একটি_অপ্রেমের_গল্প #জান্নাতুল_ফারিয়া_প্রত্যাশা ৩৬+৩৭

0
344

#একটি_অপ্রেমের_গল্প
#জান্নাতুল_ফারিয়া_প্রত্যাশা
৩৬+৩৭

(৩৬)

‘তাহলে সেই ব্যক্তি অমিত নয় অয়ন?’

চোখ তুলে তাকাল অন্বিতা। সদ্য কান্নায় ভেজা পিঙ্গলবর্ণ চোখে চেয়ে কিঞ্চিৎ হাসল মাহির। অন্বিতার এক হাত টেনে নিজের মুঠোয় ভরল। কন্ঠস্বর খাদে নামিয়ে বলল,

‘এই যে ধরেছি, পৃথিবীর আর কোনো শক্তি এই বন্ধন ছিন্ন করতে পারবে না।’

বিষাদ সিন্ধু চিত্ত জুড়ে এক টুকরো স্বস্তির ঢেউ আছড়ে পড়ল। অন্বিতা অপর হাত এগিয়ে রাখল তাদের হাত জোড়ার উপর। প্রশ্ন করল,

‘সত্যি তো?’

মাহির ঠোঁট চেপে মাথা নাড়িয়ে বলে,

‘তিন সত্যি।’

অন্বিতা পরম আবেশে তার মাথা হেলিয়ে দেয় মাহিরের বাহুতে। মাহিরের হাত যুগলের মাঝে এখনও তার হাত। অন্বিতা পরিশ্রান্ত স্বরে বলল,

‘অয়ন আমাকে পছন্দ করতেন। আমাকে এটা দুইদিন আগে অমিত জানিয়েছেন।’

মাহিরের মাঝে তেমন ভাবান্তর এল না। অন্বিতাকে সে পেয়ে গিয়েছে একেবারের জন্য। মেয়েটা এখন কেবল’ই তার অধিকার। কেউ চাইলেই তা হরণ করতে পারবে না। তাই কে পছন্দ করল বা না করল তাতে তার কিছু যায় আসে না। সে জানে, অন্বিতার জীবনে তার বাবার পর এখন সবথেকে প্রিয় পুরুষ তার স্বামী। এই স্থান কখনও দ্বিতীয় কেউ নিতে পারবে না। অন্বিতার হাতে আলতো হাত বুলিয়ে সে বলল,

‘তোমার কি আফসোস আছে?’

মাথা তুলে চকিতে তাকাল অন্বিতা। ভীত সুরে বলল,

‘আফসোস? কীসের আফসোস?’

অন্বিতার ভয়ার্ত, চুপসানো মুখ দেখে হাসল মাহির। মনের মধ্যে তার বিশ্বাসের দৃঢ়তা বাড়ল। প্রসন্ন গলায় বলল,

‘অয়ন ভালো ছেলে। কয়দিনের পরিচয়ে আমার তাই মনে হয়েছে। ও তোমাকে পছন্দ করে সেটা ওর কোনো ব্যবহারে আমি বুঝতে পারিনি। তবে আজ তুমি আলাদা কথা বলতে চাওয়াতে আমি ব্যাপারটা টের পেলাম।’

অন্বিতা ক্ষীণ সুরে বলল,

‘আমি শুধু উনাকে বুঝিয়েছি, আর কিছুই না।’

মাহির এগিয়ে এসে অন্বিতার ললাটে গভীর চুম্বন এঁটে দিয়ে বলল,

‘তোমাকে আমি বিশ্বাস করি, অন্বি। তাই আর এত জড়তা দেখাতে হবে না।’

মাহিরের ঠোঁটের স্পর্শ পেয়ে ব্রীড়ায় আরক্ত হলো অন্বিতা। চোখ নামিয়ে ফের মাহিরের বাহুতে মাথা ঠেকিয়ে বলল,

‘আমি তোমার এই বিশ্বাস আজীবন অক্ষুন্ন রাখব। তবে আপনার বোন শশী, সে তো ব্যাপারটা ঘোলাটে করতে চাইবে।’

‘চিন্তা করো না। আমি সামলে নিব সব।’

