প্রেমের প্রদীপ জ্বলে [৩] প্রভা আফরিন

0
290

প্রেমের প্রদীপ জ্বলে [৩]
প্রভা আফরিন

“নিজের বউকে কোলেপিঠে করে বড়ো করেছিস। এমন ভাগ্য কয়জনের হয়?”

কাজিনদের মশকরায় বরসভায় হাসির হিড়িক পড়ে গেল। জাওয়াদের মুখ লজ্জায় লালবর্ণ ধারণ করেছে। কোলেপিঠে করে মানুষ না করলেও শাওন তার চোখের সামনেই বড়ো হয়েছে বলা চলে। শৈশব, কৈশোর নির্বিঘ্নে পেরিয়ে যৌবনে তারই প্রতি হৃদযন্ত্রের ধুকপুকানি উৎপন্ন হয়েছে। আজ সেই মানুষটাকে নিজের নামে দলিল করে নেওয়ার দিন। কী অদ্ভুত এক ভালোলাগায় বুদ হয়ে আছে মনের অলিগলি।

আসরে আরেকজন এলিজিবল ব্যাচেলর নিশান্তের পা পড়তেই সকলের উল্লাস বেড়ে গেল। এই বান্দার পেশাগত ব্যস্ততার কারণেই সচরাচর কোনো প্রোগ্রামে পাওয়া দুষ্কর। অনেক বছর পর আজ ওরা সকলেই কোনো অনুষ্ঠানে একত্র হতে পেরেছে। দ্বীপশিখায় যেন আজ চাঁদের হাট বসেছে।
জাওয়াদ ও নিশান্তকে শেখ ও আজাদ বাড়ির দুই রত্ন বলা হয়। পিঠোপিঠি এই দুই তরুণ অদ্ভুতভাবে তাদের পিতাদেরই মতো হয়েছে। পেশা হিসেবেও বেছে নিয়েছে পিতার কর্মকে। অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার আশরাফুল আজাদের পুত্র ক্যাপ্টেন নিশান্ত বর্তমানে সিলেটের জালালাবাদ সেনানিবাসে পোস্টিং-এ রয়েছে। অন্যদিকে জাওয়াদ তার পিতা সুলতান শেখের টেক্সটাইল বিজনেস বিদেশে প্রসারিত করে চলেছে। নিশান্ত যতটাই রাশভারী মেজাজের জাওয়াদ ততটাই শান্ত, স্নিগ্ধ, হালকা মেজাজের মানুষ। যার ফলে ভাইবোনেরা সব জাওয়াদের ভক্ত। অন্যদিকে জাওয়াদ এক শাওনের ভক্ত। ছোটোবেলা থেকেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কও ছিল ওদের। মাঝে শুধু দূরত্ব বেড়েছিল যখন শাওন অন্য কারো সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে যায়। কিন্তু ভাগ্যের লিখন হাজারো চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ওদের ঠিকই এক করে দিয়েছে।

দ্বীপশিখার কর্ত্রী চাঁদনি বেগম। ধবধবে সাদা চুলের এই বৃদ্ধা স্বভাবে জাদরেল ধরনের হলেও বেশ রুচিশীল মানুষ। কুচি করে শাড়ি পরেন, গলায় একটা সাদা মুক্তোর মালা থাকে সর্বদা। উনার নামের সূত্র ধরেই শোভা উনাকে চাঁদের বুড়ি বলে ডাকে। বধূ সাজে সজ্জিত শাওন যখন আসরে উপস্থিত হলো চাঁদনি বেগমের চশমা ঠাসা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি পড়ল নাতনির কণ্ঠদেশে। ভ্রুকুটি করে বললেন,
“তোর সাতনরী হারটা কই? আমি তো নিজে হাতে পরিয়েছিলাম।”

শাওন ঢোক গিলল। ট্রান্সপারেন্ট দোপাট্টার ভেতর থেকে ভয়ার্ত চোখে চাইল ছোটো বোনের দিকে। যেন এখন বোনই ভরসা। শোভা তড়িৎ বলে উঠল,
“আরে দাদু, গলা ভরে পরালেই হবে? আপুর হাঁসফাঁস লাগছিল তাই একটা খুলে রেখেছে।”

চাঁদনি বেগম ধমক দিলেন,
“খুলবে কেন? ওটা জাওয়াদদের বাড়ি থেকে দিয়েছে। ওরা দেখলে কী ভাববে?”

