হিয়ার_মাঝে ৬৪. #মেঘা_সুবাশ্রী

1
296

#হিয়ার_মাঝে ৬৪.
#মেঘা_সুবাশ্রী ®️

নিশ্চুপ ঠাঁই বসে আছে নুবাহ। চোখমুখেও নির্লিপ্ত ভাব। মুখে জবাব না দিয়ে দীর্ঘ সময় পর বিছানা ছেড়ে উঠল। জিতু নিজমনে হাপিত্যেশ করছে। বউ কি আজ অভিমানে চুপ হয়ে আছে। ফের তাড়া দিল।
‘বোকাপাখি শুনো না, ভাতের সাথে ঝাল কিছু খেতে ইচ্ছে করছে। কিছু একটা বানিয়ে দাও তো। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।’

নুবাহ নীরবতায় আচ্ছন্ন। অথচ ধীর কদমে রান্নাঘরে নিজের পা বাড়ালো। ছটপট কিছু একটা তৈরি করবে। ঘড়িতে অলরেডি রাত ১১: ১০ বাজে। সামান্য তেলের মধ্যে পেয়াজ কুঁচি করে কয়েকটা রসুনের কোয়া আর একটা শীতল শুঁটকি দিল। গুঁড়া মরিচ একটু পরিমাণে বেশি দিল যাতে ঝাল ঝাল হয়। কসানো শেষে সামান্য পানি দিয়ে দশমিনিট বাদেই তার রান্না হয়ে গেল। এত রাতে শুঁটকির গন্ধ শুঁকে শুঁকে রান্নাঘরের সামনে আজমল হাজির। নুবাহকে রান্নাঘরে দেখে মিটমিট করে হাসল। রগড় গলায় বলল,

‘এত রাতে রান্নাঘরে কি করছো মা?’

নুবাহ শ্বশুরকে দেখে মুচকি হাসল। আমতা আমতা করে বলল,
‘আপনার ছেলে বলল ও ঝাল কিছু খাবে। তাই সামান্য শুঁটকির ঝাল রান্না করলাম।’
‘ভালোই, ওকে খাইয়ে শুয়ে পরবে জলদি। কাল থেকে তাড়াতাড়ি বাসায় আসতে বলবে। দেরি করলে রাতের খাবার একদম বন্ধ বলে হুমকি দেবে, বুঝলে মা।’

নুবাহ আচ্ছা’ বলে মাথা নাড়ালো। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি আজমলের। ছেলেটার জন্য একদম যোগ্য বউ এনেছে। হাসিমাখা মুখে সে নিজের রুমে ফিরল। মনের মাঝে প্রশান্তির বাতাস বইছে। ছেলেটা ভালো আছে। এতেই শান্তি। ফরিদা মাত্রই ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। আজমলের এমন হাসিমাখা মুখ দেখে কিঞ্চিৎ অবাক হল। ব্যগ্রকন্ঠে বলল,
‘কি ব্যাপার! এত মিটমিট করে হাসছো কেন?
‘খুশিতে হাসছি পরিবানু। ছেলেদের সুখ দেখলে মনটা খুশিতে নাচে। বুঝলে পরিবানু।’

ফরিদা অবাক হল না। বুঝল জামাই তার কিসের কথা বলছে। এত রাতে রান্নার গন্ধ পেয়েই সেও বুঝেছে। তার জিতু মাত্রই ফিরেছে। ছেলেটা তার স্বভাব পরিবর্তন করেনি। তার ঝাল কিছু চাই। এত ঝাল খেতে পারে বাবার মত। তার বাবাও এমন করত। সেসব ভেবে চোখ ছলছল করে উঠল। সময় কত দ্রুত চলে যায়। তাদের সংসার জীবনের
একত্রিশ বছর পার হয়ে গেছে। অথচ সে টেরই পায়নি।

