#ভালোবাসার_কাব্য_গাঁথবো
(৪০)
মনটা ভার। ফোনের লোকেশন এখানেই দেখাচ্ছে। আশেপাশেই আছে তানভীর। জিম থেকে লাবিবা আর বাসার পথে যায়নি। ইসমাইল ফোন দিয়ে জানিয়েছে লেট হবে। ইসমাইল ভেবেছে চলে আসবে। এদিকে লাবিবা জিম থেকে বেরিয়ে ব্যাগ কাঁধে তুলে বা দিকে জজ কোর্টের রাস্তার ধরেছে। রাস্তাটা ভালোই লাগে হাঁটতে। সারি সারি সরকারি সব ভবন। শিক্ষা অফিস থেকে শুরু করে মৃত্তিকা পর্যন্ত শহরের সব সরকারি ভবন এই রাস্তা ধরেই। এদিকটায় বছর দুয়েক আগেও লাবিবা আসতো বাবার সাথে ক্যারাটি শিখতে। ব্যাটমিন্টনও খেলতো অবসর সময়ে এসে বাবা মেয়ে মিলে। স্টেডিয়াম এরিয়ার ভেতরেই ইনস্টিটিউট। তানভীর লাবিবাকে ফাঁকি দিয়েছে। যাবেনা বলেও ঠিক চলে গিয়েছে। ঘুম ভাঙার পর তাকে আর পাওয়া যায়নি। সাবিনা জানিয়েছে নাস্তা করেই বেরিয়েছে। আর যোগাযোগ হয়নি। ফোনে কল দিলেও মিনিট দুয়েক কথা ছাড়া আর কথা হয়নি। তানভীর এমন কেন? লাবিবা বুঝতে পারেনা। একটা ফিলিংলেস নিরামিষ লোক যাকে নিজের করতে লাবিবা একপ্রকার উঠে পড়ে লেগেছিলো সে তার মর্জি মাফিক কাছে এলো আবার চলেও গেলো। যতক্ষন সামনে আছে ততোক্ষন বউয়ের কদর। একটু দূরে গেলেই লাপাত্তা।
লাবিবা স্টেডিয়ামের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। সিট ছেড়ে ঘাসের উপরে বসে ব্যাগ থেকে বাদাম বের করে খেতে লাগে। জেলা স্কুলের ছেলেরা ক্রিকেট প্র্যাকটিজ করছে। লাবিবা খেলাতে মগ্ন হয়। চার পড়ার সাথে সাথে ছেলেরা হৈ হৈ করে উঠে। পরের বলটা একদম লাবিবার মাথার উপর দিয়ে বাউন্ডারি ক্রস করলো। লাবিবা ঘাড় ঘুড়াতেই তানভীরকে চোখে পড়লো। বলটা ক্যাচ ধরে দাঁড়িয়ে। ছেলেরা ছক্কা বলে হিড়িক মারলো। তানভীর লাবিবার থেকে চোখ সরালো। বলে একটা ফু দিয়েই মাঠে ছুঁড়ে দিলো। প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে লাবিবার দিকে পা বাড়ালো। লাবিবা মুগ্ধ চোখে তাকিয়েই রইলো। তানভীর যত এগিয়ে এলো ততো লাবিবার হৃদস্পন্দন ক্রমশ বাড়তেই থাকলো। একদম দু ইঞ্চি সামনে এসে থামলো। লাবিবার মুখ ঠেকলো তানভীরের হাঁটুতে। লাবিবা চোখ বন্ধ করে ঢুক গিললো। গলা শুকিয়ে এলো। এটা নতুন কিছু নয়। কিন্তু বারবার নতুনত্বের ফিল দেয়। তানভীর এ্যাশ কালার টুপি ওয়ালা স্লিভলেস গেঞ্জি পড়ে লাবিবার সামনে দাঁড়িয়ে। ফুলো ফুলো মাসল দুটো দৃশ্যমান। লাবিবা আগে খেয়াল করেনি। আজ ই প্রথম খেয়াল করলো। লাবিবা বুঝতে পারলো তার দুর্বলতার চার্ট লম্বা হচ্ছে। সব দুর্বলতা এই একটা মানুষের উপরই এসে পড়েছে। আর কাউকে প্রয়োজন নেই।