অন্বিতা মুচকি হেসে চোখ বুজল। মনে ভীষণ শান্তি অনুভূত হচ্ছে। সুখ সুখ আমেজ যেন চারদিকে। মাহির পাশে হেলান দিয়ে বসে তার প্রিয়তমার স্ত্রীর অস্তিত্ব অনুভব করছে। চিত্ত জুড়ে বয়ে চলছে অদ্ভুত শিহরণ। কত বিধ্বস্ত রাত, কত মুমূর্ষু দিন কাটিয়ে আজ এক হয়েছে তারা। এবার খুঁটি বসিয়েছে শক্ত করে, যেন ঝড় কিংবা ভূমিকম্প, কোনোকিছুতেই সেই খুঁটির অস্তিত্ব না সরে।

মাহিরের গাড়ির পেছনে আরেকটা গাড়ি যাচ্ছে। সেটাতে শশী। চিন্তা শক্তি সমস্ত খুইয়ে দিচ্ছে একটা ঘটনার বিবরণ সাজাতে। অন্বিতা কেন অয়ন নামের ছেলেটাকে আলাদা ডাকল? কী কথা বলল তারা দুজন? মাহির কেন কিছু বলল না? সামান্য প্রতিবেশীর সাথে এমন কী কথা থাকতে পারে তার? শশী চঞ্চল চোখে রাস্তায় তাকায়। উফ, বাসায় কখন যাবে। মা’কে সব না বলা অবধি শান্তি পাচ্ছে না সে।

___________

পেছন পেছন হেঁটে যেতেই হঠাৎই থমকাল। পা থামিয়ে দিল আভা। খানিকটা ঘাবড়ে একটু সরে দাঁড়াল। পেছন ফিরে তাকাল অয়ন। ভ্রু কুঁচকাল। বলল,

‘আপনাকে আমি দেখতে পাচ্ছি, বেরিয়ে আসুন।’

একটা বৈদ্যুতিক খুঁটির পেছনে লুকিয়ে ছিল আভা। অয়নের কথা শুনে জিভ কাটল। কাচুমাচু করে বেরিয়ে এল সে। অয়ন আপাদমস্তক দেখল তাকে। জলদগম্ভীর স্বরে শুধাল,

‘আপনি অন্বিতার বান্ধবী না?’

আভা ত্বরিতে মাথা দুলায়। কুঁচকানো ভ্রু সোজা করে অয়ন। অন্বিতার বিদায়ের পর অমিত বাসায় চলে গেলেও সে আর যায়নি। মন মেজাজ ঠিক নেই বলে রাস্তার পাশে হাঁটছিল। আর তখন থেকেই মনে হচ্ছিল কেউ একজন অনুসরণ করছে তাকে।

সে গুমোট স্বরে বলল,

‘আমাকে ফলো করছিলেন কেন?’

আভা নতমস্তকে হাত কঁচলাচ্ছে। অস্থির অস্থির লাগছে তার। ঠোঁট কামড়ে একবার অয়নকে দেখে আবার চোখ নামায়। বিরক্ত হচ্ছে অয়ন। সে উত্তর না পেয়ে হাঁটা ধরে। আভার সংবিৎ ফেরে তখন। ছুটে যায় অয়নের কাছে। পাশে দাঁড়িয়ে বলে,

‘একটা কথা ছিল।’

পা থামায় অয়ন। আভার দিকে না তাকিয়েই জিজ্ঞেস করে,

‘কী কথা?’

আভা আমতা আমতা করে বলে,

‘আপনার ফেসবুক আইডি’টা একটু দেয়া যাবে?’

কপালে ভাঁজ পড়ে অয়নের। সন্দিগ্ধ চোখে আভাকে দেখে। আভা অপ্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে। অয়ন স্বাভাবিক গলায় বলে,

‘আমার ফেসবুক নেই।’

বড়ো বড়ো চোখে তাকায় আভা। বিস্ময়াবিষ্ট সুরে বলে,

‘এই যুগে এসে আপনার ফেসবুক নেই? কী আশ্চর্য!’

অয়ন উত্তর না দিয়ে আবার হাঁটতে উদ্যত হয়। আভা ফের তাকে আটকে বলে,

‘হুয়াট’স অ্যাপ আছে নিশ্চয়?’

