#আমরন_চেয়েছি_তোমায়
#লেখায়_সুরাইয়া_নওশিন
১৩
গাড়ি চলছে তার আপন গতিতে। দুজনের মাঝে নিরবতা, আরহি চুপচাপ বসে রয়েছে আর সাফি তার মতো গাড়িয়ে চালিয়ে যাচ্ছে। সাফিকে অন্য রাস্তায় ঘুরতে দেখে আরহি অবাক হয়ে সাফির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,,
” স্যার এ রাস্তায় কেন যাচ্ছেন? ”
সাফি গাড়ি চালাতে চালাতে বলে,,
” কাজ রয়েছে ”
আরহি আবারও বিরক্ত হলো। কাজ থাকলে তাহলে তাকে আনতে হবে কেন? তাকে বলে দিতো এক ঘন্টা আগেই বাড়ি চলে যেতো সে। এতোক্ষনে খাওয়া দাওয়া শেষ করে বিশ্রাম নিতো সে। এই মানুষটার অত্যাচার এ সে সত্যি অধৈর্য্য হয়ে পরেছে। আরহি মাথা নিচু করে মিনমিনে গলায় বলে,,
” কাজ ছিলো আমাকে বলতে পারতেন, আমি তো রিক্সা ঠিক করে চলে যেতে পারতাম বাসায়।”
সাফি গাড়ি চালাতে চালাতে স্বাভাবিক ভাবে বলে,,
” তোমাকে নিয়েই কাজ রয়েছে। ”
আরহি ভীষণ অবাক হলো। তাকে নিয়ে আবার কি কাজ থাকবে। আরহি প্রশ্ন করার আগেই সাফি গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠে,,
” গেলেই দেখতে পারবে এতো ভাবার কিছু নেই। ”
আরহি আর প্রশ্ন করতে পারলো না। তবে মনে মনে কৌতূহল জাগলো ভীষণ। কি এমন কাজ থাকতে পারে। সাফি গাড়ি থামালো একটা শপিং মলের সামনে। আরহি অবাক হয়ে বলে,,
” এখানে কেন থামলেন স্যার”
সাফি কোনো জবাব দিলো না চুপচাপ বেড়িয়ে এলো গাড়ি থেকে। এরপর গাড়ির দরজা খুলে আরহিকে উদ্দেশ্য করে গম্ভীর কন্ঠে বলে,,
” বেরিয়ে এসো। ”
আরহি অবাক হয়ে সিট বেল্ট খুলে বেরিয়ে এলো গাড়ি থেকে। আরহি বের হতেই সাফি দরজা লাগিয়ে বলে,,
” আমার সাথে আসো ”
আরহি বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছে। শপিং মলে তাকে নিয়ে কি কাজ। মানুষটা তো ভীষণ আজব। আর কোনো কিছু বলার প্রয়োজন টুকু মনে করে না। সব সময় হুকুম চালায়, যেন তার কথা মতো চলাই আরহির কাজ। আরহি কিছুটা বিরক্তও আবার অবাকও। দুজনে দূরত্ব রেখেই পাশাপাশি হাটছে। সাফি প্রবেশ করলো হিজাব এর দোকানে৷ আরহি এবার অবাক এর চরম সীমায় পৌঁছে গেলো। আরহি কিছুটা আন্দাজ করে মনে মনে আওড়ালো,,
” স্যার কি আমার হিজাব হারিয়েছে বলে আমাকে হিজাব কিনে দিতে এনেছে। ”
পরক্ষণেই মাথা ঝাঁকালো আরহি। কি সব উল্টো পালটা ভাবছে সে। হয়তো সারার জন্য কিনতে এসেছে। আর মেয়েদের জিনিস কেনার অভিজ্ঞতা নেই তাই সাহায্যের জন্য তাকে নিয়ে এসেছে। সাফিকে দেখে একজন কর্মচারী হাঁসি মুখে সালাম দিলেন। সাফিও হাঁসি মুখে তার সালামের জবাব দিলেন। সাফি কর্মচারীকে উদ্দেশ্য করে বললেন কিছু ভালো মানের হিজাব দেখাতে। কর্মচারী হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়িয়ে একের পর এক হিজাব বের করতে লাগলেন। সাফি হাত দিয়ে সব হিজাব এর কাপড় গুলো দেখতে লাগলো। আরহি হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে সবটা। সাফি আরহির দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলে,,
” দেখো তো তোমার এসব ভালো লাগে কি না ”
আরহি অবাক হয়ে প্রশ্ন করে,,
” কেন? ”
সাফি চোখ মুখ কুচকে গম্ভীর কন্ঠে বলে,,
” তোমাকে এসব দেখতে বলেছি প্রশ্ন করতে বলি নি। ”
আরহি একটু ভয়ে কেঁপে উঠলো। দ্রুত গতিতে দুই একটা হিজাব হাত দিয়ে ধরে বলে,,
” ভালো ”
সাফি আন্দাজ করতে পারলো মেয়েটা ভয়ে ভালো বলছে। মেয়েটা যে তাকে অসম্ভব ভয় পায় এটা তার অজানা নয়। সাফি এবার দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। একটু এগিয়ে এলো আরহির দিকে। তবে দুজনের মাঝে দূরত্ব রয়েছে। সাফি এবার নরম গলায় বলে,,
” ভালো ভাবে দেখো তোমার ভালো লাগে কি না। তুমি নির্দ্ধিধায় তোমার পছন্দ অনুযায়ী বেছে নাও। তোমার হিজাব হারিয়েছি আমারও তো কিছু দায়িত্ব রয়েছে নাকি। এতো ভাবার কিছু নেই, আমি তোমার হারিয়ে ফেলা হিজাবের পরিবর্তে দিচ্ছি। ”
