কার্নিশ_ছোঁয়া_অলকমেঘ লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা ২৬.

0
382

#কার্নিশ_ছোঁয়া_অলকমেঘ
লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা

২৬.

‘খোলা চোখ খানা করো বন্ধ, বাতাসে ঠান্ডা গন্ধ
বয়ে বেরায়, ঘরেরও বাহিরে…
আসো ছোট্ট একটা গান করি যাতে
ঘুম পাড়ানি মাসী এসে,
পাশে বসে, হাতখানা, দেবে কপাল ভরে…
ভয় নেই আছি পাশে, হাতখানা ধরে আছি হেসে
কোলেতে আমার মাথা, তোমার…
অন্ধকার রাত নিশ্চুপ সব,
জোনাকির দল আজো জেগে আছে
তারা হয়তো অপেক্ষায় তোমার ঘুমের।
হাতে রেখে হাত দেখে ঘরি, বসে অপেক্ষা করি
কবে হবে কাল, ফুটবে সকাল…
আয় ঘুম চুম্বন দে, তার সারা কপালে
যাতে ঘুম আসে সব নিশ্চুপ, হয়ে যায়…
আয় চাঁদ মামা কাছে আয়,
যাতে অন্ধকার না হয়…
আলোমাখা কপালেতে টিপ টা দে যাতে
কিছু আলোকিত হয়।
সে যাতে ভয়, না, পায়…’

তাথৈয়ের বন্ধ চোখের কোনা বেয়ে জল গরালো। সারাদিনের সব ভীড় কলরব ঠেলে, একটুখানি স্তব্ধতা পেলে যে সুখটা অনুভূত হয়, সে সুখের কান্না। একাকীত্বের সুখ। কিন্তু ওর একাকীত্বকে ছাপিয়ে হঠাৎই কেউ বলে ওঠে,

– ব্রেকিং নিউজ! সমুদ্র দেখে গাইয়ে হয়ে গেলো তাথৈ আলফেজ! গহীন রাতে তার গান শুনে উচ্ছ্বাসিত হচ্ছে আকাশবাতাস, কল্লোলে ফেটে পরছে সুগন্ধা পয়েন্টের ঢেউয়েরা!

তাথৈ অন্যদিক ফিরে চোখের জল মুছলো। পাশ ফিরে, চেনা স্বরধারীকে দেখে অবাক হলো না ও। পরনে আকাশীরঙা শার্ট, গোটানো জিন্স, পায়ে স্যান্ডেল আর ঠোঁটে সেই চিরন্তন হাসিবহুল মানুষটা। তাশদীদ। ফজরের পর এদিকটা দেখে গিয়েছিলো তাশদীদ। রাতের দৃশ্যটা দেখবে বলেও ঠিক করে গিয়েছিলো। তাই এখন আসা। তুলনামুলক কম কোলাহল পুর্ণ জায়গাটায় অসময়ে নারী অবয়ব দেখে ওর কৌতুহল জাগাটা যেমন, ও তেমনটাই স্বাভাবিক ছিলো তাথৈকে দেখার পর। বিন্দুমাত্র অবাক হয়নি ও। কেননা ও জানে, অসময়ে একাকী সমুদ্রতীরে দাড়িয়ে থাকার সাহসটা তাথৈয়ের আছে। তাশদীদ দুহাতের তালু ঘষে বললো,

– একটা ইউটিউব চ্যানেল না থাকায় আজকে সত্যিই আফসোস হচ্ছে! থাকলে পরে তোমার গান লাইভ ব্রডকাস্ট করতাম। ‘তুমি গান গাইছো!’ এমন তোড়ফোড় নিউজ থেকে মানুষজন বঞ্চিত হলো বলো? নাহ! ব্যাপারটা ঠিক হলো না। মোটেও ঠিক হলো না!

