আমরন_চেয়েছি_তোমায় ০৫
লেখায়_সুরাইয়া_নওশিন
০৫
সারা আর আয়রা বিকেলে আরহির বাসায় কিছু সময় গল্প গুজব করে আরহির ছোট ভাই লাহাব এর সঙ্গে সময় কাটিয়ে আরহিকে খান বাড়িতে নিয়ে আসে। আরহির ছোট ভাইয়ের বয়স ৭ বছর এবং দুষ্টুমির শিরমনি। আরহির বড় ভাইয়ের নাম লাবিব। নতুন সরকারি চাকরি হয়েছে ঢাকার বাইরে থাকে প্রতি সপ্তাহে বাসায় আসে সে।
সারা, আরহি আর আয়রা করিডরে সোফায় বসে আছে আর নূর জাহান বেগম পাকোড়া বানিয়ে দিচ্ছেন তারা গরম গরম বসে খাচ্ছে৷ আর তিনজন মিলে জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছে। আর একটু পর পর শব্দ করে হেঁসে উঠছে। এমন সময় শাহানা বেগম কিছু ফল আর লেবুর শরবত ট্রে তে সাজিয়ে এনে সারাকে উদ্দেশ্য করে বলে,,
” সারা মা এটা তোর সাফি ভাইকে দিয়ে আয়। দেরি হয়ে গেলো আমার রেডি করতে, একটু পর তোর ভাই আবার বের হবে।”
সারা তৎক্ষনাৎ দ্রুত বেগেই বলে,,
” আমি পাকোড়া খাচ্ছি। যেতে পারবো না আপনি যান”
শাহানা বেগম বিরক্ত স্বরে বলে,,
” বলার আগেই না। এতো ফাঁকিবাজ কেন তুই।”
শাহানা বেগম আরহির দিকে তাকিয়ে নরম স্বরে বলে,,
” যা তো মা তুই দিয়ে আয়। আমি তোর ছোট কাকিমা সাহায্য করি একা হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে। কাজের মহিলাও নেই আজ। তোর খালামনি ঘুমাচ্ছে, বেচারা এমনি অসুস্থ থাকে ডাক দেওয়া ঠিক হবে বল।”
আরহি খান বাড়িতে অনেকটা পরিবারের সদস্যদের মতো। অনেক বছরের আসা যাওয়ায় হয়ে গিয়েছে এমন সম্পর্ক। সাফির সামনে যেতে ভীষণ রকম ভয় পেলেও শাহানা বেগম এর অনুনয় কারনে মানা করতে পারলো না। তাই বাধ্য হয়ে বলে,,
” ঠিক আছে কাকিমা দেন আমি দিয়ে আসছি।”
শাহানা বেগম যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলেন। খুশি হয়ে বললেন,,
” লক্ষী মেয়ে একটা। আর আমার একটা মেয়ে হয়েছে একে বিয়ে দিলে নালিশ এর ডালা আসবে এই বাড়িতে। ”
সারা মুখ বাঁকিয়ে বলে,,
” প্রতিটা মা এমনি হয়। একটু কথার অবাধ্য হলে শশুর বাড়ির খোঁচা দেওয়া শুরু করে। হু”
আরহি মৃদু স্বরে হেঁসে শাহানা বেগম এর থেকে ট্রে নিয়ে সাফির ঘরের উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়। আর মনে মনে হাজারো বার দোয়া দরুদপাঠ করতে থাকে। খান বাড়িতে তার প্রতিদিন আসা যাওয়া হলেও সাফি ঘরে সে শুধু এইস এস সি পরীক্ষা দেওয়ার সময় পড়ার জন্য বাধ্য হয়ে ঢুকেছে। সাফি আর তার বাবা এবং বড় ভাইয়ের কড়া আদেশে সারা আর আরহি মিলে এক সঙ্গে সাফির কাছে পড়তে হয়েছে। এইস এস সি পরীক্ষা শেষ হয়েছে আর ভুলেও এই ঘরে পা রাখে নি সে। সাফিকে আরও এতো ভয় পাওয়ার কারন সাফিকে সে শুরুতে পড়তে এসে ভাইয়া বলে সম্মোধন করেছিলো কিন্তু সাফি তাকে এক কড়া আদেশে স্যার ডাক শিখিয়েছে। বরাবরই এমন গম্ভীর মুখ দেখে এসেছে সে। তাই তার নাম নিয়ে দিয়েছে প্যাঁচা মুখো। আজ আবার শাহানা বেগম এর অনুনয় কারনে এই কক্ষে পা রাখতে হচ্ছে। ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বুকে ফুঁ দিয়ে লম্বা এক শ্বাস টেনে আওয়াজ দেয় আরহি।
