আজ থেকে ছয় বছর আগে সানি ভাইকে প্রপোজ করায় তার শক্ত হাতে থাপ্পড় খেয়ে ছিলো সারা। সেই মানুষটি ছয় বছর পর দেশে ফিরছে শুনে পুরনো থাপ্পড়ের ব্যাথা যেন আবারও জাগ্রত হলো। আচমকা হাত চলে গেলো সানির ডান গালে। কি ভয়ানক দৃশ্য ছিলো। ভাবতেই গাঁ শিউরে উঠছে সারার। সানিকে নিজের ঘরে এইভাবে গালে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আরহি ঘরে প্রবেশ করতে করতে বলে,,
” কি রে সারা পুরনো ক্ষত জেগে উঠলো নাকি সানি ভাইয়ের আসার কথা শুনে। ”
সারা নিজের গাল ঘষতে ঘষতে রাগী স্বরে বলে,,
” মজা নিচ্ছিস শাকচু*ন্নি। থাপ্পড় যে কি ব্যাথা ছিলো তুই একটা খেলে ঠিক বুঝতি। তখন আর মজা নিতি না। ”
আরহি শব্দ করে হেঁসে উঠে। আরহি হাঁসির আওয়াজ কাটা গাঁয়ে লবন ছেটানোর মতো লাগছে সারার কাছে। সারা বিরক্ত হয়ে বলে,,
” দেখ আরহি তুই যদি মজা নেওয়ার জন্য এখানে আসিস তাহলে যা আমার ঘর থেকে বেরিয়ে যা। মজা করার মতো মুডে নেই আমি।”
আরহি এবার নিজের হাঁসি থামিয়ে সারার কাছে এগিয়ে এলো। বিছানায় বসতে বসতে বলে,,
” আরে রেগে কেন যাচ্ছো বান্ধবী। আমি তো মজা করছিলাম”
সারা রাগান্বিত কন্ঠে বলে,,
” মজা তো করবি। আমি তো জানি থাপ্পড় এর কি ব্যাথা ছিলো। এখনও মনে হলে চিন চিন ব্যাথা করে। বে*য়াদব, রা*ক্ষস লোক একটা এতোটুকুও একটা মেয়ের গায়ে নির্মম ভাবে হাত তুলে কেউ। আমি না হয় ছোট মানুষ ছিলাম ভুল করতেই পারি। তিনি না বুঝিয়ে এভাবে মারবেন। কত টুকু বয়স ছিলো মাত্র তেরো বছর বয়স বান্ধবীদের ফালতু কথা, আর এই হিন্দি সিনেমা দেখে কি অদ্ভূত ভূত চেপে ছিলো মাথায়। এমন একটা রা*ক্ষস রে প্রপোজ করতে গিয়েছিলাম আমি। বুঝলে কি আর এমন ভুল করতাম। এখন সামনে আসলে তার ছায়াও দেখবো না আমি।*
রাগে গজগজ করতে করতে এক শ্বাসে কথা গুলো বললো সারা। আরহি মিটমিট করে হেঁসে সারার কথা গুলো শুনছিলো। আরহি মুচকি হেঁসে বলে উঠে,,
” এতো টা ভাব নিশ না। যদি আবার সানি ভাইয়ের প্রেমে হাবুডুবু খাশ।”
সারা ত্যাড়ে এসে আরহির সামনে দাঁড়িয়ে আরহির দিকে আঙ্গুল তুলে ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলে,,