‘না।’

অয়নের স্বাভাবিক জবাবে অস্বাভাবিক বিরক্ত হলো আভা। ক্ষিপ্ত সুরে বলল,

‘ফোন নাম্বার আছে তো, না-কি সেটাও নেই?’

অয়ন তপ্ত গলায় শুধায়,

‘এসব দিয়ে আপনার কী কাজ?’

ধমক দিল না-কি? আভার চোখ মুখ ম্লান হলো। সে ক্ষীণ সুরে বলল,

‘আপনার সাথে যোগাযোগ রাখার জন্য।’

‘আমার সাথে যোগাযোগ রাখতে চাওয়ার কারণ?’

আভা উত্তর পেল না এবার। যোগাযোগ রাখতে চাওয়ার কারণ অনেক। তবে সেসব এই ছেলেকে এখনই বলা যাবে না। তাই ছোট্ট করে শুধু বলল,

‘এমনি।’

‘উপযুক্ত কারণ ছাড়া আমি অপরিচিত কাউকে আমার ফোন নাম্বার দিই না।’

আভা উত্তেজিত হয়ে বলল,

‘আমি অপরিচিত নয়। আমি অন্বিতার একমাত্র বেস্ট ফ্রেন্ড।’

‘অন্বিতার বেস্ট ফ্রেন্ড অন্বিতার পরিচিত, আমার না। আসি।’

ফের হাঁটা ধরল অয়ন। মুখ ভার হলো আভার। হৃদয় ব্যথিত হলো সূক্ষ্ম ছ্যাঁকায়। চোখে মুখে উপচে পড়া দুঃখ নিয়ে বলল,

‘আপনার নাম্বার আমি নিয়েই ছাড়ব।’

অয়ন শুনতে পেল কি-না কে জানে। সে আর ফিরে তাকাল না। আভাও চলে গেল বিপরীত পথে।

__________

অনিচ্ছা, অসম্মতিকে এক কোণে দমিয়ে রেখে জিনিয়া বেগম অন্বিতা আর মাহিরকে বরণ করে ঘরে তুললেন। মুখে তার কৃত্রিম হাসি আর কারো নজরে না পড়লেও অন্বিতার নজরে ঠিকই পড়ল।

নতুন বউ জুড়ে যেমন হৈ চৈ, হুল্লোর, উত্তেজনা, চঞ্চলতা থাকে এই বাড়িতে তা তেমন একটা নেই। বিয়ে বাড়িটা ম্লান। অন্বিতার শ্বশুরবাড়ির মানুষ বলতে আজ আছে মাহিরের দাদু, ফুপি, ফুপাতো বোন আর মামা। ঘরের কাজের লোকেরা একটু ব্যস্ত হলেও তেমন আড়ম্বরতা দেখাচ্ছে না। অন্বিতাকে ঘিরে নেই কোনো আয়োজন। জিনিয়া বেগম যে বরণ করে রুমে গিয়েছেন আর আসেননি। তার পেছন পেছন গিয়েছে শশীও। বসার ঘরে সোফায় দাদু, মামা, অন্বিতা আর মাহির বসা। কাজের লোকেরা নাস্তা এনে সাজিয়েছে। অন্বিতার মধ্যে ঠিক বউ বউ জড়তাটা কাজ করছে না। এই বাড়িতে আগেও একবার এসেছিল। সেদিন এসেছিল প্রেমিকা হিসেবে। আর আজ এসেছে বউ হয়ে। বসার ঘরে ডানের খালি দেয়ালে বড়ো ছবিখানার দিকে তাকাল সে। ঠোঁট কোণে ঝুলাল অমায়িক হাসি। ছবিতে মাহিরের মা বাবা। শুনেছে, মাহির খুব ছোটবেলায় মা বাবা হারিয়ে এতিম হয়েছে। মা’র পক্ষে মামা আর বাবার পক্ষে দাদু, ফুপিকে ছাড়া সে তার এই জীবনে আর কাউকে চেনে না। এই মানুষগুলোই বড়ো করেছে তাকে। বিশেষ করে দাদু। ছোট থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া অবধি মানুষটা ঠায় তার পাশে ছিল।