” স্যার আসবো।”
সাফি এডমিশন শিক্ষার্থীদের অনলাইনে ক্লাস নেয়। অনেক অনুরোধ এ রাজি হয়েছে হিসাববিজ্ঞান ক্লাস নিতে। মাত্র লাইভ শেষ করে বসেছে। পুরোনো মার্কার কালি ফেলে দেওয়ার উদ্দেশ্যে টেবিলে রেখে দিয়েছিলো সাফি।নিজের অসাবধানতার জন্য ছোট দূর্ঘটনার কারনে টেবিলে রাখা মার্কার কালি সম্পূর্ণ পরে যায় তার গাঁয়ে। তার হাত, পরনে খয়েরী রঙের টি-শার্ট আর মেঝেতে দাগ লেগে যায়। নিজের উপর বেশ বিরক্ত হলো সাফি। এতটা অসাবধান ভাবে কাজ পছন্দ করে না অথচ আজ নিজেই করে বসেছে। হাতটা বাজে ভাবে মেখেছে। আর টি-শার্ট এর নিচের অংশে দাগ লেগে গিয়েছে। তবে প্যান্টের অনেকাংশ মেখে গিয়েছে। সেই দিকেই মনযোগ সাফি তাই কোনো আওয়াজ শুনতে পেয়ে বিরক্ত ভরা কন্ঠে বলে উঠে,,
” হুম এসো।”
আরহি আবারও বুকে ফুঁ দিয়ে ঘরে প্রবেশ করে। আরহি ঘরে প্রবেশ করে অবাক হয়ে তাকিয়ে রয়েছে। যতবার এই ঘরে প্রবেশ করেছে এই ঘর পরিপাটি দেখেছে সে। একদম গোছালো মানুষ। মেঝেতে কালি ছড়িয়ে আছে। সাফির হাত আর টি-শার্ট কালো রঙে মাখা। আরহির হাঁসি পেলেও সাফির ভয়ে হাঁসতে পারলো না। সাফি তার দুই হাত ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বিরক্ত হয়ে সামনে তাকায়। আরহিকে নিজের ঘরে দেখে বেশ খানিকটা অবাক হলেও আরহির হাতে ট্রে দেখে বুঝতে পারলো সবাই ব্যস্ত থাকায় তাকে পাঠানো হয়েছে। সাফি অনুরুপ তার গম্ভীর কন্ঠে বলে,,
” টেবিলে রেখে যাও। আর সাবধানে দেখে হেঁটো ফ্লোরে মার্কারের কালি পরেছে।”
আরহি হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়িয়ে বলে,,
” আচ্ছা।”
সাফি বিরক্ত হয়ে সোফায় গিয়ে বসে পরে। এমনিতেই তার কাজ রয়েছে অনেক। আরও কাজ বাধিয়ে ফেললো সে। আরহি সাবধানে হেঁটে টেবিলে খাবার রেখে দিলো। এরপর সাফির দিকে তাকিয়ে ধীর কন্ঠে বলে,,
” রেখে দিয়েছি। আসি তাহলে।”
” মাজেদা খালাকে পাঠিয়ে দিও তো। এই কালি গুলো দ্রুত পরিষ্কার করতে হবে।”
” শুনলাম খালাতো নেই। তাই আমাকে আসতে হলো।”
সাফি বেশ বিরক্ত স্বরে বলে উঠে,,
” উফ অসহ্য।”
আরহি একটু মনে সাহস নিয়ে প্রশ্ন করে সাফিকে,,
” কি হয়েছে স্যার।”
সাফি স্বাভাবিক ভাবে জবাব দেয়,,
“এমনিতেই দেরি হয়ে গিয়েছে। যেতে হবে আমার অফিসে। তার ভেতর দেখো আর একটা উটকো ঝামেলা। কখন কি করবো আমি। যে ভাবে গাঁ মেখেছে আবারও শাওয়ার নিতে হবে। ক্লিন করবো, নাকি রেডি হবো, নাকি অফিস যাবো অসহ্য।”
সাফির চোখে মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ। এই প্রথম সাফির প্রতি তার দয়া হলো। বেচারাকে সাহায্য করা উচিত বলে মনে করলো আরহি। মানুষটা গম্ভীর প্রকৃতির হলেও তার সাথে তো তার কোনো শত্রুতা নেই।
