“বল স্বরবর্ণ কয়টা?”
জুঁইয়ের প্রশ্ন শুনে জহির হা করে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।জুঁই ওর মুখ দেখেই বুঝতে পারলো যে উত্তরটা জহির দিতে পারবে না।মাথাটা ঠান্ডা রেখে আবারো প্রশ্ন করল,
“ব্যঞ্জনবর্ণ কয়টা বল?”
জহির অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“তুই তো জানোস জুঁই পড়াশোনা আমার মাথার মধ্যে ঢোকে না।আমি কি করুম তুই ক?”
“পড়াশোনা করবি না তো কি সারা জীবন এই নৌকাই চালাবি?”
জহির শুকনো মুখে বলল,
“ভালোই তো কামাই নৌকা চালাইয়া।”
জুঁই বাঘিনীর ন্যয় গর্জে উঠে বলল,
“শুধু টাকা উপার্জন করলেই চলবে না।তুই যদি সারাজীবন নৌকা চালাস তাহলে আব্বা কোনদিনও তোর সাথে আমার বিয়ে দেবে না।আর এখন নাহয় এই টাকা দিয়ে আমাদের সংসার চলে যাবে কিন্তু দুদিন পর যখন আমাদের ছেলেমেয়ে হবে তখন কি করে চলবে?”
“সেই জন্যেই তো তরে আমি কইছিলাম যে আমারে ভালোবাসিস না।আমি তর যোগ্য না।”
জুঁই অনেক কষ্টে নিজের রাগটা নিয়ন্ত্রণ করে বলল,
“একদম আজেবাজে কথা বলে আমার মাথা গরম করবি না।আর তোকে আমি বলেছি না শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে?আমার বলা একটা কথাও তোর মনে থাকে না?”
“আচ্ছা আর বলবো না।”
“মনে থাকে যেন।”
জুঁইয়ের দিকে একবার চোখ তুলে তাকালো জহির।রোদে ঠিক মতো তাকাতে পারছে না জন্য জুঁই চোখমুখ কুঁচকে রেখেছে।কপালে আবার বিন্দু বিন্দু ঘামও জমেছে।জুঁইয়ের পড়নে হালকা বেগুনি রঙের সুতি শাড়ি আর ঘটি হাতা ব্লাউজ।কোমড় সমান লম্বা চুলগুলো দুই বেনি করা।সেই বেনির সৌন্দর্য বৃদ্ধি করতে ব্যবহৃত হয়েছে রঙিন ফিতে।যদি কেউ জহির কে সৌন্দর্যের সঙ্গা জিজ্ঞেস করে তাহলে জহির কিঞ্চিৎ সময় ব্যয় না করেই উত্তরে বলবে,
“আমার জুঁই।”
পরক্ষণেই আবার নিজের দিকে তাকালো।রোদের তাপে পু/ড়তে পু/ড়তে গায়ের রং কালচে হয়ে গেছে।জহির কোনোকালেই ফর্সা ছিল না।তবে এটা ঠিক যে এতটা কালোও ছিলোনা গায়ের রং।আগে সে ছিল শ্যামলা।কিন্তু এখন রোদে পু/ড়তে পু/ড়তে কালো হয়ে গেছে।জুঁই তো সেজন্য এখনো ওকে ওর বাবা-মার দেওয়া নামে কালা বলে ডাকে।জহিরের তাতে একটুও মন খারাপ হয় না বরং বেশ ভালো লাগে।জহিরের পড়নে একটা ছেঁড়াফাটা স্যান্ডো গেঞ্জি আর লুঙ্গি।ঘেমে নেয়ে মুখটা তেলতেলে হয়ে গিয়েছে।চুলগুলো উষ্কখুশকো, অনেকদিন হলো চুলগুলো কাটাও হয় না।তারপরে নজর গেল হাতে থাকা বৈঠাটায়।জহিরের সম্বল এতোটুকুই,তাও নিজের না অন্যের দান।আর সেখানে জুঁই গ্রামের মাতব্বরের মেয়ে।জহির আজও একটা বিষয় ভাবে,ফুলের মতন একটা মেয়ে কি করে ওর মতো একটা ছেলেকে ভালোবাসতে পারে?তবে কখনো করা হয়ে ওঠেনি প্রশ্নটা।আজ জহিরের খুব ইচ্ছে হলো জুঁই কে জিজ্ঞেস করার যে ওকে কেন ভালোবাসে সে।
“জুঁই একটা কথা কই?”
