#প্রেমের ঘাটের মাঝি
#পর্ব ৩
#লেখনিতে খুশবু আকতার
জুঁই জহিরের জন্য সকালের খাবারও নিয়ে গেল।জহিরকে ঘরে পেল না।আরেকটু এগিয়ে গিয়ে দেখল নদীর পাড়ে নৌকা মেরামতের কাজ করছে।নাম ধরে ডাকতেই জহির উঠে এলো।
“সকালের খাবার খেয়ে নে,একটু পরে না হলে ডাক পড়বে তখন আর খেতে পারবি না।”
জহির খাবারটা হাতে নিয়ে জুঁইকে বলল,
“তুই কোথাও যাইতেছিস জুঁই?”
“হ্যাঁ।কলেজ মেরামতের কাজ কতদূর এগোলো সেটাই দেখতে যাচ্ছি।”
“আচ্ছা দেইখা শুইনা যাস।”
জহির আর কিছু বলল না।জুঁই আশা করেছিলে যে জহির নিজ থেকে একটু তার প্রশংসা করবে।অন্তত ওর দেয়া শাড়িটা যে পড়েছে সেই বিষয়টা খেয়াল করবে কিন্তু না এই ছেলের কোন দিকে খেয়াল নেই।জুঁই মৃদু রাগান্বিত স্বরে বলল,
“একবারও আমাকে দেখার প্রয়োজন বোধ করলি না?তোর দেয়া শাড়ি আমায় পড়ে কেমন লাগছে সেটা তো অন্তত বলতে পারতি।”
জহির আলতো হেসে তাকালো জুঁইয়ের দিকে।হুট করে জহিরের অভিব্যক্তি কেমন যেন বদলে গেল যা ভাবিয়ে তুললো জুঁইকে।অপেক্ষা করে জহিরের কিছু বলার।
“আমার তো তোরে সব সময়ই ভালো লাগে জুঁই।তুই কি ভাবিস তুই নতুন শাড়ি পইরা সুন্দর করে সাজলে আমার কাছে তোরে সুন্দর লাগে?না রে জুঁই,আমার কাছে তোরে সবসময়ই সুন্দর লাগে।”
“তো সেটা মুখে বলতে কি হয়?”
“সব কথা মুখে কওনের কি দরকার?নদীরেও তো আমি ভালোবাসি।হের লগে কথা না কইয়া থাকতে পারিনা।বর্ষাকালে যখন বৃষ্টি হইয়া চারিদিকে পানি দিয়া ভইরা উঠে তখন যে তারে দেখতে কি সুন্দর লাগে আমার চোখে সেইডা আমি কি কখনো তারে কইছি?এই নদী আমার প্রাণ রে জুঁই।কিন্তু তাও কখনো আমার ভালোবাসার কথা তারে কই নাই।তারে যেমন ভালোবাসি না কওনের পরেও আমারে তার বুকে ঠায় দিছে তেমনি তোরে ভালোবাসি না কওনের পরেও তোর বুকে আমি ঠাঁয় পাইছি।”
“তাহলে তো বলতে হচ্ছে তুই স্বার্থপর জহির।শুধু আমার থেকে ভালোবাসা নিয়েই গেলি কিন্তু এর বদলে আমায় কিচ্ছু দিলিনা।”
কথাটা বলে জুঁই ভেংচি কাটলো।জহির ওর থুতনি ধরে নিজের দিকে মুখ ঘুরিয়ে আলতো হেসে বলল,
“তরে কিছু দেই নাই ক্যাডা কইলো?তুই হইলি বর্ষার পানিত ভইরা ওঠা সেই নদী,যারে দ্যাখতে ভালো লাগলেও নৌকা বাইতে ডর লাগে।তারপরেও তোর এই পাগল মাঝি বৈঠা হাতে লইয়া তার মাঝে গিয়া থাকতেই সুখ পায়।তর ম্যালা ক্ষমতা রে জুঁই।”
“তা কি ক্ষমতা আমার একটু শুনি?”
