প্রেমের_প্রদীপ_জ্বলে [২৪] প্রভা আফরিন

0
200

প্রেমের_প্রদীপ_জ্বলে [২৪]
প্রভা আফরিন

রৌদ্রস্নাত দুপুর আচমকা অস্ত্রহীন সৈনিকের ন্যায় তার তেজ হারিয়েছে। শান্তির পতাকারূপে আকাশতটে আগমন ঘটেছে তুলো নরম মেঘেদের। যার ছায়াতলে তপ্ত প্রকৃতি অবসন্ন মনে জিরিয়ে নিচ্ছে। আধ ঘণ্টার ব্যাপক চিন্তা, উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা ও ছোটাছুটির পর নিশান্তের মনও এখন যথারীতি প্রকৃতির অনুরূপ শান্ত। তবে মস্তিষ্ক আপনমনেই একের পর এক ছক কষে চলেছে। বিক্ষিপ্ত দৃশ্যপটে উঠতি ব্যবসায়ী মাহির মোহাম্মদ সুফির আকস্মিক আগমন তাকে চিন্তিত করেছে বৈকি। তবে সেই চিন্তার গভীরতা ঠিক কতখানি তা বোঝা মুশকিল। ক্ষণে ক্ষণে শুধু দৃষ্টির তীক্ষ্ণতা ও কপালের সুক্ষ্ম ভাজের রুক্ষতা ভেসে উঠছিল গম্ভীর মুখশ্রীতে।

মেহযাবীন গুটিগুটি পায়ে এসে থামল লম্বাটে যুবকের পেছনে। তার হাঁটার ক্ষীণ শব্দ সদা সতর্ক আর্মি অফিসারের শ্রবণশক্তিকে এড়াতে পারল না। দৃষ্টি ঘুরে গেল বিনা সংকোচে। চোখের তারায় ফুটে উঠল বেগুনি রঙের শাড়ি পরিহিতা সুশ্রী গোলগাল মুখশ্রী। যার চোখের পেলব দৃষ্টি কিছু বলার জন্য উৎকণ্ঠিত। নিশান্ত নীরবে চেয়ে থেকে প্রতিক্ষা করল সে কথা শুনতে। প্রতিক্ষা দীর্ঘায়িত করল না অপ্রস্তুত মেয়েটি। তার ফোনে এতবার মিসড কল আসার রেকর্ড এই প্রথম। একজন মানুষ সামান্য চিন্তায় যে এভাবে ডেস্পারেটলি কল করে না, তা বুঝতে কোনো সচেতন মানুষের অসুবিধা হবার নয়। সেখানে নিশান্তের এভাবে কল করাটা যেন আরো বেশি চিন্তার। যাবীন চাপা গলায় বলল, “সত্যি করে বলুন তো, কিছু কী হয়েছে?”

নিশান্ত বরফশীতল কণ্ঠে জবাব দিলো, “কিছু যেন না হয়, সে জন্যই এত ব্যস্ততা।”

মেহযাবীন সহসাই বুঝল না সে কথার অর্থ। বিপরীত ব্যক্তিটি তার অজ্ঞতাকে কটাক্ষ করে পুনরায় বলল, “শোভার সঙ্গে কী হয়েছে স্মরণে আছে? যদি থাকে তবে নিজেকে নিয়ে যেন সতর্ক থাকা হয়। অপরাধী যতক্ষণ হাতের বাইরে, নিজের সেফটি ততক্ষণ হাতের মুঠোয় রাখতে হবে। মাইন্ড ইট।”

যাবীনকে টপকে লম্বা পা ফেলে নিশান্ত চলে গেল সুমা বেগমের কাছে। এবার তাকে ফিরতে হবে। সুমা প্রতিবাদ করে বললেন, “যাবে মানে? দুপুরে খেয়েছো?”

তানি খালা উনার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললেন, “খায় নাই। মুখ দেইখ্যাই বুঝা যায়। আইয়ো, গরম গরম কয়ডা ভাত খাইয়া লও।”

নিশান্ত সে প্রস্তাব নাকচ করতে চাইছিল। শাওন এসে তার একটা হাত ধরে আবদার করল, “না খেয়ে যেয়ো না।”

বোনের আবদারের কাছে হার মানল পাষাণ মন। ভাতৃসুলভ নমনীয়তা এলো চোখে। নিরেট কণ্ঠে বলল, “জাওয়াদ উঠেছে?”

