প্রেমের_প্রদীপ_জ্বলে [১] লেখা: প্রভা আফরিন

0
389

প্রথম প্রেমের অভিজ্ঞতা যেমন মানুষ কোনোদিন ভোলে না, তেমনই প্রথম চড় খাওয়ার অভিজ্ঞতাও ভুলবার নয়। মেহযাবীনের আজও মনে পড়ে প্রথম চড় খাওয়ার দিনটার কথা।
তখন কতই বা বয়স ওর? সবে পনেরো। স্কুল পড়ুয়া বোকাসোকা যাবীনের মন কিশোরীকোমল আবেগে টইটম্বুর ছিল। অল্পেতেই খিলখিল করে হাসে, আবার একটু ধমকেই দুচোখে মেঘ ঘনিয়ে বর্ষা নামে। খেয়ালি মন তখন শাসনের অলক্ষ্যে দুঃসাহস দেখাতে চায়। ভাবাচ্ছন্ন মস্তিষ্কে রঙিন প্রজাপতি ডানা ঝাপটে উড়ে বেড়ায়। সেই রঙিন প্রজাপতি একবার টের পেল পাশের বাড়ির ছাদ থেকে সায়ান ভাই তাকে নিবিষ্ট নয়নে দেখে। সেই দেখা যে সাধারণ নয় তা কিশোরীর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় টের পায়।

সায়ান কলেজ পড়ুয়া তরুণ। প্রতিবেশী হিসেবে চেনা-জানা থাকলেও ওদের মেলামেশা ছিল না। যাবীনের অল্পবয়সে পেকে যাওয়া বন্ধুরা যখন বিষয়টা জানল তখন আশকারা দিতে লাগল। যাবীন সর্বদা ভীতু, নরম-সরম মনের মেয়ে। ওকে অনেকটা বন্ধুদলের দুধভাত হিসেবে ট্রিট করা হয়। এ নিয়ে তীব্র মন খারাপও হতো ওর। বন্ধুদের অনেকেই প্রেম করে, ক্রাশ খায়। বিষয়টা বর্তমানে তরুণ প্রজন্মের কাছে স্মার্টনেস হয়ে দাঁড়িয়েছে। হৃদয়ঘটিত ব্যাপারস্যাপার যেন খুব সাহসের এমনই ভাব প্রকাশ করে। সাহস দেখানোর ইচ্ছে যাবীনেরও জাগল। তার কারণ সায়ান ভাইকে ওর ভালোলাগে। নাকের নিচে পাতলা গোফ গজানো তরুণের ফরসা মুখটাকে যাবীনের কাছে এক শব্দে কিউট মনে হয়। তারমানে সায়ান ভাই ওর ক্রাশ! প্রথম ক্রাশ! কিশোরীর আপ্লুত মনে পুলক জাগে। দূর থেকেই ওরা একে অপরকে দেখে। যাবীন অবশ্য আঁড়চোখে দেখে। চোখাচোখি হয়ে গেলে অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে চোখ সরিয়ে নেয়। একসময় অপ্রস্তুত ভাব কেটে যায়। একে অপরকে দেখে মুচকি হাসে। বাড়ির কেউ অবশ্য সেসব জানে না, দেখেও না। তাদের কাছে সরল, ভীতু, বোকা মেয়েটা তেমনই রয়েছে।
এরপর একদিন স্কুল যাওয়ার পথে সায়ান ভাই ওর পথ আগলে দাঁড়ায়। জানতে চায়,

“কেমন আছো?”

কিশোরী লাজুক স্বরে উত্তর দেয়, “ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?”

