#প্রেমের ঘাটের মাঝি
#পর্ব ১৬
#লেখনিতে খুশবু আকতার
স্কুলে ক্লাস নেওয়ার সময় দরজার দিকে দৃষ্টি পড়তেই দেখলো জুঁই দাঁড়িয়ে আছে।জুঁই কে অসময় এখানে দেখে নাদিম ভীষণ অবাক হলো।এগিয়ে গিয়ে হাস্যজ্জ্বল গলায় বলল,
“আপনি এখানে এখন?কোন দরকার ছিল নাকি?”
জুঁই ব্যস্ত গলায় বললো,
“হ্যাঁ আপনার সাথে একটু কথা ছিল।সময় হবে?”
“হ্যাঁ বলুন না।”
“এখানে না।আপনার ক্লাস কতক্ষণ আছে?”
“এইতো আর একটু বাকি আছে।”
“ঠিক আছে আপনি ক্লাস শেষ করে স্কুলের পিছন দিকে আসুন।আমি ওখানে দাঁড়িয়ে আছি।”
“আচ্ছা ঠিক আছে চলুন এখনই যাচ্ছি আপনার সাথে।”
“কিন্তু আপনি যে বললেন আপনার ক্লাস বাকি আছে?”
“ও কোনো ব্যাপার না।আপনি এগোন আমি আসছি।”
জুঁই মাথা নাড়িয়ে সায় জানিয়ে চলে গেল।পিছন পিছন নাদিমও এলো।স্কুলের পিছন দিকটায় মানুষজনের আনাগোনা তেমন নেই বললেই চলে।একদম ফাঁকা।গাছপালা ঘেরা অঞ্চলটা দেখতে জঙ্গলের মতন লাগছে।
“বলুন জুঁই কি বলবেন?”
কথাটা বলতে ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে জুঁইয়ের।কে জানে নাদিম কি মনে করে।এই কথাগুলো জলিল তালুকদারের কানে গেলে আরেক কান্ড ঘটে যাবে।জুঁইয়ের চিন্তিত মুখশ্রী দেখতেই নাদিম যেন ওর অস্বস্তি বুঝে গেল।অভয় দিয়ে বলল,
“যা বলতে চাইছেন নির্ভয়ে বলতে পারেন।আমার দৃষ্টিতে আপনি একজন অত্যন্ত বিচক্ষণ,বুদ্ধিমতি মেয়ে।ভরসা আছে আপনার ওপর।আমি জানি আপনি অযৌক্তিক কোন কথা বলবেন না।”
জুঁই এবারে একটু সাহস পেল।নাদিম কে অনুরোধ করে বলল,
“এই বিয়েটা আপনি দয়া করে ভেঙ্গে দিন।”
নাদিম যেন আন্দাজ করতে পেরেছিল যে জুঁই এই ধরনের কোন কথাই বলবে।কেননা এই কথাটাই একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ।আর কোন গুরুত্বপূর্ণ কথা না থাকলে জুঁই ওর সাথে কথা বলার জন্য এতটা তাড়া দিত না সেটা নাদিম বেশ ভালো করেই জানে।তাছাড়া ওর মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে ও ভীষণ চিন্তিত।তবে অমতের কারণটা জানা ভীষণ জরুরি।
“কারণ কি?মানে বিয়েটা যে আপনি করতে চাইছেন না তার কারণ কি?”
“কারণ যেটাই হোক না কেন সেসব তো আপনার জেনে কোন লাভ নেই।যদি এই বিয়েটা হয় আমি আপনাকে কখনো ভালোবাসতে পারব না।আর ভালোবাসতে না পারলে ভালো থাকবো কি করে?আপনি জানেন মেয়েদের আপত্তির থেকে ছেলেদের আপত্তির প্রাধান্যই এই সমাজে বেশি।আমার মতামত কে অতটা গুরুত্ব দেওয়া হবে না যতটা আপনার মতামত কে দেওয়া হবে।অনেক আশা নিয়ে আপনার কাছে এসেছি। আমায় শূন্য হাতে ফিরিয়ে দেবেন না।”
“বিয়ের প্রস্তাবটা আমাদের দিক থেকেই গেছে এবং আমি আপনাকে পছন্দ করি জন্যই এই বিয়ের প্রস্তাবটা পাঠানো হয়েছে।তার পরে আবার আমার কাছে কোন ভরসা নিয়ে এলেন?”
