#আমরন_চেয়েছি_তোমায়
#লেখায়_সুরাইয়া_নওশিন
১৫
খান বাড়ির সকলে এক সাথে রাতের খাবার শেষে যে যার ঘরে প্রবেশ করেছে। রায়হান খান আর রবিউল খান এর মাঝে সানির অসুস্থতার খোঁজ নিলেন। তারা জানে শিকদার বাড়ির সদস্যরা এসেছিলো। কিন্তু এ প্রসঙ্গে কথা বললেন না। এই বিষয়ে কথা বলারও তাদের কোনো আগ্রহ নেই। তাই বিষয়টি নিয়ে তারা চুপ থাকলেন। কিন্তু সানি কে জানিয়ে দিলেন কাল থেকে অফিসে যেতে। সানিও বাধ্য ছেলের মতো তাদের কথা মেনে নিয়ে সম্মতি জানালেন । অফিসে যাওয়ার আগে কিছু কাজ বুঝে নেওয়া প্রয়োজন। কারন সকালে গিয়ে তাকে সামলাতে হবে। আর বিকালে সামলাবে সাফি। সকালে সাফি ভার্সিটি চলে যাবে তাই তার কাছে সহযোগিতা পাবে না বিদায় রাতেই সাফির কাছে এলো সানি। দুজনে মিলে অফিসের কিছু কাজ দেখে নিলো। সাফি সুন্দর করে বুঝিয়ে দিলো সবটা। সানিও খুব সহজে বুঝে নিলো। সানি অনেকক্ষন যাবৎ খেয়াল করছে সাফির মনটা একটু ভারি। যদিও সে বুঝতে দিচ্ছে না। কিন্তু সাফির সঙ্গে তার খুব ভালো বুঝাপড়া থাকায় বিষয়টি তার বুঝতে কষ্ট হলো না। কাজ শেষে সোফায় আরাম করে হেলান দিয়ে বসে আড়মোড়া দিলো সানি।
সানি আড়মোড়া দিতে দিতে বলে,,
” একদিন শুয়ে থেকে পুরো গাঁ ব্যাথা হয়ে গিয়েছে আমার। ”
সাফি ল্যাপটপ বন্ধ করতে করতে বলে,,
” অসুস্থ ছিলি এ রেস্ট দরকার ছিলো। কাল থেকেই তো শুরু হবে আবার। দুদিন রেস্ট নিয়ে কাজ শুরু করলেই হতো। ”
” না না তার প্রয়োজন নেই। এই ভাবে থাকলেই আমি বরং অসুস্থ হয়ে যাবো। ”
সানি সাফির দিকে তার মোটা ভ্রু যুগল বাঁকিয়ে জিজ্ঞাসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,,
” তোমার কিছু হয়েছে সাফি ভাই। ”
সাফি স্বাভাবিক ভাবে জবাব দেয়,,
” কই কিছু না তো। ”
সানি সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সাফির দিকে। সাফি সানির দৃষ্টি দেখে বুঝতে পারছে সে না জেনে ছাড়বে না। আর সানির এ স্বভাবের জন্য চাইলেও কিছু লুকাতে পারে না সে। সাফি দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে,,
” তেমন কিছু নয়, মাঝে মাঝে হাঁপিয়ে উঠি জানিস।
এই বাঁধা জীবন নিয়ে খুব ক্লান্ত হয়ে পরি। মাঝে মাঝে মনে হয় ভুলে যাই সব, এই সমাজ, এই পরিবারের দায়িত্ব। মনে হয়, একটু নিজেকে নিয়ে ভাবি, নিজের চাওয়া পূরণ করি। পরক্ষনেই মনে হয়, সবাইকে কষ্ট দিয়ে, এই দায়িত্ব থেকে পালিয়ে সুখী হতে পারবো আমি। নিজের সামনে নিজে দাঁড়াতে পারবো তো। এই ২৮ বছরে আমি একটা বিষয় লক্ষ্য করেছি কি জানিস,
যেই সব মানুষ শুধু নিজের চিন্তা করে দিন শেষে তারাই সুখী। আর যারা সবাইকে নিয়ে সুখী হতে চায় তাদের নিজের চাওয়া বিসর্জন দিতে হয়। হাঁপিয়ে উঠি রে, মাঝে মাঝে নিজের মতো বাঁচতে ইচ্ছে করে কিন্তু পারি না স্বার্থপর হতে। নিজের দায়িত্ব অবহেলা করতে পারি না৷ নিজের অনুভূতি চেয়েও প্রকাশ করতে পারি না। জানিস তো ২০ বছর বয়সে বড় একটা ধাক্কা খেয়েছি আমি। প্রথম বাবার অবাধ্য হয়ে ছিলাম, কষ্ট দিয়েছি তার শাস্তিও আমি পেয়েছি। নতুন করে আবারও রঙ্গিন স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম। আমি অনেক ভয় পেয়েছিলাম, নিজেকে অনেক আটকানোর চেষ্টা করেছি, নিজের মনকে অনেক বুঝানোর চেষ্টা করেছি কিন্তু মনের সাথে আর কি জোর করা যায়। আমি হেরে গিয়েছি। ভেবেছি সবটা গুছাবো নিজের হাতে,কিন্তু ভয় লাগে গুছানোর আগে যদি সব এলোমেলো হয়ে হারিয়ে যায়। দ্বিতীয় বার আমি একই আঘাত পেলে আমি মরে যাবো সানি। কারন ও আমার সাদা কালো জীবনে রঙিন রঙ হয়ে আমার জীবনে আগমন ঘটিয়েছে। আমার সানি আরহি কে চাই। আমি জানি না এমনটা কেন হচ্ছে,এটা পুরো বাচ্চামো আমার সাথে এ স্বভাব একদমই যায় না। আমি এখানে ভীষণ ভাবে অবুঝ হয়ে যাই, আমার চাই মানে চাই। সেটা আজ হোক কিংবা এক মাস, এক বছর কিংবা একশো বছর পরও আমার আরহিকেই চাই। এই খান বাড়ির যোগ্য বউ হয়ে গড়ে তুলবো আমি। কিন্তু আমাকে তো সময় দিতে হবে। আমার ভয় হয় যদি এর আগে ও অন্য কাউকে চেয়ে বসে। আমি মেনে নিতে পারবো না। আমার মনে হলে দম আটকে আসে,আমার শ্বাস নিতে ভীষণ কষ্ট হয়। ”