তাশদীদ আফসোসে ‘স্তু স্তু’ আওয়াজ করলো। তাথৈয়ের রাগটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো এবারে। পরিপুর্নভাবে তাশদীদের দিক ফিরে হাতের মোবাইলটা তুলে ধরলো ও তাশদীদের সামনে। তাশদীদ ভ্রুকুচকে তাকালো। তাথৈ ক্ষিপ্ত কন্ঠে বললো,

– ইয়াহ! ক্রেডিট গোজ টু আপনার অশ্রুতপূর্ব, অদৃষ্টপূর্ব, অভূতপূর্ব সিনারিও। এসবের কথাই বলেছিলেন না আপনি? দিজ? টোটাল ওয়েস্ট অফ মাই টাইম!

ফোনটা হাতে নিলো তাশদীদ। আজকে ওরা যেখানে যেখানে ঘুরেছে, হিমছড়ি পাটুয়াটুলি, কলাতলী বিচ, সবকিছুর ছবি তাথৈয়ের ফোনে। কিন্তু ছবিগুলোতে না আছে প্রকৃতি, না আছে প্রাণ। কেবল মানুষজনের ভীড়। অবশ্য সেটাই বাস্তবতা। পর্যটকদের ভীড়ে জায়গাগুলো সবসময় ভরাট। সমুদ্রের পানিতে ভেজা, ঝড়নায় গোসল, তীরে বাইক ড্রাইভ, প্যারাশুটিং এগুলোতে কেউ নিজেকে না জড়ালে ট্রিপ কি করে উত্তেজনাপুর্ন হয়? আর তাথৈ এগুলোর কোনোটাতেই আগ্রহ দেখায়নি। তাশদীদ খেয়াল করেছে, ও কেবল রোবটের মতো সবার সাথে গিয়েছে, চুপচাপ আশপাশ দেখেছে, খাবারটা খেয়েছে। এই ওর ট্যুর! ছবিগুলো দেখতে দেখতে তাশদীদ মৃদ্যু হাসলো। তাথৈ ততোক্ষণে রাগে ফুসছে। বুকে হাত গুজে উল্টোপাশ হয়ে দাঁড়িয়েছে ও। কি ভেবে এগিয়ে গিয়ে তাথৈয়ের পিঠ ঘেষে দাড়ালো তাশদীদ। ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে বললো,

– জুতা খোলো তাথৈ।

পিঠে ছোঁয়া অনুভব করতেই চমকে ওঠে তাথৈ।
কানের ওপর উষ্ণ নিশ্বাস টের পেয়ে পিছন ফিরতে যাচ্ছিলো ও। কিন্তু পারলো না। বাধা পেলো পায়ে। পেছন থেকে তাশদীদ ওর কেডসের ওপর পারা দিয়ে দাড়িয়েছে। তাশদীদ ওর এতোটাই কাছে দাড়ানো যে, ওর পিঠ ঠেকেছে তাশদীদের বুকে। তাথৈ ঘাড় কিঞ্চিৎ ঘুরিয়ে শক্তভাবে বললো,

– হুয়াট ইজ দিস ননসেন্স নাও?

– টু মেক ইউ সেন্স আবাউট দ্যাট ওয়েস্ট অফ টাইম।

– কি করছেন টা কি! লিভ মি ড্যাম ইট!

– লিভ ইওর শুজ।

– হোয়াট দ্যা…আপনি চাইছেন আমি সিন ক্রিয়েট করি?

– সিন অলরেডি ওপরওয়ালা ক্রিয়েট করে দিয়েছে। আর সেই সিনে আপাতত আমি আর তুমি ছাড়া কেউ নেই। এখন একপাও সরতে চাইলে, জুতা খোলো।

জেদ করে ওভানেই দাড়িয়ে রইলো তাশদীদ। আজও তাথৈ হার মানলো। রাগ নিয়ে জুতা খুললো ও। পা রাখলো বালুকাময় তীরে। কোনোদিক না তাকিয়ে চলে আসতে যাবে, তাশদীদ বলে উঠলো,

– ফোনটা?