আরহির আন্দাজ এভাবে মিলে যাবে ভাবতে পারে নি আরহি। তাহলে তাকে হিজাব কিনে দিতেই সাফি এসেছে। কিন্তু আরহির এসবের প্রয়োজন নেই। বিষয়টি কেমন দৃষ্টি কটু লাগছে আরহির কাছে। সাফি তাকে তার জন্মদিনে উপহার দেয়, কিন্তু সে গুলো হলো বই।সব গুলো বই দার্শনিক আর নয়তো ধর্মীয় বই। শুধু এক বার ঘড়ি উপহার দিয়েছিলো সারা আর তাকে এক সাথে। কিন্তু সে আজ অবদ্ধি তাকে কোনো উপহার দেয় নি তার জন্মদিনে। গোমড়া মুখোকে কি উপহার দিবে সে, এছাড়া কখনও ইচ্ছেও হয় নি। কিন্তু হিজাব হারিয়েছে বলে হিজাব কিনে নেওয়া বিষয়টি কেমন লাগছে আরহির কাছে। আরহি অনেকটা ইতস্তত নিয়ে বলে,,
” এসবের কোনো দরকার নেই স্যার। আমার লাগবে না। ”
সাফির বিরক্ত লাগছে এখন। মেয়েটা একটু বেশি বুঝে। এক কথায় সব মেনে নিলে কি হয়। তাকে তো সে খারাপ কিছু বলে নি। এতো সংকোচ লাগার কি রয়েছে এখন। সাফি এবার শাসনের কন্ঠে বলে,,
” তোমাকে নিতে বলেছি নাও। ”
মেয়েটা সাফিকে এমনিতেই ভয় পায় তার ভেতর সাফির শাসন দেখে ভয়ে যে রঙের হিজাব হারিয়েছে সাফি সে রঙের হিজাব বেছে নিয়ে বলে আরহি। এরপর ভীত কন্ঠে বলে,,
” এ রঙের হিজাব হারিয়েছেন এটাই নিলাম। ”
সাফি আবারও দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। এই মাত্র একটা হিজাব কিনে দেওয়ার জন্য এসেছে সে। আর মেয়েটা এমনই কান্ড করবে এ রকমই আন্দাজ করেছিলো সাফি। সাফি কোনো উপায় নে পেয়ে নিজেই বাছাই করলো কয়েকটা হিজাব। এসব বিষয়ে মোটেও কোনো অভিজ্ঞতা নেই। সে কখনও মেয়েদের উপহার দিয়েছে বা তাদেরকে নিয়ে কেনাকাটা করেছে যে অভিজ্ঞতা থাকবে। সারা আর আয়রা জন্মদিন আসলে তাদের সঙ্গে করে শপিং মলে আসে তারাই পছন্দ করে নেয়। তার তো শুধু বিল দেওয়াটাই কাজ। এই মেয়েটাকে নিয়ে কিভাবে সংসার করবে মাঝে মাঝে খুবই চিন্তায় পরে যায় আরহির কর্মকান্ডে। মেয়েটা তাকে একদম বুঝতে চায় না তাকে। তার গম্ভীর দিকটাই সব সময় দেখে। এর আড়ালে তার প্রতি যত্ন, ভালোবাসা এক বারের জন্য অনুভব হয় না তার। কোনো অভিজ্ঞতা না থাকায় বাছাই করতে করতে তেরোটা হিজাব এক জায়গায় রাখলো সাফি। এরপর কর্মচারীকে উদ্দেশ্য করে বলে,,
” এগুলো প্যাক করে দিন। ”
আরহি হতবাক হয়ে বলে,,
” এতোগুলো হিজাব কার। ”
সাফি আরহির দিকে তাকিয়ে বলে,,
” তোমাকে যেহেতু সঙ্গে করে এনেছি তোমার জন্যই।”
আরহি অবাক হয়ে বলে,,
” এতো হিজাব দিয়ে কি করবো আমি।”
সাফি ভীষণ বিরক্ত হচ্ছে আরহির কর্মকান্ডে। এতো অবাক হওয়ার কি রয়েছে। সাফি বিরক্ত ভরা কন্ঠে বলে,,
” হিজাব দিয়ে কি করো তোমরা মেয়ে রা। ”
এতো হিজাব কখনও নেওয়া যায় না। আরহি এতো গুলো হিজাব কেন নিবে সে। সে তো মাত্র একটা হিজাব হারিয়েছে, দিলে একটা হিজাবই দিবে। এগুলো নিতে পারবে না সে। আরহি না সূচক মাথা নাড়িয়ে বলে,,
” আমি এতো গুলো হিজাব নিতে পারবো না। আপনি একটা হিজাব হারিয়েছেন একটাই কিনে দিবেন আমাকে। আর না হলে কোনো প্রয়োজন নেই, আমার লাগবে না হিজাব। ”
সাফি আরহির কোনো কথা সেভাবে গাঁয়ে মাখলো না। হিজাব প্যাক করে নিয়ে বিল দিয়ে দিলো সাফি। আরহি আবারও বলে উঠে,,
” আপনি কেন নিচ্ছেন এগুলো, আমি বললাম তো নিবো না। আমি কেন নিবো এতো গুলো হিজাব আপনার থেকে। ”
সাফি চুপচাপ হিজাব এর প্যাকেটটা হাতে নিয়ে হাটছিলো৷ কিন্তু আরহির আবারও প্রশ্ন শুনে সাফি বাধ্য হয়ে আরহির দিকে তাকিয়ে জবাব দিলো,,
” অ্যাকাউন্টিং ডিপার্টমেন্ট এর স্টুডেন্ট ছিলাম আমি আর এখন টিচার সুদ, আসল, মুনাফা এসব হিসাব ভালো বুঝি। যেহেতু তোমার হিজাব হারিয়েছে তাই সুদসমেত ফেরত দিলাম। ”
