি?”

” ছোট ব্লাউজ।”

” কেমন?”
” ছোট স্লীভলেস গেঞ্জি। ঐটাও না। মানে এই গেঞ্জি আমি জীম করার সময় পরি।”

” দেখাও দেখি। ”

ফ্লোরা দেখে একদম স্লীভলেস ব্লাউজের মতো। মিটি মিটি হাসে। লাবিবাকে পড়তে বলে। লাবিবা যখন ব্লাউজ পেটিকোট পড়ে আসে তখন ফ্লোরা আরো হাসে। লাবিবা লজ্জা পায়। হাত দিয়ে পেটে দাগ গুলো আড়াল করে। সহজ হবার জন্য জিজ্ঞেস করে,
” এসব দাগ কোন ক্রীমে যাবে আপু? আমাকে একটা ভালো ক্রীম সাজেস্ট করিও তো।”

” প্রয়োজন নেই।”

” না না আছে। তুমি দিও আমাকে।”

ফ্লোরা উচ্চ স্বরে হেসে উঠে। হাসতে হাসতেই বলে,
” স্পট রিমুভার ক্রিম লাগিয়েই আর কি করবে?এমনি এমনিই যাক। এখন থেকে তানভীর মহাশয় তো প্রায়ই শরীরে ভালোবাসার দাগ লাগিয়ে দিবে।”

ফ্লোরার হাসি যেন কমে না। লাবিবা সহজ হতে গিয়ে আরো লজ্জায় পড়ে যায়। কান দুটো গরম হয়ে উঠে। ফ্লোরা সাজিয়ে দিয়ে চলে যাবার পর লাবিবা দৌড়ে আয়নার সামনে দাঁড়ায় এসে। পলাশ ফুলের কথা মনে পড়ে। নিজেকে দেখে নিজেই লজ্জায় পড়ে যায়। অপেক্ষায় অধীর হয়। আজ তার খান সাহেব আসবে।

চলবে__

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here