“কোন ভরসা নিয়ে আসিনি।আশা আর অনুরোধ করতে এসেছি।আমার কথা শুনে এই বিয়েটা কখনোই ভাঙবে না।আমার আব্বা আমার থেকে আমার মতামত চেয়েছেন ঠিকই তবে আমি যদি অমত করি সেটাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে না।এখন বাকি রইল শুধু মাত্র আপনি যে চাইলে এই বিয়েটা ভাঙতে পারেন সেজন্য আপনার কাছে এসেছি।”
“ভালোবাসার মানুষ আছে?”
জুঁই প্রশ্ন শুনেই বুঝতে পারলো যে নাদিম জহিরের বিষয়ে কিছু জানে।কিন্তু সেসব বুঝতে দিলে চলবে না।পাল্টা প্রশ্ন করলো,
“হঠাৎ এই কথা বললেন কেন?”
“এই বিয়েতে আপনার অমতের একটা কারণ খুঁজছি।”
“ধরুন যদি এটাই তার কারণ হয় তাহলে কি করবেন?”
“আমাকে কি আপনার মানুষ হিসেবে এতটাই খারাপ মনে হয়েছে জুঁই?”
“তেমনটা না।আসলে আপনি যে আমায় সাহায্য করবেন সে ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারছে না।”
নাদিম আলতো হেসে বলল,
“আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে আপনি হয়তো আমার উপর একটু বিরক্ত কিংবা আমাকে আপনার অতটা পছন্দ না।তবে আমার আপনাকে ভীষণ পছন্দ,আপনার কথাবার্তা,ব্যবহার,ব্যক্তিত্ব আমার ভীষণ পছন্দ।ভেবেছিলাম বিয়ের প্রস্তাব দিলে হয়তো রাজি হয়ে যাবেন সেজন্য দিয়েছিলাম।কিন্তু আপনার অমতে কখনোই বিয়েটা আমি হতে দেব না।কথা দিচ্ছি ভেঙে যাবে বিয়েটা।”
জুঁই কৃতজ্ঞতার কন্ঠে বলল,
“আমি চির কৃতজ্ঞ থাকবো আপনার কাছে।যদি কখনো সুযোগ পাই আপনার এই ঋণ আমি নিশ্চয়ই শোধ করবো।”
______
“খাবারটা আগে খেয়ে নিন।কাজ করার জন্য পরেও সময় পাবেন।”
জবার কথার প্রেক্ষিতে মতিউর ব্যস্ত গলায় বলল,
“না জবা।এখন খাবার খেলে অনেকটা সময় নষ্ট হয়ে যাবে।কয়েকদিন শ্বশুরবাড়ির আদর আপ্যায়ন খেতে গিয়ে কাজে অনেক সমস্যা হয়ে গেছে।আগে এটা শেষ করে নেই তারপরে খাবো।”
“আমি রান্না করেছি।”
মতিউরের হিসাবের হাতটা থেমে গেল।চোখ তুলে জবার দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুমি রান্না করেছো জবা?”
জবা উপর-নিচ মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বলল।
“তো তুমি চাইছো আমি তোমার রান্না খেয়ে প্রশংসা করি?”
জবা একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো।এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে বলল,
“সেটা কখন বললাম?”
“তাহলে এই কথাটা কেন বললে যে তুমি রান্না করেছো?”
“আমি রান্না করেছি তাই বললাম আমি রান্না করেছি।”
মতিউর আলতো হেসে বলল,
“তুমি বড্ড বোকা জবা।ঠিকঠাক অজুহাতটাও দিতে পারো না।”
“এখানে অজুহাত দেওয়ার কি আছে?”
“তুমি চাইছো আমি এখন ঠিক সময়ে খাবারটা খেয়ে নেই।আর তুমি এটা জানো যে তুমি যদি বলো এই খাবারটা তুমি রান্না করছো তাহলে আমি নিশ্চয়ই খাবো।আর তুমি এটাও চাইছো আমি যেন এই খাবারটা খেয়ে একটু তোমার হাতের রান্নার প্রশংসা করি তাইতো?”