তাথৈ পেছন ফেরে। তাশদীদ একটা হাসি দিয়ে ফোনটা ওরদিক বাড়িয়ে দিলো। ফোন নেওয়ার উদ্দেশ্যে হাত বাড়ালো তাথৈ। হাসি বর্ধিত হয় তাশদীদের ঠোঁটের। নিজের পায়ের স্যান্ডেলটা খুলে একপা দু পা করে পেছোতে শুরু করে ও। তাথৈ বুঝলো, ওকে জ্বালাতে ইচ্ছে করে পেছোচ্ছে তাশদীদ। ফোন নেবার উদ্দেশ্যে কয়েকপা এগোলো তাথৈ। তাশদীদ শব্দ করে হেসে দিয়ে ছুট লাগালো এবারে। তাথৈ নিজেও আর সাতপাঁচ ভাবেনা। ছুটতে শুরু করে তাশদীদের পেছন পেছন। তাশদীদ আরেকটু তীরে এগোলো। যেটুকোতে ঢেউ এসে পা ছুইয়ে ফিরে যায়। কয়েকবার বাক নিয়ে তাথৈকে ঘোরাতে লাগলো একজায়গাতেই। রাগের বশে তাথৈ উবু হয়ে আজলাভরা পানি তুলে ছুড়ে মারলো তাশদীদকে। তাশদীদ যেনো আরো উদ্দীপনা পায়। ওউ পানির ছিট লাগালো তাথৈকে। তাথৈ হাত দিয়ে নিজেকে আড়ালের চেষ্টা করতে থাকে। সাথে তাশদীদকেও ভেজানোর চেষ্টা করতে থাকে। সমুদ্রতীরের আবছা আলোতে দেখা যায় একজোড়া ছায়া মানব-মানবী ছুটছে, একে ওপরকে ভেজাচ্ছে। তাদের দুরন্তপনার সঙ্গ দিচ্ছে মিটমিটিয়ে আলোভরা আকাশ, শনশনে আওয়াজে জেলেনৌকার পাল দোলানো বাতাস, আর গর্জন করে তীরে আছড়ে পরা ঢেউ।

তুল্য কানে হেডফোন দিয়ে তীর দিয়ে হাটছিলো। মুলত মোবাইলে তোলা আজকের ছবিগুলো দেখছিলো ও। ছবি বলতে, লুকিয়ে চুরিয়ে তোলা শার্লির ছবি৷ সকালবেলা হিমছড়ি ঝর্ণার উদ্দেশ্যে যখন ও হোটেলের সামনে দাড়িয়ে ছিলো, কালো হুডি-প্যান্ট পরিহিত, মাথায় কাপড় বাধা শার্লিকে দেখে কিছু তো একটা হয়েছিলো ওর৷ ঘোরাঘুরির পুরোটা সময় ও শার্লির আড়ালে আড়ালে থেকে ওকে দেখেছে, ছবি তুলেছে। ছবিগুলো দেখতে দেখতে আপনামনে হাসছিলো তুল্য৷ হঠাৎই তাথৈয়ের উল্লাসী আওয়াজ কানে আসে ওর। ফোন থেকে চোখ তুলে দুরে তাকালো তুল্য৷ আর তাতে যা দেখলো, ওর নিজের চোখকেই বিশ্বাস হচ্ছিলো না ওর। দুপা এগিয়ে, চোখ ছোটছোট করে আবারো পরখ করলো দৃশ্য৷ না! ও ভুল দেখেনি। তাথৈ সমুদ্রের ঢেউয়ের সাথে ছোটাছুটি করছে। হাসছে৷ একটু সময় নিয়ে পাশের পুরুষালী অবয়বটাকেও চিনে নিলো তুল্য। ওটা তাশদীদ। তুল্যর ঠোঁটে হাসি ফোটে। কিন্তু চোখে রয়ে যায় বিস্ময়ের রেশ। কি ভেবে, উল্টোদিকে পা বাড়ালো ও।