” নর্দমার পানিতে ডুবে মরবো, সারাজীবন কুমারী থাকবো তবুও এই রা*ক্ষসটার প্রেমে পরবে না এই সারা। যে মানুষ এতোটুকু একটা বাচ্চার গাঁয়ে হাত তুলতে পারে তার প্রেমে হাবুডুবু, তার ছায়াও দেখবো না আমি।”
” না প্রেমে পরলেই ভালো। তোদের বাড়ির ছেলে গুলো যা গম্ভীর। বাপরে আমার তো এদের দিকে তাকাতেই ভয় লাগে।”
” আস্তো একটা জেল খানায় থাকি আমি। অসহ্য,,,। ”
সারা আর আরহি খুব ভালো বান্ধবী। আরহি বাড়ি খান বাড়ির বিশাল বড় বাড়ি পেরেয়ি আর দু একটা বাড়ি পেরোলেই হাফ বিল্ডিং এর একটা ছোট বাড়ি। দু- তিন মিনিটের দূরত্ব হবে আরহির বাড়ি আর খান বাড়ি। সারার জন্য প্রায় বেশ খানিকটা সময় থাকতে হয় খান বাড়িতে। খান বাড়ির সদস্যরাও আরহিকে বেশ স্নেহও করে থাকে।
____*****___*****___*****___*****____*****____
সকাল থেকে খান বাড়িতে নানা আয়োজন বহু বছর পর খান বাড়িতে সবার চোখের মনি বাড়ি ফিরেছে। খান বাড়ির দুই ভাইয়ের এক মাত্র আদরের ছোট বোন শায়লা বেগম এর এক মাত্র ছেলে সানি মেহরাজ শিকদার সার্জারি বিভাগে পড়াশুনা শেষ করে আজ বাড়ি ফিরেছেন। সানি মেহরাজ শিকদার খান বাড়িতে পৌঁছেছে প্রায় সকাল ৯ টার দিক।
সকলের জন্য টুকটাক কিছু না কিছু উপহার এনেছে সবাইকে সেগুলো দেওয়া হলেও সারাকে এখনও কিছু দেওয়া হয় নি। এখন পর্যন্ত সারা তার সাথে দেখাও করে নি।
সানি মেহরাজ শিকদার মানুষটা অপ্রয়োজনীয় কথা খুবই কম বলে, তার কথা, চলাফেরা,পোশাক সব সময় মার্জিত। বড়দের সাথে আজ পর্যন্ত উঁচু গলায় কথা বলে নি সানি। সেজন্য বড়দের আরও স্নেহের পাত্র সে।
বিশেষ করে খান বাড়ির বউদের কাছে খুবই স্নেহের।
সানি মেহরাজ শিকদার এর বাবা মারা যায় ৮ বছর বয়সে তখন থেকেই তার শায়লা বেগম আর সানি খান বাড়িতেই থাকে।
সকলের সাথে কুশুল বিনিময়ে করে নিজের ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছিলো সানি। এমন সময় আগমন খান বাড়ির সব থেকে ছোট সদস্য আয়রা। বয়স ১২ বছর হবে আয়রা। সানি ডেকে পাঠিয়েছিলো আয়রাকে। আয়রাকে আসতে দেখে বিছানা থেকে উঠে বসে সানি।
” ভাইয়া ডেকে ছিলেন আমাকে”
মুচকি হেঁসে জবাব দেয়,
” হুম আপু। তোমার সারা আপু কোথায়? ”
” আপু তো ঘরে। আপনার সাথে দেখা করে নি সারা আপু । আসলে আপুর কি জানো হয়েছে সকাল থেকে ঘর থেকে বের হই নি। আমি কি ডাক দিবো আপুকে?”
