কার্নিশ_ছোঁয়া_অলকমেঘ লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা ১১.

0
385

#কার্নিশ_ছোঁয়া_অলকমেঘ
লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা

১১.

হিলের আওয়াজ শুনে ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে সিড়ির দিকে তাকালেন তৈয়ব আলফেজ। কাধে ব্যাগ নিয়ে, চুইংগাম চিবোতে চিবোতে নিচে নামছে তাথৈ। পরীক্ষা আছে ওর আজ। সৌভাগ্যবশত জ্বরটা আর নেই। আগেররাত মনের মতো করে পড়েছে ও। কোনোদিন না তাকিয়ে তাথৈ বেরিয়ে যাচ্ছিলো। মুখের সিগারেটটা নামিয়ে এ্যাশট্রেতে নেভালেন তৈয়ব আলফেজ। বললেন,

– একটাদিন বাসায় ব্রেকফাস্ট করো না। সকালে কোথায় কি খাও?

তাথৈ আটকে গেলো। অবাক চেহারা করে পেছন ফিরলো ও। স্বরে রাজ্যের বিস্ময় মিশিয়ে বললো,

– আমি কি ঠিক শুনলাম ড্যাড? তুমি আমাকে ব্রেকফাস্টের কথা জিজ্ঞেস করছো?

তৈয়ব আলফেজ উঠে দাড়ালেন। দৃষ্টি এদিকওদিক করে বললেন,

– তোমার জন্মদাতা হবার দায়িত্বপালন করলাম। আর কিছুনা।

– না খেয়ে থাকিনা ড্যাড। নিজের যত্ন নিজেই করি। জানিতো! আমাকে ভালোবেসে যত্ন করার মতো কেউ নেই। যে আছে, সে শুধু দায়িত্ব পালন করে। আর কিছুনা।

তৈয়ব আলফেজ চলে গেলেন। তাথৈ একদৃষ্টিতে বাবার চলে যাওয়া দেখে তাচ্ছিল্যে হাসলো। পরে বেরিয়ে আসলো অম্বুনীড় থেকে। গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসে, সিটবেল্ট বেধে নিলো। চাবি ঘুরিয়ে স্টার্ট দিতে যাবে, গাড়ি স্টার্ট নিলোনা। তাথৈ বিব্রত হয়। উঁকিঝুঁকি দিয়ে দেখে নিয়ে, আবারো চেষ্টা করলো গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার। এবারেও গাড়ি স্টার্ট নিলোনা। ঠিক সেসময়েই পাশে তুল্যর গাড়ি থামে। তুল্য জানালা দিয়ে তাথৈয়ের দিকে তাকিয়ে, উত্তেজনা নিয়ে বললো,

– ওয়াও! তোর গাড়ি নষ্ট হয়ে গেছে? ট্রিট দে তাথৈ!

কটমটে চোখে ভাইয়ের দিকে তাকালো তাথৈ। শক্তহাতে আঁকড়ে ধরলো স্টেয়ারিং। তুল্য ভয় পাওয়ার ভান করে বললো,

– উউউ! তাথৈ তো রেগে গেছে! তাথৈয়ের গাড়ি খারাপ হয়ে গেছে! তাথৈ আমার বা তার ড্যাডের গাড়ি ইউজ করে না! তাথৈ ভার্সিটির বাস কিংবা রিকশায়ও কমফোর্টেবল না! আজ আবার তাথৈয়ের এক্সাম! এবার তাথৈ কি করবে?

তাথৈ ভাইয়ের দিকে অগ্নিচক্ষু করে তাকিয়ে, রাগে বড়বড় শ্বাস ফেলতে লাগলো। পাশের সিটে পরে থাকা ব্যাগ হাতড়ে ফোন বের করলো। তুল্য ওপাশ থেকে বলছে,

– এবার তাথৈ উবারে কল করবে। কারন তাথৈয়ের সবুর নাই, উবার আছে।

কানে ফোন ধরে আরেকবার ভাইয়ের দিকে তীক্ষ্ণদৃষ্টি তাক করে তাথৈ। সত্যিই উবারে কল করেছে ও। কলটা রিসিভ হতেই তাথৈ লোকেশন বলে দিয়ে দশমিনিটের মধ্যে গাড়ি পাঠাতে বললো। এপাশে তুল্য বলে চলেছে,