নিগূঢ়, নিষ্পলক চোখে ছবিটা একটুক্ষণ দেখে মলিন হাসল অন্বিতা। ভাবল, “আজ এই দুজন মানুষ বেঁচে থাকলে হয়তো তাদের বিয়েটা আরো চমৎকার হতো। চমৎকার হতো তাদের সংসার জীবন।”

মামা চশমাটা চোখে ঠেলে বললেন,

‘মাহির, অন্বিতাকে নিয়ে রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও।’

মাহির মাথা নাড়িয়ে উঠে দাঁড়াল। অন্বিতার দিকে চেয়ে বলল,

‘চলো।’

কেন যেন লজ্জা পেল অন্বিতা। সে এখন মাহিরের রুমে যাবে, যে রুমটা আজ থেকে তারও। অযথা লজ্জা পাওয়া বদনে উঠে দাঁড়াল সে। শম্বুক গতিতে এগুলো মাহিরের পেছন পেছন।

চলবে…..

#একটি_অপ্রেমের_গল্প
#জান্নাতুল_ফারিয়া_প্রত্যাশা
৩৭।

মাহিরের রুমে এসে চমকাল অন্বিতা। বাড়িটাতে বিয়ে বাড়ির আমেজ না থাকলেও এই ঘর জুড়ে বাসর ঘরের আমেজ পরিপূর্ণ। অতিশয় সুন্দর ভাবে সাজানো চারদিক। বিছানার উপর ফুলের সমারোহ। বাতাবরনে গোলাপের তীক্ষ্ণ ঘ্রাণ। অন্বিতার বক্ষস্থলের কম্পন তরান্বিত হলো। ধীর পায়ে ভেতরে প্রবেশ করল সে। মাহির অন্বিতার দিকে চেয়ে বলল,

‘তোমার ব্যাগটা ওখানে রাখা। ব্যাগ থেকে কাপড় নিয়ে ফ্রেশ হয়ে এসো।’

অন্বিতা মাথা ঝাঁকিয়ে ব্যাগ খুলতে গেল। মাহির বিছানায় বসল গিয়ে। আশপাশটা ভালোভাবে পরখ করতে করতে বলল,

‘বাড়িতে কেউ ছিল না বলে ইভেন্টের লোকেরা নিজের মর্জি মতোই সাজিয়েছে।’

অন্বিতা একটা সুতি শাড়ি বের করে উঠে দাঁড়াল। বলল,

‘বেশ ভালো সাজিয়েছে।’

মাহির খুশি হলো। জিজ্ঞেস করল,

‘পছন্দ হয়েছে তোমার?’

অন্বিতা স্মিত হেসে বলল,

‘হ্যাঁ।’

এরপর ফ্রেশ হতে গেল সে। মাহির প্রসন্ন চিত্তে বসা। ফুলের ঘ্রাণ বক্ষস্থলের আন্দোলন বাড়াচ্ছে তার। অন্বিতাকে সে সত্যিই পেয়ে গিয়েছে, তার ভালোবাসা সফল, ভাবতেই নতুন উন্মাদনায় মন মত্ত হচ্ছে যেন।

________

‘এসব কী বলছিস? এতকিছুর পরেও মাহির হাসি মুখে মেয়েটাকে বাড়ি নিয়ে এল?’

শশী বিছানায় শুয়ে মাথার নিচে হাত ভাঁজ করে বলল,

‘সাধে কি আর বলি ঐ মেয়ে তোমার ভাতিজাকে জাদু করেছে। প্রমাণ পেয়েছ তো এবার?’

‘তা তুই ছিলি কী করতে? কিছু বলতে পারলি না।’

চট করে উঠে বসল শশী। কুপিত সুরে বলল,

‘এতগুলো মানুষের সামনে আমার অপমানিত হওয়ার কোনো শখ ছিল না।’

তপ্ত শ্বাস ছাড়লেন জিনিয়া বেগম। মনের ভেতরটা রাগে, ক্ষোভে নিশপিশ করছে। ইচ্ছে করছে এক্ষুনি গিয়ে ঐ মেয়েটাকে ঘর থেকে বের করে দিতে। শশী সন্দিগ্ধ সুরে বলল,

‘তোমার কী মনে হয়, মা? ঐ ছেলের সাথে কি অন্বিতার সম্পর্ক থাকতে পারে?’

