হে_সখা #অক্ষরময়ী ষষ্ঠদশ পর্ব

0
37

#হে_সখা
#অক্ষরময়ী
ষষ্ঠদশ পর্ব

প্রফিট, টার্গেট, পার্সেন্টেজ, সেলস ইত্যাদি শব্দগুলোর প্রতি রেহবারের আগ্রহ ছিলো অনেক। কিন্তু এই মুহুর্তে সাইফুল ইসলামের সাথে বিজনেস আলোচনায় এই শব্দগুলোই যেনো রেহবারের বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চোরাচোখে বারকয়েক হাতঘড়িতে সময় দেখে নিয়েছে। প্রায় আধাঘন্টা হতে চললো, গুলিস্তা ফিরে আসেনি। ম্যানেজমেন্ট টিমের সেই মেয়েটিকেও দেখা যাচ্ছে না। চিন্তার সুক্ষ্ম রেখা রেহবারের কপালজুড়ে। এর মধ্যে আরও কয়েকজন বিজনেসম্যান এগিয়ে এসে আড্ডায় যুক্ত হলো। এই ফাঁকে রেহবার সবার থেকে বিদায় নিয়ে দ্রুত পা ফেলে রেস্টরুমের দিকে এগিয়ে গেলো।
পথিমধ্যে দেখা হলো সেই মেয়েটির সাথে। রেহবার দ্রুত জানতে চাইলো,
– হোয়ার ইজ শি?
– ম্যাম এখনো ওয়াশরুমেই আছেন। আমি উনার বের হওয়ার অপেক্ষা করছি।

লেডিস ওয়াশরুমের দিকে যেতে ইতস্ততবোধ হচ্ছে ঠিকই তবুও যেতে হচ্ছে। ওয়াশরুমের সামনে আসতেই রেহবারের পায়ের গতি ধীর হলো। বেশ কয়েকজন নারী ওয়াশরুম হতে বের হওয়ার পথে রেহবারকে দেখে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। সেদিকে পাত্তা না দিয়ে রেহবার ভেতরে প্রবেশ করলো।
বেসিনের সামনে উল্টোদিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে গুলিস্তা। ওর সামনে অচেনা একজন মহিলা দাঁড়িয়ে। উচ্চ স্বরে কিছু একটা বলছে। সেসব রেহবারের কর্ণগোচর হলো না। সে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে গুলিস্তার সামনে দাঁড়ালো। গুলিস্তার চোখে মুখে খানিকটা আতংক। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলাটি শক্ত করে গুলিস্তার ডান হাতের কব্জি ধরে রেখেছেন। রেহবারের মনে পরলো সপ্তাহখানিক আগেই একই স্থানে তার দ্বারা গুলিস্তা আঘাত প্রাপ্ত হয়েছে। কালবিলম্ব না করে তার শক্তপোক্ত হাত দ্বারা মহিলাটির হাত থেকে গুলিস্তার হাত ছাড়িয়ে নিলো। হঠাৎ আক্রমণে মহিলাটি অবাক চোখে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠলো,
– কে আপনি? লেডিস ওয়াশরুমে কি করছেন?

ততোক্ষণে গুলিস্তাকে একহাতে আগলে নিয়েছে রেহবার। মহিলাটির প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে গুলিস্তার কাছে জানতে চাইলো,
– তুমি ঠিক আছো?

সাদা কাগজের মতো ফ্যাকাশে হয়ে আছে গুলিস্তার মুখ। রেহবারের বুকের সাথে লেপ্টে দাঁড়িয়ে মাথা দুলিয়ে বললো, হু।
ওদের দুজনের দিকে তাকিয়ে মহিলাটির নিজের প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেলো৷ নিজের বাজখাঁই গলায় বলে উঠলো,
– ওহ, আপনি ওর হাসবেন্ড! আপনাকেই তো খুঁজছিলাম।

রেহবার আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো একজন ফিমেল গেস্ট ও ক্লিনিয়িং লেডি ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। তাছাড়া লেডিস ওয়াশরুমে ওর নিজেরও বেশিক্ষণ অবস্থান করা সমীচীন নয়।
– এনি প্রবলেম মিস? উই ক্যান গো আউটসাইড এন্ড টক।