টেবিলে খাবার না দিয়ে নুবাহ রুমে নিয়ে আসল। জিতু মাত্রই গোসল সেরে বাইরে বেরিয়েছে। এর মাঝে খাবার রেডি দেখে অবাক। বউ তার কত দ্রুত রান্না করে ফেলেছে। নিজমনে খুশিই হল। তবে শুঁটকির ঝাল দেখে আরও বেশি খুশি হল। বউ একদম মনের মত রান্না করেছে আজ। দেখেই জ্বিব লকলক করছে। তড়িঘড়ি বসল সে। চেয়ারে বসতেই নুবাহ রুম থেকে বেরিয়ে গেল। জিতু ফের অবাক হল। বউ কি এখনও অভিমান ভাঙেনি। তড়িৎ ছুটল নুবাহর পিছু। জলদি গিয়ে হাত ধরে টান দিল। গলার স্বর নরম করে বলল,

‘এভাবে খাবার রেখে কোথায় যাচ্ছো? তুমি না থাকলে আমি কিভাবে একা একা খাবার খাব।’ নিজের ডানহাত উঠিয়ে ব্যান্ডেজ করা দুটো আঙুল দেখালো।
‘দেখ বউ আমার ডানহাতের দুটো আঙুল ব্যান্ডেজ করা। এখন ভাত কিভাবে খাব? তুমিই বল।

নুবাহ আৎকে উঠল মুহুর্তে। নিজের অভিমান জল হয়ে গড়িয়ে গেল তৎক্ষণাৎ। তবে অভিমান কমলেও কপট রাগ চোখমুখ জুড়ে। মুখে জবাব না দিয়ে চেয়ার টেনে বসল জিতুর পাশে। নিজের হাতে ভাত মাখিয়ে তার মুখের সামনে ধরল। জিতু মুখে খাবার নিচ্ছে আর মিটমিট করে হাসছে। অবশেষে বউয়ের রাগ ভাঙানোর জন্য এই ব্যান্ডেজ তাহলে কাজে আসল। যাক বাবা আঙুল কাটলেও তার কষ্ট নেই। এবার থেকে দরকার হলে মাঝেমধ্যে সে হাত-পা ভেঙে আসবে। বউয়ের রাগ ভাঙানোর জন্য এইটুকু কাজ সে করতেই পারে। ভেবেই নিজমনে শান্তি পাচ্ছে। বউ তার একটু হলেও রাগ কমিয়েছে। সে নিশব্দে খেয়ে নিচ্ছে বউয়ের হাতে। অথচ নুবাহ আঁড়চোখে দেখছে জিতুর ব্যান্ডেজে মোড়ানো দু’আঙুল। এতটা কেটেছে। কিন্তু এতক্ষণ সে দেখেনি। কত বড় অপদার্থ বউ সে।
___

ভার্সিটিতে পা রেখেই অবাক নুবাহ। আজ তার জন্য তমা দাঁড়িয়ে আছে আগে থেকেই। ভালো লাগল ব্যাপারটা। নিজের ক্লাসরুমে প্রবেশের পূর্বেই তাসনিহা হন্তদন্ত হয়ে তার সামনে আসল। অবাক হল দু’জনকে একসাথে দেখে। বিতর্কের দিন তাদের দু’জনের মান-অভিমানের কান্ডের কথা অনেকেই জানে। তাই তাসনিহা রাখঢাক না রেখেই বলে উঠল,
‘তোমরা দুজন মিলে গেছো? রাগ ভেঙে গেছে তাহলে?’

