#শুনলাম_বসন্ত_নাকি_আবার_এসেছে
#লেখিকা_সিনথিয়া_জাহান
#পর্বঃ২০
প্রগাঢ় নিরবতা বিরাজমান ৷ বেশ কিছুক্ষণ আগেই তুবা আর স্বাধীনের প্রফেশনাল কথাবার্তা বলা শেষ হয়েছে ৷ আজ অন্যদিনের তুলনায় একটু বেশি সময় নিয়ে কাউন্সিলিং করেছে স্বাধীন ৷ বর্তমানে দুজনে চুপচাপ বসে আছে ৷ বারবার একে অপরের দিকে তাকিয়ে শুকনো হাসি হাসছে ওরা কিন্তু কেউ কিছু বলছে না ৷
তুবা বাড়ি থেকে ঠিক করে এসেছে আজ স্বাধীনকে ইনিয়ে বিনিয়ে নিজের মনের কথা বলবে ৷ যদি পজিটিভ ইঙ্গিত পায় তাহলে সোজা বাবাকে গিয়ে কথাটা বলবে কেননা তানজিদের সামনে ও বি*ব্রতিতে পড়তে চায় না ৷ যদি স্বাধীন রিজেক্ট করে দেয় তাহলে তানজিদের মাথা কাটা যাবে যেটা তুবা কখনো চায় না ৷ তাই এই সিদ্ধান্ত কিন্তু মনে মনে ঠিক করে রাখা একটা কথাও তুবা বলতে পারছে না ৷
অবশেষে কিছুটা সাহস সঞ্চার করে তুবা গলা খাকারি দিয়ে কিছু বলতে যাবে তার আগেই স্বাধীন বসা থেকে উঠে বলল,,,
চলুন আপনাকে এক কাপ কফি খাওয়াই ৷ কথা বলতে বলতে নিশ্চয়ই গলা শুকিয়ে গেছে ৷
তুবা মাথা কাত করে সায় জানাল ৷ দুজনে স্বাধীনের চেম্বার থেকে বেরিয়ে পাশের একটা কফিশপে চলে গেল ৷ শপে প্রবেশ করতেই শপের ম্যানেজার বলে উঠল,,,,
আসসালামু আলাইকুম স্যার এন্ড ম্যাম ৷
স্বাধীন আর তুবা সালামের জবাব দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করল ৷ ম্যানেজার ওদের একটা টেবিলে বসিয়ে দিয়ে একজন ওয়েটারকে ডাকল ৷ ওয়েটার টা আসতেই ম্যানেজারটা আন্তরিক হেসে বলল,,,
আপনাদের অর্ডার দিন ৷ বাই দা ওয়ে ইউ আর আ লাভলি কাপল ৷ নাইস চয়েজ স্যার ৷
উনার কথা শুনে তুবা আর স্বাধীন কেশে উঠল ৷ ম্যানেজার কথাটা বলার পরই চলে গিয়েছে তাই ওদের অবস্থা প্রত্যক্ষ করল না ৷ তুবা আর স্বাধীন বিব্রতিতে পড়ে গেল ৷ ওয়েটার টা তাড়া দিতেই স্বাধীন গলা খাকারি দিয়ে নিজেকে সামলে ছোট্ট করে বলল,,,
টু কফি প্লিজ ৷
ওয়েটার টা চলে যেতেই দুজনে মাথা নিচু করে বসে থাকল ৷ এখনও অস্বস্থি কাটেনি ওদের ৷ কিছুক্ষণ পর স্বাধীন গলা খাকারি দিয়ে অত্যন্ত স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,,
উই লুক গুড টুগেদার ৷
তুবা চকিতে মাথা তুলে অবাক কন্ঠে বলল,, হ্যাহ?
বললাম আমাদের একসাথে দারুন লাগে ৷ তাই বলছি সারাজীবন আমাদের একসাথেই থাকা উচিত ৷ সবাই যেন আমাদের একসাথে দেখে মুগ্ধ হয়ে যায় ওকে? এর বেশি কোনো কারন নেই ৷ শুধু মানুষের থেকে এতো সুন্দর কমপ্লিমেন্ট শোনার জন্যই আমাদের একসাথে থাকা উচিত ৷
তুবার চোয়াল ঝুলে গেল ৷ টিটকারি মে*রে বলে উঠল,,,, আপনি কি আমাকে ইনডিরেক্টলি বিয়ের প্রস্তাব দিলেন?
