যেখানে_দিগন্ত_হারায় #পার্ট_৩৯ জাওয়াদ জামী জামী

0
194

#যেখানে_দিগন্ত_হারায়
#পার্ট_৩৯
জাওয়াদ জামী জামী

” কল্পনা, আরমানতো আমার ফোন রিসিভই করলনা। তুমি একবার সুধার কাছে যাবে? ওকে মাশিয়ার কথা জানালে কি খুব খারাপ হবে? ” মিরাজ মোর্তাজা কেবিনে বসে স্ত্রী’র সাথে আলোচনা করছেন।

” সুধা গ্রামে গেছে বেশ কয়েকদিন হলো। আমি ওদের বিল্ডিংয়ের একজনের কাছে ফোন দিয়েছিলাম। আরমান সুধাকে নিষেধ করার পর মেয়েটা আর আমার সাথে যোগাযোগ রাখেনি। তারপরও সুধা ঢাকা আসলে আমি একবার ওর কাছে যাব। ওকে অনুরোধ করব, আরমানকে মানাতে। আরমান যতই, আমাদের সাথে ওর বোনদের যোগাযোগ করতে নিষেধ করে দিক, তার অনাগত সন্তানের কথা জানতে পারলে নিশ্চয়ই আর রাগ করে থাকবেনা। ” কল্পনা মোর্তাজার গলায় হতাশা। তবুও তিনি আশা ছাড়লেননা।

ঘন্টাদুয়েক আগে সুখের যে পরশ নিয়ে ঘুমিয়েছিল মাশিয়া, ঘুম ভাঙ্গতেই ওর সব সুখ, স্বপ্ন নিমেষেই মিলিয়ে যায়। আরমান ওর বোনদের মাশিয়ার পরিবারের সম্পর্ক রাখতে নিষেধ করেছে, কথাটা কানে যেতেই কয়েক ফোঁটা অশ্রু মাশিয়ার চোখের কোন ভাসিয়ে নিল। তবে কি ওর শুরু করা বিদ্বেষ, রাগ আর অপমানের সমাপ্তি আরমান সব সম্পর্ক ঘুচিয়েই দিতে চায়! নিজের অজান্তেই পেটে হাত রাখল মাশিয়া। ওর প্রতিশোধেই আগুনে নিজের পুড়ে ছারখার হচ্ছে, সেটা প্রতিনিয়ত ও উপলব্ধি করতে পারে। তবে ও যে এখন নিঃস্ব, পরিত্যক্তা এক নারী সেটা এইমাত্র অনুধাবন করল।

” মম, তুমি কোথাও যাবেনা। আমার অনাগত সন্তানের কথা ঐ বাড়ির কাউকেই জানাবেনা তোমরা, এটা তোমাদের কাছে রিকুয়েষ্ট। যে সম্পর্ক পায়ে মাড়িয়ে আমি চলে এসেছি, সন্তানের দোহাই দিয়ে সেই সম্পর্ক জোড়া লাগানোর মত ভুল আমি আর করবনা। ” মাশিয়ার গলা পেয়ে চমকে উঠল ওর বাবা-মা। তারা বুঝতে পারেনি মাশিয়ার ঘুম ভেঙেছে। তারা উঠে আসলেন মাশিয়ার বেডের কাছে।

” এসব তুমি কি বলছ, মাশিয়া! বাবা হিসেবে তার সন্তানের আগমনের কথা জানার অধিকার আরমানের আছে। তুমি পাগলামি করোনা। ওদের সাথে আমাদের যোগাযোগ করতে বাঁধা দিওনা। ” মাশিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে নরম গলায় বললেন কল্পনা মোর্তাজা।

” প্লিজ মম, এই শেষবারের মত তোমরা আমার কথা রাখ। এখন যদি সন্তানের অযুহাত দিয়ে আমি তার কাছে ফিরে যাই, তবে সে আমাকে গ্রহন করবে ঠিকই কিন্তু স্ত্রী’র অধিকার সে কখনোই আমাকে দেবেনা। তার সন্তানকেও সে হাসিমুখে মেনে নিবে কিন্তু আমাকে ছুঁড়ে ফেলবে আস্তাকুঁড়ে। এতেও আমার কোন আপত্তি নেই। কিন্তু যখন সে ভাববে, তার কাছে ফিরে যাওয়ার হাতিয়ার হিসেবে আমি নিজের সন্তানকে ব্যবহার করেছি, তখন সে আমাকে উপহাস করবে। সে ভাববে, আমি নিরুপায় হয়েই তার কাছে গেছি। সারাজীবন তার কাছে ঘৃণার পাত্রী হয়ে থাকতে হবে আমাকে। যেটা আমি কখনোই চাইনা। ”