“তোকে আমি শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে শিখিয়েছি না?সেভাবে জিজ্ঞেস করতে পারলে উত্তর দেব।”
“আচ্ছা।কইতেছিলাম…না মানে বলতেছিলাম তুই আমারে কেন ভালোবাসিস?”
জহিরের মুখ থেকে প্রশ্নটা শোনার চরিত্র পেতে থাকা।কিঞ্চিত ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
“হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন করলি?”
“এমনিতেই।”
“তুই খুব সহজ সরল জহির।পুরুষ মানুষের ভালোবাসা নিয়ে আমার মনে বড্ড ভয় ছিল।নিজের আব্বা,চাচাদের দেখেছি ছোটবেলায় মা,চাচীদের সাথে কি জঘন্য ব্যবহার করত। বড় হওয়ার পর ভাইদের দেখেছি ভাবিদের সাথে সেই একই আচরণ করতে।কিন্তু তোকে দেখার পর মনে হয়েছে তুই সবার থেকে আলাদা।”
জহির বিষ্ময়ভরা কন্ঠে বলল,
“তুই আমারে এত বিশ্বাস করিস জুঁই?”
জুঁই মৃদু হেসে বলল,
“হ্যাঁ।তোর ব্যাপারে আমি অন্তত এতোটুকু নিশ্চিত যে তুই যদি আমায় ভালোবাসিস তাহলে কখনো আমায় ছেড়ে যাবি না,না আমায় কষ্ট দিবি।আর তোর থেকে এর বেশি আর কিছু চাওয়ার নেই আমার।”
জহির আরো কিছু বলতে চাইলো কিন্তু তার আগে জুঁই ওকে থামিয়ে দিল।চোখ দিয়ে পিছনে ইশারা করে বলল,
“আপা আর দুলাভাই আসছে চুপ কর।”
জহির তাড়াহুড়ো করে নৌকা থেকে নেমে গিয়ে ওদের হাত থেকে ব্যাগ পত্র নিল।জবাকে নৌকায় উঠতে সাহায্য করার জন্য দুই হাত বাড়ালো জুঁই।সবাই নৌকায় উঠতেই জহির নৌকা ছাড়লো।জুঁই জিজ্ঞেস করল,
“কেমন আছেন দুলাভাই?”
মতিউর হালকা হেসে জবাবে বলল,
“ভালো আছি।বাড়িতে যখন আমার খেয়াল রাখার জন্য তোমার আপার মতন একজন যত্নশীল স্ত্রী আছে তাহলে কি আমি খারাপ থাকতে পারি?”
কথাটা শুনে হাসল জুঁই।জবা আড়চোখে একবার মতিউরের দিকে তাকালো।লোকটা সত্যি ওর প্রশংসা করলো নাকি খোঁচা মেরে কথাটা বলল সেটা ঠিক বুঝতে পারল না।তবে এ নিয়ে আর জবা আর বেশি ভাবলো না।মতিউরের ব্যাপারে সে কিছু ভাবতে আগ্রহী না।জবা জুঁইকে উদ্দেশ্য করে হালকা রাগী কন্ঠে বলল,
“তুই আবার এপাড়ে আসতে গিয়েছিস কেন?”
“তো কি হয়েছে হ্যাঁ?বাড়িতে একা একা ভালো লাগছিল না।জহির তোদের নিতে আসবে তাই ভাবলাম ওর সাথে আমিও আসি।”
“মা কেমন আছে?”
“ওই যেমন থাকে আর কি।তবে তোমায় দেখলে একটু মনটা ভালো হবে।”
ওদের কথাবার্তা আর গল্পগুজব এর মাঝেই নৌকা এসে শ্যামলডাঙ্গা গ্রামের নদীর পাড়ে থামলো।পাড়ে নৌকাটা বেঁধে জহির ব্যাগ পত্র সব নামালো।এবারে মতিউর আগে নৌকা থেকে নামলো।জবাকে সাহায্যের জন্য হাত বাড়ালে সে হাতটা ধরল না।তবে বিপত্তি বাধলো নামতে ধরে।নদীর পাড়ের মাটি শ্যাওলা জমে পিচ্ছিল হয়ে গেছে।মাটির উপর পা রাখতেই জবা পড়ে যেতে ধরলে মতিউর তার বলিষ্ঠ হাতের সাহায্যে ওকে ধরলো।নিজের এমন কাজে জবা কিঞ্চিত লজ্জিত হলো।জবার সেই লজ্জা রাঙা মুখটা দেখে মতিউরের মুখে হাসি ফুটে উঠলো।
“আমার থেকে সাহায্য নিতে তোমার এত সংকোচ জবা?ভুলে যেওনা বাকিটা জীবন কিন্তু আমার হাত ধরেই তোমায় চলতে হবে।”
জবা দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিলো।জবা মতিউরের কথার কোন উত্তর না দিয়ে ওর কাছ থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,
“ছাড়ুন জুঁই দেখছে।”
মতিউর আর কথা বাড়ালো না।যেতে দিল।জবা আর কারোর অপেক্ষা করলো না।একা একাই হাঁটা দিল।জুঁইয়ের মতিউরকে কিছু কথা বলার আছে সেজন্য আর সবার সাথে গেলো না।মতিউরের পাশে হাঁটতে হাঁটতেই ইতস্তত গলায় বলল,
“আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে পারি দুলাভাই?”
