#কার্নিশ_ছোঁয়া_অলকমেঘ
লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা
১৭.
তাশদীদকে জীনপ্রকৌশলের এক শিক্ষকের কেবিন থেকে বেরোতে দেখে, করিডোরে দাড়িয়ে গেলো শান্ত। হাতে একটা নীল রঙের ফাইল নিয়ে, কেবিন থেকে বেরিয়ে আস্তেধীরে দরজাটা ভিড়িয়ে দিলো তাশদীদ। তবে সামনে শান্তকে দেখে থেমে গেলো ও। হাতের ফাইলটার দিক তাকিয়ে একটা ছোট্ট শ্বাস ফেললো। আর শান্ত উত্তোজিত হয়ে সামনে এগোলো। নেমপ্লেটে থাকা শিক্ষকের নামপরিচয় দেখে নিয়ে, বিস্ময়ে বললো,,
– তুই এখনো…
তাশদীদ শান্তর হাত ধরতে যায়। তৎক্ষনাৎ সরে দাড়ায় ও। একপ্রকারে জোর করে, তবুও ওকে কেবিনের সামনে থেকে সরিয়ে আনলো তাশদীদ। কিছুটা দুরে এসেই শান্ত ঝারা মেরে হাত ছাড়িয়ে নিলো নিজের। বললো,
– আমি ভেবেছিলাম তুই এসব থেকে সরে এসেছিস! কিন্তু তুইতো…
…
– এই প্রোজেক্টের জন্য তোকে কি কি ফেইস করতে হয়েছে, কি কি হারাতে হয়েছে, তা আমার চেয়ে তুইই ভালো জানিস তাশদীদ! আমি ভাবতেও পারছি না, এতোসবের পরও তুই পিছু হটিসনি। বরং এখনো চেষ্টায় আছিস কিকরে…
– দুচারটে শিক্ষিত, ক্ষমতাধর, দূর্নীতিগ্রস্ত, চোরের জন্য আমি আমার লক্ষ্য থেকেই পিছিয়ে আসবো কেনো? আমার উদ্দেশ্য এতোটাও ফেলনা না।
দীপ্ত দৃষ্টিতে হাতের ফাইলটার দিকে তাকিয়ে রইলো তাশদীদ। শান্ত নিজের মাথা চেপে ধরে। এদিকওদিক দুকদম পাইচারী করে। আবারো তাশদীদের সামনে এসে, একটু সময় নিয়ে বলে,
– কি চাইছিস তুই?
– অনেককিছু। কিন্তু তোকে বলবোনা।
মাসুম একটা হাসি দিয়ে, নির্ভাবনায় শান্তকে পাশ কাটায় তাশদীদ। শান্ত কোমড়ে দুহাত দিয়ে দাড়িয়ে ওর চলে যাওয়া দেখলো। তাশদীদ এক আঙুলের ওপর ফাইল ঘোরাতে ঘোরাতে যাচ্ছে। ওর এমন গা ছাড়া স্বভাব দেখে, শান্ত বুঝে উঠলো না, ওর ঠিক কোন কারনে দুঃখ করা উচিত? এই প্রোজেক্টে এখনো তাশদীদ জড়িত জেনে? নাকি এমন রাঘব-বোয়ালদের বিপরীতে ওর এমন গা ছাড়া স্বভাব দেখে?
ক্লাসে এসে ব্যাগ কাধে নেয় তাশদীদ। বাড়ি ফিরবে বলে ভার্সিটির বাসে চড়ে বসে। কিন্তু ফেরার পথে বৃষ্টি শুরু হয় আরেকদফা। ক্যাম্পাস এরিয়াতেই ওদের বাস জ্যামে দাড়িয়ে ছিলো। জানালার পাশের সিটটা থেকে তাশদীদের চোখে পরলো, রাস্তার ধারে একটা বসারমতো জায়গা করা। আর তার নিচে একটা কুকুর কোনোমতে বৃষ্টি থেকে গা বাচানোর চেষ্টা করছে। লোমশ ক্ষুদ্র শরীরটা ভিজে একাকার হয়ে গেছে ওর। তাশদীদ দেখেই বুঝলো, ওটা পমেরিয়ান কুকুর। কারো অতি সযত্নের পোষ্য। আশপায়ে উঁকি দিয়ে কাউকে চোখে পরলো না তাশদীদের। কি ভেবে বাস থেকে নেমে আসে ও। বৃষ্টির মাঝে ছুট লাগিয়ে এসে বসে কুকুরটার সামনে। কুকুরটা আরো গুটিয়ে যায়। তাশদীদ কপালে হাত ঠেকিয়ে ওর গলার ব্যাজটা লক্ষ্য করলো। সেখানে বুজো লেখা। তাশদীদ হাত বাড়িয়ে বললো,
– বুজো? কাম?