“উঠেনি। ডেকে দেব?”

“প্রয়োজন নেই। উঠলে বলিস আমি তার সঙ্গে কথা বলতে চাই। আমাকে যেন কল করে।”

নিশান্তের খাওয়া হতে হতে মেহযাবীন পোশাক বদলে ফ্রেশ হয়ে নামল। তার হাতে ল্যাপটপ। সেন্টার টেবিলে সেটা নামিয়ে রেখে বলল, “আমি গত রাতেই ইনভাইটেশন কার্ড ডিজাইন করে রেখেছিলাম। তোমরা দেখো তো পছন্দ হয় কিনা।”

শাওন আগ্রহ নিয়ে দেখল। পানপাতা আকৃতির একটি কার্ড যেটাকে একপাশ দিয়ে দেখলে মনে হয় পানপাতা আবার অপরপাশ দেখলে মনে হয় হার্ট। পানপাতা অনেকটা হার্ট শেইপের মতোই বলে এই লুকটাকে কেন্দ্র করে ভালোবাসা ও নিমন্ত্রণ উভয় থিমে দুই পার্ট করা কার্ডটা ডিজাইন করা হয়েছে। আর সোনালি অক্ষরে নিমন্ত্রণ বার্তা খচিত থাকবে ভেতরে। সুমা মেয়ের কাজের ওপর সন্তুষ্ট হলেন। শাওনকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “তোমার বাড়িতে দেখাও। এপ্রুভাল দিলে আমি আজই প্রিন্টিংয়ে পাঠাব। হাতে সময় কম।”

শাওন ল্যাপটপটা নিয়ে খাবার টেবিলে গেল নিশান্তকে দেখাতে। নিশান্ত ভাতের লোকমা গালে নিয়ে একপলক চেয়ে দেখল। মেহযাবীন সোফা থেকে ঘাড় বাঁকিয়ে চেয়ে রইল লোকটার প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য। কিন্তু ওকে নিরাশ করে নিশান্ত বোনকে জিজ্ঞেস করল, “তোর পছন্দ হয়েছে?”
“খুব।”
“তাহলে প্রেসে পাঠিয়ে দিতে বল। আর কারো এপ্রুভাল নেবার প্রয়োজন নেই।”

সুমা সে কথা শুনে আর দেরি করলেন না। ব্যস্ত গলায় শাওনকে বললেন,
“কার্ডের ঝামেলা মিটে গেল। তোমার রিসেপশনের লেহেঙ্গা, মিহার লেহেঙ্গা আর জাওয়াদের শেরওয়ানি দুদিনের মাঝেই দিল্লি থেকে চলে আসবে। গহনা গড়ানোর ঝামেলা নেইনি। আমার চয়েজের সঙ্গে তোমারটা না-ও মিলতে পারে। তাই সেসব তুমি নিজের পছন্দে কিনবে। বাকিসব টুকটাক যা শপিং বাকি এ সপ্তাহের মাঝেই দুই ননদ-ভাবি মিলে সেরে নেবে। আপাতত বাবার বাড়িতে ফেরার প্রয়োজন নেই। নিজের বিয়ের জিনিস নিজে পছন্দ করে কেনো। এই উৎসব তোমাদের জন্যই। তাই আমি চাই না সাজসজ্জা নিয়ে তোমাদের মনে কোনো আক্ষেপ থাকুক।”

একনাগারে সব প্রয়োজনীয় কথা সেরে ফেললেন সুমা। শাওন সম্মতি দিতেই তিনি নিজ কক্ষে চলে গেলেন। সুলতান শেখের পাশে সারাক্ষণ কেউ না কেউ থাকছে প্রয়োজন, অপ্রয়োজনীয় নজর রাখতে। তিনি চলে গেলে ননদ-ভাবি অথবা দুই বান্ধবী সোফায় পা তুলে বসে কী কী কিনবে তার ফাইনাল লিস্ট তৈরি করছিল। নিশান্ত বেরিয়ে যাবার আগে ওদের উদ্দেশ্যে সেনা কণ্ঠে নির্দেশ জারি করল, “কেউ একা বাড়ির বাইরে যাবে না। জাওয়াদ না থাকলে আমাকে কল করবে। কোথাও গাড়ি নষ্ট হলে, কেউ নিতে না গেলেও পাকামো করে একা একা আসা যাবে না। এ কথার যেন কোনো নড়চড় না হয়।”

