#প্রেমের ঘাটের মাঝি
#পর্ব ১৪
#লেখনিতে খুশবু আকতার
“ভাবি কিছু সাহায্য করবো আমি?”
জবা প্রশ্নটা করতেই ওর দুই বড় জা শিল্পী আর কান্তা বাঁকা চোখে ওর দিকে তাকালো।শিল্পী রুষ্ঠ গলায় বলল,
“না থাক তোমার কিছু করা লাগবো না।গ্রামের মাতব্বরের মাইয়া,আবার আমাগো মতিউরের বউ লাগো তোমারে দিয়া কিছু করান যাইবো নাকি?”
জবা বুঝলো যে কথাটা ওকে খোঁচা দিয়ে বলা হলো তবে ঝগড়া করা জবার ধাঁচে নেই।তাই মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল,
“এমন করে বলছেন কেন?আমি সব কাজই পারি।আমাকে বলুন না কি করতে হবে?”
পাশ থেকে এবার কান্তা বলে উঠলো,
“যদি কাজ করার ইচ্ছাই থাকতো তাইলে আরো সকাল সকাল উইঠা আসতা।আমাগো রান্না শেষ,এখন কি আইসা উনুনে বইসা খালি নাম কামাইবা?”
জবা বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,
“এত তাড়াতাড়ি রান্না শেষ?”
“হ।তুমি তো বড় লোকের বাড়ির মাইয়া এত সকাল সকাল ওঠনের বোধ হয় অভ্যাস নাই।উঠতে হইব না যাও তুমি ঘুমোও।”
“আমি তো জানতাম না যে এই বাড়িতে তাই বলে এত তাড়াতাড়ি রান্না শেষ হয়ে যায় সেজন্য উঠতে একটু দেরি হয়ে গিয়েছে।আমি কাল থেকে আরো তাড়াতাড়ি উঠবো।কিছু করার কি বাকি আছে বলুন আমি করে দিচ্ছি?”
“ভাত রান্না বাকি আছে।তা পারো তো নাকি?”
“হ্যাঁ আমি সব পারি।চিন্তা করবেন না আমি করে দেবো,আপনি উঠুন।”
শিল্পী আর কান্তা দুজনে উঠে গেল।জবা চাল ধুঁয়ে পাতিলে তুলে চুলার উপর বসিয়ে দিল।উনুন ধরানোর সময় দেখলে পাতাগুলো হালকা ভেজা,খড়িও নেই। একটু গলা উচিয়ে কান্তাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ভাবি এখানে তো কোনো খড়িই নেই,পাতাগুলোও ভেজা।”
“ওই দিয়েই নামাও।এহন কেউ যাইবো না খড়ি আনতে।আমরাও ওই দিয়া রানছি।”
জবা আর কোন কথা বলার সাহসই পেল না।এদের দুজনের কথা বলার ভাব ভঙ্গি একদমই ভালো না।উপায় না পেয়ে চেষ্টা করলো পাতা দিয়েই উনুন ধরানোর।কিন্তু পাতাগুলো একদমই ভেজা।আশেপাশে কয়েকটা ছোট ছোট ডাল খুঁজে পেল।সেগুলোও কাজে লাগানোর চেষ্টা করলো তবে কাজ হলো না।বরং ধোঁয়ায় রান্নাঘর ভরে উঠলো।ধোঁয়ায় কাশতে কাশতে জবার অবস্থা খারাপ।একদম চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে গেছে।উঠোনে কান্তা আর শিল্পী দুজনে কি যেন কাজ করছে।জবার এমন বেহাল দশা দেখেও তারা একবারও এগিয়ে এলো না,সহানুভূতি দেখানো তো অনেক পরের কথা।ঘরে বসে জবার কাশির শব্দ মতিউরের কানে গেল।সকালে ঘুম থেকে উঠে সে ব্যবসার কিছু হিসাব পত্র করতে বসেছিল।শব্দটা কানে যেতেই তাড়াহুড়ো করে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে যেতেই দেখলো জবার বেহাল দশা।তাড়াহুড়ো করে এগিয়ে জবাকে সেখান থেকে তুলে এনে উদ্বিগ্ন গলায় বলল,
“আরে আরে তোমাকে এইসব কে করতে বলেছে?তুমি পারো এসব করতে যে গেছো?”