আরহি আর কিছু বলতে যাবে এর আগেই সাফি আরহির দিকে কপাল কুচকে তাকায়। তার চোখে স্পষ্ট রাগ দেখতে পারছে আরহি। ভয়ে চুপসে যায় আরহি, তাই আর চেয়েও কিছু বলতে পারে না। চুপচাপ শপিং মল থেকে বেরিয়ে যায় সাফির পিছু পিছু।
হুট করে একটা বাচ্চা মেয়ে দাঁড়ায় সাফির সামনে। গাঁয়ের রং কালো হলেও চেহেরাটা বেশ মায়াবী। বয়স ৮ কি ৯ বছর হবে। হাতে নানা রকমের ফুল, আর মুখ ভরা হাঁসি। দেখে আরহি আন্দাজ করলো এই মেয়ে ফুল বিক্রেতা। মেয়েটিকে দেখে সাফির মুখেও হাঁসি ফুটে উঠে। মেয়েটি সাফিকে সালাম দিলো। সাফি সালামের জবাব নিয়ে মেয়েটার মাথায় হাত রেখে বলে,,
” কি খবর তোমার? কেমন আছো? ”
মেয়েটি হাঁসি মুখে জবাব দেয়,,
” জ্বি আংকেল ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন? ”
” আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। তোমার আম্মু কেমন আছে? ”
” আম্মাও ভালো আছে। এখন ভালো দিন যায় আম্মার। ওই যে আম্মা দেখেন আপনার দিকে তাকাইয়া আছে। আম্মায় আপনারে দেইখা আমারে পাঠাইলো। ”
মেয়েটির হাতের ইশারা লক্ষ্য করে আরহি সেদিকে তাকালো। শ্যাম বরন গায়ের রঙের একটা মেয়ে, খুব বেশি বয়স হবে না, তার থেকে দু তিন বছরের বড় হবে।
সাফির দিকে তাকিয়ে হাঁসছে, সাফিকে দূর থেকে ইশারায় সালামও দিলো। পিচ্চি মেয়েটি সাফিকে বলে,,
” আন্টিরে নিয়ে আইছিলেন জামা কিনতে ”
আরহি আবারও অসস্তিতে পরে গেলো। কিন্তু সাফি স্বাভাবিক ভাবে জবাব দিলো,,
” ওই রকমই কেনাকাটা করতে। পড়াশুনা করছো তো ঠিক ভাবে। ”
” জ্বি আংকেল করতাছি, আইজ স্কুল যাই নাই। মার একটু জ্বর আইছে, এখন ভালোই আছে। তাও মার সঙ্গে দোকান আইছি। ”
” ভালো করেছো। আজ একটু ব্যস্ত, তোমার মাকে বলো অন্য কোনো দিন আসলে দেখা করবো আমি। ”
” আইচ্ছা আংকেল। কিন্তু ফুল নেওয়াই লাগবো আপনার। আইজ আন্টিরে সাথে নিয়া আইছেন যে। অন্য দিনের মতো না করলে আমি শুনমু না আইজ। ”
সাফি মুচকি হাঁসলো মেয়েটির কথায়। আরহি নিরব দর্শক হয়ে তাকিয়ে দেখছে। সাফি তার মানিব্যাগ বের করে এক হাজার টাকার নোট বের করে দিলো। মেয়েটি খুশি হয়ে হাত বারিয়ে নিলো। এরপর সাফি মেয়েটিকে উদ্দেশ্য করে বলে,,
” তোমার যে ফুল পছন্দ সেই ফুল তোমার আন্টিকে দাও। ”
মেয়েটি অবাক হয়ে বলে,,
” এ কেমন কথা আংকেল। আপনারই পছন্দ করে আন্টির হাতে দেওয়া লাগবো। আমি কোনো কথা শুনমু না। ”
সাফির উপর এতো জোর গলায় হুকুম করা দেখে অবাক হলো আরহি। আর সাফিও হাঁসি মুখে সবটা মেনে নিচ্ছে। সাফি একটা লাল গোলাপ তুলে নিয়ে আরহির দিকে বাড়িয়ে বললো,,
” এই নাও ”
আরহি হা হয়ে তাকিয়ে আছে সাফির দিকে। সাফি কপাল কুচকে চোখের ইশারা করতেই তড়িৎ গতিতে ফুলটা হাতে নেয় আরহি। মেয়েটি আরহির দিকে এগিয়ে এসে বলে,,
” আপনি দেখতে অনেক মিষ্টি আন্টি ”
মেয়েটির কথায় আরহির মুখে হাঁসি ফুটে উঠে। এরপর মেয়েটির মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,,
” তুমিও দেখতে অনেক মিষ্টি, আর তোমার কথা গুলো ভীষণ মিষ্টি। ”
মেয়েটি সাফির দিকে তাকিয়ে হাঁসি মুখে বলে,,
” আন্টি আপনার মতো অনেক ভালো। ”
আরহি বেশ অবাক হলো মেয়ের কথায়। সে সাফির মতো কি করে হয়। সে একদম সাফির মতো গম্ভীর, প্যাঁচা মুখো, কাটখোট্টা স্বভাবের মানুষ নয়৷ সাফি মেয়েটিকে উদ্দেশ্য করে বলে,,
এবার আসি তাহলে মামুনি ”
মেয়েটি হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ায়। সাফি আরহিকে উদ্দেশ্য করে বলে,,
” চলো এবার ”
আরহি হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ালো। এরপর দুজনেই গাড়িতে গিয়ে বসে পরে। সাফি তার মতো গাড়ি চালাচ্ছে। আরহি দুই হাত কচলাতে কচলাতে মনে অনেক সাহস জুগিয়ে বলে বসে,,,
” ওই পিচ্চি মেয়েটার নাম কি? ”
সাফি স্বাভাবিক ভাবে গাড়ি চালাতে চালাতে জবাব দেয়,,
” জুথি”
আরহি এবার শুকনো ঢোক গিলে বলে,,
” মেয়েটা আমাকে আন্টি বললো আপনি কিছু বললেন না কেন? ”