‘আলবাত পারে, নয়তো বিয়ের দিন কোন মেয়ে অন্য ছেলেকে এভাবে ডেকে নিয়ে কথা বলে?’

শশী ঠোঁট কামড়ে একটুক্ষণ ভেবে বলল,

‘এবার কী করবে?’

জিনিয়া বেগম চোখ বুজে কী যেন ভাবলেন। চোখ খুলে বললেন,

‘চল, তোর নানাভাইয়ের রুমে যাই।’

_____________

ওয়াশরুমে শাড়ি পরার মতো কঠিন কাজ দ্বিতীয় আর কিছু নেই বোধ হয়। হাঁপিয়ে উঠেছে অন্বিতা। কোনোভাবেই শাড়িটাকে আয়ত্তে নিতে পারছে না। এদিকে টান দিলে ঐদিক মেঝেতে পড়ে, ঐদিকে টান দিলে এদিক। ভেজা মেঝেতে পড়ে শাড়িও ভিজে যাচ্ছে তাই। সে উপায়ান্তর না পেয়ে দরজা মেলে একবার উঁকি দিল বাইরে। দেখল মাহির নেই। ভালোভাবে পরখ করে নিল- না নেই। কোনোরকমে শাড়িটা শরীরে জড়িয়ে বেরিয়ে এল সে। তারপর প্রথমেই গিয়ে মাহিরের রুমের দরজাটা আটকে দিল। আয়নার সামনে দাঁড়াল অতঃপর। ঊর্ধ্বশ্বাস ফেলে শাড়িটা ছুড়ে ফেলল মেঝেতে। আয়নার তার অর্ধন গ্ন প্রতিবিম্ব। শাড়ি পরায় ব্যস্ত সে। বারান্দা থেকে বের হওয়ার অভিমুখে এমন দৃশ্যে থতমত খায় মাহির। চট করে পেছন ফিরে যায়। বুকের বা পাশে হাত রেখে জোরে নিশ্বাস ফেলে। পরক্ষণেই আবার ভাবে, সে এত ঘাবড়ে গেল কেন? অন্বিতা এখন তার বউ, তাকে এখন সে যেকোনো অবস্থাতেই দেখতে পারে। এই ভেবে আবার ঘুরে দাঁড়ায় মাহির। অন্বিতা তখন শাড়ির কুঁচি তুলছে। মাড় ভাঙা নয় বিধায় সুতি শাড়িতে কুঁচি উঠছে না ঠিকঠাক। তার কুঁচকানো ভ্রু, বিরক্ত মুখ দেখে মাহির হাসল। এগিয়ে এসে ঠিক দাঁড়াল অন্বিতার সম্মুখে। আচম্বিত কারোর আগমনে ধরফরিয়ে উঠে অন্বিতা। মাহিরকে দেখে লজ্জায়, আতঙ্কে মুখ লাল হয়ে যায়। শাড়িটা কোনোরকমে শরীরে পেঁচিয়ে অপ্রস্তুত সুরে বলে,

‘তুমি রুমে ছিলে? আমি দেখিনি কেন?’

মাহির মৃদূ হাসল অন্বিতার আরক্তিম মুখশ্রী দেখে। বলল,

‘বারান্দায় ছিলাম।’

অন্বিতা ইতস্তত সুরে বলল,

‘ওয়াশরুমে শাড়ি ভিজে যাচ্ছিল বলে রুমে এসেছি। ভেবেছিলাম তুমি নেই।’

‘কেন, আমি থাকলে অসুবিধা কীসের?’