আদেশের অন্তর্নিহিত কারণ অনুধাবন করতে কোনো অসুবিধাই হলো না ওদের। শাওন সঙ্গে সঙ্গে মাথা নত করে ফেলল। এসব নিরাপত্তার উৎপত্তি তো তাকে ঘিরেই। উঠে দাঁড়িয়ে ভাইয়ার নিকটে গিয়ে আর্দ্র স্বরে বলল, “আ’ম সরি, ভাইয়া।”

নিশান্ত শাওনের নত থুতনি দুই আঙুলে উঁচু করে তুলল। দৃঢ় গলায় পুনরায় বলল, “প্রদীপের শিখা কখনো নতমুখী হয় না। আগুন সদা উর্ধ্বমুখী হয়ে জ্বলে। তুমি কোনো অন্যায় করোনি। কাজেই তোমার ঘাড় যেন অকারণে নত না হয়। কেউ ভুল বুঝলে তার ভুল ভাঙাতে চেষ্টা করবে, কিন্তু নিজেকে দোষারোপ করবে না। মনে থাকবে?”

শাওন মাথা কাত করল। তার মনে থাকবে। ভাইয়া যতই কঠোর হোক না কেন, ভাই-বোনদের ক্ষেত্রে তার অভিভাবকসুলভ সুরক্ষাদায়ী মনটায় কখনো ছেদ ঘটে না। কিছু মানুষ ঘটা করে আহ্লাদ দেখাতে জানে মা। তার দায়িত্বের মাঝেই ভালোবাসাকে বুঝিয়ে দেয়।
_____________

জাওয়াদের ঘুম ভাঙল সন্ধ্যার কিছু আগে। সূর্য তখন তল্পিতল্পা গুটিয়ে প্রস্থানে প্রস্তুত। কার্তিকের হিম হাওয়া উড়ে আসছে জানালা গলে। চোখ মেলেই সে একটি চমৎকার দৃশ্য দেখতে পেল। ঘরের নতুন বউটা শাড়ি পরে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে আঁচল ভাজ করে নিচ্ছে। হাত উঁচিয়ে চুল বাঁধতে গিয়ে আঁচলের ফাঁক গলে তার নির্মেদ, আকর্ষণ জাগানিয়া উদর উঁকি দিয়ে যেন এর একচ্ছত্র অধিকারীকে ইশারায় ডাকছে। ইশারা প্রত্যাখান করল না জাওয়াদ৷ নিজের সাজ নিয়ে নিমগ্ন বধূ কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে নিঃশব্দে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল৷ বাঁ হাতটা সন্তর্পণে গলিয়ে দিলো আঁচলের ভেতর নিজের অধিকার বুঝে নিতে। মৃদু স্বরে বলল, “শাড়ি পরা নারীকে কখনো বিশেষ চোখে দেখা হয়নি। তোমাকেই প্রথম মনোযোগ দিয়ে দেখেছি। আর বুঝেছি, নারীর অঙ্গে জড়ানো শাড়ির প্রতিটি ভাজে ভাজে জগতের অর্ধেক মাদকতা লুকিয়ে থাকে।”