সাফি জানতো আরহি তাকে এমন কিছু একটা প্রশ্ন করবে। সাফি আরহির দিকে তাকিয়ে না বোঝার ভান করে বলে,,
” কি বলবো? ”
” কি বলবেন আপনি? আপনি বলবেন যে আমি আন্টি না ”
” ওহ ঠিক আছে। আমি জানতাম না কেউ তোমাকে আন্টি ডাকলে তোমার ভালো লাগে না। ঠিক আছে এরপর দেখা হলে বলবো তোমাকে আপু ডাকতে। আসলে আমি সেভাবে ভাবি নি আপু আর আন্টি ডাক নিয়ে কারও সমস্যা হতে পারে। ”
সাফির এমন জবাবে থতমত খেয়ে গেলো আরহি। আসলেই তো তাকে তো আন্টি বলে সম্মোধন করতেই পারে। অচেনা মানুষকে আন্টি না হয় আপু এভাবেই সম্মোধন করি আমরা। মেয়েটাও তাই করেছে, নিজের চিন্তা ধারা দেখে নিজের উপর লজ্জিত আরহি। কি সব কি ভেবে ফেলেছে সে। এই ঘুরতে গিয়ে মাঝির মুখে এসব শুনে, সত্যি তার মাথা গিয়েছে। সাফি এখন কি ভাবছে। ভাবতেই লজ্জায় জড়সড় হয়ে যাচ্ছে মেয়েটা।তবুও আরহির মনে খটকা লাগছে মেয়েটি তাকে অন্য উদ্দেশ্যে আন্টি বলে ডেকেছে। কিন্তু সে তো আর সাফিকে সেভাবে বলতে পারছে না। কিভাবে বলবে সে? তবে সাফি যেহেতু বুঝতে পারেনি তাই বিষয়টি নিয়ে আর মাথা ঘামালো না। সাফি বাইরে দিকে তাকিয়ে ঠোঁট চেপে নিশব্দে হাঁসছে। আরহি তাকিয়ে রয়েছে চুপচাপ হাত থাকা ফুলটির দিকে। গাঢ় লাল রঙের তাজা গোলাপ ফুল। ফুল এর সৌন্দর্য যেন সকল সৌন্দর্যকে হার মানায়৷ এই ফুলের সৌন্দর্যের গুন এতটাই যে একটা মানুষের মন সহজেই ভালো করে দিতে পারে। একটা সম্পর্কের মান অভিমান দূর করে দিয়ে ভালোবাসায় ভরিয়ে দিতে পারে। আরহির ফুল দেখতে দেখতে হুট করে মনে একটা প্রশ্ন বাসা বাঁধলো সাফি তাকে এই লাল গোলাপ ফুল কেন দিলো? অন্য ফুল দিতে পারতো। সে তো জানে লাল গোলাপ ফুল ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। নিজের চিন্তাভাবনায় নিজেই বিরক্ত হলো আরহি। ইদানীং কি সব ভাবছে সে। সাফি তাকে ভালোবাসে অসম্ভব। আর এসব সে কিভাবে ভাবছে। আরহি তড়িৎ গতিতে ফুল থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো। সাফি মানুষটা কি অদ্ভুত, দুনিয়াতে কত রকমের, কত স্বভাবের মানুষ রয়েছে। কিন্তু সাফি একটু বেশি অদ্ভুত। আরহি আবারও নিজের চিন্তা ধারা পাল্টাতে চাইলো। মানুষটাকে নিয়ে এতো কেন ভাবছে সে। এই মানুষটাকে নিয়ে ভাবার কি রয়েছে। সে অদ্ভুত হোক যা ইচ্ছে তাই হোক, এতে তার কি। গাড়ি থামলো আরহি দের বাসার গলির সামনে। আরহি গাড়ি থেকে নামতে যাবে তখনই সাফি আরহির দিকে হিজাব এর প্যাকেট বাড়িয়ে দেয়। আরহি হিজাব এর প্যাকেট অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও হাতে নেয়। কিন্তু সমস্যা হলো বাসায় গিয়ে কি বলবে সে। আরহি সাফির দিকে তাকিয়ে বলে,,
” আপনি এতো গুলো হিজাব কিনে দিলেন, বাসায় কেউ কিছু বললে। মা যদি বলে আমি কেন এতো কিছু নিয়েছি। ”
সাফি স্বাভাবিক ভাবে জবাব দেয়,,
” চাচিকে বলো সাফি স্যার দিয়েছে খুশি হয়ে। আর তুমি তো মিথ্যে বানিয়ে বলার পিএসডি অর্জন করেছো আগেই। আর তুমি বলছো কি জবাব দিবে? গত সপ্তাহের ক্লাস টেস্ট এর রেজাল্ট তোমার ভাইকে কি বলেছো? ”
আরহি আর বসে থাকতে পারলো না। সাফিকে সালাম দিয়ে তড়িৎ গতিতে বেরিয়ে এলো। সে না হয় ভাইয়ের থেকে কথা শোনার ভয়ে একটু বানিয়ে নম্বর বাড়িয়ে বলেছে। আর এই টুকটাক মিথ্যে বলাই যায়। সে শুধু পড়াশুনা নিয়ে একটু আকটু মিথ্যে কথা বলে। তাই বলে পিএসডি অর্জন করেছে। এতো বড় অপবাদ দিতে পারে না সাফি। আর বাড়ির সবাইও কেমন এই বাড়ির মেয়ে অথচ তাকে বিশ্বাস করে না। সব কিছু কেন বলতে হবে সাফিকে আশ্চর্য।
নিজের ভাইয়ের উপর ভীষণ ক্ষিপ্ত হলো আরহি। তার ভাই সাফির থেকে তিনবছর এর জুনিয়র। পড়াশুনা বিষয়ে টুকটাক সেও সাজেশন নিয়েছে সাফির থেকে। এই জন্য ভালো সম্পর্ক তার সাথে। তার মানে বোনের থেকে তো আর আপন হতে পারে না। মাঝে মাঝে সবাইকে পর মনে হয় তার। আরহি বড় বড় পা ফেলে হাঁটে। সাফি তাকিয়ে রয়েছে আরহির যাওয়ার দিকে। আরহি তার চোখের আড়াল হতেই সাফি মুচকি হেঁসে চলে যায়।