“নিশ্চয়ই।”
“আপার সাথে আপনার সম্পর্কটা ঠিক আছে তো?”
“ঠিক না থাকার কথা ছিল বুঝি?”
“না সেটা বলতে চাইনি আমি।আসলে আপার মুখ দেখে মনে হচ্ছিল যে ওর মনটা ভালো নেই।সেজন্যই জিজ্ঞেস করলাম।”
“এমনিতে তুমিও বেশ বুদ্ধিমতী একজন মেয়ে কিন্তু আমার সামনে তোমার এই ছোট মাথার বুদ্ধি টিকতে পারবে না।”
জুঁই একটু ঘাবড়ে গেল।একটা শুকনো ঢোক দিলে বলল,
“বুঝলাম না আপনার কথাটা।”
মতিউর শব্দ করে হেসে উঠে বলল,
“এতোটুকুতেই ঘাবড়ে গেলে?বাকি কথা আর নাইবা বলি,ছোট মানুষ নিতে পারবেনা এত চাপ।”
“শুধু এতোটুকু বলুন আপনাদের মাঝে সব ঠিক আছে কিনা?”
মতিউর একটু শান্ত হল।তবে বরাবরের ন্যায় তার ঠোঁটে সে হালকা হাসিটা এখনো বিদ্যমান আছে।আনমনে হাঁটতে হাঁটতে বলল,
“সুজনের ভালোবাসাটা বোধ হয় আমার ভালোবাসার থেকেও কয়েক গুণ বেশি তীব্র ছিল।সেজন্যই তোমার আপা তাকে ভুলে আমাকে ভালোবাসতে পারছে না।”
মতিউর যে সুজনের ব্যাপারটা জানে এ বিষয়ে জুঁই সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিল।তবে যেহেতু মতিউর খুব স্বাভাবিকভাবে সুজনের কথাটা বলল তার মানে এই নিয়ে তার মনে আলাদা করে কোন ক্ষোভ নেই।
“আর আপনি ভালোবাসেন আপাকে?”
“সে তো প্রথমদিন তাকে দেখেই ভালোবেসে ফেলেছি।প্রথম তাকে দেখি টকটকে লাল রঙা শাড়িতে।তার রক্তিম ঠোঁট দুটো তখন আমায় দেখে ভয়ে কাঁপছিলো।ঘোমটার আড়ালে থাকা তার মুখটা মূহুর্তের মাঝে আমার হৃদ স্পন্দনের গতি বাড়িয়ে দিয়েছিল।ওর কান্নায় ভেজা চোখ দুটো আমায় বুঝতে শিখিয়েছিল যে কাঁদলেও মেয়েদের ভীষণ সুন্দর লাগে।”
জুঁই মুগ্ধ হয়ে মতিউর এর কথাগুলো শুনলো।সাথে প্রচন্ড অবাকও হলো।এই কদিনের মাঝে এই মানুষটা তার আপাকে কতটা গভীর ভাবে ভালোবেসে ফেলেছে।কিন্তু তার আপা কি এই মানুষটার ভালোবাসার মূল্য দিতে পারবে?
শ্যামলডাঙা গ্রামের মধ্যভাগে বিশাল জায়গা জুড়ে গ্রামের মাতব্বর জলিল তালুকদারের বসতবাড়ি।স্ত্রী,তিন ছেলে,তাদের পরিবার আর দুই মেয়ে কে নিয়ে তার সংসার।বাবা-মা গত হয়েছেন বহু বছর আগে।বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন সপ্তাহ খানেক আগে।তিন ছেলেরও বিয়ে সম্পন্ন।প্রথম দুই ছেলের ঘরে সন্তান থাকলেও তৃতীয় ছেলের ঘরে এখনও সন্তানের আগমন ঘটেনি।বাড়িতে বিবাহ যোগ্য এখন একমাত্র জুঁইই বাকি আছে।তিন ছেলের আলাদা আলাদা ঘর তৈরি করে দিয়েছেন তিনি।ঘর আলাদা হলেও খাওয়া-দাওয়া এখনও সবাই একসাথেই করে।নতুন জামাই কে দেখতে পেয়ে বাড়ির দুই জেলে জামশেদ আর জাফর এগিয়ে এলো।জামশেদ এর স্ত্রী ঘোমটা টেনে গেলেন শ্বশুর কে খবরটা দিতে।খবর পেয়ে জলিল তালুকদার তাড়াহুড়ো করে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন।জামাইকে একা দেখে দ্রুত সে প্রশ্ন করলেন,
“তুমি একা কেন জামাই?জবা কোথায়?”
