প্রেমের প্রদীপ জ্বলে [১৫] প্রভা আফরিন

0
239

প্রেমের প্রদীপ জ্বলে [১৫]
প্রভা আফরিন

নৈশভোজে বসে খাদ্য গ্রহণের আগেই দস্তগীর সাহেব বিষম খেলেন। সুলেখা আজ লাল রঙের নাইট স্যুট পরে, সেজেগুজে আছেন। কানে আবার একটি রক্তজবাও গোজা। লাল হচ্ছে এই দম্পতির সাংকেতিক রং। অর্থাৎ সুলেখা রোমান্টিক মুডে আছেন। দস্তগীর সাহেব কাশি দিয়ে গলা ঝেড়ে নিলেন। প্লেটে ভাত বাড়তে বাড়তে স্বগতোক্তি করে বললেন,
“বয়সটা কী দিন দিন কমছে?”

“প্রেমের আবার বয়স কী? তাও আবার নিজের স্বামীর সঙ্গে।”

যুক্তিযুক্ত কথা! সুলেখা যুক্তিযুক্ত কথা খুব একটা বলতে পারেন না৷ মাঝে মাঝে বললে দস্তগীর সাহেব তখন গদগদ হয়ে পড়েন। তবে আজ বিরক্তি নিয়ে বললেন,
“তুমি একটি বিবাহযোগ্য ছেলের মা। ছেলে এসব দেখলে কী ভাববে সেটা কী ভেবেছো?”

“ওকে আগেই খাইয়ে ঘরে পাঠিয়ে দিয়েছি।”

“বাহ! তারমানে ময়দান সাফ করেই এসেছো!”

সুলেখা অভিমানী স্বরে বলেন, “তুমি আমাকে বুড়ি বানাতে চাইছো কেন বলোতো?”

“কারণ আমি বুড়ো হয়ে যাচ্ছি। বউ এভারগ্রিন থেকে গেলে তো তার পাশে চলতে সংকোচ হবে।”

সুলেখা মুখ ঝামটে বলেন, “মানুষ চায় বউকে সুন্দর দেখাতে আর তুমি বলো উলটো কথা! এ জন্যই বলি একটু মেইনটেইন করো। চুলে একটু কালার করো। তুমি এখনো কত সুন্দর দেখতে জানো?”

দস্তগীর সাহেব এবার দাম্ভীক একটা হাসি দিয়ে বলেন, “তা একটু জানি। নয়তো কী এখনো বউ আমাকে সিডিউস করতে সেজেগুজে থাকে!”

“ইশ! এখন আমার ওপরে দায় চাপাচ্ছো! নিজেই তো প্রথমে সংকেত দিলে।” সুলেখার গালে এই বয়সেও দারুণ লজ্জারুণ লালিমা খেলে যায়।

দস্তগীর সাহেব আকাশ থেকে ভূপতিত হয়ে বললেন,
“আমি আবার কীসের সংকেত দিলাম!”

“ঢঙ করবে না একদম। নিজেই দুষ্টু কথা বলে উশকে দেবে এরপর ভাব করবে যেন ভাজা মাছটাও উলটে খেতে জানে না। এইসব টেকনিক পুরোনো হয়ে গেছে।”

দস্তগীর সাহেব হতভম্ব হয়ে বললেন, “আমি কখন দু্ষ্টু কথা বললাম! মনে মনে অতীতে ভ্রমণ করে সেটাকে বর্তমানে হ্যালুসিনেট করছিলে নাকি! তাহলে তো বলতে হয় শরীর-মন বুড়ো না হলেও তোমার ব্রেইনটা বুড়ো হতে শুরু করেছে।”

সুলেখা ভীষণ ক্ষেপলেন, “খবরদার কথায় কথায় বুড়ো বলবে না। নিজেই ছেলে ছোকরাদের মতো চিরকুট দিয়ে আমাকে সিডিউস করে এখন কথা ঘোরাচ্ছো?”

“চিরকুট? আর আমি?” দস্তগীর সাহেব খাওয়া থামিয়ে দিলেন। বিস্মিত চোখে চেয়ে বললেন, “কোথায় চিরকুট?”

সুলেখা হনহন করে হেঁটে গিয়ে টিভি কেবিনেটের ওপর রাখা পেপারওয়েটের নিচ থেকে কাগজটা বের করে এনে স্বামীর হাতে দিলেন, “এখন বলো এটা তুমি দাওনি? মতিচুর আমায় কে ডাকে আদর করে?”