★★★★
সাফি হাতমুখ ধুয়ে সোজা চলে আসে সানির ঘরে। তার জ্বর কমেছে কি না, তার শরীর কেমন সেটা আগে দেখা প্রয়োজন। শুনেছে শিকদার বাড়ির লোকেরা এসেছিলো এটা জানতে পেরে তার দুশ্চিন্তা যেন দ্বিগুণ বেড়ে গিয়েছে। সানি নিজের ঘরে বসে বুক সেল্ফ এর পাশে চেয়ারটায় বসে বই পড়ছিলো। সাফি দরজায় দাঁড়িয়ে বলে উঠে,,
” সানি ”
সানি বই বন্ধ করে পেছনে ঘুরে তাকায়। সাফিকে দেখে বলে,,
” আরে সাফি ভাই, আজ এতো তাড়াতাড়ি ভার্সিটি শেষ ”
সাফি ঘরে প্রবেশ করতে করতে বলে,,
” কয়েকদিন পর টুর্নামেন্ট তাই ক্লাস হয় নি। তোর শরীর কেমন সেটা বল।”
সাফি একটা চেয়ার টেনে সানির মুখোমুখি বসে পরলো।
” এখন জ্বর নেই কিন্তু ঠান্ডা আছে৷ একটু সারতে সময় লাগবে। তোমার ঠান্ডা কমেছে? ”
সাফি সানির কপালে হাত রেখে তাপমাত্রা দেখে নিলো। এরপর স্বাভাবিক ভাবে বসতে বসতে বলে,,
” আমার তো হাল্কা ঠান্ডা লেগেছে। তেমন কিছু নয়। শুনলাম শিকদার বাড়ির লোকেরা এসেছিলো। ”
সানি দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে,,
” হুম এসেছিলো ”
সাফি সানির দিকে ভ্রু কুচকে তাকিয়ে বলে,,
” কি বললো সাইফ রেজওয়ান শিকদার আর শিপন তাজওয়ার শিকদার ”
” ওই তো আমি কেমন আছি। হয়তো হসপিটালে ফোন দিয়ে শুনেছে আমি অসুস্থ হসপিটালে যাই নি। তাই এসেছিলো। ”
সাফি একবার শুকনো ঢোক গিলে বলে,,
” আর কিছু বলে নি। ”
সানি সাফির দিকে তাকালো। সাফির চোখে মুখে ভয়ের ছাপ। আর সাফির ভয়ের কারন সানির কাছে অজানা নয়। সানি একটু সাফির সাথে মজা করতে বলে,,
” হ্যাঁ বলেছে, শিকদার বাড়িতে যেতে বলেছে। ”
সাফি এবার নড়েচড়ে বসে।
” তুই কি বললি ”
” যাবো বলেছি ”
সাফি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলে,,
” অহ আচ্ছা। ঠিক আছে থাক, আমি যাই অনলাইন এ ক্লাস রয়েছে আবার অফিস যেতে হবে। ”
সানি সাফির হাত ধরে বসে,,
” বাহানা দেখাতে হবে না। কি সাফি ভাই তুমি এখনো ভয় পাও। আজ থেকে ১৫ বছর আগে আমি যেই কাজ করি নি সেই কাজ আমি এখন করবো। তখন ছোট ছিলাম তাই যে পথে পা বাড়াই নি এখন আমি বড় হয়েছে বুদ্ধিও আছে কম আর বেশি এখন আমি এই কাজে পা বাড়াবো। এখনও তুমি এগুলো ভয় পাও সাফি ভাই। ”
” এখন আরও ভয় পাই, এখন বড় হয়েছিস নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিবি। সাফি ভাইকে কি আর বলতে যাবি। এখন তো তুই প্রতিষ্ঠিত নাম করা সার্জন ডাক্তার, নিজের হসপিটাল রয়েছে আশেপাশে তোর শুনাম। ”
সানি এবার উঠে দাঁড়ায়, সাফির কাঁধে হাত রেখে বলে,,
” তুমি আমার বড় ভাই, আমি তোমাকে সম্মান করি। তুমি এসব ভাবো কিভাবে সাফি ভাই। আমি সানি মেহরাজ শিকদার যত প্রতিষ্ঠিত হই না কেন।আমার যতই নাম ডাক থাকুক না কেন। আমি সাফি মেহতাব খান এর কাছে সেই ছোট ভাই সানি থাকবো। আমি তোমাকে অবহেলা করবো ভাবো কিভাবে তুমি। এই বিশ্বাস তোমার আমার প্রতি। ”
সাফি সানিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। সাফির ভীষণ ভয় সানিকে নিয়ে। সানি তার ছোট ভাই আর তার ভালো বন্ধু। তার খুবই স্নেহের, তার প্রতি বেশি মায়ার হওয়ার কারন সানি তার খারাপ সময়ে ছায়ার মতো সঙ্গ দিয়েছে। তার কথা সব সময় মেনেছে। আরও বেশি মায়ার হওয়ার কারন ছোট বেলায় সে তার বাবাকে হারিয়েছে। যে বয়সে একটা ছোট বাচ্চা হাঁসি খেলে বেড়ায় সে বয়সে তাকে আতংকে থাকতে দেখেছে। কতটা অসহায় ভাবে তার ঘরে ধীর পায়ে এসেছে সাফি ভাই, সাফি ভাই বলে ডাকতে ডাকতে। এখনও সেই ডাক তার কানে বাজে অনবরত। কতটা ভরসা করে সব সময় তার হাত শক্ত করে ধরে ঘর থেকে বেরিয়েছে। ওই ছোট বয়সে কতটা ভয় নিয়ে বাঁচতে দেখেছিলো ছেলেটাকে সে। মনে হলে এখনও তার আত্না কেঁপে উঠে।