তমা হাসল। নুবাহর একহাত চেপে ধরে বলে উঠল, ‘রাগ তো কখনই ছিল না। যেটা ছিল, তা শুধু অভিমান। এখন সেটাও পানি হয়ে গেছে। বন্ধুত্বে বেশিদিন মান-অভিমান থাকা ঠিক না, তাহলে সেটা বন্ধুত্বই নয়, বুঝলে।’

তাসনিহাও হাসল। আসলে বন্ধুত্ব তো এমনই হওয়া উচিৎ। নয়ত বন্ধুত্বের সৌন্দর্য কোথায়! রগড় গলায় সেও জবাব দিল,
‘যাক বাবা, শুনে খুশি হলাম।’

ঈষৎ হাসি ঝুলছে তমার অধরকোণেও। নুবাহ তাসনিহা থেকে বিদায় নিয়ে নিজের ম্যাথ বিভাগে ফিরে গেল। নিজের ক্লাসে ফিরবে, তার আগেই কেউ একজন তার মুখ চেপে ধরেছে পেছন থেকে। জনমানবহীন ক্লাসরুম, সেই রুমে তাকে টানতে টানতে নিয়ে এল। তমা চিৎকার দেওয়ার মত অবস্থায় নেই। তার মুখ আবদ্ধ কারও বলিষ্ঠ হাতের আঙ্গুলের ভাঁজে।

নুবাহ ক্লাসে ফিরতেই নিরবের সাথে দেখা। তাকে দেখে কেমন বিচলিত মনে হল। সে কিঞ্চিৎ অবাক হল। মুখ কুঁচকে বলে উঠল,
‘কি ব্যাপার! মুখটারে তুই এত আন্ধার করে রাখলি ক্যান?’

নিরব মুখে আক্ষেপের সুর তুলল।
‘আর বলিস না, ল্যাব পরীক্ষা কাল। অথচ আমার প্রস্তুতি ভালো না। কি করব বুঝতেছি না।’
নুবাহ ধমকের সুরে বলে উঠল, ‘এত হতাশ হওয়ার মত তো কিছুই দেখছি না আমি। না পারলে দিবি না, কাহিনী খতম। তাই বলে এত হা হুতাশ করে লাভ আছে।’
নিরবও সায় দিল, ‘তা অবশ্যই ঠিক।’

তাসনিহাও নিরবকে বুঝাল হাপিত্যেশ না করার জন্য। ক্লাস করার জন্য মাত্র বই খুলল নুবাহ। কিন্তু বই খুলে অবাক। বইয়ের মাঝে ছোট্ট এক চিরকুট। তাসনিহা, নিরব ক্লাসে অন্য বিষয় নিয়ে মগ্ন। তাই নুবাহর দিকে তাদের ধ্যান নেই। নুবাহ চিরকুট খুলে দেখতে লাগল। হাতের লেখা নয়, কম্পিউটারে টাইপিং করা একটা সাদা কাগজ।

‘প্রিয়,
বসন্তের আগমনের মতই স্নিগ্ধ তুমি। কেমন আছো আমার স্নিগ্ধময়ী? কিন্তু আমি ভালো নেই। খুব শীঘ্রই আসছি তোমার কাছে।’

মাত্র দু’বাক্যে। নামবিহীন চিরকুট দেখে পুরাই থ’ নুবাহ। চিরকুট হাতের মাঝে মেলে রেখে ভাবনায় মগ্ন হল সে। তাসনিহার আচমকাই চোখ পড়ল নুবাহর চিরকুটের উপর। সে নুবাহর হাত থেকে চিরকুট নিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘এটা কার, কে দিয়েছে নিশাত।’

নুবাহ চুপচাপ ভাবনায় নিমজ্জিত। ঠোঁট উল্টিয়ে জবাব দিল,
‘জানি না কার? কিন্তু আমার বইয়ের ভেতরে পেয়েছি।’

তাসনিহা উল্টো পালটে দেখল কিছুসময় ধরে। সহসাই নিরবেরও চোখ পড়ল চিরকুটের দিকে। হুট করে বলে উঠল,
‘এটা কে দিয়েছে তোমাকে?’
তাসনিহা বলে উঠল, ‘এটা আমার নয়, নিশাতের।’