“তুই হইলি স্রোত।আর আমি বৈঠা হাতে নিয়া চুপচাপ নৌকায় বইসা থাকা এক মাঝি।আমি তরে ভরসা কইরা আর নৌকা বাই না।তুই স্রোত হইয়া আমারে যেই দিকে নিয়া যাস সেই দিকেই যাই।এইডা কি কম ক্ষমতার কথা?তুই হইলি সেই জোয়ার যা আমারে বারবার তর মাঝে ডুব দেওয়ায়।”
জুঁইয়ের ঠোঁটদ্বয় প্রশস্ত হয়।জহির যে এভাবে নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারে সেটা তার জানা ছিল না।পাগলটা সত্যি পাগলের মতনই ভালোবাসে জুঁই কে।
জহিরের কোঁকড়ানো চুলগুলো জুঁই হাতের সাহায্যে আরেকটু এলোমেলো করে দিয়ে বলল,
“এখন তবে আসি।দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
জুঁই এগিয়ে গিয়ে একবার পিছনে ফিরে তাকালো।জহির তখন আবার তার নৌকার কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য উদ্যত হয়েছে।
“ওই কালা!”
ডাকটা কানে যেতেই জহির পিছনে ফিরে তাকিয়ে ইশারায় জিজ্ঞেস করল কিছু বলবে কিনা জুঁই।জুঁই আলতো হেসে বলল,
“তুই কখনো তোর নৌকা চালানোর পথটা বদলাস না।আমি সারাজীবন স্রোত হয়ে তোকে ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব নিলাম।তুই শুধু আমাকে একটু ভালোবাসিস।”
প্রত্যুত্তরে জহিরও মুচকি হেসে বলল,
“তুইও খালি আমারেই তোর স্রোতে ভাসাইয়া নিয়া যাস।আর কেউ যেন সেইখানে ঠায় না পায়।তুইও আমারে ইট্টুখানি ভালোবাসিস।আমি তরে এই বিশাল নদীর চাইতেই বেশি ভালোবাসমু।”
______
বাড়ির উঠানে এসে দাঁড়াতেই মতিউর এল।একটু পরে সুজনের ডাক পড়লো।জুঁই গরুর গাড়িতে উঠে পড়ল।ওর সাথে মতিউর কে দেখে সুজন একটু অসন্তুষ্ট হয়েছে বটে তবে সেটা প্রকাশ করার সাহস তার নেই।
গ্রামের কাঁচা রাস্তা দিয়ে গরুর গাড়ি চলছে।রাস্তার অবস্থা তেমন একটা ভালো না।রাস্তাটা উঁচু নিচু হওয়ায় গাড়ির যাত্রীরাও বারবার এদিক সেদিক হেলে পড়ছে।এই গাড়িতে অবশ্য বাহিরের কেউ নাই।এ বাড়ির সদস্যদের সাথে গ্রামের সাধারণ সদস্যদের একই গাড়িতে যাওয়া নিষেধ।
