প্রেমের ঘাটের মাঝি #পর্ব ২৩ #লেখনিতে খুশবু আকতার

0
133

#প্রেমের ঘাটের মাঝি
#পর্ব ২৩
#লেখনিতে খুশবু আকতার

“শুনুন?”

জবার মিষ্টি কন্ঠের ডাকে মতিউর মিষ্টি করে জবাবে বলল,

“হ্যাঁ বলুন।”

“ধ্যাৎ! আপনি কেন আপনি করে ডাকছেন?”

“তুমি আপনি করে ডাকলে তাই।”

“সেটা তো আমি সবসময়ই ডাকি।”

“তাহলে আমিও তোমায় এখন থেকে সব সময় আপনি করেই ডাকবো।”

“ভুলেও না।মা শুনলে খারাপ হয়ে যাবে।”

“এতদিনেও তোমারে অন্যের ভয় গেল না জবা।কতদিন আর ভরসা দেবো বলোতো যে আমি আছি?”

“আপনি আছেন সেটা আমিও জানি। তাই বলে সবসময় এমন অন্যদের কথা শোনার থেকে আমাকে বাঁচাতে হবে না।সংসার করতে গেলে মাঝে মাঝে অমন একটু দু-চারটে কথা শুনে নিতে হয়।অন্তত শাশুড়ির কথা তো অবশ্যই শুনতে হয়।”

“এসব নিয়ম অন্যদের বউয়ের ক্ষেত্রে চললেও চলতে পারে তবে আমার বউয়ের ক্ষেত্রে চলবে না। আমি আমার বউ এর সাথে একটু রাগী গলায় কথা বলি না আর অন্যদেরকে কথা বলতে দেবো ভাবলে কি করে? শোন জবা আমার বউ আমার খুব শখের।আর আমার শখের জিনিসের আমি খুব যত্ন নেই।”

জবা হার মেনে নিল।এই পাগলটাকে বুঝিয়ে কোন লাভ নেই।

“আচ্ছা ঠিক আছে যা ইচ্ছে করবেন।আপনাকে আমার একটা কথা বলার ছিল।”

“হ্যাঁ বলো।”

জবা ইতস্তত গলায় বলল,

“আমায় একবার শ্যামলডাঙ্গা গ্রামে নিয়ে যাবেন?”

“এই অবস্থায়?”

“যাবেন না নিয়ে?”

“আমার নিয়ে যেতে অসুবিধা নেই কিন্তু এই অবস্থায় নিয়ে যাওয়াটা কি ঠিক হবে? নদী পার হয়ে যেতে হবে।আম্মা তো বলল এই সময় নাকি নদী পার হওয়া ঠিক না।তার মধ্যে জায়গাটাও ভালো না।”

“আমি দোয়া দরুদ পড়ে বের হব।সারা রাস্তা আল্লার নাম নিয়ে যাব কিছু হবে না। চলুন না নিয়ে!খুব যেতে ইচ্ছে করছে।”

“হঠাৎ কেন এত যেতে ইচ্ছে করছে?এখন তো আর আম্মাও।নেই জামশেদের মুখ দেখতে যাবে?”

“জানি আমার আম্মা নেই,আব্বাও নেই কিন্তু ওদের কবরটা তো আছে।খুব দেখতে ইচ্ছা করছে। জানেন আজ স্বপ্নে আব্বাকে দেখেছি।খুব আদর করছিলো আমায়, আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল।আম্মা ছিল না। আমি আম্মাকে খুঁজছিলাম।পরে আব্বা আমার হাত ধরে বলল চলো আম্মার কাছে নিয়ে যাচ্ছি।”

জবার স্বপ্নের বিবরণটা শুনে মতিউরের গলাটা কেমন শুকিয়ে এলো যেন।একটা শুকনো ঢোক গিলে বলল,

“এসব কি আজেবাজে স্বপ্ন?আর আম্মার কাছে নিয়ে যেতে হবে কেন?তোমাকেও বলি আব্বা একা আদর করছিল হচ্ছিল না আম্মুকে খুঁজতে হবে কেন?”

