ভালোবাসার_কাব্য_গাঁথবো (৩২)

0
1307

#ভালোবাসার_কাব্য_গাঁথবো

(৩২)
বাবার রুম থেকে তানভীরকে রাগারাগি করে বেরিয়ে যেতে দেখে লাবিবা তব্দা হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তার কানে এসব কি কথা এলো? কিছুক্ষন পূর্ব হতে সে বাবা এবং স্বামীর প্রায় কথপোকথন দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনেছে। তানভীর যখন বাড়িতে আসে তখনই বারান্দা থেকে সে নোটিশ করেছে। গুটি গুটি পায়ে বেরিয়েও এসেছে। বাবার রুম থেকে গলা পেয়ে দরজার পাশে এসে দাঁড়ায়। রুমের ভেতর বাবা উঁচু গলায় কথা বলছে। মা তাঁকে থামানোর চেষ্টা করছে। তানভীর অতি ভদ্র ছেলের ন্যায় দাঁড়িয়ে শ্বশুরের রাগ সহ্য করছে।
” তোমার সাথে মেয়ে বিয়ে দিয়ে আমি ঠেকে যায়নি যে তুমি যখন ইচ্ছে তখন আমাকে বিরক্ত করবে। আমার মেয়েকে ঘরে পুরতে চেষ্টা করবে। তানভীর তোমাকে আমি এই শেষ বার বলে দিচ্ছি। আমার মেয়ের বেলায় আমি বিন্দু মাত্র কমপ্রোমাইজ করবো না। এরজন্যই আমি বয়স্ক ছেলের সাথে কখনও মেয়ে বিয়ে দিতে চাইনি। তারা সবসময় ভাবে তাঁদের বয়স শেষের গোড়ায় আর এক্ষুনি তাদের সবকিছু লাগবে নয়তো সব ফুরিয়ে যাবে।”

সাবিনা থামানোর চেষ্টা করে,
” তুমি থামো। কিসব বলছো জামাইকে? ওর স্ত্রী ওর অবশ্যই অধিকার আছে। ”

” কে দিয়েছে ওকে সেই অধিকার? বিয়ে দেবার সময় তো এই কথা হয়নি। আমার মেয়ে প্রতিষ্ঠিত হবার পরই পাবে সেই অধিকার। যদি আমার মেয়ের মত থাকে তবে। শোনো তানভীর, হয়তো তুমি অনেক বড় মাপের মানুষ। অনেক ক্ষমতাধর ব্যক্তির সন্তান। তোমার তুলনায় আমরা কিছুই না। কিন্তু আমার মেয়েও তোমার থেকে কম আদরের না। তোমাকে প্রতিষ্ঠিত দেখার জন্য যদি তোমার বাবা মা কোলের ছেলেকে বিদেশ ভুঁইয়ে একা রেখে শুন্য ঘরে দিন কাটাতে পারে তাহলে আমিও চাইবো আমার মেয়ে প্রতিষ্ঠিত হবার আগে সংসার জীবনে পা না রাখুক। আমার মেয়ের যে ফোকাস ব্রেক হয়েছে তার দায় নিশ্চয় তুমি এড়াতে পারবে না। ”

” অন্যত্র বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন তা চাওয়ার আগে আপনার ভাবা উচিৎ ছিলো আব্বু।”

” আমি সিউর ছিলাম সেই ঘরে আমার মেয়ে কখনওই যেতো না। আমার মেয়ে আমার কাছেই থাকতো। কিন্তু ওরা আমার মেয়েকে অসম্মান করে চরম ভূলটা করলো। ”

” আপনি কি জানেন আপনার মেয়ের সাথে সেই ছেলের যোগাযোগ আছে?”

“আমার মেয়ে সেরকম মেয়ে নয়। আমি আমার মেয়ের ভালো চাই। এটা কখনও ভেবো না যে আমি তোমাদের আলাদা করছি।”

” এক ও তো করছেন না। আপনি চাইছেন টা কি?”