সকাল সকাল আজ বেশ গরম পড়েছে।অথচ দুদিন আগেও এই সময়টা একটু পরপরই বৃষ্টি হচ্ছিল।পথের দুই ধারের জমিগুলোর মাঝে এখনো পানি জমে আছে।বৃষ্টির কথা মনে পরতেই হুট করে জুঁই এর মানস্পটে ভেসে উঠলো দুদিন আগে রাতের স্মৃতি।বাড়ির সবাই তখন ঘুমিয়ে পড়েছে।বৃষ্টিও থেমেছিল কিছু সময়ের জন্য।সেই সুযোগে সে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল জহিরের সাথে দেখা করতে।তারপর জহিরকে নিয়ে সে রাতের অন্ধকারে সোজা গিয়েছিল বাড়ির পাশে ছোট বিলের ধারে।সামান্য আলোর কাজ করেছিল হাতের হারিকেনটা।দিনের বেলাতে জ্বিন ভুঁতের ভয়ে এই জায়গাতে কেউ তেমন একটা আসে না।আর এই রাতে যে কেউ আসবে না সেই ব্যাপারে তারা নিশ্চিত ছিল।রাতের শীতল আবহাওয়া,ভেজা মাটির গন্ধ,ব্যাঙের ডাক আর জোনাকি পোকার আলো সব মিলিয়ে এক অপূর্ব পরিবেশ তৈরি হয়েছিল।জুঁই তখন জহিরের কাঁধে মাথা রেখে বিলের পানির দিকে দৃষ্টি তাক করে রেখেছিল।দিনের বেলা হলে এখানে বেশ কিছু ফুটন্ত শাপলা ফুলের দেখা পাওয়া যেত।রাত নামার সাথে সাথেই তারা যেন লজ্জায় নিজেদের পাপড়ি গুটিয়ে নিয়েছে।বেশ কিছুসময় এভাবে চুপচাপ বসে থাকার পর জুঁই বলে উঠল,
“এবার বাড়ি ফিরে যাই চল।অনেক রাত হয়েছে।”
জহির জুঁইয়ের হাতটা ধরে বসেই থাকলো।হাতটা ছাড়তে ইচ্ছে করছে না তার।জহিরের সেই সুপ্ত ইচ্ছেটা জুঁই বুঝতে পারল।নীরবে জহিরের সেই ইচ্ছেটাতে সায় জানালো।
❝তুমি এলে তাই স্বপ্ন এলো,
ইন্দ্রধনুর লগ্ন এলো,
এ মধুর প্রহর হোক না অমর,
ওগো মোর পল্লবীনি!
এ মধুর প্রহর হোক না অমর,
ওগো মোর পল্লবীনি!❞
এই অসময়ে জহিরের কন্ঠে গান শুনে অবাক হলো জুঁই।জুঁই জহিরের কাঁধ থেকে মাথা তুলে বিস্ময় ভরা কণ্ঠে বলল,
“কিরে কালা গান তো বেশ শুদ্ধ ভাষায়ই গাইলি তাহলে কথা বলার সময় এমন ব্যবহার করিস কেন?”
জহির মুখ কালো করে বলল,
“শুদ্ধ না অশুদ্ধ ভাষায় গাইছি এইডাই আগে তোর দেখা লাগলো?তোর জন্য যে এত সুন্দর একখান গান গাইলাম এইডা কেমন হইলো কইবি তো নাকি?”
“গান তো তুই বরাবরই সুন্দর গাস।আর তোর গানের গলার প্রশংসা আমি সবসময়ই করি।”
“তর ভালো লাগে আমার কন্ঠে গান শুনতে?”
জুঁই মুচকি হেসে বলল,
“আমার কালার সবকিছুই আমার ভালো লাগে।”
জহির গাল ফুঁলিয়ে বলল,
“তুই যে আমারে সারাক্ষণ কালা কইয়া ডাকস আমি কিন্তু এতডাও কালা না।জানিনা বাপ মায়ে কি দেইখা নাম রাখছিল আমার কালা।তুই ক যে আমি কি এতডাই কালা?হ মানতাছি তোর লাহান ফর্সা না।তোর বাপ-মা দুইজনেই ফর্সা কিন্তু আমার বাপ মা ছিল কালা হের লাইগা আমিও কালা হইছি।এইডাতে আমার কি দোষ ক?”