জবা অসম্মতি জানিয়ে বলল,
“মোটেই এমনটা না।আপনার খাওয়ার হলে খান না খাওয়ার হলে না খান।আর প্রশংসা করতেই হবে তেমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই।যা ইচ্ছা তাই করুন।”
“আচ্ছা ঠিক আছে আর রাগ করতে হবে না।আমি খেয়ে নিচ্ছি।”
মতিউর চুপচাপ খেয়েই যাচ্ছে তো খেয়েই যাচ্ছে। মতিউর আজ প্রথম জবার হাতের রান্না খাচ্ছে।এই বাড়িতে জবা আজ প্রথম রান্না করেছে।জবা একটু আশা নিয়ে বসে আছে মতিউর একটু প্রশংসা করবে তার রান্নার।অথচ ছেলেটা শুধু খেয়েই যাচ্ছে।জবা বেশ বিরক্ত হলো,তবে কিছু বলল না।মতিউর ক্ষনে ক্ষনে আড় চোখে জবার দিকে তাকাচ্ছে।জবার মুখ ভঙ্গি দেখেই বুঝতে পারছে ভীষণ বিরক্ত হচ্ছে সে,সাথে রাগও উঠছে তবে কিছু বলছে না।শুধু ঠোঁট টিপে হাসছে আর খাবার খেয়ে যাচ্ছে।এদিকে খাওয়া শেষ হয়ে গেল এখনো কিছু বলল না।জবা কেন জানি এবার আর চুপ থাকতে পারলো না।নিজ থেকে বলে উঠল,
“লবণ ঠিক ছিল?”
“হ্যাঁ।”
“ঝাল ঠিক ছিল?”
“হ্যাঁ।”
“তরকারি সিদ্ধ হয়েছিল?”
“হবে না কেন?”
জবা আবার থেমে গেল।এতগুলো প্রশ্ন করার পর তো অন্তত বোঝা উচিত ছিল মতিউরের যে জবা চাইছে ওর রান্নার প্রশংসা করুক।এই নাকি আবার জবাকে ভালোবাসে অথচ ওর মনের কথাই বোঝে না।যতসব ঢংয়ের কথাবার্তা।ভালোবাসা মানে বোঝে নাকি!
জবার এসব ভাবনার মাঝেই মতিউর গ্লাসটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
“পানি শেষ হয়ে গেছে জবা।এক গ্লাস একটু পানি এনে দেবে?”
জবা রাগান্বিত গলায় বলল,
“পারবোনা।নিজে গিয়ে খেয়ে আসুন।”
কথাটা বলে জবা উঠে চলে যেতে নিলে মতিউর পিছন থেকে ওর হাত টেনে ধরল।হ্যাঁচকা টান দিতেই জবা হুড়মুড়িয়ে একপ্রকার মতিউরের গায়ের উপর পড়লো।
“আরে কি করছেন ছাড়ুন।”
মতিউর ছাড়লো না বরং হাতের বাঁধন আরো দৃঢ় হলো।মতিউরের অদ্ভুত দৃষ্টি জবাকে ভীষণ বিব্রত করলো।জবা খেয়াল করেছে মতিউর যখন হাসে ওর চোখ দুটোও হাসে।ঘোর লাগানো দৃষ্টিতে জবার দিকে তাকিয়ে মতিউর বলল,
“কি চাও সেটা সরাসরি আমায় বলতে পারো না?তোমায় তো বলে দিয়েছি তোমার জন্য আমার জান হাজির সেখানে শুধুমাত্র সামান্য প্রশংসাটুকু করতে পারব না?”
“আমি চেয়েছি নাকি আপনার থেকে প্রশংসা?”
“চেয়েছো তো।শুধু বলতে পারোনি।”
“এতই যখন সব বোঝেন তাহলে করছেন না কেন?”
“তুমি যখন আমার সাথে রেগে কথা বলো আমার ভীষণ ভালো লাগে।তোমায় আরো বেশি ভালোবাসতে ইচ্ছে করে আমার।জানো তোমার সব অদ্ভুত বিষয়গুলো দেখে আমার তোমায় ভালোবাসতে ইচ্ছে করে।প্রথমে তোমায় ভালোবেসেছিলাম তোমার কান্না দেখে আর বিয়ের পর তোমার রাগ দেখে তোমায় ভালোবাসি।”
জবা কিঞ্চিৎ বিরক্তি মাখা গলায় বলল,
“যত সব আজেবাজে কথাবার্তা!”
কথাটা বলে জবা অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিল।মতিউর আলতা হেসে বলল,
“আমার জবা যতটা সুন্দর তার হাতের রান্নাও ঠিক ততটাই সুন্দর।”
জবার ভালো লাগলো কি লাগলো না সেই অনুভূতিটুকু মতিউর কে বোঝার সুযোগ দিলো না,কিছু বলল না মুখ ফুটে।মতিউর পুনরায় বলল,
“কিন্তু কথা হচ্ছে আমি তো তোমায় রান্নাঘরে যেতে বারণ করেছিলাম,তাহলে কেন গিয়েছিলে?অনেক মানুষ আছে এসব করার জন্য।তোমায় কষ্ট করতে কে বলেছে?”