শোভা নিষ্পাপ চোখে চেয়ে যেন কেঁদে ফেলবে এমন ভঙ্গিতে বলল,
“তোমার নাতনিটা আজই পত্রপাঠ বিদায় হবে বাড়ি ছেড়ে। এভাবে বকে দিচ্ছো? তোমার দিলে কী দয়া হয় না?”

“তোর চোখের জল হঠাৎ উতলে পড়ছে কেন তাই তো ভেবে পাচ্ছি না।”
চাঁদনি বেগম সন্দেহি চোখে চাইলেন ছোটো নাতনির দিকে। শোভা বুঝল ওভার-অ্যাক্টিং হয়ে যাচ্ছে। তড়িঘড়ি করে উঠে বলল,
“ভালোবাসা দেখালেও মন্দ হয়ে যাই! এনে দিচ্ছি তোমার সাতনরী হার, ওয়েট করো।”

শোভা ওপরে যাওয়ার সিড়িতে পা দেওয়ার সময় শাড়ির কুচিটা খপ করে ধরে হাঁটু পর্যন্ত তুলে ফেলে। চাঁদনি বেগম ‘ইন্না-লিল্লাহ’ বলে আঁতকে ওঠেন। শোভা পিছু ফিরে চোখ ছোটো ছোটো করে বলে,
“আই হেইট ইয়োর মাইন্ড। এই দেখো, নিচে জিন্স আছে।”

চাঁদনি বেগম বুকে হাত রেখে হাঁপ ছাড়েন। দাঁত কিড়মিড় করে উঠলেন,
“হতচ্ছাড়ি! তোর শাড়ি পরতে হবে না। এক্ষুনি বদলাবি, এরপর হার নিয়ে নামবি। বাড়ির মান সম্মান ভাসিয়ে দেবে একেবারে।”

শোভা দুষ্টু হেসে ঠোঁট বাঁকায়, “এতক্ষণে লাইনে এসেছে চাঁদের বুড়ি। আমাকে জব্দ করতে চাওয়া?”

চাঁদনি বেগম বিরক্ত হয়ে স্বগোতক্তি করলেন,
“ছোটোবউ এটাকে কী খেয়ে পেটে ধরেছিল?”

ছোটোবউ শিরীন পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। শাশুড়ির বিদ্রুপ শুনে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে বললেন,
“আপনার বাড়ির খাবার খেয়েই জন্ম দিয়েছি, আম্মা। আপনাদের ছায়াতেই আপনাদের বংশের মেয়ে বড়ো হয়েছে। দেখতেও তো আপনাদেরই মতো হয়েছে। দোষের বেলায় আমার নাম টানেন কেন?”

আশেপাশে সব আত্মীয়দের ভিড়। শাশুড়ি-বউয়ের কথা শুনে তারা ঠোঁট টিপে হাসছে। চাঁদনি বেগম চোখ গরম করে চাইলেন। তাতে কাজ হলো। শিরীন আপাতত মুখ বুজলেন। মেয়ের বিয়েটা ভালোয় ভালোয় মিটে যাক। শোভা দৌড়ে উপরে উঠে গেল। নিজ রুমে ঢুকে শাড়ি খুলতে গিয়ে সেফটিপিনের জ্বালাতনে ছিঁড়ে গেল কয়েক জায়গায়। চামড়াতেও লাগল বুঝি। দেখার ফুরসত মিলল না। ঝটপট পোশাক বদলে ও বেরিয়ে গেল।

তেতলার করিডোরে অস্থির ভঙ্গিতে পায়চারী করছে যাবীন। নির্জন রজনীর নিগূঢ় আঁধার ভেদ করে কান ছুঁয়ে যাচ্ছে কারো উত্তপ্ত চাপা স্বর। গা ছমছমে শিহরণ জাগে। তিনতলায় সাধারণত কেউ থাকে না। এটা মূলত বাড়ির ছেলেদের জিম ও অবসর যাপনের বিলাসিতার স্থল। তাই বলে রক্ষা। নয়তো বিয়ে বাড়ির মানুষ ঘূনাক্ষরেও কিছু টের পেয়ে গেলে একটা বিস্তর ঝামেলা বেঁধে যেত। শোভাকে ছুটে আসতে দেখে যাবীন একটু আশ্বস্ত হলো। বলল,

