প্রেমের ঘাটের মাঝি #পর্ব ১২ #লেখনিতে খুশবু আকতার

0
134

#প্রেমের ঘাটের মাঝি
#পর্ব ১২
#লেখনিতে খুশবু আকতার

❝ওরে নীল দরিয়া
আমায় দেরে দে ছাড়িয়া
বন্দী হইয়া মনোয়া পাখি হায়রে
কান্দে রইয়া রইয়া❞

গানটা গাইল সুজন।বৈঠা হাতে নিয়ে নৌকা চালাতে চালাতে গানটা গাইতে তার বেশ ভালোই লাগলো।জহিরের হাতের অবস্থাটা ভালো না ফলে সে আজ নৌকা চালাতে পারবে না।তাই তার জায়গায় সুজন এসেছে মতিউর আর জবাকে নদীর ওপার অব্দি পৌঁছে দিতে।সাথে অবশ্য জুঁই আর জহির আছে।চার লাইন গাওয়া শেষ হতেই মতিউর প্রশংসার কন্ঠে বলে উঠল,

“আরে সুজন মিয়া তুমি তো দারুন গান গাও।তোমার গানের গলার প্রশংসা করতে কিন্তু বাধ্য হচ্ছি।”

সুজন হালকা হেসে বলল,

“ওই একটু আকটু পারি।”

টুকটাক কথাবার্তা বলতে বলতেই নৌকা নদীর ওপার অবধি পৌঁছে গেছে।জহির যখন নামার জন্য তাড়া দিল তখন জবার ধ্যান ভাঙলো।খুব গভীরভাবে বোধহয় কিছু ভাবছিল সে।বিরক্ত হলো সময়ের উপর।এত তাড়াতাড়ি কেন পৌঁছে দিলো?আরেকটু কি দেরি করা যেত না?বিরক্ত হলো এই নদীর স্রোতের ওপর।এপাড় অবধি পৌঁছাতে কি একটু বাঁধা দিতে পারতো না?ওরা পারতো তো কিন্তু বরাবরই তো সবাই জবার ভালোবাসার পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।তাহলে আজই বা ওকে আর কি সাহায্য করতে পারবে?মতিউর আগে নেমে জবাকে নামতে সাহায্যের জন্য হাত বাড়ালো। সুজন নৌকায় বসেই মতিউরের সেই হাতের দিকে তাকিয়ে রইল।দেখতে চাইলো যে জবা সেই হাতটার সাহায্য নেয় কিনা?জবা কি মনে করে যেন মতিউরের হাতে হাত রাখল।মতিউর তাতে বেশ চমকেছে।কারণ সে ভেবেছিল আজকেও হয়তো সেই প্রথম দিনের মত জবা ওর হাতটা ধরতে চাইবে না,ফিরিয়ে দেবে।তবে আজ তার ব্যতিক্রম ঘটলো।পাড়ে নামতেই কয়েকজন লোক এসে ওদের ব্যাগ পত্র নিয়ে গেল।মতিউররা আসার আগেই ওর লোকজন গরুর গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়েছিল।জবা জুঁই আর জহিরের থেকে বিদায় নিয়ে আগে আগে গিয়ে গরুর গাড়িতে বসে পড়ল।সুজনের থেকে বিদায় নিল না।সুজন হয়তো আশা করেছিল যে জবা শেষবারের মতন একবার অন্তত পিছন ফিরে তাকাবে কিন্তু না তেমনটা হলো না।তার প্রেমিকার হৃদয় মনে হয় বড্ড কঠিন হয়ে গেছে।সেই হৃদয়ে হয়তো এখন আর সুজনের মুখটা একবার দেখার জন্য কোন তোলপাড় বয়ে চলে না।উতলা হয় না সেই মনটা আর সুজনকে দেখার জন্য।সেজন্যই তো একটা বারও পিছন ফিরে তাকালো না।সুজন নিজের উপরে নিজেই বিরক্ত হলো।সেই বা কেন আশা রাখছে এখনো?
সুজনের সেই তৃষ্ণার্ত চোখ দুটো জবা দেখল না ঠিকই তবে মতিউরের আড়াল হলো না।মতিউর খুব গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারলো যে আজও সুজনের দৃষ্টিতে জবাকে পাওয়ার তীব্র ইচ্ছে কাজ করছে।আজ একটা প্রশ্ন মতিউরকে ভীষণ ভাবালো।সুজনের চোখে জবার জন্য যে তৃষ্ণাটা দেখতে পাওয়া যায় মতিউরের চোখেও কি জবার জন্য সেই একই তৃষ্ণাটা আছে?
আচ্ছা কখনো যদি জবা মতিউরের থেকে হারিয়ে যায় তবে কি সুজনের মতন তৃষ্ণাটা থাকবে?নিজের ভাবনার উপর আবার পরে নিজেরই রাগ হলো।মতিউর তো হারিয়ে যেতে দেবে না জবাকে।কোনো মতেই হারাতে দেবে না।