জবা ভরকালো মতিউরের এমন কথায় আর আচরণে।

“স্বপ্নের উপরে কি আমার নিয়ন্ত্রণ থাকে নাকি? আমি কি করে আমার স্বপ্ন নিয়ন্ত্রণ করবো?”

“তাই বলে আব্বা যেখানে নিয়ে যাবে সেখানেই যেতে হবে? পাগল নাকি তুমি?আবার সেই খারাপ স্বপ্নের কথা আমাকে বলছো?ধুর ভালো লাগে না।”

মতিউরের এত বিরক্তি আর ভয়ের কারণটা এবারে জবা বুঝল।এগিয়ে এসে মতিউরের পাশে বসলো। মতিউরের হাতের উপর হাতটা রেখে শান্ত গলায় বলল,

“ভয় পাচ্ছেন কেন অযথা্ ওটাতো কেবল স্বপ্নই ছিল। আর আপনি জানেন সব স্বপ্ন সত্যি হয় না।”

“যে স্বপ্নগুলো সত্যি হোক আমরা চাই না সেগুলোই সত্যি হয়ে যায়।এমন স্বপ্ন আর কখনো দেখবে না।আর এসব কি শরীর ভালো লাগছে না? ভালো লাগবে না কেন?কি সমস্যা হচ্ছে আমায় বলো? কালই তোমায় শহরে নিয়ে গিয়ে ভালো ডাক্তার দেখাবো।আগামী কয়েক মাস আমরা শহরেই থাকবো।এই গ্রামে যখন তখন ডাক্তার পাওয়া যায় না,হাসপাতালে অনেক দূরে। তোমায় নিয়ে আমি কোন ঝুঁকি নিতে পারবো না।”

“যা ইচ্ছে তাই করবেন কিন্তু আমায় সাথে একবার শ্যামলডাঙ্গা গ্রামে নিয়ে চলুন।আমি আব্বা আম্মার কবর দেখতে চাই।খুব মনে পড়ছে ওনাদের কথা।ছোট ভাইজান আছে।ওনার সাথেও দেখা করতে চাই।চলুন না নিয়ে।অনুরোধ করছি আপনাকে।আর কিছু চাইবো না কখনো।”

মতিউর অসহায় গলায় বলল,

“এভাবে অনুরোধ করছ কেন?তুমি জানো তোমার কথা আমি ফেলতে পারিনা,আবার আমার নিয়ে যেতেও মন চাই দিচ্ছে না।তোমায় দেখে মনে হচ্ছে তোমার শরীরটা ভালো না।আমারই ভুল হয়েছে।তোমার বয়স এখানো কম,এখনই এসব বাচ্চাকাচ্চার কথা আমার ভাবা উচিত হয়নি।”

“আহা!আবার ওকে দোষারোপ করছেন কেন?আমি বলছি তো কিছু হবে না।আপনি শুধু মা কে রাজি করিয়ে নিন কোনমতে।”

অবশেষে জবার জোরাজুরিতে মতিউর কে হার মানতে হলো। কি করবে,এই মেয়েটার কোন অনুরোধ যে ফেলতে পারে না।জবা বায়না ধরলো আজই যাবে।মতিউর তাই গেল মমি খাতুন এর কাছে অনুমতি নেওয়ার উদ্দেশ্যে।যদিও তিনি অনুমতি দিলেন না তবে মতিউরও এখন আর ওনার অনুমতির অপেক্ষায় থাকে না।শুধু ঘটনাগুলো জানায়। কেননা জবার ব্যাপারে তিনি কোন কিছুতেই অনুমতি দেন না।তার বোধহয় ইচ্ছে তার ছেলের বউ সারা জীবন বাড়ির ভেতরেই বসে থাকবে আর তার কথায় উঠবে বসবে।মমি খাতুন এর ঘর থেকে বেরিয়ে উঠোন পেরিয়ে নিজের ঘরে আসতেই কান্তার মুখোমুখি হলো মতিউর।কান্তার হাতে থাকা দুধের গ্লাসটা মতিউরের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