“অনন্তকে থামা গিয়ে, মেরে ফেলবে তো।”

শোভা দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
“মরাই উচিত। কত বড়ো দুঃসাহস দেখিয়েছে ভাবতে পারছো? একজন সেনা কর্মকতার বাড়িতে ঢুকে তারই বাড়ির মেয়ের গায়ে হাত দেওয়ার শখ ওর ঘুচিয়ে দেব।”

যাবীন আসলেই ভাবতে পারছে না। তার আগেই ওর নারীমন শিউরে ওঠে। স্বার্থের জন্য এমন জঘন্যতম দুঃসাহস আমিন দেখাবে কল্পনাও করতে পারেনি ওরা।
আমিন মেধাবী ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষ বেশ ভালোভাবেই থেকেছে। মূলত তখনই শাওনের সঙ্গে ভাব বিনিময় হতো তার৷ কিন্তু এরপর সে জড়িয়ে গেল নেশার জগতে। আব্বা-আম্মার অসুস্থতা, নিজের বেকারত্ব ইত্যাদি দুরবস্থার কথা বলে, অসহায়ত্ব প্রমাণ করে শাওনের মনকে নরম করে অসংখ্যবার টাকা ধার নিয়েছে সে৷ তবে ধার পর্যন্তই। শোধ করার নামও তোলেনি। শাওনও ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে আর চাওয়ার কথা ভাবেনি। কতবার ব্যবসা শুরু করতে মূলধন দিয়েছে। সব গেছে নেশার পেছনে। শাওন চেষ্টা করেছিল সঠিক পথে আনার। রিহ্যাবে পর্যন্ত পাঠাতে চেয়েছিল। শেষে বিষাক্ত সম্পর্কের জাল কেটে মুক্তিটাই বেছে নিল। কিন্তু আমিন যে এতটা ডেস্পারেট হয়ে উঠবে কল্পনাও করেনি। যাবীন বলল,
“তুই টের পেলি কেমন করে?”

“ফাইজা আপু বলার পর বুদ্ধি করে বাড়ির সামনে-পেছনের সিসিটিভি চেক করেছিলাম। নিশ্চিত হয়েছিলাম আপু বাড়ির বাইরে যায়নি। আমিন ঢুকেছে মাস্ক পরে, ক্যাটারিং সার্ভিসের সঙ্গে। সেও বেরোয়নি। এরপর পুরো বাড়ির সম্ভাব্য নির্জন স্থানে চিরুনি তল্লাসি চালিয়ে খুঁজে বের করেছি। নিশান্ত ভাইয়ার ডাম্বেলটা হাতের কাছে পেয়ে দিয়েছি বেদম প্রহার৷ ঘাড় উঁচাইতে পারিবে না আর। ইহা তাহার কৃতকর্মের যৎসামান্য উপহার।”
শোভা ক্ষোভের মাঝেও কিঞ্চিৎ ছন্দ মেলাতে চেষ্টা করল। বিপাকে পড়ে যাবীন হাসতেও পারে না। শোভা দাঁতে দাঁত ঘষে পুনরায় বলে,

“এটা যদি বিয়ে বাড়ি না হতো ওকে আমি নিশান্ত ভাইয়ার কাছে তুলে দিতাম। আমরা তো হাতে মেরেছি, ভাইয়া একদম হাড়গোড় পিস পিস করে ফেলত। এমন কারো সঙ্গে প্রেম করার দায়ে শাওন আপুকেও ছেড়ে দিতো না। আপুর কথা ভেবেই আর গেলাম না। এবার চলো তো ভেতরে। এতকিছুর মাঝেও আপুর সাতনরী হার ঝেপে দিয়েছে বেয়াদবটা। ওটা আগে উদ্ধার করি।”