– তাথৈ চিল্লালো। কিন্তু ওদিকে উবার ভাইয়ের সবুরও আছে। সে তাথৈয়ের চিল্লানি শুনেও বলবে, ‘ওকে ম্যাম, পাঠাচ্ছি গাড়ি।
তবে তবে তবে! দশমিনিটে হবেনা। আপনার লোকেশনে গাড়ি পৌছাতে মিনিমাম চল্লিশ মিনিট লাগবে ম্যাম।’

তুল্যর দিকে এবার বিস্ময়ে তাকালো তাথৈ। ফোনের ওপাড় থেকে হুবহু একই কথা বলা হয়েছে ওকে। কল কেটে নিরবে ফোন কান থেকে নামিয়ে নিলো তাথৈ। গাড়ি থেকে নেমে দাড়ালো। তুল্য বিশ্বজয়ের হাসি দিয়ে লুকিং মিরর দেখে দুহাতে মাথার চুল উল্টালো। বললো,

– এইদিকের রোডে সংস্কারকাজ চলছে বেহেন। গাড়ি অন্যরোড হয়ে ঘুরে আসতে মিনিমাম চল্লিশমিনিট তো লাগ…

তুল্যের বলা শেষ করার আগেই কিছু একটা ভাঙার আওয়াজ কানে আসে ওর। তৎক্ষনাৎ জানালা দিয়ে মুখ বের করে উকি দেয় ও। বাসার ঠিক সামনে মাটির ছোটছোট টবে সাকুলেন্ট গাছ ছিলো। সেগুলোর একটাতে তাথৈ লাথি ছুড়েছে। আর সেটা একপ্রকার উড়ে গিয়ে তুল্যর গাড়িতে লেগেছে। টবটা তো ভেঙেছেই, সে সাথে তুল্যর সাদা গাড়িতেও দাগ পরে গেছে। তুল্যর মাথায়ও রাগ চড়ে যায় এবারে। চেচিয়ে বলে,

– জানতাম তুই গাড়িকেই তাক করবি!

– আর জেনেও তুই আমাকে রাগাতে আসিস।

– আমি ইনফো দিয়ে তোকে হেল্প করছিলাম ড্যাম!

– গো টু হেল উইথ ইওর হেল্প!

এতোক্ষণ বাসার ভেতরে থেকে চিৎকার চেচামেচি শুনলেও এবার বেরিয়ে আসলেন তৈয়ব আলফেজ। ভাঙা টব আর তুল্যর গাড়ির দাগ দেখে তার বুঝতে বাকি রইলো না কি ঘটেছে। তৈয়ব আলফেজ তাথৈকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

– মায়ের মতোই হয়েছো। শুধু ভাঙতে জানো।

তাথৈ এমনিতেই রেগে ছিলো। বাবার কথা শুনে টুপ করে ওর চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে আসলো। তুল্য বোনের চোখের জল দেখে, গলা উচিয়ে বললো,

– বাবার মতোই বেশি হয়েছে। অনুভূতিশুন্য!

ছেলের জবাব শুনে, ফোন কানে তুলে ভেতরে চলে গেলেন তৈয়ব আলফেজ। কলে তিনি কাউকে বলছেন, ‘টবসহ দুটো সাকুলেন্ট লাগবে।’ তাথৈয়ের স্থির দৃষ্টি। তবে কাদছে না ও। তুল্য বললো,

– গাড়িতে ওঠ! প্রক্সি পরীক্ষা আছে তোর। আজ পরীক্ষা না দিলে সবমিলিয়ে ফাইনালে কম পাবি।

তাথৈ হাতের পিঠে গাল মুছলো। ওকে ঘুরতে দেখে তুল্য কিছুটা শ্বাস নেয়। কিন্তু সেকেন্ডত্রিশেক পেরিয়ে যাওয়ার পরেও ব্যাকসিটে উঠে বসেনা তাথৈ। তুল্য আবারো জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে ওকে খোজে। দুবার ডাক লাগায়। কিন্তু সাড়া পায়না। তৃতীয়বার ডাকতে যাবে, তার আগেই মুখ রীতিমতো তালাবন্ধ হয়ে যায় ওর। ওকে, ওর গাড়িকে অদৃশ্য বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, পাশ কাটিয়ে চলে গেছে তাথৈ। ওর কাধে ব্যাগ, কানে হেডফোন, হাতে স্টিক আর পায়ে, স্কেটিংয়ের জুতা। বাসা থেকে ভার্সিটি, আজ স্কেটিং করেই যাবে তাথৈ।

