#ভালোবাসার_কাব্য_গাঁথবো
(৬২)
তানভীরকে বার বার কল দেওয়া হচ্ছে। সুইচ স্টপ বলছে। লাবিবাকেও কল দেওয়া হয়েছে। প্রথমে রিং হলে পরে সুইচস্টপ বলছে। এটা যে ইচ্ছে করে সুইচস্টপ করেছে সেটা বোঝা যাচ্ছে। ইসমাইল রাগে ফেটে পড়ছে। কি হচ্ছেটা কি? তামিম ,রোজী এসে বসে আছে অথচ তার মেয়ে জামাইয়ের খবর নেই। লোকজন কতক্ষন থেকে উৎসুক হয়ে আছে। কি জবাব দিবে? ড্রাইভার মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। ড্রাইভারকে দেখেই শরীর জ্বলে যাচ্ছে। ফিরোজ খান ড্রাইভারকে দিলেন একটা ধমক।
” ইডিয়ট! তোমাকে নামিয়ে দিলো আর তুমি চলে এলে? এট লিষ্ট জিজ্ঞেস তো করতে পারতে তারা কোথায় যাচ্ছে। রাস্তায় কোন বিপদ আপদ না হলে
হয়। ”
ড্রাইভার মাথা নিচু থেকে নিচুতর করে নিলো। ভয়ে পা দুটো থরথর করে কাঁপছে । ফিরোজ খান রেগেমেগে প্রস্থান করলেন। বড় ছেলে ছেলে বউকে নিয়েই অনুষ্ঠান শেষ করতে বললেন।
গাল ফুলিয়ে তানভীরের দিকে মুখ করে বসে আছে লাবিবা। রাগের চোটে নাক ফুসফুস করছে। ফোন কেড়ে নেওয়ার মানে কি? কথাটাতো বলতে দিবে। বাবা না জানি কত টেনশন করছে। তানভীর একটু পর পর লাবিবার দিকে তাকাচ্ছে। ফাঁকা রাস্তায় গাড়ি একটু স্লো করেই হাত বাড়িয়ে ফুলো গালের একগাল টেনে দেয়। আদুরে গলায় বলে, “সুন্দর লাগছে। ”
অপমান! লাবিবা মুখ স্বাভাবিক করে নেয়। বলে,
” আব্বু টেনশন করবে। ”
” করুক। ”
” এটা কেমন ধরনের পাগলামি? রিসিপশনে আমার কত প্লান ছিলো! রোজীপু এবং আমি একসাথে নেচে এন্ট্রি নিবো, পেছনেই থাকবেন আপনারা। ফ্রেন্ডসদের সাথে বন্ধু পোজে ছবি নিব। পেট ভরে রোষ্ট খাবো। আমার সব জলে গেল। ”
” সব প্লান মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলো। এখন থেকে শুধু আমাকেই ভাবো। আগামী তিনদিন আমাকে পাচ্ছো তার পরের পাঁচদিন কনভারসেশনটাও থাকবে না। ”
” কোথায় যাবেন আপনি?” অবাক হয়ে লাবিবা প্রশ্ন করল।
” সিঙ্গাপুর। বিয়ের জন্য ইমপর্টেন্স কিছু কাজ আনকমপ্লিট রেখেছি। সেটাই কমপ্লিট করতে যেতে হবে। ”
” বিজনেসের? কিসের বিজনেস আপনার?”
“আমার না। পাপার। আমাকেই দেখতে হয়। ভাইয়ার এসবে ইন্টারেস্ট নেই।”
” বুঝেছি।বাসায় ফিরে মমের সাথে আমাকেও জয়েন করতে হবে ।”
তানভীর ফিক করে হেসে দিলো। কিছু না বলে ড্রাইভিং এ মনোযোগ দিলো। লাবিবা বাইরের দিকে চোখ রাখলো। নিশুথি রাত গ্ৰামের মাঝদিয়ে শো শো করে চলে যাচ্ছে তাদের গাড়িটি। খারাপ লাগা সব ধুলিসাৎ হয়ে গেলো। মৃদুমন্দ হাওয়ায় চোখ বুজে নিল। তানভীর চোখ খুলে আবছা অন্ধকার সুন্দর রাস্তাটা উপভোগ করতে বললো। লাবিবা খুললো না। চোখ বন্ধ রেখেই বললো,
” চোখ খোলা থাক আর বন্ধ! আমার পৃথিবী আজ থেকে আপনার মাঝেই আবদ্ধ। ”
তানভীর মৃদু হাসলো। ” ধন্যবাদ বউ। অল্পতেই আমাকে বুঝে যাওয়ার জন্য। ”
অল্পসময়েই গাজীপুরের চৌরাস্তা পার হয়ে ঢাকার জ্যাম ছাড়িয়ে গাড়িটা যখন চলতে লাগলো তখন লাবিবা ভেতরে ভেতরে ভীষন উত্তেজিত। বার বার জিজ্ঞেস করলো, “খান সাহেব! কোথায় যাচ্ছি আমরা? একবার বলুন। আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারছিনা। ”
তানভীর ফিসফিসিয়ে বললো, “সারপ্রাইজ। ”
” দুলাভাইয়ের পক্ষ থেকে?”