তানভীর হাত বাড়ালো। লাবিবা বাড়ানো হাতের দিকে তাকিয়ে নিজের হাতে তাকালো। দশ টাকার বাদামের ঠোঙা কিনেছিলো। অর্ধেক খাওয়া শেষ। সেটাই তানভীরের হাতে দিলো। ঠোঙা দেখে তানভীর ভ্রু জোড়া কুচকালো। দুটো বাদাম বের করে ছিলে মুখ দিলো। চিবুতে চিবুতে ঠোঙাটা পকেটে ঢুকিয়ে আবার হাত বাড়ালো। লাবিবা আর কি দিবে? ব্যাগটা হাতে নিতেই তানভীর ছো মেরে নিয়ে কাঁধে তুললো। আরেকটা হাত লাবিবার দিকে বাড়ালো। লাবিবা ঘাড় উঁচু করে তাকাতেই তানভীর মুখ টিপে হাসলো।
” উঠো।”
লাবিবা এতোক্ষনে বুঝলো তাকেই উঠাতে চাইছে। এতোক্ষণ বোকার মতো ভেবেছিলো হাতে বাদাম তাই বাদাম নিতে হাত বাড়িয়েছিলো। খানিকটা লজ্জাও পেলো। ঝটপট হাত বাড়িয়ে দিলো।
” হাত দাও। বাদাম যত ইচ্ছা আমি তোমাকে খাওয়াবো। ইভেন যা চাইবে সব ই পাবে। ”
লাবিবা উঠে দাঁড়ালো। পেছনে কাপড় ঝাড়লো। তানভীরের দিকে তাকিয়ে বললো,
” হাত পেয়েই আপনি হ্যাপি? হাত তো কেটেও দেওয়া যায়। আমার হাতে কাজ নেই। আমি পুরো মানুষটার অভাব বোধ করি। এছাড়া আলহামদুলিল্লাহ আমার কোনো দিকে অভাব নেই। ”
তানভীর চোখে হাসলো। হাতটা শক্ত করে ধরে সামনের দিকে এগিয়ে গেলো।
” কোথায় যাচ্ছি? ”
” আমি যেখানে নিয়ে যাচ্ছি।”
” আমি কেন যাবো? আমি যে আপনাকে এতো বাসায় যেতে বলি আপনি সেখানে যান?”
” শ্বশুড়ের বাসায় গিয়ে পড়ে থাকবো নাকি? এতোটা নির্লজ্জ আমি নই।”
” কোন আদালতে রায় দিয়েছে যে শ্বশুড়ের বাসায় যাওয়া নিষেধ?”
” তুমি যাবে? যাবেনা?”
লাবিবা চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। তানভীর লাবিবার ভাব ভঙ্গি বুঝার ট্রাই করে। কোমড় থেকে হাত নামিয়ে বলে
” ওকে। গেলানা।”
লাবিবা দেখে তানভীর তাকে রেখেই চলে যাচ্ছে। মেজাজ তির তির করে বাড়ে লাবিবার। এই লোকটা ওকে একটু দামও দেয়না। দেয়ালের বাক নিতে দেখেই লাবিবা পিছু ছুটে। ফোনটা ব্যাগের ভেতরেই।এতো বড় এরিয়া! হারিয়ে গেলে খুঁজতেও কোমড় ভাঙবে।তানভীর জানে লাবিবা ঠিক পেছনে দৌড়োবে। ব্যাগ যে তার কাছে।
” মেয়েটা কে? ” গলফ খেলতে খেলতেই প্রশ্ন করে পার্টনার। তানভীর পেছনে ঘাড় ঘুরায়। ফোর্টের বাইরে সিঁড়ির উপর ফোন নিয়ে বসেছে লাবিবা। এদিকে তার দৃষ্টি নেই। মেরুন স্কার্টে টাটকা গোলাপের মতো লাগছে।
” গার্লফ্রেন্ড।”
চমকে তাকায় লাবিবা। গার্লফ্রেন্ড! বিয়ের এক বছর হতে চললো এতো দিন ছিলো আত্মীয়। বাসর করার পর গার্লফ্রেন্ড। তাহলে বাচ্চা হবার পর বউ! বাচ্চা বড় হবার পর বাচ্চার মা! নিজের ভাবনাতে নিজের ই মাথা ঘুরে গেলো।
তানভীর জোরে ডাকলো,
” খেলবে? এসো।”
লাবিবাও গলা বাড়িয়ে উত্তর দিলো,
” ভদ্র ঘরের ছেলে বউ নিয়ে এসে খেলেন।”
তানভীরের পার্টনার ফিক করে হেসে দিলো।
” ঝগড়া চলছে নাকি দুজনের মধ্যে?”