“জবা তো আমার আগে এসেছে আব্বা।অনেকদূর পথ এসেছে তো,মনে হয় ক্লান্ত হয়ে গেছে।তাই হয়তো ঘরে আরাম করছে।”
মতিউরের প্রতি অবহেলার বিষয়টা জলিল তালুকদারের বড় ছেলে জামশেদের একটুও পছন্দ হলো না।রাগী কন্ঠে জবার নাম ধরে দুইবার ডাকলেন।ডাকটা কানে যেতেই জবা তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে উঠোনে এলো।ওকে দেখতে পেয়ে জামশেদ এগিয়ে গিয়ে কড়া কন্ঠে বলল,
“মতিউরকে একা ফেলে তুই আগে আগে চলে এসেছিস কেন?এসব কোন ধরনের অভদ্রতা?”
জবা মৃদু কম্পিত কন্ঠে বলল,
“আসলে ভাইজান আমার শরীরটা ভালো লাগছিল না তাই আগে আগে চলে এসেছি।”
“এতোটুকু রাস্তা একসাথে আসতে কি মরে যেতি?বিয়ের পর প্রথমবার এ বাড়িতে আসছে মতিউর।তোর জ্ঞান নেই যে ওকে তোর সাথে করে নিয়ে আসা উচিত?”
জামশেদ হয়তো আরো কিছু বলত কিন্তু তার আগে মতিউর ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“ওর কোন দোষ নেই জামশেদ।আমি ওর শরীর খারাপ জন্য আগে আগে চলে আসতে বলেছিলাম।আর জবা আমি যে তোমাকে চলে আসতে বলেছিলাম সেটা তো বললেই পারো।তুমিও না নিজের হয়ে কিছু বলতে পারো না।”
জবা আবারো চমকালো।মতিউর তাকে এমন কিছু বলেনি তাহলে পুরো দোষটা নিজের কাঁধে নিল কেন?এই মানুষটা আসলে চাইছে কি?জবার চোখে ভালো হতে?
উঠানে দাঁড়িয়ে আর কেউ কোন কথা বাড়ালো না।মতিউর কে নিয়ে ঘরে চলে গেল।জবা নিজের ঘরে গেল।একটু পর জহির এলো ব্যাগ পত্র রাখতে।এতক্ষণে একটা বারের জন্য জহিরের সাথে কথা হয়নি জবার।হয়তো খেয়ালই করেনি।মনটা যে তার সর্বক্ষণ অন্য কোথাও পড়ে থাকে।অন্যদিকে খেয়াল থাকবে কি করে?ব্যাগ পত্র রেখে জহির ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে নিলে জবা নিজ থেকেই বলে উঠল,
“কেমন আছো জহির ভাই?”
জহির পিছন ফিরে তাকিয়ে একগাল হেসে বলল,
“ভালো আছি জবা আপা।তুমি কেমন আছো?”
“আমিও ভালো আছি।অনেক কাজ করেছো এবার ঘরে গিয়ে একটু বিশ্রাম করো।”
“এখন বিশ্রাম করতে পারুম না আপা।মেজো ভাইরে নিয়ে পাশের গ্রামে যাইতে হইবো।”
“আচ্ছা তাহলে যাও আর দেরি করো না,না হলে আবার গালি শুনতে হবে।”
জহির চলে যেতে নিলে জুঁই ওর পথ আটকে দাঁড়ালো।বাড়ির মধ্যে জুঁইয়ের এমন আচরণে জহির বেশ ভয় পেলা।ভীত গলায় বলল,
“আমার পথ আটকাইতেছিস ক্যান?বড় সাহেব,বড় ভাই,মেজো ভাই সবাই বাড়িত আছে।কেউ দেখলে খারাপ হইবো?”