“এইডা জবারে দিও।ওর খাওন লাগবো এইসব।”

কান্তা কে দেখেই মতিউরের চোখে মুখে রাগ ফুটে উঠেছে। ওর হাতে থাকে দুধের গ্লাসটা মাটিতে ছুঁ/ড়ে মে/রে বলল,

“আপনি ভাবলেন কি করে ভাবি যে এখনো আপনার দেওয়া খাবার আমি আমার স্ত্রী সন্তানকে খাওয়াবো?কি চাইছেনটা কি আপনি? শুধু আপনি না আপনারা দুজনে চাইছেনটা কি বলুন তো?কি ক্ষতি করেছি আমি আপনাদের?কখনো কি কোন কিছুর অভাব রেখেছি, কোন কিছু নিয়ে খোটা দিয়েছি?তাহলে অযথা আমার বউ বাচ্চার পিছনে পড়ে আছেন কেন?কিসের এত ভয় আপনাদের?আমি আমার ভাইদের,আপনাদের,আমার ভাইয়ের ছেলেমেয়েদের কি ফেলে দিতাম?আরে ওরা আমারও সন্তান।”

“মানতাছি ভুল করছি হের লাইগা তো ক্ষমা চাইছি তোমার কাছে,জবার কাছেও চাইছি।আর কখনো করুম না এমন।”

“আর কখনো করলে ছেড়েও দেব না আমি।আমার এখনো ভাবতে অবাক লাগে যে আপনারা জবার যেন কখনো সন্তান না সেজন্য ওকে কি সব আজেবাজে ওষুধ খাওয়ানোর চেষ্টা করেছেন।আপনারা নিজেরাও তো মা।এতটা নোংরামি করতে কি একটুও বিবেকে বাধলো না?”

“ভুল তো মানুষ মাত্রই হয়, আমরাও করছি। তাই বইলা কি এখন সারাজীবন দোষারোপ করবা তুমি মতিউর? ক্ষমা করণ যায় না কি?”

“সে আশা ত্যাগ করুন।আমার সাথে কিছু করলে তাও ক্ষমা করার কথা ভাবতাম কিন্তু আপনারা হাত বাড়িয়েছেন আমার স্ত্রী আর সন্তানের দিকে।আমার থেকে ক্ষমা পাওয়া অসম্ভব সে আপনারা যদি এখন আল্লাহর অলিও হয়ে যান তাও ক্ষমা পাবেন না।”
_______
“রুমি!”

দরজায় দাঁড়িয়ে রুমির নাম ধরে একবার ডাকলো সুজন।রুমির চিঠিতে উল্লেখ করা তারিখ অনুযায়ী তো আজকেই ওর বিয়ে।তাহলে বাড়িঘর সাজানো নেই কেন?বিয়ের কোন আমেজ নেই, কোন হৈচৈ শব্দ নেই কেন?সুজনের বুকটা কেঁপে উঠলো। তবে কি ও আসতে দেরি করে ফেলল?রুমি কি তাহলে অঘটনা ঘটিয়ে ফেলেছে?না আর দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না সুজন।কারো অনুমতি না নিয়ে ভিতরে গিয়ে রুমির নাম ধরে বেশ জোরে জোরে ডাকলো।