ভ্রু নাচিয়ে শুধাল মাহির। কন্ঠে স্পষ্ট দুষ্টুমি। অন্বিতা বলল,

‘অবশ্যই অসুবিধা আছে। তুমি রুম থেকে বের হও।’

‘আমার রুম, আমি থাকব না যাব সেটা আমার ইচ্ছে। আমি অবশ্যই তোমার কথা শুনব না।’

অন্বিতা কপাল কুঁচকে তাকাল। মাহিরের চোখ মুখের চঞ্চলতা দেখে আবার দৃষ্টি নামিয়ে ফেলল সে। মাহির এগিয়ে এসে হাঁটু ভাঁজ করে বসল। শাড়ির কুঁচিতে হাত রেখে বলল,

‘আমি সাহায্য করছি।’

অন্বিতা বাধা দিল না। মাহির সযত্নে একটি একটি করে কুঁচি ধরে ঠিক করে দিল। সবগুলো কুঁচি একসাথে ধরে পেটের কাছে হাত নিতেই নড়ে উঠে অন্বিতা। মাহিরের হাত থেকে কুঁচিগুলো নিয়ে বলে,

‘আমি গুঁজে নিচ্ছি।’

মৃদু হেসে উঠে দাঁড়াল মাহির। অন্বিতা কুঁচি গুঁজে নিয়ে আঁচল টেনে ঠিক করল। মাহির ড্রেসিং টেবিলের উপর থেকে একটা পিন নিয়ে পেছনে গিয়ে দাঁড়াল তার। ব্লাউজের সাথে আঁচলটা ভালোভাবে পিন দিয়ে এঁটে দিল। অন্বিতার মুখের রং এখনও স্বাভাবিক হয়নি। আয়না দিয়ে তা দেখে মাহিরের চিত্তচঞ্চল হলো। গ্রীবাদেশের চুল হটিয়ে তাতে গাঢ় চুম্বন এঁকে সরে দাঁড়াল সে। শিরশিরিয়ে উঠল অন্বিতার পুরো শরীর। লজ্জায় আর তাকাতে পারছে না। মাহির এসে বলল,

‘ভূমিকাতেই এত লজ্জা পেলে সমাপ্তিতে গিয়ে তো তোমাকে আর খুঁজেই পাওয়া যাবে না।’

অন্বিতা নির্বাক, নিরুত্তাপ। মাহির নিজ থেকেই বলল,

‘বাকি লজ্জাটুকু রাতের জন্য রেখে এবার নিচে চলো। দাদু তাড়াতাড়ি খেয়ে ফেলেন, তাঁর সাথে আমাদের আজ বসতে হবে।’

এতক্ষণে মৃদু আওয়াজে জবাব দিল অন্বিতা। বলল,

‘তুমি যাও, আমি আসছি।’

আলতো হেসে মাহির বেরিয়ে এল সেখান থেকে। সে বেরিয়ে যেতেই হাফ ছাড়ল অন্বিতা। এতক্ষণ দম যেন ধরে রেখেছিল সে। আয়নায় দেখল নিজেকে। গালগুলো দেখে বিরক্ত হয়ে দুই হাত ঘঁষে বলল,

‘আশ্চর্য! এত লাল হওয়ার কী আছে?’

তারপর হালকা পাতলা গয়না পরে নিল সে। মাথায় টানল বড়ো করে ঘোমটা।

মাহিরের মামা খেয়ে দেয়ে আরো আগেই বেরিয়ে গেছেন। এখন ডাইনিং-এ বসেছেন দাদু, জিনিয়া বেগম, শশী, মাহির আর অন্বিতা। বাড়ির কাজের লোকেরা তাদের খাবার বেড়ে দিচ্ছে। নতুন বউ বিধায় অন্বিতা খাওয়া চলছে না ঠিক মতো। শশী মা’কে কী যেন ইশারা করল। জিনিয়া বেগম চোখের পাতা ঝাপটে আশ্বস্ত করলেন তাকে। এরপর তাঁর বাবার দিকে চেয়ে বললেন,

‘বাবা, তুমি কি কিছু বলবে না?’

মাহির অন্বিতা দুজনেই তাঁর দিকে তাকায়। মাহির মুখের খাবারটা গিলে জিজ্ঞেস করল,

‘কী ব্যাপারে, ফুপি?’

জিনিয়া বেগম কপাল কুঁচকে মাহিরের দিকে চাইলেন। ক্ষুব্ধ সুরে বললেন,

‘তোমার বউয়ের ব্যাপারে।’

এই পর্যায়ে হাত থেমে যায় অন্বিতার। সে ভ্রু কুঁচকে জিনিয়া বেগমের দিকে তাকায়। মৃদু সুরে জিজ্ঞেস করে,

‘আমি কী করেছি, ফুপি?’

