#গল্পঃ_হৃদয়ে_লাগিল_দোলা_
#পর্বঃ_৩৮
#লেখিকাঃ_নুসাইবা_জান্নাত_আরহা_
মোমবাতি হাতে নিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে এলো আদ্রিশ। অধরের কোণে এখনও তার লেপ্টে রয়েছে সেই চমৎকার মনকাড়া হাসি। সাথে মাতাল করা এক চাহনিতে চেয়ে আছে সে আমার পানে। আমাদের চোখাচোখি হতেই বরাবরের ন্যায় চোখ নামিয়ে নিলাম আমি। হৃদস্পন্দন এখনও অস্বাভাবিকভাবে স্পন্দিত হচ্ছে আমার। অশান্ত চাহনিতে একবার পুরো কক্ষে চোখ বুলিয়ে নিলাম। তবে অরনী, রিশতা বা আয়ুশী ভাবি, কারো ছায়াও নজরে এলো না আমার।
-‘ ভয় পেয়েছিলে মেহুপাখি?
একপ্রকার ঘোরের মাঝে চলে গিয়েছিলাম তবে ধ্যান ভাঙে আদ্রিশের বলা কথায়। মনে এতোটাই ভয় জেঁকে বসেছিল যে আদ্রিশ আমায় প্রশ্ন করলেও কোনোরূপ জবাব দিতে পারলাম না।
বেড সাইড টেবিলের উপরে মোমবাতিটা রেখে, আমার দিকে এগিয়ে এসে আমায় টেনে নিজের পাশে বসাল। আমার কাঁধে হাত রেখে গম্ভীর গলায় বলল
-‘ অরনীদের সামনে খুব তো বড়াই করে বলেছিলে যে মেয়েরা নাকি ছেলেদের বিয়ে করে, ছেলেরা রাতে ঘুমাতে ভয় পায় বলে, তাছাড়া নাকি জামাই আহামরি আর কিছুই না! তাহলে আমার বদলে তুমি কেন ভয় পেয়েছো মেহরুন? নাকি ধরে নিবো তুমি একটা আস্তো ভীতুর ডিম!
আদ্রিশের কথায় থতমত খেয়ে গেলাম আমি। সত্যিই ভয় পেয়েছিলাম, তবে নিজের বাসা হলে হয়তো এতোটা ভয় হতো না। আদ্রিশ পুনরায় বলল
-‘ কি ব্যাপার, ভয় পেয়ে আবার বোবা হয়ে গেলে নাকি?
আমি মাথা নাড়ালাম শুধু। প্রসঙ্গ পাল্টাতে তাই চট করে বলে বসলাম
-‘ আচ্ছা টর্চলাইট বা মোবাইলের ফ্লাশ থাকতে, মোমবাতি কেন জ্বালাতে গেলে?
-‘ কারণ আছে। বাই দ্যা ওয়ে এখন যে রাত সাড়ে এগারোটারও বেশি বাজতে চলল খেয়াল আছে কোনো?
দেয়ালঘড়ির দিকে তাকিয়ে কথাটা বলে ওঠে আদ্রিশ। আমি চমকে তাকালাম সেদিকে। আড্ডায় এতোটাই মশগুল ছিলাম যে এতোটা সময় পেরিয়েছে খেয়ালই হয়নি আমার! তাছাড়াও এখন তো সন্ধ্যে হয়ে পারেনা ওমনিই আটটা বেজে যায়! আর ওরাও বা কেমন, আমায় না বলেই অন্ধকারে একা ফেলে চলে গেল! ভাগ্যিস সময়মতো আদ্রিশ এসেছিল নয়তো ভয়ে শুকিয়ে মরতাম আমি!
আমার হাতখানা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে সে বলল
-‘ এতো বড় হয়েছো তবুও মাথার বদ বুদ্ধিগুলো যায়নি। আছো শুধু আমায় কষ্ট দেওয়ার বেলায়। যেদিন আমি থাকবো না সেদিন বুঝবে আমার মর্ম!
আচমকা আদ্রিশের এহেন কথায় বুকটা ধক করে ওঠে আমার। তার হাত চেপে কপট রাগ দেখিয়ে বললাম
-‘ খবরদার এমন কথা যেন তোমার মুখে আর দ্বিতীয়বার না শুনি!
আমার কথায় আদ্রিশ সূক্ষ্ম হেসে বলল
-‘ তোমার ভাষ্যমতে জামাই তো আহামরি কিছুই না! তাহলে আমি মরলে তোমার কি তাতে?