সুজন নৌকার দিকে অগ্রসর হলে পিছন থেকে মতিউর বলে উঠল,

“কি গো সুজন মিয়া,বিদায় জানালে না?”

সুজন থেমে গেল।বলা যায় থামতে বাধ্য হলো।এভাবে কেউ নাম ধরে সম্মোধন করলে কি আর উত্তর না দিয়ে থাকা যায়?দূরত্বটাও খুব বেশি না যে শুনতে পাইনি অজুহাতটা দেবে।পিছন ফিরে তাকিয়ে জোরপূর্বক মুখে একটা হাসি এনে বলল,

“আমি বিদায় বলবো,আপনি যে সে আশায় আছেন সেটা বুঝতে পারিনি।বুঝলে বিদায় জানিয়ে যেতাম।”

“কি অদ্ভুত!কেউ কারো মনের কথা বলছে না।আমি তোমার থেকে বিদায় চাইলাম তুমি বুঝলে না,তুমি আবার যার থেকে বিদায় চাইলে সে বুঝলো না।যাক গে সেসব কথা এখন বাদ দেই।এখন তো জানলে এখন বিদায় বলো।”

সুজন হালকা হেসে বলল,

“ভালো থাকবেন,সেই সাথে ভালো রাখবেনও।”

“তুমিও ভালো থেকো।যতটা ভালো থাকলে কেউ একজন ভালো থাকবে ঠিক ততটাই ভালো থেকো।”

_______
দিনটা শুক্রবার।নাহারের বিয়ে।তালুকদার বাড়ির সকলে বিয়েতে যাওয়ার জন্য তৈরি হওয়া শুরু করেছে অনেকক্ষণ আগে।জুঁইও খুব সুন্দর করে সাজলো।অনেকদিন পর কোন অনুষ্ঠান বাড়িতে যাচ্ছে।আলমারি থেকে খুঁজে খুঁজে একটা কলাপাতা রংয়ের জামদানি শাড়ি পরল।চোখে মোটা করে কাজল পড়ল, কপালের মাঝ বরাবর ছোট্ট একটা টিপ পড়লো,ঠোঁটে একটু লিপস্টিক দিতে নিয়ে থেমে গেল।মনে হলো বেশি সাজগোজ হয়ে যাবে।শেষে যদি ও বাড়ি গিয়ে দেখা যায় যে কনের থেকে জুঁই ই বেশি সেজেছে তাহলে ব্যাপারটা বড্ড খারাপ লাগবে দেখতে।তাই লিপস্টিকটা বাদ রাখল।তবে চুলের সাথে কি করবে সেটা ভেবে পাচ্ছে না।একবার ভাবছে বেনি করবে, তারপর আবার ভাবছে না খোপা করবে,তারপরে আবার মনে হচ্ছে চুলটা বোধহয় খোলা রাখলে বেশি ভালো লাগবে দেখতে।কিন্তু এই গরমে কি চুল খুলে যাওয়াটা উচিত হবে?বাইরে একবার উঁকি দিয়ে আকাশটা দেখে নিল।আবহাওয়া বেশ ঠান্ডা আজ, আকাশটাও হালকা একটু মেঘলা মেঘলা।বৃষ্টি হতে পারে।চুল খুলে রেখে গেলে বোধহয় খুব একটা গরম লাগবে না।সুন্দর করে চুলটা আঁচড়ে নিয়ে শেষবারের মতন আয়নায় ভালোভাবে নিজেকে দেখে নিয়ে যেই না যাওয়ার জন্য বাইরে পা বাড়াবে অমনি ঘরে আনোয়ারা ঢুকল।মেয়ের লম্বা চুলগুলো ছেড়ে দিয়ে যেতে দেখে তিনি আতঙ্কিত গলায় বললেন,

“চুল বাঁধিস নাই ক্যান মা?”