“তোমাকে দেখলে সব খারাপ লাগা পালিয়ে যায়। সুতরাং ধরে নাও খুব ভালো আছি।”

সেই থেকে ওদের টুকটাক কথা বলা শুরু হলো। প্রেমের সিগন্যালটা তখনও যাবীনের মন থেকে আসেনি। সবে ভালোলাগার রেশ জোড়ালো হচ্ছে। বিপরীতে সায়ান একটু বেশিই এগিয়ে৷ প্রেম নিবেদন করা থেকে হাত ধরা সবটাই অল্প সময়ে ঘটিয়ে ফেলেছে। এরই মাঝে একদিন সায়ান আবদার করল তার সঙ্গে দেখা করতে হবে। যেটাকে প্রেমের ভাষায় বলে ডেট করা। ওদের প্রথম ডেট হবে রেস্টুরেন্টে। যাবীন ইতস্তত করছিল। পরিবারকে না বলে কোথাও যাওয়ার স্বাধীনতা এখনো সে পায়নি। মুশকিল আসান বন্ধুরাই ওকে বের হওয়ার উপায় বাতলে দেওয়া থেকে শুরু করে প্রথম ডেট সুন্দর করার জন্য সাজিয়েও দিল। প্রবল উৎকণ্ঠা, উত্তেজনা ও রোমাঞ্চ নিয়ে যাবীন উপস্থিত হলো রেস্টুরেন্টে। মনে মনে প্রস্তুত না হলেও ঠিক করেছিল আজই সায়ানের প্রস্তাবে হ্যাঁ বলবে। তবে রেস্টুরেন্টে গিয়ে আর বলতে পারল না। পরিবেশটা দেখেই অস্বস্তি হচ্ছিল। চারিদিকে সব ঘুপচি ঘুপচি স্থান। জোড়ায় জোড়ায় কপোত-কপোতীরা সেইসব ঘুপচি স্থানে নিজেদের আড়াল করে রেখেছে। একজনকে দেখা গেল প্রেমিকার গায়ের ওপর হেলে পড়ে বসে আছে। যাবীনের অস্বস্তি হলো এসব দেখে। সায়ানকে বলল,

“চলো আমরা অন্য রেস্টুরেন্টে যাই। এখানে কেমন দমবন্ধকর পরিবেশ।”

সায়ান জবাব দেয়, “এডভান্স পেমেন্টে টেবিল বুক করে ফেলেছি। একটু সময়ই বসব। এরপর নাহয় কোনো পার্কে যাব। আসলে বোঝোই তো পকেটমানি থেকে জমিয়ে সব ম্যানেজ করি।”

ছাত্রাবস্থায় বাজেট একটা বিরাট সমস্যা। সায়ান নিজেও পরিবারের টাকায় চলে। কাজেই তার বাজেট টাইট বলে বড়ো কোনো রেস্টুরেন্টে নিতে পারেনি। ভেবে যাবীন আর প্রতিবাদ করেনি। সায়ান যাবীনকে নিয়ে একটা ঘুপচি সাইডে বসে। গোলাপের তোরা উপহার দেয় ওকে। এরপর হাত ধরে কথা বলতে শুরু করে। যাবীন কিছুতেই সহজ হতে পারছিল না। কথাও বলতে পারছিল না। ঠিক তখনই কোথা হতে নিশান্তের উদয় হলো। যাবীনের বাবার প্রাণপ্রিয় বন্ধুর ছেলে নাফিউন আজাদ নিশান্ত। ওদের দুই পরিবারের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। সুতরাং আলো-আঁধারির ঐন্দ্রজালিক পরিবেশে, আড়ালকৃত টেবিলে একটি ছেলের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে বসে থাকার শাস্তিটা যাবীনের জন্য বেশ ভোগান্তি বয়ে আনবে বুঝতে বাকি রইল না। যাবীন থরথরিয়ে কেঁপে উঠে শুধু উচ্চারণ করেছিল,

“নিশান্ত ভাই…”

বাকি কথা কণ্ঠতেই সমাধিস্থ হয়। শক্ত চড় খেয়ে চোয়ালের সবগুলো দাঁত যেন নড়ে উঠেছিল। মাথাটা ভো ভো করে ঘুরছিল। যতক্ষণে হুশে ফিরেছে সায়ানকে বাহুবলে কাবু করে ফেলে নিশান্ত। কী মারটাই না খেয়েছিল সায়ান। এরপর পারিবারিক বোঝাপড়া তো ছিলই। নিশান্ত দুইজনের বাড়িতেই নিজ দায়িত্বে তাদের অধঃপতনের বিস্তারিত জানিয়েছিল। যার ফলে পরবর্তী দিনগুলোতে সায়ান ভুলেও আর যাবীনের দিকে চোখ তুলে তাকায়নি।