না তো ৷ একদম না ৷ আমি ডিরেক্টলিই তো দিলাম ৷
এটাকে ডিরেক্টলি প্রস্তাব দেওয়া বলে? এভাবে কেউ বিয়ের প্রস্তাব দিতে পারে আমার জানা ছিল না!
জেনে তো গেলেন ৷ এখন বলুন আপনার মত কি?
এবার লজ্জারা এসে তুবাকে জেঁকে ধরল ৷ আড়ষ্ঠতায় চোখমুখ ছেঁয়ে গেল ৷ গলায় এসে কথাগুলো সব আটকে গেল ৷ বেশ কিছু সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরেও যখন জবাব পেল না তখন স্বাধীন স্বাভাবিক কন্ঠে বলে উঠল,,,
বুঝেছি আপনি রাজি না ৷ সমস্যা নেই ৷
তুবা তৎক্ষণাৎ বলে উঠল,,, কে বলেছে আমি রাজি না?
তার মানে আপনি রাজি?
সেটাই বা কখন বললাম?
এবার স্বাধীন দ্বিধান্বিত হয়ে গেল ৷ ভ্রু কুঁচকে বলতে লাগল,,, এই দুটোর মাঝেও কোনো উত্তর আছে জানা ছিল না তো ৷
অনেক কিছুই জানবেন ৷ তার আগে এটা বলুন তো আপনার আমাকে পছন্দ করার কারন কি? আমি তো চশমা পড়ি না ৷
স্বাধীন সামান্য হেসে উঠে বলল,,, চশমা পড়া মেয়েগুলো আমার বোন ৷ আমি কি একবারও বলেছি চশমা পড়া মানুষকে আমার কাছে বউয়ের মতো লাগে? চশমা পড়া মানুষগুলোকে জাস্ট আত্মীয় মনে হয় , বউ না ৷
আত্মীয় আর বউয়ের মধ্যে পার্থক্য কোথায়?
আত্মীয় হচ্ছে বিরিয়ানির মতো যাদের দেখা রোজ পাওয়া যায় না ৷ আর বউ হচ্ছে ভাতের মতো যাকে ছাড়া একদিনও থাকা সম্ভব না ৷
তুবা আহাম্মক হয়ে গেল স্বাধীনের লজিক শুনে ৷ মিনিং টা সুন্দর কিছু উপমাগুলো আজব ৷ অবশ্য সাইক্রিয়াটিস্টের কাছ থেকে এর চেয়ে বেশি আর কিই বা আশা করা যায়?
তুবাকে অন্যমনস্ক দেখে স্বাধীন ওর সামনে চুটকি বাজিয়ে বলল,,, এই যে ম্যাডাম চুপ না থেকে উত্তর দিন ৷ আই ডোন্ট ওয়ান্ট ইউর সাইলেন্স , আই নিড ইউর আনসার ৷
তুবা লাজুক হেসে বলল,,, আমিও সুন্দর কমপ্লিমেন্ট শোনার জন্য আপনার সাথে সারাজীবন একসাথে পা মিলিয়ে চলতে রাজি আছি ৷
ওর জবাব শুনে স্বাধীন মাথা চুলকে মুচকি হাসল ৷ ক্ষণকাল দুজনেই লাজুক হাসতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল ৷ অতঃপর লাজুক হাসি বজায় রেখেই তুবা বলে উঠল,,,
আমার বাবার না আপনাকে অনেক পছন্দ হয়েছে ৷
স্বাধীন লাজুক মুখটা গম্ভীর করে বলে উঠল,,, আপনার বাবাকে বলে দিবেন উনি আমাকে যতই পছন্দ করুক না কেন বিয়ে কিন্তু আমি আপনাকেই করব ৷
তুবা জোরে হেসে উঠে বলল,,, আপনি আসলেই পাগল!
তুবার হাসির ঝংকার স্বাধীনের কানে সুরেলা গলার কোকিলের গানের ন্যায় মনে হলো ৷ মুগ্ধ হয়ে সামনের হাস্যজ্জ্বল রমনীটির দিকে তাকিয়ে থাকল ও ৷
°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°
তুবা নেই তাই আয়েশা অসহায়ের মতো একা একা ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে ৷ হঠাৎ একটা গাছের নিচে সাভাশকে বসে থাকতে দেখে আয়েশার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল ৷ কারন এমন বোরিং ভাবে সময় কাটানোর চেয়ে সাভাশের সাথে ঝগ*ড়া করে সময় কাটানো ঢের ভালো ৷ যেই ভাবা সেই কাজ ৷
লাফাতে লাফাতে চলে গেল ভাইয়ের কাছে ৷ গিয়েই সাভাশের মাথায় একটা গা*ট্টা মে*রে বলল,,,,
কি রে কি করছিস এখানে?