“হলে হবে।তুই আগে পানিটা খেয়ে নে তো।এখনই কল থেকে ঠান্ডা পানি তুলেছি।খা ভালো লাগবে।”
জহির উঁকি দিয়ে একবার বাইরেটা দেখে নিলো।না উঠানটা ফাঁকা,কেউ নেই।ঝটপট পানিটা খেয়ে গ্লাসটা পুনরায় জুঁইয়ের হাতে দিয়ে বলল,
“খাইছি।এবার সামনে থেকে সর।আর বাড়ির মধ্যে এমন হুটহাট আমার সাথে কথা কইতে আসবি না।”
জুঁই মৃদহ বিরক্তিকর কণ্ঠে বলল,
“এত ভয় পেলে তুই আমাদের বিয়ের কথাটা আব্বার কান অব্দি কিভাবে পৌঁছাবি বলতো?”
“সে যখন কার কাথা তখন দেখা যাইবোনি।তুই এখন সর।ঘাটে মেজ ভাই আমার জন্য অপেক্ষা করতেছে মনে হয়।”
“একটু পুরুষ মানুষের মতন আচরণ করতে শেখ জহির।পুরুষ মানুষ হবে সাহসী,ওদের চোখে থাকবে তেজ,তুই এত নরম কেন?এত বোকা হতে গেলি কেন তুই?তুই একটু চালাক চতুর হলে আমাকে এতো চিন্তা করতে হতো না।”
“জুঁইরে তোর সব প্রশ্নের উত্তর আমি আইসা দিমুনে।এখন আমারে যাইতে দে নাইলে আমার কপালে দুঃখ আছে।”
জুঁই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।এই ছেলেটা এখনই ওর বাবা ভাইকে দেখে যা ভয় করে তাতে বিয়ের কথা বলবে কি করে?বাধ্য হয়ে সামনে থেকে সরে দাঁড়ালো।জহির চলে যেতেই জুঁই ভিতরে এলো।এই ঘরটা জুঁইয়েরই।জবা ইচ্ছে করেই এঘরে এসে উঠেছে কেননা ওর ঘরে নিশ্চয় মতিউর থাকবে।আর কেন যেন জবার মতিউরের সাথে থাকতে ভীষণ অস্বস্তি হয়,বিরক্ত লাগে ওই লোকটাকে।জুঁইয়ের ঠিক পরপরই ওই ঘরে মতিউরও প্রবেশ করলো।মতিউর কে দেখতে পেয়েই দুই বোন মৃদু কেঁপে উঠল।জহিরের সাথে হওয়া জুঁইয়ের কথোপকথনে কিছু শুনে ফেলল কিনা কে জানে?
মতিউর লোকটা বেশি রসিক মানুষ।যেকোনো গুরুতর মুহূর্তে সে তার রসিকতার দ্বারা পরিবেশ বদলে ফেলতে পারে।দুঃখে কাঁদতে থাকা মানুষও তার কথায় না হেসে পারে না।তাই সে মানুষটার মুখ থেকে কখনো হাসিও ছাড়ে না।আর এ হাসিটা দেখলেই জবার কেন যেন বেশি গা জ্বলে।পরিবেশ পরিস্থিতি কিছুই মানে না,সবসময় হেসেই যায়।
“জুঁই,তোমার আপাকে বলো আমি কোন রাক্ষস নই যে এক ঘরে থাকলে খেয়ে ফেলবো।”
মতিউরের কথা শুনে জুঁই ফিক করে হেসে ফেলল।জবা চোখ গরম করে ওর দিকে তাকাতেই থেমে গেল।মতিউর পুনরায় বলল,
“তুমি যে আমার উপরে বিরক্ত সেটা তোমার বাপের বাড়ির লোকজনকে না বোঝালেই ভালো হয় জবা।আমার কোন অসুবিধা নেই জানলে কিন্তু ওরা তোমাকেই বকবে আর যেটা আমার পছন্দ হবে না।তাই বলছি তোমার ঘরে চলো।”