” আরে না! এতো বোকা নাকি? তার থেকে তার দেশের ট্রিট নিবো। মাসে মাসে এতো ডলার কামায় সুযোগ মতো কিছু ছাড়াতে হবে তো।”
” আমরা আমেরিকাতেও যাবো!”
” তো ননাশের বাসায় যাবে না?”
লাবিবার আনন্দ যেন আর ধরে না। বকবক করতে করতে পুরো রাস্তা শেষ করলো। ঘড়িতে তখন প্রায় এগারোটা। বিকালেই বুকিং দেওয়া হয়েছে। তারা তাদের জন্য বরাদ্দকৃত কটেজে উঠলো। রাস্তায় নেমে ডিনার করে নিয়েছে সেজন্য খাওয়া-দাওয়ার আর ঝামেলাটা নেই। তানভীর রিসোর্টের বয়দের সাথে লাবিবাকে যেতে বললো। লাবিবা ছেলে দুটোর মুখপান করে ভয় পেয়ে গেলো। তানভীর অভয় দিল,
“ভয়ের কিছু নেই। যাও তুমি। ফ্রেশ হয়ে নাও। আমি আসছি। ”
” হুম।”
তানভীর হাতের ব্লেজারটা লাবিবার হাতে ধরিয়ে দিল।
যেতে যেতে চোখে ইশারা করলো, “ওয়েট ফর মি। আর বাসায় কথা বলে নিও। দু চারটে বকা নাহয় আমার হয়ে তোমারই পাওয়া হক। ”
লাবিবা চোখে হাসলো। তানভীরকে যতদূর দেখা গেল ততক্ষন দাঁড়িয়ে রইল। ঘোর কাটলো ছেলে দুটোর কথায়। ” চাবিটা ম্যামের হাতে দিয়ে দে। ”
লাবিবা এগিয়ে গিয়ে চাবি নিলো। ওরা আগেই লাগেজ ভেতরে দিয়ে গেছে। কটেজে ঢুকে আলো জ্বালাতেই লাবিবার চোখ ধাঁধিয়ে গেলো। আর্টিফিশিয়াল ফুলে অনেক সুন্দর করে ডেকোরেট করা পুরো রুমটা। কেউ একপলক দেখেই বলবে ফুলগুলো রিয়েল। লাবিবা ঘ্রাণ নিল। কেমন যেনো মিষ্টি একটা ঘ্রাণ। ফুলে হাত ছোয়ালো। না ফুলগুলো আর্টিফিশিয়াল। উপর দিয়ে সুগন্ধী স্পে করে দিয়েছে। লাবিবার মন চনবন করে উঠলো। দৌড়ে দিয়ে জানালার পর্দা খুলে দিল। ভেবেছিলো জানালা হবে। কিন্তু না বেলকনির দেখা যাচ্ছে। লাবিবা লেহেংগা তুলে বেলকনিতে পা রাখলো। বিশাল বেলকনি তার নিচেই পুরো ফাঁকা। চাঁদের আলোয় দেখা মিলেছে সামনের পাহাড়গুলি। কোন জায়গা এটা? লাবিবা জানে না। তবে পাহাড়ের উপরে আছে সেটা জানে। কিছুক্ষন খোলা বেলকনিতে দাঁড়িয়ে রুমে চলে এলো। লেহেংগার নিচের পার্ট খুলে আরাম করে বিছানায় বসলো। ফোন অন করে কল করলো বাবার কাছে। ইসমাইলের স্বর গম্ভীর। লাবিবা ঝটপট সরি বললো। এখন না কতোগুলো বকা শুনতে হবে। কিন্তু ইসমাইল বিন্দুমাত্র বকলোনা। বকার কথাও না। কাজটা যে তার মেয়ে জামাইয়ের সেটা জানা কথা। তার মেয়ের এতোটা স্পর্ধা নেই। উল্টে লাবিবাকে বললো, “যে কয়দিন থাকবে সাবধানে থেকো। আমি আমার মেয়েকে সুস্থ অবস্থায় বাড়ি দেখতে পেলেই হলো। ”
লাবিবা আরো কিছুক্ষণ কথা বললো। তারপর ফোনটা রেখে ফ্রেস হতে উঠতে যাবে তখনি একটা টেক্সট আসে।
” থ্যাংক য়্যু সেই স্পেশাল মানুষটাকে যে আমার প্রতিটা সময়কে সুখময় করে তুলে। ”