রুমি তখন নিজের ঘরে বিছানায় শুয়ে আছে। অপেক্ষা করছি সুজনের।রুমি জানে সুজন আসবেই।মানুষটার উপর থেকে বিশ্বাস যে কমেই না।ঠিক সেই মুহূর্তেই একটা ডাক ওর কানে ভেসে এলো। প্রথমে ভাবলো মনের ভুল। কেননা এমনটা আজকাল প্রায়ই হয়। তবে না, ক্রমেই গলার শব্দ টা জোরালো হচ্ছে।বারবার ডেকেই যাচ্ছে রুমির নাম ধরে।রুমি লাফ দিয়ে উঠে বসলো। চোখ দুটো বন্ধ করে ভালোভাবে আরো একবার কন্ঠটা শোনার চেষ্টা করলো। উপলব্ধি করতে চাইলে আসলে এই কন্ঠটা কার।কন্ঠটা যে সুজনের সেটা বুঝতে পেরেই দৌড় লাগালো ঘর থেকে।উঠোনে গিয়ে অগোছালো সুজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল,যার চোখে মুখে তীব্র উৎকণ্ঠা আর ভয়।রুমির অজান্তেই দুচোখ ছাপিয়ে গাল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।আজ কতগুলো দিনের অপেক্ষার অবসান ঘটলো।সুজন ভরসা রেখেছে রুমির।তবে একটু বেশিই অপেক্ষা করালো বোধহয়।রুমি ধপ করে উঠোনের উপরে বসে পড়ল।ক্রন্দনরত গলায় বলল,

“এতটা অপেক্ষা কেউ করাই সুজন মিয়া?তুমি জানো আমি কতটা অধৈর্য।তবুও এতগুলো দিন আমায় অপেক্ষা করালে?না নিজের কোন খোঁজ দাও, না আমার কোন খোঁজ নাও।তোমার হৃদয় এতটা পাথর হয়ে গেছে?তবে আজ কেন এলে?”

“আমি মানুষটা যে ম/রে গেছি রুমি।আর মৃ/ত্যু যন্ত্রণা আমি বুঝি।তোমায় আর মা/রতে চাইলাম না.অন্তত আমার কারণে তোমার মৃ/ত্যু হোক সেটা মেনে নিতে পারছিলাম না আমি।”

রুমি ডুকরে কেঁদে উঠে বলল,

“আজ তুমি না এলে এই অপেক্ষা চিরতরের জন্য ফুরাতো সুজন মিয়া।আমার ধৈর্যের বাধ ভাঙতো।এই পৃথিবীতে আমার সময় ফুরিয়ে যেত।ভাগ্যিস তুমি তার আগেই চলে এসেছো।নিয়ে যাবে তা আমায় তোমার সাথে?”

সুজন দুই হাঁটু গেড়ে রুমির সামনে বসলো।রুমির যে কিছু হয়নি এজন্য ভীষণ খুশি লাগছে।নিজের প্রতি সুজন আজ আজ ভীষণ সন্তুষ্ট।মনে হচ্ছে কারো অন্তত জীবন বাঁচাতে পারলো।

“বিশ্বাস করে রুমি আমি আজ ভালোবেসে তোমায় বাঁচাতে আসিনি।চিঠিতে যখন লিখেছিলে তুমি যে,কবুল বলার আগ মুহূর্ত অব্দি তুমি অপেক্ষা করবে না হলে বি/ষ খেয়ে নেবে তখন শুধু আমার একটাই কথা মনে হচ্ছিল তোমাকে বাঁচাতে হবে। না হলে তুমি ম/রে যাবে.আর তোমাকে ম/রতে দিতে পারিনা আমি।জানো আমি আজো সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি।আমার বলতে কোন দ্বিধা নেই যে আমি এখনো জবাকেই ভালবাসি।আর আমি জানি তুমিও এটা খুব ভালো করেই জান আমি এখনো জবাকে ভালবাসি।তারপরও কেন অপেক্ষা করতে গেলে আমার জন্য?আমার থেকে অনেক ভালো কাউকে তুমি পেতে।”

“কিন্তু আমার যে তোমাকেই চাই।আমাকে নিয়ে চলো না। একবার যখন এসেছো আর ফেলে রেখে যেও না আমায় তাহলে কিন্তু আর ঘুরে এসে আমায় দেখতে পাবে না।চলো না সুজন মিয়া আমায় নিয়ে।তুমি জবা আপা কে ভালোবাসো আমি জানি কিন্তু তারপরও অপেক্ষা করেছি তোমার জন্য।আমি তাও তোমাকেই চাই।বিয়ে করে নেই চলো।”

“আজ তো তোমার বিয়ে ছিল তাহলে বাড়ি ঘর সাজানো নেই কেন?কোন তোরজোরই তো দেখছি না বিয়ের?”

