স্রোতস্বিনী #মুগ্ধতা_রাহমান_মেধা পর্ব ২৯

0
122

#স্রোতস্বিনী
#মুগ্ধতা_রাহমান_মেধা
পর্ব ২৯

আজ আকাশে চাঁদ উঠার নাম নেই।আকাশটা ঘুটঘুটে অন্ধকার রূপ ধারণ করেছে।দেখে মনে হচ্ছে চাঁদ আকাশের উপর রাগ করে আজ দেখা দেয় নি।তাদের এতো ভালো সখ্যতার ব্যাঘাত ঘটেছে।মান্ধবী মাত্রই রাতের খাবার শেষ করে রুমে এসেছে।মা মা রা যাওয়ার পর জীবনটা কেমন থম মেরে গিয়েছিলো।এতোদিন পর জীবনে আনন্দ, খুশী নামক বস্তুগুলো ধরা দিলেও আমার দুঃখেরা ঝাঁপিয়ে পড়লো।সব কিছুই আচমকা হয়ে গেলো।তারউপর তার জীবনের একটা বড় অধ্যায় জুড়ে রয়েছে রায়হান নামক ব্যক্তি।যে কোনো একসময় তার ভালোবাসা প্রত্যাখ্যান করেছিলো।তাকে চরম অপমান করেছিলো।আজ সেই ব্যক্তির চোখেই মান্ধবী তার জন্য ভালোবাসা দেখতে পায়।সেই ব্যক্তি মান্ধবীর কাছে একটা সুযোগ চায়,ভালোবাসা ভিক্ষা চায়।রায়হান মান্ধবীর জীবনের প্রথম প্রেম ছিলো।প্রথম প্রেমের প্রত্যাখ্যান,অসম্মান, অপমান মেনে নিতে পারে নি কিশোরি মন।যতটা ঘৃণা করা যায়,ঠিক ততটা ঘৃণা করে সে রায়হানকে।কিন্তু অন্তঃকরণের কোথাও না কোথাও এখনো সেই কিশেরী মনের ভালোবাসা রয়ে গেছে।রায়হানের আকুতি, মিনতি মনের কোনো না কোনো অংশ মেনে নিতে পারে না।কোথাও না কোথাও কষ্ট হয়,বড্ড কষ্ট হয়।এটাই হয়তো প্রথম প্রেম।হাজার চেষ্টা করলেও ভুলা যায় না।তবে মান্ধবী নিজের অপমানের প্রতিশোধ নিবে।যতদিন তার মন শান্তি না পাবে ততদিন সে রায়হানকে এড়িয়ে চলবে।স্রোতের বিয়ের পর থেকে রায়হান মান্ধবীর সাথে যোগাযোগ করার অনেক চেষ্টা করেছে।ফোনের পর ফোন দেওয়া,রাস্তা-ঘাটে প্রায়ই দাঁড়িয়ে থাকা,রাতে বাড়ির সামনে চলে আসা। মান্ধবীর সাথে সব ঠিক করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে রায়হান।এখনো চেষ্টা করছে।কিন্তু মান্ধবী সবটা সময় যথাসম্ভব এড়িয়ে চলেছে।ফোন ধরে নি,উল্টো নাম্বার ব্লক করে দিয়েছে,সোশ্যাল মিডিয়াতেও ব্লক,রাস্তায় অপরিচিত মানুষের মতো এড়িয়ে গেছে,বাড়ির সামনে আসলে সে দেখা দেয় নি।মান্ধবী যতই বলুক সে রায়হানকে ঘৃণা করে,রায়হান যে তার দূর্বলতা তা সে অস্বীকার করতে পারবে না।
এগুলা ভাবতে ভাবতেই অচেনা নাম্বার থেকে কল আসে।মান্ধবী দেখেও রিসিভ করে না। সে বুঝে নেয় রায়হান কল করেছে।এমন অনেক অচেনা নাম্বার থেকে রায়হান কল দিয়েছিলো।রায়হানের নাম্বার বুঝতে পেরে মান্ধবী ব্লক করে দিয়েছিলো।এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না।কিন্তু এবার মান্ধবী ব্লকও দিলো না,রিসিভও করলো না।সে দেখতে চায় কি হয়!কল একের পর এক আসতেই থাকে,রিং অনবরত বাজতেই আছে।বুঝা যাচ্ছে অপর পাশের মানুষটা নাছোড়বান্দা। একে একে পনেরোটা কল শেষ হলো। আবার বাজতে শুরু করলে মান্ধবী রিসিভ করে বিরক্ত নিয়ে বলে,
“এতোবার কল দিচ্ছেন কেনো?”
“যাক অবশেষে রিসিভ করলে।আমি তো ভেবে ছিলাম সেঞ্চুরি করবো আজ।”
“বাজে কথা বলবেন না। আপনি বিরক্ত করছেন আমায়।”
“বললাম না বাজে কথা।ইদানিং একটা ছেলের সাথে দেখা যাচ্ছে তোমাকে। কে সে?”