আয়াদ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলে,,
” বুঝেছি আমার প্রতি কারও কোনো ভালোবাসা নেই। ”
সানি সাফি একে অপরকে ছেড়ে দরজার দিকে তাকায়। আয়াদের মুখ রাগে লাল হয়ে আছে। আর তার গলা জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে আয়রা। সানি সাফি হেঁসে দিয়ে বলে,,
” আরে তুই তো আমাদের হীরা আয়। ”
সানি সাফি এক হাত বাড়িয়ে ডাকে। আয়াদ যাওয়ার আগে আয়রা ছুটে চলে আসে। সানি সাফি এক সাথে আলিঙ্গন করে নেয় আয়রাকে। আয়াদ লোভ সামলাতে না পেরে সেও চলে আসে। আর রেগে থাকতে পারলো না। সাফি আয়াদের মাথায় গাট্টা মেরে বলে,,
” সকাল থেকে সানি অসুস্থ, কই ছিলি তুই। ”
আয়াদ গাল ফুলিয়ে বলে,,
” তুমি কি আমার কোনো কাজে সাহায্য করো। ভার্সিটিতে কাগজ জমা দিতে গিয়েছিলাম আমি। কোনো খোঁজ রাখো না তুমি আমার।”
সাফি একটু জিহবা কামড় দিলো। কাজের চাপে খোঁজ নেওয়া হয় নি তার। সব দিকে খেয়াল রাখে, তবে হুট করে আজ এটা যে কিভাবে ভুলে গেলো। আয়রা বলে উঠে,,
” আমরা সবাই আছি, সারা আপু কোথায়। দাঁড়াও সারা আপুকে নিয়ে আসি। ”
আয়রা এক মুহুর্ত দেরি না করে ছুটে গেলো সারার ঘরে। সারাকে কোনো কিছু না বলে হাত ধরে টেনে নিয়ে আসে সানির ঘরে। সারা আয়রাকে প্রশ্ন করেই যাচ্ছে। কিন্তু আয়রা তার মতো চুপচাপ সারাকে টেনে আসলো সানির ঘরে। সাফি সারাকে দেখে বলে,,
” নাও আমরা সব ভাই বোন হাজির। ”
সানি সাফির কানে ফিসফিস করে বলে,,
” তোমার বোন আমার না কিন্তু। ”
সাফি সানির পেটে জড়ে সরে চিমটি কেটে। সানি ব্যাথায় চোখ মুখ খিঁচে বন্ধ করে নেয়। কিন্তু মুখে কোনো আওয়াজ করলো না। আয়াদ ফোন বের করে বলে,,
” আসো একটা হ্যাপি সেলফি হয়ে যাক। ”
ভাই বোন সেলফি তুলে কিছু সময় আড্ডা দিয়ে বেরিয়ে গেলো যে যার ঘরের উদ্দেশ্যে। সানির সাথে সারার চোখে চোখ পরলো কয়েকবার। সারা ততবারই লজ্জায় চোখ সরিয়ে নিয়েছে। সানি মনে মনে নিশব্দে হাঁসছিলো। তার সূবর্ণা নয়নের রাণীকে লজ্জাবতী নাম দিলে ভুল হবে না। এই টুকুতেই এতো লজ্জা। তবে লজ্জা রাঙানো চোখ জোড়ার সৌন্দর্য আরও মোহনীয়।
★★★★
বিকেলে চুপচাপ করিডরে সোফায় বসে ফল খাচ্ছে আর ফোন দেখছে সানি৷ বাসায় কেউ নেই, সারাদিন ঘরে বসে থাকতে থাকতে বিরক্ত। এতো ঘরে বসে থাকা যায় নাকি। এদিকে কেউ বাইরেও যেতে দিচ্ছে না। শায়লা বেগম, শাহানা বেগম আর নূর জাহান বেগম সাথে সাফির কড়া আদেশে বাধ্য হয়ে ঘরে বসে থাকতে হচ্ছে তার। এদিকে আয়াদও নেই, আয়রা ঘুম। বাড়ির মহিলা সদস্যরা তো ঘরের কাজে ব্যস্ত। সারার সাথে একটু গল্প করবে কিন্তু মেয়েটা তো লজ্জায় ঘরে বসে আছে। এতো লজ্জা কীসের,এতো লজ্জা পাওয়ার কি রয়েছে। প্রেমে পাগল হয়ে আছে, অথচ একটু হাত ধরে পানি খাইয়ে দিয়েছে তাই লজ্জায় দরজা আটকিয়ে বসে রয়েছে, আজব মেয়েতো। এই অবস্থায় সারার ঘরে গিয়ে গল্প করার সাহস পেলো না সে। এমন লজ্জা রাঙানো মুখ দেখলে কি থেকে কি হয়ে যায় বলা যায়।
সানির সময় কাটছে না। চলে গেলো শায়লা বেগম এর ঘরে, উদ্দেশ্য মার সাথে কিছু সময় কাটানো। শায়লা বেগম এর ঘরে পা বাড়াতেই সারার কন্ঠস্বর শুনে দাঁড়িয়ে গেলো সানি। হাল্কা উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করলো এবার। তার সুবর্না নয়নের রাণী লম্বা ঘন চুলে সুন্দর করে তেল মাখিয়ে দিচ্ছে তার মা শায়লা বেগম।
সারা মনে অনেক সাহস নিয়ে বলে,,
” মামুনি সাফি ভাই তো বিয়েতে রাজি হচ্ছে না, তাই বলে সানি ভাইকে বিয়ে দিবেন না। ”