স্পেশাল মানুষ! স্পেশাল মানুষের জন্য কিছু স্পেশাল হোক। লাবিবা প্রত্যেকটা সময় তৈরী থাকবে এই কৃতজ্ঞ মানুষটাকে আরো স্পেশাল ফিলিংস এনে দেবার জন্য। বাথরুমে ঢুকে খুব সময় নিয়ে ফ্রেশ হলো। মুখে সাজসজ্জার রেশ নেই। র ফেইসে গাঢ় লাল লিপস্টিকে ভরালো। এই লিপস্টিক দিতেই যত বাধা। আজ তো কোন বাধা নেই। তাহলে কেনো দিবেনা? লাগেজ থেকে বিয়ের লাল বেনারসীটা বের করে নিলো। বাবার বাড়ি যাবার উদ্দেশ্যে লাগেজ গুছানোর সময় ভাগ্যিস বিয়ের শাড়িটা তুলেছিলো। লাবিবা প্যাচ দিয়ে শুধু শাড়িটা গাড়ে জড়িয়ে নিলো। শুধুই শাড়ি। বুকের উপর আঁচল টেনে দিলো সুন্দর ভাবে। জুয়েলারি বক্স থেকে সোনার গহনা গুলো একে একে গায়ে জড়িয়ে নিলো। চুল গুলো ছেড়ে দিয়ে এসে দাঁড়ালো বেলকনিতে। অপেক্ষার প্রহর গুনলো তানভীরের নামে। মুহুর্তের পর মুহুর্তে পার হয়ে যাচ্ছে তানভীর আসার নাম নেই। অতপর মাঝরাতে তানভীরের আগমন। লাবিবা তখনও বেলকনিতে দাঁড়িয়ে। গা শিউরে উঠা বাতাসে খোলা পিঠ একদম ঠান্ডা হয়ে গেছে। তবুও শরীরের ভেতরে যে উষ্ণতা বইছে সে উষ্ণতায় বাইরের শীতলতা কিছুই নয়। দরজা খোলা পেয়ে তানভীর রুমে ঢুকে দেখলো রুম একদম ফাঁকা। লাবিবা নেই। কিন্তু বেলকনির দরজা খোলা। বাতাসে পর্দা উড়তেই দৃশ্যমান হলো অপরদিকে মুখ করে তাকানো লাল টকটকে এক বধু। বাতাসে উড়ছে যার শাড়ীর আঁচল। চুল গুলো সব সামনে নেওয়া। তানভীরের হাতে একঝুড়ি সদ্য তুলা কয়েকশত লালগোলাপ। প্রেয়সীর জন্য এই রাতে অদূরে বাগান থেকে নিজ হাতে তুলে এনেছে। আসার সময়ই চোখে পড়েছিলো বাগানটা। প্রেয়সীকে চমকে দেবার জন্যই এতোগুলো গোলাপ ডাল বিহিন হাতে গুটিয়ে তুলে এনেছে। আর প্রেয়সী যে তার প্রেমে মরণ ফাঁদ তৈরী করে রেখেছে জানতো কে? কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে তাকাতেই তানভীরের চোখ যেনো জ্বলসে গেলো। বিছানার উপর ঝুড়ি রেখে ধীরে ধীরে লাবিবার দিকে এগিয়ে গেলো। একদম দাঁড়ালো পেছন বরাবর। এতো কাছে। অনেক কাছে। লাবিবার গায়ের সুবাস পাচ্ছে। দৃষ্টি আটকে গেছে খোলা পিঠে। লম্বা চুলের কয়েকটা চুল এলোমেলো হয়ে পিঠের উপর পড়ে আছে। তানভীরের গরম শ্বাস পড়ছে লাবিবার ঘাড়ের উপরে। হটাৎ ই লাবিবা ঘুরে দাঁড়াল। চোখ পড়লো ডাগর ডাগর দুই চোখে। সেই চোখে স্পষ্ট লজ্জার ছাপ। চোখ নামিয়ে নিলো লাবিবা। প্রচন্ড উত্তেজনায় তার শরীর কাঁপছে। এমন মোহনীয় রুপে তানভীর ব্যালেন্স হারিয়ে ফেললো। ধপ করে হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়লো ফ্লোরে। বাহুবন্ধনে আঁকড়ে নিলো প্রেয়সীর জানু। আবেগে কাঁপছে তার কন্ঠ। কোনভাবে আওড়ালো,
” আমার রাণী!”
( ডোন্ট মাইন্ড। আজ এটুকুই।) ‘