“মা বলেছিল আজ সকালে সবার জন্য আমায় রান্না করতে।”
“তোমার খুব কষ্ট হয়েছে তাই না এত মানুষের রান্না করতে?চিন্তা করোনা আমি মা কে বুঝিয়ে বলবো। এরপর থেকে আর বলবে না।”
মতিউরের কথায় জবা তুমুল আপত্তি করে বলে,
“একদম না।আপনাকে আমি বলেছি না এসব বিষয়ের মাঝে আপনি আসবেন না।এমনিতেই কালকের করা আপনার কাজের জন্য ভাবীরা আমার সাথে কথা বলছে না ঠিকঠাক করে।কথায় কথায় খোঁচাচ্ছে।আমার এসব ভালো লাগেনা।”
মতিউরের মুখে মৃদু রাগ ফুটে উঠলো।হালকা রাগী গলায় বলল,
“ওরা যে তোমার সাথে খারাপ আচরণ করছে আমায় আগে বলোনি কেন?”
“চুপ করুন তো আপনি।আর শুনুন এসব ব্যাপারে আপনি একদম ঢুকবেন না।আর মা কে তো এ বিষয়ে কোনমতেই কিছু বলবেন না।”
“কিন্তু তোমার তো কষ্ট হবে?”
জবা স্মিত হেসে বলল,
“সংসার তো করতেই হবে।এখন আমার সংসারে যদি আমার একটু কষ্ট হয় তো হলো।এমনিতেও এই সংসার ছেড়ে তো যেতে পারবো না।”
“সবটাই বাধ্যবাধকতা?একটুও কি ভালোবেসে থাকা যায় না?”
“আপনি বোধহয় আমার কথাটা ঠিকভাবে শোনেন নি।যদি শুনতেন তাহলে এই কথাটা বলতেন না।”
মতিউর ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,
“কি?”
“আমি বলেছি আমার সংসার।যদি এখনো সবটা বাধ্যবাধকতা হতো তবে আমি এই সংসারটাকে নিজের বলতাম না।এখন আমি সবটা মেনে নেওয়ার চেষ্টা করছি।কেননা আমার সবটা মানিয়ে নেওয়ার সাথে আরো দুটো জীবন জড়িয়ে আছে।আমি ধীরে ধীরে সবকিছুকে আপন করে নেওয়ার চেষ্টা করছি।”
“আমাকেও?”
“সবকিছুর মাঝে আপনিও পড়েন।”
“তারমানে আমাকে ভালোবাসবে?”
উত্তরটা শোনার জন্য জবা মতিউরের মুখে তীব্র কৌতুহল দেখতে পেল।ব্যাপারটা ভাবতেই কেমন যেন অদ্ভুত লাগছে জবার কাছে যে ওর ভালোবাসা পাওয়ার জন্য কেউ এতটা উদ্বিগ্ন।জবাকে চুপ করে থাকতে দেখে মতিউর তাড়া দিয়ে বলে উঠলো,
“কি হলো বলো ভালোবাসবে আমায়?সুজনকে যতটা ভালোবাসো ততটা ভালোবাসবে নাকি তার থেকেও বেশি?”
“সুজন কে যতটা ভালোবেসেছিলাম তার থেকে বেশি আর কাউকে ভালোবাসা সম্ভব না।আর সুজনকে যেমন ভাবে ভালোবেসেছি তেমনভাবে আপনাকে কখনোই ভালোবাসবো না।”
মতিউরের মুখটা ছোট হয়ে এলো।যেই ক্ষুদ্র একটা আশার আলো দেখেছিল সেটা আবার দপ করে নিভে গেল।মতিউরের বিরস মুখটার দিকে তাকিয়ে জবা বলে উঠলো,
“আমার পুরো কথাটা তো শুনুন।”
“বলো।”
“সুজন কে হারিয়েছি আমি।নিজের সবটা দিয়ে ভালোবেসেও হারিয়েছি।আপনি কি চান আপনাকেও আমি হারিয়ে ফেলি?”