” এসব তোমার নিছকই কল্পনামাত্র। তুমি খুব বেশি ভয় পাচ্ছ, তাই এমন চিন্তা তোমার মনে আসছে। হয়তো প্রথমে আরমানের তোমাকে মানতে কষ্ট হবে, কিন্তু দেখবে একটা সময় ও তোমাকে ঠিক মেনে নিবে। জিদ করোনা, মা। আমাদের কথা মেনে নাও। ” মিরাজ মোর্তাজাও মাশিয়াকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন।

” পাপা, প্লিজ। আমাকে এই শেষবারের মত নিজের সিদ্ধান্ত নিতে দাও। যদি কখনো তার কাছে আমাকে যেতে হয়, তবে তার যোগ্য হয়েই তার সামনে গিয়ে দাঁড়াব। আমাকে নিয়ে কোনও অভিযোগ তার সেদিন থাকবেনা। আর রইল তার সন্তান। সে অবশ্যই জানবে তার অংশ দুনিয়ায় এসেছে। কিন্তু সেটা আরও পরে। যদি কখনো সে আমাকে ফিরিয়ে দেয়, সেদিন যেন আমার সন্তান ওর বাবাকেই বেছে নেয়। আমার অনুরোধ তোমাদের রাখতেই হবে, পাপা। নতুবা আমাকে আমার সন্তানকে নিয়ে দূরে কোথাও নিরুদ্দেশ হতে হবে। ” কান্নার দমকে ঠিকমত কথা বলতে পারছেনা মাশিয়া। চোখের পানিতে ভিজে যাচ্ছে বালিশ।

কাঁদছেন মিরাজ মোর্তাজা আর কল্পনা মোর্তাজাও। মেয়ের অনুরোধের কাছে তাদের হার মানতে হলো। তাদের মন মাশিয়ার এই সিদ্ধান্ত না মানতে পারলেও বাধ্য হয়ে রাজি হতে হয় তাদের।

সাতদিন পর আরমান সুধা, শশীকে নিয়ে চিটাগং ফিরে যায়। সুধা চায়নি আরমান শুধু শশীকে নিয়ে চিটাগং যাক। আরমান ভেতর থেকে ভেঙ্গে পড়েছে। শশী একা ওকে সামলাতে পারবেনা। তাই পড়ার ক্ষতি হলেও সুধা ভাইয়ের সাথে চিটাগং যায়।

দশদিন পর মাশিয়াকে নিয়ে বাসায় আসলেন কল্পনা মোর্তাজা। মাশিয়াকে দেখে দোলন মোটেও খুশি হলোনা। ও মুখ গোমড়া করে নিজের রুমেই বসে থাকল।

কল্পনা মোর্তাজা মাশিয়াকে নিচের একটা রুমে নিয়ে গেলেন। মাশিয়ার শারীরিক অবস্থা খুব একটা ভালো নয়, ওর উপরনিচ করতে সমস্যা হবে জন্যই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি মাশিয়ার সার্বক্ষনিক দেখভালের জন্য একজনকে নিয়োগ করেছেন।

আরও সাতদিন পর মাশিয়া ভার্সিটিতে যায়। ওর তত্ত্বাবধানে নিযুক্ত মহিলাকে নিয়েই ভার্সিটিতে যায় মাশিয়া। তৃষা, মিতুল আর জয় ও মাশিয়াকে আগলে রাখছে। ওদের যত্নে মাশিয়ার মাঝেমধ্যে অস্বস্তি হচ্ছে। তবুও নিরবে ওদের যত্ন নামক অত্যাচার সহ্য করছে।