হাতের বেপরোয়া দখল ও কণ্ঠের ঘোরলাগা স্বরের যুগপথ আক্রমণে শিউরে উঠল শাওন। অপ্রতিভ, কুণ্ঠিত চোখে চাইল আয়নার প্রতিবিম্বে। তার কাঁধে থুতনি নামিয়ে লোকটা মিটমিট করে হাসছে। জাওয়াদ ও মেহযাবীন উভয়েই উত্তরাধিকার সূত্রে অতিশয় সৌন্দর্যের অধিকারী। যে সৌন্দর্যে শান্ত, স্নিগ্ধতা বিরাজ করে। ইদানীং এই সুদর্শন পুরুষটিকে দেখলে শাওনের চোখে আরাম লাগে। এই যে লোকটার দুদিন না কামানো খোঁচা খোঁচা দাড়িযুক্ত ফরসা মুখটায় আধো ঘুমের রেশ লেগে আছে, শাওনের হা করে চেয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে। বিয়ের আগেও এই মুখটায় বিশেষ কিছুই খুঁজে পায়নি সে। অথচ বিয়ের পর থেকে বারবার নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করছে, এমন সুদর্শন পুরুষ সে আর দেখেছে? উহু, কক্ষনো দেখেনি। দেখতে চায়ও না। তার এক জীবনে ভালো থাকার জন্য শুধু এই মানুষটার একটু সান্নিধ্য ও ভালোবাসাই বুঝি যথেষ্ট।

জাওয়াদ চোখ টিপে ইশারা করে বলল, “আজকাল আপনার চোখদুটি এত মুগ্ধ হয়ে কী দেখে, হুম? আমি যা বুঝি তাই কী?”

“কী বুঝো তুমি?”

“বুঝি, এই দুটো চোখ আমাকে পাওয়ার জন্য উতলা হয়ে আছে। আমি কী তার আবদার অপূর্ণ রাখতে পারি!”
জাওয়াদের অপর হাতটি শক্ত হয়ে চেপে ধরল স্ত্রীর কোমড়। ঠোঁটদুটি আলতো করে চেপে বসল ঘাড়ে। শাওন ছটফটিয়ে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে খোচা খোচা দাড়ির ঘর্ষণ লাগল ঘাড়ে। কণ্ঠ হতে মৃদু আর্তনাদ বেরিয়ে এলো। জাওয়াদ সে স্বর শুনে হাত আলগা করতেই পাখি ফুড়ুৎ করে উড়ে যেতে চাইল। কিন্তু শাড়ির আঁচলটা আর ছাড়াতে পারল না। মিনমিন করে বলল, “সারাদিন খাওনি। চলো এবার খেয়ে নেবে।”

“পেটের অভুক্ততা দেখলেই হবে? মনেরটা দেখা লাগবে না?” জাওয়াদ আবারো তাকে বাহুবন্দি করল।

“সে জন্য সারারাত পড়ে আছে। আগে মৌলিক চাহিদাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।”

“আর ইউ শিওর? সারারাত?” বলেই তীর্যক হাসল জাওয়াদ।

শাওন নিজের কথার ফাঁদে পড়ে অস্থির হয়ে মুখ লুকানোর জায়গা খুঁজল। প্রসঙ্গ বদলাতে বলল, “তোমার বন্ধু এসেছিল আজ দুপুরে।”
“কোন বন্ধু?”
“মাহির সুফি। যাবীনকে ভার্সিটি থেকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে গেছে। তুমি ঘুমাচ্ছিলে বলে আর দেখা করেনি।”

জাওয়াদের বাহুবন্ধনী শিথিল হয়ে গেল। দুপুরের ঘটনা বৃত্তান্ত শুনে তার চোখ-মুখের রং বদলে গেল। শাওন খুব কমই এই মানুষটাকে রাগতে দেখেছে। তাই কিছুটা অবাক হলো। কারণ না বুঝে বলল, “কী হয়েছে? আমি কী তোমায় কোনোভাবে অসন্তুষ্ট করলাম?”

“উহুঁ। আমার জন্য খাবার গরম করো। হাত-মুখ ধুয়ে আসছি।”
জাওয়াদের আকস্মিক নির্লিপ্ত আচরণে শাওন অবাক হলেও প্রতিবাদ করল না। নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল। ঠিক তখনই নিজকক্ষে আত্মনিমগ্ন যাবীনের ফোনে আকস্মিক একটি ম্যাসেজ এলো,
“প্রেম একটি অনিরাময়যোগ্য ব্যধি। তুমি বোধহয় আমাকে সে ব্যধিতে আক্রান্ত করে ফেললে।”

চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here