” না দরকার নেই। ”
সানি বিছানার পাশে রাখা একটা প্যাকেট হাতে নিয়ে আয়রার হাতে দিয়ে বলে,,
” যাও তোমার সারা আপুকে এটা দিয়ে দিও”
” এটা সারা আপুর গিফট”
সানি মুচকি হেঁসে জবাব দেয়,
” হুম”
————– ————- ————– ————-
সানি সারার জন্য গিফট এনেছে ভাবতেই ছোট খাটো বিষম খেলো সারা। আরহি বিছানায় বসে পা দুলাতে দুলাতে বলে,,
” মানুষটাকে কত কি বললি। দেখ সেই মানুষ তোর জন্যে গিফট আনতে ভুলে নি।”
সারা বিরক্ত হয়ে বলে,
” উকালতি করবি না তো। সবার জন্য গিফট এনেছে তাই ভদ্রতার খাতিরে আমার জন্য গিফট এনেছে।”
” সে তো ভদ্রতার খাতিরে গিফট এনেছে তুই তো ভদ্রতার খাতিরে মানুষটার সাথে দেখাও করলি না। কত বার ডাকলো সবাই। তোর ফুপি মনি কি ভাবলো বলতো।”
” যে যার ইচ্ছে ভাবুক। ওই রা*ক্ষস টার সামনে আমি যাচ্ছি না ব্যস। ”
আরহি বিছানা থেকে গিফটের প্যাকেট হাতে নিতে নিতে বলে,,
” তুই থাক তোর মতো। আমি তো দেখি ডাক্তার সানি মেহরাজ শিকদার কি গিফট এনেছে ।”
সারা বিরক্ত হয়ে বলে,,,
” দেখ। আর পারলে নিয়েও যা। লাগবে না আমার ওই মানুষটার গিফট। ”
গিফট পেতে কার না ভালো লাগে। সারা উপরে রাগ দেখালেও কি গিফট দিয়েছে জানার বেশ আগ্রহ। কিন্তু আত্নসম্মান রক্ষার্থে বলতেও পারছে না। সারা আড় চোখে দেখছে আরহি গিফট খোলার দৃশ্য। গিফট এর প্যাকেট খুলে দুজনের চোখ কপালে। একটা গর্জিয়াছ গ্রাউন আর একটা সাধারণ থ্রি পিচ। দুটো ড্রেস অসম্ভব সুন্দর। আরহি বিস্মিত হয়ে বলে।
” চয়েস আছে বলতে হবে।”
সারা অবাক হলেও আরহিকে বুঝতে দিলো না। একটু ভাব নিয়ে বলে,,
” বিদেশি গার্লফ্রেন্ড কে গিফট করে না এই জন্য এতো ভালো বুঝে।”
আরহি এক বার সারার দিকে তাকিয়ে আবার গিফট দেখায় মনোযোগ দেয়। অনেক রকমের চকলেট। চোখ পরে লাল রঙের একটা বক্সের দিকে। অনেক কৌতূহল নিয়ে বক্স খুলে আরহি। বক্স খুলে আরহি আর সারা আরও অবাক হয়ে যায়। খুবই সুন্দর একটা লকেট। ডায়মন্ডের এস লেখাটি জ্বলজ্বল করছে। আরহি অবাক হয়ে বলে,,
” এ কি সারা। এ তো দামী গিফট। রহস্য কি বলতো?”
সারা এবারও তার ভাব মূর্তি মজায় রেখেই বলে,,
” এই গুলো গিফট আহামরি কিছু না। এসব গিফট আমরা একে অপরকে দিয়েই থাকি।”
আরহি দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে,,
” হ্যাঁ বড়লোক মানুষ তোমরা, বড়লোক ব্যপার শেপার। আমি মধ্যবিত্ত পরিবারে মেয়ে আমাদের কাছে এসব বিশাল কিছু।”
সারা এক গাল হেঁসে আরহির পাশে বসে আরহিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আহ্লাদী কন্ঠে বলে,,
” সারা মেহরুন খান এর একমাত্র বেস্ট ফ্রেন্ড তুই। আমরা দুজনেই বড়লোক। এখানে হুট করে বড়লোক মধ্যবিত্ত এসব কথা কোথায় থেকে আসে শুনি।”