পুরো কথা এক শ্বাসে শেষ করে সোফায় হেলান দেয় সাফি। চোখের কিনারা বেয়ে এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পরে। সানি অবাক হলো, অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। কত বছর পর সাফির চোখে অশ্রু দেখলো সে। সাফির মতো শক্ত মানুষও মাঝে মাঝে হাঁপিয়ে উঠে। প্রিয় মানুষটাকে হারানোর ভয় একটা শক্ত মনের পুরুষ মানুষকে কাঁদিয়ে দেয়। অথচ এই মানুষটা তাকে সব সময় বুঝায়, সাহস দেয়, অনুপ্রেরণা দেয়। সানি সাফির মাথায় হাত রাখে। আলতো ভাবে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলতে থাকে,,,
” তুমি ভয় কেন পাচ্ছো? আরহি তো হারিয়ে যায় নি। অন্য কারও হয়েও যায় নি। তাহলে এতো ভয় কেন পাচ্ছো আজ। আর অন্য কারও হবেও না। আজ হোক, এক মাস পর হোক, এক বছর পর হোক কিংবা একশো বছর পর আরহি তোমারই বউ হবে। ”
সাফি অসহায় দৃষ্টিতে ঘুরে তাকালো সানির দিকে। ভয়ার্ত কন্ঠে বলে,,
” যদি ও না চায় তো। ”
” কেন চাইবে না? ”
” সানি ও আমাকে ভীষণ ভয় পায়। ও মুক্তি চায় আমার থেকে, আমাকে চায় না সানি। এটা কি স্বাভাবিক নয় ওর জীবনে কারও আগমন করা। এখন বয়স টাই এমন ওর। কত রঙিন স্বপ্ন, রঙিন অনুভূতি এসব অস্বাভাবিক নয় সানি।”
” তুমি আরহিকে শেয়ার করো। ”
সাফি সানির দিকে কপাল কুচকে তাকিয়ে বলে,,
” পাগল তুই, আরহিকে বললে ও ভয়ে দাঁত কেলিয়ে বসে থাকবে। সামনে দাঁড়ালে হাত পা কাঁপে তার। সানি আমি চাই ও আমাকে ভরসা করুক, বিশ্বাস করুক। ও আমার ভয়ে নয় আমার মায়ায় বেঁধে থাকুক। সানি আমি চাই আমি যেমন ও সেভাবে আমাকে এক্সেপ্ট করুক। আমি ভিন্ন রুপ ধরে অভিনয় করে ওকে চাই না। সানি একটা বয়সে মানুষ ভালোবাসা দিতে চায় শুধু, আরেকটা বয়সে মানুষ চায় কেউ তাকে ভালোবাসুক, তাকে বুঝোক। আমি সবাই কে বুঝি, সবার জন্য সেক্রিফাইজ করি। কেউ তো আমাকে বুঝোক। ”
” বিষয়টি আমি বুঝতে পারছি।কিন্তু একে অপরকে সময় দিতে দোষ কোথায়, তুমি একটু সময় দাও না হয় বুঝবে কিভাবে তোমাকে। ”
” কিভাবে সময় দিবো?”
সানি অবাক হয়ে বলে,,
” মানে কি একটু ঘুরো,কথা বলো। ”
” বুদ্ধি বয়স থেকে দেখছে আমাকে। আমাকে চেনে না নাকি। দুই লাইন কথা বলবে তার ভেতর সরি বলবে দেড় লাইন, অসহ্য। এতো বছর আমাকে ফেসবুক থেকে ব্লক করে রেখেছিলো ভয়ে। কি বলবি তাহলে বল। ”
সানি একটুর মজার ছলে বলে,,
” আরে প্রেমিক হিসেবে তো চিনে না। একটু নরম স্বরে কথা বলো আমার ভাবির সাথে। সব সময় পড়াশোনা কথা না বলে একটু তো রোমান্টিক কথা বলতে পারো নাকি। সব সময় সিরিয়াস মুড নিয়ে থাকলে ভয় তো পাবেই।”
সাফি সোফার কুশন ছুড়ে মারে সানির গাঁয়ে,,,
” সব সময় ফাজলামো তোর। একে তো আমি দুশ্চিন্তায় ভুগছি, আর তোর ফাজলামো। এসব লুতুপুতু বাবু সোনা প্রেম আমার দ্বারা হবে না। ”
” হবে না যখন তাহলে প্রেমিকাও পাবে না। থাকো এভাবে কুমার হয়ে। ”
” আমি কি প্রেমিকা চেয়েছি নাকি। ওকে আমি প্রেমিকা নয় বউ করতে চাই। প্রেমিকা হারিয়ে যায়, তিন কবুলে বেঁধে রাখবো যাওয়ার অফসন নেই।এসব প্রেম আমার পছন্দ নয়,একবার ভুল করেছি আর নয়। আর আমি প্রেমিক নই, আমি স্বামী। বিয়ে করবো, বিয়ে, বউ চাই আমার। ”
সানি এবার ফিক করে হেঁসে দেয়। সাফির কপাল কয়েকস্তর ভাঁজ পরে সানির হাঁসি দেখে। সাফির শেষ বাক্য শুনে খুব হাঁসি পায় তার। এমন বাচ্চামো কথা প্রথম শুনছে সাফির মুখ থেকে। সানির কাছে অবিশ্বাস্য লাগলেও ঘটনাটা তার সামনে ঘটছে তাই অবিশ্বাস করারও কারণ নেই। সাফি গম্ভীর কন্ঠে বলে,,
” হাঁসছিস কেন? ”
সানি হাঁসতে হাঁসতে বলে,,
” সাফি ভাই শেষের লাইন জাস্ট জোস ছিলো।
সাফি সানির মাথায় গাট্টা মেরে বলে,,
” সব সময় উল্টো বুঝা তোর, আমি ওই ভাবে বলি নি। ”
” আরে ভাই রাগ করছো কেন? তুমি তো আর খারাপ কিছু বলো নি। আমি বুঝেছি তুমি ওই ভাবে বলো নি। বউ লাগাটা স্বাভাবিক, এটা দোষের কি? দোষের হলে কি কেউ বিয়ে করতো, তুমি ভুল বুঝছো আমাকে। ”
” তোকে আমি চিনি না তো। তুই যে কত ভদ্র তার জানার বাকি নেই আমার। বড় ভাইয়ের সামনে নির্লজ্জ মার্কা কথা বলিস তুই। ”