যাবীন ওর বাবা-মায়ের কনিষ্ঠ সন্তান। বাড়ির একমাত্র আদরের মেয়ের গায়ে কেউ ফুলের টোকাও দেয়নি। সেবারও দিল না। কিন্তু বকাবকি ও নিয়মের কড়াকড়ি জুড়ে গেছিল। যাবীনের প্রথম ভালোলাগার নির্মম সমাপ্তি ঘটেছিল সেখানেই। সেই সঙ্গে স্বাধীনতা ও মনের ভেতরের রঙিন প্রজাপতির পায়েও বেড়ি পরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এরপর আর কারো প্রতি মনের টান তৈরি হয়নি। কিন্তু একজনের জন্য সীমাহীন রাগ ও মনের মধ্যে পুষে রেখেছে।

আজ আট বছর পর এই আলো ঝলমলে স্বপ্নালু ক্ষণে হঠাৎ উড়ে আসা দুঃস্বপ্নের মতোই সেই দিনটার কথা মনে পড়ে গেল। সারাদিন যে পরিমাণ উচ্ছ্বাস, উত্তেজনা ছিল তা এক লহমায় মলিন হয়ে গেল অপছন্দের মানুষটাকে দেখে। ক্যাপ্টেন নাফিউন আজাদ নিশান্ত, যার কালো ছায়া যাবীন সর্বদা এড়িয়ে চলে। সেই মুডি, রুক্ষ পুরুষ কণ্ঠটি ওকে একাকি দেখতে পেয়ে ডাকল,
“মেহযাবীন?”

যাবীন রাস্তার সাইডে পাতা চেয়ারে শক্ত হয়ে বসে আছে। জবাব দেওয়ার ইচ্ছে দেখা গেল না, চোখ তুলে তাকালও না। তাতে পুরুষটির বিশেষ ভাবান্তর হলো না। পুনরায় বলল,
“আমি ডাকছি তোমায়। বধির তো নও।”

“সব কথা শুনতে বাধ্যও নই।”
যাবীন মনে মনে আওড়ায়। চাপা ক্ষোভে পূর্ণ অন্তর। প্রকাশ করার সাহসটা হয়ে ওঠে না। একেই বাবার বন্ধুপুত্র, সেরের ওপর সোয়া সের হিসেবে আবার একমাত্র ভাইয়ের সম্বন্ধি হতে চলেছে। বাড়িতে নালিশ দিলে রক্ষে নেই। এই ঝামেলাকে এখন প্রতিনিয়ত মোকাবিলা করতে হবে! যাবীনের কান্না চলে আসে। ওদিকে রুক্ষভাষী পুরুষ এবার শীতল হেসে বলছে,

“জেদি হয়েছো! চড়ের কথাটা ভুলে গেছ মনে হচ্ছে?”

এ কথায় কাজ হলো। যাবীনের অন্তরের সুপ্ত অগ্নিকুণ্ড দাহ্য পদার্থ ছাড়াই দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। কিঞ্চিৎ আচরণেও প্রকাশ পেল। যাবীন ঘাড় কাত করে চাইল দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিটির পানে। পেছন দিক থেকে বিয়ে বাড়ির উজ্জ্বল আলো এসে পতিত হলো মুখশ্রীর অর্ধভাগে। বোঝা গেল দৃষ্টির ক্রোধ। শক্ত গলায় জবাব দিল,

“ভুলে যাবেন না, আমি আর ছোটোটি নেই।”

নিশান্ত কৌতুকের চোখে চায়। ভ্রু উঁচিয়ে তাচ্ছিল্য করে হাসে। বলে,
“আচ্ছা! দেখি কত বড়ো হয়েছো। এসে দাঁড়াও আমার সামনে।”