মতিউর তৎক্ষনাৎ আপত্তি জানিয়ে বলল,
“কখনোই না।”
“তাহলে আমি সুজনকে কতটা ভালোবাসতাম,কেমন করে ভালোবাসতাম সেসব কথা বাদ দিন।যদি সম্ভব হয় আমার দ্বারা তবে আপনাকে নতুন করে ভালোবাসবো।”
_______
নদীর পাড়ে উঁচু ঢিবির মতন জায়গায় সবুজ ঘাসের উপর বসে আছে জুঁই।চোখে মুখে তার একরাশ দুশ্চিন্তার ছাপ ফুটে উঠেছে।মুখে একটুও হাসি নেই। চঞ্চল মেয়েটা একদম শান্ত হয়ে গেছে।জহির গেছে নদীর ওপারে কি যেন কাজে।ওর জন্যই অপেক্ষা করছে।আজ সকাল থেকে দেখা হয়নি।এলে একটু কথা বলবে তবে না একটু শান্তি পাবে।জহিরকে তো বলতেও পারবেনা যে জুঁইয়ের বিয়ে ঠিক করেছে।পাগল ছেলেটা দুশ্চিন্তা করবে অযথা।তার থেকে ভালো জুঁই সবটা সামাল দিক।জুঁইয়ের এসব ভাবনার মাঝেই কোথা থেকে যেন সুজন এসে ওর পাশে বসলো।হঠাৎ করে বসায় জুঁই মৃদু কেঁপে উঠলো।পাশ ফিরে সুজনকে দেখতেই আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল।কিছু বলতে মন চাইলো না,আবারও নদীর দিকে মনোযোগ নিবদ্ধ করলো।
সুজন বেশ অবাক হলো জুঁই কিছু না বলায়।জিজ্ঞেস করলো,
“কিছু ভাবছো নাকি জুঁই?”
“না।”
“উঁহুম।নিশ্চয়ই কিছু ভাবছো।দুশ্চিন্তা করছো কিছু নিয়ে তাই না?”
জুঁই এবারে কোন উত্তর দিল না।সুজন পুনরায় বলে উঠলো,
“জানি হয়তো তোমার দুশ্চিন্তার সমাধান দিতে পারব না।তবে আমার সাথে একটু ভাগ করলে দুশ্চিন্তা কমবে।কিংবা বলা যায় আমি হয়তো তোমায় সমাধানের কোন পথ খুঁজে দিতে পারলাম।”
জুঁই একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলল,
“আমায় একটা কথা বলবে সুজন ভাই?নিজের ভালোবাসার মানুষটাকে হারালে ঠিক কতটা কষ্ট হয়?বাঁচার ইচ্ছে কি হারিয়ে ফেলি আমরা?তখন যেই যন্ত্রণাটা হয় সেটা কে কি মৃত্যুর যন্ত্রণার সাথে তুলনা করা যায়?”
জুঁইয়ের প্রশ্ন শুনে সুজনের বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।নিজের ভালোবাসার মানুষটাকে হারানোর যন্ত্রণা যে ঠিক কার সাথে তুলনা করবে সুজন সেসব ভেবে পায় না।আগে তো কখনো এতটা যন্ত্রণা হয়নি যে কোন কিছুর সাথে তুলনা করতে পারবে।
“এই যন্ত্রণাটা তুমি কারো সাথে তুলনা করতে যেও না জুঁই।তুমি শুধু একবার কল্পনা করে দেখোতো যে তোমার ভালোবাসার মানুষটা তোমার থেকে দূরে সরে গেছে তাহলে ঠিক কতটা কষ্ট হবে?আর বাস্তবে যখন সত্যি সেই মানুষটা তোমার থেকে হারিয়ে যায় তখন সেই যন্ত্রণা তোমার সেই কল্পনার যন্ত্রণার থেকেও হাজার গুণ বেশি হয়।তাহলে বল সেই যন্ত্রণাটা কি আদৌ কারো সাথে তুলনা যোগ্য?”
জুঁই দুদিকে মাথা নাড়িয়ে না বোধক উত্তর জানিয়ে বলল,
“তাকে কি সারা জীবন নিজের কাছে রাখার কোন উপায় নেই?কেন হারিয়ে যায়?”