“সে কৈফিয়ত আমি তোমাকে দিবো না। মেয়ে আমার সিদ্ধান্ত আমার। মেয়ে আত্ননির্ভরশীল হবার আগে আমি মেয়েকে সিদ্ধান্ত গ্ৰহনের অধিকার দিবো না।”

” আপনার জেদের কারণে লাবিবা যদি কোনো ট্রেপে পড়ে আমি কিন্তু আপনার কথা আর রাখতে পারবো না।”

রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ধড়াক শব্দে দরজা খুলে তানভীর চলে যায় । লাবিবা থ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তার অগোচরে তাকে নিয়েই বাবা আর স্বামীর মাঝে যে এক গোপন দ্বন্ড চলছে সেটা বুঝতে সময় নেয় না। তৎক্ষনাৎ ভেতর থেকে ডাক আসে। বাবার ডাকে লাবিবা সাড়া দেয়। সামনেই সাবিনা দাঁড়িয়ে ইসমাইলের সাথে ঝগড়া করছে।
” জামাই মেয়েকে নিয়ে যেতে চায় এতে তোমার সমস্যা কোথায়? কি পেয়েছো কি তুমি? বার বার তোমার কাছে এসে হাত পাতে তোমার কথার খেলাপ যে ছেলে করে না আজ তাকে তুমি বয়সের খোটা দিলে? মেয়ের গার্ডিয়ানগিরি দেখালে? বিয়ের পর মেয়ের আসল গার্ডিয়ান তার হাজবেন্ড। এটা তুমি জানোনা? সভ্য শিক্ষিত জামাই আমার তাই মুখের উপর চার কথা শুনিয়ে দিলো না। তোমার মেয়ে রাত করে বাড়ি ফিরছে। বাসায় থাকছে না। উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে। লেখাপড়ায় মন নেই রেজাল্ট খারাপ করছে এতে তুমি জামাইয়ের দোষটা কোথায় পেলে? জামাই তো তোমার মেয়ের পাড়াও মাড়ায় না প্রয়োজন ছাড়া। মেয়ে বিয়ে দিয়েছি আমি। মেয়ে কেনো জামাই ছাড়া থাকবে? কি পেয়েছো কি তুমি? যা ইচ্ছে তাই করবে? এমন সোনামুখো জামাই তোমার বংশের কেউ পেয়েছে?”

লাবিবা আসতেই হাত টেনে সামনে নিয়ে সরাসরি জেরা করে,
” ঐ বাহুতরা ছেলের সাথে তোর যোগাযোগ আছে? আছে? কি হলো কথা বলছিস না কেনো? উত্তর দে। ”

ইসমাইল প্রতিবাদ করে, “আমার মেয়েকে ধমকাচ্ছো কেনো ছাড় ওকে।”

“কি ছাড়বো? নাকি তুমিই আস্কারা দিচ্ছো? এই তোমার মনে কিছু নেই তো?”

” আজেবাজে কথা বলবেনা। কি থাকবে মনে? বরং তোমার মন পরিষ্কার করো। কুটিল প্রবৃত্তির মহিলা হয়ে আমার সংসার করতে এসো না। ”

” মনের মধ্যে কুটিলতা আমার নাকি তোমার? মেয়ে আর জামাই কে আলাদা করতে উঠে পড়ে লেগেছো। মেয়ে বিগড়ে যাচ্ছে অথচ তাকে শাসন করা তো দূর আরো সায় জাগাচ্ছো। ”

” আমার মেয়ে ঠিকই আছে। যে ছেলে আমার মেয়েকে অপমান করেছে তার মুখ ও আমার মেয়ে দেখবে না। আর তুমি বলছো যোগাযোগ আছে। আমি মরে গেলেও বিশ্বাস করবো না। ”