” আচ্ছা নির্লজ্জ হলে তোমার বোন কি? বিয়ে করার জন্য তোমাকে বুড়ো আর আমার মায়ের কাছে আমার ফর্সা চরিত্রে কালি দাগ লাগিয়ে দিয়েছে। ”
সাফি বিস্মিত কন্ঠে বলে,,
” মানে কি ”
সানি শুরু থেকে সবটা খুলে বললো। সাফি হা হয়ে সবটা শুনলো। সাফি এবার সোজা হয়ে বসে মাথায় হাত রেখে বলে,,
” ওরে আল্লাহ ”
সানি এবার ভনিতা করে বলে,,
” ভাই বোন দুজনেই বিয়ের জন্য পাগল হয়ে গিয়েছে। আমি আর এদের নিয়ে পারি না। ”
সাফি চোখ জোড়া ছোট করে কপাল কুচকে তাকায় সানির দিকে,,
” আমিও দেখি তুই কবে বিয়ের কথা বলিস ”
সানি আড়মোড়া দিতে দিতে বলে,,
” হবু বউ আমার বিয়ের জন্য উতলা হয়ে গিয়েছে হবু বর হয়ে আমারও কিছু দায়িত্ব আছে নাকি। বউয়ের শখ পূরণ করবো না তো কার করবো বলো। এতো কিছু কার জন্য করছি বলো। এই বউটার জন্যই তো। ”
শেষ বাক্যটা একটু লজ্জা রাঙা ভাব নিয়ে বললো সানি। সাফি আবারও আর একটা কুশন ছুড়ে মারে সানির দিকে,,
” ঢং করিস আমার সাথে,,ড্রামা বাজ। তোর সাথে আমার বোনের বিয়ে দিচ্ছি না যা। ”
সানি সাফিকে চোখ মেরে বলে,,
” এই যে এই শরীরে যে রক্ত বইছে শিকদার বংশের, মেয়ে তুলে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করার রক্ত বুঝছো। ”
” তুই কি আমাকে ভয় দেখাচ্ছিস ”
” মোটেও না, স্মরন করে দিলাম আর কি। ”
” তারপর ছেড়ে চলে যাওয়া এটাও রয়েছে শিকদার বংশে এটাও স্মরন কর। ”
সানি তর্জনী আঙ্গুল নাড়িয়ে না সম্মতি জানালো আর বলতে লাগলো,,
” উহু শিকদার বংশে কেউ বউ ছেড়ে যায় নি। সব বউ পাগল, ভবিষ্যতে আমিও হবো মানে অলরেডি হয়ে আছি। শিকদার বংশের লোকেরা রাগী হোক, জেদি হোক, গুন্ডামি করুক, রাজনীতি করুক যাই করুক বউকে নিজের জীবন বাজি রেখে রক্ষা করে। আমার বাবাকেই দেখো মাকে কখনও বিপদের ছায়াও পরতে দেয় নি। নিজের শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত আগলে রেখেছে।”
সানি দীর্ঘ শ্বাস ফেলে আবারও বলে,,
” মৃত্যুকে বিচ্ছেদ বলি না আমি। জন্ম মৃত্যু এটা প্রকৃতির নিয়ম। বিচ্ছেদ আমি তাকে বলি বেঁচে থেকে দুজন আলাদা হয়ে যাওয়া। মৃত্যু কখনও একটা সম্পর্কে অপূর্ণতার কারন হতে পারে না। মৃত্যু তো অন্তত কাল এক সঙ্গে থাকার এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া।
তুমি যতদিন বাঁচো এক বছর, এক মাস, এক সপ্তাহ, একদিন কিংবা এক ঘন্টাও যদি বাঁচো সেটা যদি প্রিয় মানুষটার সঙ্গে নিয়ে বেঁচে থাকা হয় সেটাকেই একটা সম্পর্কের পরিপূর্ণতা বলি আমি, বিচ্ছেদ নয়। আর এই এতোটুকু সময় প্রিয় মানুষটাকে এভাবে ভালোবাসো যাতে তোমার অনুপস্থিতিতেও সেই ভালোবাসা যেন পুষিয়ে দেয়। ভালোবাসার জন্য যেন কোনো আফসোস না থাকে। তোমরা দোষ দাও আমার বাবাকে, আমি মানছি, মাফিয়া জগৎ এসব অন্ধকার জগৎতে নিজেকে হারিয়ে ফেলা। রাজনীতি এটা প্রানের ঝুঁকি, ভয়, আতংক। কিন্তু তুমি মাকে জিজ্ঞেস করে দেখো তুমি হাজারো জনম জীবন সঙ্গী হিসেবে কাকে চাও আমার মা কি বলবে জানো, তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া মাফিয়া কিং সাগর মাইন শিকদার কে চাই। তাও কোনো কিছু না ভেবে জবাব দিবে। ভালোবাসা এমনি হওয়া উচিত, তোমার ভালোবাসায় যে তোমাকে ঘৃণা করবে সেও তোমাকে ভালোবাসতে বাধ্য হবে। ”
সাফি মৃদু স্বরে হেঁসে বলে,,
” এই জন্য বলি আমার বোন পাগল কেন? ”
সানি মনমরা হয়ে বলে,,
‘ আর তোমরা আলাদা করতে চাইছো। ভয় পাচ্ছো তাই না, সারাকে যদি সাদা রঙহীন শাঁড়ি পড়তে হয়। ”
সাফির বুকটা তৎক্ষনাৎ মোচড় দিয়ে উঠলো। আহত দৃষ্টিতে তাকালো সানির মুখ পানে। চোখের অশ্রু যেন আবার টলমল করছে। ধরা গলায় বলে,,
” বোনকে সাদা শাড়িতে দেখার সহ্য ক্ষমতা আমার আছে, কি নেই আমার জানা নেই। তবে তোকে সাদা কাফনে দেখার ক্ষমতা আমার নেই। ”
সানি মুচকি হেঁসে জড়িয়ে ধরে সাফিকে। সাফির পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে বলে,,
” চিন্তা করো না আমি আছি। আরহি জান্নাত মনে কারও জায়গা হবে না সাফি মেহতাব খান ব্যাতিত। যে আসতে চাইবে তাকে সরানোর দায়িত্ব আমার। ”