“ দু’দিন পর তোরজোর হবে।”

“তবে মিথ্যা বললে কেন আমায়? চিঠিতে যে লিখেছিল ২৬ তারিখ তোমার বিয়ে?”

“ভুল বুঝোনা আমায়।ঐদিন পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে আমায়।আর আজ পর্যন্ত কেউ অপছন্দ করেনি আমায়, শুধু তুমি ছাড়া। আব্বা আমায় এবার বলে দিয়েছিল যদি ওরা পছন্দ করে তাহলে বিয়ে আমায় করতেই হবে না হলে আব্বা বি/ষ খাবে।আর আমি দুদিন আগের তারিখ বলেছিলাম কারণ ভেবেছিলাম যদি চিঠিটা পৌঁছাতে তোমার কাছে দেরি হয়ে যায় কিংবা ধরো তোমার আসতে দেরি হয়ে গেল সেই ভয়ে।

সুজন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“তোমার বাড়ির লোক কোথায়?তোমার আব্বা কে ডাকো।”

রুমও পাশে ইশারা করে বলল,

“ওই যে আব্বা দাঁড়িয়ে আছে। তুমি দেখোনি নাকি?সবাই আছে এখানে।”

সুজন চট করে উঠে দাঁড়ালো।খুব তাড়াতাড়ি নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে পাশে দাঁড়ানো রুমির আব্বাকে সালাম দিল।ভদ্রলোক গম্ভীর গলায় সালামের উত্তর দিয়ে সুজনের দিকে এগিয়ে এসে বললেন,

“তুমিই তাহলে সুজন?”

“জি আমি সুজন।”

“পরিবারে কে কে আছে?”

“মা-বাবা দুজনেই মা/রা গেছেন. দু বোন আছে ওদের বিয়ে হয়ে গেছে.আমি শহরে একাই থাকি. চাকরি করি,ভালো টাকা বেতন পাই।রুমি কে নিয়ে বিয়ের পর শহরেই থাকবো কোনো অসুবিধা হবে না। রুমি ছাড়া আপনার থেকে আর কিছু চাই না।আপনি স্বেচ্ছায় দিলেও আমি কখনো সেটা গ্রহণ করতে পারব না,তাই দয়া করে কিছু দেবেনও না।আমার কোন অভিভাবক নেই তাই নিজের বিয়ের কথা আপনাকে নিজেই বলছি।রুমির সারা জীবনের দায়িত্ব নিতে চাই আমি।আশা করছি এই বিয়েতে কোন আপত্তি নেই আপনার?”

ভদ্রলোক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

“আর আপত্তি করে কি করবো?মেয়ে যদি তোমার মাঝেই নিজের সুখ দেখে থাকে তবে আমি তাতেই রাজি।তবুও যে আমি বেঁচে থাকতে মেয়েটা সংসার করতে রাজি হয়েছে এটাই অনেক।এতগুলো দিন তো কম চেষ্টা করিনি অন্য জায়গায় বিয়ে দেওয়ার।অনেকবার ম/রারও চেষ্টা করেছে।হয়তো তোমার সাথে ওর বিয়ে ভাগ্যে লেখা ছিল জন্য আল্লাহ বাঁচিয়ে দিয়েছে।”

“আজই বিয়েটা করতে চাই আর আজই ওকে নিয়ে আমি শহরে চলে যাব।এই গ্রামে আমি থাকতে চাই না।”

ভদ্রলোক বোধহয় এত তাড়াহুড়োয় আপত্তি করতে চাইলেন তবে তার আগেই রুমি বলে উঠলো,

“আব্বা আপত্তি করো না।ও যা চাইছে তাই হোক। আজকে বিয়েটা দিয়ে দাও। বিয়ে তো দিতেই হবে বলো।আজ দিলেই কি আর কাল দিলেই কি।”