মহিলাটির উত্তরের অপেক্ষা না করে গুলিস্তার হাতে হাত রেখে হনহনিয়ে বেরিয়ে এলো ওয়াশরুম থেকে।
খানিকটা নিরিবিলি জায়গা দেখে ওরা তিনজন দাঁড়ালো। গুলিস্তা এখনো খানিকটা কাঁপছে কিন্তু চোখে মুখে আতংকিত ভাবটা আর নেই। স্বাভাবিকভাবেই তাকিয়ে আছে অচেনা নারীর দিকে। রেহবার ধীরে সুস্থে জানতে চাইলো,
– আপনার পরিচয়?
– আমি জেরিন। আপনার শ্বশুরবাড়ির পাশেই আমাদের বাড়ি।

মেয়েটি খুব উগ্র স্বভাবের নাকি সে কোনো কারনে রেগে আছে? ঠিক বুঝতে পারলো না রেহবার। কিন্তু জেরিনের কথাবার্তা খুবই রুঢ় সেই সাথে অমার্জিতও। কারো সাথে অকারণ বাজে আচরণ করার স্বভাব রেহবারের নেই। সে নিজেকে যথেষ্ট শান্ত রেখে গুলিস্তার কাছে জানতে চাইলো,
– উনাকে চেনো?
– হু।

গুলিস্তা স্বল্প ভাষায় সায় দিলো।
– চেনা পরিচিত হলে খুব ভালো কথা। তবে ওয়াশরুম আড্ডার উপযুক্ত স্থান নয়। আমি যদি ভুল না হই, তবে আপনি রীতিমতো ওর উপর চড়াও হচ্ছিলেন।
– এই মেয়ে ভদ্র আচরণে যোগ্যই নয়। আপনি নিশ্চয়ই কোনো খোঁজ খবর না নিয়ে বিয়ে করেছেন। ওর সম্পর্কে একটু খোঁজ করলে আমি নিশ্চিত আপনি কখনোই এই মেয়েকে বিয়ে করতেন না।
– বিয়ে হয়ে গেছে এবং সে বর্তমানে আমার স্ত্রী। কেউ আমার স্ত্রীর সাথে রুঢ় আচরণ করবে এটা আমি টলারেট করবো না। আপনার কিছু বলার থাকলে ভদ্র ভাবে বলুন।
– যাকে নিয়ে এতো তেজ দেখাচ্ছেন, সেই মেয়ে আদোও এতোটা সম্মানের যোগ্য কিনা সেটা আগে শুনুন। কী রে, নিজের রঙলীলার কথা নিশ্চয়ই জামাইকে কিছু জানাসনি? সেসব আবার কেউ জানায় নাকি! তোর বাড়ির লোকজনও পাক্কা সেয়ানা। কেমন চুপেচাপে বিয়ে দিয়ে দিলো কেউ টেরও পেলো না। আমার ভাইয়ের জীবনটা নষ্ট করে ঠিকই নিজের জীবন গুছিয়ে নিয়েছিস। স্বার্থপর, নষ্টা মেয়ে কোথাকার।
– ডোন্ট ক্রস ইউর লিমিট, মিস জেরিন।

কথার তালে জেরিনের কন্ঠস্বর জোরালো হয়ে গেছে। রেহবার নিজেও রেগে চাপা গলায় ধমকে উঠলে জেরিন নিজেকে সামলে নিলো। কাহিনী কিছু জানে না বলে, এই লোক বউয়ের হয়ে গলা বাজাচ্ছে। সব জানার পরে ছুঁড়ে ফেলতে দ্বিধা করবে না৷ পুরুষ মানুষকে জেরিনের ভালো করে চেনা আছে। যতো ভদ্র গোছের মানুষ হোক না কেনো, বউয়ের অতীত কেউ মেনে নিতে পারে না৷ বুকের ভেতর তীরের ফলার মতো বিঁধে থাকে। আর কখনো স্বাভাবিক হয়ে উঠে না দাম্পত্য জীবন। জেরিনের বুকের ভেতর প্রতিশোধের আগুন দপদপ করে জ্বলছে। গুলিস্তার গায়ে দামী শাড়ি জড়ানো। গায়ে জ্বল জ্বল করছে গয়না। চোখে মুখে সুখের ঝলক। ওর এমন পরিতৃপ্ত চেহারা জেরিনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জ্বালা ধরিয়ে দিলো।
– কথা বাড়ানোর ইচ্ছা আমারও নেই। যার জন্য এতো তেজ দেখাচ্ছেন, সেই মেয়েটার সম্পর্কে আপনি কিছুই জানেন না৷ এই মেয়েটার চেহারা এমন বোকাবোকা, ভ্যাবলার মতো হলেও ও মোটেও সাধু সন্নাসী টাইপের কোনো মেয়ে নয়। আস্ত শয়তানী একটা মেয়ে। ওর এমন চেহারা দেখে আমরাও ভাবতাম ও ভাজা মাছটা উল্টে খেতে জানে না। অথচ এই মেয়ে ভেজা বেড়াল গোছের মানুষ।