সাফি হাল্কা করে ধাক্কা মারে সানিকে। সানি মুচকি হাঁসে নিশব্দে। সাফি বিরক্ত ভরা কন্ঠে বলে,,
” মারামারি ছাড়া তোরা শিকদার বংশ কিছু বুঝিস না।”
” আমরা কি বুঝি সেটা জানি না, তবে একটা জিনিস খুব ভালো ভাবে বুঝি নিজের জিনিস আদায় করে নেওয়া বুঝি। আচ্ছা একটা কাজ করলে কেমন হয়? ”
সাফি সানির দিকে ভ্রু কুচকে জিজ্ঞাসাসূচক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,,
” কি কাজ? ”
” বড় মামাকে বলি বিষয়টা । ”
সানির কথায় আৎকে উঠে সাফি। চমকে গিয়ে বলে উঠে,,
” ভেবে কথা বলিস তুই, বাবা মানবে, কখনও না। জানিস না সে কেমন বউ চায়, বাড়ির বউ কেমন হতে হবে। মানবে কখনও, কখনও না। আর এমনি তেও আমি আগেও একটা ভুল করেছি। এই বিষয়ে বাবার চোখে আমি এমনি তেই দোষী। ”
” আরে তুমি চাপ কেন নিচ্ছো, আমি কি বলেছি তুমি বলবে। আমি বলবো, আমি সামলে নিবো। মামার চোখে এমনিতেই আমি দোষী আর হলে সমস্যা নেই। ”
” খবরদার না সানি, আমি এমনিতেই তোর আর বাবার বিষয় নিয়ে চিন্তায় আছি। কেন এতো যুদ্ধ করে তোকে বিদেশ পাঠিয়েছি এই জন্য। বাবার চোখে সুপাত্র হওয়ার জন্য। আর এই সব করে বাবার চোখে খারাপ হতে দিবো আমি, কখনও না। সানি তুই আমার বোনকে ঠকাস না। আমি জানি, এই আঘাতের যন্ত্রণা কতটা তীব্র আমি চাই না সেটা আমার বোন পাক। আমার বোন একটু অগোছালো, ঠিক ভাবে পড়াশোনা করে না, জেদ বেশি, পাগলামি, দুষ্টুমি তে মেতে থাকে, কিন্তু ও তোকে ভীষণ ভালোবাসে। তুই ছাড়া ও দ্বিতীয় কোনো পুরুষের দিকে তাকায়নি। ওকে সময় দে, ঠিক ও সব বুঝে যাবে। দেখিস না তোর কাছে একদম জেদ খাটায় না, একদম রেগে থাকতে পারে না। ”
সানি একটু রেগে গিয়ে কপালে কয়েকস্তর ভাঁজ ফেলে বলে,,
” মাথা গরম করার কথা বলো না তো। তোমার বোনকে ছেড়ে যাওয়া আমার পক্ষে অসম্ভব, সেটা তুমি খুব ভালো করে জানো, তাহলে এসব কেন বলো? তোমার বোন অগোছালো হোক, ও হাজার সাবজেক্ট ফেইল করুক, পড়াশোনার কোনো দরকার নেই, রাগী হোক, জেদি হোক, ও যেই রকমই হোক সেই ভাবে কবুল আমার। কথায় আছে হেরে যাওয়ার আগেও শেষ চেষ্টা করতে হয় আমি তাই করছি।
আমি চাই না আমার সামনে কিংবা আমার অগোচরে আমার বউকে নিয়ে কেউ মন্তব্য করুক। আমি আমার বউকে সম্পূর্ণ সুখ দিতে চাই, সব পরিপূর্ণতা দিতে চাই আমার মা মতো কষ্টে দেখতে পারবো না। ওকে সুখে রাখার দায়িত্ব যখন আমি তোমার কাছে থেকে হাত পেতে নিয়েছি সে দায়িত্ব আমি পালন করবো। শেষ চেষ্টা করবো, শিকদার বাড়ি আর খান বাড়ি না মানলেও সারা মেহরুন খান এই সানি মেহরাজ শিকদার এর। ”
” আমি আমার বোনকে ঝামেলায় ফেলতে চাই না সানি। আমি আমার বোনকে কখনও আঘাত পেতে দেই সানি। ওর গাঁয়ে কখনও হাত তুলি নি। ওকে কাউকে কিছু বলতে দেই নি। আমিও মেনে নিতে পারবো না ওকে কেউ কিছু বললে। তাই তোকে স্বার্থপরের মতো হাজারটা শর্ত দিয়ে বসে রয়েছি। সবটা ঠিক করা সত্যি প্রয়োজন। এই ভাবে কখনও একটা নতুন জীবন শুরু করা সম্ভব না। শিকদার বাড়ির কেউ তো খান বাড়ির কাউকে সহ্য করতে পারে না। আর খান বাড়ির কথা তো বাদি দিলাম আমি। মাথা কাজ করে না, কিভাবে কি সম্ভব। এদিকে আরহিকে খান বাড়ির সবাই স্নেহ করলেও বউ হিসেবে অন্তত বাবা মেনে নিবে না। বাবার তো শিক্ষিত, বংশ দেখে, গোছালো মেয়ে চাই। সময়টা এতো বাজে যাচ্ছে। ”
আরহির বয়স কত? পড়াশোনা তো করছে করুক না, আর বাকি রইলো ওর ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড সেটা তো তুমি দেখছোই চিন্তা কেন? এসব দুশ্চিন্তা বাদ দাও, বাদ দিয়ে বউকে কোলে পিঠে মানুষ করো। সানাই এমনিতেই বাজবে। ”
সানির শেষ কথায় সাফি না হেঁসে আর থাকতে পারলো না। হাঁসতে হাঁসতে বলে,,
” তুই ও একটা মানুষ রে ভাই। ”
সানিও মুখে হাঁসি এনে বলে,,
” শিকদার বংশের ধামাকা আমি। ”
সাফি এবার বেশ আওয়াজ করে হেঁসে উঠে। সানি মনে মনে খুশি হলো সাফিকে হাঁসাতে পেরে। যাই হোক হাঁসাতে তো পেরেছে এটাই শান্তনা। বাকিটা না হয় পরে দেখা যাবে। সে তো তার সাফি ভাইকে আঘাত পেতে দিবে না, কোনো শর্তেই না। বরাবরই তার ঝুঁকি নেওয়ার সাহসটা একটু বেশি। শান্ত ভাবে ঘুরে বেরালেও শিকদার বংশের তেজের রক্ত বইছে শরীরে, ঝুঁকি নেওয়ার সাহস থাকা অস্বাভাবিক নয়।