আরহি আবারও ধীর কন্ঠে বলে,,
” আমি কি হেল্প করবো।”
সাফি একটু থেমে জবাব দেয়,,
” হেল্প করবে, আচ্ছা করো অনেক উপকার হয় তাহলে আমার।”
সাফি একটু অবাকও হলো যে মেয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে ভয় পায় আজ নিজ থেকে উপকার করতে চাইছে। তবে তার জন্য ভালোই হলো।
সাফির তিনটা ফোন। দুইটা সব সময় তার সাথে থাকে। আর একটা বাসায়। একটা ফোন তার খুবই ব্যাক্তিগত এবং খুবই স্পেশাল , এ ফোনের নাম্বার তার খুবই কাছের গুরুত্বপূর্ণ মানুষ গুলো জানে। আর একটা ফোনের নাম্বার তার কর্মস্থলে, ভার্সিটি সব জায়গায় দেওয়া। আর একটা ফোন দিয়ে লাইভে ক্লাস নেয়।
এমন সময় বিছানায় থাকা সাফির সে স্পেশাল ফোনটা বেজে উঠে,,
” দূরে কোথাও আছি বসে
হাত দুটো দাও বাড়িয়ে
বিরহ ছু’তে চায় মনের দুয়ার
দু’চোখ নির্বাক আসোনা ছুটে
তুমি এলে রংধনু রং ঢেলে দেয়
তুমি এলে মেঘেরা বৃষ্টি ছড়ায়
এই মনের আহলাদ আসোনা ছুটে”
সাফির ঘরে এমন গান বেজে উঠায় বিশাল বড়সড় ধাক্কা খেলো আরহি। তার মতো জড়বস্তু, অনুভূতিহীন, গোমড়া মুখো, একটা রসকষহীন, কাঠখোট্টা মানুষের ঘরে এমন গান বেজে উঠলে বিশাল বড়সড় ধাক্কা খাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। আরহি বিশ্বাস করতে পারছিলো না, নিজের কান কে অবিশ্বাস করে ভাবলো বাইরে থেকে আসছে হয়তো। কিন্তু আরহিকে আরও বড়সড় ধাক্কা দিতে সাফি বলে উঠে ,,
” আরহি আমার বেড থেকে ফোনটা আনো তো।”
আরহি বিস্মিত নয়নে তাকিয়ে বলে,,
” মানে।”
সাফি নিজের দুই হাত দেখিয়ে বলে,,
” দেখেছো আমার হাত। এই হাতে ফোন ধরতে পারবো আমি। আর ফোনটা ধরা গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত নিয়ে আসো ফাস্ট।”
আরহি ঝড়ের গতিতে বিছানা থেকে ফোনটা নিয়ে সাফির দিকে এগিয়ে গিয়ে হাত বাড়িয়ে বলে,,
” এই নিন স্যার।”
সাফি এবার খুব বিরক্ত হলো আরহির উপর। মানুষ এতোটা নির্বোধ কিভাবে হয়। সাফি এবার বিরক্ত স্বরে বলে,,
” ফোন ধরতে পারলে তোমাকে আনতে বলি আমি।”
আরহি তৎক্ষনাৎ বিষয়টি বুঝতে পারে। কিন্তু সেই মুহুর্তে ফোনের লাইন কেটে যায়। আরহি ভয়ে শুকনো ঢোক গিলে। আবারও বেজে উঠে ফোন। সাফি বিরক্ত স্বরে বলে,,
” এবার ফোনের লাইন কেটে যাওয়ার আগে ফোনটা রিসিভ করে আমার কানে ধরো।”
আরহি হয়তো আজ বড়সড় ধাক্কা খেতে খেতে এই অল্প বয়সে নিজের প্রান হারাবে। আরহি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে সাফির দিকে। সাফি এবার শাসন এর কন্ঠে বলে,,
” কি হলো রিসিভ করো।”
আরহি কাঁপা কাঁপা গলায় বলে,,
” করছি।”