জুঁই এবারে শব্দ করে হেসে উঠলো।পাশের হারিকেনের টিমটিমে আলোতে সেই হাসিটা কি ভয়ংকর সুন্দর লাগলো জহিরের কাছে।
“তোর এই বোকা বোকা কথাগুলোর জন্যই তোকে আমি এত ভালোবাসি জহির।তুই সারা জীবন এমন বোকাই থাকিস কেমন?তোর জন্য আমিও বরং বোকা হয়ে যাব।প্রেম ভালোবাসায় বোকামি করাই ভালো,বেশি চালাকি করা ভালো না।”
জহির মুগ্ধ নয়নে জুঁইয়ের কথাগুলো শুনে আনমনে বলল,
“তোর এই হাসি দেখার লাইগা আমি সারা জীবন বোকা কথা কইতে রাজি জুঁই।”
সে কথাগুলো মনে হাতেই জুঁই আবারো শব্দ করে হেসে উঠলো।সুজন আর মতিউর একযোগে ওর দিকে তাকালো।ওদের দুজনের দৃষ্টি দেখে জুঁই থেমে গেল।নিজের বোকামির উপর নিজেরই রাগ হলো।মতিউর হাস্যজ্জ্বল কন্ঠে প্রশ্ন করল,
“জ্বিনে ধরলো নাকি তোমাকে জুই?কোন কারণ ছাড়াই হাসছো যে?”
জুঁই ইতস্তত কন্ঠে বলল,
“আসলে একটা কথা মনে হয়ে গিয়েছিল তাই হেসে উঠেছিলাম।”
সুজন সন্দেহি কন্ঠে প্রশ্ন করল,
“কোন বিশেষ কারো কথা নাকি জুঁই?আমাদেরও বলো আমরাও একটু হাসি?”
“আরে না সুজন ভাই তেমন কোন কথা না।বাদ দিন।”
“বুঝেছি বুঝেছি থাক আর বাহানা বানাতে হবে না।”
“কি বুঝলেন আপনি?”
“যা তুমি চাওনি আমি বুঝি সেটাই বুঝে গেছি।”
সুজনের কথা শুনে পাশে বসে মতিউর জুঁই কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“সুজন সাহেব ঠিকই বুঝেছে জুঁই।প্রেমে যেহেতু তোমরা দুজনেই পড়েছো তাই কেউ কাউকে বোকা বানাতে পারবে না।আমি আবার কারো প্রেমে পড়িনি তাই দেখো আমি বোকা বনে গেলাম।তোমরা দুজনে যে কি বিষয়ে আলোচনা করছো তা বুঝলাম না ঠিক।”
সুজন থেমে গেল।আর কথা বাড়াতে মন চাইলো না।পুরো রাস্তা জুড়ে জুঁই আর মতিউরের মাঝে টুকটাক আরও কিছু কথা হলো।কলেজের কাছে এসে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল সবাই।আরেকটু পথ পায়ে হেঁটে যেতে হবে।
কলেজের গেটটারও বেহাল দশা।প্রাচীর গুলোও ভেঙে পড়েছে।বিল্ডিং এর মেরামত অনেকটাই হয়ে এসেছে।সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেলও এখনো কলেজের নামটা বেশ পরিষ্কারই দেখা যাচ্ছে।
❝শ্যামল ডাঙ্গা সরকারি কলেজ।❞স্থাপিত হয়েছিল ১৯৬৯ সালে।আর এখন ১৯৮৫ সাল।নির্মাণের পর যে ঠিক কতদিন কলেজটা চালু ছিল তা বলা কঠিন।আজ চোখের সামনে গ্রামের সেই সরকারি কলেজের মেরামত হতে দেখে জুঁই এর প্রাণটা স্বস্তিতে ভরে গেল।নিজের গ্রামে একটা কলেজের অভাবে তাকে নদী পেরিয়ে অন্য গ্রামে পড়তে যেতে হয়।এ কারণে না জানি কত ছেলে মেয়ের পড়াশোনাটাই বন্ধ হয়ে গেল।কিন্তু একবার এই কলেজটার সংস্কার কাজ শেষ হয়ে গেলে আর কারো পড়াশোনার ক্ষতি হবে না।তাদের গ্রামটাও আশা করা যায় ধীরে ধীরে উন্নত হবে।মতিউর আর সুজন গেল কলেজের চারিপাশটা ভালো করে দেখতে।জুঁই একাধারে কলেজের ভবনের সামনের সাদা প্লাস্টার করা দেয়ালে মোটা অক্ষরে লেখা কলেজের নামের দিকে তাকিয়ে আছে।এই কলেজটা তাদের গ্রামের গর্ব ছিল।আশেপাশের গ্রামগুলোতে তখন আর তেমন স্কুল কলেজ ছিল না।ফলে পার্শ্ববর্তী গ্রাম থেকেও তাদের কলেজেই শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করতে আসতো।এসবের বেশিরভাগটা অবশ্য জুঁইয়ের তার বাবার মুখ থেকে শোনা কথা।কেননা সেই সময়ে সে নিজেই অনেক ছোট ছিল।
“জলিল তালুকদারের মেয়ে?”