দস্তগীর সাহেব ক্রুদ্ধ চোখে দেখলেন লাইনটা,
“পৃথিবীর সবচেয়ে তেতো মতিচুর হলেও আমি তোমাকেই চাই।”
সঙ্গে সঙ্গে ঘর কাঁপিয়ে হুংকার দিলেন, “আমার বউকে লাইন মারার সাহস কে পায়!”

টফি সিড়িঘরের নিচে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে ছিল। হঠাৎ ধমক শুনে সে লাফিয়ে উঠল। ঘুমের ব্যঘাত ঘটানোর বিরক্তিস্বরূপ সেও বারদুয়েক ঘেউ ঘেউ করে উঠল।

সুলেখা চমকে গেলেন। হতবুদ্ধি হয়ে বললেন, “এটা তোমার লেখা নয়?”

“আমার লেখা এমন! তুমি এত বছরেও আমার লেখা চেনোনি?” দস্তগীর সাহেব ফোঁসফোঁস করে ওঠেন।

সুলেখা বোকার মতো ঘাড় নাড়েন। তিনি হাতের লেখা খেয়াল করবেন কী, লাইন পড়েই তো মনে লাড্ডু ফুটেছিল। দস্তগীর সাহেব ভীষণ ক্ষেপে বললেন,
“কতদিন ধরে?”

“কী কতদিন ধরে?”

“এইসব চিঠি-ফিঠি কতদিন ধরে চালাচালি হচ্ছে?”

সুলেখা আহত স্বরে বলেন, “তুমি আমাকে সন্দেহ করো? এত বছর সংসার করে এই ছিল আমার কপালে?”

সুলেখার কণ্ঠে কান্নার সুর উঠল। দিলশান ছুটে এলো বেডরুম থেকে৷ বাবা-মায়ের তর্ক-বিবাদ বুঝতে না পেরে বলল,
“কী হয়েছে? রাতের বেলা বাড়ি মাথায় তুলে ঝগড়া করছো কেন?”

দস্তগীর সাহেব মুখ ফিরিয়ে বললেন, “তোর মাকে জিজ্ঞেস কর কোন লোক তার পেছনে পড়েছে।”

সুলেখাও মুখ ফিরিয়ে বললেন, “এত বছর সংসার করে এখন আমার সন্দেহ নিতে হচ্ছে! হতে পারি আমি খুব সুন্দরী। লোকে দুয়েকটা চিঠি দিতেই পারে। তাই বলে তোর বাবা আমাকে সন্দেহ করবে? অন্যলোকে মন দেওয়ার হলে তোর বাবাকে এতগুলো বছর ধরে সহ্য করি!”

দিলশান অতিষ্ট হয়ে বলল, “ঝগড়া থামিয়ে কেউ কী আমায় সরাসরি বলবে কী হয়েছে?”

দস্তগীর সাহেব ছেলের হাতে চিরকুট ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “তোর মায়ের নতুন আশিক হয়েছে। মেয়েদের পেছনে ঘোরার বয়সে মায়ের পেছনে কে ঘুরছে খুঁজে বের কর এবার।”

দিলশান চিরকুট দেখে ভ্রুকুটি করে। মাকে বলে, “কে দিয়েছে তোমাকে?”

“কেউ এসে দিলে কী আর তোর বাবার সামনে অপদস্ত হতে আসি! এটা টফি এনে দিয়েছে।”

দিলশান টফির কাছে গেল। সে কিঞ্চিৎ জিভ বের করে, চিত হয়ে শুয়ে ঘুমাচ্ছে। সামনের দুটি পা দুদিকে বেঁকে আছে। আদুরে ছানাটার ঘুম ভাঙাতে ইচ্ছে হলো না দিলশানের। চিরকুটটা উলটেপালটে দেখে নিজেই আন্দাজ করে নিল বাড়িতে চিরকুট পাঠানোর মতো সাহস কে করতে পারে। বিড়বিড় করে বলল,
“মিনি মনস্টার!”
______________