আরহি এবার ফোনের দিকে তাকালো। নিহাল নাম লেখা ভেসে আছে। তবে ফোনের ওয়ালপেপার দেখে আরও বড়সড় ধাক্কা খেলো আরহি। এক দিনে এতো বড়সড় ধাক্কা নিতে পারছে না আরহি। এই তো এখনি মাথা ঘুরে পরে যাবে সে। দুটো ছায়া, আন্দাজ করতে কষ্ট হলো না একটা ছেলের আর একটা মেয়ের। আরহি কাঁপা কাঁপা হাতে একবার ফোন রিসিভ করতে ব্যর্থ হলেও পরিবর্তিতে ঠিক সক্ষম হয়েছে। সাফির কানে ফোন ধরতে ভীষণ হাত কাঁপছে তার। সাফির খোঁচা খোঁচা কালো দাঁড়ি গুলো আরহির হাত স্পর্শ করতেই অসম্ভব ভাবে হাত কেঁপে উঠে তার। সাফি খুব বেশি হলে ১ মিনিট কথা বলেছে। এই এক মিনিটে আরহির নাজেহাল অবস্থা, অসম্ভব হাতের কাঁপুনি। মাথা নিচু করে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে আরহি। আরহির এমন মুখের গঠন আকৃতি দেখে ঠোঁট চেপে হাঁসে সাফি। নিজেকে স্বাভাবিক করে অনুরূপ গম্ভীর কন্ঠে বলে,,
” কথা বলা হয়ে গিয়েছে ফোন সরাও।”
আরহি অনেকটা চমকে গিয়ে দ্রুত গতিতে ফোন সরিয়ে নেয় কান থেকে। সাফি আবারও বলে,,
” ফোনটাও ঠিক ভাবে ধরে রাখতে পারো না। এই ভাবে ফোন কাঁপলে কথা বলা যায়। ”
আরহি চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। সাফি সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলে,,
” আমি শাওয়ার নিতে যাচ্ছি। তুমি যেভাবে পারো কালি গুলো ক্লিন করে ফেলো।”
আরহি এদিক ওদিক তাকিয়ে ভীত কন্ঠে বলে,,
” কি দিয়ে ক্লিন করবো।”
সাফি কিছু সময় ভেবে নিজের টি শার্ট খুলে আরহির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে,,,
” এটা দিয়ে করো। এই টি-শার্টে দাগ লেগে গিয়েছে। আর কাজ নেই এর।”
আরহি একবার সাফির দিকে তাকিয়ে দ্রুত গতিতে চোখ নামিয়ে নেয়। মনে মনে বলে,,
” প্যাঁচা মুখো জানতাম নির্লজ্জ জানতাম না। এই ভাবে কোনো মেয়ের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে।”
সাফি মিটিমিটি হেঁসে বলে,,
” কিছু বললে আরহি।”
আরহি মাথা নিচু করে না সূচক মাথা নাড়ায়।
” ওকে।”
সাফি ওয়াশরুমে পা বাড়াতে যাবে তখন কিছু ভেবে আবারও থেমে যায়। আরহির দিকে তাকিয়ে বলে,,
” আর একটা হেল্প করো। আলমারি থেকে তোমার ইচ্ছে মতো একটা ড্রেস বের করে বেডে রাখো। আমার কাজটা আরও এগিয়ে থাকলো। ”
কথাটি বলে সাফি ওয়াশরুমে চলে যায়। আরহি হা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুহুর্তে কিছু ভেবে আরহির রাগে কপাল কুচকে আসে। কোমড়ে দুই হাত রেখে বলে,,
” কথায় আছে না বসতে বললে খেতে দিতে হয়, আর খেতে দিলে শুতে দিতে হয়, আর শুতে দিলে ঘুমাতে দিতে হয়। কোন দুঃখে যে এই প্যাঁচা মুখোকে দেখে আমার দয়া হলো। দয়া দেখিয়ে একটু উপকার চাইলাম আর কত খাঁটিয়ে নিচ্ছে। আরও দেখা দয়া। কানে ধরেছি আর এই প্যাঁচা মুখোর উপর কোনো দিন দয়া করবো না আমি। কালির ভেতর ডুবে থাক প্যাঁচা মুখো, হুতুম প্যাঁচা একটা।”