কয়েকপা দুরে তুল্যকে দেখে দৌড়ের গতি কমে আসে আলোর। থেমে গিয়ে ভয়ে ও শুকনো ঢোক গিললো একটা। রাতের খাবার সেরে তাথৈ বলেছিলো একটু দরকার আছে ওর, বেরোবে। এরপর তাথৈ আর রুমে ফেরেনি। ওরা ক্লান্ত ছিলো, কখন ঘুমিয়ে গেছে টেরই পায়নি। কিন্তু ঘুম ভাঙার পর তাথৈকে না দেখে ভয় পেয়ে যায় আলো। শার্লিকে ডেকে হোটেলে খুজতে বলে আলো নিজেই বিচে চলে এসেছে তাথৈকে খুজতে। আর কাউকে জানানোর সাহস হয়নি আলোর। ও জানে, তুল্য তাথৈকে যতোটা জ্বালায়, আড়ালে আড়ালে তারচেয়ে বেশি যত্নও করে। এসময় তাথৈ হোটেলে রুমে নেই, সেটা শুনলে আকাশপাতাল একে করে দিতে তুল্য দুবার ভাববে না। আলোকে অসময়ে বিচে দেখে, ওমন ভয় পেতে দেখে তুল্য বললো,

– এতোরাতে এখানে কি?

– ও্ ওই আসলে…

– তোমাকে ভীতু ভেবেছিলাম। এই এতোরাতে একা একটা মেয়ে হোটেল থেকে বেরিয়েছো, এতো সাহস কোথায় পেলে তুমি?

আলোর ভয় বাড়তে থাকে। যে ছেলে ওকে বেরোনো নিয়ে এতো কথা শোনাচ্ছে, তাথৈ ঘরে নেই জানলে আর কি কি বলবে ভাবতেই ভয়টা তরতর করে বাড়তে লাগলো ওর। কিন্তু না বললে তো তাথৈকে খুজে পাওয়া যাবে না। এখন দেখা যখন হয়েছেই, আলো সিদ্ধান্ত নিলো তুল্যকে সত্যটা বলবে। সাহস সঞ্চার করে কোনোমতে বললো,

– ত্ তাথৈ রুমে নেই তুল্য। আমি ওকে খুজতেই বেরিয়েছি।

বলে দিয়ে তুল্যর প্রতিক্রিয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলো আলো। কিন্তু ওকে অবাক করে দিয়ে চুপ রইলো তুল্য। স্বাভাবিক গলায় বললো,

– আছে ও ঠিকঠাক। তুমি হোটেলে ফিরে যাও।

স্বস্তির শ্বাস ফেললো আলো। কিছু একটা মনে পরতেই আবারো বললো,

– কোথায় গেছে ও? তোমার কথা হয়েছে ওর সাথে?

– আমার বোনের টেককেয়ার আমি করে নেবো। তোমাকে এতো ভাবতে হবে না।

আলো ভেতরেভেতরে তীব্র কষ্ট অনুভব করলেও চেহারায় তা প্রকাশ করলো না। মৃদ্যু হেসে মাথা নিচু করে নিলো ও। অকস্মাৎ হাসির আওয়াজ কানে আসে ওর। আলো সেদিকে লক্ষ্য করতে যাবে, তার আগেই তুল্য ওর হাত ধরে ফেললো। ওকে নিয়ে হাটা লাগিয়ে বললো,

– অনেক রাত হয়েছে। চলো এখান থেকে।

সবটুকো মনখারাপ সুখের পায়রা হয়ে আলোর মনজুড়ে উড়তে শুরু করে দেয় যেনো। তুল্য সামনে থেকে ওর হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, পেছন থেকে ওরদিক একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে পা বাড়িয়েছে আলো। ওর বিশ্বাস হয় না, তুল্যর এইটুকো ছোঁয়া ওর ভাগ্যে ছিলো। সমুদ্রপাড়ের কোনো এক ঝুপড়ি দোকান থেকে টুংটাং আওয়াজ ভেসে আসছে। আলোর বেখেয়ালী মনটাও হয়তো তার তালেতালে বলছে, ‘সময় তুমি থেমে যাও। সময় তুমি থেমে যাও।’