জেরিনের অযথা কথায় রেহবার ভীষণ বিরক্তবোধ করছে। ওদিকে গুলিস্তাও নির্বিকার। আজব মেয়ে একটা। রেহবার না হয় মেয়ে মানুষের উপর রাগ দেখাতে পারছে না। জেরিনের জায়গায় কোনো ছেলে হলে এতোক্ষণে ঠাটিয়ে চড় মেরে দেওয়া যেতো৷ কিন্তু মেয়ে মানুষের গায়ে হাত তোলা যায় না৷ কড়া কথা বলতে গেলেও মানহানীর মামলা হয়ে যেতে পারে। কিন্তু গুলিস্তা তো চাইলে এই মহিলাকে কিছু বলতে পারে। ওর সম্পর্কে একেক পর এক বাজে কথা বলে যাচ্ছে অথচ মেয়েটা শুধু তাকিয়ে দেখছে৷ ওর হাত ধরে পেছন ফিরে রেহবার বললো,
– চলো তো এখান থেকে। যতোসব উন্মাদ লোকজন।

ওরা এক কদম এগোতেই জেরিন সামনে এসে পথ আটকে দাঁড়ালো। একদম গায়ে গা লেগে যাওয়ার মতো অবস্থা। রেহবার দ্রুত পিছিয়ে গেলো।
– এটা কী ধরনের অসভ্যতা!
– পুরো কথা শেষ না করে তো আপনি যেতে পারবেন না৷ এই মেয়ে আমার ভাইয়ের জীবনটা ছারখার করে দিয়ে নিজে বিয়ে করে সুখে স্বামীর সংসার করবে, এটা তো আমি মেনে নিবো না।
– আপনার কোনো কথা শোনার ইচ্ছে আমাদের নেই। পথ ছাড়ুন।
– এখন তো ইচ্ছে হবে না৷ নতুন বিয়ে, সুন্দরী বউ রঙিন দুনিয়ায় ভাসছেন। কয়েকদিন পর আফসোস না করতে হয়৷ যখন ওর আসল চেহারা সামনে আসবে তখন আমাকে খুঁজলেও পাবেন না। আল্লাহ নিজেও এই অন্যায় মেনে নিতে পারছেন না বলেই তো আমাদের এভাবে দেখা হয়ে গেলো। না হলে পাড়ার কেউ তো ঘুনাক্ষরেও টের পায়নি, কবে এই কলঙ্কিনী, নষ্টা মেয়েটার বিয়ে হয়ে গেলো।
– আপনি আমার স্ত্রী সম্পর্কে এমন বাজে ভাবে কথা বলছেন, আবার আমার থেকে এটাও আশা করছেন, আমি যেনো আপনার কথা শুনি! আর এক মুহুর্ত আপনাকে টলারেট করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
– রিসিপশনে এসেছেন তো? এখানে সবার সামনে আপনার এই স্ত্রীর গোমড় ফাঁস করে দিলে সেটা ভালো লাগবে আপনার? নেহাৎ আপনার সাথে আমার কোনো শত্রুতা নেই, আপনি আমার কোনো ক্ষতি করেননি বলে একান্তে জানাতে চেয়েছিলাম৷ ওর অতীত এখানে সবার সামনে এলে মান সম্মান আপনারই যাবে। ওই মেয়ের কিছু আসবেও না, যাবেও না। আপনাকে দেখে ভদ্র পরিবারের ছেলে মনে হচ্ছে। কিন্তু আপনার দেখি আমার ভালোমানুষি সহ্য হচ্ছে না৷ ঠিক আছে সবার সামনে গিয়েই বলছি। তামাশা একটু হয়েই যাক। পরে কিন্তু পস্তানোর সুযোগ পাবেন না৷