যাবীন ভ্যাবাচেকা খেয়ে পুনরায় আঁধারে মুখ ডোবায়। হাত দশেক দূরত্বে দাড়িয়ে থাকা নিশান্ত এবার বিরক্ত গলায় বলল,
“দুই মাসের ছুটিতে বাড়ি ফিরেছি। আমার প্রতিটা মুহূর্ত মূল্যবান। তোমার পেছনে টাইম ওয়েস্ট করার খুব একটা ইচ্ছে নেই।”

অপমানে থমথমে হয় যাবীনের মুখ। নিজেই পেছনে এসে আবার কথা শোনানো হচ্ছে! ও বলল,
“এসেছেন কেন? চলে যান আপনি।”

“আমার গণ্ডিতে এসেছো যেহেতু, তোমার নিরাপত্তার কথাও আমাকে ভাবতে হচ্ছে। গা ভর্তি গহনা পরে কোন বুদ্ধিধারী মানুষ রাতের বেলা রাস্তায় বের হয় জানা নেই আমার। বেটার হয় এই নির্জন জায়গা ছেড়ে বাড়ির ভেতরের লনে বসো। ভাইয়ের বিয়ে দিতে এসে চোর-ডাকাতের কবলে পড়তে চাও? শেষে তোমার জন্য আমার বোনের বিয়ে ভেস্তে যাক আরকি। আদরের বোনটার খুশির জন্যই তোমাকে নিয়ে ভাবতে হলো। এখন কেউ যদি নিজের ভালো না বোঝো তাতে আমার কী? ফারিনের ঘটনা কী জানা নেই?”

কথাটা বলে নিশান্ত আর অপেক্ষা করল না। তার লম্বা ছায়াটা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে, সেই সঙ্গে যাবীনের মনের সাহসটাও বিদায় নিচ্ছে। আজ ওর ভাইয়ের আকদ। সে উপলক্ষে শাড়ি-গহনা আস্তরণ উঠেছে দেহে। এতক্ষণ অন্ধ ক্ষোভে হুশ না থাকলেও এবার যেন খেয়াল হলো কাজটা আসলেই ঠিক হয়নি। ফারিনের কথা মনে পড়তেই ছমছমে অনুভূতি জাগে। লোকমুখে শোনা যায় একটা কালো মাইক্রোবাস এসে কিশোরী মেয়েটাকে তুলে নিয়ে গেছে। আর ফেরেনি, সন্ধানও মেলেনি। যাবীন শুকনো ঢোক গিলল। সামনেই হাইওয়ে। হুট করে একটা গাড়ি এসে যদি ওকে উঠিয়েও নিয়ে যায় কেউ বুঝবে না। তারওপর সামনের বাড়িতে একটা আলাস্কান মালামিউট জাতের ধবধবে কুকুর জিভ বের করে ঘুরঘুর করছে। একটু পর পর গেইটে এসে উঁকি দিয়ে যাবীনকে দেখে আবার ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। কুকুরটা দেখতে ভীষণ সুন্দর। কিন্তু কাছে এলে ভয় লাগে। নির্জন, নিঝুম আঁধারে ওর ভয়ের মাত্রাটা বাড়িয়ে দিতেই যেন কুকুরটা খ্যাঁকিয়ে উঠল। যাবীনের রাগ, ক্ষোভ ফুস করে উড়ে গেল। সটান দাঁড়িয়ে হাঁটা দিল ‘দ্বীপশিখা’ নামের বাড়িটার দিকে।
_____________