মান্ধবী প্রথমে বুঝতে পারে না কি বলেছে।তারপর মাথায় আসলো ডিপার্টমেন্টের নবীনবরণ উৎসবের জন্য কয়েকদিন যাবৎ ডিপার্টমেন্টের এক সিনিয়র ভাইয়ের সাথে কয়েক জায়গায় যেতে হয়েছে তাকে।বুঝলো রায়হান তার কথা বলছে।
মান্ধবী বিপরীতে প্রশ্ন করলো,
“যেই হোক!আপনি জিজ্ঞাসা করার কে?কি প্রয়োজন আপনার তার সাথে?
” প্রশ্নের বিপরীতে প্রশ্ন আমার পছন্দ নয়।” দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলে রায়হান।
“আপনার আমাকে এভাবে প্রতিদিন বিরক্ত করাটাও আমার পছন্দ নয়।” কাঠকাঠ গলায় বলে মান্ধবী

কথাটায় যেনো রায়হান কষ্ট পেলো।তবুও পাত্তা না দিয়ে আবার শক্ত গলায় শোধায়,
“ছেলেটা কে বলো?আমি জানতে চাই কে সেই ছেলে যার সাথে একসাথে ভার্সিটিতে ঢুকো,একসাথে বের হও,রিকশায় ঘুরো,শপিংমলে যাও,রেস্টুরেন্টে যাও! যার সাথে কথা বলতে গেলে তোমার মুখ থেকে হাসি সরেই না।আন্সার মি!”

শেষের কথাটা চিৎকার করে বলে রায়হান।মান্ধবী ভয় পেলেও প্রকাশ করে না।নিজেকে ধাতস্থ করে থেমে থেমে মিথ্যে বলে,
“আমার বয়ফ্রেন্ড।আমরা একে অপরের ভালোবাসি। ”

এই দুটো শব্দ যেনো বজ্রপাত সৃষ্টি করলো।রায়হান নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলো না।মনে হচ্ছে কেউ কানে গরম সীসা ঢেলে দিয়েছে।বুকের ভেতর রক্তক্ষরণ শুরু হয়ে গেছে।ধারাজ গলায় বলে,
“আমার সাথে মজা করো না মান্ধবী।এটা হতে পারে না।”
“আপনার সাথে নিশ্চয়ই আমার মজা করার সম্পর্ক নয়।মজা করার ইচ্ছেও নেই।আপনি জিজ্ঞেস করলেন তাই বললাম।বিশ্বাস করা না করার আপনার ব্যাপার।রাখছি।”
“না না ওয়েট।তুমি আমার সাথে এমন করতে পারো না মান্ধবী।আমি তোমাকে ভালোবাসি। ”