ভিতরে ভিতরে জবা যতই রাগ দেখাক না কেন কিন্তু তা কখনোই তার আচরণ কিংবা কন্ঠে প্রকাশ পায় না।মতিউরের বেলায় তো মোটেই না।জবা মনে প্রাণে একটা কথা বিশ্বাস করে যাকে ভালোবাসা যায়,তার ওপরেই অধিকার দেখানো যায় আর তার ওপরেই রাগ দেখানো যায়।কিন্তু জবা তো মতিউরকে ভালোবাসে না তাই মতিউরের উপর ওর কোন অধিকার নেই,তাই রাগও দেখাতে পারে না।কিন্তু যাকে জবা ভালোবাসতো সেই মানুষটাকে সর্বক্ষণ রাগ দেখাতো।কত মান অভিমান চলতো দুজনের মাঝে।সময়ের বিবর্তনে আজ সবটাই অতীত।শান্ত কন্ঠে মতিউর কে বলল,
“একেবারের জন্য থাকতে আসিনি আমি জুঁইয়ের ঘরে।ওর সাথে কথা বলা শেষে এমনি ফিরে যেতাম।”
“কিন্তু এসময়ে তুমি এখানে এসে তো জুঁই আর জহিরের কথার মাঝে বড্ড ঝামেলা তৈরি করলে।ছেলে মেয়ে দুটোকে মন খুলে কথাই বলতে দিলে না।”
জবা আর জুঁই দুজনে একসাথে বিস্ফরিত নয়নে মতিউরের দিকে তাকালো।তারমানে মতিউর ওদের কথাবার্তা সব শুনে ফেলেছে।এদিকে ওদের দুজনকে এমন ভাবে তাকাতে দেখে মতিউর হো হো করে হেসে উঠলো।দুজনে নিশ্চয়ই ভেবেছে যে মতিউর এখন এই কথা সবাইকে জানিয়ে দেবে।কিন্তু ওরা তো আর জানে না যে মতিউর সম্পর্ক গুলোকে পূর্ণতা দিতে ভালোবাসে।সেগুলোর বিচ্ছেদের পিছনের কারণ সে হতে চায় না।তবে এই কথাটা জবা কখনোই বিশ্বাস করবে না।এখন যেমন তার চোখে মতিউর একটা জঘন্য ঘৃণ্য মানুষ,সারা জীবন হয়তো তেমনটাই থেকে যাবে।মতিউর এগিয়ে এসেছে দুজনকে আশ্বস্ত করে বলল,
“চিন্তা করো না জুঁই।আমি কাউকে কিছু বলবো না।তোমার আপা আমায় যতটা খারাপ মানুষ ভাবে আমি ততটাও খারাপ না।”
জুঁই ভরসা পেল।তবে জবা ভরসা করতে পারল না।সন্দেহি কন্ঠ প্রশ্ন করলো,
“আপনাকে বিশ্বাস করবো কিসের ভিত্তিতে?”
মতিউর শান্ত দৃষ্টিতে জবার দিকে তাকিয়ে বলল,
“কবুল বলে সারা জীবন পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছি।তোমার সুখ দুঃখ ভাগ করে নেওয়ারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছি।ছয়টা রাত তো কাটালে আমার সাথে।এখনো বিশ্বাস অর্জন করতে পারলাম না?”
জবা আর কিছু বলল না।ওদের নিরবতার মাঝেই দরজা থেকে কোন পুরুষালী কন্ঠস্বর ভেসে এলো।সে জুঁই কে ডাকছে।কন্ঠটা কানে যেতেই জবার বুকটাকে ধক করে উঠলো।একটু ঘাড় কাত করে দরজার দিকে তাকাতেই দেখলো সুজন দাঁড়িয়ে আছে।জবার ভালোবাসার পুরুষ সুজন।অপ্রত্যাশিত ভাবে জবার হাত দুটো কাঁপছে।দুচোখ ছাপিয়ে জল বেরিয়ে আসতে চাইল।জবা পারলো না তাদেরকে আটকাতে।মতিউর এর আগে কখনো সুজনকে দেখেনি।দরজার দিকে তাকিয়ে একবার সুজনকে দেখে নিলো।অতঃপর জবার অভিব্যক্তি দেখে তার আর বুঝতে বাকি রইল না যে এই সেই পুরুষ যার ভালোবাসা আজ জবাকে মতিউরকে ভালোবাসতে দিচ্ছে না।সুজনের দৃষ্টি তখন মেঝের দিকে।মাথা তুলে তাকানোর সাহস তার নেই।জুঁই তাড়াহুড়ো করে দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল,
“কিছু বলবে সুজন ভাই?”