কাঁঠালি চাঁপা ফুলের গাছটি দ্বীপশিখা বাড়িটির সম্মুখভাগের অভ্যর্থনা হিসেবে সটান দাঁড়িয়ে আছে। সবুজ পল্লবের ফাঁকে উঁকি দেওয়া হলুদাভ পুষ্পের মন মাতানো সুবাস নৈশকালীন নিশ্চুপ হাওয়ার গায়ে ভর করে ছড়িয়ে আছে সারা বাগানময়। বাড়ির সম্মুখের খোলা বারান্দাটি বৃক্ষস্পর্শে সুসজ্জিত। রেইন লিলি, ডেইজি, মানি প্ল্যান্টস… তবে বারান্দাবিলাসীর মনোযোগ আকর্ষণ করে নেয় লাল গোলাপটি– এনা হার্কনেস। কালো রজনীর রক্তাভ আভা হয়ে ফুটে আছে যে ফুল। মেহযাবীন সেই ফুলের নিকটে বসে আছে। হাতে একটি পেন্সিল ও নোটপ্যাড। হলদেটে আলোয় খুব মন দিয়ে সে একটি ফুলে সজ্জিত বারান্দার পেন্সিল স্কেচ আঁকছে। একটু ফুরফুরে থাকলেই তার শিল্পী সত্ত্বাটি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। সেই খোরাক মেটাতে ধরতে হয় পেন্সিল কিংবা রঙ তুলি। রাতের খাবারের জন্য ডাকা হয়েছে দু-বার। যাবীন সাড়া দেয়নি৷ শখের মাঝে বিচরণকালে বাহ্যিক কোনো উত্যক্ততা সে অপছন্দ করে। এতে মনোযোগ ভ্রষ্ট হয়। কল্পনায় ছেদ পড়ে। তাই বাড়ির অন্যরাও ওকে বিশেষ ঘাটায় না। কিন্তু সে কথা না জানা ব্যক্তিটি মনোযোগে বিঘ্ন ঘটালো।

“আর্টটাকে প্রফেশন হিসেবে নিয়েছো?”

প্রশ্নকারীর দিকে ঘুরে চাইল যাবীন। শিলা বেতের চেয়ারটি টেনে বসল তার থেকে কিঞ্চিৎ দূরে। সদ্য ডিনার সেড়েই এসেছে বলে চেয়ারে গা এলিয়ে দিতে কার্পণ্য করেনি। যাবীন পেন্সিল নামিয়ে হাসার চেষ্টা করে বলল,
“উহু, প্যাশন বলতে পারেন। তবে মাঝেমধ্যে বিশেষ অনুরোধে অর্ডারের কাজ করা হয়।”

শিলা বলল, “মাঝেমধ্যে কেন? নিজের গুণ লাগিয়ে ইনকাম করাতে তো আনন্দ হবার কথা। স্বাবলম্বীও হওয়া যায়। ইদানীং আর্টপিসের বেশ চাহিদা আছে।” একটু থেমে কথার পিঠে সংযোগ করল, “অবশ্য তোমার ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড বেশ রিনাউন্ড। তোমার মা-ও শুনলাম বিজনেস সামলান। আর্ট তোমার কাছে অবসরের শখ হতেই পারে।”

যাবীন স্মিত হাসল। পেন্সিল দিয়ে কপালে পড়ে থাকা চুলগুলো কানের পেছনে সরিয়ে দিতে দিতে বলল, “শখকে ইনকামের পথ হিসেবে নেইনি কথাটা সত্যি। তবে শুধু যে শখ বলেই তাই নয়। আসলে নিজের কল্পনার বাইরে গিয়ে অন্যের কল্পনাকে মন দিয়ে ফুটিয়ে তোলার ব্যাপারটা এখনো রপ্ত করতে পারিনি। তাই অন্যের অর্ডার নিতে একটু হেজিটেট ফিল করি। মনে হয় যেন নিজের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছি কিছু। তবে ভবিষ্যতে প্রফেশন হবে না তেমনটাও বলা যায় না। ফ্যাশন ডিজাইন নিয়ে পড়ছি। যদিও এটা মায়ের ইচ্ছেতে। তিনি চান ভবিষ্যতে উনার ক্লোথিং বিজনেসে ইনভলভ হই। তবে আমার মাঝে এখনো সেই স্পৃহা জাগেনি।”

ফ্যাশন ডিজাইন নিয়ে পড়ার কথাটা শুনে শিলা মেয়েটির দিকে ভালোমতো তাকায়। পরনে বেলবটম প্যান্ট ও সেমি লং টপস। চেরি ফেব্রিকের ওড়নাটি কাঁধের দুইপাশে লম্বা করে ফেলে রাখা। পোশাকে আধুনিকতা ও শালীনতা দুই-ই বজায় রেখেছে। শিলা প্রশ্ন করল,
“তুমি আমাকে দেওয়া পেইন্টিংটা সত্যিই নিশান্তকে ভেবে আঁকোনি?”