★★★★★★
সকাল সাতটায় হসপিটালের উদ্দেশ্য বের হচ্ছে সানি। সেখান থেকে অফিস যেতে হবে দশটার ভেতর। হসপিটালে গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে সে জন্য যাওয়া।সিঁড়ি বেয়ে নিচ্ছে নামছে তখনই চোখে পরে রান্না ঘর থেকে হাতে কফি নিয়ে বেরিয়ে আসছে তার ভালোবাসার রমনী। হাঁটু অবব্ধি ঢিলেঢালা কালো রঙের গেঞ্জি, হাল্কা আকাশী রঙের প্লাজু, গলায় ঝুলিয়ে রাখা ওড়না। ছেড়ে দেওয়া ভেজা চুল কোমড় ছাড়িয়ে গিয়েছে। দেখতে সত্যি ভোর সকালের শীতল রূপের মতো স্নিগ্ধ লাগছে। তার চক্ষু জোড়া শীতল করে দিলো, মুহুর্তটাই যেন সুন্দর করে দিলো।এই মুহুর্তে তাকে শীতলিকা রমনী উপাধি না দিলে অন্যায় হয়ে যাবে। সারার দৃষ্টি অন্য দিকে থাকায় তার চোখে পরলো না কোনো দৃষ্টি তাকে অপলক তাকিয়ে দেখছে। সারা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে মুখোমুখি হয় সানির। সানি এর আগেই নিজেকে স্বাভাবিক করে নিলো। সারা সানিকে এতো সকালে রেডি হয়ে যেতে দেখে বলে উঠে,,
” সানি ভাই এতো সকালে বেরিয়ে পরেছেন আজ। ”
সানি শুকনো কাঁশি দিয়ে বলে,,
” হুম হসপিটালে একটু কাজ ছিলো, সকালেই করতে হবে। সেখান থেকে আবার অফিস যেতে হবে।”
সারা ছোট করে জবাব দিলো,,
” ওহ ”
সানি সারার দিকে ভ্রু কুচকে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলে,,
” এতো সকালে গোসল করেছিস কেন? তার ভেতর চুল ভেজা ঠান্ডা বাঁধার শখ হয়েছে তাই না। এমনিতেই তোর ঠান্ডা সমস্যা। কবে একটু খেয়াল রাখা বুঝবি বলতো। ”
সানির গম্ভীর শক্ত কন্ঠ শুনে সারা মাথা নিচু করে বলে,,
” সকালে গোসল না করে গেলে ভালো লাগে না ভার্সিটিতে গিয়ে। আর হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে চুল শুকিয়ে নেই ঠান্ডা লাগে না। কিন্তু হেয়ার ড্রায়ার নষ্ট হয়ে গিয়েছে তাই চুল শুকাতে পারি নি। ”
সানি আবারও শক্ত কন্ঠে বলে,,
” খান বাড়িতে টাকার এতো অভাব হয়ে গিয়েছে একটা হেয়ার ড্রায়ার কেনার টাকা নেই। ”
সারা মিনমিনে গলায় বলে,,
” আজ সকালে নষ্ট হয়ে গিয়েছে। ”
সানি দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে,,
” একটা হেয়ার ড্রায়ার কিভাবে থাকে তোর। তুই অনলাইন অর্ডার কর কয়েকটা, আমি পেমেন্ট করে দিবো। ভেজা চুলে আর কোনো দিন যেন তোকে বেশি সময় না থাকতে দেখি। ”
সারা হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ালো শুধু। সানি আবারও বলে উঠে,,
” আর হ্যাঁ রাতের পোশাক পরে এভাবে যেন ঘুরতে না দেখি। ঘর থেকে বের হলে ভালো জামা পরে বের হবি। ”
সারা সরু দৃষ্টিতে তাকায় সানির দিকে। কিন্তু কিছু বলার সাহস নেই। এই পোশাকে খারাপ কি দেখলো সে। যথেষ্ট লম্বা আর ঢিলেঢালা পোশাক। তবুও বাধ্য হয়ে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ালো।
সানি এবার নরম স্বরে বলে,,
” কফি তুই বানিয়েছিস ”
সারা হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ালো। কিভেবে অনেকটা আগ্রহ নিয়ে বলে উঠে,,
” খাবেন আপনি ”
সানি একটু আশেপাশে চোখ বুলিয়ে নিলো। এরপর সারাকে উদ্দেশ্য করে বলে,,
” দে দেখি টেস্ট করে, তোর হাতের কফি। ”
সারা হাত বাড়িয়ে এগিয়ে দিলো কফি। সানির উচ্চতা বেশি থাকায় সিঁড়ি বেয়ে এক পা নেমে দাঁড়ালো। এরপর কফির গ্লাস হাতে না নিয়ে সারার হাতেই কফির কাপে ঠোঁট রাখলো সানি। সারা লজ্জা রাঙানো মুখ নিয়ে খাইয়ে দিলো কফি। সানি নিজের মুখ সরিয়ে নিয়ে ঢোক গিলে বলে,,
” মাশআল্লাহ, টেস্ট হয়েছে অনেক। ”
সানির প্রশংসা শুনে খুশিতে আধখানা হয়ে গেলো মেয়েটা। আজ সকালটা একটু বেশি সুন্দর ছিলো তার জন্য। মনটা ভালো হয়ে গেলো তার। আজ দিনটাও ভালো কাঁটবে তার। সারা মুখে হাঁসি এনে বলে,,
” ধন্যবাদ সানি ভাই। ”
” তোকেও ধন্যবাদ কফির জন্য।”
সারা এবার অন্য প্রসঙ্গ চিন্তা এনে বলে,,
” চলবে তো। ”