যাবীনের বাবা সুলতান শেখের প্রাণপ্রিয় বন্ধু মোহাম্মদ আশরাফুল আজাদ। বন্ধুত্বের হৃদ্যতা থেকেই পারিবারিক ঘনিষ্ঠতা দুই পরিবারে। সুলতান শেখের দুটি সন্তান। পুত্র জাওয়াদ শেখ ও কন্যা মেহযাবীন শেখ মিহা। আজাদ সাহেবের দুটি পুত্র। নিশান্ত ও অনন্ত। তবে আজাদ সাহেবের যৌথ পরিবারে উনার ছোটো ভাইয়ের আরো দুটি কন্যা সন্তানও আছে। শাওন ও শোভা। দুই পরিবারের ঘনিষ্ঠতার সূত্রেই ছেলেমেয়েরা সকলে ছোটোবেলা থেকে বন্ধুর মতো বড়ো হয়েছে। বন্ধুত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এবার শেখ বাড়ির একমাত্র পুত্র জাওয়াদের সঙ্গে আজাদ বাড়ির কন্যা শাওনের বিয়ে ঠিক করা হয়েছে। দুই পরিবারের উপস্থিতিতে আজ রাতে আকদ সম্পন্ন হবে। সেই উপলক্ষেই ‘দ্বীপশিখা’ বাড়িটা আজ নববধূর মতো সেজেছে। বাড়ির আনাচে-কানাচে আত্মীয়দের ভিড় জমেছে। বরযাত্রীও এসে পড়েছে অনেকক্ষণ।

যাবীনও ভাইয়ের বিয়েতে হৈ-হুল্লোড় করতে করতেই এসেছিল। কিন্তু সভায় উপস্থিত হয়েই দেখল নিশান্তের আগমন ঘটেছে। অথচ ওকে জানানো হয়েছিল নিশান্ত সেনাবাহিনীর গোপন মিশনে আছে বলে বোনের বিয়েতে আসতে ছুটি পায়নি। বান্ধবী ও হবু ভাবির এহেন মিথ্যাচারেই চটে গেছিল যাবীন। তারওপর অপছন্দের মানুষটার গা জ্বালানো হাসি। সব মিলিয়ে ক্ষোভের মাথায় বেরিয়ে গেছিল ও। ফিরতেই মা চেপে ধরলেন,
“কোথায় ছিলে এতক্ষণ?”
যাবীন মিনমিন করে জবাব দিল,
“এত মানুষের মাঝে দমবন্ধ লাগছিল। তাই একটু বাইরে গেছিলাম।”
সুমা বেগম উত্তরটি বিশ্বাস করলেন। কেননা উনার এই সন্তানটি নির্ঝঞ্ঝাট থাকতে পছন্দ করে বলে লোক সমাগম এড়িয়ে চলে। স্বভাবে সে ভীষণ নরম মনের মেয়ে, সরল ও শান্তশিষ্ট। শুধু জানেন না কোনো একজনকে দেখলেই মেয়েটির এই শান্তশিষ্ট থাকার গুণটা বিলুপ্ত হয়, অন্তরে অশান্তি তৈরি হয়। সুমা বেগম বললেন,
“বাইরে যাওয়ার দরকার নেই। ভালো না লাগলে ওপরে চলে যেয়ো।”

কোথা হতে শোভা ছুটে এসে যাবীনের হাত টেনে ধরল,
“এই যাবীন আপু, তোমাকে আমি সেই কখন থেকে খুঁজছি। এসেই কোথায় গা ঢাকা দিলে?”

যাবীন অবিশ্বাস্য চোখে শোভার দিকে চাইল। চাইল উপস্থিত সকলে। শোভা সকলের বিস্ফোরিত দৃষ্টির মুখে পড়ে ভ্রুকুটি করল৷ কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
“হোয়াট হেপেন্ড গাইজ? এম আই লুক লাইক এন এলিয়েন?”

“শোভা, তুই শাড়ি পরেছিস! আমি কী ঠিক দেখছি? মহল্লার দ্য গ্রেট টমবয় শোভা কিনা শাড়ি পরেছে?” যাবীন অবাক কণ্ঠে উচ্চারণ করে। চোখ কচলাতে গিয়েও শখের কাজল লেপ্টে যাওয়ার ভয়ে আর পারে না। বিকল্প হিসেবে হাতে চিমটি কাটে।

শোভা শাড়ির আঁচলটা দুমড়ে মুচড়ে কাঁধে তুলে বলল,
“এইসব সিলি ড্রেস পরে কী মজা বুঝি না। এদিকে সামলাও, ওদিকে সামলাও, কুচি তো পায়ের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে। বেশি তেড়িবেড়ি করলে খুলে ফেলব টান মেরে। এরচেয়ে ভেতরের দুটো বেশি সুন্দর দেখায়।”