আগুনে ঘি ঢালার ন্যায় চেতে উঠলেন জিনিয়া বেগম। রোষপূর্ণ স্বরে বললেন,

‘কী করোনি তুমি, সেটা বলো। সদ্য বিয়ে করা বরকে পাশে রেখে বাইরের ছেলের সাথে আলাদা কথা বলতে যেয়ে আবার জিজ্ঞেস করো, কী করেছ?’

অন্বিতার চৌকস চাহনি তখন শশীর উপর বর্তাল। এই মেয়েটা এত কুৎসিত মনের কেন কে জানে। ঠিক মা’কে এসে উল্টা পাল্টা লাগিয়ে দিয়েছে।চোয়াল দৃঢ় করল মাহির। রাশভারী স্বরে বলল,

‘অন্বিতা আমাকে বলেই তার সাথে কথা বলেছে। যেখানে আমার বউকে নিয়ে আমার কোনো আপত্তি নেই, সেখানে তোমাদেরও কোনো সমস্যা হবে না, আশা করছি।’

জিনিয়া বেগম তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন,

‘তোমার কেমন করে আপত্তি থাকবে, মেয়েটা তোমাকে অন্ধ করে ফেলেছে কি-না। এখন তো তার সাত খুনও মাফ।’

‘সেই সাত খুন সাত অপরাধীকে করলে আমি সেটা অবশ্যই মাফ করব। এই ব্যাপারে নিশ্চিন্তে থাকো।’

শশী মাঝে ফোঁড়ন কেটে বলল,

‘কাকে কীসব বলছো, মা? অন্বিতা তো মাহিরকে বশ করে ফেলেছে, এখন দুনিয়ার সবাই একদিকে আর তার বউ একদিকে।’

মাহির হাসল। বলল,

‘ঠিক বলেছিস। যা বলেছিস শুধু সেইটুকু মনে রাখবি, তাহলেই হবে। আর একটা কথা, অন্বিতাকে ভাবি বলে সম্বোধন করবি। নাম ধরে ডাকবি না।’

অপমানে মুখ থমথমে হলো শশীর। দাঁত দাঁত চেপে চেয়ে রইল সে। জিনিয়া বেগম ক্ষিপ্ত সুরে বাবাকে বললেন,

‘বাবা, তুমি কি কিছুই বলবে না? তোমার নাতি আমার মেয়েটাকে কীভাবে অপমান করছে দেখতে পাচ্ছো না তুমি?’

দাদুর খাওয়া শেষ। তিনি পাশ থেকে তোয়ালেটা তুলে মুখ হাত মুছলেন। তারপর তীক্ষ্ণ চাহনিতে একবার দেখলেন সবাইকে। অতঃপর প্ররিশ্রান্ত বদনে বললেন,

‘ওরা দুজন এখন স্বামী স্ত্রী। ওদের মধ্যকার ব্যাপার ওরা বুঝে নিবে, সেটা নিয়ে তোমরা এত মাথা ঘামাচ্ছ কেন?’

দাদুর পাল্টা প্রশ্ন পেয়ে অন্বিতা প্রসন্ন হাসল। এতক্ষণের সব রাগ, দুঃখ ফিঁকে হয়ে পড়ল মাহিরের জবাবে আর দাদুর সমর্থনে। জিনিয়া বেগম আর শশী ক্ষুব্ধ হয়ে বসে রইলেন। এতক্ষণ ধরে লোকটার কান ভেঙে কোনো লাভ’ই হলো না। শশী ফোঁস ফোঁস করতে করতে চলে গেল সেখান থেকে। দাদুও লাঠি ভর করে উঠে নিজের রুমের দিকে পা বাড়ালেন। মাহির ফুপির দিকে চাইল। বলল,

‘ফুপি, নিজের মেয়ের বয়সী একটা মেয়ের সাথে অযথা লাগবে না। আমার স্ত্রীর সম্মানে আঘাত করলে আমি কিন্তু ভুলে যাব তুমি আমার বাবার বোন।’

চলবে…..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here