রেহবার বুঝে গেলো, এই মহিলা ভালোই কুচক্রী। এমন মানুষের কথা কতোটা সত্যি হতে পারা, তা ধারণা করা যাচ্ছে৷ উনি বললেই সে কথা তো আর বিশ্বাস করে নিতে হচ্ছে না৷ নিজের স্ত্রী সম্পর্কে আরেকজনের মুখে বাজে কথা শুনতে একটু খারাপ লাগবে, রাগ হবে। ব্যাপার না, কিছুক্ষণ দাঁত মুখ চিপে সহ্য করাই যায়। মনে মনে নিজেকে প্রস্তুত করে রেহবার বললো,
– কোনো ভণিতা না করে দ্রুত কথা শেষ করে বিদায় হন। আপনাকে বেশিক্ষণ সহ্য করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

জেরিন বাঁকা হেসে গুলিস্তার দিকে তাকালো। এখন গা ছাড়া ভাব নিয়ে জেরিনের কথা শুনতে চাইছে কিন্তু সব জানার পর নিজে থেকে আরও বিস্তারিত জানতে চাইবে৷ তখন জেরিনও তেজ দেখাবে৷
– এই মেয়ের কীর্তি পুরো পাড়ার লোকে জানে। ছোটো থেকে এমন ভ্যাবলার মতো ঘুরতো দেখে লোকে ওকে আধপাগল বলতো। কারো সাথে কথা বলে না। কোনো বন্ধু-বান্ধব নেই। ঘরের কোণে একলা মানুষ হয়েছে। বাপ-মায়ের বুড়ো বয়সের অনাকাঙ্ক্ষিত সন্তান। গর্ভধারণের খবর শুনে ওর মায়ের তো লজ্জায় নাক কাটা যায়। কতো ঔষধপত্র, কতো কবিরাজ! এই বাচ্চা রাখবে না। কিন্তু এই মেয়ে তো জন্ম থেকে গায়ে পরা স্বভাবের। ঠিকই বেঁচে গেলো। দুনিয়ায় আসার পরে ওর মায়ের জান নিয়ে টানাটানি। চাচী আম্মা সেই যে বিছানায় পরলো, তখন থেকে বেচারি অসুস্থ। এই অলুক্ষণে মেয়ে, জন্মের কয়েকদিন পর বাপটাকেও খেয়ে নিলো। আমরা তখনি বুঝে গেছিলাম, আকবর বংশে এক অপয়া জন্ম নিছে৷ আল্লাহ জান দিছে, মেরে তো আর ফেলা যায় না। সব মেনে নিয়ে ওর ভাইগুলা তাও মানুষ করছে ওরে৷ কিন্তু এই মেয়ে এমনভাবে চলাচল করতো যেনো সে এক জনম দুঃখী। পাড়ার কয়েকজন জনদরদীর দরদ উতলে উঠতো ওরে দেখলে। আহারে! জনম দুঃখী মাইয়াটা! মা-ভাইয়ে দেখতে পারে না৷ আমি তো আগে থেকে জানতাম, সব এই মেয়ের নাটক। মানুষের সিম্প্যেথি পাওয়ার ধান্দা। তখন আমার কথা অনেকের পছন্দ হয় নাই। কিছুক্ষণ আগে যেমন আপনার পছন্দ হচ্ছিলো না।

রেহবার কড়া দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। হাত মুষ্টিবদ্ধ করে রাগ নিয়ন্ত্রণ করছে৷ একটা বাচ্চা মেয়ে অবহেলায় বড় হয়েছে, সেটা উনার নিকট সমস্যা মনে হচ্ছে না। উল্টো গুলিস্তার পরিবারকে সাপোর্ট করে কথা বলতেছে। নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ ছুটে গিয়ে ও বলেই ফেললো,
– সে তো এখনো পছন্দ হচ্ছে না।