শিলার এহেন প্রশ্নের হেতু ধরতে পারল না যাবীন। মেয়েটি তাকে সন্দেহ করছে নাকি! বলল,
“নাতো। আসলে সেনাসদস্যদের বডি ফিটনেস, হাইট, ওয়েট কাছাকাছি হয় বলে সিমিলার লাগতে পারে।”

কথার এ পর্যায়ে বারান্দায় পা পড়ল নিশান্তের। এবং এসেই যাবীনের অপছন্দের কাজটি করে বসল সে, “তুমি ভুল ভাবছো, শিলা। মেহযাবীন ছবিটা এঁকেছে ওর পছন্দের মানুষকে ভেবে। সেও পদাতিক!”

যাবীন চুপসে গেল। নাকের ওপরের দিকে ভাজের রেখা ফুটল। এই লোক আবার তাকে খোঁচা দিল! শিলা আশ্চর্য হেসে বলল,
“তাই নাকি! বেশ তো!”

“তার নাকি আবার বু’লেট চেরা চোখ, দুইনলা ব’ন্দুকের মতো নাক। কণ্ঠস্বর যেন কীসের মতো… মে’শি’নগানের ব্রা’শফা’য়ার!”

যাবীন অপ্রতিভ, অসন্তুষ্ট, বিরক্ত। মুখে মেজাজ দেখাতে অপারগ বলে মনে মনে ভয়ানক কিছু বলে ফেলল ক্যাপ্টেনকে। চোখ তুলে চেয়ে দেখল নিশান্ত তাকেই নিগূঢ় দৃষ্টিতে দেখছে। যেন মেয়েটির জলে ভাসা পদ্মের মতো চোখদুটি দেখেই মনের কথা অনুমান করে ফেলেছে। এই লোকের দৃষ্টি বুলেটের মতোই সাংঘাতিক! বুকের ভেতরটা যেন এফোঁড়ওফোঁড় করে দেয়। যাবীন দৃষ্টি সরিয়ে নেয় তৎক্ষনাৎ। শিলা হো হো করে হেসে উঠে বলল,
“কী সাংঘাতিক উপমা! সে তো তাহলে ভয়ানক লোক! এই কোমল, তরল মেয়েটির বিপরীতে এমন শক্ত পুরুষ!”

যাবীন থতমত মুখ করে আছে। নিশান্ত অদ্ভুত কণ্ঠে বলল, “স্রোতস্বিনী নদীর জলকে ধরে রাখতে যেমন শক্ত বাঁধ প্রয়োজন, তেমনই আবেগী নারীর তারল্যকে ধরে রাখতেও শক্ত পুরুষ প্রয়োজন। বাঁধ না দিলে নদীর জল কিংবা নারীর তরল আবেগ উভয়ই ভেসে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।”

শিলা আগ্রহী স্বরে বলল, “চমৎকার বললে তো ক্যাপ্টেন! কিন্তু যদি নারী-পুরুষ উভয়ই শক্ত হয়, তখন?”

নিশান্ত ওর জানার উদগ্রীবতা অনুধাবন করে স্মিত হেসে জবাব দিল, “শক্ত দুটি হাত একত্রিত হয়ে দৃঢ় বন্ধন তৈরি করতে পারে। দেশকে সুরক্ষা দিতে পারে। আবার একে অপরকে ধ্বংসও করতে পারে।”

যাবীন অস্বস্তিতে বুদ হয়ে আছে। এই দুই শক্ত ব্যক্তির মাঝে সে আর থাকতে চাইল না। এরপর দেখা যাবে নাকউঁচু মিলিটারিটা ওর পাস্ট লাইফের পোস্টমর্টাম করতে বসেছে। নোটপ্যাড গুছিয়ে নিয়ে বলল,
“আপনারা কথা বলুন। আমি আসছি।”

শিলা তড়িঘড়ি করে বলল, “তোমাকে ডিস্টার্ব করলাম, সরি!”