কথাটা বলে নিজেই জবার চোখ মুখ মুছিয়ে দিল।ফর্সা টকটকে গায়ের রং কাশতে কাশতে একদম চোখ মুখ লাল হয়ে উঠেছে।মতিউর এবারে মৃদু রাগী কন্ঠে নিজের ভাবীদেরকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আপনারা ওকে রান্না ঘরে কেন পাঠিয়েছেন?বাড়িতে কি কাজ করার লোকের অভাব?না আমি আপনাদের কখনো এসব কাজ করতে বলেছি,না আমার বউকে দিয়ে কখনো করাবেন।দরকার হলে আরো পাঁচটা কাজের লোক রাখা হবে।তাও যেন দ্বিতীয় দিন আমার বউকে আর রান্না ঘরে না দেখি আমি।”
মতিউরের এমন উদ্বিগ্নতায় জবা নিজেই লজ্জা পেয়ে গেল।ধীর গলায় বলল,
“চুপ করুন।আপনি ঘরে যান,আমার অভ্যাস আছে।”
মতিউর পাল্টা ধমক দিয়ে বলল,
“তুমি চুপ করো।তোমার অভ্যাস আছে কি নেই সেটা কি আমি জানতে চেয়েছি?আমি যখন বলেছি তুমি এসব করবে না তার মানে করবে না।”
শিল্পী ব্যাঙ্গাত্মক গলায় মতিউরকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“তুমি এমন ভাব করতাছো মতিউর যেন মাইয়া মানুষ রান্দে না।তোমার বউয়েরই কি খালি কাশি হয় নাকি?এমন তিন বেলা আমরাও কাশি তাই বলে কি ঘর সংসার করোন ছাইড়া দিছি?”
“সেটা আপনাদের ব্যাপার ভাবি যে আপনারা ছাড়েননি।আপনারা রান্না করতে গিয়ে কাশলে হয়তো আমার ভাইদের সমস্যা নেই কিন্তু আমার বউ রান্না করতে গিয়ে কাশলে আমার সমস্যা আছে।”
পাশ থেকে কান্তা বলে উঠলো,
“বউ মনে হয় তোমার একলারই আছে মতিউর।তা এত সোহাগের বউরে সারাদিন ঘরের মধ্যে বইসা রাখলেই পারো।আমরা তো কামের লোক,তোমার বউরে বইসাই না হয় খাওয়ামু।যতই হোক তোমার পয়সায় বইসা থাইকা খাই এইডা তো করতেই হইবো তাই না?”
মতিউরের এবার ভীষণ রাগ হলো।তার দুই ভাবির এমন কথায় কথায় খোঁচানো অসহ্য লাগে তার।সে পুরুষ মানুষ হয়ে এসব সহ্য করতে পারে না কে জানে জবা কি করে ধৈর্য ধরলো বা ধরবে।বহুত কষ্টে নিজের রাগটা সংবরণ করে বলল,
“আপনারা যে আমার টাকায় খান সে কথাটা আমি যদিও বা না মনে করি আপনারা নিজেরাই মনে করিয়ে দেন।আমি কি কখনো এই নিয়ে আপনাদেরকে কিছু বলেছি যে আপনাদের এত মাথাব্যথা?আমাদের ভাইদের মাঝে ঝামেলা না লাগালে আপনাদের শান্তি হচ্ছে না তাইতো?”