“কীহ?” যাবীন ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল।

শোভা ওর মনোভাব বুঝে চোখ ছোটো ছোটো করে বলল,
“আই হেইট ইয়োর মাইন্ড। আমি পেটিকোট আর ব্লাউজের কথা বলেছি৷ ওইদুটো স্কার্টের মতো করে পরা যায়। শাড়ির চেয়ে সহজ পোশাক। তোমাকে খুঁজছিলাম যদি এই হতচ্ছাড়া শাড়িটা একটু পিনআপ করে দাও। কখন না জানি কুচিগুলো পায়ের তলায় পরে টুশ করে খুলে যায়।”

শোভার হাতে স্টেপলার দেখে যাবীন ফিক করে হেসে ফেলল। ওকে টেনে নিয়ে নিচতলার এক রুমে ঢুকল। মোচড়ানো আঁচলটা নামিয়ে ভাজ করে দিতে দিতে বলল,
“সামলাতে পারিস না যখন জোর করে পরেছিস কেন?”

শোভা বিরক্ত হয়ে বলল,
“কেন আবার? জানো না বাড়িতে একটা চাঁদের বুড়ি আছে! তার হুকুম ছাড়া তো দ্বীপশিখার একটা পাতাও নড়ে না, মানে চাঁদের বুড়ির তেমনই ধারণা। তিনি হুকুম করেছেন আমাকে বাঙালি সাজে বিয়েতে আসতে হবে। মানে সালোয়ার কামিজও না৷ ডিরেক্ট শাড়ি। নাহলে তিনি আমাদের সংস্থাতে আর ডোনেশন পাঠাবেন না। মানে কত্ত বড়ো হুমকি! নেহাৎ আমি ফকির। ডোনেশন দিয়েই চলতে হয়। নয়তো আমাকে হুমকি দেওয়া!”

প্রসঙ্গত শোভা একজন এ্যানিমেল রেসকিউয়ার। ওদের একটা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা আছে, যার কাজ মূলত পশু-পাখিদের নিরাপদ আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও খাদ্য সরবরাহ করা। চাঁদের বুড়ি অর্থাৎ শোভার দাদি ও দ্বীপশিখার কর্ত্রী ওদের সংস্থাতে একটা বড়ো ডোনেশন দেন। সেই ডোনেশনের লোভেই ঘাড়ত্যাড়া শোভা মাঝে মাঝে ঘাড় সোজা করতে বাধ্য হয়। চাঁদের বুড়িও এই সুযোগে নাতনিতে নাস্তানাবুদ করে ছাড়েন।

যাবীন কৌশলে জানতে চাইল, “নিশান্ত ভাইয়ের তো আসার কথা ছিল না। তাহলে আসল কীভাবে?”

শোভা বলল, “বলেছিল আসবে না। কিন্তু গতকাল হুট করে এসে সারপ্রাইজ দিল। মিশনটা সাকসেসফুলি শেষ করে বীরের বেশে ফিরেছে।”

যাবীন আর কিছু বলল না। নিরবে শোভার শাড়ি ঠিক করে দিল। বিয়ের আসরে এখন সবাই কনের অপেক্ষা করছে। ওদিকে শাওন নিচে নামার নামই নিচ্ছে না। এমন সময় ফাইজা ছুটে এসে শোভার কানে ফিসফিস করে বলল,
“শাওন আপু ঘরে নেই। দোতলার কোথাও খুঁজে পেলাম না।”

চলবে…
#প্রেমের_প্রদীপ_জ্বলে [১]
লেখা: প্রভা আফরিন
[কোনো ক্রমেই কপি করবেন না❌]

অনেক চরিত্রের সমাহার ঘটবে উপন্যাসে। বলুন দেখি ফু দিয়ে প্রদীপ নিভিয়ে দেবেন নাকি জ্বালিয়ে রাখবেন?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here