বুজো আরো গুটিয়ে যায়। তাশদীদ ভিজছে। তবুও আদুরে গলায় বললো,
– তোমার মালিক এখানে নেই। আর বৃষ্টি অনেক বেশি বুজো। আমার সাথে আসাটাই তোমার জন্য ভালো হবে। এটুক বুঝো? বুজো?
এবারেও বুজো এগোলো না। তবে তাশদীদও আর অনুমতির জন্য সময় নিলো না। দুহাতে আগলে নিলো ও বুজোকো। ছুটে এসে আবারো বাসে চড়ে বসলো। ওর এক ব্যাচমেট রুমাল এগিয়ে দিলো। বুজোকে কোলে নিয়ে, ওর গা যতোটুকো সম্ভব মুছে দিলো তাশদীদ। কাদা, পানির সংস্পর্শ কিছুটা কাটিয়ে উঠতেই ওর গায়ে গা ঘষতে লাগলো বুজো। তাশদীদ হেসে বললো,
– ওকে ওকে। আর কৃতজ্ঞতা জানাতে হবেনা।
বাসের সবাইকে বুজোকে পাওয়ার খবরটা ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে দিতে বলে তাশদীদ। ওর প্রীতিকার্নিশ পৌছাতে পৌছাতে সন্ধ্যে নামে। ততোক্ষণে বৃষ্টিও থামে। কিন্তু বাসার দরজায় এসে থেমে যায় ও। তাশদীদের মনে হয়, ওয়াসীর সাহেব বুজোকে ভেতরে রাখাটা পছন্দ করবেন না। ব্যাপারটা ও নিজেও মেনে চলে। শখ করে কুকুরপালনে ধর্মীয় নিষেধ আছে। তবুও একটা দম নিয়ে বাসায় ঢুকলো তাশদীদ। তামজীদ ব্যাট কাধে ঠেকিয়ে সবে বারান্দা থেকে রুমের দিকে রওনা হচ্ছিলো। ভাইয়ের কোলে বিদেশী কুকুর দেখেই ও বলে উঠলো,
– আবার কার দায়িত্ব ঘাড়ে করে নিয়ে আসলি তুই? রিংকি আপু কি কম ছিলো?
মিসেস ওয়াসীর রান্নাঘরে ছিলেন। গলা উচিয়ে ‘তামজীদ’ ছোটছেলেকে বলে শাষন করলেন তিনি। ওয়াসীর সাহেব মসজিদের উদ্দেশ্যে বেরোচ্ছিলেন। তাশদীদকে কুকুর কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বললেন,
– এটা কার?
– জানিনা। রাস্তায় ভিজছিলো দেখলাম, তাই…যারই হোক কালকে ক্যাম্পাসে গিয়ে ফেরত দিয়ে দেবো বাবা।
ওয়াসীর সাহেব হাসলেন। এগিয়ে এসে ছেলের কাধে হাত রাখলেন তিনি। হেসেহেসেই বললেন,
– সৃষ্টিকর্তার সব সৃষ্টিকে যদি ভালোবাসতে না পারো, সৃষ্টির সেরা জীব কি করে হবে তাশদীদ? ওকে তামজীদের ঘরে রাখো৷ তামজীদ? তুমি আজকে ভাইয়ার ঘরে শিফট হয়ে যাও।
তামজীদ ঘাড় নাড়ালো। ওয়াসীর সাহেব বেরিয়ে গেলেন। তাশদীদ বুজোকে তামজীদের ঘরে ঢুকিয়ে দিলো। মাকে রান্নাঘরে গিয়ে বুজোর কথা বলে, পা বাড়াচ্ছিলো ওয়াশরুমের দিকে। তামজীদ ওর পাশে হাটতে হাটতে বললো,
– ওইদিন রিংকি আপু নাকি প্রীতিকার্নিশ এসে ড্রাইফ্রুটস খেয়ে গেছে। বুজোকে ওগুলোই দেবো? নাকি ডগফুড আনা লাগবে?