মান্ধবী হেঁসে উঠলো শব্দ করে।তাচ্ছিল্য করে বললো,
“আমি ওতো বলেছিলাম আমি ভালোবাসি আপনাকে?কি করেছিলেন তখন?মনে করিয়ে দিবো?একজন ঠকানোয় আপনি আমার কাছে এসেছেন, আমাকে ভালোবাসেন বলছেন।তাতে আমি কি করবো?আপনাকে মেনে নিবো?এতোটা সস্তা আমি?যাইহোক,আর কোনোদিন আমাকে কল করে ডিস্টার্ব করবেন না।আর হ্যাঁ!রাস্তাঘাটে, বাড়ির সামনেও দাঁড়িয়ে থাকবেন না।বখাটেদের তালিকায় আপনাকে মানায় না।”

বলে কল কেটে দিয়ে কাঁদতে শুরু করে মান্ধবী।রায়হান কিছু বলতে পারে না।কি বলবে!সব দোষ তো তারই।আসলেই কি তার?ইরাকে কি সে বিয়ে করতে চেয়েছিলো?ঐ কিশোরীর পাগ লামী গুলোই তো প্রথম তার জীবনে প্রণয় পুষ্প ফুটিয়ে ছিলো।কিন্তু বাবা-মার সম্মান, এতোদিনের প্রতিশ্রুতি! সে কিছু ভাবতে পারছে না।শুধু ঐ কথাটাই মাথায় ঘুরছে,মান্ধবী আরেকজনকে ভালোবাসে।
মোবাইলটা ছুড়ে মারলো সে।অদ্ভুত হেঁসে উঠে দেয়ালে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে ঘুষি মা র তে শুরু করলো।পাশাপাশি বিলাপ বকছে,
“সব দোষ আমার।ঠিক করেছো মান্ধবী একদম ঠিক করেছো।”

আজ মেহরাদকে হাসপাতাল থেকে নিয়ে যাওয়া হবে।সে এখন বিপদমুক্ত।তাঈফ,নোলক সাহেব এসেছে তার সাথে দেখা করার জন্য।মাহিরা-তাঈফ দেশে এসেছিলো দেড় মাসের জন্যে।দেড় মাস দেখতে দেখতেই চলে গেলো।আগামীকাল রাতে ফ্লাইট। তারা হাসপাতাল থেকেই বিদায় নিয়ে চলে যাবে ঢাকায়।বনলতা বেগমও চলে যাবেন।মেয়ে জামাই এসেছে ভিনদেশ থেকে।কিন্তু ছেলের অসুস্থতার জন্য কিছুই করতে পারেননি তিনি। বিদায়টা দিতে চান,নাহয় খারাপ দেখায়।মেহরাদ-স্রোত আপাতত মেহরাদ সুস্থ হওয়া পর্যন্ত চট্টগ্রামেই থাকবে।মেহরাদের পায়ের চোটের কারণে এখন জায়গা পরিবর্তন করে এতোদূর জার্নি করা ঠিক হবে না।তাই বনলতা বেগম বলেছেন মাহিরা চলে গেলে তিনি আবার এখানে চলে আসবেন।মেহরাদকে হাসপাতাল থেকে ডিসচার্জ করা হবে বিকেলে।সবাই দুপুরের দিকেই বিদায় নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়।

মাহিরা যাওয়ার সময় ভাইকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে ফেলে।বলে,
“ভাই নিজের খেয়ালো রেখো।ছুটি বাড়াতে পারি নি নাহয় তোমাকে এই অবস্থায় রেখে কখনোই যেতাম না।”

ভাইও বোনকে আগলে নেয়।আদুরে স্বরে বলে,
“কান্না করবি না একদম। আই অ্যাম ফাইন।নেক্সট টাইম আসলে আমরা সবাই ট্যুরে যাবো।ঠিক আছে?”