সানি মনে মনে নিশব্দে হাঁসলো। সারার কথার প্রসঙ্গ বুঝতে বাঁকি নেই তার। মেয়েটা দুর্দান্ত পাজি এটা তার এতোদিনে বুঝতে বাকি নেই। সানি জিহবা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বলে,,
” দৌড়াবে,,।”
সারা মুচকি হেঁসে মাথা নিচু করে ফেলে। সানি যে তার কথার প্রসঙ্গ বুঝতে পেরেছে কি না তার জানা নেই। তবে সানি অজান্তেই বলুক তবুও সারা খুশি এ জবাবে। সানি নরম স্বরে বলে,,
” আমি আসি তাহলে হ্যাঁ। ”
সারা একটু সংকোচ নিয়ে বলে উঠলো,,
” আসবেন কখন বাসায়। ”
সানি মনে মনে নিশব্দে হেঁসে বলে,,
” বাসায় ফিরতে দেরি হবে একটু, রাত হয়ে যাবে। এখন একটু ব্যস্ত থাকবো। সারাদিন বাসায় থাকা হবে না। দুই দিকে সামলাতে হবে। ”
সারার মনটা একটু খারাপ হয়ে গেলো। মাথা নিচু করে ছোট করে জবাব দিলো,,
” ওহ ”
সানি নিশব্দে মুচকি হাঁসলো। প্যান্টের পকেট থেকে ফোনটা বের করলো তার। এরপর সারাকে উদ্দেশ্য করে বলে,,
” তোর ফোন নাম্বার বল। ”
সারা একটু অবাক হলো, এই জড়তার কারনে এতো দিন হয়ে গেলো অথচ ফোন নাম্বারটাই রাখা হয় নি। সানির কাছে যদিও সারার নাম্বার ছিলো এমনকি মুখস্তও রয়েছে তবুও বিষয়টা এখন জানানো ঠিক হবে না দেখে লুকিয়ে গেলো। এমনিতেই মেয়েটা পুরো পাগল আশকারা দেওয়া ঠিক হবে না। সারা ধীর কন্ঠে নাম্বার বলে। সানি নাম্বার লিখতেই ভেসে আসে নয়না রানী। সানি ফোন দেয় কয়েকটা রিং বাজতেই কেটে দিলো। সারাকে উদ্দেশ্য করে বলে,,
” যখন কোনো কিছু প্রয়োজন হবে ফোন দিশ। মেসেজ ও দিতে পারিস কেমন। আসি তাহলে ”
সানি সারার নাকে তার ডান হাতের তর্জনী আঙ্গুল হাল্কা স্পর্শ করে চলে যায়। সারা সানির যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। সারার খুশিতে এই মুহুর্তে নৃত্য করতে ইচ্ছে করছে। সারা সানির এঁটো কফি এক চুমুক খেয়ে মনে মনে বলে,,
” আজ কফি অন্য দিনের তুলুনায় বেশি টেস্ট হয়েছে। ”
সারা খুশিতে এক দৌড়ে নিজের ঘরে। আজ সে খুশিতে আৎহারা। আজ সারার খুশি দেখে কে।সারার মনটা যেন নতুন করে প্রেমে পরছে। নতুন প্রেমে পরার অনুভূতি সত্যি সুন্দর। নতুন প্রেমের অনুভূতি যেন একটি অসীম সমুদ্রের মতো। এখানে উত্তাল ঢেউ, মাঝে মাঝে শান্তির পরশ, আর এক মহৎ অনুভূতির সংমিশ্রণ। জীবনকে এক নতুন রঙের তুলিতে রাঙিয়ে দেয়, যা কখনো ভুলে যাওয়া যায় না।প্রেমের প্রারম্ভে, প্রতিটি মুহূর্তে এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ কাজ করে। প্রেমিকার পুরনো হাসি, চোখের দৃষ্টি, নীরবতা সবকিছু যেন নতুন করে জীবন্ত হয়ে ওঠে। হৃদয়ের কোটরে একটি নতুন গান শুরু হয়, আর তার সুরে মন খুঁজে পায় শান্তি আর উল্লাস।
★★★★★★
ভার্সিটির উদ্দেশ্য বেরিয়ে পরেছে সাফি আর সারা। আরহির বাসার গলির সামনে দাঁড়াতেই আরহি গাড়িতে উঠে বসে। প্রতিদিন এর মতো দুজনের সালাম বিনিময়ে হলো। তবে আজ সাফি আরহি গাড়িতে ওঠার সময় শুকনো ঢোক গিলে তাকিয়ে ছিলো কয়েক সেকেন্ড। সারা আর আরহি দুজন ফিসফিস করে কথা বলছে। এমন সময় ভুল বশত আরহির কাঁটা আঙ্গুলে সারার হাতের চাপ লাগে। কথায় রয়েছে ক্ষত স্থানে মানুষ বার বার আঘাত পায়। সেটা মনের হোক কিংবা শরীরে। আরহি তৎক্ষনাৎ ব্যাথায় কুকিয়ে উঠে,,
” উহ”
সারা আরহির হাত ছেড়ে দেয়। আরহির আর্তনাদ সাফির কান পর্যন্ত পৌঁছাতে সঙ্গে সঙ্গে ব্রেক কষে থামিয়ে ফেলে গাড়ি। খানিকটা উদ্বিগ্ন হয়ে পেছনে ঘুরে তাকিয়ে বলে,,
” কি হলো। ”
সারাও চিন্তিত হয়ে বলে,,
” কি হলো তোর। ”
আরহি হতবাক হয়ে তাকালো দুজনের দিকে। দুজনের চোখে আতংক। আরহি অবাক হয়ে বলে,,
” আমি ঠিক আছি। আমার কাঁটা আঙ্গুলে চাপ লেগেছিল তাই ব্যাথা পেয়েছিলাম হাল্কা। এ তেমন কিছু নয়। ”
সারা আরহির হাত নিয়ে ক্ষত হওয়া আঙ্গুলটি দেখে। সামান্য কেটেছে, কিন্তু কাঁটার আঘাত সামান্য হলেও যন্ত্রণাটা একটু বেশি থাকে। সারা কপাল কুচকে বলে,,
” ভাইয়া আরহির গোলাপ অনেক পছন্দ। দেখো কি গোলাপ ফুল কিনেছে কাঁটা ছিলো আঙ্গুল কেঁটে গিয়েছে। এতো সুন্দর জানুর হাত টা আমার। তুমি অনেক গুলো গোলাপ ফুল কিনে দিবে। ”
সারা আরহিকে উদ্দেশ্য করে বলে,,
” ভাইয়া গোলাপ ফুল কিনে দিবে তোকে। ভাইয়ার দেওয়া ফুলে একটুও আঘাত পাবি না তুই। একদম কাঁটা থাকবে না। ”