এমন কথা শুনে এবার আদ্রিশের বুকে অজস্র কিল-ঘুষি মেরে ক্রন্দনরত গলায় বললাম
-‘ তুমি খারাপ, প্রচন্ড রকমের খারাপ! আমায় প্রতিনিয়ত আঘাত কর। ছোট থেকে এই অবধি আমার আবেগ-অনুভুতি নিয়ে ঠাট্টা করতেও তুমি দু’বার ভাবতে না!
এতোটুকু বলে আমি চলে আসতে নিলেই আদ্রিশ একটানে ওর বুকের সাথে মিশিয়ে নেয় আমায়। গালে হাত ঠেকিয়ে বলল
-‘ ছোট থেকে এই অবধি আমি তোকে আঘাত করলাম কবে? আমার জানা মতে তো তোর গায়ে একটা ফুলের টোকাও পড়তে দেইনি আমি! তবে? আর আমি কখনোই তোর অনুভূতি নিয়ে ঠাট্টা করিনি মেহু! আগেও বলেছি আমি শুধু তোকে ভালোইবাসিনি, সম্মানও করেছি। সবসময় আমি চাইতাম তুই জীবনে সফল হ। আমাদের সমাজে ক’জন পুরুষ চায় যে মেয়েরা তাদের থেকেও এগিয়ে থাকুক! তারা তো উল্টে চায় মেয়েদেরকে কিভাবে দমিয়ে রাখা যায়। ইভেন এর মাঝে আমার নিজের বাবাও ছিল। তবে আমি কখনোই তেমন ছিলাম না। এইযে এখন তোর নিজস্ব একটা পরিচয় হয়েছে, কিন্তু তখন যদি তোর তালে তাল মিলিয়ে বিয়ে করে নিতাম, তাহলে তুই এতদূর পৌঁছাতে পারতিস? তোকে আমি ভালো মতোই চিনি, না চাইতেও যখন আমায় পেয়ে যেতিস তখন তোর পড়াশোনা লাটে উঠত একেবারে! আর তাছাড়া তখন তোর সবে সতেরো ছিল, বাল্যবিবাহ করলে তো আমার জেল হতো, তুই তখন সংসার করতিস কার সাথে?
নির্বিকার হয়ে শুনছিলাম তবে তার কথা শেষ হতেই বললাম
-‘ হয়তো গায়ে হাত তোলোনি তবে ধমকও তো কম দাওনি!
-‘ হয়তো মাঝে মধ্যে একটু আধটু ধমক দিতাম তবে এই ধমকানোর আড়ালে আমার এই পিচ্চিটাকে আমি নিজের চাইতেও বেশি ভালোবাসতাম!
এতোটুকু বলেই আদুরে ভঙিতে আমার নাক টেনে দিয়ে, ললাটে নিজের অধরজোড়া ছুঁইয়ে ভালোবাসার পরশ এঁকে দিয়ে আমায় নিজের সাথে জড়িয়ে নেয় আদ্রিশ।
একসময় তার ওমন ব্যবহারে খুব খারাপ লাগত আমার কেননা তখন ছোট ছিলাম এতোটা বুঝ হয়ে উঠেনি, তবে বুঝতে শিখেছিলাম আদ্রিশ চলে যাওয়ার পর, তখন থেকেই নিজেকে নিজে গড়তে শিখেছি। বলাবাহুল্য আলভি ভাইয়ার মাধ্যমে আদ্রিশ সবসময় খোঁজখবর রেখেছে আমার, তবে সে ঢাকায় থাকাকালীন সময়টায় আমার সাথে যোগাযোগ করতে চাইলেও আমি-ই করিনি আর। কেননা ততদিনে আমার অভিমান প্রগাঢ় হয়েছিল। এজন্য আদ্রিশ ফেরার পর তার থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলতাম! তবে কালের পরিক্রমায় দূরত্ব ঘুচেছে সেই কবেই!
কিছুক্ষণ পর আমায় ছেড়ে দিয়ে আদ্রিশ বলল
-‘ আমার খিদে পেয়েছে ভীষণ, তোমার জন্য আমিও খাইনি। এখন খিদের জ্বালায় পেটে ইঁদুর চিঁউচিঁউ করছে। এমন চলতে থাকলে আমার মৃত্যু নিশ্চিত!
আবারও সেই এককথা! আমি এবার রেগে গেলাম ভীষণ। মৃদু চেঁচিয়ে তাই বললাম
-‘ এমন অলক্ষুণে কথা যদি আর দ্বিতীয়বার শুনেছি তবে আমি তোমার ঠোঁট কেটে দিব!