ঘড়ির কাটা বারোটার ঘরে। বিরক্ত হয়ে হাতঘড়ি থেকে চোখ তুললো তাশদীদ৷ সামনে তাকিয়ে দেখলো গাড়ির কোনোরুপ নড়চড় হচ্ছে কিনা। না। নেই। শুধুমাত্র বাস্কেটবল খেলার জন্য ক্যাম্পাস এসেছে ও। অথচ জ্যামেই লোকাল বাসটা আটকা পরে আছে প্রায় বিশমিনিট। শাহবাগ চত্বর থেকে বিশমিনিটে বিশ সেন্টিমিটারও হেলেনি বাসটা। গরমে সিদ্ধ হয়ে যাবার উপক্রম সব যাত্রীদের। তাশদীদ বুকের ওপরের আরেকটা বোতাম খুলে শার্টটা ঝারা মারলো। হাতের দিকে তাকিয়ে দেখে ঘেমে শার্টের হাতাও ভিজে যাচ্ছে ওর। হাল ছাড়লো তাশদীদ। ভাড়া মিটিয়ে নেমে আসলো বাস থেকে। পুরো রাস্তা আটকানো দেখে ঠিক করলো, বাকিটুক হেটেই এগোবে ও। মিনিট পনেরোর মতো লাগবে আর। অসহনীয় গরমে জ্যামে বসার চেয়ে হেটে এগোনোই শ্রেয়। শার্ট ঝেরে আবারো বুকে বাতাস লাগানোর চেষ্টা করলো তাশদীদ। হাতের ওপরপিঠ থুতনিতে ডলা মেরে ফুটপাত দিয়ে হাটা লাগালো।

কিন্তু কয়েকপা এগোতেই পায়ের গতি কমে তাশদীদের। ওর চোখ আটকায় শাহবাগের ফুটপাতে সাজানো ফুলের দোকানগুলোতে। একটা দোকানের সামনে গিয়ে দাড়িয়েই যায় ও। পকেটে দুহাত গুজে দাড়িয়ে, পুরো দোকানের সবগুলো ফুলে চোখ বুলায়৷ ফুলের প্রতি ভালোলাগা থাকলেও এখনো অবদি কেনা হয়নি ওর। মুলত কিনতে ইচ্ছে করেনি। কিন্তু আজ প্রথমবার ওর ফুল কিনতে ইচ্ছে করছে। দোকানের সব ফুল কিনতে ইচ্ছে করছে। অকস্মাৎ ওর মনে হলো, একগুচ্ছ লাল গোলাপে, প্রেম আঁকাই যেতো। এই সাদা গাজরা, নীলশাড়ি পরিহিত ব্যক্তিগত অপ্সরীর খোঁপায় গুজে দেওয়াই যেতো। বেলির মালাগুলো তার চুড়িবিহীন হাতে মোড়ানোই যেতো। নিজের অদ্ভুত চিন্তাগুলোতে হেসে ফেলে তাশদীদ। মাথাটা চুলকে পা বাড়ায় আরো সামনে।

চাকাওয়ালা জুতোয় ভর করে ছুটে চলেছে তাথৈ। শখ হিসেবে শেখা স্কেটিং ওর জীবনে অনেক কাজে দিয়েছে। চরম বিষন্নতার রাতগুলোতে ফাকা রাস্তায় যখন ও স্কেটিং করতো, কিছুটা হলেও হালকা লাগতো ওর। আজ ওর পরীক্ষায় বসতে পারাটাও এই স্কেটিংয়ের জন্যই হয়েছে। বেশ ভালো পরীক্ষা দিয়ে মনটা ফুরফুরে ওর। তাথৈ দেখলো এদিকটার পুরো রাস্তা জ্যামে আটকানো। সকালেও এমনই ছিলো। উবারে বেরোলেও ও ঠিকঠাক সময়ে ক্যাম্পাসে পৌছাতে পারতো না। রুমন-শার্লি ক্যাম্পাসেই। ক্লাসব্রেকে মনটাকে আরেকটু প্রশান্ত করতেই স্কেটিং করছে তাথৈ। উল্টোদিকের রাস্তার একপাশ দিয়ে এগোচ্ছে ও। জ্যামে আটকে থাকা গাড়িগুলোর বেশিরভাগ চোখ তখন ওর দিকে স্থির। সেগুলোর মাঝে একটা স্কুলভ্যানও ছিলো। ভ্যানে থাকা পাঁচছয়টা বাচ্চা তাথৈকে দেখে হাততালি দিলো। বাচ্চাগুলোকে দেখে, গতি কমিয়ে দিলো তাথৈ। হেসে চোখটিপে দিলো একবার। একটা বাচ্চা মেয়ে চেচিয়ে বললো,

– আপু রিঙ্গা রিঙ্গা রোজেজ করো! টিভিতে যেমন করে, ওমন! ওমন করো!