সানির নিজের কপাল নিজে থাপড়াতে ইচ্ছে করছে। কি সাংঘাতিক মেয়ে, আর কি তার মারাত্মক সুন্দর বুদ্ধি। সারার বুদ্ধি দেখে শিহরিত সে। এই ভাবে সে বললো আর তার মা তার সাথে তার পুত্র বিয়ে দিয়ে দিলো বাহ কি অসাধারণ বুদ্ধি। এই মেয়েটা তাকে পাগল ছাড়বে। বিয়ে করার জন্য পাগল হয়ে গিয়েছে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু তাই বলে এই ভাবে নিজের শাশুড়ির মন জয় করবে সে। নাকি নিজের সতিন আনার মতলব। সানির মাথা ঘুরপাক খাচ্ছে। সানি দাঁড়িয়ে শুনছে সারা পরবর্তীতে কি কি কান্ড করে,,
শায়লা বেগম সারার চুলে তেল মালিশ করে দিতে দিতে বলে,,
” বিয়ে তো দিতে চাই মা, কিন্তু তোর ভাই শুনে কথা। দেখিস না কেমন জেদি, সারাদিন কি সব কাজের পেছন ছুটোছুটি। কোনো কিছু বললেই বলে সাফি ভাই আগে বিয়ে করুক। তারপর সে নাকি করবে। আমার আর এসব ভালো লাগে না। দুই ভাই এক।”
” তাই হাল ছেড়ে দিলে চলবে, আপনি জোর করবেন। আপনার ছেলে আপনার কথা শুনতে হবেই। ”
সানি নিজের কপাল নিজে থাপড়াচ্ছে। সে কি জানে সে কি করছে। এমনিতেই তার মা নাচের কাঠি আর তার ভেতর সে দিচ্ছে ঢোলের বাড়ি। এতো পাকনামো করতে কে বলেছে তাকে। সানি নিজের মাথা ঝাঁকিয়ে শান্ত করলো নিজেকে।
শায়লা বেগম বলে উঠলেন,,
“আমার কোনো কথা কি শুনে। এখন তো বড় হয়ে গিয়েছে। আমি আর শাসন করতে পারি। তবে তোর ফুফা বেঁচে থাকলে এতোদিনে ঠিকি সানির বিয়ে হয়ে যেতো। ঠিক তোর মতো দেখতে মিষ্টি একটা মেয়ে সানির বউ হয়ে আসতো।”
শায়লা বেগম এর কথায় লজ্জায় গাল দুটো লাল হয়ে গেলো মেয়েটার। সে তো এমন কথাই শুনতে চেয়েছিলো। সারা মনে মনে আওড়ালো,,
” ঠিক আমার মতো কেন আমাকেই আপনার ছেলের বউ করলেই হয়। ”
মনের কথা সারার মনেই রয়ে গেলো। এসব কথা তো আর মুখ ফুটে বলা যায় না। তবে সারা কথা সানি ঠিক বুঝতে পেরেছে। সানি মনে মনে বিড়বিড় করে বলে,,
” দেখো কি খুশি,,এটাই শুনতে চেয়েছিলো পাঁজি মেয়ে। এসব বললেই কি আর বউ বানিয়ে নেয় পাগলি। ”
সারা একটু নড়েচড়ে বসলো। একটু সাহস পেলো সারা। একটু ভাব নিয়ে বলে,,
” আচ্ছা মামুনি সানি ভাই বিয়ে কেন করতে চায় না। সানি ভাইয়ের কি কোনো পছন্দ রয়েছে। মানে দেশের বাইরে ছিলো কোনো মেয়ে পছন্দ হতেই পারে। আর জার্মানির মেয়েরা তো অনেক সুন্দর হয়। সানি ভাইকি আপনাকে এসব বলেছে কিছু। ”
সারার উদ্দেশ্য ভেতরে তথ্য জানা আর কি। সানি চোখ জোড়া রসালোর মতো গোল আকৃতি ধারন করলো। সানি অবাক হয়ে বলে,,
” আরে থাম রে থাম। এ তুই আমার মায়ের কাছে আমার চরিত্রের দাগ লাগাচ্ছিস। উফ,,, সাফি ভাই কোথায় তুমি। তোমার বোনকে আটকাও। তোমার বোন আমার চরিত্রে দাগ লাগিয়ে দিলো। ”
শায়লা বেগম এবার বেশ কৌতূহল নিয়ে বলে,,
” না তো, সানি আমাকে এসব কিছু বলে নি। তুই তো ভালো কথা বলেছিস সারা। তোর তো ভাই হয় তুই একটু শুনতে পারিস না। আমি কি আর মা হয়ে বলতে পারি এসব। ”
সারা অসহায় মুখ করে বলে,,
” দেখেন না আপনার ছেলে কেমন গম্ভীর আর রাগী। যদি আমার উপর রেগে গিয়ে বকে আমাকে তখন। আমার তো খুব ভয় লাগে সানি ভাইকে। কেমন সব সময় একটা গোমড়া মুখ নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। একটু কথা বলতে গেলেই হাজারটা জ্ঞ্যান দিয়ে পাঠিয়ে দেয়। জ্ঞ্যানের ভান্ডার আপনার ছেলে। ”
” আরে আমি আছি, বকে দেখুক একবার। তুই কথার ফাঁকে জেনে নিবি। ”
” সত্যি বলছেন ”
” একদম সত্যি ”
সানি দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে,,,
” শাশুড়ী বউ মিলে আমাকে পাগল করে ছাড়বে। ”
শায়লা বেগম আবারও সারাকে বলে উঠে,,
” তুই একটু বেশি বেশি সানির সাথে কথা বলবি। হুট করে প্রশ্ন করতে পারবি না তো। যা সানি ঘরে রয়েছে, একটু গল্প কর। গল্প ফাঁকে ফাঁকে হুটহাট একটা প্রশ্ন করে ফেলবি। এমনি দিন তো আর ঘরেই পাবি না। আজ জোর করে আটকে রেখেছি। দেখতো কি করে ওর ঘরে। ”