“ইটস ওকে, আপু। আমি পরে করে নেব।”

যাবীনের নিরব প্রস্থানে চেয়ে থাকে নিশান্ত। শিলা বলল, “বোসো না, ক্যাপ্টেন।”

নিশান্ত বসে শিলার বিপরীতে। ঠিক যেখানটায় ক্ষণ মুহূর্ত আগে যাবীন বসে ছিল। শিলা বলল,
“শুনলাম এবারের শান্তিরক্ষী মিশনে সকলের নজর কেড়ে নিয়েছো! তা শুধু যু’দ্ধবাজ, বিদ্রোহী মন নিয়ে চললে হবে? প্রেম ভালোবাসাও তো দরকার আছে নাকি!”

নিশান্ত স্মিত হেসে বলল, “দরকার তো আছেই। সে জীবনের তাগিদেই হোক বা মনের।”

“তাগিদটা কেন পাচ্ছো না বলোতো? তারুণ্য তো থেমে থাকবে না।”

অনন্ত দূর থেকে দুজনকে চোখে চোখে রাখছিল। ক্রাশকে ভাইয়ার সঙ্গে একান্তে কথা বলতে দেখতে তার মোটেও ভালো লাগছিল না। হঠাৎ বাবার আদেশ পেয়ে সে হুট করে ঢুকে গেল ওদের কথার মাঝে। কান পেতে পূর্বকথা শুনে ফেলায় দার্শনিক ভঙ্গিতে বলল,
“সঠিক মানুষ না পেলে ভালোবাসার তাগিদ আসবে কেমন করে? যার সাথে ভাব হয় তার ছায়া দেখলেও হয়ে যায়। আর যার সাথে হয় না সে ছায়া হয়ে সঙ্গে থাকলেও হয় না।”

শিলা ও নিশান্ত ভ্রুকুটি করে চাইতেই অনন্ত নিজেকে সংযত করে নেয়৷ হাসার প্রয়াস করে বলে,
“সরি টু ইন্টারাপ্ট, গাইজ! বাবা ডাকছে তোমাদের।”

রাত বাড়ছে। আজাদ সাহেবের সঙ্গে কুশল বিনিময় করে শিলা চলে গেল। সে গাড়ি নিয়ে এসেছে বলে নিশান্তও আর পৌঁছে দিতে গেল না। যদিও শিলা মনে মনে তাই চাইছিল। নিশান্ত ফিরে এসে বাবার সঙ্গে আবার দেখা করে। আজাদ সাহেবের খাবার পরে চা খাওয়ার অভ্যাস। তিনি নিজ ঘরে আরাম করে বসে চা খান। নিশান্তকে দেখে তিনি বললেন,
“বসো। কিছু দরকারি কথা আছে।”

নিশান্ত বসল খাটের মুখোমুখি সিঙ্গেল সোফায়৷ আজাদ সাহেব গম্ভীর হয়ে নিজের বড়ো পুত্রকে দেখেন। পিতা-পুত্রের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তাদের নেই। অদ্ভুত এক দূরত্বের দেয়াল দুজনের মাঝে৷ আজাদ সাহেব চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন,
“তুমি নাকি প্রতিরক্ষা দপ্তরের স্পেশাল টিমে ইনভলভ হতে চলেছো?”

নিশান্ত ঘাড় নাড়ল। তার এবারের মিশনের অসাধারণ পারফর্মেন্সে মুগ্ধ হয়ে মেজর জেনারেল নিজেই এই প্রস্তাব করেছেন৷ নিশান্তের জন্য এ বিশাল সুযোগ। মোটেও হাতছাড়া করবে না। তাছাড়া সামনের নির্বাচনকে টার্গেট করে কিছু সংঘবদ্ধ গোষ্ঠি দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করতে প্রস্তুত হচ্ছে। বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সে নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাই বাছাইকৃত সেনা সদস্যদের নিয়ে একটি সিক্রেট টিম তৈরি হচ্ছে সামনের দুর্যোগগুলো মোকাবিলা করার জন্য। আজাদ সাহেব বললেন,
“দীর্ঘ মিশন শেষে ফিরলে সবে৷ তোমার এই কাজে এখন ইনভলভ না হলেও চলতো।”

নিশান্ত জবাব দিল, “সুযোগটা আমি হাতছাড়া করতে চাইছি না, বাবা।”

“আজকে সকালে যে বাড়িতে একটা অঘটন ঘটে গেল তা নিয়ে তোমার মতামত কী?”