“বাঁধতে ইচ্ছে করছে না আম্মা।ছেড়ে দিয়ে যাব।”

আনোয়ারা পুনরায় আতঙ্কিত গলায় বলল,

“ছাইরা দিয়া যাবি মানেটা কি?যাওয়ার পথে কতগুলো বাঁশঝাড় পড়বো।তুই জানোস না ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হইয়া যাইবো।তহন চুল খুইলা দিয়ে আসবি তুই?”

“তো কি হবে?”

জুঁইয়ের চোখে মুখে একরাশ বিস্ময় আর প্রশ্ন।আনোয়ারা রাগী গলায় বলল,

“কি হইবো জানিস না?জ্বীনের আছর পড়বো শিগগির চুল বাইন্ধ্যা আয়।”

জুঁই আরেকটু কথা বাড়াতো তবে তার এই জ্বীন-ভূতে একটু ভয় আছে।তাই আর মায়ের কথায় আপত্তি করতে পারলে না।আবার আয়নার সামনে গিয়ে চুলটা সুন্দর করে খোপা করল।সামনে কিছু ছোট চুল ছেড়ে দিল।আনোয়ারার বোধহয় এতটুকুতেও আপত্তি ছিল। তবে জুঁই এবারে আর তার আপত্তি মানবে না।এতটুকু চুল সামনে ছেড়ে দিয়েছে তাতে আর কি হবে?আনোয়ার কথা বাড়াতে চাইলেন না তাই বেরিয়ে পড়লেন।

গরুর গাড়ি ঠিক করে রাখাই ছিল।দুটো গাড়ি লাগবে।তাদের সদস্য সংখ্যা বাড়ির অনেক।নিজের জন্য বরাদ্দ গাড়িতে উঠে বসলো জুঁই।পাশ দিয়ে সুজন কে চুপচাপ চলে যেতে দেখে একবার গলা ছেড়ে ডাকলো।জুঁই কে দেখতেই সুজন হালকা হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল,

“কিছু বলবে?”

“কোথায় যাচ্ছো?”

“আমিতো বাড়ি ফিরছি।”

“এতটা হেটে হেঁটে যাবে নাকি?”

“হ্যাঁ এখন তো এখানে কোন ভ্যান পাব বলে মনে হচ্ছে না।সামনের মোড়ে গিয়ে ভ্যান পেয়ে গেলে তখন গাড়িতে চলে যাব।”

“আমাদের সাথে চলো।সামনের মোড় অব্দি তোমায় ছেড়ে দিচ্ছি।”

উত্তরে সুজন অসম্মতিই জানাতো তবে সুজনকে সেই কথাটা বলার সুযোগও দিলো না।তার আগেই জামশেদ জুঁইয়ের উপর চড়াও হয়ে বলল,

“এত বেশি কথা বলিস কেন তুই?ও কি একবারও তোর থেকে সাহায্য চেয়েছে,না বলেছে যেতে পারবে না? দুটো পা যখন সচল আছে হেঁটে হেঁটে চলে যেতে পারবে।”

জুঁইয়েল প্রস্তাবে মুক্তা ভীষণ খুশি হয়েছিল।গত কয়েক দিল হলো সুজনের সাথে কথা বলার কোন সুযোগ পাচ্ছে না।যখনই পাচ্ছে মনে হচ্ছে সুজন কেমন যেন ওকে এড়িয়ে যেতে চাইছে।জামশেদের ভয়ে খুব একটা বেশি কথা বলতেও পারে না।ভেবেছিলি এই গাড়িতে গেলে অন্তত কিছুটা পথ কথা বলার সুযোগ পাবে।তবে জামশেদের কথা শুনতেই তার সেই ইচ্ছেটা দমিয়ে ফেলল।তবে মুক্তা দমে গেলেও জুঁই তো আর দমদার পাত্রী নয়।পাল্টা রাগ দেখিয়ে বলল,