মধ্যম স্তরে ঝগড়া ফেলে লাবিবা রুম ছেড়ে বেড়িয়ে যায়। বুকটা ধূকপুক ধূকপুক করছে। আজ বিকেলেই ফাহাদের সাথে তার দেখা করার কথা। ফাহাদ তার অনেক বড় একটা উপকার করতে চলেছে। তানভীর সম্পর্কে অনেক কিছুই সে ফাহাদ থেকে জেনেছে। জানেনা তার কতটুকু সত্য কতটুকু মিথ্যা। এই সত্য মিথ্যার গ্যাড়াকলে সে অনেক দিন থেকেই ফেঁসে আছে। ফ্লোরা নামের হিরোইনেরও কটাক্ষ রোজ রোজ সহ্য করছে। ফ্লোরার সাথে যতটা সময় কথা হয় তামিম তানভীরের ব্যপারে বেশ তথ্য পায়। একটা মানুষ যাকে ভালোবাসে সে মানুষটা পুরোপুরি অচেনা। তাকে কাছে থেকে চেনার কোন উপায় নেই। দূর থেকে অধরাই থেকে গেছে। মানুষটা যে এসে পাশে দু দন্ড থাকবে তার জোগাড় নেই। অথচ মানুষটা তাকে পুরোপুরি নিয়ে যাবার জন্য অগোচরে বাবার কাছে আর্জি পেশ করছে। কই লাবিবাকে তো একবারও বলেনা চলো আমার সাথে। লাবিবা তো হাসি মুখে পা বাড়াতো। বাবাকে নাহয় সেই বুঝিয়ে বলতো। মা বাবার ঝগড়া থামার নাম নেই। লাবিবা বাড়ির ভেতর তানভীরকে খুঁজে রাস্তা অব্দি হেঁটে আসলো। তানভীর চলে গেছে। রাগের মাথায় দুদন্ড দাঁড়ায়নি । ইসমাইলের কথায় বেশ অপমান বোধ করেছে। কিন্তু এতো রাগ নিয়ে রাস্তায় গাড়ি চালানো কি ঠিক ?

অস্থির মনে লাবিবার প্রহর কাটে। একবুক ভয় নিয়ে লাবিবা দেখা করে ফাহাদের সাথে। ফাহাদ ঠোঁট এলিয়ে হাসে লাবিবাকে দেখে। প্রথমেই প্রেম নিবেদন জানায় মিস্ট কথা দিয়ে।
” লাবিবা তোমাকে ভীষণ সুন্দর লাগছে। আমার ভালোবাসার চাদরে টুপ করে লুকিয়ে বুকের ভেতর পুরে ফেলতে ইচ্ছে করছে।”
লাবিবা উত্তরে মুচকি হাসে।

“আমাকে দেখে তো কত জনের কত কি ইচ্ছে করে! গুনে হিসাব মেলানো দায়। আমার আবার এসব মানুষকে ভীষন ভালো লাগে। মিশতে ইচ্ছে করে। তাঁদের সম্পর্কে জানতে ইচ্ছে করে। তাঁদের ইচ্ছের কারণ জানতে ইচ্ছে করে। শুধু তাঁদের ইচ্ছেটা পূরণ করতে ইচ্ছে করে না।”

” সে তুমি চাইলেই পূরণ করতে পারো। তোমার হাজব্যান্ড তো আর তোমাকে ভালোবাসে না। তার গার্লফ্রেন্ড এর সংখ্যা তুমি হিসেব করে বের করতে পারবে না। সেই কথা ছাড়ো। রাজনীতিতে তার প্রশস্ত হাত। রাজনীতি কি জিনিস বুঝলেনা? উপর দিয়ে নিতী দেখানো কাজ। নিচ দিয়ে অবৈধ টাকার পাহাড়। তোমার শ্বশুরের আজ যে সম্পত্তি প্রতিপত্তি এককালে আজকের মতো ছিলো না। মধ্যবিত্তই ছিলো বলা যায়। আজ ডিসটিক্টে ধনী ব্যক্তিদের একজন। কোথা থেকে আসে এতো টাকা? সৎ ব্যক্তিরা আর যাই হোক আঙুল ফুলে কলাগাছ হতে পারে না। আর এইসব লিড করে তোমার হাজব্যান্ড মি. তানভীর খান।”

” আমার শ্বশুড়বাবা কতদিন থেকে রাজনীতি তে আছে?”