তাশদীদ অতিকষ্টে হাসি আটকায়। ভাইয়ের মাথায় চাটি মেরে, ঢুকে যায় ওয়াশরুমে। তামজীদ মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে সাইকেল বের করলো। বুজোর খাবার আনতে সুপারশপ যাবে বলে।
পরদিন সকালে বুজোকে সাথে করে ভার্সিটির জন্য রওনা হলো তাশদীদ। ক্যাম্পাসে গিয়ে খোজ নিলো, কেউ বুজোর খোজ করেছে কিনা৷ কিন্তু লাভ হয়নি। কেউই নাকি খোজেনি ওকে। তাশদীদ আরেকটু সময় নিলো। আজ ওর ক্লাস নেই৷ বাস্কেটবল টুর্নামেন্টের জন্য আসা। চেন্জ করে, বুজোকে নিয়ে কোর্টের দিকে এগিয়ে গেলো ও। শান্ত দলের বাকিসবদের নিয়ে আগে থেকেই ছিলো সেখানে। তাশদীদকে দেখে উচু গলায় ওদেরদিকে যেতে বললো। বুজোর বেল্টটা কোর্টের পাশের একটা খামে আটকে দেয় তাশদীদ। পরে এগিয়ে যায় দলের দিকে। ওরা নিজেরা কথা বলছিলো। তাশদীদের কানে আসলো,
– কুকুরটা কোথায় পেয়েছেন তাশদীদ ভাই?
তাশদীদ পাশ ফেরে। জার্সি পরিহিত তুল্যকে দেখে, হাসিমুখে বলে,
– আরে তুল্য! কেমন আছো?
– জ্বী ভালো। কুকুরটা…?
– কাল রোডসাইডে বৃষ্টিতে ভিজছিলো। আমি ওকে পাওয়ার পরপরই ভার্সিটির গ্রুপসহ সবজায়গায় খোজ পাঠিয়েছিলাম। তোমার এটা?
তুল্য একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো বুজোর দিকে। জন্মদাত্রী নামক মহিলার মনে মায়া নামক বস্তুটা যে বিন্দুমাত্রও নেই, তাতে আর সন্দেহ রইলো না ওর। সে নিশ্চয় ভেবেছে, একটা হারিয়েছে তো কি, টাকা দিয়ে আরেকটা কিনে নেবো। বুজোকে নিজের কাছে রাখার সিদ্ধান্ত নেয় তুল্য। যদি ভদ্রমহিলা ওকে খুজেও থাকে, ও ফেরত দেবে না এমনটা ভেবে রাখে। অতি স্বাভাবিক গলায় বললো,
– হ্যাঁ। বুজো আমার পেট। কাল প্রথমবার ক্যাম্পাসে এসেই হারিয়ে গেছে।
তাশদীদ ভ্রুকুচকে তাকালো। রাগের পাশাপাখি দু ভাইবোনের কুকুর পালার সময় আছে জেনে খুশিই হলো হয়তোবা। হেসে বললো,
– অনেক শান্তশিষ্ট পেট তোমার।
তুল্য বুঝলো, তাশদীদ আলাদা করে বুজোকে শান্তশিষ্ট বলে, ওকে রাগী সম্বোধন বুঝিয়েছে। একপা এগিয়ে, ও তাশদীদের দিকে মাথা উচু করে তাকালো। চোখে চোখ রেখে বললো,
– রাগের সাথে তুল্যর জেদও আছে তাশদীদ ভাই। ও জেতার জন্যই মাঠে নামে।
– তুমি মনেহয় দেবের ফ্যান?
তাশদীদের এমন প্রশ্নে হচকিয়ে যায় তুল্য। মুচকি হাসলো তাশদীদ। তুল্যর কাধে হাত রেখে বললো,
– আবারো অল দ্যা বেস্ট। যাওয়ার সময় মনে করে বুজোকে নিয়ে যেও।
স্থির হয়ে দাড়িয়ে রইলো তুল্য। তাশদীদ চলে আসলো নিজের দলের কাছে। টিটু কলা মুখে পুরতে পুরতে বললো,
– তুল্য কি তোকে লেকচার দিলো তাশদীদ? অবশ্য ওর আত্মবিশ্বাসের কারন আছে। শুনেছি কলেজে দুবছর বাস্কেটবল জিতেছে। ভার্সিটিতে এসেও সিনিয়রদের হারিয়ে কাপ নিয়েছে। এটুক কনফিডেন্ট তো হবেই!