-‘ ঠোঁট কেটে নিলে তোমায় চু’মু খাব কিভাবে, বউ?
শুরু হয়ে গেল আবার অভদ্রের মতো কথাবার্তা। কপট রাগ দেখিয়ে তাই আলতো হাতে আদ্রিশ গালে থাপ্পড়ে দিলাম। ফলে আদ্রিশ এবার নিজের গালে হাত রেখে করুণ সুরে ছড়া কাটল
-‘ “আঁতা গাছে তোতাপাখি,
ডালিম গাছে মউ।
বিয়ার আগে আব্বায় মারতো,
বিয়ার পরে বউ।”
আদ্রিশের এমন উদ্ভট ছড়া শুনে আমি না হেসে পারলাম না আর। আমায় হাসতে দেখে এবার টুপ করে আমার গালে চু’মু দিয়ে বসল সে। হাসি থামিয়ে সরু চোখে আদ্রিশের পানে চাইলাম একবার। সে আমার গাল টেনে দিয়ে দাঁত কেলিয়ে হেসে বলল
-‘ এই যে আমার মিসেস মেহরুন ইবনাত খান ওমন সুচালো দৃষ্টিতে তাকিওনা আমার দিকে। তোমার ঐ ধারালো চাহনি আমার বুকে তীরের মতো বিঁধে! নিজেকে তখন সামলে রাখা বড় কঠিন হয়ে পড়ে যে আমার!
-‘ তুমি কি আর ভালো হবেনা এ জনমে!
-‘ কেন আমি ভালো ছিলাম না কবে, আমি তো একেবারে খাঁটি ইনোসেন্ট বয়!
-‘ ইনোসেন্ট না ছাঁই, আগেই ভালো ছিলে এখন তো অভদ্র হয়ে যাচ্ছো দিনদিন!
-‘ যদি সত্যিই অভদ্র হয়ে যাই তবে মনে রাখিস অভদ্র হয়েছি শুধুমাত্র তোর জন্যে।
-‘ কেন আমি আবার কি করলাম!
-‘ তুমি যে আহিরের সাথে প্ল্যান করে আমায় জেলাস ফিল করাতে সে আমি ভালো করেই জানতাম। আমার লুকানো অনুভূতিগুলো জানতে চাইতে না? এখন যখন সব অনুভুতি প্রকাশিত হয়ে গেছে তখন পালাতে চাও কেন আমার থেকে? মনে রেখো মেয়ে, পুরুষের ভালোবাসা ভয়ংকর রকমের সুন্দর! একবার তা প্রকাশ পেয়ে গেলে প্রতিনিয়ত তার প্রেয়সীকে লজ্জায় পড়তে হয়!
আদ্রিশের কথায় লজ্জার চাইতেও অবাক হলাম বেশ। আদ্রিশ তবে এসবও জেনে গেছে, কিন্তু কিভাবে জানল লোকটা, অন্তর্যামী নাকি!
এরই মাঝে কোথ থেকে বিচ্ছুর দলগুলো ছুটে এসে আমাদের দিকে ফুলের পাপড়ি আর জরি ছিটিয়ে দিয়ে চিৎকার করে বলে উঠল
-‘ হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ মেহু! মেনি মেনি হ্যাপি রিটার্নস্ অফ দ্যা ডে!
ওদের কথা কর্ণপাত হতেই দেয়াল ঘড়ির দিকে নজর যায় আমার। ঘড়িতে তখন বারোটা বাজে! আজ চার তারিখ আমার জন্মদিন! আমার মনে ছিল ঠিকই কিন্তু ওদের করা কর্মকান্ডে কয়েক মুহুর্তের জন্য ভুলতে বসেছিলাম তা। ওরা দু পাউন্ডের একটা হার্ট সেইপের কেক নিয়ে এগিয়ে এলো আমাদের পানে।
ছুরিটা হাতে নিয়ে আদ্রিশ আমার হাত ধরে কেকটা কেটে আমায় খাইয়ে দিতে দিতে বলল
-‘ হ্যাপি বার্থডে আমার প্রিয় মেহুপাখি। ভাগ্যিস এইদিনে তুমি পৃথিবীতে এসেছিলে নয়তো তুমিহীনা আমায় একলা একলাই চিরকাল কাটাতে হতো!
আদ্রিশের কথায় উপস্থিত সবাই ফিক করে হেসে ফেলল। এবারে কেকের আরেকটু অংশ কেটে সর্বপ্রথম আদ্রিশকে খাইয়ে দিলাম আমি। আমার এমন কান্ডে আদ্রিশ তো বেজায় খুশি। তাই বাছবিচার না করেই খুশিতে সবার সামনেই আমায় জড়িয়ে ধরল সে। এদিকে লজ্জায় আমার অবস্থা যায়যায় হবার উপক্রম!