“হবেই তো চল্লিশ বছর।”
লাবিবা মুচকি হাসে।

” আচ্ছা। কি যেনো দেখাবে বলেছিলে।‌ তানভীর খানের গার্লফ্রেন্ড নাকি দেখাবে? দেখাও দেখি।”

ফাহাদ তাচ্ছিল্য হাসে। ফোন ঘেঁটে লাবিবার হাতে তুলে দেয়। মেয়েগুলোর ছবি দেখে লাবিবা সাথে সাথেই চিনতে পারে। সেদিনকার ক্লাবের মেয়ে। লাবিবার জানামতে মেয়েগুলো ম্যারিড। জাস্ট হ্যাংআউটের জন্য তাদের এখানে আসা। লাবিবা মুচকি হাসে। সেই হাসি বেশিক্ষন স্থায়ী হয়না। এক রাশভারী পুরুষ কন্ঠে খাদে নেমে আসে।‌
” অর্পি, মোহনা, জানভি। আমার ইউনিভার্সিটি ফ্রেন্ড। জাস্ট ফ্রেন্ড। ”

লাবিবার ঘুরে তাকানোর প্রয়োজন হয়না। মনে পড়ে যায় সেই জাস্ট ফ্রেন্ডদের সাথে হাগ দেবার দৃশ্যপট। সব বুঝতে পেরেও মনের কোনে কোথাও যেনো কালিমা পড়েছিলো। সেটাই প্রখর হতে থাকলো। হাত থেকে ফোনটা এক ছোবলে মুঠোয় নিয়ে নেয়। দৃষ্টি সরাসরি ফাহাদের দিকে তাক করে। ফাহাদ কাঁচুমাচু করতে লাগে। এক্ষুনি সুযোগ বুঝে পালাবে পালাবে ভাব। কিন্তু ঘটনা চক্রে পালাতে পারেনা ফাহাদ। তানভীরের শক্তপোক্ত হাত চেপে ধরে ফাহাদের কাঁধ। পর পর নাকে পড়ে শক্ত মুষ্টির আঘাত। হুংকার ছাড়ে তানভীর, ” তোকে বারবার সাবধান করেছি। তাও আমার কথা শুনিস নি। যতবার না বলেছি ততোবার স্পর্ধা দেখিয়েছিস। গার্লফ্রেন্ড এর ছবি দেখানো হচ্ছে আমার তাইনা? শালা ভেবেছিলাম বউ আমার হয়ে গেছে কোনো শিয়ালে হুক্কা হুয়া করবেনা। একটুও স্বস্তি দিলি না। ঠিকই লেজ নাড়াতে নাড়াতে চলে এলি। আজ তোর এমন অবস্থা করবো তোর বাপ তোকে চিনতে পারবেনা। ”

ফাহাদ প্রতিবাদ করতে চাইলো। মুখ খুলতে গেলেই তানভীর টুটি চেপে ধরলো।
” আমার বউয়ের ব্রেইন ওয়াশ করিস? ভাবীর সাথে আমি পরকিয়া করি তাইনা? তোর এই নষ্ট ব্রেইনটাই রাখবো না। ”

একের পর এক আঘাতের সিস্টেম দেখে লাবিবা ধীরে ধীরে পিছিয়ে গেলো। এই ট্রীপ শেষ হলে পরের ট্রীপ যে তাকে নিয়েই হবে সেটা বেশ বুঝতে পারলো। সকালের রাগটা বিকালে আজ ফাহাদের উপর তুলবে। তানভীর লাবিবাকে জায়গায় পেলো না। কিছুটা দূরে আবিষ্কার করতেই চিৎকার করে উঠলো, “এই একদম স্থান ত্যাগ করবেনা। তোমার সাথেও হবে আমার বোঝাপড়া।”

লাবিবার পিলাই কেঁপে উঠলো। যে সুযোগ ফাহাদ খুঁজছিলো সেই সুযোগ সে পেতেই উত্তর দিকে রাস্তা বরাবর ছুটলো। একটি বারের জন্য ও পেছন ফিরে তাকালো না।

চলবে __

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here