তাশদীদ নিশব্দে হেসে জুতোর ফিতে বাধলো। কিছু বললো না। শান্ত ব্যাগ থেকে তোয়ালে বের করলো। পানির বোতলটা টিটুর কোলে ছুড়ে মেরে বললো,
– তাশদীদের রেকর্ড জানিস?
মাথা নেড়ে না বুঝালো টিটু। মুখে বললো,
– তবে আগেরদিন তো ফাটিয়ে দিয়েছে! আমি তখনই বুঝে গেছি, আজ তো আমরাই জিতবো!
– অভার-কনফিডেন্সি নিয়ে পানি একঢোক কম করে খা। গলায় আটকাবে।
টিটুর কাছ থেকে বোতল নিয়ে বললো তাশদীদ। কিছুসময়ের মধ্যেই বাশির আওয়াজে কোর্টে ঢুকে যায় ওরা। শুরু হয় অন্তঃবিভাগ বাস্কেটবল ফাইনাল। তাশদীদ খেয়াল করলো, শুরু থেকেই তুল্য নিজস্ব ক্ষিপ্রতা নিয়ে খেলছে। তবে ফাউল করছে না। আর আফিফের খেলার ভঙিমা এমন, যেনো ও ফাউল করে অভ্যস্ত। তাশদীদ ওর দলের শান্তসহ বাকি তিনজনকে বলো রাখলো, হারলে সমস্যা নেই। কিন্তু বিপরীত দলকে ফাউল করার সুযোগ না দিতে। তুল্য বা আফইফ দুজনেই যেভাবে খেলছে, তাতে কেউ আঘাত পেলে তা গুরুতর আঘাতই হবে। বাধ্য হয়ে তাশদীদের দল ডিফেন্ডে যায়। গেইম প্যাটার্ন ঘুরে যেতেই সুবিধা হয় তুল্যর। অতি সহজেই সাথে বাস্কেট করতে থাকে ওরা। রুমনের ডাকে তাথৈ লাইব্রেরি থেকে বেরোলো। মন মেজাজ ঠিক নেই ওর। আগেররাতে ঘুম পড়া কোনোটাই হয়নি। শার্লিও রুমনের সাথেই ছিলো। তাথৈকে বেরোতে দেখে রুমন উত্তেজনা নিয়ে বললো,
– তাথৈ চল শর্টস পরা ছেলে দেখতে যাই?
ঠাস করে নিজের কপালে চড় লাগালো শার্লি। তাথৈ নিজের ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করলো। তলানীতে অল্প কিছু পানি ছিলো বোতলটার। বোতলের মুখ খুলে ও রুমনের মুখে পানি ছুড়ে মারলো। উত্তেজনা হারিয়ে থম মেরে যায় রুমন। তাথৈ বললো,
– হুশে ফিরেছিস?
হাতে মুখ মুছলো রুমন। মিনমিনে গলায় বললো,
– চল বাস্কেটবল টুর্নামেন্ট দেখতে যাই। আজ ফাইনাল ম্যাচ চলছে।
একপলক শার্লির দিকে তাকালো তাথৈ। শার্লি অন্যদিক ঘুরে, ‘আমি কিছুই জানিনা’ টাইপ প্রতিক্রিয়া দেখালো। রুমন আবারো উত্তেজিত হয়ে বললো,
– চল না তাথৈ! দেখে আসি! আজকে খেলা তো জমজমাট! ওইদিন ওই হ্যান্ডসামটা তো খুব ভালো খেললো। আর আজ তুল্যবাবু বাস্কেটের ওপর বাস্কেট করছে! চল না!
অন্যসময় তুল্য বাস্কেট করেছে শুনলে হয়তো আগ্রহ দেখাতো না তাথৈ। কিন্তু তুল্য তাশদীদের বিপরীতে বাস্কেট করছে শুনে, হাসি ফুটলো ওর ঠোঁটে। তাথৈ ব্যাগ কাধে নিয়ে, বই বুকে জড়িয়ে বললো,
– চল!
