#সুখ_একটি_প্রজাপতি (৭)
অভিনবর অতি নরম চমৎকার ব্যবহার মুগ্ধ করেছে সবাইকে শুধু ঝিল ছাড়া। মেয়েটির মুখে সুক্ষ্ম বিরক্তি। তবে এসব কি পাত্তা দেয় অভিনব? উহু কখনোই না। মেয়েটির এই বিরক্তিই ওর ভালো লাগে। কাছে এলে ঝিল যখন জমে যায় তখন অভিনবর মনে হয় এই তো সেই হিমালয়। যার রূপে পাগল হয়ে নিজেকে উৎস্বর্গ করে দেয় কতশত মানুষ! ঝিলের সাথে কথা বলার মানুষ নেই। সবাই ডুবে আছে অভিনবকে নিয়ে। মেয়েটি দেখল প্রায় সবাই ছবি তুলল অভিনবর সাথে। অবশ্য ঝিল ও তুলত যদি অভিনবর সাথে ওর সম্পর্কটা বাকিদের মত হতো। কিন্তু তেমন কি হওয়ার উপায় আছে? ছেলেটা সেদিন ওমন কান্ড করে বসবে তা যদি ঘুনাক্ষরে ও টের পেত তবে জা ন গেলেও পাত্র পক্ষের নিকট উপস্থিত হতো না। মৌনতা একটু ফুরফুরে মেজাজে। যা মোটেই সহ্য হলো না ঝিলের। এসব যদি ওর ভাই দেখত তবে নিশ্চয়ই কষ্ট পাবে। ঝিল এক কোণে বসে রইল। সোশ্যাল মিডিয়া সবে অন করেছে ওমনি দেখতে পেল ছবিটা।
মৌনতার বাড়াবাড়ি রকমের দাপাদাপির ছবি তুলে পোস্ট করেছে নিয়ন। যা মোটে ও পছন্দ হলো না ঝিলের। কিছু সময়ের মাঝেই কলটা এল। রোহনের গলায় রাগ উপচে পড়ে “কি করছিস?”
“বৃষ্টি হচ্ছে,তাই হোটেলে বসে আছি।”
ঝিল স্পষ্ট বুঝতে পারে ওপাশের মানুষটা ভেঙে গেছে। রোহনের সাথে বয়সের ফারাক ছয় বছর প্রায়। কিন্তু একটা দারুণ অনুভব শক্তি রয়েছে। ঝিল কিছু বলতে চাইছে।
“সাবধানে থাকিস।”
ব্যাস এইটুকুই! ঝিলের বুঝতে অসুবিধা হয় না রোহনের হৃদয়ে এসিড লেগেছে। যা ক্ষ ত তৈরি করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। মৌনতা এদিকেই আসছে।
“চল, বৃষ্টি থেমে গেছে।”
“আমি যাব না। তোরা যা।”
“কেন? তোর আবার কি হলো?”
“ঐ লোকটাকে নিয়ে সবার এত আদিখ্যেতা আমার ভালো লাগছে না। এমন করার কোনো কারণ দেখতে পাচ্ছি না আমি।”
“এটা তো স্বাভাবিক ঝিলি। ওনি অতো বড় একজন ট্রাভেলার। ইন্টারন্যাশনাল পর্যায়ে যার নাম। সব থেকে দারুণ অর্ধ বিদেশী। আমাদের সংস্কৃতি বজায় রেখেছে আমেরিকার বুকে। এত গুলো কারণ। তাছাড়া ওনি নিশ্চয়ই উদার মনের মানুষ। নতুবা শুরুতেই নিজের নাম অভিনব না বলে ইহান বলত। দেশে আসবে তাই লুকটাই চেঞ্জ করে ফেলেছে। বাংলার রূপ নিজের মাঝে ধরার চেষ্টায়। নিশ্চিতভাবে বলা যায় এ দেশ ওনার হৃদয়ের একাংশ।”
পদ্মা নদী নিয়ে কতশত লেখা আছে এর হিসেব নেই। এই নদী যেন কবি,লেখকদের লেখাকে এক ধাপ উপরে তুলে দিয়েছে। পদ্মার স্রোত কখনো কখনো এক রাশ আনন্দ দিয়েছে আবার কখনো বা চোখের জল হয় নেমেছে। অভিনবর সাথে সকলেরই সুসম্পর্ক। ছেলেটা এত মিশুক যে মনেই হয় না অন্য দেশের কেউ। রুদ্রম তো ধরেই নিয়েছে অভিনব ওর নিজর বড় ভাই। এই অসাধারণ ব্যক্তিত্বের জন্যই অভিনবর প্রতি তরুণের এত ভালোবাসা। ছেলেটার উপর ভরসা যেন এক ধাপ এগিয়ে। এই যে এত রকমারি