জেরিন সে বিষয়ে কিছু না বলে বাঁকা হাসলো৷ নিজের উপর তার অগাধ বিশ্বাস আছে।
– যাক গে সেসব কথা! ওরে নিয়ে আমার সমস্যা ছিলো না, যদি না ও আমার শান্তশিষ্ট ভাইটার দিকে হাত বাড়াইতো৷ আকবররা এলাকার স্থানীয়, প্রতাপশালী পরিবার। ওদের সাথে ঝামেলা হয়ে গেলে দোষ তো আমাদের মতো গরীব ঘরের মানুষের দিকেই আসবে৷ এই সহজ কথাটা আমার বোকা ভাইটা বুঝে নাই৷ আমার চাঁদের মতো সুন্দর ভাইটার দিকে নজর পরছিলো এই ডাইনীর। জাহিদের পিছনে ঘুরঘুর করতো, কিন্তু জাহিদ পাত্তা দিতো না৷ অল্প বয়স হলেও আমার ভাই দায়িত্বের দিক থেকে সচেতন। আমাদের টানাটানির গরীব সংসার। জাহিদ তখন নিজের পায়ের দাঁড়ানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে প্রাণপণ। মেয়েদের দিকে তাকানোর সময় কই! মন থেকে চেষ্টা করলে আল্লাহ ফেরায় না৷ জাহিদকেও খালি হাতে ফেরায়নি। আর্মিতে টিকে গেছিলো। কয়েকদিন পরেই ট্রেনিং। আমরা খুশিমনে ওরে বিদায়ের ব্যবস্থা করতেছিলাম। এই মেয়ের তখন মাথা খারাপ অবস্থা। জাহিদ ওর হাত থেকে ছুটে যাচ্ছে। জাহিদকে জোর করতেছিলো, বিয়ে করে যাইতে। শুনে তো জাহিদের মাথায় হাত। এতোদিন পিছে পিছে ঘুরে বিরক্ত করতো, এখন পুরোই উন্মাদ হয়ে গেছে৷ সেদিন বন্ধুদের সাথে দেখা
করে দুপুরবেলা বাড়ি ফিরতে ছিলো। এই উন্মাদ মেয়েটা স্কুল থেকে ফেরার পথে ওর দেখা পায়। আবার স্থান-কাল ভুলে জাহিদের সাথে জেদাজেদি শুরু৷ এতোটাই উন্মাদ হয়ে গেছিলো যে আশেপাশে যে মানুষজন আছে সেই খেয়াল তার নাই৷ আমাদ এখনো মন পরে সেইদিনের কথা। দুপুরবেলা আম্মা কতো শখ করে দেশী মুরগী কষায় ছেলের জন্য অপেক্ষা করতেছিলো৷ হঠাৎ বাড়িতে খবর আসলো, জাহিদকে নাকি আকবর বাড়ির মেয়ের সাথে আপত্তিকর অবস্থায় স্কুলের পেছনে আটক করা হইছে। আমাদের তো মাথায় হাত৷ আমার আম্মা ভাতের হাড়ি চুলায় রেখে দৌড়। আব্বা-আম্মার কথা শোনার মতো কেউ নাই। টাকার জোরে মানুষ ন্যায় অন্যায় ভুলে যায়। আকবরদের অবস্থা আরও ভয়ানক। একে তো টাকার জোর, আরেকদিকে ঘরে চারটা জোয়ান ছেলে। আমার নির্দোষ ভাইটারে রাস্তায় ফেলে অমানুষের মতো মারছে৷ বিচার-সালিশের ধার ওরা ধারে নাই। আরও হাস্যকর ঘটনা শোনেন, চুপিচাপে যতোটুকু বিচারের আসর বসলো সেখানেও এই মেয়ে একটা কথা বলে নাই। হ্যাঁ, না কিচ্ছু না৷ অথচ দোষ আমার ভাইয়ের কাঁধেই এলো। জাহিদ নাকি ওকে বিরক্ত করছে। আমি তাও মনে ক্ষোভ রাখতাম না৷ আল্লাহর কাছে নালিশ করে চুপ থাকতাম। এই নিষ্ঠুর দুনিয়ায় টাকা নাই তো আপনার কথার কোনো দাম নাই। কিন্তু ওরা আমার ভাইটার ভবিষ্যত নষ্ট কর দিছে। ওরে এমনভাবে মারছে যে ডান হাতটা ভেঙে গেছে।এতোদিনের স্বপ্ন, এতো পরিশ্রম বৃথা হয়ে গেছে। ওর স্বপ্ন, ওর চাকরীটা হাতছাড়া হয়ে গেছে। বেচারা ট্রেনিং এ যেতে পারে নাই। আমাদের পরিবারটা কতো কষ্টের দিন পার করছে আপনি ভাবতেও পারবেন না। অর্থ কষ্টে আমাদের কোনোরকমে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটে। অথচ একই দায়ে দায়ী, এই মেয়েটার জীবনে কি পরিবর্তন হয়েছে ওকে জিজ্ঞাসা করুন৷ কয়েকদিন স্কুল যাওয়া বন্ধ করে ঘরবন্দী থাকলো৷ আস্তে আস্তে পাড়ার মানুষজন ঘটনা ভুলে গেলো। এখন দেখেন, বিয়ে করে কী সুন্দর ঘর সংসার করতেছে! আমাদের পুরো পরিবারটা যার পাপে ভেসে গেলো, তার সুখ দেখে আমার হিংসা হওয়া কি স্বাভাবিক নয়? আমি সারাজীবন এই মেয়েকে অভিশাপ দিয়ে যাবো৷ দুনিয়ায় শাস্তি না পেলে, আখিরাতে দাবী নিয়ে আল্লাহর সামনে দাঁড়াবো। তবুও ওর শাস্তি আমি চাইবো।