“পা তো আমাদেরও আছে তাহলে আমরা গরুর গাড়িতে করে যাচ্ছি কেন?আমরাও তো হেঁটে গেলেই পারি।”

“তো যা না।তোকে হেঁটে যেতে কেউ বারণ করেছে?যত মিল মহব্বত সব ফকিন্নির বাচ্চাদের সাথে।সেই নাকি আবার তালুকদার বাড়ির যোগ্য মেয়ে।”

জুঁই জানে জামশেদের সাথে তর্ক করে কোন লাভ নেই। মূর্খের সাথে তর্কে কখনোই জেতা যায় না।কেননা সে কোনো যুক্তি দেখাতেও পারেনা,কোনো যুক্তি মানেও না।অযথা কথা বাড়াতেই থাকবে।গাড়ি থেকে নেমে জলিল তালুকদার কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আব্বা আমাদের গাড়িতে জায়গা ফাঁকা আছে।সুজন ভাইকে নিয়ে গেলে কি খুব অসুবিধা হবে?”

জলিল তালুকদার ফোঁস করে একটা শ্বাস ছেড়ে বললেন,

“তোমাদের দুই ভাই বোনের এত ঝামেলা আমার আর ভালো লাগেনা।”

“ঝামেলা তো বড় ভাইজান করছে।আমি একটা সাধারণ কথা বলেছিলা, উনি এর মাঝে নাক না গলালেও পারতেন।”

“তুই কিন্তু আমার রাগ তুলছিস জুঁই।”

সুজন বুঝলো পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে।ওর জন্য জুঁইয়ের অসুবিধা হোক সেটা সুজন চায় না।জুঁই কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তোমরা চলে যাও,আমার একটু কাজ আছে।আমি চলে যাবা চিন্তা করোনা।আমার এতোটুকু পথ হেঁটে গেলে কোন সমস্যা হবে না।আর ভ্যান পেয়ে গেলে আমি ভ্যানেই চলে যাবো।”

“না সুজন ভাই ব্যাপারটা এটা না যে তুমি এতোটুকু পথ যেতে পারবে কি পারবে না।ব্যাপার হলো সব সময় এই ভেদাভেদটা করা।পর হলে তাও মানতাম,কিন্তু তুমি আমাদের নিজের আত্মীয়।তার পরেও তোমার সাথে এই ভেদাভেদটা আমি সহ্য করতে পারি না।আমি তোমায় বলেছি তুমি আমার ভাই।যখনই কেউ আমার ভাইকে ছোট করার জন্য উঠে পড়ে লেগে যায় না আমার গা টা জ্ব/লে যায়।”

“এত রাগ করলে চলে না জুঁই।ভাই বলোতো আমায়? তোমার সেই ভাই বলছে অশান্তি না করে চলে যাও।”

“আমিও তোমায় বলছি তোমায় নিয়েই আমি যাব।
আব্বা আমরা এগোলাম।”

সুজন বাধ্য হলো জুঁইয়ের কথা রাখতে।এতবার করে মেয়েটা অনুরোধ করছে এখন যদি সুজন ওর কথা না রাখে তাহলে তো সবার সামনে ওকে ছোট করা হয়। মেয়েটা ওকে কত ভালোবাসে,সম্মান করে।সেই মেয়েটাকে কষ্ট দেয়াটা ঠিক হবে না।কোন উপায় না পেয়ে সুজন গাড়িতে বসলো।জামশেদও আর বলার মতন কিছু পেল না।গাড়ি ছাড়লো।

“কেমন আছোস সুজন?কথা কস না ক্যান আজকাল আমার লগে?”

হঠাৎ প্রশ্ন করায় সুজন ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলো কে প্রশ্নটা তাকে করেছে।যখন বুঝতে পারলো যে মুক্তা তাকে প্রশ্নটা করেছে তখন ঘাড় ঘুরিয়ে সামনের দিক হয়ে বসে স্বাভাবিক গলায় বলল,

“ব্যস্ত থাকি আজকাল।ভালো আছি।”

“আব্বা-আম্মা,মনি ভালো আছে?”