ভালোবাসা। সবটাই বার বার পুলকিত করেছে অভিনবর চিত্ত। তবু কোথাও একটা শূন্যতা। খান খান হৃদয়। ঝিলকে নিয়ে এলো মৌনতা। অভিনব এক পলক তাকিয়ে চোখ নামিয়ে ফেলল। নিয়ন ফের দামাদামিতে মেতেছে। রুদ্রম প্রায় বিরক্ত। নিয়নের ভাষ্যমতে কিছুতেই ঠকবে না সে। অথচ ট্রলার ওয়ালা এত কম দামে পদ্মা ঘুরাবে না। অভিনব এলো। নিয়নের কাঁধে হাত রেখে বলল “আচ্ছা বাদ দাও এসব, যদি সামর্থ্য থাকে তবে একটু টাকা পয়সা বেশি দিলেও ক্ষতি নেই। বরং দুটো ভাত খেতে পারলে দোয়া করবে নিম্ন আয়ের মানুষগুলো।”
কথাগুলো এত ভালো লেগেছে যে নিয়নের আধ ঘন্টা ধরে করা দর, দামাদামির সবটাই ভেস্তে যায়। অভিনবর কথা মতো ভাড়া ঠিক হয় বারো শ। সবাই খুশি শুধু ঝিল ছাড়া। তরুণ আগেই উঠে গেছে। সত্যি বলতে ঝিলের দুটি চোখ যেন জলন্ত দাবানল। রুদ্রম নিয়ন মায়রা আর মৌনতাও উঠে গেছে। বাকি রইল অভিনব ঝিল। সবাই দেখতে পেল ঝিল অনেকটা দূরে দাঁড়িয়ে। অভিনব হাতের ইশারায় বোঝালে সে যাচ্ছে। একটা বিষয় ঝিলের মনে ঘুরপাক খায়। এই যে অভিনব, যে ছেলেটার ব্যক্তিত্ব বড়ই অদ্ভুত। কি এমন কথা হয়েছিল যার জন্য বড় পাপা এত সহজে ছেড়ে দিলেন! এই রহস্যের উদঘাটন হলো না। তার পূর্বেই অভিনব বলল “আমার সাথে অভিমান করে ট্যুর পানসে করে দিচ্ছেন। আসেন আর একটু ও বিরক্ত করছি না।”
মুখে এ কথা বললেও অভিনব ফট করেই ঝিলের হাত ধরে ফেলল। মেয়েটি আকাশ সম অবাক হয়ে বলল “আপনি মাত্রই তো বললেন আমায় বিরক্ত করবেন না।”
“হাত ধরেছি। আর কিছু করেছি কি?”
“ছাড়েন আমার হাত।”
“অন্তত এ জন্মে পারছি না।”
ঝিলের কথা হারিয়ে যায়। মেয়েটির দুটি চোখে ভীষণ জ্বালা। যন্ত্রণায় মস্তিষ্ক টনটন করে। অভিনব ঘাটের কাছাকাছি এসে মেয়েটির হাত ছেড়ে দিল। এখন ঝিল একাই আসছে। অভিনবর উষ্ণ হাতের ছোঁয়া এখনো লেগে আছে। কেমন যেন একটা সুখ মিলে। ঝিলের হৃদয় হতে তপ্ত বাতাস পুরো শরীরে ছড়িয়ে যায়।
“অনুভব করতে থাকুন প্রজাপতি। কথা দিচ্ছি এত বেশি অনুভূতি লেপন করব যা আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না।”
ট্রলার চলবে দুই ঘন্টা। পদ্মার প্রবল স্রোত আর মিহি বাতাসে দোল খাচ্ছে সবাই। এক কোণে কত গুলো লাইফ জ্যাকেট। ঝিল সাঁতার পারে না বিধায় মাঝামাঝি বসেছে। অভিনবর ইচ্ছে করছে ঝিলকে নিয়ে এই পদ্মায় ডু বে যেতে। দুজন মিশে হয়ে যেত একাকার। কিন্ত সেসব তো উটকো কল্পনা। নিজের ভাবনায় নিজেই হেসে ফেলল অভিনব! মায়রা পাশেই ছিল। অনেক সময় ধরে দেখছে অভিনব আর ঝিলকে। দুজনের হৃদয়ে থাকা প্রেমের উষ্ণতা অতি সহজেই অনুভব করতে পারল মেয়েটি। অথচ নিজের জীবনে একটি প্রেম নেই। অবশ্য প্রেম নেই বললে ভুল হবে, প্রেমের সফলতা নেই মায়রার জীবনে। ইষৎ নোনা জলে অস্পষ্ট হয়ে এলো সব কিছু। হাতের তালুতে চোখ মুছে।
“দোস্ত, তোর মন খারাপ?”