মেয়ের এমন কথায় ভদ্রলোক নিজেই লজ্জা পেয়ে গেলেন।রুমির মা চোখ রাঙ্গাতে রুমি থেমে গেল।ভদ্রলোক আর কথা বাড়ালো না। সুজনের কথাতেই রাজি হয়ে গেলেন।

_________
“এইভাবে টাকা পয়সা নষ্ট করা কি ঠিক হইতাছে? বাচ্চাকাচ্চার ভবিষ্যৎ এর কি হইবো?মাইয়াডার বিয়া দেওন লাগবো,পোলাডার কিছু ব্যবস্থা করন লাগবো।আর আপনে এইভাবে জুয়া খেইলা টাকা উড়াইতাছেন?”

কথাটা বলার সাথে সাথে জামশেদ ঠাস করে মুক্তার গালে একটা চ/ড় বসালো।হিংস্র গলায় বলল,

“আমার বাপের টাকা আমি যা ইচ্ছে তাই করবো। তোর বাপের বাড়ি থেকে নিয়ে আসিনি যে তোর জ্ঞান শুনতে হবে। আর আমার ছেলেমেয়ের ভবিষ্যৎ আমি বুঝে নেব।তোর না পোষালে বেরিয়ে যা।”

মুক্তা গালে হাত দিয়ে মেঝের দিকে দৃষ্টিপাত করে অশ্রু বিসর্জন দিয়ে বলল,

“আমি আপনার খারাপের লাইগা কই নাই।আপনি ভাবেন এইভাবে যদি আপনি জুয়া খেলে টাকা গুলা উড়ান তাইলে কয়দিন থাকবো এই সম্পত্তি? বুড়া বয়সে কি হইবো?ব্যবসাও ঠিকমতো করেন না সবকিছু জাফর রে দিয়া দিছেন।বাজারহাট ঠিকমতো করেন না, বাচ্চাদের পড়াশোনার খরচ দেন না,এমন করলে কেমনে চলবো কন তো?”

“আমার যা ইচ্ছা হয় তাই করবো।আর ওদের অত পড়াশোনা শিখিয়ে কি হবে।আরেকটু বড় হলে মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেব আর ছেলের চিন্তা করছিস কেন?ব্যবসা আছে না? ওখানে লাগিয়ে দেব।”

“তার লাইগাও তো পড়াশোনা জানা লাগবো নাইলে হিসাব করবো কেমনে?”

“তুই একটু বেশি জ্ঞান দিচ্ছিস না?জ্ঞান না দিয়ে খাবার দে।”

মুক্তা আর কথা বাড়ালো না,খাবার আনতে চলে গেল।জামশেদ যেই না একটু আরাম করে বিছানায় বসলো ওমনি পরিচিত একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো উঠান থেকে, যে জোরে জোরে জামশলদের নাম ধরে ডাকছে।কন্ঠটা কানে যেতেই বিরক্ত হলো।এই ছেলেটা যে এখনো কোন দুঃখে এই গ্রামে আসে বোঝে না জামশেদ।ইচ্ছা তো করলো যাবে না কিন্তু জামশেদ জানে যদি ও না যায় তবে মতিউরি চলে আসবে।বাধ্য হয়ে গেল।জামশেদ কে দেখতেই মতিউর এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরল ওকে।উচ্ছ্বসিত গলায় বলল,

“আরে সম্বন্ধি, কি খবর তোমার?জুয়া খেলে তো দেখছি শুকিয়ে গেছো?খালি কি হেরেই যাচ্ছো নাকি,জিততে পারছ না?”

“আমি শুকিয়ে যাই না মোটা হই তাতে তোমার কি?তোমার শরীর স্বাস্থ্য ঠিক থাকলেই তো তোমার হলো তাই না?”