সুজন এবার শব্দ করে হেসে উঠে বলল,
“কার থেকে তুমি কিসের সমাধান চাইছো?যে নিজেই নিজের ভালোবাসার মানুষটাকে হারিয়ে নিঃস্ব,কাঙ্গাল হয়ে গেছে?এই বিষয়টায় অন্তত আমার থেকে কিছু জানতে চেয়ো না।কেননা যদি এর কোন সমাধান আমার জানা থাকতো তাহলে আজ জবা আমার ঘরে থাকতো,অন্য কারো ঘরে না।”
“আব্বা আমার বিয়ে ঠিক করেছে।”
কথাটা শুনতেই সুজন চমকে উঠল।বিস্ফোরিত নয়নে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো,
“কি বলছে এসব?কার সাথে আর কবে ঠিক করলো?”
“আমাকে আজকে জানালো।নাদিমের সাথে।আমাদের গ্রামের হাই স্কুলের মাস্টার যার বোনের বিয়েতে গিয়েছিলাম সেদিন সবাই মিলে।”
“তো এখন কি করবে?”
“জানিনা।নাদিমের সাথে কথা বলেছি।আমায় আশ্বস্ত করেছে যে এই বিয়েটা ভাঙবে।এখন জানিনা কি হবে।”
“শুধু কি ওনার উপর ভরসা করে বসে থাকা ঠিক হবে জুঁই?”
“তাহলে কি করব?”
“আমার মনে হয় তোমার আর জহিরের ব্যাপারটা এখন সবাইকে জানিয়ে দেওয়ার সময় এসেছে।না হলে কিন্তু পরে দেরি হয়ে যাবে।”
জুঁই অসহায় গলায় বলল,
“কি করে বলি সুজন ভাই?তুমিও এটা খুব ভালো করে জানো আর আমিও খুব ভালো করে জানি যে কেউ এই সম্পর্কটা মেনে নেবে না।কালাকে নিয়ে আমি এখন কি করি বলোতো?”
“তোমার হাতে দুটো উপায় আছে।এক জহিরকে ভুলে গিয়ে যার সাথে তোমার বিয়ে ঠিক করেছে তাকে বিয়ে করে নাও।নয়তো জহিরের সাথে পালিয়ে যাও।”
“প্রথম উপায় টা কখনই সম্ভব না।আমি ম/রে যাব তবু জহির কে ভুলে অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারব না।আর আমি খুব ভালো করে জানি যদি আমার জহিরের সাথে সংসার করতে হয় তবে পালিয়ে যেতে হবে।”
সুজন কিছু একটা ভেবে বলল,
“মতিউর সাহেব কে বলবে উনি সাহায্য করতে পারবেনা তোমাদের?”
“এখনই বলি না দুলাভাইকে।এমনিতেই আপা আর দুলাভাইয়ের সংসারে অনেক অশান্তি,ঝামেলা।ওদের দুজনের সম্পর্কই তো ঠিক নেই এই নিয়ে দুলাভাই সবসময়ই চিন্তার মাঝে থাকেন,মন খারাপ থাকে।এর মাঝে আর আমার এই ঝামেলাটা না বলি।আগে দেখি আমি সামলাতে পারি কিনা।যদি না পারি তখন না হয় দুলাভাইকে বলব কেমন।”
“আচ্ছা ঠিক আছে।”
“ওহ্ সুজন ভাই তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করার ছিল।”
জুঁইয়ের কন্ঠ আর ভাব ভঙ্গি দেখে মনে হলো সাংঘাতিক কোনো গুরুত্বপূর্ণ কথা বলার আছে।
“হ্যাঁ বলো।”
“রেদওয়ান নামের কাউকে চেনো তোমাদের গ্রামের?পুরো নামটা মনে আসছে না।”
সুজন কে মাথায় বেশি জোর দিতে হলো না মনে করার জন্য।মানুষটার সাথে তো আর কম দিনের পরিচয় না।ভীষণ কাছের একজন মানুষ।তবে জুঁই এই মানুষটাকে কি করে চিনল আর তার সম্বন্ধে প্রশ্ন করছে কেন এই কথাটা সুজনের ঠিক মাথায় আসছে না।
“হ্যাঁ চিনি,কিন্তু তুমি চিনলে কি করে?”
“ওই যে নাদিমের বোনের বিয়েতে গিয়েছিলাম ওখানে দেখা হয়েছিল।”
সুজন বিস্মিত কন্ঠে বলল,
“তুমি চিনলে কি করে ওনাকে?আগে থেকে চিনতে নাকি?”
“আরে না।আমি কি করে ওনাকে চিনবো?বড় ভাবির সাথে কথা বলছিলেন পরে আমি গিয়ে ওনার থেকে ওনার নামটা শুনি।”
মুক্তার সাথে রেদওয়ান কথা বলছিল কথাটা শুনতেই সুজন আতঙ্কিত গলায় বলল,
“বুবুর সাথে কথা বলছিল মানে দুলাভাই দেখেনি তো?”