“হ্যাঁ।আসলে মাতব্বর সাহেব বললেন যে গ্রামের স্কুলের সংস্কারের জন্য যে টাকাটা উনি দেবেন সেটা নাকি তোমার কাছে আছে।তোমার থেকে যেন নিয়ে যাই।”
“হ্যাঁ আব্বা তো আমাকেই দিয়েছে।দাঁড়াও আনছি।”
জুঁই আলমারি থেকে টাকাটা বের করতে গেল।এর মাঝে সুজন একটা বারের জন্যও চোখ তুলে জবার দিকে তাকালো না।তবে খুব ইচ্ছে করলো একবার জবার স্বামীকে দেখতে।দেখতে ইচ্ছে করলো যে মানুষটার কাছে সুজন ঠিক কতটা অযোগ্য।সুজন জানতে চায় কতটুকু যোগ্যতা অর্জন করলে সে জবাকে পেত।একবার চোখ তুলে তাকালো।একদম ফকফকা সাদা পাঞ্জাবি পাজামা পরিহিত এক সুপুরুষ।দাঁড়িগুলো বড় হয়েছে।তার মুখে লেপটে থাকা হাসিটা দেখলেই যেন হৃদয়ে এক শীতল স্রোত বয়ে যায়।খুবই স্নিগ্ধ সে হাসি।তার দৃষ্টি ভীষণ শান্ত এবং তীক্ষ্ণ।সুজনকে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে মতিউরই নিজ থেকে ওর দিকে এগিয়ে গেল।কাঁধে হাত রেখে বলল,
“কেমন আছো সুজন?”
মতিউরের থেকে এমন বন্ধুসুলভ আচরণে সুজন একটু অবাকই হলো।ধরতে গেলে এই মানুষটাই সুজনের ঘোর শত্রু।কিন্তু কথা না বলে কোন উপায় নেই।তালুকদার বাড়ির জামাইকে অপমান করার স্পর্ধা সুজনের নেই।এর শাস্তি ভয়াবহ।তাই কন্ঠে যথাসম্ভব কোমলতা এনে বলল,
“জ্বি ভালো আছি।আপনি ভালো আছেন?”
“আমি তো সত্যিই ভালো আছি কিন্তু তুমি মনে হয় সত্যি ভালো নেই,তাই না?”
মতিউরের প্রশ্নের মানেটা সুজনের ঠিক বোধগম্য হলো না।
“আমি ভালো থাকবো না কেন?”
মতিউর একবার ঘাড় কাত করে জবার দিকে তাকালো যে বিছানার এক পাশে দাঁড়ি এখনো কাঁদছে।কান্নার তোপে নাক মুখ লাল হয়ে উঠেছে ইতোমধ্যেই।মতিউরের দৃষ্ট অনুসরণ করে সুজন একবার সেদিকে তাকালো।মুহূর্তের মাঝে যেন সুজনের চোখে ঘোর লেগে গেল।আজকে জবা লাল রঙের শাড়ি পড়েছে।গলায় সোনার গহনা,হাতের বালা,কানের ঝুমকো।কি অপরূপ লাগছে দেখতে ওকে।দেখেই বোঝা যাচ্ছে নববধূ।মতিউরের নববধূ।কথাটা মনে হতেই সুজনের বুকে একটা চিন চিনে ব্যথা অনুভূত হলো।জবা তো সুজনের নববধূ হতে পারতো?আজ জবার সাজটা তো সুজনের জন্যও হতে পারতো তবে কেন হলো না?শুধুমাত্র বংশ গৌরব আর টাকা নেই জন্য?তাই হবে।তবে মুগ্ধতার থেকেও বেশি সুজনের কষ্ট হলো ওর জবার চোখে জল দেখে।যে জবাকে একটুও কষ্ট পেতে দিতে চায়নি কখনো সে জবা আজ কাঁদছে অথচ সুজনের কিছু করার নেই।এগিয়ে গিয়ে যে একটু চোখের জলটা মুছে দেবে সেই ক্ষমতাও নেই।এতটা অক্ষম হয়তো সুজনের নিজেকে কখনো অনুভূত হয়নি।এরই মাঝে সেখানে একটা খামে করে টাকা নিয়ে জুঁই এলো।খামটা সুজনের দিকে বাড়িয়ে দিতেই সুজন সেটা নিয়ে তাড়াহুড়ো করে চলে গেল।সেখানে আর দাঁড়ালো না। সুজন জানে ও যতক্ষণ জবাকে দেখবে ততক্ষণই জবা কাঁদবে।সুজন চলে যাওয়ার পর মতিউরও সেখানে দাঁড়ালো না।কষ্ট তো তারও হচ্ছে?ওর স্ত্রী অন্য এক পুরুষকে ভালোবেসে কাঁদছে এই কথাটা ভাবতেই মতিউরের হৃদয়ে যেন রক্তক্ষরণ হচ্ছে।