দরজা খুলতেই দেখা গেল অনন্ত নিস্তেজপ্রায় আমিনের সঙ্গে ডব্লিউ ডব্লিউ চ্যাম্পিয়নশিপ খেলছে। হাত-পা বাঁধা আমিনকে মাটিতে ফেলে দূর থেকে ছুটে এসে ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ছে অনন্ত। আর প্রতিবার ঝাপানোতে আমিন যন্ত্রণায় কেঁদে উঠছে। যাবীন কপাল চাপড়ায় বন্ধুকে দেখে। গুরুতর মুহূর্তেও তার বালখিল্যতা যায়নি! দ্বীপশিখার এক একজন মানুষের স্বভাব একদম বাঁধিয়ে রাখার মতো আশ্চর্যজনক। শোভা ক্ষীপ্ত মেজাজে ছুটে গিয়ে আমিনের পেটে লাথি দিল। অনন্তকে বলল,
“ভাইয়া, শয়তানটা আপুর গলার সোনার হার ঝেপে দিয়েছে। খুঁজে বের করো ফাস্ট। চাঁদের বুড়ি খুঁজছে।”

অনন্ত ক্ষেপে গিয়ে বলল, “এত্ত বড়ো সাহস! হার কোথায় বল? নয়তো জামাকাপড় টেনে ছিঁড়ব। দুটো মেয়ের সামনে একদম নাঙ্গা করে দেব।”

আহত, নিস্তেজপ্রায় আমিন কোনোমতে ইঙ্গিত করল নিজের প্যান্টের পকেটে। সেটা উদ্ধার করতেই যাবীন বলল,
“এটাকে ছাড় এখন। সবাই নিচে চল। বিয়ে পরানো হবে। বাড়ির লোক সন্দেহ করবে আমাদের না পেলে।”
______________

সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। যখন ফুলের তৈরি ঝালরের দুইপাশে বসে বর-কনের হৃৎস্পন্দনের গতি ঊর্ধ্বমান। আপন ঘর পর হয়ে যাওয়ার বেদনায় কনের চোখে পানি আসে। আর বরের গলা শুকায়। কাজি বসেছে মাঝ বরাবর। কনেকে কবুল বলতে বলা হচ্ছে। শাওন ঠোঁট চেপে আছে। চোখ টলমল করছে। অপরপ্রান্তে উদগ্রীব কর্ণদ্বার নিয়ে অপেক্ষা করছে জাওয়াদ। শাওনের নিজেকে বেশ ছোটো মনে হয়। জাওয়াদ নাহয় শুধু তাকেই ভালোবেসেছে। প্রথম ভালোবাসা ও। কিন্তু ওর প্রথম ভালোবাসা তো জাওয়াদের জন্য ছিল না। ও কী আসলেই ওই স্বচ্ছ মানুষটার ভালোবাসার যোগ্য সম্মান দিতে পারবে? পারবে কী নতুন করে ভালোবাসতে? বুকে শঙ্কা জাগে। শুধু একটা কবুল। জীবনের পথচলায় দুজন জুড়ে যাবে। অন্তরের দোলাচলের মাঝেই শাওন টের পেল ফুলের ঝালর দিয়ে তৈরি পর্দা ভেদ করে একটি পুরুষালি হাত এগিয়ে এসেছে। আলতো স্পর্শে আঁকড়ে ধরেছে ওর ঘর্মাক্ত হাত৷ সেই স্পর্শে ভরসা আছে, আশ্বাস আছে, আছে পাশে থাকার আকুলতা। বিবাহসভার সকলেই এই দৃশ্য দেখে উল্লাস করে। শাওন চোখ বুজে উচ্চারণ করে,
“আলহামদুলিল্লাহ কবুল।”

জাওয়াদের দিক থেকে কবুল উচ্চারিত হলো সহজ, সাবলিলভাবেই। কাবিনের আনুষ্ঠানিকতা শেষে পর্দা উঠল বর-কনের মাঝ থেকে। জাওয়াদ দেখল নিজের স্ত্রীকে। শাওন দেখল স্বামীকে। এ যেন নতুন সম্পর্কের সূচনায় নতুন করে একে অপরকে দেখা। অন্যদিকে বর-কনের পাশে বসে থাকা আরো দুটি মানুষ একে অপরকে দেখল জ্বলজ্বলে চোখে।

চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here