জেরিন সেখানে আর দাঁড়ালো না। কান্নায় সিক্ত গাল মুছে দ্রুত পায়ে স্থান ত্যাগ করলো। রেহবার মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। জেরিন নামক মহিলাটিকে এখন আর ওতোটা খারাপ লাগছে না। উনার চোখে মুখে যন্ত্রণার ছাপ, চোখ বেয়ে গড়ে পরা অশ্রু কখন যেনো রেহবারের হৃদয়ের তিক্ততা ধুয়ে মুছে দিয়েছে সে টেরও পায়নি। ক্যারিয়ার গঠনের চিন্তা একজন পুরুষকে কতোখানি যন্ত্রণা দেয়, চিন্তায় রাখে, সে জানে। পড়াশোনা শেষ করে সে নিজেও তো হন্য হয়ে আয়ের পথ খুঁজছিলো৷ এমন নয় যে তাদের আর্থিক কষ্ট ছিলো। তবুও পড়াশোনা শেষ করার পর নিজস্ব আয়ের তাগিদ আপনা থেকেই এসে যায়। বাবার টাকায় জীবনযাপন করা ভীষণ বোঝা মনে হয়৷ আর্থিক স্বচ্ছলতার মাঝেও কোম্পানিকে প্রতিষ্ঠিত করার চিন্তায় রেহবারের রাতের ঘুম উড়ে গিয়েছিলো, সেখানে পুরো পরিবারের দায়িত্ব যে ছেলেটির কাঁধে তার নিশ্চিত চাকরীটি হাতছাড়া হওয়ায় তার কেমন লেগেছিলো? জাহিদের সেই মরণ যন্ত্রণা অনুভব করে পেরে রেহবারের মাথায় ভীষণ যন্ত্রণা করতে শুরু করলো। বগুড়ায় গুলিস্তার পরিবারকে যতোটুকু দেখেছে, তাদের মধ্যে উগ্রভাব লক্ষনীয়৷ সেখানে দাঁড়িয়েই অস্থির মস্তিষ্কে হিসাব মিলিয়ে ফেললো। পাশ ফিরে তাকাতেই দেখলো, গুলিস্তা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাই তুলছে। তার চোখে নেমে আসছে রাজ্যের ঘুম। রেহবার অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো, সেই মেয়েটির দিকে যাকে ঘিরে এতো আয়োজন। অথচ সে যেনো এসব থেকে অনেক দূরে অন্য কোনো গ্রহের বাসিন্দা।

(চলবে..)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here