সাভাশ ভ্রু কুঁচকে ওর দিকে তাকিয়ে বলল,,, ভাবলাম ক্যাম্পাস টা জঙ্গল দিয়ে ভরে গিয়েছে তাই একটু ঘাস কাটি ৷ এতোক্ষণ ঘাসই কাটতেছিলাম, তুই কাটবি?
আয়েশা মুখ ভেংচি কেটে বলল,,, কমেডি কমেডি কমেডি দারুন ব্রো ৷
সাভাশ অন্যদিকে দৃষ্টিপাত দিল ৷ আয়েশাও এক সেকেন্ড চুপ থেকে বলে উঠল,,,
তখন ক্লাস থেকে রে*গে বেরিয়ে গেলি কেন?
সাভাশ দাঁতে দাঁত চেপে বলল,,, আমার পাশে বসা মেয়েটা এতো ডিস্টার্ব করছিল যে আর স*হ্য করতে পারিনি শা*লা! ওই মেয়ে পারলে আমার কোলে উঠে যায় এমন অবস্থা!
আয়েশা জোরে হাসতে হাসতে বলল,,, কালাচাঁদকেও মেয়েরা লাইন মা*রে তাহলে? আহারে মেয়েগুলোর টেস্ট এতো নিচে নেমে গেছে ছ্যাহ!
এই পৃথিবীর সবচেয়ে জ*ঘন্য টেস্ট কার হবে জানিস?
আয়েশা অত্যন্ত কৌতূহল নিয়ে বলল,,, কার?
সাভাশ কাটকাট গলায় বলল,,, তোর স্বামীর ৷
আয়েশা সাভাশকে মা*রতে মা*রতে বলল,,, বেদ্দব বেদ্দব বেদ্দব তুই বেদ্দব!
সাভাশ আয়েশার হাত দুটো ঝাটকা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বলল,,, থ্যাংকস ৷
দুজনে আবার চুপ হয়ে গেল ৷ সাভাশ নিজের সবচেয়ে পছন্দের জিনিস, বাদাম, খাচ্ছে একের পর এক ৷ তা দেখে আয়েশার লোভ লাগল ৷ আসলে বাদাম ওর পছন্দ না কিন্তু সাভাশকে খেতে দেখলে ওর সবসময় লোভ লাগে কি আজব!
অনেকক্ষন চেষ্টা করার পরেও যখন লোভ সামলাতে পারল না তখন আয়েশা অত্যন্ত মিষ্টি স্বরে বলতে লাগল,,,,
সাভাশ এই সাভাশ ৷ ভাইয়া শুনছো?
সাভাশ বাদাম খেতে খেতেই বলল,,, ঢং করে লাভ নেই ৷ বাদাম আমি দিব না তোকে ৷
আয়েশা এবার অনুরোধ করে বলতে লাগল,,, দে না একটু ৷ ভাই আমার দে ৷
না দিব না ৷
অনুরোধ করে লাভ না হওয়ায় আয়েশা এবার ওর টি শার্ট খামছে ধরে বলল,,,, এএএ সাভাশের বাচ্চা বাদাম দে , দে বলছি বাদাম ৷
সাভাশ বি*রক্তিতে চ কারান্ত উচ্চারণ করে বলল,,, সর তো বা*ল নাটক করিস না ৷
অনেকক্ষন ধ*স্তাধ*স্তি করার পরও যখন লাভ হলো না তখন আয়েশা বুকে দু হাত গুজে গাছের সাথে হেলান গিয়ে রা*গী মুখে বসে থাকল ৷ আড়চোখে সেটা লক্ষ্য করে সাভাশ ওর মুখের সামনে বাদাম ধরে বলল,,,
নে খা ৷
আয়েশা রা*গ দেখিয়ে বলল,,, না খাব না আমি ৷
সাভাশ এবার অনুরোধ করে বলায় আয়েশা হা করল কিন্তু সাভাশ সেটা ওকে না দিয়ে নিজে খেয়ে নিয়ে হাসতে লাগল ৷ আয়েশা কটমট দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে থাকল ৷ সাভাশ আবারও ওর সামনে বাদাম ধরল , আবারও আয়েশা আপত্তি করল আর আবারও খেতে ধরলে সাভাশ ওকে ধোকা দিল ৷ এভাবে পরপর তিনবার করার পর আয়েশা প্রচন্ড রে*গে গিয়ে কেঁদে ফেলল ৷