ক্লাসে গিয়ে ওরা জানতে পারল তুষার স্যার পিএইচডি করতে দেশের বাইরে চলে গেছে। তার বদলে নতুন শিক্ষক এসেছে। খবরটা শুনে ওদের মন খারাপ হয়ে যায়। শিক্ষক হিসেবে সে যথেষ্ট ভালো ছিল। নতুন শিক্ষকের প্রথমদিনের ক্লাস ওরা মন খারাপ নিয়েই করল।

আরমান বিসিএস দিয়েছে। ওর পরীক্ষা খুব ভালো হয়েছে। আম্মার মৃ’ত্যু’র শোক কাটিয়ে উঠতে পারেনি ঠিকই, ভেঙ্গে গুড়িয়ে গেছে কিন্তু ওর লক্ষ্য স্থির ছিল।

মাশিয়ার ফোর্থ সেমিস্টার শুরু হয়েছে। ও শারিরীকভাবে অসুস্থ থাকলেও দৃঢ় মনোবল থাকায় পরীক্ষা দিতে পারছে। ভার্সিটির সময়টুকু ওর ভালো কাটলেও বাসায় সব সময়ই দোলনের কথার আঘাতে জর্জরিত হতে হয়। দোলন বিভিন্নভাবে ওকে হেনস্তা করতেই থাকে। কল্পনা মোর্তাজা প্রতিবাদ করতে গেলেই দোলন তাকে উল্টো কথা শুনিয়ে দেয়। এ নিয়ে বাসায় মাঝেমধ্যেই তুলকালাম কাণ্ড ঘটে যায়। তাই ভার্সিটির সময়টুকু ও শান্তিতে কাটায়।

রাতের খাবার সময় হয়েছে। কল্পনা মোর্তাজা টেবিলে খাবার দিয়ে সবাইকে ডাকলেন। সিাই একে একে ডাইনিং এড়িয়ায় এসে যে যার চেয়ার টেনে বসল।

খাবারের গন্ধে ডাইনিং এড়িয়া ম ম করছে। সার্ভেন্ট সবার প্লেটে খাবার দিল।

” মম, আমাকে মাছের মাথাটা দেবে? তরকারির কালার দেখে মাথা খেতে ইচ্ছে করছে। ” মাশিয়ার আবদারে হাসলেন কল্পনা মোর্তাজা। কাঁটা বাছার ভয়ে যে মেয়ে মাছ খেতে চাইতনা, আজ সে মাছের মাথা খেতে চাচ্ছে!

” তোমার যেটা যেটা খেতে ইচ্ছে হবে, তুমি সেটাই খাবে। আমি কি বেছে দেব? ” কল্পনা মোর্তাজা মাশিয়ার প্লেটে মাছের মাথা তুলে দিলেন।

” আমি এভাবেই খেতে পারব, মম। ”

” খাও, পেট পুরে খাও। শ্বশুর বাড়িতে থাকলে তারা হয়ত তোমাকে এত খাবার খাওয়াতেই পারতনা। এই একটা মাছের টাকায় তাদের পনেরদিনের বাজার হত। এসব খাবার খাওয়ার জন্য মেয়েদের বাবার বাড়িই ভরস। ”

মাশিয়া মাথার একটু অংশ কেবল মুখে দিয়েছে, দোলনের এরূপ কথায় ওর মুখে অমাবস্যার আঁধার নামল। নিমেষেই হাসিমুখ বদলে কান্নায় রুপান্তরিত হয়। ও মুখের খাবার চিবাতে পারছেনা। আর না পারছে ফেলে দিতে। মাথা নিচু করে দোলনের অপমান হজম করার চেষ্টা করছে। কিন্তু ও ব্যর্থ হয়। টুপটুপ করে ঝরতে থাকে অশ্রুকনা। মাশিয়ার প্লেটে জায়গা করে নিচ্ছে তারা।

” বউমা, আজ তুমি সীমা পার করে ফেলেছ। তোমার সাহস হয় কি করে আমার মেয়েকে খাওয়ার খোঁটা দেয়ার? তুমি এত বেয়াদব সেটা আগে জানলে এই বাড়িতে তোমার ঠাঁই হতোনা। আমার মেয়ে আমার উপার্জনের খাবার খায়। এতে যদি তোমার কোন প্রবলেম থাকে, তবে তুমি এই বাড়ি ছাড়তে পার। মাহিন, তুমি তোমার স্ত্রী’ কে নিয়ে আমাদের অন্য যেকোন একটা এ্যাপার্টমেন্টে যেতে পার। তোমাকে আর তোমার স্ত্রী’কে এই বাড়িতে কোন প্রয়োজন নেই। ” মিরাজ মোর্তাজা আজ ভিষণ রেগে গেছেন।