” গার্লফ্রেন্ড বলায় মেডামের একটু রাগ হয়েছে। ”
দুজনেই হাসলো। ডাকলো,
” ভাবী আসেন। যে যাই বলুক আপনি আমার ভাবীই হন।”
” ওসব খেলায় আমার কোনো ইন্টারেস্ট নাই। ”
” ভাবী কোন খেলা পছন্দ আপনার। ঐটাই খেলবো চলেন।”
” আমি ব্যাটমিন্টন লাভার। ”
” সিউর সিউর। ”
দুজনেই কোর্ট ছেড়ে বেরিয়ে গেলো। গল্প করতে লাগলো, ” ভাবী আমাকে চিনে রাখুন। আমার নাম আকাশ। আপনি দেখতে মাশাআল্লাহ। আপনার ছোট বোন টোন নেই?”
” আছে। তিন বছর। হে হে। ‘”
” ও আচ্ছা। নো প্রবলেম। বিয়েতে কিন্তু তানভীর ভাই যাই করুক আপনি আমাকে ইনভাইট করবেন। আগের কাতারে থাকবো। সুন্দরীদের মন চুরি করা আমার দায়িত্ব। ”
” সেটা থাক। দেখি কে জেতে।”
‘” টর্চ। ”
” বাজি হয়ে যাক। ”
লাবিবা তানভীরের দিকে তাকালো।
” যদি আমি জিতি তাহলে আপনি আমাদের ডিনার করাবেন। আর যদি আপনি জিতেন স্যার আপনাকে ওয়ান কে দিবে। ”
” ওকে ডান।”
তানভীর বসলো না। আকাশের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। লাবিবা চেঁচিয়ে উঠলো। তানভীর হাত তুলে বললো,
” প্রক্সি দিচ্ছি। দুজনকেই ইকুয়েল ইকুয়েল।”
খেলা শেষ হবার নাম নিলোনা। সন্ধ্যা লাইট জ্বলে উঠলো। হাঁপিয়ে গেছে তিনজনেই। আকাশ জানতে চাইলো, ” ভাবি কি রেগুলার খেলেন?”
” আগে খেলতাম। এখন আর সময় পাই না। ”
” পড়াশোনায় এত্তো সিরিয়াস? গুড।”
” উহু। প্রেম নিয়ে সিরিয়াস। আপনার ভাইয়ের প্রেমে পড়েছি। তাকে নিয়ে টেনশনেই সময় কেটে যায়।”
আকাশ হো হো করে হেসে দিলো। তানভীর লাবিবার পিছু এসে খেলতে লাগলো। মৃদু আওয়াজে ধমকালো।
” চুপ যাও। ওর সামনে মান ইজ্জত খেও না। ”
” আর আপনি যে আমাকে আনঅফিশিয়াল বানিয়ে দিলেন? আপনি জানেন আমার জন্য কত ছেলে পাগল? হাত বাড়ালে?”
” আমার ওমেনের দিকে হাত বাড়ানোর সাহস কারো নেই।”
” আমার হয়ে আপনি খেলুন। আমি আর পারছি না।”
লাবিবা গিয়ে সিঁড়িতে বসলো। আকাশ তানভীরের কাছে হেরে গেলো। শর্ত অনুযায়ী ডিনার একসাথে করতে অনুরোধ করলো। তানভীর অযুহাত দেখিয়ে এড়িয়ে গেলো। লাবিবার পাশে এসে বসে পড়লো। তাকিয়ে দেখলো সত্যিই খুব হাঁপিয়ে গেছে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করলো,
” আব্বুকে বলে এসেছো? ”
” বলেছি লেট হবে।”
” সন্ধ্যা হয়ে গেছে । চলো বাসায় চলো। ”
” আপনিও আসেন।”
” সেদিন ই তো গেলাম। তোমার জ্বর ছিলো।”
” আমি কি আবার জ্বর নিয়ে আসবো? দিন গালে দুটো থাপ্পড় দিন। না দিলে বলুন। রাস্তায় যাকে পাবো তাকেই বলবো থাপ্পড় লাগাতে।”
” ফালতু কথা বলোনা।”
” ওকে বলবো না। আমারই দোষ। আমিই যেচে পড়ে আপনার পিছু পিছু ঘুড়ি।”
” পেছন ফিরে দেখো তোমার পেছনে আমিই আছি।”
লাবিবা থেমে দাঁড়ায়। তানভীর পাশে এসে দাঁড়ালে বলে, ” পাশে চাই। পিছু নয়। লোককে বলে বেড়াচ্ছেন আমি আপনার গার্লফ্রেন্ড। ”
” তো কি বউ ? বউ হলে আমার বাড়ি থাকতে। বাবার বাড়ি নয়।”
” আপনি তো দু রাত থেকে আপনার বাড়িতেও যান না। মামনি ভেবেছে আমার বাসায় এসেছেন।”
” বউ নেই বাড়ি ফিরে কি করবো ?”