রাগে গজগজ করতে করতে আলমারি দিকে এগিয়ে যায় আরহি। এরপর আলমারি খুলে আরহি হা হয়ে তাকিয়ে থাকে। মানুষটার রুচি আছে বলতে হবে। সব শার্টের রঙ গুলো খুব সুন্দর। আরহি এর ভেতর একটা কফি রঙের শার্ট বের করে নিলো, একটা কালো প্যান্ট আর একটা কালো বেল্ট বের করে বিছানায় রেখে দিলো।
বাসায় সব সময় মার সাথে কাজ করায় কাজে খুব চালু আরহি। তাই এই টুকু কাজ করতে খুবই অল্প সময় লাগলো। মেঝে পরিষ্কার করে, কি ভেবে টেবিলটাও যতটুকু এলোমেলো ছিলো সেটাও গুছিয়ে দিলো। আর মার্কার কালির বক্স গুলো দরজায় রাখা ডাস্টবিনে ফেলে দিলো। এতোটুকু সময়ে সাফি শাওয়ার নিয়ে বেরিয়ে এলো ওয়াশরুম থেকে। পরনে শুধু সাদা টাওয়াল। আর একটা টাওয়াল দিয়ে ভেজা চুল মুছতে মুছতে বেরিয়ে এলো সাফি। চুল মুছতে মুছতে আরহির দিকে তাকিয়ে বলে,,
” হয়েছে।”
টেবিল থেকে পরে যাওয়া একটা কলম তুলে টেবিলে রাখতে রাখতে সাফির দিকে তাকিয়ে চোখ মুখ খিঁচে বন্ধ করে আবারও উল্টো ঘুরে তাকিয়ে বলে,,
” হয়ে গিয়েছে। আমি আসছি এখন।”
আরহি আর এক মুহুর্ত দাঁড়িয়ে না থেকে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে আসে সাফির ঘর থেকে। সাফি আরহির যাওয়ার দিকে তাকিয়ে নিশব্দে হেঁসে বিছানায় গুছিয়ে রাখা কাপড় গুলোর দিকে তাকিয়ে ভ্রু জোড়া বাঁকিয়ে বলে,,
” গ্রেট”
আরহি এক দৌড়ে করিডরে এসে সারার পাশে বসে। আরহিকে এমন হাঁপাতে দেখে সারা ভ্রু বাঁকিয়ে বলে,,
” কি হয়েছে? এমন হাঁপাচ্ছিস কেন? কি এমন কাজ করালো আমার ভাই তোকে দিয়ে আসতেও লেট আবার এভাবে হাঁপাচ্ছিস কেন?”
আরহি রাগে কটমট করতে করতে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,,
” তোর ভাই একটা অসহ্য।”
” ওহ আচ্ছা এতো সময় ধরে এই জিনিসটাই উদঘাটন করলি তুই। বেশি সময় লেগে গেলো না। কি রহস্য বল তো”
আরহির দিকে ভ্রু নাচিয়ে মজার ছলে বলে কথা গুলো সারা। আরহি এমনিতেই রেগে আছে। আর সারা এমন মজা গরম তেলে পানি ঢালার মতো। আরহি রাগে কটমট করতে করতে বলে,,
” একদম মজা নিবি না। আমি কিন্তু আর আসবো না তাহলে।”
” আরে খেপিস কেন? আমার বেশ ভালো লাগে তোকে জ্বালাতে। আরে দেখিস না ফেসবুকে বড় বড় অক্ষরে হেডলাইন বান্ধবীর ভাইয়ের সাথে প্রেম, শিক্ষকের সাথে প্রেম।”
আরহি রাগে কটমট করতে করতে বলে,,
” তোর ভাইয়ের সাথে প্রেম করবে আমার জুতো।”
সারা কপাল কুচকে বলে উঠে,,
” আমার ভাইকে অপমান। তোর বর হবে টাকলা, বুড়ি ওয়ালা, কিপটা।”
” সে যাই হোক তোর ভাইয়ের মতো প্যাঁচা মুখো না হলেই হয়েছে।”
তাদের কথোপকথন এর মাঝে সাফি সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে আওয়াজ দেয়,,
” মা”
সারা আর আরহি দুজনে ঝগড়া রেখে দৃষ্টি রাখে সিঁড়ি দিকে। সাফির ফর্সা গায়ের রঙে এ রঙের শার্ট বেশ মানিয়েছে। আরহি কিছুটা অবাক হয়ে তাকিয়ে রয়েছে। শাহানা বেগম এর কথা শুনে ঘোর কাটে আরহির। আবারও সামনে ঘুরে স্বাভাবিক ভাবে বসে আরহি। সারা আরহির দিকে ভ্রু নাচিয়ে বলে,,