পাশ দিয়ে রিশতা টিপ্পনী কেটে বলল
-‘ থাক ভাইয়া হয়েছে, বউকে পরেও ভালোবাসা যাবে। কিন্তু তার আগে আমাদের খাবারের ব্যবস্থা করেন, খিদেয় পেটে ছুঁচো দৌড়াচ্ছে তো! শুধুমাত্র আপনার আর মেহুর জন্য বেচারা আমরা এখনও খেতে অবধি পারিনি!
রিশতার কথা শুনে আদ্রিশ ছেড়ে দেয় আমায়। খুকখুক কেশে সবার খাবারের বন্দোবস্ত করে সে। বেচারাগুলো আদ্রিশের কথায় আমার জন্মদিনের জন্য অল্প সময়েই এসব করেছে! ফলে অন্ধকারে আমায় ফেলে যাওয়ার জন্য রাগ হলেও আর কিছু বললাম না। কেননা ওরা আমার জন্য যা করেছে, তার কৃতজ্ঞতা বলে শেষ হবেনা।
সবাই মিলে একসাথে খাওয়া দাওয়ার পর যে যার কক্ষে চলে যায়। যাওয়ার আগে অরনী, রিশতা আর আয়ুশী ভাবি রসিকতা করে বলে গেল
-‘ কিরে আমাদের চারজনের না একসাথে থাকার কথা ছিল!
-‘ আমে দুধে মিশে গেল আর আমরা আঁটিরা এখন বাগানে গড়াগড়ি খাই!
-‘ আমাদের আদ্রিশ ভাইকে ছাড়া আমার ননদিনী দেখি থাকতেই পারেনা।
ওদের কথায় আরও একদফা লজ্জায় পড়তে হলো আমার। কোনোরকমে ওদের বিদায় জানিয়ে চলে এলাম। তাকে ছাড়া একটু বোনেরা মিলে একসাথে থাকতে চেয়েছিলাম তাতেই যেকথা শুনিয়ে দিল লোকটা!
আমায় আসতে দেখে পুনরায় নিজের সাথে জড়িয়ে নেয় আদ্রিশ। গাল আলতো করে একহাত ঠেকিয়ে আড়ষ্ট গলায় বলল
-‘ এতোকিছু যখন জেনেই ফেলেছো, তবে এটাও জেনে রাখ আমার মিসেস, আমার “মেহুরানী”, যাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে আমার সব স্বপ্ন। যার অগাধ বিচরণ আমার এই অন্তরে! যার আবাস আমার এই বুকের বাঁ পাশে। আমার বক্ষপিঞ্জরের খাঁচায় তুমি বন্দি হয়ে থাকবে আজন্মকাল। এই আদ্রিশ খান হতে তোমার আর কোনো নিস্তার নেই “মিসেস মেহরুন আদ্রিশ খান”। তোমার জন্য আমার এই বুক উজার হোক। আমরা দুটি মিলেমিশে একাকার হয়ে যাব এই মধুচন্দ্রিমার রাত্রে। এখন থেকে তবে আমাদের জুটির নাম দিলাম, “মেহাদ্রিশ”।
জড়িয়ে ধরলাম আদ্রিশকে। মানুষটা সত্যিই চমৎকার ব্যক্তিত্বের অধিকারী! একদম আমার মনের রাজ্যের রাজা! আদ্রিশ এবার আমার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল
-‘ আকাশে আজ পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছে! চলো দুজনে মিলে চন্দ্রবিলাশ করে আসি।
আদ্রিশের কথামতো মাথা নাড়িয়ে সায় জানালাম আমি। আমার সম্মতি পেতেই আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে জানালার পাশে দাঁড়াল। মিষ্টি শীতল হাওয়া এসে শরীর মনে দোলা দিয়ে যায়! আদ্রিশের কাঁধে মাথা রেখে আমি প্রকৃতি দেখতে ব্যস্ত আর আদ্রিশ তার প্রেয়সীকে দেখায়!
মাঝেমধ্যে আমার বড্ড ভয় হয়, আচ্ছা এতো সুখ সত্যিই সইবে তো আমার নাকি এক দমকা হাওয়ায় সমস্তটা ওলাট পালট হয়ে যাবে?
(চলবে)
নেক্সট পর্ব পোস্ট করার সাথে সাথে পেতে পেইজটি ফলো করছেন না কেনো..!?😪