“তো আমাকে নিয়ে যাচ্ছেন না কেন?”
” গিয়ে কি করবে? সংসার? নিজেকে সামলাতে পারো?”
” আপনি তো আছেন।”
” সেটা তোমার আব্বুকে গিয়ে বলো।”
” আব্বু কেন দ্বিমত করে? আপনার সাথে আব্বুর কিসের এতো মনমালিন্য?”
” মনমালিন্য নয়। সবটাই আমার ভাগ্য। ”
” মানে কি?”
” কিছু না। এদিকে আসো। একটু আদর করে দিই।”
” না। ”
লাবিবা জেদ করেই গেলো না। কিন্তু তানভীর কেও ছাড়লো না। তানভীর গাড়ি নিয়ে আসেনি। একটা রিকশা ডেকে নিলো। রাতের ঠান্ডা মন মাতানো হাওয়া হৃদয় প্রশান্ত করে দিলো। তানভীর লাবিবার রাগ বুঝে হাতটা মুঠোয় নিলো। লাবিবা তাকাচ্ছে না দেখে অন্যহাতে মুঠোয় ধরা হাতটা ট্রান্সফার করে সেই হাতে কাঁধ চেপে কাছে কাছে টানলো। লাবিবা তাকালো না। নিচ দিকেই তাকিয়ে রইলো। শহর ছেড়ে যখন গ্ৰামের পথ ধরলো। দুপাশে খোলা ধানের মাঠ। ঠান্ডা হাওয়া। লাবিবার একটু শীত লাগলো। কুঁজো হয়ে বসলো। নিজে থেকেই তানভীরের গা ঘেসলো। তানভীর এতোক্ষন যাবৎ লাবিবাকেই দেখছিলো। লাবিবার প্রত্যেকটা মুভমেন্ট একেকটা নেশা দ্রব্য যেনো। মুচকি হেঁসে একপাশে বুকে টেনে নিলো। মাথাটা বুকে চেপে কপালে আলতো ঠোঁট ছুঁয়ে দিলো। লাবিবার রাগ পড়ে গেলো। ভীষণ আদুরে হয়ে উঠলো। তানভীর যেন এতোক্ষণ এটাই চেয়েছিলো। আকাশের দিকে তাকিয়ে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করলো এমন একটা মেয়েকে তার ভাগ্যে জুড়ে দেবার জন্য। কোনো চাহিদা নেই। একটু আদরেই সব মাটি হয়ে যায়। ভালোবাসার কাঙাল। বোকা মেয়েটা কি জানে তানভীর খান তার চেয়েও বড় কাঙাল।
মোড়ের মাথায় ইসমাইলের দেখা মেললো। টেনশনে কপাল কুঁচকে রেখেছে। তানভীরকে সাথে দেখে চিন্তামুক্ত হলো। তানভীর বললো,
” আব্বুর সাথে চলে যাও। আমি আসছি। ”
লাবিবা করুন চোখে তাকালো। তানভীর গেলো না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। ইসমাইল লাবিবাকে বকা দিলো।
” এটাকে একটু লেট বলে? জামাই সাথে আছে জানালে কি হতো? এই বয়সেও মেয়েটা টেনশনে মারবে আমাকে। বিয়ে দিয়েও শান্তি নেই।”
এমন ধমকে লাবিবা মুখ বাকালো। তাকে নিয়ে অযথা টেনশনের কি প্রয়োজন? ও বলেছে টেনশন করতে? বড় হয়েছে না!
ইসমাইল বাইক স্টার্ট দিলো। তানভীরের প্রতিও অভিযোগ করলো, ” তুমিতো জানাতে পারতে আমাকে। রাত নয়টা বাজে। টেনশন হয়না? তোমার আম্মু অনেক টেনশন করছে। উঠো গাড়িতে উঠো। ”
লাবিবা উঠতে বসেছিলো। নেমে এসে তানভীরের জন্য জায়গা দিলো। তানভীর উঠে বসতেই লাবিবা মুখ টিপে হাসলো। তানভীরের চোখ এড়ালো না। লাবিবাও লাফ দিয়ে উঠে বসলো। কাঁধে হাত রেখে ছুটে চললো।
চলবে __