জুঁইয়ের ভাবনার মাঝে পাশ থেকে কোন অপরিচিত কন্ঠ কানে ভেসে এলো।ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখল মধ্য বয়সী এক যুবক দাঁড়িয়ে।পরনে তার সাদা হাফ হাতা ঢিলেঢালা শার্ট আর কালো প্যান্ট।চোখে চিকন ফ্রমের চশমা আর ঠোঁট জুড়ে লেপটে আছে মুগ্ধ করার মতন হাসি।তবে সেই মুগ্ধ করার মতন হাসিও জুঁইয়ের উপর খুব বেশি প্রভাব ফেলতে পারল না।জুঁই মুগ্ধই হলো না।স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
“হ্যাঁ জলিল তালুকদারের মেয়ে।কিন্তু আপনাকে তো ঠিক চিনলাম না।”
ছেলেটা হাস্যোজ্জ্বল মুখে জবাবে বলল,
“আমি মুজাহিদ নাদিম।আফজাল তরফদারের ছেলে।”
জুঁই একটু মনে করার চেষ্টা করে বলল,
“ওহ্ আচ্ছা আপনি আফজাল চাচার ছেলে।কবে ফিরেছেন গ্রামে?”
“আমি তো কয়েকমাস আগেই ফিরেছি।শ্যামল ডাঙা হাইস্কুলে শিক্ষক হিসেবে জয়েন করেছি।আপনি বোধহয় জানেন না?”
জুঁই উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলল,
“বাহ্।আপনি তো আমাদের গ্রামের গর্ব।আগে জানলে আমি নিজে এসে আপনার সাথে দেখা করে যেতাম।”
নাদিম মুচকি হেসে বলল,
“সে তো আপনিও আমাদের গ্রামের গর্ব।শুনলাম বৃত্তি পরীক্ষায় জেলা পর্যায়ে প্রথম হয়েছেন।এই কৃতিত্ব আমার কেন আরোও দশগ্রামের কারোরই নেই।আপনার এই ফলাফলের ধারের কাছে কখনো আমার ফলাফল ছিল না।সেই দিক দিয়ে যদি বিবেচনা করতে যাই তাহলে ভবিষ্যতে আমার থেকেও আপনি আরো বেশি গর্বের কারণ হবেন এই গ্রামের।”
জুঁই সলজ্জিত হয়ে বলল,
“সেটা বোধহয় সম্ভব হবে না।যতই হোক আপনি পুরুষ মানুষ।যদিও আমি মেয়ে হয়ে অনেক স্বাধীনতা পেয়েছি।আমার ভাগ্য ভালো জন্যে এখনো পড়াশোনা করতে পারছি।তবে এই গ্রামের গর্বের কারণ হয়তো হতে পারবো না।যাই হোক আমার সেসব কথা বাদ দিন। আপনি কি কিছু বলবেন?”
“না তেমন কিছু না।আপনার সাথে আলাপ করার ইচ্ছে ছিল।কলেজের সংস্কারের কাজ কতদূর এগোলো সেটাও দেখতে এসেছি।আপনাকে দেখলাম তাই ভাবলাম একটু কথা বলি।”
“ও আচ্ছা।আফজাল চাচা এখন কেমন আছে?”