দুজনের মধ্যে খুনসুটি কথোপকথন চললো কিছু সময়। এরপর আরহি চলে যায় তার বাড়ির উদ্দেশ্য। দুপুরে সবার ডাকাডাকি পরেও খেতে যায় নি সারা।সবারই সারার জেদ সম্পর্কে ধারণা আছে। একাই জেদ করবে আর একাই শান্ত হবে। এর আগে কেউ তার জেদ ভাঙ্গাতে পারবে না। খান বাড়ির একটাই মেয়ে ছিলো সারা বহু বছর পর আয়রা আগমন। তাই সারার আদর একটু বেশি। তাই সারার জেদ নিয়ে খুব একটা বেশি কেউ গাঁয়ে মাখলো না কেউ। আপাতত সবাই সানিকে নিয়েই ব্যস্ত। সারা সবার সাথে আজ খাবে না উদ্দেশ্য সানি মুখোমুখি হবে না সে। জানে এই মুহুর্তে সানিও নিচে আছে। সানিকে নিয়ে পুরো বাড়িতে যে আদিখ্যেতা চলছে বেশ অসহ্য লাগছে সারার সবটা। আছরের সময় বেশ খিদে পেয়েছে সারার। খিদে কারনে তার পেট মহা ভূমিকম্প শুরু করেছে এখন। আর না খেয়ে থাকা সম্ভব নয়। একে শান্ত করা জরুরি। সকাল থেকে সবাইকে মেজাজ দেখানোর কারনে কেউ আর ঘরেও আসে নি। এর সবটাই দায়ী করলো সানি কে। মনে মনে ভীষণ বকলো সারা সানিকে।
সারা ঘরের দরজা খুলে এদিক ওদিক তাকায়। সারার এক ঘর পরেই সানি ঘর। সারা উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করলো ঘরের দরজা খোলা নাকি লাগানো। ঘরের দরজা লাগানো দেখে সস্তির শ্বাস নেই সারা। বিরবির করে বলে,,
” যাক জমের সামনে পরতে হবে না।”
প্রবাদে আছে যেখানে বাঘের ভয় সেখানে সন্ধ্যা হয়। সারার সাথে প্রবাদটা সম্পূর্ণ মিলে যায় যেন আজকে। রান্না ঘরে থেকে খাবার নিয়ে সবে মাত্র কয়েক লোকমা খেয়েছে সারা। তখনই একটা পুরুষালি কন্ঠ কানে আসে সারার।
” বড় মামি, বড় মামা কোথায় নামাযে যাবে না।”
কন্ঠটা দীর্ঘ বছর পর শুনলেও চিনতে কষ্ট হলো না সারা। তেমনি গম্ভীর কন্ঠ স্বর। বড় রকমের এক বিষম খেলো সারা । অনবরত কাঁশছে মেয়েটা। চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পরছে মেয়েটার। হুট করে একটা পুরুষালি হাত পানির গ্লাস সামনে ধরে। সারা সেদিকে খেয়াল না করে এক নিশ্বাসে পানি টুকু খেয়ে ফেলে সস্তির শ্বাস নিয়ে বলে,,
__ thank you.
সানি গম্ভীর কন্ঠে বলে,,
___ welcome..
মুহুর্তে চোখ জোরা বড় আকৃতি ধারন করে সারার। বিশাল আকৃতি বিস্মিত চোখ নিয়ে তাকায় সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির দিকে। সাদা রঙের পাঞ্জাবি পরা, উজ্জ্বল শ্যামা গাঁয়ের রঙ, চুল গুলো গুছানো, মুখে চাপ দাঁড়ি, চেহারায় গম্ভীরতা। আরেক দফায় ক্রাশ খেলো সারা। সানি আর দাঁড়িয়ে না থেকে চলে যায় সেখান থেকে। কিছু একটা ভেবে সারা আবার নিজের ডান গালে হাত দেয়। কান্না জড়িত কন্ঠে বলে,,
__ আবার। ধ্যাৎ ভালো লাগে না
__________________
ছোট করে যেকোনো কমেন্ট করুন—হোক ‘নেক্সট’ বা ❤️
কমেন্টে যদি 1090 পেজ থেকে লাইক/রিয়েকশন পান,
তাহলে বুঝে নিন নতুন পর্ব এসেছে!
সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ 😊
“গল্প পড়ে ডুব দিন অনুভবে। মন্তব্যে জানান আপনার অনুভূতি।
ফলো করে রাখুন, যেন পরবর্তী পর্বের চমক সবার আগে পান!”
সূচনা পর্ব
গল্পঃ আমরন চেয়েছি তোমায়
লেখায়ঃ সুরাইয়া নওশিন