সারা তো অনেক আগেই থেকে যেতে চেয়ে ছিলো। কিন্তু সুযোগ বা বাহানা কোনোটাই খুঁজে পাচ্ছিলো না। আজ সম্পূর্ণ অনুমতি পেয়ে গেলো সে। তাকে আর পায় কে। মা আর ছেলেকে এক সাথে পটিয়ে ফেলবে সে।
সারা একটু বনিতা করে বলে,,
” যাবো ”
” হ্যাঁ যা। তেল দেওয়া হয়ে গিয়েছে। আমি দেখি তোর মা আর তোর ছোট মা কি করে। ”
সানি মনে মনে আওড়ালো,,
” এতো হিটলারি বুদ্ধি নিয়ে ঘুমাস কিভাবে তুই। ঠিক আছে আয় আমার ঘরে। শুনাচ্ছি আমার প্রেমিকার গল্প, আর করাচ্ছি তোকে পাকনামি। ”
সানি চলে গেলো নিজের ঘরে। বেলকনিতে দাঁড়িয়ে সারার অপেক্ষা করছে। মিনিট পাঁচ এর ভেতর ডাক পরলো সারার,,
” সানি ভাই ”
সানি গম্ভীর কন্ঠে জবাব দেয়,,
” হুম আয় ”
সারা ধীর পায়ে ঘরে প্রবেশ করলো। ঘরে দেখতে না পেয়ে সোজা চলে গেলো বেলকনিতে। সানি রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে। সারা সানির পাশে অনেকটা দূরত্ব রেখে দাঁড়ালো।
” আপনার শরীর এখন কেমন? ”
” হুম ভালো। ”
সারা দুই হাত কচলাতে লাগলো। কি কথা বলবে ভেবে পাচ্ছে না। কোনো কথা খুঁজে না পেয়ে সারা এদিক ওদিক দৃষ্টি রেখে বলে,,
” আজকের আবহাওয়াটা সুন্দর না ”
সানি নিশব্দে হাঁসছে মনে মনে। কোনো কথা খুঁজে না পেলে যা হয়। আজকের আবহাওয়া একদম ভালো না। চড়া রোদ বাইরে। বিকেল হয়ে গিয়েছে অথচ এখনও সূর্যের প্রখর তাপ। সানি গম্ভীর কন্ঠে স্পষ্ট জবাব দেয়,,,
” এমন ভ্যাবসা গরম আবহাওয়া কারও ভালো লাগে জানা ছিলো না। ”
নিজের বলা কথায় নিজেই বিপাকে পরে গেলো সারা। আহলে ভ্যাবসা গরম পরেছে আজ। কিন্তু সে তো কোনো কথা খুঁজে না পেয়ে বলেছে। কিন্তু হার মানলে চলবে না। তাই সারা কথা ঘুরিয়ে বলে,,
” আপনি এতো বছর দেশের বাইরে ছিলেন। তাই এমন মনে হচ্ছে। ”
” আমার ২৬ বছর বয়সে মাত্র ছয় বছর দেশের বাইরে কাটিয়েছি আর বাকি ২১ বছর বাংলাদেশে। এই দেশের আবহাওয়া আমার রক্তে মিশে রয়েছে। কারন এটা আমার জন্মস্থান। ”
নাহ কথায় একদম পারছে না সারা। সারা প্রসঙ্গ পালটে বলে,,
” জার্মানিতে অনেক সুন্দর সুন্দর জায়গা রয়েছে তাই না। ”
” হুম রয়েছে। ”
সানির এমন মুর্তির মতো উত্তর দিতে দেখে বিরক্ত হচ্ছে সারা। সারা মনে মনে আওড়ালো,,
” কি বোরিং মানুষরে বাবা। সারা মাথা ঠান্ডা এমন অধৈর্য্য হলে চলবে না। ”
নিজেকে শান্তনা দিয়ে বলে,,
” সানি ভাইয়া বাংলাদেশে আপনার বেস্ট ফ্রেন্ড গুলোর নাম কি? ”
সানি বিনা হেঁচকিয়ে বলে,,
” নাহিদ, শাকিল, মাইদুল,মাহফুজ ”
সারা একটু খুশি হলো, একটা মেয়ে মানুষের নাম বললো না। সারা আবারও প্রশ্ন করে,,
” এগুলোর ভেতর কার সাথে আপনার বেশি ভালো সম্পর্ক ”
” নাহিদ ”
” জার্মানির বেস্ট ফ্রেন্ড ”
” অ্যালান, অলিভার , শেহজান”
নাম গুলো শুনে বুঝতে পারলো একজন বাংলাদেশি আর বাকি সবাই দেশের বাইরে। এখানেও মেয়েদের নাম নেই। সারা এবার খুশিতে আধখানা। তবুও একটু ভালো ভাবে বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ দূর করতে মনে সাহস জুগিয়ে বলে,,
” আপনার কোনো মেয়ে ফ্রেন্ড নেই। ”
সানি মনে মনে বললো,,
” এবার আসো লাইনে। ”
সানি বরাবরের মতো গম্ভীর কন্ঠে স্পষ্ট জবাব দিলো,,
” না নেই। প্রয়োজন ছাড়া কথা হয় না। ”
সারার মন খুশিতে পাখা মেলে নৃত্য করছে। মন যেন বার বার গান গেয়ে উঠছে। এ খুশি তাকে পাগল করে খেলবে। সারা নিজেকে স্বাভাবিক করে বলে,,
” জার্মানির মেয়ে গুলো দেখতে সুন্দর তাই না সানি ভাই। ”
সানি জিহবা দিয়ে নিজের ঠোঁট ভিজিয়ে নিলো। নিজের হাঁসি আটকিয়ে বলে,,
” হুম সুন্দর ”
সানির এ উত্তরে সারার মুখ চুপসে গেলো। মন তার পাখা গুটিয়ে নিয়ে নৃত্য বন্ধ করে দিলো। গলাটা হুট করে শুকিয়ে এলো। ,,
” ওহ,, ”
সারা একটু থেমে শুকনো ঢোক গিলে বলে,,
” আপনার কোনো মেয়ে পছন্দ রয়েছে ”
” এসব পছন্দ করার সময় পায় নি৷ ”
সারার ধরায় যেন প্রান ফিরে পেলো।
চলবে____