“হ বুঝছি সব দোষ আমাগোরে।”
“সব দোষ আপনাদের কিনা জানিনা তবে আমার বউকে রান্নাঘরে বসানোটা আপনাদেরই দোষ।আর জবা তোমাকেও বলছি এমনটা না যে তুমি এই সংসারে কাজ না করলে থাকতে পারবে না।আমি তোমার স্বামী, আমি তোমাকে বলছি তোমার যা ইচ্ছা তাই করবে,যেমন ভাবে ইচ্ছে তেমন ভাবেই থাকবে।তোমাকে রানীর মতন বসিয়ে রাখার সামর্থ্য তোমার স্বামীর আছে বুঝতে পেরেছো?ঘরে চলো।”
কথাটা বলে জবা কে একপ্রকার টেনেই ঘরে নিয়ে গেল মতিউর।ঠাস করে দরজাটা বন্ধ করে দিল।শিল্পী আর কান্তা যেন অবাক না হয়ে পারল না।মতিউরের মতন বউ পাগল ছেলে আশেপাশের দশ গ্রামেও তারা আজ অব্দি কখনো দেখেনি।তাও আবার এমন দিন দুপুরে বউকে ঘরে নিয়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল ওদের মুখের ওপর!না এই কথাটা তো তাদের শাশুড়ির কানে তুলতেই হবে যে তার ছোট ছেলে হাতের বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে।দুদিন হলে বউ এসে একদম ছেলেকে পুরোপুরি নিজের আঁচলে বেঁধে ফেলেছে।
ঘরে আসতেই জবা রাগী গলায় মতিউরকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“এত ঝামেলা করলেন কেন বাইরে?আমি তো আমার বাড়িতেও রান্না করেছি।আর রান্না করতে গেলে একটু ধোঁয়া হবে,ধোঁয়াতে কাশি উঠবে এটাই স্বাভাবিক।”
“সব স্বাভাবিক কিন্তু তোমার চোখের জলটা আমার কাছে অস্বাভাবিক।এমন কোন কিছু করবে না যাতে তোমার চোখে জল আসে বুঝতে পেরেছো?”
“এত চিন্তা কেন করছেন আমায় নিয়ে?”
“ভালোবাসি তাই।”
মতিউরের সরল স্বীকারোক্তি শুনে জবা কিঞ্চিত অস্বস্তিতে পড়লো।মানুষটা জানে যে জবা অন্য কাউকে ভালোবাসে তারপরও কি সুন্দর সহজ ভাবে বলে দিলো যে সে জবাকে ভালোবাসে।জবার চোখে জল যে মানুষটাকে এতটা বিচলিত করে তুলেছে তার বদলে সেই মানুষটাকে জবা কি দিতে পেরেছে?কিচ্ছু না।শুধু কষ্টই দিয়েছে।জবা কে এক দৃষ্টিতে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে মতিউর বলল,
“এভাবে তাকিয়ে আছো কেন?আমার ভালোবাসার কথা শুনে কি তুমিও ভালোবেসে ফেললে নাকি?”
“যদি কখনো ভালোবাসার হয় তাহলে আপনাকে এমনি ভালোবাসব।তবে একটা কথা,এমন আর কিছু করবেন না কখনো।এখন আমি ভাবিদের সামনে যাব কি করে?আমার তো অস্বস্তি হবে।ওরা কি ভাবল বলুন তো? দরজাটাও বন্ধ করে দিলেন আপনি।এমন নির্লজ্জদের মতন আচরণ কেউ করে?”
“তুমি এমন ভাব করছো যেন অন্যের বউকে নিয়ে আমি দরজা লাগিয়েছি?আর আমি তো তোমায় বলছি কেউ তোমায় কিছু বলবে না।কারো সেই সাহসই নেই।তাও যদি কারো কলিজা খুব বেশি বড় হয়ে থাকে তাহলে আমায় একটু কষ্ট করে মুখ ফুটে বলো।কেননা প্রথম দিকে যদি সাবধান না করি পরে কিন্তু সাহসটা বেড়ে যাবে।”
জবা একটা হতাশার শ্বাস ফেলল।মতিউর কে কোনমতেই হয়তো বোঝাতে পারবে না সে।তবে তার এখন বাইরে বেরোনো দরকার।একটু আগেই তো ঘর থেকে বেরিয়েছিল,এখন যদি আবার নতুন বউ ঘর বন্ধ হয়ে বসে থাকে তাহলে ব্যাপারটা কি খারাপ দেখায় না?জবা চলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়ালে মতিউর হাত টেনে ধরল।জবা চমকালো।একটু বোধহয় বিরক্ত বোধ করল।মতিউর এভাবে হঠাৎ করে হাত ধরে না।যদিও সচরাচর মতিউর জবা কে স্পর্শ করে না,করলেও অনুমতি নেয়।আজ প্রথম বিনা অনুমতিতে হাতটা ধরল।জবা বিরক্ত হয়েছে সেটা মতিউর কে বুঝতে দিতে চাইলো না।স্বাভাবিক কণ্ঠে বললে,
“কি হয়েছে?”