রুমন খুশি হয়ে যায়। কিন্তু শার্লি কিছুটা অবাক, কিছুটা শোকাহত হয়। তাথৈ আর ও, দুজনে মিলে প্রতিবার তুল্যর হার চায়। অথচ এবার তাথৈও তুল্যের জিত চাইছে। যতোযাই হোক, রক্ত কথা বলে। মনকে বুঝ দিয়ে, মন খারাপ করে পা বাড়ালো ওউ। ওরা তিনজন এসে দেখে হাফটাইম খেলা শেষ। ফলাফল, ১২-৮. তাশদীদরা পুরো চার বাস্কেট পিছিয়ে। মনেমনে খুশি হলেও, প্রকাশ করলো না তাথৈ। সেমিফাইনালে তাশদীদ কিভাবে খেলার মোড় ঘুরিয়েছিলো, ভোলেনি ও। রুমন তুল্যকে দেখে চেচিয়ে বললো,
– তুল্যবাবু? অল দ্যা বেস্ট!
তুল্য পানি খাচ্ছিলো। রুমনের অল দ্যা বেস্ট শুনে হিচকি উঠে যায় ওর। পানির বোতল সর্বশক্তিতে ছুড়ে মারে ও রুমনের দিকে। ‘আউচ’ উচ্চারন করে সরে দাড়ায় রুমন। যে বেগে বোতল এসে পরেছে, ওই বোতল ওর গায়ে লাগালে, ওর একটা হাড়গোড়ও অবশিষ্ট থাকতো না। তাশদীদ রুমনের গলা শুনে সেদিকে তাকালো। সবার আগে ওর চোখ পরলো তাথৈয়ের দিকে। পরনে কোমড় অবদি কমলা রঙের গোল কুর্তা, গিটের অনেকটা ওপর অবদি ভাজ দিয়ে রাখা জিন্স, উচু পেন্সিল হিল। মাথার সবগুলো চুল উচুতে ঝুটি করে বাধা। কাধে থাকা ব্যাগের ফিতা দুহাতে ধরে রেখে, চুইংগাম চিবাচ্ছে তাথৈ। তাশদীদ দৃষ্টি সরালো। টিটু এনার্জী ড্রিংক এগিয়ে দিলো ওকে। হাতের আঙুল দুবার মুঠো করে, খুলে, তাশদীদ জবাব দিলো,
– লাগবে না।
শুরু হয় দ্বিতীয়ার্ধের খেলা। তুল্যরা ডিফেন্ড পেয়ে একটানা আরো ছয়টি বাস্কেট করে ফেলে। তাশদীদরা কোনোমতে তিনটি। আটারোতম বাস্কেট করে, তুল্য বল বাউন্ড করাতে করাতে এগিয়ে আসলো তাশদীদের দিকে। বললো,
– আপনাদের না এ্যাটাকে খেলার কথা ছিলো তাশদীদ ভাই?
তাশদীদ কোনো জবাব দিলো না। কেবল হাসি দিলো একটা। কিন্তু শান্তর মেজাজ খারাপ হচ্ছে। দল লিড দেওয়ার সময় শুরুতে এ্যাটাকে খেলার কথা বলেছিলো তাশদীদ। এখন ডিফেন্ডে খেলতে গেলে তো হারবেই! ও বেশ রেগে তাশদীদকে বললো,
– কি বা*র গেইমপ্লান করিস তুই! এ্যাটাকে খেলবো বলে ডিফেন্ডে কেনো যাচ্ছিস?
– ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড শান্ত। ওরা পাঁচজনই অনেক এগ্রেসিভ হয়ে আছে। একমুহুর্তের জন্য ডিফেন্ডে যাচ্ছে না। শুধু আছে বল গ্র্যাব করবে কিভাবে, সে ধান্দায়। এতে সামনেরজন মরুক বাচুক, ওদের আসে যায় না। এখানে আমরাও যদি এ্যাটাকে খেলি, এটা খেলা না, রণক্ষেত্র হবে।
– হলে হবে! ফাটুক না একটার নাকমুখ! অনার্সের চারবছরের জন্য টিম থেকে ব্যান করে দেওয়ার ব্যবস্থা করবো। ওই শোন, সবাই এ্যাটাকে খেলবি! দেখি এই ছানাপোনারা কেমনে জেতে!