“হুম সবাই ভালো আছে।”

জুঁইয়ের কেন যেন মনে হলো যে সুজন কথা বাড়াতে চাইছে না মুক্তার সাথে।ঠিক একই ভাবে মুক্তারও তাই মনে হলো।তবে হঠাৎ সুজনের এমন অভিমানের কারণ বুঝতে পারল না।প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,

“তুই কি কোন কারণে আমার উপরে রাগ করছোস সুজন?”

সুজন আবারো স্বাভাবিক গলায় বলল,

“রাগ করতে যাবো কেন?আপন মানুষদের উপর রাগ করা যায় বুবু?”

“আমি কি আপন না তোর?”

“হয়ত ছিলে এক সময় বা এমনও হতে পারে কখনো ছিলেই না।”

জুঁই সুজনের কথাটা শুনে বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,

“ও মা!এ আবার কেমন কথা?তোমার কিছু হয়েছে নাকি সুজন ভাই?”

“না জুঁই আমার আবার কি হবে?আমি কি মানুষ নাকি? আমি তো পাথর,আমায় আঘাত করলেও আমি ভাঙ্গিনা।আল্লাহ তায়ালা আমার সহ্য ক্ষমতা অসীম করে পাঠিয়েছেন,আমার ধৈর্য অসীম করে পাঠিয়েছেন,প্রিয় মানুষ হারিয়ে গেলে তাকে ভুলে থাকার তীব্র ক্ষমতা আমার মাঝে দিয়ে পাঠিয়েছেন তো।আমার কি হবে?”

জুঁই যেন এখানে অল্প কিছু আন্দাজ করতে পারছে।তবে তার মনে হলো এই নিয়ে আর কথা না বাড়ানোই ভালো।তবে মুক্তা এখনো ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি।পুনরায় সুজন কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“কি হইছে ভাই ক না আমারে?আমি কি কোন অপরাধ করছি?আমি কি তোরে কষ্ট দিছি?তোর বুবুরে কইবি না?”

“আমার কিছু বলার নেই বুবু।বিশ্বাস করো আমি আর কিছু বলার মতন কোন অবস্থাতেই নেই।শুধু চাইছি খুব শীঘ্রই যেন আল্লাহ আমার মুখের মতন আমার নিঃশ্বাসটা থামিয়ে দেয়।”

জুঁই আর মুক্তা আৎকে উঠলো।সুজনের নিঃশ্বাস থেমে যাওয়ার কথায় নিশ্বাস আটকে গেল পাশে বসে থাকা আরো একজনের।তবে তা কেউ দেখলো না।তার হৃদয়টা যে ধক করে উঠেছিল সেটাও কেউ বুঝলো না।খুব সুন্দর করে সে নিজের আবেগ অনুভূতি আড়াল করে ফেলল যেন কেউ দেখে না।জুঁই রাগী গলায় সুজন কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আবার পাগলামি শুরু করে দিয়েছো তুমি?কেউ কারো জন্য মরে না সুজন ভাই।তাহলে কিন্তু আপাও এতদিনে ম/রে যেত তোমার জন্য।”

“জানো জুঁই,জবা আমার সাথে কখনো কোন বিশ্বাসঘাতকতা করেনি।আমরা যা করেছি দুজনে একসাথে মিলে সিদ্ধান্ত নিয়ে করেছি।কখনো মিথ্যে বলেনি ও আমাকে।আমি ওকে ভালোবাসার জন্য হলেও বেঁচে থাকতে চাই।কিন্তু আমার খুব কাছের একজন মানুষ আমার সাথে এমন বিশ্বাসঘাতকতা করেছে যার জন্য আমার ম/রে যেতে ইচ্ছা করছে।”

মুক্তা এবারে যেন বুঝতে পারলো সুজনের এত অভিমানের কারণ।সন্দেহী গলায় বলল,

“জবা তোরে সব কইয়া দিছে?”