নিশান্ত বুদ্ধিদীপ্ত চোখে চেয়ে দৃঢ় স্বরে বলে, “নিশ্চিত বলা না গেলেও এটুকু বলতে পারি কেউ শুধু ভড়কে দিতেই কাজটি ঘটিয়েছে।”

“আমাদের ভড়কে দিয়ে কার লাভ? কোনো ক্লু পেয়েছো?”

নিশান্ত গম্ভীর হলো। একটু চুপ থেকে বলল, “বাড়িতে যে ঢুকেছিল তার একজন প্রত্যক্ষদর্শী মিলেছে। আশাকরি শীঘ্রই কিছু জানতে পারব।”

আজাদ সাহেবের চা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। তিনি চায়ের কাপে আর চুমুক দিলেন না। বললেন,
“তোমাকে যে জন্য ডাকা, শাওনের রিসেপশনের দিন তোমার বিয়ের ঘোষণা দিতে চাইছিলাম আমরা।”

নিশান্তের চোখের চামড়া কুঞ্চিত হয়। কপালে গাঢ় রেখা ফোটে। বলে, “এত তাড়াহুড়া কীসের? নির্বাচনটা গেলেই নাহয়…”

“এর সাথে তোমার বিয়ে আটকানোর কোনো কারণ দেখি না।”

“না, তবে ফ্রি হয়েই করা যেতো।”

“সারাজীবন তো সৈনিকের পোশাকে কাটালাম। এ জীবনে ফ্রি হতে চাইলেই হওয়া যায় না। যত দেরি করবে ততই সময় হারাবে। তারচেয়ে এবার মনস্থির করো।”

নিশান্ত মৌন থাকে। আজাদ সাহেব ছেলের মতিগতি বুঝতে পারেন না। বলেন, “তুমি কী শিলার ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারোনি?”

নিশান্ত বুঝল বাবাও শিলাকে পছন্দ করেছেন। অবশ্য অপছন্দের কিছুই নেই মেয়েটির মাঝে। শুধু নিস্পৃহতা নিশান্তের মাঝেই। তবে সত্যিটাই বলল সে,
“এখনো পারিনি।”

“শিলা তোমার জন্য সবদিক থেকেই পারফেক্ট। একজন সৈনিকের জীবনসঙ্গীকেও নিরব সৈনিক হতে হয়। নতুবা সংসার মজবুত হয় না। সেক্ষেত্রে প্লাস পয়েন্ট হলো শিলা নিজেও একজন সৈনিক। তোমাদের আন্ডারস্ট্যান্ডিং ভালো হবে।”

“আমি আরেকটু ভাবতে চাই, বাবা। বিয়ে একবারই করব। তাই কোনো দ্বিধা বা সংশয় রেখে করব না। আপনি বিশ্রাম করুন, আসছি।”

নিশান্ত নিরবে প্রস্থান করল। নিচতলার বাতি নিভে গেছে। খোলা বারান্দার দিক থেকে আলোর ঝাপটা আসছে। ওপর থেকে তা খেয়াল করে নিশান্ত ভ্রুকুটি করে। নিচে নেমে এসে দেখে এক রমনী মশগুল হয়ে পেন্সিলের খসখসে শব্দ তুলে আঁকিবুঁকি করছে৷

যাবীন তার অসমাপ্ত আর্টটা নিয়ে পুনরায় এনা হার্কনেসের সামনে বসে গেছে। হঠাৎ তার ধ্যানভঙ্গ হলো। ইন্দ্রিয়শক্তি জানান দিল আরেক ব্যক্তির উপস্থিতি। যাবীন তড়িৎ ফিরে চাইল। দেখল আবছায়াতে একজোড়া চোখ নিমেষহীন চেয়ে আছে।

“কিছু বলবেন?” যাবীন ইতস্তত করে প্রশ্ন ছুঁড়ল।

নিশান্ত আলোর দিকে এগিয়ে আসে৷ যাবীনের সামনাসামনি বসে অসংকোচে। চোখে চোখ রেখে হিমস্বরে বলে,
“কিছু বলা ও শোনা একান্তই প্রয়োজন।”

চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here