এতোক্ষণ সাভাশ হাসছিল ৷ বোনকে কাঁদতে দেখে ও হাসি থামিয়ে ওর রা*গ ভাঙাতে লাগল ৷ অবশেষে রা*গ ভাঙিয়ে সাভাশ নিজ হাতে বোনকে বাদামের খোঁসা ছাড়িয়ে একটা একটা করে খাইয়ে দিতে লাগল ৷ হঠাৎ দূর থেকে কিছু পড়ার শব্দ হলো ৷ দুজনে চকিতে সেদিকে তাকিয়ে কিছু দেখতে না পেয়ে পুনরায় খুনশুঁটি করতে করতে বাদাম খেতে লাগল ৷
°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°
বীর বাংলা লেখা কমপ্লিট করে হঠাৎ আয়েশার দিকে তাকিয়ে বিজ্ঞের মতো বলতে লাগল,,,
এই যে শোনো ৷ তুমি ভার্সিটিতে কারো সাথে প্রেম করো না ঠিক আছে? প্রেম করা ভালো না ৷ বিশেষ করে যেসব ছেলে তোমাকে কাঁদায় সেসব ছেলের সাথে তো মোটেও না ৷
আয়েশার ভ্রু কুঁচকে গেল সাথে ছোট বাচ্চার মুখে এমন কথা শুনে প্রচন্ড হাসিও পেল ৷ বহুকষ্টে হাসি আটকে গলা খাকারি দিয়ে বলল,,,
বাছা এসব কথা তুমি বেশি করে মাথায় রাখবে ঠিক আছে? কোনো মেয়ের সাথে আমি যেন তোমাকে না দেখি নয়তো ছাগলের পিঠে চড়িয়ে সারা এলাকা ঘোরাব!
বীর লাজুক হাসল ৷ আয়েশার মুখে ওসব কথা শুনে লজ্জা পেয়েছে বেচারা ৷ হঠাৎ কারো শিখিয়ে দেওয়া কিছু লাইন মনে পড়তেই ও বলে উঠল,,,
আমি জানি ৷ কিন্তু তুমি প্রেম করবে না বলে দিলাম ৷
করব না বাছা ৷ প্রেম আমার পছন্দ না ৷
বারিশ এতোক্ষণ কফি খাচ্ছিল ৷ আয়েশার শেষোক্ত কথাটা শুনে স্বশব্দে কফির মগটা মিনি টেবিলে রেখে গটগট পায়ে ভিতরে চলে গেল ৷ আয়েশা হতভম্ভ হয়ে বারিশের প্রস্থান দেখল ৷ ও সর্বদাই বারিশকে ইগনোর করে , এখানে এসেও এমন আচরণ করে যেন বারিশ ওর সামনে নেই ৷ কারন এমন ছেলে ওর একদম পছন্দ না ৷ তার উপর বারিশের এই কাঠখোট্টা আচরণগুলো ওকে আরও বি*রক্তি এনে দিচ্ছে লোকটার প্রতি ৷
আয়েশা বীরকে একটা ম্যাথ বুঝিয়ে দিচ্ছিল ৷ তখনই বারিশ ওর সামনে মাঝারি সাইজের একটা গামলা এনে রাখল ৷ আয়েশা দেখল গামলা টা বাদাম দিয়ে ভরা ৷ তা দেখে আয়েশা ভ্রু কুঁচকে বলল,,,
এসব কি?
বাদাম চেনো না তুমি?
বারিশের কাটকাট গলার জবাব ৷ আয়েশা একটু সময় নিয়ে বলল,,,
জানি কিন্তু এখানে কেন?
বারিশ ইশারা করতেই বীর বলতে লাগল,,, আজ আমাকে পড়ানোর এক মাস পূর্ণ হবে ৷ তাই তোমাকে এক বসাতেই সব বাদাম খেতে হবে ৷ একটাও অবশিষ্ট রাখা যাবে না ৷ এটা আমাদের বাড়ির নিয়ম ৷
আয়েশার চোখগুলো রসগোল্লার মতো বড় হয়ে গেল ৷ বিরবির করে বলতে লাগল,,,
এতো বাদাম তো একসাথে সাভাশই খেতে পারবে না সেখানে আমি কোন ক্ষেতের মূলা? এর চেয়ে তো হাচু নানীর স্বজন হারানোর বেদনার কাহিনী শোনা ঢের ভালো!
চলবে,,,,