তাশদীদ তাথৈয়ের ছোড়া পানি থেকে নিজেকে বাচানোর চেষ্টা করছিলো। কিন্তু অকস্মাৎ ওর চোখে পরে, তাথৈ হাসছে। ও ভুলে গেছে, ও ওর পেছনে ছুটছিলো, রাগ নিয়ে ছুটছিলো। গায়ে আসা ছিটেফোটা পানিকনার শিরশিরে অনুভূতিতে তাথৈ হাসতে শুরু করেছে। এখন সে রাগ না, উল্লাসে তাশদীদকে পানি ছুড়ছে। তীরে আসা ঢেউয়ের সাথে ছোটাছুটি করছে। কোথাও ঢেউ নেমে গেলে, ঝিনুক খুজতে সেদিকে দৌড়াচ্ছে। তাশদীদ থামলো। কিঞ্চিৎ ঘাড় বাকিয়ে, কোমড়ে দুহাত রেখে চেয়ে রইলো উচ্ছ্বল তাথৈয়ের দিকে। তাথৈয়ের সাদা রঙের কুর্তার নিজের দিকে পানির ছিটেফোটা, টাইট জিন্সটা ভাজ দিয়ে গিরার ওপর অবদি ওঠানো, সেটাও কিছুটা ভিজে গেছে, ফর্সা পা জোড়ায় কাদাবালি লেগেছে। তাথৈ কিছু একটা পেয়ে উত্তেজিত হয়ে গেছে। দুহাতের আজলায় সেটা নিয়ে ছুটে আসলো ও তাশদীদকে দেখাতে। কিন্তু তাশদীদের কাছে আসতে আসতে আঙুলের ফাঁকে পরে যায় পানিটুকো। তাথৈ ঠোট উল্টে হয়ে আবারো ছুটলো সমুদ্রের দিকে। সেখানে গিয়ে আবারো মুঠোতে পানি নিয়ে ইশারায় ডাকলো তাশদীদকে। তাশদীদ হাসলো৷ মৃদ্যুবেগে দৌড়ে গিয়ে দেখে তাথৈয়ের হাতের পানিটুকো জ্বলছে। তাথৈ উল্লাসে বললো,

– সুন্দর না?

তাশদীদের চাওনি প্রসারিত হয়। তাথৈকে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বুঝিয়ে, ঢেউগুলো দেখতে লাগলো ও। বেশ কয়েকটা ঢেউ পরপর এমন উজ্জ্বল ঢেউ তীরে আসছে। তাশদীদ আশপাশ তাকিয়ে দেখলো, লোকজনের আনাগোনা নেই। পানি নেওয়ার মতো পলিথিন, বোতলজাতীয় কিছু খুজলো ও। পেলো না। সারাদিনের ময়লা সব সরিয়ে ফেলা হয়েছে তীর থেকে। তাশদীদ তাথৈয়ের দিকে তাকিয়ে দেখে, সে কেবল ঢেউয়ের সাথে খেলতে ব্যস্ত। দিনদুনিয়া সব ভুলে গেছে সে। মুচকি হেসে নিজের ফোনে ওর ছবি তুললো কয়েকটা। ছবিগুলোতে তাথৈ যেনো পানি না, কোনো আলোকীয় বিচ্ছুরন ছুড়ে মারছে। তাশদীদ গিয়ে তাথৈয়ের কেডস নিয়ে আসলো এবারে। কিছু পানি, আর বালি কেডসে তুলে তাথৈয়ের সাথে নিজেও উজ্জ্বল ঢেউয়ের অপেক্ষা করতে লাগলো। তিনচারটা ঢেউয়ের পর আর উজ্জ্বল ঢেউ আসছিলো না। তাথৈ উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছিলো। তাশদীদ ওর অপেক্ষা দেখে বললো,

– আর আসবে না।

– কিন্তু…

– অনেক রাত হয়েছে তাথৈ। হোটেলে ফিরবে চলো।

তাথৈ চকিত চোখে পাশে তাকালো। যেনো এতোক্ষণে হুশে ফিরেছে ও। তাশদীদ বেশ স্বাভাবিকভাবে ওর দিকে তাকিয়ে। শশব্যস্তের মতো চতুর্দিকে চোখ বুলালো তাথৈ। কোথায় ছিলো ও? কোথায় এসেছে? কেনো এসেছে? এখানে কি করছিলো ও? বিস্ময়ে বললো,

– এ্ এসব…এসব কি ছিলো?