মেয়েটার সাথে বাকি বাচ্চাগুলোও সায় দিলো। তাথৈয়ের মেয়েটার কথা মোটেও ফেলতে ইচ্ছে করলো না আজ। আশেপাশের অন্যকোনো দৃষ্টিকে পাত্তা না দিয়ে বাধ বেয়ে ফুটপাতে উঠে গেলো ও। বাচ্চাগুলো খুশিতে চেচিয়ে উঠলো। তাথৈ দু আঙুলে একবার নিজের চোখ, আরেকবার ওর পায়ের দিক দেখালো ওদের। তারপর ফুটপাতের একটা ল্যাম্পপোস্ট একহাতে ধরে কৌশলে ঘুর্নন তুলে বেরিয়ে গেলো। বাচ্চাগুলো একসাথে হৈহৈ করে উঠলো। তাথৈ ঘাড় ঘুরিয়ে ওদের হাসি দেখতে থাকে। ভুলে যায়, ওর পা চলমান। কিন্তু হুট করে একটা বড় গাছের মুল চলে আসে ওর সামনে। হোচট খেয়ে হুশ ফেরে তাথৈয়ের। এক সেকেন্ডের জন্য সামনে তাকিয়ে, চেচিয়ে বলে ওঠে,

– স্টেপ আসাইড!

তাশদীদ হাটতে হাটতে শার্টের তিন নম্বর বোতামটা লাগাচ্ছিলো। হঠাৎ সামনে থেকে ইংরেজীতে ‘সরে দাড়াও’ শুনে হচকিয়ে দাড়িয়ে যায় ও। একপলক দেখায় চোখে পরে, নেভী ব্লু টপস আর কালো জিন্স পরিহিত এক রমনী স্কেটিং শু পরে টালমাটাল গতিতে একদম ওর বরাবর অগ্রসর হচ্ছে। তার মাথায় উল্টো করে পরা ফিতেযুক্ত ক্যাপ, দুই ঝুটি করে গলার দুপাশে দেওয়া চুল, গলায় হেডফোন ঝুলানো, আর হাতে স্টিক। তাথৈ নিজেকে থামাতে স্টিকের ধরার দিকটা দোকানের এক গাদাফুলের ঝালরে বাঝিয়ে দিলো। কিন্তু লাভ হলো না। ওর গতির জন্য পুরো ঝালরটাই চলে আসে স্টিকের সাথে। নিজেকে সামলাতে না পেরে তাশদীদকে নিয়েই মাটিতে পরে যায় ও।

চোখ বন্ধ করে নেয় তাশদীদ। নির্দিষ্ট কারনে ওর মস্তিষ্ক চোখ খুলতে অসম্মতি জানায়। কিন্তু তাথৈয়ের বিস্ফোরিত চাওনি। বাহাতের স্টিক ছেড়ে, ডানহাতে তাশদীদের শার্ট খামচে ধরে ও। বুকে জড়িয়ে যাওয়া মানুষটার বন্ধ চোখে তাকায়। তাথৈয়ের মনে হতে লাগলো, এই ছেলের বুকের বা পাশ খামচে ধরায় ওর নিজেরই হৃদস্পন্দকে থেমে যেতে চাইছে। অতি সন্নিকটের নিশ্বাসবায়ুতে এই পুরুষ ওকে শ্বাসরুদ্ধ করতে চাইছে। প্রথমবার কোনো ছেলের ওর এতোটা সন্নিকটে আসা ওকে সর্বহারা করতে চলেছে। পাশ থেকে দোকানী ছুটে আসছে তার ফুলের ঝালর ফেরত নিতে। বাকিসবার মতো তার দৃষ্টিতে, সেখানে কেবলই আকস্মিকতায় জড়িয়ে যাওয়া তাথৈ-তাশদীদ। কিন্তু সে তো আর জানেনা, ঝালরের আড়ালে জমা পরেছে আরেক ভিন্ন আঙ্গিকের গল্প। কমলা গাদার আড়ালে লুকিয়েছে প্রনয়লাজ। পরস্পরকে অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ জানিয়ে, থমকে যাওয়া দুজোড়া ঠোঁট। অভূতপূর্ব শিহরনী ছোঁয়ায় থমকে যাওয়া, তাশদীদ-তাথৈয়ের ঠোঁট।

#চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here