” লাগছে না আমার ভাইকে স্মার্ট।”
আরহি সারার দিকে তাকিয়ে মুখ বাকাঁয়। দুজনের মাঝে এ নিয়ে ঝগড়া লেগেই থাকে। সারা সব লেগেই থাকে আরহির পেছনে। আর আরহি লেগে সারার পেছনে সানিকে নিয়ে। সাফি শাহানা বেগম এর সাথে কথা বলে বেড়িয়ে যায় ঘর থেকে। আরহি কিছু ভেবে তৎক্ষনাৎ সারাকে উৎফুল্ল হয়ে সাফির ফোনের বিষয়ে কথা বলে। সারা অবাক হয়ে বলে,,
” এই কাঠখোট্টা মানুষের ফোনে এই রিংটোন। আবার এই ওয়ালপেপার। ”
” আরে আমি তো অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। ওটা কি তোর ভাইয়ের ফোন।”
সারা কৌতূহল নিয়ে বলে,,
” দাঁড়া বিষয়টা দেখতে হবে। কিন্তু আমার ভাই এতো দুর্দান্ত চালাক ধরা মুশকিল। শিক্ষক মানুষ বুঝিস তো। তবে আমি তার বোন আমিও কম না। তুমি যদি তলে তলে ট্যাম্পু চালাও আমি তো খুঁজে বের করবোই। আমিও সারা মেহরুন খান।”
~~~~~~~~~~~~~~~
সন্ধ্যায় বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে সারা। ভোর সকালের পর আর দেখা মিলে সানির। একবারের জন্যও বাসায় আসে নি। সানি নামক ভূত কিছুতেই ছাড়াতে পারছে না সারা। খুবই বিরক্ত সারা এ বিষয় নিয়ে। এতোদিন ভালো ছিলো হুট করে মানুষটা সামনে এসে পুরনো স্মৃতি তাজা করে দিলো। এলোমেলো করে দিলো সব। মানুষটার ব্যাক্তিত্ব বরাবরই তার প্রতি না চাইতেও মস্তিষ্কে জায়গা করে নেয়। ভাবতে বাধ্য করে তাকে। সারা ফেসবুকে গিয়ে সানির পুরনো পোস্ট করা ছবি গুলো দেখছে বার বার। সারার মনে একটা প্রশ্ন তীব্র ভাবে জ্বালাতন করছে তার জীবনে কেউ জড়িয়ে আছে কি না। সে কি কারও অধিকার এর খাতায় নাম লিখিয়েছে কি না। তার মনে অন্য কারও রাজত্ব চলছে কি না। আর এসব কি স্বাভাবিক নয়। আবার ভাবে যে পানসে লোক সে এসবে জড়াবে না। আবার যদি জড়িয়ে যায়। সারা আর সাঁত প্যাঁচ না ভেবে ফ্রেন্ড রিকুয়েষ্ট পাঠায় সানিকে। এরপর দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে কিছুভেবে ফেসবুকে লেখালেখি করে,,
” হৃদয়ের উম্মাদনা যখন দিগন্তের সূর্যাস্তের সাথে মিশে যায়, তখন বুঝতে পারি, অনেক সময় হারানো সম্পর্কের স্মৃতি বর্তমানের সৌন্দর্যের ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। একাকিত্ব, নিরবতার প্রতিটা অক্ষরেই বিদ্যমান থাকে এক অতৃপ্ত আকুলতা। অন্তরের গহীনে একটি শূন্যতা, যা পূর্ণ হয় না, যেন একটি পুরনো প্রেমের ছায়া।”
~~~~~~~~~~
খান বাড়িতে এক সঙ্গে সবাই রাতের খাবার খেতে বসেছে। খেতে খেতে রায়হান খান গম্ভীর কন্ঠে বলেন,,
“সানি”
সানি রায়হান খান এর দিকে তাকিয়ে সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলেন,,
“জ্বি মামা,,”
” কবে জয়েন করছো কোম্পানিতে।”
” মামা মাত্র হসপিটাল ওপেন করলাম অনেক কাজের প্রেশার। ওই সপ্তাহ থেকে জয়েন করি।”