“আরে কিসের মন খারাপ। আমি তো সব থেকে বেশি আনন্দে।”
“বুঝি আমি।”
“সব সময় বেশি বুঝিস রুদ্রম। এখন সব কথা বাদ কয়টা ছবি তুলে দে তো।”
রুদ্রম ছবি তুলতে লাগল। মায়রার হৃদয়ে নেমে আসা ঝড় খানিকটা প্রশমিত হয়েছে বোধহয়। বন্ধুদের সাথে থাকলে মায়রা ভালো থাকে। মনে হয় সব না পাওয়ার মাঝেও একটি সুখ প্রজাপতির মতো ডানা ঝাপটাচ্ছে।
ঠান্ডা লাগছে ঝিলের। চিকন বাতাসে বার বার কেঁপে কেঁপে উঠছে। অভিনব বিষয়টা লক্ষ্য করল। তাই কাছে এলো। ওর বলিষ্ঠ দেহ অনেকটাই স্বস্তি দেয়। আরাম লাগছে বিধায় নীরবে কৃতজ্ঞতা জানায়। কিছু সময় যেতেই ঝিল বলল “জা নের মায়া নেই?”
আচানাক এমন প্রশ্নে অভিনব বিস্মিত হয়। একটু সময় নিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করে
“জীবন যেখানে ঠুনকো,সেখানে মায়া করে কি লাভ? তাছাড়া কারো জন্য জান ত্যাগ করতে পারলেও শান্তি।”
“সত্যি?”
“একদম।”
মৌন রইল ঝিল। ট্রলার চলছে। স্রোত আর পানি দুটোই অনেক। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেই বুকের ভেতর অশান্ত হয়ে যায়। ঝিলের মনে হলো অভিনবর বলা কথাটা সত্য নয়। জীবন দেওয়ার মাঝে আসলেই কি শান্তি পাওয়া যায়? এ তো পাগলদের প্রলাপ। আর পাগল কি সুখে থাকে আদৌ?
পদ্মা সেতুর নিচ দিয়ে যাওয়ার সময় প্রায় সকলেই চেচিয়ে উঠে। অভিনব মৃদু হেসে ঝিলের দিকে তাকায়। একদম ই অনুভূতি নেই চোখে। সত্যি বলতে ঝিলের জন্য অভিনবর বুকে ভীষণ দহন। মেয়েটার দুটি চোখ অনেক কিছু বলে। যা অভিনব বুঝে। এই যে ঝিল, পরিবারে একমাত্র মেয়ে সদস্য। পাঁচ ভাইদের আদর পেলেও শূন্যতার পরিমান তো কম নয়। এই শূন্যতা ফুটে উঠে ঝিলের মাঝে। তখন মনে হয় মেয়েটির মতো দূর্ভাগা বুঝি কেউ নেই। আসলেই কেউ নেই। না হলে কেন একই দিনে হারিয়ে ফেলবে তিন মায়ের স্নেহ?
চলবে…
কলমে~ফাতেমা তুজ
**আজ সন্ধ্যায় আমার প্রথম বই “কৃষ্ণচূড়ার বাড়ি” এর প্রি অর্ডার আসবে। ৩০% ছাড়ে কুরিয়ার চার্জ সহ মাত্র ৩০০ টাকা। আশা করি পাঠকরা আশাহত করবেন না।