অশ্রুপূর্ণ চোখেই হেঁসে ফেলে মাহিরা।তাদের ভাইবোনের সম্পর্কটা সবসময়ই সুন্দর।আরো অনেক কথা হয় তাদের মধ্যে।
মাহিরা যাওয়ার সময় স্রোতকে জড়িয়ে ধরে বলে,
“স্রোত তুমি সত্যিই খুব মিষ্টি।আমার ভাইয়ের জন্য এই দেড় মাস তুমি যা করলে সত্যিই বলতে হয় আমার মা ঠিক মেয়েকেই পছন্দ করেছে।”

সাথে সাথেই মেহরাদ বলে উঠলো,
“শুধু মা করে নি,আমিও করেছি।আমি জোর করেছি।আমাকেও ক্রেডিট দে।”

মেহরাদের কথায় সবাই হেঁসে উঠে।স্রোত লজ্জায় পরে যায়।এই লোকের সবজায়গায় পাগ লামি করতেই হবে।

সবাই চলে গেলে স্রোত মেহরাদের সাথে কপট রাগ দেখিয়ে বলে,
“আপনি দিন দিন ঠোঁটকা টা হয়ে যাচ্ছেন।সবার সামনে লজ্জায় ফেলে দিলেন।”
স্রোতকে হাত দিয়ে টেনে নিজের কাছে নিয়ে স্রোতের উদরে মুখ ডোবালো।উল্লেখ্য,মেহরাদ বেডে বসা,স্রোত তার পাশে দাঁড়ানো।উদরে নাক ঘষতে থাকতে মেহরাদ।স্রোত শিউরে উঠে।প্রাণ ভরে নি:শ্বাস নিয়ে মেহরাদ মুখ ডুবিয়েই বলে,
“তোমার এই অগাধ ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ আমাকে নির্লজ্জ বানিয়েছে।আরো আরো আরো পাগ ল প্রেমিক বানিয়েছে স্রোত।কি করে পাগ লামি ছাড়ি বলো তো?”

স্রোত মেহরাদের চুলগুলো টেনে দিতে দিতে বললো,
“ছাড়তে হবে না।আপনার পাগ লামীতে আমি অভ্যস্থ মেজর সাহেব।”

বিদায় বেলা ঘনিয়ে এসেছে।সব ব্যাগ গুছানো শেষ।এখন হাসপাতাল থেকে চলে যাবে।ডাক্তার নার্সদের থেকেও বিদায় নেওয়া হয়ে গেছে।তারা শুভকামনা জানিয়েছে।
বের হওয়ার সময় মেহরাদ স্রোতকে বলে,

“স্রোত আমাদের প্রথম সংসার এই কেবিনটায়।ইচ্ছে করছে এখানে থেকে যাই সারাজীবন।এই রুমটায় না আসলে আমার স্রোতস্বিনীর আমার প্রতি অব্যক্ত ভালোবাসা আমি হয়তো কোনোদিন টেরই পেতাম না।আমার ব্যক্তিগত স্রোতস্বিনীর আত্মত্যাগ,স্বপ্ন বিসর্জন,রাত জাগা পরীশ্রম বিসর্জন, আমার যত্ম সব সব এই রুমটায়।এই রুমটা আমাকে তোমায় দিয়েছে এক নতুনরূপে। এই রুমটায় আমার অর্ধাঙ্গিনীর আমার প্রতি সব ভালোবাসার স্মৃতি রয়েছে। দেড়টা মাসের স্মৃতি আজীবন জীবন্ত থাকবে।”

স্রোত স্মিত হেঁসে বললো,
“এই হাসপাতাল, এই কেবিন স্বাক্ষী থাকুক স্রোতস্বিনী তার মেজর সাহেবকে কতটা চায়,কতটা ভালোবাসে!এই কেবিন মেজর সাহেবকে এটাও জানান দিক যে,মেজর সাহেব যেনো আর কখনো তার স্রোতস্বিনীকে এভাবে একা ফেলে না যায়।”

তারপর আরকি!এই যুগল দেড় মাসের যাত্রা শেষ করে বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়।

#চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here