” ঠিক আছে করো। তুমি আর সাফি দুজন দু সময়ে নাও। একজন সকালে আরেকজন বিকেলে। সাফির তো ভার্সিটি সকালে তুমি বিকালে না হয় চেম্বারে বসো। সকালে কোম্পানির কাজ করবে বিকেলে চেম্বারে বসবে। আর সাফি সকালে ভার্সিটিতে যাবে বিকালে কোম্পানির কাজ করবে।”
” ঠিক আছে মামা।”
আর কিছু সময় কোম্পানি নিয়ে কথপোকথন হলো তাদের মাঝে। এরপর খাওয়া শেষে যে যার মতো কক্ষে চলে যায়। কাজের ব্যস্ততায় সারাদিন অনলাইন যেতে পারে নি সানি। মাত্র ফোন হাতে নিয়ে অনলাইনে যেতে নোটিফিকেশন এলো সারা মেহেরুন খান সেন্ড ফ্রেন্ড রিকুয়েষ্ট। সানি মুচকি হেঁসে এক্সেপ্ট করলো। দেখলো চার ঘন্টা আগে ফ্রেন্ড রিকুয়েষ্ট পাঠিয়েছে। এখন বুঝতে পারলো খাওয়ার সময় সারার মুখ কেন বিষন্ন দেখেছিলো। সানি সারার লাস্ট পোস্ট দেখে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে মনে মনে আওড়ালো,,
” তুমি বেশ অধৈর্য্য আর খুব অভিমানী। এতো অল্পতেই অভিমান করলে, এতো অধৈর্য্য হলে কিভাবে কি করবো আমি। একটু ধৈর্য্য রাখো তোমার এই ধৈর্য্যের উপহার সরুপ এই সানি আজীবন তোমার অভিমান ভাঙানোর কারণ হবে। তোমার জীবনে সকল শূর্ণ্যতা পূরন করতেই তো আমার ছুটে চলা। পূর্নতার রঙে রাঙিয়ে দিবো তোমাকে। হবো তোমার একাকিত্বের সঙ্গী, তোমার প্রেম কাহিনী।”
মনমরা হয়ে আবারও ফেসবুকে ঢুকে সারা। সন্ধ্যায় অনেক সাহস নিয়ে ফ্রেন্ড রিকুয়েষ্ট পাঠিয়েছিলো সানিকে। এখনও এক্সেপ্ট না করায় বেশ ক্ষিপ্ত সারা। তার সঙ্গে ভাব নিচ্ছে আগ বাড়িয়ে কথা বলছে দেখে । ভেবে নিলো ফেসবুকে ঢুকে ফ্রেন্ড রিকুয়েষ্ট ক্যান্সেল করে দিবে। কিন্তু ফেসবুকে ঢুকে খুশিতে তার চোখ জোড়া জ্বলজ্বল করে উঠে। এবার খুব ভালো ঘুম হবে তার।
~~~~~~~~
সকালে ঘুম থেকে উঠতে অনেকটা দেরি হয়ে গিয়েছে সারার। দ্রুত উঠে নামাজটা পরে নিলো সারা। এমন সময় দরজায় কড়া নারে কেউ। এতো সকালে কে কৌতূহল নিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সানিকে দেখে বেশ অবাক হলো সারা। সকাল সকাল সবার আগে সানির মুখ দেখলো ভাবতেই মনটা নেচে উঠছে তার। আবারও কিছু ভেবে তার মনের নৃত্য থেমে গেলো।
সানি তাকিয়ে আছে সারার মায়াভরা চোখ জোড়ার দিকে। সকালের স্নিগ্ধতা এর সুন্দর্য দ্বিগুন বাড়িয়ে দিতে সক্ষম। সকালে হালকা পিপাসার মতো নতুন দিনের প্রতীক্ষায় রয়েছে যেন তার রূপে। গোলাপি রাঙা ঠোঁটের মৃদু হাঁসি দিকের তাকিয়ে শুকনো ঢোক সানি। এরপর স্বাভাবিক ভাবে বলে,,
” খাবার গুলো নিয়ে ছাদে আসুন। আমি অপেক্ষা করছি।”
তাড়াহুড়ো মাঝে ভুলেই গিয়েছিলো সারা সবটা। সারা হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়িয়ে বলে,,
” ঠিক আছে।”