মুহুর্তে নিরবের চোয়াল শক্ত হল। নিশাতকে কে আবার চিরকুট দিল। সে চোখমুখ কুঁচকে নুবাহর দিকে তাকাল। জিজ্ঞেস করল,
‘কে দিয়েছো চিরকুট, জানো তুমি?’
নুবাহ না’ বলে মাথা নাড়ালো। নিরবের মন বিচলিত হল। কে আবার তার পথের কাঁটা হতে চাই। অথচ নুবাহ ভাবনাহীন। চিরকুট প্রেরককারী যে হোক, এসব নিয়ে এখন মাথা ঘামানোর সময় নেই তার। কাল তার ল্যাব পরীক্ষা। তা নিয়ে চিন্তিত।
__

বসন্তের আগমন প্রকৃতিতে মাত্রই। কোকিলের কুহুতান যেন আরও মোহনীয় করে রেখেছে তা। সকালের মিষ্টি ঝলমলে রোদের আলোয় একাকি হলে ফিরছে মুবিন। পথিমধ্যে তার মুঠোফোন কর্কশধ্বনি তুলল। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে এক উচ্ছ্বসিত হাসির শব্দ ভেসে এল। ঘটক কল দিয়েছে। তার মেঝোবোন মিলিকে তাদের পছন্দ হয়েছে। এখন পাকাপোক্ত কথা বলতে চায়। বিয়ের ডেট কবে হবে তা নিয়ে দু পরিবার যেন জলদি কথা বলে। মুবিন এসব শুনে যেন প্রান ফিরে পেল। অবশেষে তার বোনের বিয়ের সানাই বাজবে। এর থেকে খুশি আর আছে নাকি। সেও রগড় গলায় জবাব দিল,

‘আলহামদুলিল্লাহ, চাচাজান আমি এক্ষুনি বাড়িতে কল দিয়ে জানাচ্ছি। আর দ্রুতই দু পরিবার বসে কথা বলমু, ইনশা’আল্লাহ।’

ঘটক খুশি মনে কল কাটল। মুবিনের চোখমুখে উচ্ছ্বাস, সে আজ ভীষণ খুশি। এই খবর দ্রুতই বন্ধুমহলে দিতে হবে।
__

ঘরের মাঝে চিৎকার চেঁচামেচিতে মাথা ঘুরছে জুঁইয়ের মায়ের। মাথা চেপে বসে আছেন তিনি। আরফান সেই সকাল থেকেই চেঁচিয়ে যাচ্ছে। আজ কি উত্তর দেব তাই জানতে এসেছে। নয়ত সে থানায় যাবে মা-বোনের বিরুদ্ধে মামলা দেবে। তখন আর বলতে পারবে না সে আগে সতর্ক করেনি তাদের। টগর মাত্রই কলেজ থেকে ফিরেছে। মা-ভাইয়ের তর্কাতর্কি শুনেছে সে। তাই চোখমুখ শক্ত করেই ঘরে প্রবেশ করল। আরফান বোনকে দেখে আরও তেতে উঠল। তাকে শুনানোর জন্য ইচ্ছে করেই বলল,

‘বড়টা তো বুড়ি হচ্ছে, সাথে ছোটটারে বুড়ি বানাচ্ছে। বিয়েশাদি এদের কারোর দরকার নাই। দু’জনেই বাপের ভিটের মধ্যে বসে থাকুক। আর সে ছেলে হয়ে মানুষের বাড়িতে আশ্রয় থাকবে।’

টগরের গা রি রি করে উঠল। কিন্তু শুধুমাত্র আজ তার বোনের জন্য চুপ আছে। জুঁই নিজের রুমে বসে থেকেই ভাইয়ের সব কীর্তিকলাপ শুনে যাচ্ছে। সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে, এবার সে বিয়ে করবেই। পাত্র যেমনই হোক, শুধু বিয়ে করে এই বাড়ি ছাড়তে হবে জলদি। ভাই তার খুশি থাকুক অন্তত তার বিদায়ের জন্য।

চলবে,,,

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here