মতিউর বেরিয়ে যেতেই তাড়াহুড়ো করে দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ করে দিল জুঁই।জবা এবারে কান্নায় ভেঙে পড়লো।এতটা সময় ধরে খুব কষ্টে নিজেকে যতটা পেরেছিল শক্ত রেখেছিল কিন্তু এবারে যেন আর পারলো না।জুঁই তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে বোনকে দুহাতে জড়িয়ে ধরল।মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে সান্ত্বনা দিয়ে বলল,
“কেঁদো না আপা।যা ভাগ্যে ছিল না তা নিয়ে আর আফসোস করে কি হবে বলো?দুলাভাই অনেক ভালো মানুষ।”
জবা ক্রন্দনরত কণ্ঠে বলল,
“কিন্তু আমার যে আমার সুজনকেই চাই জুঁই।চোখ বন্ধ করলে যে আজও আমার চোখের সামনে ওর মুখটাই ভেসে ওঠে।আমার কানে প্রতিনিয়ত ওর ডাক ভাসে।আমার জন্য লুকিয়ে লুকিয়ে আনা চুরি,ফিতে,লুকিয়ে লুকিয়ে মেলায় নিয়ে যাওয়া,রাত বিরেতে আমার ঘরের জানালার পাশে এসে দাঁড়িয়ে থাকা,মাঝরাতে নৌকায় চড়ে ঘুরে বেড়ানো এই সব স্মৃতি যে এখনও আমার কাছে জীবন্ত।”
“ভুলে যাও আপা।তোমার ভালোর জন্যই বলছি ভুলে যাও।দুলাভাইকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে শেখো।”
জুঁইয়ের বুক থেকে মাথা তুলে ঘৃণাভরা কন্ঠে জবা বলল,
“যেই মানুষটাকে আমি সব থেকে বেশি ঘৃণা করি তাকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে বলছিস আমায় তুই?উনি বিয়ের আগেই সবটা জানতেন।উনি চাইলেই বিয়েটা ভাঙতে পারতেন কিন্তু উনি এমনটা করেনি।আজ ওনার জন্য আমি আমার সুজনকে পাইনি।ওনাকে আমি কোনদিনও ক্ষমা করতে পারব না।”
“এটা কিন্তু তুমি ভুল বললে আপা।তুমি সুজন ভাইকে পাওনি তোমাদের দুজনের অক্ষমতার জন্য।কতবার তোমাদের দুজনকে বললাম পালিয়ে যেতে তোমরা শুনলে না কেন আমার কথা?”
“কোথায় পালিয়ে যেতাম আমরা?সুজন ওর মা,বোনে আর অসুস্থ বাবাকে ফেলে কি করে আমাকে নিয়ে পালিয়ে যেত?তুই ভাবতে পারছিস যদি একবার আমরা ধরা পড়ে যেতাম তাহলে সুজনের কি অবস্থা হতো?আব্বা আর ভাইয়েরা আমাদের মে/রে ফেলতো জুই।”
“তাহলে দুলাভাইয়ের দোষ দিচ্ছো কেন?”
“উনি চাইলেই বিয়েটা ভাঙতে পারতেন।”
“উনি ভাঙলে অন্যজন বিয়ে করতেন।তোমার কি মনে হয় দুলাভাই বিয়েটা ভেঙে দিলে আব্বা আর ভাইয়েরা সারা জীবন তোমাকে বাড়িতে বসিয়ে রাখত?নাকি সুজন ভাইয়ের সাথে বিয়ে দিত?তুমি অযথা দুলাভাইয়ের দোষ দিচ্ছ আপা।উনি তোমায় ভীষণ ভালোবাসে।”
“ভালোবাসেন?উনি যদি আমাকে ভালোবাসতেন তাহলে আমার আর সুজনের ভালোবাসাকে সম্মান করতেন।”
জুঁই এবার জবার উপর ভীষণ বিরক্ত হলো।জবা অকারণে মতিউরকে দোষারোপ করছে যেখানে ওর কোন দোষই নেই।জুঁই বুঝলো জবাকে সে এখন বোঝাতে পারবেনা।জবার মানসিক অবস্থা প্রচন্ড খারাপ।তাই হাল ছেড়ে দিলে এখন আর চেষ্টা করল না।
চলবে?
নোট:গল্পটা আগেকার সময়ের।পরবর্তী পর্বে যদিও সময়ের উল্লেখ থাকবেই তারপরেও আমি আপনাদের সুবিধার্থে বলে দিচ্ছি যে এটা ১৯৮৫ সালের সময়ের হিসেবে লেখা হয়েছে।খুব সাদামাটা কিছু ভালোবাসার গল্প নিয়ে লিখবো।কেমন লেগেছে সবাই জানাবেন।
#প্রেমের ঘাটের মাঝি
#পর্ব ১
#লেখনিতে খুশবু আকতার