সাফি আর আরহির চোখাচোখি হয়। আরহি নিজের চোখ সরিয়ে নিয়ে মুখে হাঁসি এনে সারার দিকে তাকিয়ে বলে,,
” কাঁটা ছাড়া গোলাপ ফুল কমই রয়েছে। কাঁটা যুক্ত ফুলকে যখন ভালো লাগে তখন কাঁটার আঘাত একটু সহ্য করতে হবে। ”
সাফি চোখ মুখ কুচকে সামনের দিকে তাকায়। আবারও গাড়ি চালাতে মনোযোগ স্থির করে। কিন্তু ব্যর্থ হচ্ছে বার বার। ভয়, আতংক ঘিরে রেখেছে তাকে। শ্বাস প্রশ্বাস যেন এখন অস্বাভাবিক ভাবে বাড়তে শুরু করেছে।
সারা কপাল কুচকে আরহির দিকে তাকায়। এমন ধরনের কথা আরহির মুখে প্রথম শুনছে সারা। আর আরহি নিজেও জানে না এমন ধরনের কথা কেন বলছে সে। এতো গভীর চিন্তা ভাবনার মেয়ে তো সে নয়।
” তোর কি হয়েছে বলতো। কি সব অদ্ভুত কথা বলছিস তুই। কাল কেও কি সব স্টোরিতে লিখেছিস। ”
” আমি তো তোকে বলেছি কিছু হয় নি আমার। শুধু শুধু বেশি ভাবিস তুই। সত্যি তো বলেছি গোলাপ ফুলে কাঁটা তো থাকেই। ”
সারা একটু ব্যঙ্গ করে ভ্রু নাচিয়ে একটু ধীর কন্ঠে আরহিকে বলে,
” উহু সত্যি করে বলো জানু। প্রেমের হাওয়া লাগে নি তো। ”
সারা ধীর কন্ঠে বললেও সাফির সম্পূর্ণ মনোযোগ তাদের কথোপকথন এ থাকায় সাফি ঠিক শুনতে পেলো।সাফি আবারও চোখ মুখ কুচকে ফেলে। বাক্যটা ভীষণ ভয়ানক ছিলো সাফির জন্য। আরহি চোখ বড় বড় করে সাফির দিকে তাকায়। এরপর সারার দিকে চোখ পাকিয়ে তাকায় আরহি। কিন্তু সাফির অস্থির মন আর সংযত রাখতে পারলো না শক্ত কণ্ঠে বলে,,
” স্টপ সারা ”
সাফির শক্ত কন্ঠে দুজনে কেঁপে উঠে এক সঙ্গে। আরহির ভয়ে গলা শুকিয়ে এলো। কিন্তু মনে মনে বেশ রাগ হলো সারার উপর। ভার্সিটি গিয়ে দেখে নিবে। যেখানে সেখানে ফাজলামো তার।
সারা আয়াদের সাথে অনেক ফাজলামো করেছে সাফির সামনে। সাফি জবাব না দিলেও মুচকি হেঁসেছে বরাবরই। কখনও কোনো প্রতিক্রিয়া করে নি, সে জানে সারা মজা করে। তবে আজ এমন প্রতিক্রিয়া করায় সারার সন্দেহ তীব্র থেকে তীব্র গাঢ় হতে থাকলো।
সারা একটু সন্দেহের বসে আবারও বলে,,,
” সরি ভাইয়া, আমি তো মজা করলাম। আর এমন হতেই পারে তাই না ভাইয়া। ”
সাফি এবার আরও একটু শক্ত কন্ঠে বলে,,
” জাস্ট স্টপ সারা ”
সারা হাল্কা কেঁপে উঠে চুপ হয়ে গেলো এবার। এ বিষয়ে আর কথা বাড়ালো না। তার ভাই এখন রেগে আছে। তবে সারার মনে তীব্র গাঢ় সন্দেহটা রয়েই গেলো। গাড়িতে আর কথা হলো না তাদের। ভার্সিটিতে এসে নামিয়ে দেয় দুজনকে সাফি। এসময় সাফি আর আরহির চোখাচোখি হলো আরও একবার। কিন্তু কথা হলো না। সাফি তাকিয়ে রইলো আরহির যাওয়ার দিকে। খুব ইচ্ছে করছে কথা বলতে। কিন্তু জড়তার কারনে পারছেও না। সাফি দীর্ঘ শ্বাস ফেলে উল্টো ঘুরে সেও চলে তার কেবিনের দিকে।
সারা, আরহি, মনিরা, ফাহমিদুল আর কাওসার ক্লাসে বসে আড্ডা দিচ্ছিলো। টুর্নামেন্টের জন্য প্রথম দুটো ক্লাস হবে এরপর বন্ধ থাকবে ক্লাস। আড্ডায় আরহির মন নেই একদম। চোখে ভাসছে সাফির দৃষ্টি। সাফির চোখ জোড়ায় ভীষণ অনুশোচনা দেখতে পেরেছে সে। এই গোলাপ ফুল তার দেওয়া ছিলো দেখে অনুশোচনা করছে। কিন্তু এখানে তার তো কোনো দোষ নেই। সবটাই তার অসাবধানতা৷ আবার পরক্ষণেই ভাবলো নাহ অনুশোচনার দৃষ্টি নয়। ইদানীং একটু বেশি ভাবছে সে। নিজেকে স্থির করতে চাইলো কিন্তু এ কাজে ব্যর্থ হলো সে। পারলো না স্থির করতে। চোখে বার বার দৃশ্যমান হচ্ছে সাফির অনুশোচনা ভরা দৃষ্টি। নিজের উপর বিরক্ত হলো আরহি। আড্ডা ভালো লাগছে না, চোখে মুখে পানি দেওয়া প্রয়োজন। সারাকে বললো ওয়াশরুমে যাবে সে। সারা যেতে চাইলো কিন্তু বারন করলো আরহি। সে যেতে পারবে আর তাড়াতাড়ি চলে আসবে মুখে পানি দিয়ে। সারা আর কিছু বললো না। সে আড্ডায় ভীষণ মনোযোগী। আরহি বের হয়ে এলো ক্লাস রুম থেকে। আরহি নিজের অজান্তেই আশেপাশে তাকাচ্ছে। যে মানুষটাকে এতো ভয় পায়, সব সময় পালিয়ে বেরায় অথচ সেই মানুষটাকে এক পলক দেখতে চাইছে সে। নিজের অদ্ভুত কর্মকান্ডে ভীষণ অবাক হচ্ছে আরহি। হুট আরহির চোখের সামনে পরে হাতে ফাইল নিয়ে, ফোনে কথা বলতে বলতে এগিয়ে আসছে সাফি। ফোনে কথা বলায় ভীষণ মনোযোগী সে। পরনে কফি রঙের সেই শার্ট যেটা আরহি তাকে বের করে দিয়েছিলো। রঙ টা ভীষণ মানিয়েছে তাকে। কথা বলতে বলতে চোখ পরে আরহির দিকে সাফির। আরহি সঙ্গে সঙ্গে চোখ নামিয়ে নেয়। আরহি শুকনো ঢোক গিলে কয়েকবার। যে মানুষটার থেকে পালিয়ে বেরায় সে মানুষটার সঙ্গে ভীষণ ভাবে কথা বলতে ইচ্ছে করছে তার। সাফি এগিয়ে এলো আরহির দিকে। ধীর কন্ঠে বলে,,