“আহা রাগ করছ কেন?শোনো আজ তোমার সাথে বরং আমিও যাব।চিন্তা করো না তোমায় জিতিয়ে দেব।”

“কোন দরকার নেই।তুমি নিজের রাস্তা মাপো তো।
আর তুমি এই গ্রামে আসো কেন বারবার?কাজ নেই কোন?”

“আমিও সেটাই ভাবি জানো তো আমি কেন বারবার এই গ্রামে আসি। পরে মনে হলো কোন কিছু আমায় খুব টানে এই গ্রামে। অনেক ভাবার পর বুঝতে পারলাম জামশেদ আমায় টানে। এই গ্রামে যে আমার খুব ভালো একজন বন্ধু আছে।তোমায় বেশিদিন না দেখে থাকতেই পারি না।”

রাগে জামশেদের সর্বাঙ্গে যেন আ/গুন ধরে গেল। কোনমতেই মতিউরের কথা সহ্য করতে পারে না সে।এই মুহূর্তে তো মতিউরের মুখ থেকে বের হওয়া আর একটা শব্দও ওর পক্ষে সহ্য করা সম্ভব না।আবার কোন ঝামেলাও করা যাবে না মতিউরের সাথে।বাধ্য হয়ে আবার নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালে পিছন থেকে ফের মতিউর ডেকে উঠলে।তবে এবার তার কন্ঠে কোনো ঠাট্টা নেই।একটু গুরুতর ভঙ্গিতে বলল,

“জলিল তালুকদারের নাম এভাবে খারাপ করছ কেন?সম্মান অর্জন করা কিন্তু অত সহজ না।এক দুই দিনে উনি এই নামটা কামাননি।আজ তার মৃত্যুর দেড় বছর হতে চলল এর মাঝেই তার ছেলে হয়ে এভাবে তার সম্মান নিয়ে খেলছো?কি মনে হয় এসব জুয়া খেলা ভদ্র বাড়ির ছেলের কাজ?সম্পত্তি তো শেষে কিছুই থাকবে না।তালুকদার বাড়ির ছেলে কি ভিক্ষা করে খাবে?”

রাগে জামশেদের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো।পিছন ফিরে তাকিয়ে সাবধানী গলায় মতরকে বললো,

“মুখ সামলে কথা বলবে মতিউর।মানছি তুমি হয়তো আমার থেকে অনেক বেশি সম্পত্তির মালিক তাই বলে এখনো জামশেদ তালুকদারের এতটা খারাপ দিন আসেনি যে ভিক্ষা করে খেতে হবে।”

“আসতে কতদিন?”

“সে আমি বুঝে নেব।আর আমি কি করছি না করছি তার কৈফিয়ত তোমাকে দেবো না।আমার বাপের সম্মান আমি যা ইচ্ছে তাই করবো তুমি কে বলার?তুমি তোমার বাপের সম্মান যা ইচ্ছে তাই কর আমি কি তোমাকে কিছু বলতে গিয়েছি?কিছুক্ষণের জন্য এসে অযথা অশান্তি করো না।”

মতিউর এবারে শান্ত কণ্ঠে বললো,

“তোমার ভালোর জন্যই বলছি। দুটো ছেলেমেয়ে আছে, বউ আছে আজ যদি তোমার কিছু হয়ে যায় ওদের কি হবে ভেবেছো একবার?এইভাবে যদি টাকা-পয়সা ওড়াতে থাকো বুড়ো বয়সে গিয়ে আর কিছুই পাবে না তখন কি করবে?তখন এই দেমাগ কিন্তু পিছন দিয়ে বেরিয়ে যাবে।”

“পিছন দিয়ে বের হোক না সামনে দিয়ে বের হোক তোমাকে কিছু বলতে হবেনা।নিজের কাজ করো।”

কথাটা বলে জামশেদ চলে গেল।মতিউর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিরবির করে বলল,

“রুমি ঠিকই বলে। শা/লা জা*****ড়া জামশেদ।”

চলমান।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here