মতিউর একটু এগিয়ে গেল জবার কাছে।জবার চোখের পাপড়ি গুলো তখনও ভেজা।মতিউর সযত্নে সেটুকু মুছে দিয়ে বলল,
“তুমি কখনো কেঁদো না কেমন।যদি কোন কষ্ট হয়, কোন প্রয়োজন হয় আমাকে বলবে।যত কষ্ট করেই হোক,যা করেই হোক আমি তোমায় হাসানোর চেষ্টা করব।তোমার সব কষ্ট দূর করার চেষ্টা করব।তোমার সব প্রয়োজন পূরণ করার চেষ্টা করব তবুও তুমি কখনো কেঁদো না।তোমায় কাঁদতে দেখলে না আমার খুব কষ্ট হয়।”
মতিউরের কথার প্রেক্ষিতে জবার ঠিক কি বলা উচিত সেটা বুঝতে পারছেনা।জবা কি করে বলবে নতুন করে আর কোন কষ্ট পাওয়ার তার দরকার নেই,বুকের ভেতরে যে ক্ষত জমে আছে সেটাই সারা জীবন তাকে মৃত্যু সমান যন্ত্রনা দিতে যথেষ্ট।জবা কি করে বোঝাবে এই জীবনে সুজনকে পেলে আর কোন কিছুরের প্রয়োজন ছিল না।
জবাকে চুপ করে থাকতে দেখে মতিউর পুনরায় বলে উঠলো,
“আমি জানি তোমার বুকের ভেতরে অনেক বড় একটা ক্ষত রয়েছে।তোমার জীবনে অনেক বড় একটা অপূর্ণতা রয়েছে তবে সেসব নিয়ে আর ভেবো না কখনো।সেই অপূর্ণতাটাকে পূরণ করার চেষ্টা করো না।যে তোমার জীবন থেকে হারিয়ে গিয়েছে তাকে অন্তত ফিরিয়ে আনার আবদার টুকু আমার কাছে করোনা।আমি তোমায় চাই জবা,ভীষণ চাই।যে চলে গিয়েছে তাকে না হয় ভুলে যাও।বাকিটা জীবন কি আমার সাথে সুখে শান্তিতে কাটানো যায় না?আমি কি এতই খারাপ?”
“আমি তো বলিনি আপনি খারাপ?”
“তাহলে ভালো কেন বাসোনা?একবার আমার দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখো আমি দেখতে শুনতে ভালোই আছি,তোমার পাশে আমাকে মানায়।আমি পড়াশোনা জানি,আমি বেকার না ভালো একটা ব্যবসা আছে আমার।তোমাকে ভালোবাসি।আর কি করলে ভালোবাসবে আমায় বলো?”
“যেদিন আপনাকে দেখলে আমি শান্তি অনুভব করবো সেদিনই আপনাকে ভালোবাসবো।ঠিক যে কারণে সুজনকে ভালোবেসে ছিলাম।”
জবা নিজের হাতটা মতিউরের হাত থেকে ছাড়িয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল।মতিউর তাকিয়ে রইল জবার যাওয়ার পথে।কে জানে আদৌ কখনো জবা ওকে দেখলে শান্তি অনুভব করবে কিনা?
_______
“কি গো মাঝি তোমার খবর কি?”
রুমির প্রশ্ন শুনে জহির আলতো হেসে বলল,
“ভালো আছি।তুমি কেমন আছো?”