“দেখেছে তো।”
“কিছু বলেনি?”
“বড় ভাইজান কি স্বাভাবিকভাবে কিছু বলতে পারে যে তুমি আশা রাখছো কিছু বলবেনা?ওখানে তো হালকা পাতলা একটু বকাঝকা করলো।পরে বাড়ি ফিরে কিছু করেছে কিনা আমি জানিনা।এখন আমায় বলো উনি বড় ভাবিকে ভালোবাসতেন তাই না?”
জুঁই এর থেকে কখনোই কোন কিছু লুকানোর প্রয়োজন মনে হয় নি সুজনের।মেয়েটা পর হলেও বড্ড আপন লাগে।আর সুজন এই ব্যাপারে একেবারে নিশ্চিত যে ওদের সমস্যা হতে পারে এমন কোন কাজ জুঁই করবে না।হতাশার শ্বাস ফেলে বলল,
“হ্যাঁ।এমনকি রেদওয়ান ভাই আর বিয়েও করেনি।”
জুঁই এবারে কিঞ্চিত রাগান্বিত গলায় বলল,
“তোমরা কি পাগল সুজন ভাই?এমন একটা ভালো মানুষকে রেখে আমার ভাইজানের সাথে তোমরা কি করে বিয়ে দিলে ভাবির?যে মানুষটা এতটা ভালোবাসতো ভাবি কে এবং এখনো বাসে একবার ভাবো তো কতটা না সুখে রাখত!আর এখানে ভাবি কি পেয়েছে?কেন তোমরা এই ভুলটা করলে?”
“আব্বা-আম্মা মেনে নেয়নি।রেদওয়ান ভাই এতিম।ছোটবেলা থেকে এর ওর জায়গা জমিতে টুকটাক কাজ করে নিজের খাবারের খরচটুকু কোন মতে জোগাড় করতো।তবে হ্যাঁ পড়াশোনাটা করেছে।নিজে সারাদিন কষ্ট করে খাটাখাটনি করার পর রাতে এসে পড়েছে।আব্বা-আম্মা বুবু কে ওনার হাতে তুলে দেওয়ার সাহস পায়নি।বলেছিল আগে একটা চাকরি যোগাড় করতে।সেই চাকরি জোগাড়ের আশায় রেদওয়ান ভাই শহরে গিয়েছিল।একটা চাকরি পেয়েও গিয়েছিল জানো কিন্তু ফিরে এসে দেখল বুবুর বিয়ে হয়ে গিয়েছে।”
“কি বলছো?ওনাকে সময়টা তো অন্তত দেওয়া উচিত ছিল চাকরিটা খুঁজে বের করার?এটা কিন্তু ঠিক হয়নি ওনার সাথে।”
সুজন তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
“পেটের জ্বালা খুব ভয়ানক জুঁই।বড় ভাই শহরে কাজ করে যেটুকু টাকা বাড়িতে পাঠাতো তা দিয়ে সংসার চলতো না।আব্বাও কাজ করার শক্তি হারিয়েছে,আমি তখন ছোট।এর মাঝে অ্যাক্সিডেন্ট করে বড় ভাই মা/রা গেলেন।সাতটা মানুষের সংসার কি করে চলে?মাতব্বরের ছেলের সাথে বিয়ের সম্বন্ধ এসেছে।কিছু না হোক অন্তত পরিবারের একটা মানুষ অন্তত ভালো খাবার পাবে এই আশাতেই বিয়েটা দিয়েছিল বুবুর।”
“ভাবিও রেদওয়ান ভাইয়ের জন্য অপেক্ষা করেনি?”
“না।বুবুর মনে রেদওয়ান ভাই কে নিয়ে কখনো তেমন কোনো অনুভূতি ছিলই না।বিয়ে দিলেও ঠিক ছিল,না দিলেও সমস্যা ছিল না।”
“একটা কথা বলি তোমায়?”