তেজ দেখিয়ে বললো শান্ত। অশান্ত বন্ধুকে চেনে তাশদীদ। ও বুঝলো এবার ব্যাপারটা বিগড়াবে। উপায়ন্তর না দেখে বললো,
– ওকে। তাহলে মিডল থেকে আমি ড্রিবলিং করবো। আর তোরা ফ্রন্টে না থেকে বাস্কেটের কাছাকাছি থাকবি।
রাজি হয় সবাই। খেলা শুরু হয় আবারো। তুল্য-তাশদীদের ১১-১৮ বাস্কেট। তুল্য বরাবরের মতো এবারো বল ছিনতে উদ্যত হয়। কিন্তু তাশদীদ ছাড়লো না। এগিয়ে গিয়ে তুল্যকে সুযোগ দেওয়ার চেয়ে, কোর্টের মিডপয়েন্ট থেকে বাস্কেট করাকেই ওর ভালো মনে হলো। ও করলোও তাই। বারোতম বাস্কেটটা বেশ দুর থেকে এসে বাস্কেটে পরে।
হৈ হৈ করে ওঠে তাশদীদের দল। তুল্য এক আঙুলে কপালের ঘাম মুছলো। তাশদীদের কথা অনুযায়ী ওর ফ্রন্টে খেললো না। নিজেদের বাস্কেটে ডিফেন্ডে রইলো ওরা। তুল্যরা একটা বলও বাস্কেট করার সুযোগ পায়নি। বলা যায়, বল হাতেই পায়নি ওরা। শান্ত-তাশদীদ মিলে আরো চারটে বাস্কেট করলো। স্কোরবোর্ডে ওদের দলকে এগোতে দেখে হাত মুঠো করে বুকে গুজলো তাথৈ। তবে শার্লি খুশি হলো। দাঁত কেলিয়ে বললো,
– ঠিক হয়েছে। সবসময় সবজায়গায় এটিচিউড চলে না!
তাথৈ সামনে তাকিয়েই ওর কলার চেপে ধরে। দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
– বদদোয়া দেওয়া অফ যা ঘষেটি! তুল্য হারলে, আমাদের ব্যাচ হারবে।
– তুই আবার কবে থেকে ব্যাচ নিয়ে ভাবতে শুরু করলি?
শার্লি বিস্ময়ে বললো। রুমন পাশ থেকে ঠিক ততোটাই বিস্ময়ে বললো,
– তুই আবার কবে থেকে নিজেকে ঘষেটি মানতে শুরু করলি? মিরজাফর না তুই?
তাথৈ ছেড়ে দেয় শার্লিকে। ছাড় পেতেই শার্লি রুমনের হাতে কিল বসিয়ে দেয়। ঝোক হারিয়ে কয়েকপা পিছিয়ে যায় রুমন। ব্যথাতুর শব্দও করে। এমন অদ্ভুত আওয়াজ শুনে আশপাশের বাকিরা ওর দিকে তাকালো। তাথৈ বড় দম নেয়। চেচিয়ে বলে, ‘খেলা কোর্টে হচ্ছে!’
ওর ধমকে চোখ সরিয়ে নেয় সবাই। খেলার আর তিন মিনিট বাকি। দুদলই বাস্কেট করার চেষ্টা করছে। তাশদীদ বল ড্রিবলিং করাচ্ছে, তুল্য তা নেওয়ার চেষ্টায়। অনেকবেশি ক্ষিপ্ত হয়ে আছে ও। তাশদীদ খেলতে খেলতে বললো,
– তুল্য কন্ট্রোল ইওরসেল্ফ। এটা জাস্ট একটা খেলা। তুমি এভাবে খেললে যে কেউ ইন্জারড হতে পারে।
তুল্য মানলো না। তাশদীদ সবে উচু হয়েছে বল বাস্কেটের উদ্দেশ্যে ছুড়বে বলে, ঠিক পাশ থেকে অনেক জোরে ওকে ধাক্কা দেয় তুল্য। তাশদীদের পায়ে পারাও মেরেছে ও। বল ছেড়ে, তৎক্ষনাৎ নিচে পরে যায় তাশদীদ। পা চেপে ধরে শুয়ে পরে কোর্টের মাঝে। প্রচন্ড ব্যথায় কুকড়ে যায়। ওর দলের বাকি চারজন ছুটে আসে তখনতখন। কোর্টের বাইরে থেকে টিটুও ছুট লাগায়। এতোক্ষণ ঠিকঠাক থাকলেও, হুট করে আঁতকে ওঠে তাথৈ। বুকের ভেতরটা অকস্মাৎ খামচে ধরে ওর। বাকিসবের চেহারায় আতঙ্ক তৈরী হলেও, শক্ত হয়ে তাথৈ দাড়িয়ে রইলো। তুল্য শুধু দেখলো, ওর গেমপ্লান এবারে কাজে দেয়নি। তাশদীদের বেসামাল অবস্থায় ছেড়ে দেওয়া বলটাও, বাস্কেট করেছে।
#চলবে…