“জবা আমায় কিছু বলেনি।তবে সেদিন যখন তুমি আর জবা ঘরের ভেতরে কথা বলছিলে তখন বাইরে দাঁড়িয়ে আমি সব শুনেছি।কি করে করলে আমার সাথে এই বিশ্বাসঘাতকতাটা তুমি বুবু?এতটা স্বার্থপর তুমি হতে পারলে?আমি জানিনা তুমি এই কথাটা ঠিক সময়ে মতিউর সাহেব কে বললে কি হতো কিংবা কি হতো না কিন্তু সারা জীবন আমার মাঝে এই সংশয়টা থেকেই যাবে যে কিছু হলেও হতে পারতো।”

জুঁই এতক্ষণে নিশ্চিত হলো।সুজনের এই কষ্ট পাওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু না।তবে একটা প্রশ্ন জুঁইয়ের মনেও আসে।এই কথাটা যদি ঠিক সময়ে মতিউর জানতো তাহলে কি কিছু আলাদা হতো?মতিউর ভীষণ ভালো মানুষ।বিয়ের পরে ব্যাপারটা জানার পর কখনো কোন অভিযোগ করেনি,রাগ করেনি,না জবার ওপর কোন ক্ষোভ দেখিয়েছে।বিয়ের আগে জানালে কি কোন সাহায্য করত?কিন্তু কেনই বা করত?ওরা কেনই বা মতিউরের কাছ থেকে সাহায্য চাইতো?প্রত্যেকটা প্রশ্নের পিছে আরও একটা প্রশ্ন থেকে যায়।

এদিকে মুক্তার গাল বেয়ে তখনও জল গড়িয়ে পড়ছে।খুব তাড়াতাড়ি সেটুকু সে মুছে নিয়ে অপরাধী গলায় সুজন কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তুই আমারে ভুল বুঝিস না ভাই।তোর কি মনে হয় তুই যদি জবারে নিয়া পলাইতি তাইলে তোর দুলাভাই তোরে বাঁচতে দিত?মা/ইরা ফালাইতো।যেই হাতে তোরে মানুষ করছি সেই হাতে তোর লাশ কেমনে নিতাম ভাই?”

“বাদ দাও বুবু।কিছুদিন পর তোমার উপর থেকে অভিমানটা ঠিক কেটে যাবে।কিন্তু কি বলতো আমার জীবনের দুঃখ,বিষন্নতা,এই হাহাকার,একাকীত্বতা কখনোই কাটবেনা।”

কাউকে কোন কথা বাড়াতে দিলো না সুজন তার আগেই গাড়ি চালককে থামাতে বলল গাড়িটা।সুজন নেমে পড়লো।গাড়িটা পুনরায় চলতে শুরু করল।মুক্তা এক নয়নে দাঁড়িয়ে থাকা সুজন কে দেখল।

নিতু ওর কাঁধে হাত রেখে বলল,

“কষ্ট পাইও না আপা।সুজন ভাই রাগের মাথায় কথাগুলো কইয়া ফালাইছে।”

“সুজন আমারে বিশ্বাসঘাতক কইলো।জানো জুঁই জবাও আমারে ভুল বুঝছে। কেউ বুঝতাছেনা আমার কষ্ট।ওই মানুষটার লগে আমি এতগুলো বছর ঘর করছি,আমি খুব ভালো কইরা তারে চিনি।সে যে কত খারাপ হইতে পারে সেইডা আমি জানি।আমি ভালা করতে চাইলাম কিন্তু হের কোন দামই রইলো না।”

“তুমি কেঁদো না ভাবি।আমি সুজন ভাইকে বোঝাবো।”

পাশ থেকে নিতু আলতো হেসে বলল,

“তুমি যাই বুঝাও না ক্যান জুঁই সুজন ভাই বুঝবো না।সে তো জবার আগে কিচ্ছু দেখে না,কাউরে দেখে না।জবা হইলো সুজানের জান।সেই জান রে সুজনের থেইকা যারা আলাদা করছে তাদের কোনদিনও ক্ষমা করবো না।”

জুঁই ইশারায় নিতু কে থামতে বলে বলল,

“এমন কিছু হবেনা ছোট ভাবি,চিন্তা করো না।আমি বোঝাবো সুজন ভাইকে।”

চলমান।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here