” এখানে একা দাঁড়িয়ে আছো কেন? ”
শুরু হয়ে গেলো আরহির মাঝে ভয় কাজ করা। এই মানুষটার গম্ভীর কন্ঠ স্বর তাকে ভীষণ ভাবে ভয় পাইয়ে দেয় বরাবরই। এতোক্ষন কথা বলার ইচ্ছে থাকলেও এখন পালাতে ইচ্ছে করছে। আরহি মাথা নিচু করে ভীতু কন্ঠে বলে,,
” মানে পানি আনতে যাবো। ”
সাফি ছোট করে জবাব দিলো,,
” ওহ ”
সাফি কিভেবে শুকনো ঢোক গিলে মনের সংকোচ কাঁটিয়ে বলে,,
” আমার কেবিনে আসবে একটু ”
আরহি সাফির মুখের দিকে দৃষ্টি রাখলো। সাফির চোখ জোড়ায় সেই অনুশোচনা। আরহি সেই চোখ জোড়ার দিকে তাকিয়ে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ায়। সাফি মাথা নিচু সামনের দিকে পা বাড়ায়। আরহিও হাঁটে সাফির পিছু পিছু। সাফি নিজের কেবিনে প্রবেশ করে, কয়েক সেকেন্ড এর ভেতর আরহি প্রবেশ করে কেবিনে। দুজনের হৃদয়ের কম্পন অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে যাচ্ছে। দুজনের মাঝে অস্থিরতা, সংকোচ। সাফি আরহির দিকে তাকিয়ে শুকনো ঢোক গিলে বলে,,
” সরি ”
আরহি অবাক হয়ে তাকায় সাফির দিকে। যে মানুষ অযথা তার উপর কাজ চাপিয়ে সরি বা থ্যাংকস কোনো কিছু বলার প্রয়োজন মনে করে না। সে মানুষ কোনো কিছু না করেই সরি বলা বিষয়টি হতবাক হওয়ার মতোই। আরহি অবাক হয়ে বলে,,
” কেন স্যার? ”
সাফির কন্ঠ স্বরে অনুশোচনা,,
” আমি জানতাম না আমার দেওয়া গোলাপ তোমাকে আঘাত করবে। তাহলে এ গোলাপ কখনও দিতাম না আমি। আমি ছুঁয়েও দেখতাম না এ গোলাপ। ”
আরহি হতবাক হয়ে বলে,,,
” এখানে আপনার দোষ কোথায়। আমি নিজেকে কেন দোষ দিচ্ছেন। আর এটা সামান্য হাত কেটেছে, কিছুই না এটা। আমার দোষেই হয়েছে, অমনোযোগী হয়ে ফুল ধরতে গিয়েছিলাম তাই কেঁটে গিয়েছে হাত।”
সাফি একটু সংকোচ নিয়ে বলে,,
” দেখি হাতটা। ”
আরহি ডান হাত বারিয়ে দিলো সাফির দিকে। সাফি তার ডান হাতের তর্জনী আঙ্গুল দিয়ে খুবই আলতো ভাবে স্পর্শ করলো সেখানে। তার চোখে মুখে অনুশোচনা স্পষ্ট ফুঁটে উঠেছে,,
” একটু সাবধানে কাজ করবে না। ”
সাফির এমন অস্থিরতা দেখে আরহি মুখে হাঁসি এনে বলে,
“স্যার কিছু হয় নি, সামান্য কেঁটে গিয়েছে। এর থেকে কত বেশি হাত কাঁটে আমার। আর এ সামান্য কাঁটায় কি। আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনার দেওয়া গোলাপে আমার পুরো আঙ্গুল কেঁটে গিয়েছে। ”
সাফি নিজের হাত সরিয়ে নিয়ে তৎক্ষনাৎ রাগী দৃষ্টিতে তাকায় আরহির দিকে। আরহির গলা আবারও ভয়ে শুকিয়ে যায়। মাথা নিচু করে ফেলে এসে। মুখের হাঁসি তৎক্ষনাৎ হারিয়ে যায় তার।
” এতো অসাবধান চলাফেরা কেন তোমার। ”
আরহি এবার মিনমিনে গলায় বলে,,
” আমি জানি গোলাপ ফুলে কাঁটা থাকে। কিন্তু এ কাঁটা যে আঘাত করে আমার জানা ছিলো না। ”
সাফি সরু দৃষ্টিতে আরহির দিকে তাকায়,,
” কাঁটার উদ্দেশ্য কাউকে আঘাত করা নয়, নিজের সৌন্দর্য কে রক্ষা করা। নেক্সট টাইম যেন অসাবধান চলাফেরা কার্যক্রম না দেখি। আর হ্যাঁ এ সব উল্টো পালটা চিন্তা ভাবনা মাথায় ঘুরপাক করা বন্ধ করে দাও। পড়াশোনায় ফোকাস দাও। এতো জটিল হিসেব কষতে হবে না তোমার। এই টা সিলেবাস বহির্ভূত মনে থাকবে। ”
আরহি সাফির কথা কি বুঝলো তার জানা নেই। তার মাথা নাড়ানো কাজ, সে তাই করলো। সাফি আরহির দিকে দৃষ্টি রেখে বলে,,
” যাও এখন ”
আরহি দ্রুত পায়ে বেরিয়ে আসে। সোজা ওয়াশরুমে গিয়ে মুখে পানি দেয়। বাম হাত বুকে রাখে তার। কি অস্বাভাবিক ভাবে শ্বাস চলছে তার। বুকে অসম্ভব ঝড়ের তান্ডব শুরু করছে তার। আর কিছু হিসেব মিলাতে হিমশিম খাবে কি না তার জানা নেই। তবে এই মানুষটাকে বুঝতে হিমশিম খাচ্ছে সে। কি অদ্ভুত আচরণ মাঝে মাঝে তার। আরহি আর একটু বেশি ভাবতে গেলে এখানে জ্ঞ্যান হারাবে বোধ হয়। এই মানুষটাকে নিয়এ
……
গল্প ঘর