“বলো।”
“ভাবির ওনার সাথে বিয়ে দিয়ে দেই আমরা চলো।”
সুজন বিস্ফোরিত নয়নে জুঁইয়ের দিকে তাকাতেই জুঁই হেসে ফেলল।জুঁই এর হাসি দেখে সুজনও হেসে উঠে বলল,
“মাথা মনে হয় তোমার খারাপ হয়ে গেছে জুঁই।”
“না সুজন ভাই আমি কিন্তু সত্যি কথাটা বললাম।”
সুজন আবারও হেসে উঠে জুঁই এর কথাটা হাওয়ায় উড়িয়ে দিল।ওদের এসব বিষয়ে গভীর আলোচনার মাঝে কোথা থেকে যেন রুমি হাজির হলো।মেয়েটা এসে জুঁইয়ের পাশে না বসে সরাসরি বসলো সুজনের পাশে।রুমি বসতেই সুজন লাফিয়ে উঠে পড়ল।মৃদু রাগান্বিত গলায় বলল,
“এভাবে গা ঘেষে বসছো কেন?আর বসার আগে একবার অনুমতি নেবে তো?”
“কেন গো সুজন মিয়া এই জায়গাটা কি তোমার নাকি নাম লেখা আছে কোথাও যে আমি বসতে পারবো না?”
“জায়গাটাতে বসা নিয়ে সমস্যা নেই কিন্তু যেহেতু আমি বসে আছি তাই আমার গা ঘেষে বসার আগে তোমার উচিত না আমায় বলা?এক্ষেত্রে আমার অনুমতি তোমায় অবশ্যই নিতে হবে।জায়গাটা আমার না হলেও শরীরটা কিন্তু আমারই।”
“আচ্ছা হয়েছে।সারাক্ষণ এত ঝগড়া করো কেন? আমি কি তোমার সতীন নাকি?”
“খালি আজেবাজে কথা।”
“আচ্ছা যাই হোক একটা কাজের কথা বলি।তা বলো আজ চোখে সুরমা পড়োনি কেন?কেমন খালি খালি লাগছে চোখ দুটো।”
“তাতে তোমার কি?”
“আরে আমার কি মানে?তোমার এসব ছোটখাটো বিষয় তো আমাকেই খেয়াল রাখতে হবে গো সুজন মিয়া।আমি ছাড়া আর কে আছে তোমার?”
জুঁই খুব মনোযোগ দিয়ে সুজন আর রুমির কথোপকথন খেয়াল করল।এক পর্যায়ে সন্দেহী গলায় প্রশ্ন করলো,
“কি চলছে তোমাদের দুজনের মাঝে?”
সুজন পাল্টা প্রশ্ন করে বললো,
“কি চলছে?”
“সেটাই তো জিজ্ঞেস করছি কি চলছে?এই রুমি তুই বলতো কি চলছে?”
রুমি মিটি মিটি হেসে বলল,
“যা চলার কথা তাই চলছে।”
“মানেটা কি?”
“মানেটা হলো আমি সুজন মিয়ার বউ হওয়ার চেষ্টা করছি রে জুঁই কিন্তু তোর সুজন ভাই বড্ড ত্যাড়া। আমাকে পাত্তাই দেয় না।”
সুজন বিরক্তিকর গলায় রুমি কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“সব সময় কিন্তু এই এক কথা ভালো লাগে না রুমি। তোমাকে কতবার আমি বলেছি যে তুমি যা চাইছো তা সম্ভব না।কথা বোঝো না?”
“আমিও তো তোমায় বলেছি যে আমি যা চাই তাই সম্ভব।তুমি আমার কথা বোঝো না?”
সুজন আর কথা বাড়ালো না।অযথা তর্ক করা তার স্বভাবে নেই।জুঁই কে আসছি বলে সেখান থেকে চলে গেল।জুঁই এবার রুমি কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“তুই সুজন ভাইকে পছন্দ করিস আগে তো আমায় বলিস নি?”
“বলার সুযোগ টা পেলাম কই?যবে থেকে একটু ওকে পছন্দ করা শুরু করেছি তারপরে তো জানতে পারলাম যে সুজন মিয়া নাকি জবা আপাকে ভালোবাসে তাই আর নিজের কথাটা বলার সুযোগ পাইনি।এখন যখন দেখলাম আমার রাস্তাটা পরিষ্কার তখন ভাবলাম সুযোগ বুঝে ঢুকে যাই।”
“বোধহয় এতটা সহজ হবে না রুমি।”
“জানি তো সহজ হবে না।কিন্তু চেষ্টা করতে ক্ষতি কি?একটু চেষ্টা করে যদি জীবনে সুজন মিয়ার মতন কাউকে পেয়ে যাই তবে তো সেই চেষ্টাটুকু স্বার্থক।”
চলবে?