“তুমিতো ভালো থাকবে এটাই স্বাভাবিক।কিন্তু আমি ভালো নেই গো।তোমার মতন এমন ভালোবাসার মানুষ আছে নাকি আমার জীবনে যে আমি ভালো থাকবো?তা বলো বিয়ে সাদি কবে করছো?তুমি কিন্তু বড্ড কিপটে মাঝি।একটা মাত্র শালী,মাঝেমধ্যে তো একটু কিছু খাওয়াতে পারো।যা টাকা কামাও সব দিয়ে তো শুধু বউকেই খাওয়াও।স্বার্থপর কোথাকার!”
“তুমি তো কখনো কিছু খাইতে চাও নাই খাওয়ামু কেন?জুঁই খাইতে চায় তাই খাওয়াই।”
“আরে আমাকে কি তোমার নির্লজ্জ মনে হয় যে এগিয়ে গিয়ে বলবো আমায় কিছু খাওয়াও?তুমি নিজ ইচ্ছেয় খাওয়াতে পারো না?”
জহির ইতস্তত ভঙ্গিতে বলল,
“আমার তো আগাইয়া যাইয়া তোমার লগে কথা কইতে কেমন কেমন জানি লাগে।মনে হয় যদি জুঁই কিছু মনে করে।সেইখানে তুমি না কইতেই খাওয়ামু?”
জহিরের কথা শুনে জুঁই শব্দ করে হেসে উঠল।জুঁইয়ের মনে হয় পৃথিবীতে জহিরের থেকে বোকা বোধহয় আর কেউ নেই,ওর মতন পরিষ্কার মনও আর কারোর নেই।জহির কে আশ্বস্ত করে বলল,
“চিন্তা করিস না কালা,রুমিকে নিয়ে আমি নিশ্চিন্ত।তুই যদি ওকে সিনেমাও দেখাতে নিয়ে যাস তাও আমি তোর বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ করব না।”
জুঁইয়ের কথার দ্বারা জহির কি বুঝলো কে জানে।তবে তার স্বাভাবিক চোখমুখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট ফুটে উঠলো।আতঙ্কিত গলায় জুইকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আমি নিয়া যামু না তুই চিন্তা করিস না।আমি কাউরে নিয়ে যামু না।আমি তো তুই ছাড়া কারো লগে কথাও কই না।”
জহিরের এমন কথা জুঁই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল।ছেলেটা আসলেও বোকা।
“আমি কি বললাম আর তুই কি বুঝলি?আমার কথার মানে ছিল তুই যদি রুমির সাথে কথা বলিস তাও আমি কিছু মনে করব না।”
জহির সন্দেহী গলায় বলল,
“সত্যি কইছোস তো?”
“হ্যাঁ রে বাবা,সত্যি বলেছি।”
“ও আমি মনে করছি তুই মনে হয় আমার পরীক্ষা নিতাছোস।হের লাইগা ভয় পাইছি।”
জুঁই এবার রেগে গেলো।রাগান্বিত গলায় বলল,
“সারাক্ষণ এত ভয় পাস কেন?তোকে কতবার আমি বলেছি ছেলেদের মতন আচরন করতে শেখ।তোর কথায় কথায় এমন ভয় পাওয়াটা আমার বড্ড বেশি বিরক্ত লাগে।আমার সাথে ঝগড়া করতে পারিস না?”
“ঝগড়া ক্যান করুম?”
“আরে বাবা সব সময় আমি যা বলি সেটা মেনে নেস কেন?তোর নিজস্ব কোন মতামত নেই?আমার কোন কিছু পছন্দ না হলে তোর নিজের যেটা ভালো লাগে তেমনটা বলবি।সব সময় আমি যেটা বলবো সেটাই যে ঠিক হবে তার তো কোন মানে নেই?সব সময় যে আমার কথা মতোই তোকে চলতে হবে তারও তো কোন মানে নেই?তোর নিজের কোন ব্যক্তিত্ব নেই?”