“তেমন একটা ভালো নেই।হাঁটা চলাফেরা করতে পারেন না।তাও এখন আমি এখানে থাকি জন্য অনেকটা সুবিধা হয়।”
“তা তো অবশ্যই।নাহার কেমন আছে?”
“ভালো আছে।সামনেই ওর বিয়ে।”
“বাহ্ ভালো সংবাদ।ছেলে সম্বন্ধে ভালো করে খোঁজ খবর নিয়েছেন তো?আমার কথায় কিছু মনে করবেন না।আসলে বিয়ের আগে ভালো করে খোঁজখবর নেওয়াটাই ভালো।অনেকে অনেক কিছু মিথ্যে বলে আর ঘটকের কথা তো বাদই দিন।তাই বলছিলাম আর কি।”
“আমার বন্ধুর সাথে বিয়ে হচ্ছে।সেজন্য অনেকটা চিন্তামুক্ত আছি।এখন দেখা যাক বিয়ে পরবর্তীতে কি হয়।”
“আচ্ছা।এখন তবে আমি আসি।”
কথাটা বলে জুঁই চলে যেতে নিলে নাদিম ওকে আটকিয়ে ফের প্রশ্ন করল,
“আপনার পরীক্ষা কবে থেকে?”
“এই তো আর দু মাস আছে।”
নাদিমকে দেখে বোঝা যাচ্ছে যে সে বলার মতন কোন কথা খুঁজে পাচ্ছে না কিন্তু জুঁইয়ের সাথে সে আলাপচারিতা চালিয়ে যেতে বড্ড ইচ্ছুক।জুঁই না পারছে ঠিক মত কথা চালিয়ে যেতে,না পারছে এখান থেকে চলে যেতে।বলা যায় নাদিমের এমন আগবাড়িয়ে আলাপচারিতা তে সে একটু বিরক্তই হলো।কিন্তু তবুও ভদ্রতার খাতিরে কিছু বলতে পারছে না।নাদিম কে চুপ করে থাকতে দেখে জুঁই বলে উঠল,
“আপনি কি আর কিছু বলবেন?”
নাদিম একটু ভেবে বলল,
“হাই স্কুলে আসবেন।আপনাকে দেখে বাকি শিক্ষার্থীরাও অনুপ্রাণিত হবে,বিশেষ করে মেয়েরা।উপরের ক্লাসের দিকে তো মেয়েদের দেখাই যায় না।আপনাকে দেখে ওরা একটু সাহস পাবে।”
“আমি তেমন কিছুই করিনি যে মানুষকে অনুপ্রাণিত করতে পারবো।আপনি বোধহয় আমাকে একটু বেশি সম্মানের চোখে দেখছেন।”
“তা তো দেখতেই হবে।গ্রামের মাতব্বরের মেয়ে,পড়াশোনায় ভালো,আচার ব্যবহার ভালো,দেখতেও বেশ সুন্দরী।আপনি সম্মান পাওয়ারই যোগ্য।আসবেন বাড়িতে।যদি আপনার সময় হয়।”
জুঁই মুচকি হেসে সেখান থেকে চলে গেল।নাদিমের থেকে ছাড়া পেয়ে সে যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল।ছেলেটাকে কেমন যেন গায়ে পড়া স্বভাবের লাগল জুঁইয়ের কাছে।আর ছেলেদের এমন গায়ে পড়া স্বভাব জুঁইয়ের একদম অপছন্দ।ছেলেরা তো একটু লাজুক হবে।মেয়েদের সাথে এত কিসের আগ বাড়িয়ে কথা?জহির তো জুঁইয়ের সাথেই এত কথা বলতে সংকোচ বোধ করে।জহির কখনো কোন মেয়ের সাথে আগবাড়িয়ে গিয়ে ভাব করতে চায় না।আর এই ছেলের তো লাজ লজ্জা নেই।
চলবে?