– বায়োলুমিনেসেন্স।

তাথৈ নিজের কপাল চেপে ধরে। ও জানে বাংলাদেশে বায়োলুমিনেসেন্স হয় না। অথচ আজ ও যা দেখলো…তড়িঘড়ি করে প্যান্টের পকেট চেইক করে ও। তাশদীদ একপা এগিয়ে ওর দিকে ওর ফোনটা বাড়িয়ে দিলো। তাথৈ হতাশ হয়ে ‘শিট’ উচ্চারন করলো। তাশদীদ বললো,

– ছবিতে ক্যাপচার করলেই মোমেন্ট আনফরগেটএবল হয়ে যায় না তাথৈ। পারিপার্শ্বিক অনুভব করতে শেখো। অনুভবেই সর্বোচ্চ সুখ।

তাথৈ চুপ করে তাকিয়ে রইলো তাশদীদের দিকে। তাশদীদ ওর খালি পায়ের দিকে তাকালো। সমুদ্রের ঢেউ ওর পা ছুয়ে দিয়ে যাচ্ছে। তাশদীদ মুচকি হেসে বললো,

– চোখ বন্ধ করে এই ঢেউয়ের ছোঁয়া অনুভব করো, বড়বড় শ্বাস নাও এই স্নিগ্ধ-শীতল বাতাসে, ঢেউয়ের গুর্জন শোনার চেষ্টা করো। এন্ড ট্রাস্ট মি, তোমার সব প্রশ্নের জবাব সেখানে তাথৈ। এ সবটাই তোমার জন্য অভূতপুর্ব, অদৃষ্টপূর্ব, অশ্রুতপূর্ব।

তাথৈ তেমনই নিস্পলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো। তাশদীদ এগিয়ে এসে ওর চোখের সামনে হাত বুলালো। মন্ত্রপুতের মতো চোখ বন্ধ করে নেয় তাথৈ। ওর হাত ধরে ওকে সমুদ্রমুখী করে দাড় করিয়ে তাশদীদ হাত ছেড়ে দুলো ওর। নিজেও বুকে দুহাত গুজলো। একদৃষ্টিতে চেয়ে রইলো বিশাল জলরাশির দিকে।
তাথৈ চোখ বন্ধ করে আছে। হিমশীতল বাতাস গা ছুইয়ে দিচ্ছে ওর। লবনাক্ত জল ওর পা ছুইয়ে দিচ্ছে। বন্ধ চোখজোড়ায় অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো জবাব পেয়ে মৃদ্যু কেপে উঠলো তাথৈ। তৎক্ষনাৎ চোখে খুলে তাশদীদের দিকে তাকালো ও। কি হলো, নিজেকে আর স্থির রাখা হয়ে উঠলো না ওর। একপা দুপা পিছিয়ে, ও দৌড় লাগালো হোটেলের দিকে। তাশদীদ ওর চলে যাওয়া দেখলো। তারপর নিচে থাকা তাথৈয়ের কেডসজোড়া হাতে নিয়ে, নিজেও পা বাড়ালো হোটেলের দিকে।

#চলবে…

[ #নোট: বায়োলুমিসেন্স বিষয়ক অংশটুকো গল্পের স্বার্থে লেখা। কক্সবাজারে এটা হয় কি হয় না এ নিয়ে বাস্তবের সাথে না মিলানোর অনুরোধ রইলো। হ্যাপি রিডিং ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here