সানি ছাদে দাঁড়িয়ে ভোরের অপরুপ সৌন্দর্য উপভোগ করছে। সূর্যের কিরন ছড়িয়ে পরতে শুরু করেছে চারদিকে। চারদিকে নিস্তব্ধতা, সতেজ মিষ্টি হাওয়া ছুঁয়ে দিচ্ছে ক্রমান্বয়ে তার শরীর। এই মিষ্টি হাওয়া শীতল করে দিচ্ছি তার অশান্ত মনটাকেও। সে সময় সারাও পাশে এসে দাঁড়ায় সানির। সারার উপস্থিতি বুঝতে পেরে সানি পাশ ফিরিয়ে তাকায় সারার দিকে। ভোরের সে লালচে আভার কিরন ছড়িয়ে পরেছে সারার মুখে।
সানি সারার দিকে তাকিয়ে বলে,,
” চলুন”
সারার বেশ লজ্জা আর হাঁসি দুটোই পাচ্ছে। যেসব নিয়ে সব সময় মজা করতো আজ তাকেই সেসব করতে হবে। তাও আবার যার উপর হুমড়ি খেয়ে ক্রাশ খায়। বেশ অসস্তি আর লজ্জা দুটো নিয়ে ছাদে আসন পেতে বসলো সারা। আর সারার সামনাসামনি বসে সানি। সারা আর হাঁসি দমিয়ে না রাখতে পেরে ফিঁক করে হেঁসে দেয়। সানি ভ্রু কুচকে তাকায় সারার দিকে। সারা হাঁসতে হাঁসতে বলে,,
” আমার ভীষণ হাঁসি পাচ্ছে। বিষয়টি কেমন ফানি। ”
” এখানে হাঁসির কি রয়েছে। চুপচাপ বসে থাকুন।”
” সানি ভাই আমি বরং আপনার এসব সকালের স্বাস্থ্যকর খাবার গুলো খাই। কাল থেকে করবো প্রমিস।”
সানি সারার দিকে ভ্রু বাঁকিয়ে তাকিয়ে বলে,,
” ঠিক আছে।”
সারা বাদাম খেতে খেতে বলে,,
” সানি ভাই।”
” জ্বী বলুন।”
” প্লিজ আমাকে আপনি বলে সম্মোধন করবেন না। নিজেকে কেমন বয়স্ক লাগে, একটা মুরুব্বি মুরুব্বি ভাব আসে। এতো বড় ছেলে আমাকে আপনি বলে সম্মোধন করছে। বিষয়টা কেমন লাগে না।”
সানি নিশব্দে হাঁসে সারার কথা শুনে।
” তাহলে কি বলে সম্মোধন করতে হবে।”
” আগে যেভাবে ডাকতেন, আয়াদ কে যেভাবে ডাকেন, সেভাবে ডাকবেন। এই আপনি ডাক শুনতে কেমন জানি লাগে আমার।”
সানি আবারও নিশব্দে হাঁসে।
” তার মানে আমি অনেক বুড়ো হয়ে গিয়েছি তাই না রে সারা।”
সেই পুরনো দিনের মতো সানির কথার ধরন শুনে মনে মনে বেশ খুশি হলো সারা। সারা মুচকি হেঁসে বলে,,,
” হ্যাঁ তা তো হয়েছেন। আপনি আমার কত বড়। বুদ্ধি বয়স থেকে আমি আপনাকে বিশাল বড় দেখছি। ৬ ফুট হাতির মতো লম্বা।”
সানি বুঝতে বাকি রইলো না সারা তার সাথে মজা নিচ্ছে। সানির সম্পর্কে সারার যদি ধারনা থাকতো তাহলে হয়তো মজা করার সাহস খুঁজে পেতো না। সানি দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে,,,
” ঠিক বলেছিস রে। আমি বুড়ো হয়ে গিয়েছি আর তুই বড় হয়ে গিয়েছিস। এই তো তোকে হতে দেখলাম, হাফ ফেন পরে ঘুরে বেড়িয়েছিস আর এখন দেখ কত বড় হয়ে গিয়েছিস। আমার কোলে অনেক বার হিশু করে দিয়েছিস জানিস। তুই তো তখন ছোট তোর মনে নেই।”
সানির কথায় বড় রকমের বিষম খেলো সারা। সানি দ্রুত গতিতে ট্রে তে থাকা পানির গ্লাস এগিয়ে নিয়ে গিয়ে নিজের হাতে পানি খাইয়ে দেয় সারাকে। এরপর সারার মাথায় হাত রাখে। এতো বছর পর সানির হাতের স্পর্শ পেলো সারা। শেষ স্পর্শ ৬ বছর আগে সানির হাতের থাপ্পড় খেয়েছিলো সারা। সানি সারা মাথায় আলতোভাবে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে নরম কন্ঠে বলে,,
” ঠিক আছিস।”
চলবে____