জহির আলতো হেসে বলল,
“তোর কথা শুনলে যদি তুই হাসিস তাইলে শুনতে ক্ষতি কি?আমি তো তোরে ভালোবাসি।আর আমি জানি আমার খারাপের লাইগা তুই কিছু কইবি না তাইলে তোর কথা শুনতে তো কোন দোষ নাই?আর হ এইডা ঠিক যে আমার কাছে তুই যেইডা করবি সেইডাই ঠিক।”
দুজনে একে অপরের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ওদের পাশে যে রুমিও দাঁড়িয়ে আছে সেদিকে কারো কোন খেয়ালই নেই।রুমি একটু গলা খাকারি দিতেই দুজনের ধ্যান ভাঙ্গলো।দুজনেই একটু বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়লো।রুমি ঠোঁট টিপে হেসে বলল,
“কি রে জুঁই তোর তো দেখছি অবস্থা খারাপ।কালাকে দেখলে তো আর নিজের উপর কোন নিয়ন্ত্রণই রাখতে পারছিস না তুই আজকাল।”
জুঁই সলজ্জিত ভঙ্গিতে বলল,
“ধ্যাত কি সব বলিস না তুই?চুপ করতো।এই কালা তুই নৌকা ছাড়।”
রুমিও তাড়া দিয়ে বলল,
“হ্যাঁ হ্যাঁ জহির মিয়া নৌকা ছাড়ো তো।”
জহির বৈঠা হাতে নৌকা চালাতে চালাতে রুমিকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“নদীতে পার কইরা নিতাছো রুমি টাকা দেওন লাগবো কিন্তু।”
রুমি চোখ ছোট ছোট করে জহিরের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ ও কি কথা জহির মিয়া?তুমি না আমার সখির প্রেমিক।একটু নদী পার করে দিচ্ছ তাও আবার টাকা নেবে?”
“তাতো অবশ্যই নিমু।টাকা ছাড়া কিন্তু নৌকা ছাইড়া নামতে দিমু না তোমারে রুমি।”
“তাহলে কিন্তু শুধু আমার একা থেকে টাকা নিলে চলবে না,জুঁইয়ের থেকেও নিতে হবে।”
“তা আমি কখন কইলাম যে খালি তোমার থেইকা নিমু?”
জুঁই রাগান্বিতা দৃষ্টিতে জহিরের দিকে তাকিয়ে বলল,
“কি বললি কালা তুই আমার থেকে টাকা নিবি?তোর এত বড় সাহস?”
“আহা জুঁই রাগতাসোস কেন?আমি কি কইছি তোর থেইকা টাকা নিমু?”
“তো কি নিবি?”
“আরে ওই গান খান শুনিস নাই যেইখানে নায়ক মাঝি থাকে কিন্তু নায়িকার থেকে টাকা নেয় না,অন্য কিছু নেয়।তোরে না সিনেমা দেখাইয়া আনলাম তারপরও ভুইলা গেছোস কোন গান?”
“আর কি নিবি তুই আমার থেকে।”
“প্রেমিকরা যা নেয়।”
“কি নেয়?”
❝সব সখিরে পার করিতে নেব আনা আনা,
তোমার বেলায় নেব সখি তোমার কানের সোনা,সখি গোওও আমি প্রেমের ঘাটের মাঝি,
তোমার কাছে পয়সা নিব না!❞
জুঁই বিস্ময় ভরা কন্ঠে জহির কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“কি রে কালা তুই আবার এসব প্রেমের আলাপ করতে জানিস?আমিতো জানতাম না।”
“আমি আরো অনেক কিছুই পারি রে কিন্তু তোরে দেখাই না।সময় মতো ঠিক দেখামু।”
পাশ থেকে রুমি হালকা করে জুঁইয়ের কাঁধে ধাক্কা দিয়ে বলল,
“তোদের দুটোর প্রেম তো দেখছি একদম জমে গেছে রে জুঁই।আর এই যে জহির মিয়া,তোমায় কিন্তু আমি বেশ নিরামিষ ভেবে ছিলাম এখন তো দেখছি তুমিও কারো থেকে কম যাও না।”
জহির মাথা চুলকে আড় চোখে একবার জুঁইয়ের দিকে তাকালো যে মুখটা এখন লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছে।তবে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলো না,আবার নৌকা চালানোয় মনোযোগ দিল।
চলমান।