” আব্বু, তুমি আমাদের এই বাসা থেকে বেরিয়ে যেতে বলছ! কি অপরাধ আমাদের? মাশিয়ার অন্যায় তোমার চোখেই পরেনা? ও আরমানের বাড়ি থেকে চলে আসায় কতজন কত কথা বলে।
সম্মানের চিন্তা তোমার একটুও নেই দেখছি! ওকে নিয়ে সামনে তোমাকে আরও ঝক্কি পোহাতে হবে বলে দিলাম। আর এই বাড়ি থেকে আমরা যাব কেন? গেলে মাশিয়া যাবে। আইনত এই বাড়ির মালিক আমিই হব। ” মাহিনও জোড় গলায় বলল।

” মাহিন, তুমি কি মানুষ! প্রেগন্যান্ট বোনকে এই অবস্থায় তুমি বাড়ি ছাড়তে বলছ? এই তোমার বোনের প্রতি ভালোবাসা? তোমাকে সন্তান বলতে আমার ঘৃণা হচ্ছে। ” মিরাজ মোর্তাজা রাগে কাঁপছেন।

” সত্যি কথা বললেই মানুষ ঘৃণা করবে এটাই স্বাভাবিক, আব্বু। আপনি ছেলেকে দূরে ঠেলে দিয়ে মেয়েকে কাছে রাখতে চাইছেনতো? আপনার বিবেক থাকলে এটা করতে পারতেননা। ” দোলনও মাহিনের সাথে গলা মেলায়।

আজ কল্পনা মোর্তাজা নির্বাক হয়ে ছেলেকে দেখছেন। এমন ছেলেকে জন্ম দিয়েছেন বলে নিজের প্রতি ঘৃণা হচ্ছে তার।

” প্লিজ, তোমরা থাম। ভাইয়া, আমার জন্য তোমাকে আর লজ্জা পেতে হবেনা। আমি বাসা ছেড়ে চলে যাব আজ রাতেই। দাদু আমাকে যে ফ্ল্যাট দিয়েছিল, সেখানেই থাকব আজ থেকে। তবুও তোমরা নিজেদের মধ্যে মনমালিন্য করোনা। দাদু আমার নামে যে সেভিংস রেখেছিল, সেটা দিয়েই আমার দিব্যি চলে যাবে। তোমার, কিংবা পাপার কোন সাহায্য আমার প্রয়োজন হবেনা। জানোতো, স্বামীর সংসার ছেড়ে আসার সময় মনে হয়েছিল, দুনিয়ায় আমার ভাইয়াই সেরা। আমার শত বিপদে তাকে পাশে পাব। কিন্তু সেই ধারনা আমার ভুল ছিল। তুমিও ভাই, আরমানও ভাই। যে আরমানের তোমাদের মত অর্থ-বিত্ত নেই কিন্তু বোনদের জন্য আকাশসম ভালোবাসা আছে। বোনদেরকে সে বাবার অভাব বুঝতে দেয়না। তুমি সম্পদ, অর্থে তার থেকে এগিয়ে থাকলে মনুষ্যত্বে পিছিয়ে আছ। আর ভাবি, তুমিও কোন বাড়ির মেয়ে। একজন মেয়ে হয়ে তুমি আরেকজন মেয়েকে কিভাবে এত আঘাত করতে পার? তাও সেই মেয়ে তোমার ছোট বোনের বয়সী! সৃষ্টিকর্তার কাছে একটাই প্রার্থনা করি, আমার মত পরিস্থিতিতে তুমি যেন না পর। পাপা, আমাকে ঐ ফ্ল্যাটে নিয়ে চল। আর যাইহোক সম্মান খুইয়ে আমি এখানে পরে থাকবনা। ” মাশিয়া কারও উত্তরের অপেক্ষা না করে নিজের রুমে গিয়ে গোছাতে শুরু করল কাপড়চোপড়।

চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here